বস
টিফিনের টাইম । কারখানার গেট থেকে বেরিয়েছে অনেকেই । কেউ কেউ অবশ্য ভেতরেই বসে বাড়ির থেকে আনা ডাল ভাত, শাক চচ্চড়ি খাচ্ছে । অনন্ত একটুকরো ভেলি গুড় দিয়ে আর নকুল শীতের পাঁচমিশেলি সব্জি দিয়ে মেঝেতে বসে বসে রুটি সাঁটাচ্ছে। দারোয়ান টা হিন্দুস্থানী, তাঁর ইয়াব্বড় ভুঁড়ি। সেই বড়ো ভুঁড়ির চাপে বোধহয় খাঁকি কালারের উর্দির দুইটা বোতাম কবেই ছিঁড়ে গেছে। সেই ছেঁড়া অংশ দিয়ে গেঞ্জি না পরে থাকার দরুন তাঁর থলথলে ভুঁড়ির কিছু অংশ উঁকি মারছে। দারোয়ানজি গেটের পাশে টুলের উপর বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে। আনমনে গুনগুন করে হনূমান চল্লিশার স্তোত্র গাইছে আর খৈনি ডলছে । একটা নেড়ি কুত্তা গেটের বাইরে মাঝ রাস্তা ছেড়ে একটু বাম ধার ঘেঁষে লেজ মুড়ে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে । গেটের সামনে রাস্তা কম করে হলেও বিশ ফুটের মতো চওড়া । সেই রাস্তার যেদিকে কারখানার গেট ঠিক তার বিপরীত দিকের থেকে একটু এগিয়ে একটা ময়লার ভ্যাট।
কি নাই সেই ভ্যাটে? মাছের আঁশ , কলার খোসা , টকসে যাওয়া তরকারি ,ছেঁড়া জুতো , শুকিয়ে যাওয়া ফুলের মালা , কিছু ছেঁড়া জামাকাপড়, এক দুটো ভাঙা প্লাস্টিকের বালতি কিংবা গামলা,মরা ইঁদুর, কাগজে মোড়া ইউজড কন্ডম মায় রক্তে ভেজা মেয়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিন, ইত্যাদি ইত্যাদি।
সেটা গতবছরের দুর্গা পূজার আগের মাস। একটা আট ন মাসের বাচ্চার আধখাওয়া লাশও ভ্যাটের বাইরে পড়েছিল। তাই না দেখে খুব চেঁচামেচি । লোকজন জমে সেকি বাওয়াল। সেই ভিড়ের মধ্য থেকে কে যেন ফোন করে খবর দিল আর তার মিনিট পনেরর মধ্যেই থানা থেকে পেটমোটা বিশু দারোগা এক কনিষ্ঠগোপালকে সাথে নিয়ে জিপে চেপে হাজির। এসে জিপ থেকে নেমে মাটিতে পা দিয়েছে কি দেয় নি, অমনি তাঁর সে কি হম্বিতম্বি ! —-কোথা থেকে এল এ সব ? আমার এলাকায় এসব কি? বলি কোন খানকি পেট খসিয়ে এখানে এসব ফেলে গেল ?
কারুর কাছে কোন উত্তর না পেয়ে তাঁর লাফানি ঝাপানি আরও বেড়ে গেল দশ গুন। শেষে সেই যে সেই পাগলাটা, পাশের বাসস্ট্যান্ডের টিনের শেডের তলায় যে দিন রাত শুয়ে থাকে , কুকুরের সাথে লড়াই করে ভ্যাট থেকে খাবার খুঁজে খায় তাকেই চালান করে নিজে পদের মর্যাদা রক্ষার প্রয়াসে ব্রতী হল !
পথচলতি মানুষ যারা ভিড় দেখে দাঁড়িয়ে গেছল , ভেবেছিল কোন তামাশা হচ্ছে তারাই শুরু করলে প্রতিবাদ । শেষে কাউন্সিলরের চামচা কালু এসে বিশু দারোগাকে একদিকে ডেকে কানে কানে কি যেন বললে আর পকেট থেকে খবরের কাগজে মোড়ানো একটা বান্ডিল ধরিয়ে দিল। সাথে সাথে বিশু দারোগা পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে থানায় ফোন করল । কিছুক্ষণ পরেই একটা মটর সাইকেলে চেপে থানার ধ্যাঙড়কে নিয়ে আরও এক কনিষ্ঠগোপাল এল এবং একটা ছোট চটের বস্তায় সেই লাশ উঠিয়ে নিয়ে ভট ভটিয়ে চলে গেল। নিমেষে সেই যে সেই ভিড়ও অমনি পাতলা ॥
সুরভীর দেওয়া আলু ভাজা, খেসারির ডাল আর ভাত খেয়ে আমিও বেরিয়েছি । ইচ্ছা একটা বিড়ি খাই । বিবেকদার পানের দোকানের সামনে গিয়ে বলি- বিবেকদা ও বিবেকদা,এক প্যাকেট লক্ষ্মী বিড়ি । ঠিক সেই সময় পিছন থেকে কে যেন বললে- দাদা একটা তিনশ পান হবে। গলাটা কেমন চেনা চেনা মনে হল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে শমীক। আমি বললাম -কিরে শমীক কোত্থেকে?
দাঁত বের করে একগাল হেসে শমীক বললে- আরে অনিকদা তুমি ? তা তুমি এখানে ? আমি বললাম -আরে ওইতো আমাদের কারখানা বলে আঙুল তুলে দোকানের উল্টোদিকের সাইনবোর্ডটা দেখাই ।
সাইনবোর্ড বলতে কালো রঙের গেটের উপর সোনালী রঙ দিয়ে আবছা হয়ে আসা লেখা “বিশ্বকর্মা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস”। তবে সেই সে লেখা পড়তে গেলে যথেষ্ট কসরত করতে হবে।
সাইনবোর্ডের হাল দেখলে যে কেউ সহজেই বুঝে নেবে তার বর্তমান হাল হকিকত ।
আমি বললাম- তুইতো বললি না তো কোত্থেকে ফিরছিস ?
-সে পরে বলব’খন শমীক উত্তর দেয় । – কেন রে পরে কেন রে? কোন গোপন ব্যাপার স্যাপার আছে নাকি! নাকি নতুন কোন খবর আছে নাকি তোর? – নতুন খবর ? না দাদা নতুন কোন খবর কিচ্ছু নাই…। আমি প্যাকেট কেটে বিড়ি বের করি । একটা বিড়ি শমিকের দিকে এগিয়ে দিই। বলি -ঠিক আছে , ঠিক আছে। সে পরে কোন একসময় শুনব’খন । নে বিড়িটা নে ।
শমীককে একটা বিড়ি দিয়ে আমিও একটা বিড়ি নিয়ে কানের কাছে নিয়ে গিয়ে আঙুল দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরখ করি ঠিক আছে কিনা। তারপর সেটা মুখে নিই । পকেট থেকে দেশলাইটা বের করি । দেখি তাতে কেবল একটামাত্র কাঁঠি পড়ে। মুখের বিড়িটা ধরাবো বলে সেটা যেই না জ্বালিয়েছি, হঠাৎ করে আসা দমকা হওয়াতে সেটি গেল নিভে। কি করি আর। একরাশ কুণ্ঠা নিয়ে বললাম- বিবেকদা, একটু ম্যাচিস টা হবে। বিবেকদা তখন রেডিও তে হিন্দি ফিল্মি গান শুনতে শুনতে পান সাজায় ব্যস্ত। আমি আবারও বলি- বিবেকদা ও বিবেকদা ম্যাচিস টা….। পান সাজতে সাজতে বিবেকদা আঙুল দিয়ে দোকানের পাশে ঝোলানো লাইটারটা দেখিয়ে দিল । আমি বিড়িটা নিয়ে ধীরে ধীরে গেলাম। বিড়ি ধরানোর পর শমীককে আমার ধরানো বিড়িটাই এগিয়ে দিলাম । শমীক সেই বিড়ির আগুনেই নিজের বিড়িটা ধরিয়ে আমায় ফেরৎ দিল । দুজনে দোকান থেকে একটু সরে গিয়ে আরাম করে সবে দুটো টান দিয়েছি এমন সময় একটা লাক্সারি কার এসে ক্যাচ করে ঠিক আমাদের কারখানার গেটেই থামল । এরকম গাড়ি বাপের জন্মে আগে দেখিনি ! আমি শমীককে বললাম -দ্যাখ দ্যাখ কি সুন্দর গাড়ি ! কত দাম হবে বলতো ?
শমীক কারটার দিকে তাকিয়ে বলল -কি জানি ! তা পঞ্চাশ -ষাট লাখ হবে নিশ্চয় !
-বলিস কিরে পঞ্চাশ ষাট লাখ !
আমার ভিরমি খাওয়ার জোগাড় । -একটা গাড়ির অত দাম !
আমার কথা শুনে শমীক হি হি করে বেশ কিছুক্ষণ হাসল । দোক্তা পান আর বিড়ি খেয়ে খেয়ে তার দাঁতের যা রঙ তা আর কহতব্য নয় ॥
এমন সময় খট্ করে একটা আওয়াজ। সেই গাড়ির ড্রাইভারের দিকের গেট খুলল। ড্রাইভার নেমে বিপরীত দিকে গিয়ে পিছনের গেট খুলল। তারপর যা দেখলাম তাতে করে আমার আর শমীকের দুজনের চোখই আকাশে ওঠার জোগাড় । দেখলাম এক কুড়ি -বাইশ বছরের সুন্দরী, না না শুধু সুন্দরী নয় ছম্মক ছল্লু রকমের সুন্দরী। পায়ে হাইহিল সু , হাঁটু অবধি পিংক কালারের স্কার্ট , চোখে রে ব্যানের সানগ্লাস, নামলেন। গেটের সামনে গিয়ে সানগ্লাস টা কপালের উপরের দিকে তুলে সাইনবোর্ডের দিকে তাকালেন। তারপর গটগটিয়ে ফ্যক্টরির গেট দিয়ে ঢুকে সোজা মালিক অবনীবাবুর রুমের দিকে হাঁটা লাগালেন । হিন্দুস্থানী দারোয়ান প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও তার বিশাল ভুঁড়ি নিয়ে পিছনে পিছনে ছুটল । আর ঠিক যখন সে কাছে যাব যাব করছে ততক্ষণে রঙ্গিলার ঊর্মিলা অবনীবাবুর সামনে ॥
টিফিনের পর সুপারভাইজার সহ সব লেবারদের ডাকা হল অবনীবাবুর চেম্বারে । অবনীবাবু বললেন- শুনুন আপনারা । ইনি হলেন মিস মুখার্জী। লণ্ডন থেকে এম .বি .এ করে এসেছেন । আজ থেকে এই ফ্যাক্টরির ইনিই হলেন মালিক । গত সপ্তাহে এই ফ্যাক্টরি আমি ওনাকে বেচে দিয়েছি । উনি কথা দিয়েছেন কোন কর্মচারীকে ছাটাই করবেন না । আশাকরি আপনারা সব্বাই ভালো থাকবেন।
আমি বাবা বিশ্বকর্মাকে মনে মনে প্রণাম করলাম। বললাম -হে বাবা ! মালকিনের মতো আমাদের ফ্যাক্টরির চেহারাটাও বদলে এ রকম ঝকাস করে দাও। আর কৃপা করে দেখো মাসের শেষে বেতনটা যেন ঠিক মতো পাই॥
