Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » উঠল জেগে সোনার শহর || Rashmita Das

উঠল জেগে সোনার শহর || Rashmita Das

দৃশ্য এক
১৫২০ খ্রীষ্টাব্দের ১২ মার্চ

রাত গভীর…!আকাশে গোল থালার মতো চাঁদ উঠেছে.।সেই অপূর্ব জ্যোৎস্নায় স্নাত…স্নিগ্ধ মায়াবী চাঁদের ছায়া পড়েছে…গুয়াটাভিটা নদীর ওপরে…!টলোমলো জলের কাঁপন ওঠা নদীর বুকে…ওই মায়াময় চাঁদের ছায়া অপূর্ব এক ছন্দের সাথে দুলে দুলে উঠছে…! এই মায়াবী রাতে…নদীর তীরে জমায়েত হয়েছে… হাজারো মানুষ…! পুরুষরা… ধুতি সদৃশ ছোট পোশাকের ওপরে বড় কারুকার্যখচিত চাদর পরিধান করে রয়েছে…আর নারী রা পরিধান করে রয়েছে… গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা…ঘাঘরা সদৃশ পোশাক…!অদ্ভুত জ্যামিতিক নক্সা…আর সর্পিল কারুকার্যখচিত এই বৈচিত্র্যময় পোশাকে সবাই খুব সুন্দরভাবে সজ্জিত হয়ে… জমায়েত হয়েছে…এই গুয়াটাভিটা নদীর তীরে…!সকলের চোখেমুখে…এক অনাবিল আনন্দের রেশ উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে…!দক্ষিণ আমেরিকার এই মুইসকা উপজাতির…আজ উৎসবের দিন।আজকের রাত টা পেরোলেই…এই গুয়াটাভিটা নদী সংলগ্ন এই ভূমির ওপরে… অভিষিক্ত হবেন নতুন রাজা…”জিপা” কে অভিষিক্ত করা হবে…!

সিংহাসনে উপবিষ্ট হতে চলেছেন… নতুন প্রজন্মের তপ্ত রক্তধারী এক যুবা…যাঁর শক্ত কাঁধ ও দৃঢ় শক্তির ছত্রছায়ায় একত্রিত হতে চলেছে মুইসকা উপজাতির নতুন প্রজন্ম…!

নদীর তীরে…বহুবর্ণের বিচিত্র পোশাক পরিহিত ছেলে… মেয়ে… বাচ্চা… বুড়ো… সবাই মেতে উঠেছে নৃত্য সঙ্গীতের চিত্তাকর্ষক অনুষ্ঠানে…!

সবাই এখন বড়ো নিশ্চিন্ত…! সবাই মনে প্রাণে… তৃষ্ণার্ত চাতকের ন্যায়ে…শুধু তাকিয়েছিল নতুন রাজা… অর্থাৎ “জিপা” র অভিষেকের…বহু প্রতীক্ষিত… সেই ভোরের আগমনের অপেক্ষা নিয়ে…!আর মাত্র আজকের এই রাতটুকু কেটে যাওয়ার অপেক্ষা…!তারপরেই সূর্যাস্তের সাথে সংঘটিত হতে চলেছে…মুইসকা উপজাতির নতুন সময়ের সূচনা…!

যে সময়ে…মুইসকা উপজাতির প্রতিটি মানুষ… ঘুরে দাঁড়াবে… দীর্ঘদিন ধরে ওদের সাথে সংঘটিত হয়ে আসা যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে…!মাথা তুলে দাঁড়াবে স্পেনীয়দের যাবতীয় অত্যাচার…নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে…!

গুয়াটাভিটা নদীর তীরে… যখন মুইসকা উপজাতির মানুষেরা উৎসবে…আনন্দে… নৃত্য সঙ্গীতের আবহে মাতোয়ারা…ওই সময়ে… তাদের অনাগত রাজা…হুনজাহুয়া…

আমাজনের গভীর জঙ্গলের ভিতরে…এক পার্বত্য গুহার ভিতরে আত্মগোপন করে রয়েছেন।কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে…তার সামনে বিশেষ মুদ্রায় উপবিষ্ট হয়ে… তিনি একমনে আরাধনা করে চলেছেন দেবতা বোচিকা র…!

মুইসকা উপজাতির আরাধ্য দেবতা বোচিকাকে তুষ্ট করার অভিপ্রায়ে মগ্ন হুনজাহুয়া…টের ই পাননি…কখন তাঁর পশ্চাৎ এ এসে দাঁড়িয়েছে এক অপূর্ব সুন্দরী মায়াবিনী নারী…!

মন্ত্রোচ্চারণ ও আরাধনার যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান শেষ করে…মুইসকা উপজাতির ভাবী রাজা হুনজাহুয়া… এবার তাঁর অভুক্ত উদরে… দিনের প্রথম জল স্পর্শ করতে উদ্যত হলেন যখন… সেই মূহূর্তে… হঠাৎ সেই কামুক নারী…হুনজাহুয়ার কাছে এসে…তাঁকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলল…!আর তারপর… অদূরে সংরক্ষণ করে রাখা… একখানি জলপূর্ণ মাটির পাত্র… এগিয়ে ধরল হুনজাহুয়া র ওষ্ঠের কাছে…!তারপর মায়াবী কন্ঠে…চাপা স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল…”পান করো প্রিয়…পান করো…! বলিহারি যাই তোমাদের এইসব নিয়মকানুনের…!

সিংহাসনে বসতে চলেছ… কোথায় উদ্যম স্ফূর্তির জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেবে…!কোথায় মদিরা…মাংস আর নেশাদ্রব্যের বিলাসিতায় মাতোয়ারা হয়ে উঠবে…তা নয়…জনহীন প্রান্তরে… নির্জন গুহায়… সকাল থেকে নির্জলা উপবাস করে… ক্লান্তিহীন আরাধনা করে চলেছ…!অনেক হয়েছে নিয়ম পালন… এবার তুমি এসো… আমার বাহুডোরে…আমি তোমাকে নিয়ে যাব…মত্ত কাম বাসনার চূড়ান্ত শিখরে…!

এই নির্জন গুহার ভিতরে অকস্মাৎ… বিনা মেঘে বজ্রপাত সদৃশ আবির্ভূতা এই পরমাসুন্দরী…এক সমুদ্র যৌবনের উত্তপ্ত লাভায় লালায়িত এই নারী কোথা থেকে… কিভাবে উদয় হল…তা বুঝেই উঠতে পারলেন না হুনজাহুয়া…! বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ওঠার আগেই…মেয়েটি আরো নিবিড়ভাবে নিজের উত্তপ্ত শরীরের সাথে আবিষ্ট করে ফেলল তাকে…!

তারপর…তাঁর কানে কানে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল…”রাত পোহালেই তুমি রাজা হতে চলেছ…রাজা মানে বোঝো তুমি?এদের সকলের প্রভু হতে চলেছ তুমি…এদের সকলের রাশ… থাকবে তোমার তর্জনী তে…তো তুমি যদি একটু আধটু নিয়ম ভঙ্গ করেও থাকো…তাতে কোনো ক্ষতি নেই।সিংহাসনে বসবার সাতদিনের মধ্যে… জনমানুষের থেকে দূরে থেকে… নারীর স্পর্শ ব্যতীত… শুধু বোচিকা র সাধনা করার চিরাচরিত নিয়মে এখন তুমি ব্রতী হয়েছ…! ভালো কথা… কিন্তু একটা কথা মনে রেখো…আজ যদি তুমি আমাকে কামনার সাথে স্পর্শ না করো… আমাকে কিন্তু আর কোনোদিন তুমি দেখতে পাবে না…!”

চাপা স্বরে…মেয়েটার বলা কথাগুলো… একেবারে ছুরির মতোই এসে বিঁধল যেন হুনজাহুয়ার ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসতে থাকা হৃদয়ে…!

তীব্রতর ধর্ম সংকটে পড়ে গেল সে।

মুইসকা উপজাতির ভাবী রাজার জন্য কড়া নিয়ম রয়েছে… সিংহাসনে অভিষিক্ত হওয়ার পূর্বের সাতদিন… জনবিরল কোনো জায়গায় বাস করে…একাকী নির্জনে…বোচিকার সাধনায় মগ্ন থাকতে হবে।

সারাদিন নির্জলা উপবাসে থেকে… রাতে বিশ্রামের পূর্বে ফলাহার করতে হবে।আর সেই সাথে… নারীর সংস্রব হতে বিরত থাকতে হবে।

কিন্তু এখন…হুনজাহুয়া র সমস্ত সংযম…ক্রমশ লোপ পেতে আরম্ভ করেছে…!

নির্জন ওই গুহার চতুর্দিকে রয়েছে কড়া পাহারা…!তা সত্ত্বেও…এই নারী… এই গুহার দরজা এমন বিপদসঙ্কুল জায়গায় অবস্থিত এই গুহার দরজা পেরিয়ে তার ভিতরে ঢুকে এল কিভাবে…এই প্রশ্ন এখন সম্পূর্ণরূপে অর্থহীন…মুইসকা উপজাতির ভাবী রাজা হুনজাহুয়ার কাছে…!তার মাথায় শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে…!

“সব নিয়ম টিয়ম চুলোয় যাক…রাত পোহালে আমি ই হব সকলের ভাবী প্রভু…!অতএব দেবতা বোচিকা কে সাধনা দ্বারা তুষ্ট করার আর কোনো প্রয়োজন ই নেই।”

নেশাতুর কামনার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে…হুনজাহুয়া… আকস্মিকভাবে গুহার ভিতরে প্রবেশকারী এই আগন্তুক কামুক নারীর ওষ্ঠে… বক্ষ দেশে… সঞ্চালিত করতে শুরু করলেন তার কম্পিত হস্ত…! তারপর… হঠাৎ…এক ঝটকায় তাকে বেঁধে ফেললেন নিজের বাহুডোরে…আর তারপর বিলীন হয়ে গেলেন আদিম রিপুর উত্তাল স্রোতের সাথে…!

দৃশ্য দুই
১৯৪৭ সাল

ঘড়িতে ঢং ঢং করে সাতটা বাজল।উজ্জ্বল সকালের আলো… জানলা দিয়ে লুকাসের মুখে এসে পড়েছে একদম তীক্ষ্ণ ভাবে।নাঃ..আর বিছানায় শুয়ে থাকা চলে না…! আড়মোড়া ভেঙ্গে… বিছানা ছাড়ল লুকাস।হাতমুখ ধুয়ে নিয়ে সোজা চলে গেল প্রাতরাশের টেবিলে…!

চাকর এসে টেবিলের ওপরে সুসজ্জিত প্লেটের ওপরে সাজিয়ে প্রাতরাশ পরিবেশন করল।বাংলোর চারপাশে… রাস্তার ওপরে চলছে উত্তাল তান্ডব।

স্বাধীনতার দাবীতে গোটা ভারতবর্ষ উত্তাল হয়ে উঠেছে। খাবার টেবিলে বসে লুকাস মুখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে এসে বলে উঠল…”ধুর…কেন যে মরতে নিজের জন্মস্থান থেকে এই ভারতে এলাম…সারা পৃথিবীতে ঘোরার মতো আরো তো কত সুন্দর সুন্দর জায়গা ছিল… নিরুপদ্রব পরিবেশে… সুন্দর ছুটি কাটানো যেত…! এখানে চারপাশে শুধু বন্দুকের গোলাগুলি আর অশান্তি…।রাবিশ…!”

ঠিক সেই সময়ে… বৃদ্ধ চাকর এসে আর্থার কে সেলাম ঠুকে…ওর হাতে একটা কাগুজে খাম ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। আর্থার বুঝল…প্রিয় বন্ধু আর্থার টেলিগ্রাম পাঠিয়েছে।

আর্থার টেলিগ্রাম পাঠিয়েছে দেখেই… প্রচন্ড উৎফুল্লতার সাথে টেলিগ্রাম টা খুলে পড়তে আরম্ভ করল লুকাস।

আর্থার লিখেছে…”আমি ভারতে আসছি দিন কয়েকের জন্য…তোর কাছেই আসছি সরাসরি… আমার বাবার সাথে ভারতীয় বিপ্লবীদের শত্রুতা এখন চরমে।আর ওনার কাজকর্ম গুলোকে আমিও সমর্থন করি না একেবারে। বিদেশের মাটিতে পা রেখে… সেখানকার মানুষদের নিজেদের দাসে পরিণত করে তাদের সর্বস্ব লুঠ করে নেওয়া টা কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারি না আমি।আমি আসছি শুধুমাত্র আমার গর্ভধারিণী মায়ের সাথে দেখা করার জন্য। আমার বাবার মুখ দর্শন করার কোনো ইচ্ছা নেই আমার।তাই আমি তোর কাছেই এসে থাকব এই কটাদিন। মায়ের সাথে দেখাও করব…আর আমাকে বহুদিন ধরে যে কথাগুলো বলার জন্য উন্মুক্ত হয়ে ছিলি…সেই সব কথা শুনব। কেমন!”

টেলিগ্রামটা পড়ে আনন্দে একেবারে নেচে উঠল লুকাস…যাক… এতদিনে তাহলে মাছ নিজে থেকে বড়শিতে এসে ধরা দিতে চলেছে…!

লুকাস সাথে সাথে তার সঙ্গী সাথীদের সাথে যোগাযোগ করল। দক্ষিণ আমেরিকা তে যাওয়ার সব বন্দোবস্ত শুরু করে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করতে বলল।সকলে বলল… এখনো তো আর্থারের সাথে এই বিষয়ে কোনো কথা হয়নি… শেষকালে সে সবটা শুনেটুনে পিছিয়ে যায় বা সবকিছু ভেস্তে দেয়…তখন! এতদিন অপেক্ষা করার পর… আর্থার এখানে এসে পৌঁছানো পর্যন্ত আর কটাদিন অপেক্ষা করে গেলে হত না?

লুকাস প্রচন্ড উৎফুল্লতার সাথে বলে উঠল…”আরে…এই অভিযানে ও ঠিক ই যোগদান দেবে আমাদের সঙ্গে…তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো…!

দৃশ্য তিন
(২০০০ সাল)

—ও দাদু…দাদু…একটা গল্প বলো না…।

দুই নাতি আর এক নাতনি… সন্ধ্যা না হতেই… দেবজ্যোতি বাবুকে তিনদিক থেকে একেবারে ছেঁকে ধরল।মাঘ মাসের কনকনে শীতের সময়।তায় আবার লোডশেডিং।অবশ্য এ লোডশেডিং অনাগত আপদ বালাইয়ের মতো না জানিয়ে হুট করে এসে হাজির হয়নি। বৈদ্যুতিক তারের লাইন ঠিক করার জন্য কাজ চলছে।তাই আজ দুপুরের পর থেকেই…প্রতিটা বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।অতএব আজকে রাতের মধ্যে কারেন্ট আসার নো চান্স‌।এতে অবশ্য সাপে বর হয়েছে তিন ভাই বোন রনি,টুকাই আর রিমঝিম। আজকে রাতের জন্য ওদের পড়াশোনার পাট একদম বাক্সবন্দী।রাতের জন্য মা আগে থেকেই পোলাও আর কষা মাংস তৈরি করে রেখে দিয়েছেন। এখন তিনিও সাংসারিক কাজকর্ম থেকে ছুটি নিয়ে… শোবার ঘরে বসে চা খেতে খেতে রেডিও শুনছেন।পাশের ঘরে বাবা আর কাকা কিছু জরুরী আলোচনার ব্যস্ত।

টুকাই জন্ম ইস্তক শুনে আসছে… দাদু নিজের কাছে এমন কোনো গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছেন…যার হদিস পাওয়া গেলে… সমাজের প্রভাবশালী ও বিত্তবান ব্যক্তিদের সাথে এক আসনে বসতে পারা সম্ভব হবে। ধনসম্পদের প্রাচুর্যে ঝলমল করে উঠবে জীবন।

টুকাই মাঝে মাঝে ভাবে…বাবা…কাকা দিনরাত মাথা খারাপ করে কেন ওই একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন…ক্লাস টুয়েলভে পড়া টুকাই বোঝে… লক্ষ্মীর কৃপা দৃষ্টি এই পরিবারের ওপর ভালোই রয়েছে। পারিবারিক ব্যবসার অবস্থা খুবই ভালো…. প্রগতিশীল। টাকাপয়সার ভাঁড়ার দিন কে দিন ফুলে ফেঁপে উঠছে। তবুও তাঁরা দিনরাত আরো ধনী হওয়ার জন্য কেন এত মাথা খারাপ করে…! দাদুর কাছে যদি এমন কোনোকিছু থেকেও থাকে… এবং তিনি যদি সেটা প্রকাশ্যে নাই বা আনেন…তা নিয়ে তাঁদের নিজেদের ভিতরে এত ফিসফিসানির প্রয়োজন টাই বা কি?

এইসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর টুকাই খুঁজে পায় না।

এখন বাবা কাকারা… আবার সেই আলোচনাই করছেন।

লোডশেডিং এ মোমবাতি জ্বেলে…মা কাকিমা রা সাংসারিক গল্পে মশগুল হয়ে গিয়েছেন।

এমন এক অলস সন্ধ্যায়…সারা শরীর সোয়েটার আর টুপি দিয়ে মুড়ে… মোমবাতির আলোয় বসে রোমহর্ষক গল্প শোনবার মজাটাই কিছু আলাদা।রনি, টুকাই আর রিমঝিম প্রায় ঝড়ের মতো দেবজ্যোতি বাবুর কাছে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

—“দাদু…এই শীতের সন্ধ্যায় একটা রোমহর্ষক গল্প শোনাও না… গায়ে কাঁটা দেবার মতো গল্প..!”

একরাশ আকুতি মাখা কন্ঠে বলে উঠল রনি। রিমঝিম আর টুকাই ও সমান তালে তাল মিলিয়ে বায়না শুরু করে দিয়েছে।সন্ধ্যার সময়ে দেবজ্যোতি বাবু নিজের ঘরের দরজা বন্ধ রেখে…একটু নিরিবিলিতে সময় কাটাতে ভালোবাসেন।কখনো গান শোনেন… কখনো বা বই পড়েন…মুভি দেখেন…কিন্তু আজ তো সেসবের কোনো জো নেই।তাই তিনি জানলার পাশে চুপচাপ বসেই সময় কাটাচ্ছিলেন…। হঠাৎ তিন নাতি নাতনী তাকে এইভাবে ছেঁকে ধরায় খানিক বিচলিত হয়ে পড়লেন তিনি।

বলে উঠলেন…”ঠিক আছে… ঠিক আছে… দাদুভাই…দিদিভাই…আমি তোমাদেরকে গল্প শোনাব।তোমরা একটু শান্ত হও দিকি…চলো…আমরা চারজনে বিছানায় গিয়ে বসি।”

এই কথা শুনে রনি, টুকাই আর রিমঝিম আনন্দে নেচে উঠল।রনি আর রিমঝিম দুজনেই পড়ে ক্লাস ইলেভেনে। হোস্টেলে থাকে। গরমের ছুটিতে বাড়িতে এসেছে।এই তিনজন নাতি নাতনি… সুযোগ পেলেই… দাদুর কাছে গল্প শুনতে খুবই ভালোবাসে ‌।

দেবজ্যোতি বাবুর জ্যেষ্ঠা পুত্রবধূ রজনী দেবী ঘরে প্রবেশ করলেন ধোঁয়া ওঠা বাটি ভর্তি একটা ট্রে নিয়ে।মোমবাতির আলোয় ওরা দেখল… ট্রে তে চারটে বাটিতে করে রাখা রয়েছে ধোঁয়া ওঠা চিকেন স্যুপ।

জিভ দিয়ে জল বেরিয়ে এল তিন ভাই বোনের।ওঃ…আজকের সন্ধ্যাটা এক্কেবারে জমে যাবে। রজনী ঘর থেকে বেরোনোর সময় তিন ভাইবোনের উদ্দেশ্যে বলে গেলেন…”গল্প শোনার তাগিদে… সময়ের দিকে খেয়াল টা যেন না চলে যায় তোমাদের… আমার পায়ে খুব ব্যাথা…আমি আর ওপর নীচ করতে পারব না। খাবার সময় হলে তোমরা সবাই কিন্তু নীচে চলে আসবে…!”

তিন ভাই বোন একসাথে বলে উঠল “একদম”।

ঠিক এমন সময়ে… মোমবাতির মৃদু আলোয়…ঘরের দরজার পরদার নিচে… দুটো ছোট্ট ছোট্ট পা দেখা গেল। দেবজ্যোতি বাবু সেদিকে তাকিয়ে সহাস্যে বলে উঠলেন…”তুমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন বাবু… ভিতরে এসে বসো‌‌ সবার সঙ্গে…!”

তাঁর কথা শুনে… বছর আটের বাচ্চা ছেলে টা… একরাশ সংকোচ নিয়ে ঘরে এসে ঢুকল।এই বাচ্চা ছেলে টা…দিন কয়েক আগে…পথ হারিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে… হঠাৎ এই বাড়ির দরজায় এসে পড়েছিল।তিনিই প্রথম ওকে এই বাড়ির কাছে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন। এতটুকু ছোট একটা বাচ্চাকে এইভাবে একা একা রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে দেখে… তিনি বুঝতে পারেন এই বাচ্চা ছেলে টা কোনোভাবে নিজের বাবা মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বাচ্চা ছেলেটিকে তিনি নিজের কাছে ডেকে নেন।ওর সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝতে পারলেন… তাঁর আন্দাজ ভ্রান্ত নয়। বাচ্চা টা কাঁদো কাঁদো হয়ে দেবজ্যোতি বাবুকে জানায়…সে হারিয়ে গেছে।এত বড় শহরে নিজের বাবা মাকে কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। নিজের একটা ডাকনাম বলেছে বটে… কিন্তু বাবা মায়ের নাম ঠিকানা ঠিকভাবে বলতেই পারছে না।দেবজ্যোতি বাবু‌ বাচ্চা ছেলেটির প্রতি সদয় হয়ে… তাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন।এই ব্যাপারটা নিয়ে বাড়ির অন্দর মহলে একটা চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে যদিও… কিন্তু দেবজ্যোতি বাবু সেসবে পাত্তা টাত্তা দেননি। বরং…এই বাচ্চা ছেলে টা আসবার পর থেকেই দেবজ্যোতি বাবুর ভিতরে দেখা দিয়েছে আমূল পরিবর্তন।যে দেবজ্যোতি বাবু কিছুদিন আগেই কেদারনাথ…বদ্রিনাথে তীর্থ করতে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে শুরু করেছিলেন… সেই মানুষটাই অকস্মাৎ এইসব চিন্তা একপাশে সরিয়ে রেখে…নিজের মৃত্যুচিন্তা করতে শুরু করে দিলেন… এবং নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় ও সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারার কাজে মনোনিবেশ করলেন।যাই হোক… সেই থেকে এই বাচ্চা ছেলে টা এই বাড়িতেই রয়েছে।ওর ডাক নাম টা কিন্তু ভারি অদ্ভুত…হুনজু। দেবজ্যোতি বাবু ডাকলেন ওকে…”হুনজু… ভিতরে এসো… একটা দারুন গল্প বলা শুরু করছি এখন… তুমিও শুনবে এসো…!

তারপর আর একটু জোরে হাঁক পেরে বলে উঠলেন…”বৌমা…আর একটা গরম স্যুপের বাটি এই ঘরে এসে দিয়ে যাও দেখি…!

গরম স্যুপের বাটিতে প্রথমে একটু ফুঁ দিয়ে… তারপর এক চামচ স্যুপ মুখে দিয়ে…তৃপ্ত মেজাজ নিয়ে গল্প বলা আরম্ভ করলেন দেবজ্যোতি বাবু‌।

“আজ আমি তোমাদের যে গল্প শোনাতে চলেছি…সেটা কিন্তু কোনো কাল্পনিক গল্পকথা নয়… আমার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া এক রোমহর্ষক অধ্যায়…!

যে সময়ের কথা বলছি…সেটা কিন্তু আজকের কথা নয়। প্রায় তিপ্পান্ন বছর আগের কথা। তখন উনিশশো সাতচল্লিশ সালের মাঝামাঝি সময়।আমাদের ভারতবর্ষ তখনো স্বাধীন হয়নি‌। দেশভাগ নিয়ে চতুর্দিকে একেবারে উত্তাল পরিস্থিতি।ওই সময় আমি ছিলাম বাইশ বছর বয়সের একজন যুবক।

চারদিকে শুরু হওয়া উত্তাল দাঙ্গায়… তখন প্রাণ টুকু হাতে নিয়ে আমরা কোথায় পালাব…কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।আমাদের এলাকায় ঢুকে কিছু উন্মত্ত ক্ষ্যাপা নরপিশাচের দল… কসাইয়ের মতো রক্তগঙ্গার স্রোতে সবকিছু ভাসিয়ে দিতে শুরু করল।এবং শেষমেষ… আমাদের বাড়িসহ… কিছু বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দিল…! নিজের বাড়িঘর চোখের সামনে ভস্মীভূত হতে দেখা সত্ত্বেও…সেইদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে…পরিবারের মানুষ দের সেখান থেকে সরিয়ে… কোনো নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি হয়ে উঠেছিলাম মরিয়া…!

কিন্তু ঈশ্বর আমার দিক থেকে সেদিন পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন…!আমি দৃঢ়ভাবে সঙ্কল্প নিয়েছিলাম…”আমার যা হওয়ার হোক…আমার …মা… ছোট ভাই বোন আর বৃদ্ধা ঠাকুরমা… এদের সবাইকে আমি নিরাপদে সেখান থেকে বার করে পাড়ি দেব অন্যত্র। ওদের কারোর গায়ে একটা আঁচড় ও পড়তে দেব না। কিন্তু ভাগ্য আমার সাথ দিল না।আমি যে সংকল্প নিয়েছিলাম…ঘটল তার ঠিক উল্টোটাই…!আমি হাজার চেষ্টা করেও…ওই লেলিহান অগ্নিশিখার কবল থেকে আমার পরিবারের একজন সদস্যকেও বাঁচাতে পারলাম না…!এক এক করে চোখের সামনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেলেন আমার মা… বৃদ্ধা ঠাকুরমা…।ছোট ছোট ভাইবোনগুলোও এক এক করে আমার সামনে আগুনে‌ ঝলসে… ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে…!আগুনের গ্রাসে আমার শরীরেরও সিংহভাগ ঝলসে গিয়েছিল। কিন্তু মৃত্যু আমাকে গ্রাস করতে পারেনি‌।পরিবারের মানুষদের এই শোচনীয় মৃত্যুর পর… আগুনে ঝলসে গিয়ে আহত অবস্থায়…আমি একলাই পড়ে থাকতাম পথে ঘাটে…!

কখনো না খেয়ে… কখনো ভিক্ষা করে…চেয়েচিন্তে…দিনপার করেছি। শরীরের অধিকাংশ জায়গায় পুড়ে গিয়ে যে টাটকা ক্ষত তৈরি হয়েছিল…তা দেখে একবার এক ধনী ব্যক্তির দয়া হয়েছিল আমার ওপরে। তিনি আমাকে খাবার জন্য আর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করানোর জন্য কিছু টাকা দিয়েছিলেন। তাঁর সেই উপকার আমি কোনদিন ভুলতে পারব না।ওই টাকা দিয়ে আমি পেট ভরে খাবার খেলাম…আর তারপর বাকি টাকা দিয়ে চিকিৎসা করিয়ে নিলাম।এর কিছুদিন পর আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলাম।অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলে আমি।তায় শিক্ষিত…। স্বজনহারা হয়ে একলা হয়ে পড়ে এহেন পরিস্থিতিতে… কোনো না কোনো কাজ করে নিজের পেট চালিয়ে জীবনধারণ করে নেওয়ার ক্ষমতা আমার ছিল।কিন্তু আমি মন থেকে পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়েছিলাম।বারে বারে শুধু মনে ভেসে উঠত মায়ের হাসিমুখ খানি। ঠাকুরমার স্নেহ ভালবাসা মাখা বচন… ভাইবোন দের খুনসুটি… এইসব দৃশ্যগুলো বারে বারে ভেসে উঠত হৃদয়ের মণিকোঠায়…। পরিবারের সকল প্রিয় মানুষদের একসঙ্গে হারিয়ে আমার প্রায় পাগল হয়ে যাওয়ার মতো দশা হয়েছিল তখন।

বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাই আমার ভিতর থেকে পুরোপুরি চলে গিয়েছিল। বাড়িতে আগুন লাগার সাথে সাথে… আমার লেখাপড়ার সব শংসাপত্র ও পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। চারপাশের ওই অস্হির সময়ে… চারপাশে চোখ মেললেই শুধু দাঙ্গা… পিশাচের মতো খেয়োখেয়ি মৃত্যু মিছিল আর রক্তের বন্যা ব্যতীত আর কিছুই দেখা যেত না।ওই পরিস্থিতিতে লোকের দরজায় দরজায় ঘুরে ঘুরে যখন চাকরির চেষ্টা করতাম… তখন নিজেকেই নিজে ধিক্কার দিতাম প্রতি মূহুর্তে…!মনে হত…ওই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আমার পরিবারের মানুষদের সঙ্গে আমিও যদি মারা যেতাম… তাহলেই এই দুঃসহ যন্ত্রণার হাত থেকে বেঁচে যেতাম।

না…এত ঘুরে…এত খুঁজেও… নিজের ছোট্ট একটা পেট চালানোর মতো কোনো চাকরিই আমি জোটাতে পারলাম না…!কি আর করব তখন…! নিজেকে পুরোপুরি অদৃষ্টের হাতে সঁপে দিয়ে শুধুই ভাবতাম…আমি বোধহয় যমের ও অরুচি। চারপাশের এইভাবে মৃত্যুর মিছিল আর অবিরাম রক্তের স্রোত দেখতে দেখতে…আমার মন যেন বলে উঠত…ওই মৃত্যু মিছিলের একজন শরিক যদি আমিও হতে পারতাম… তাহলে এই দুঃসহ জীবন থেকে চিরতরে রেহাই পেয়ে যেতাম।কিন্তু না…আমার সে আকুতি ভগবান কানেই নিলেন না।পেটে দু দানা পড়ত কি পড়ত না…তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না… কিন্তু ওই উত্তাল পরিস্থিতিতে আমি ঠিক টিকে গেলাম। এইভাবে বেশ কিছুদিন কাটল।আমি কাজ অথবা খাবারের সন্ধানে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছিলাম…এমন সময়ে হঠাৎ ঘটল সেই ঘটনাটা…!

হঠাৎ করেই…বলা নেই…কওয়া নেই…কয়েকজন লোক… ছুটতে ছুটতে আমার কাছে চলে এল।প্রচন্ড ক্রোধে লোকগুলো… ক্ষ্যাপা সিংহের মতো ফুঁসছে। ওদের মধ্যে একজন…লাল চোখ করে বলে উঠল… বেশিদূর আর কোথায় পালাবে বাছাধন… এইবার তোকে বাগে পেয়েছি।যে দুটো হাত দিয়ে বাবুর টাকা চুরি করে পালিয়েছিলি…ওই দুটো হাত… ভেঙ্গে একেবারে গুঁড়িয়ে দেব এখন।”

লোকগুলোর কথা শুনে…আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম…!এরা বলে কি!আমি ভদ্র ঘরের ছেলে…না খেয়ে মরে গেলেও… অন্যের কাছ থেকে কিছু চুরি করার ছেলে আমি নই।গত দুদিন ধরে…পেটে কিছু খাবার জোটাতে পারিনি। কিন্তু তাই বলে চুরি!ছি ছি ছি…এইসব কথা চিৎকার করে করে এরা এমনভাবে বলছে…যে আশেপাশের সব লোকেরা জড়ো হয়ে গেল।এরা যখন আমাকে ধোলাই দেওয়ার তোড়জোড় করতে শুরু করেছে…তখন চারপাশের লোকেরা আমার চারপাশে মজা দেখার জন্য ভিড় জমাতে শুরু করেছে।এই এলাকায়… কদিন ধরে…অভুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে…আর কাজ খোঁজার চেষ্টা করতে দেখেছে এরা সকলেই…!চুরি করার টাকাপয়সা যদি আমার কাছে থাকত… তাহলে আমার হাল যে কিছু অন্তত ভালো হত…এটা এই চারপাশে জমায়েত হওয়া লোকগুলো ঠিকই বুঝতে পারছিল।কিন্তু ওরা কেউই… আমার সপক্ষে একটি কথাও না বলে… চুপচাপ তামাশা দেখতে শুরু করে দিল।চোর বলে যারা আমাকে ওইভাবে পিছন থেকে এসে পাকড়ে ছিল…তারা নিঃসন্দেহে আমাকে প্রথমবার দেখছিল।যে চোরকে ধরার জন্য ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো ওরা আমার দিকে ছুটে এসে… আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল… নিঃসন্দেহে…তারা প্রকৃত চোরকে ধরতে গিয়ে… ভুল বশত… আমাকে পাকড়াও করেছে।

কিন্তু এই ব্যাপারটা আমার চারপাশে জমায়েত হওয়া সমস্ত লোকজনেরা পরিষ্কার বুঝতে পারলেও…ওরা সকলেই রীতিমতো মজা দেখবার জন্য দাঁড়িয়ে গেল।আর ওই ষন্ডা চেহারার লোকগুলো… আমাকে ধরে এমনভাবে কিল ঘুঁষি মারতে আরম্ভ করল…যে আমার প্রাণ বেরিয়ে আসার উপক্রম হল।অন্য সময় হলে… আমি এদের এই মূর্খামির উচিত জবাব টা ঠিক দিতে পারতাম।কদিন ধরে একটানা অভুক্ত একটা মানুষকে…যে একটা সরু বাঁশের কঞ্চি দিয়ে আঘাত করলেও…সে যে তাতেই কাহিল হয়ে পড়বে… তাতে আর আশ্চর্য কি!অন্য সময় হলে…এই ষন্ডা লোকগুলো… আমার কুস্তির প্যাঁচে পুরোপুরি ঘায়েল হয়ে পড়ত।কিন্তু ওই সময়ে…ওই লোকগুলোর হাতে নির্বিবাদে মার খেয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না আমার।আমি তখন শুধু ভাবছিলাম…”হা ঈশ্বর… তুমি কি আমার ডাক শুনতে পাও না? দিনের পর দিন অভুক্ত থাকার যন্ত্রনা নিয়ে পথের ধারে যাও বা পড়ে ছিলুম… গোঁদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এইভাবে মার খাওয়ার চাইতে একেবারে আমায় তুলে কেন নিচ্ছ না…!”

দৃশ্য তিন

রাত কেটে… আকাশ ক্রমে ফর্সা হতে শুরু করল।গুয়াটাভিটা নদীর তীরে…মুইসকা উপজাতির মানুষেরা একে একে জড়ো হতে শুরু করল…!

আর কিছুক্ষণ পরেই তাদের নতুন রাজার অভিষেক…!সেই অনুষ্ঠানের আড়ম্বরের যোগসাজশে সবাই মত্ত…!

বোচিকার সাধনা শেষ হলো যখন… তখন সূর্য মধ্য আকাশে ঝলমল করে উঠেছে।নলখাগড়া দিয়ে নির্মিত ভেলায় চড়ে… চারজন প্রধান পুরোহিত সহ…মুইসকাদের ভাবী রাজা হুনজাহুয়া…গুয়াটাভিটা হ্রদের তীরে এসে দাঁড়াল।ভেলাটি মূল্যবান পান্না এবং বহুমূল্য সোনার অলঙ্কারে পরিপূর্ণ!

চারপাশে জমায়েত হওয়া হাজারো মানুষের মধ্যে নিমেষে দেখা দিল আনন্দ মিশ্রিত তীব্র উল্লাস।তারা তাদের ভাবী রাজা হুনজাহুয়ার জয়ধ্বনি দিতে শুরু করল কন্ঠ চিরে…!

সম্পূর্ণ বিবস্ত্র রাজার সারা শরীরে লেপে দেওয়া হয়েছে আঠালো রজন।আর তার ওপরে অকৃপণভাবে ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে সোনার গুঁড়ো…!

যার ফলপ্রসূ…ভাবী রাজা হুনজাহুয়া কে ঠিক যেন জীবন্ত এক স্বর্ণ মানব বলে মনে হচ্ছে।

ভেলা থেকে নেমে…মুইসকাদের ভাবী রাজা হুনজাহুয়া…ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন গুয়াটাভিটা হ্রদের তীরে।

সূর্য এখন মধ্য গগনে জাজ্বল্যমান।সূর্যের ঔজ্জ্বল্য এখন ভাবী রাজা হুনজাহুয়া র স্বর্ণাভ শরীরে বিকিরিত হয়ে চলেছে এক অপূর্ব রাজকীয়তার মূর্ত মানব প্রতিরূপ নিয়ে…!

গুয়াটাভিটা হ্রদের তীরে পা রাখার পর…হুনজাহুয়া… দেবদেবীদের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানালেন।হ্রদের জলে অকাতরে বহুমূল্য

রত্ন ও স্বর্ণ নিক্ষেপ করলেন দেবদেবীদের অর্ঘ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে…!

তারপর ধীরে ধীরে অবগাহন করতে শুরু করলেন গুয়াটাভিটা হ্রদের অভ্যন্তরে…!ভাবী রাজা হুনজাহুয়া র সারা শরীরে লেপে দেওয়া স্বর্ণের গুঁড়ো…গুয়াটাভিটা হ্রদের জলে ধুয়ে যেতে লাগল। হুনজাহুয়ার অভিষেক সম্পূর্ণ হল।চারপাশে জমায়েত হওয়া বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের নতুন রাজার উদ্দেশ্যে জয়ধ্বনি দিতে লাগল সমস্বরে…!

এমন এক উৎসব মুখর আনন্দের আবহ… হঠাৎ এক লহমায় প্রবল আতঙ্কের ঘনঘটায় পর্যবসিত হল।

গুয়াটাভিটা হ্রদের জলে নিজের শরীর ধৌত করে… শরীরে লেপে দেওয়া স্বর্ণের গুঁড়ো হ্রদের জলে বিলিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই…হুনজাহুয়ার সারা শরীর জুড়ে শুরু হল এক ভয়াবহ যন্ত্রনার তাপদাহ…! কাঠফাটা রোদে মাটির সারা গায়ে যেরকম ফুটিফাটা হয়ে যায়… ঠিক সেভাবেই… সদ্য অভিষিক্ত নতুন রাজার সারা শরীর জুড়ে ফাটল ধরতে আরম্ভ করল!

আর সেই ফাটল থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করল রক্ত…!অল্প সময়ের মধ্যেই…হুনজাহুয়া র মর্মান্তিক আর্তনাদে… চারপাশটা যেন কেঁপে উঠতে আরম্ভ করল…!হুনজাহুয়ার মাথা থেকে পা পর্যন্ত…সারা শরীর জুড়ে… ফুটিফাটা হয়ে চলেছে জনসমক্ষে…আর অসহনীয় যন্ত্রনায়…হুনজাহুয়া বদ্ধ উন্মাদের ন্যায়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে…!

বড়ো নির্মমভাবে…মুইসকা প্রজাতির এই নতুন রাজা হুনজাহুয়ার ওপর থাবা বসিয়েছে মৃত্যু…এটা বুঝতে পুরোহিতদের কোনো বাকি রইল না। সাধারণ মানুষেরা… এহেন আকস্মিক পরিস্থিতিতে পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল…!ওদের শিরায় শিরায়…চোরা স্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়তে আরম্ভ করল…এক অনির্বচনীয় ভয়…!তাহলে কি শেষ পর্যন্ত…স্পেনীয়দের হাত থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য আর একজন ও অবশিষ্ট নেই? মুইসকা প্রজাতির অদৃষ্টে…কি বিনাশ ই একমাত্র ভবিতব্য?

দৃশ্য চার

—“কি বলছিস তুই লুকাস…তোর কি মাথা ঠিক আছে?ওরে…এল ডোরাডো বা সোনার শহর বলে আদৌ কিচ্ছু নেই…সবটাই মানুষের কল্পনা…! মানুষের মন গড়া একটা মিথ…!আলেয়ার পিছনে ছোটার অর্থ… শুধুমাত্র আত্মহনন…! দক্ষিণ আমেরিকার এল ডোরাডোতে সোনার শহর খুঁজতে গিয়ে… আমার পূর্ব পুরুষের কি অবস্থা হয়েছিল সেটা হয়তো তুই জানিস না…! ব্যর্থ অভিযানের পরে শুন্য হাতে ফিরে এসেছিলেন আমার পূর্ব পুরুষ ওয়াল্টার রেলি। অভিযানের শেষে তিনি প্রায় বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হন… নিজের একমাত্র ছেলে কে চিরতরে হারিয়ে ফেলেন তিনি… কারণ সোনার শহরের খোঁজে…বাবা ওয়াল্টার রেলি র মতোই…দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যে পা রেখেছিলেন তাঁর একমাত্র ছেলে।কিন্তু শেষমেশ তিনি ফিরে আসেননি।পরিশেষে সর্বহারা বদ্ধ উন্মাদে পর্যবসিত হওয়ার পর…রাজা প্রথম জেমস আনুষ্ঠানিক ভাবে তার শিরশ্ছেদ করেন।

আমি তোকে বলছি…ও পথে পা বাড়িয়ে…আজ পর্যন্ত কেউ কিচ্ছু পায়নি… তুই এল ডোরাডো খুঁজে বার করার চিন্তাভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল…আমি তোর ভালোর জন্য বলছি…!”

লুকাস এবার চেয়ার টেনে আর্থারের সামনে এসে বসল।তারপর চাপা স্বরে বলল…”আমি সবটাই জানি আর্থার…আর এও জানি…তোর পরিবার এখন ভয়ঙ্কর সংকটের মুখে রয়েছে।এটা তোর পরিবার স্পষ্টভাবে না জানলেও…তোর স্ত্রী সন্তানদের রহস্য মৃত্যু…এখন প্রতিনিয়ত তোকে তড়পে তড়পে মারছে…!তুই চাস না…তোর স্ত্রী সন্তানদের মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য দায়ী যে পাষন্ড…সে যোগ্য শাস্তি পাক…?”

লুকাসের মুখে এমন কথা শুনে…স্তম্ভিত হয়ে গেল আর্থার। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল…”হ্যাঁ…আমি অবশ্যই ওই নরপিশাচ দের সন্ধান পেতে চাই।আমি জানতে চাই…কে ওদের হত্যা করেছে…আর কেনই বা…! আমার প্রিয়তমা স্ত্রী আর ফুলের মতো সন্তানদের সাথে কি শত্রুতা ছিল তার? ওই হত্যাকারীকে একবার যদি হাতে পাই…তবে আমি তাকে জ্যান্ত কুপিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলব…!”

প্রচন্ড ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে কথাগুলো বলে উঠল আর্থার…!

লুকাস আর্থারের কাঁধে হাত রেখে বলল…”শান্ত হও আর্থার…যা হওয়ার ছিল…তা হয়েছে। কিন্তু…তাই বলে…ওই নৃশংস খুনীকে কখনোই ছেড়ে দেওয়া যায় না। তোমার স্ত্রী সন্তানদের সাথে আসলেই ওই হত্যাকারীর কোনো শত্রুতাই ছিল না। সবকিছুর জন্য দায়ী… তোমার ঘরের ভিতরে রাখা এল ডোরাডো অর্থাৎ স্বর্ণ নগরীতে পা রাখার পথ প্রদর্শক ওই গুপ্ত মানচিত্র এবং পুঁথি…!

তোমার অনুপস্থিতিতে…তোমার ঘরে ঢুকে…এক চোর সেগুলি চুরি করতে গিয়েছিল।হঠাৎ ব্যাপারটা টের পেয়ে যায় বৌদি এবং তোমার তিন সন্তান।চোর একেবারে বমাল সমেত…নগ্নভাবে ধরা পড়ে যায় তাদের কাছে…!তারা যখন চিৎকার চ্যাঁচামেচী শুরু করতে যাবে… তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্যই সে তার সাথে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে… ওদের গলার নলি কেটে দেয়… এবং পরিশেষে এল ডোরাডোর মানচিত্র এবং দিক নির্দেশ করা ওই পুঁথি… নিজের সাথে নিয়ে চম্পট দেয়।

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে আর্থার এবার প্রশ্ন করল…”এই সমস্তকিছু তুমি এত নির্ভুলভাবে জানলে কি করে?”

নিজের থুতনিতে হাত ঘষে লুকাস বলে উঠল…”আমি সমস্ত বৃত্তান্ত জানতে পারি ওই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার মাস দুয়েক পরে। তোমার ঘরে এল ডোরাডোর মানচিত্র এবং পুঁথি চুরি করতে এসে যে তোমার স্ত্রী সন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছে…সে আর কেউ নয়… বিখ্যাত জাদুকর ড্যানিয়েল। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ। ওনার সাথে ব্যক্তিগতভাবে আলাপ ছিল আমার।উনি প্রায়শই বলতেন… সোনার শহর আসলেই কোনো কল্পনা বা গল্পকথা নয়‌। সোনার শহরের বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে… কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী মানুষ তা মানতে নারাজ। তোমার পূর্ব পুরুষ ওয়াল্টার রেলি তাঁর মানচিত্র ও পুঁথি তে…যে দিকনির্দেশনা করে গিয়েছেন…তা ছিল অসম্পূর্ণ। কিন্তু জাদুকর ড্যানিয়েল…ওই অসম্পূর্ণ মানচিত্র ও পুঁথি কে কালো যাদুর দ্বারা সম্পূর্ণ করার ক্ষমতা রাখেন।এখন ওই অসম্পূর্ণ মানচিত্র ও পুঁথি… যাদুকর ড্যানিয়েলের করায়ত্তে রয়েছে।এবং তিনি ইতিমধ্যেই পাড়ি দিয়েছেন দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যে…এল ডোরাডোর খোঁজে…!তুমি বুঝতে পারছ না আর্থার…এতে তোমার কত বড় সর্বনাশ হতে চলেছে…!”

আর্থার দাঁতে দাঁত ঘষে উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল…

“শয়তান… পিশাচ…ওর যদি ওই মানচিত্র আর পুঁথি প্রয়োজন ছিল…ও তাহলে আমাকে সরাসরি বলতে পারত…আমি নিজেই ওকে দিয়ে দিতাম।ওই মানচিত্র ও পুঁথি তে যে পথনির্দেশ দেওয়া রয়েছে…তার একটা নকল আমার কাছে রয়েছে… এবং আমি সেই দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যে পাড়ি দিতে সক্ষম… কিন্তু আমি বিশ্বাস করি…এল ডোরাডো বা সোনার শহর বলে আসলেই কিছু নেই। পুরোটাই একটা মিথ।তাই ওইসব জিনিস আমার কাছে থাকলেও… আমার ওগুলোতে কোনোদিনই কোনো আগ্রহ ছিল না। ওগুলো বাড়তি আবর্জনার মতোই পড়েছিল আমার ঘরে।উনি আমার কাছে চাইলেই আমি সব তাঁকে দিয়ে দিতাম… কিন্তু আমার ঘরে লুকিয়ে চুরি করতে এসে শেষ পর্যন্ত আমার স্ত্রী সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে… আমাকে একা করে দিয়েছে ওই শয়তানটা… ওকে একবার যদি হাতে পাই… তবে আমি ওই শয়তানটাকে টুকরো টুকরো করে ফেলব…!ও দক্ষিণ আমেরিকাতেই যাক…আর যেখানেই যাক…ওর দ্বারা আমার আর কোনো সর্বনাশ হওয়ার বাকি নেই। বরং আমার হাতে ওর সর্বনাশ লেখা আছে…!”

লুকাস এবার আর্থারের পিঠে হাত রেখে ওর ক্রোধ শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর বলল…”দেখা ভাই… তোমার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি তোমাকে বলব…এটা মাথা গরম করার সময় নয়। ঠান্ডা মাথায় বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করার সময়। কারণ…ওই যাদুকর যদি তোমার পূর্ব পুরুষের লেখা পুঁথি ও মানচিত্রের সাহায্যে একবার এল ডোরাডোর সন্ধান পেয়ে যায়… তাহলে পৃথিবীর বুকে নেমে আসবে ঘনঘোর দুর্যোগ…! যেমনভাবেই হোক… ড্যানিয়েল কে আমাদের আটকাতেই হবে।”

আর্থার বলে উঠল…”তোমার এই আশঙ্কা আসলেই পুরোপুরি অর্থহীন।এই পৃথিবীতে সোনার শহর বা এল ডোরাডোর কোনো অস্তিত্ব ই নেই।”

লুকাস এবার উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল…”তুমি এ কথা এত জোর দিয়ে কি করে বলছ আর্থার…যদি সোনার শহর বলে সত্যিই কিছু থেকে থাকে…আর ওই শয়তানটা তার খোঁজ পেয়ে যায়… তাহলে এই পৃথিবীর বুকে শুরু হবে শয়তানি শক্তির রাজত্ব…! সবকিছু ছারখার হয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। তুমি বলো আর্থার…এখন তো তোমার হারাবার আর তেমন কিছুই নেই।আমিও বিয়ে থা করিনি… কোনো বন্ধন আমারো নেই।বলো ভাই…আমরা দুজনে কি পারি না…এই ভয়ঙ্কর বিপর্যয় টা আটকানোর একটা চেষ্টা করতে…?”

আর্থার দেখল… লুকাস জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে…!

কিছুক্ষন নীরব থেকে… আর্থার বলে উঠল…”বুঝলাম…তা তুমি আমাকে কি করতে বলছ এখন?”

জ্বলজ্বল করে উঠল লুকাসের চোখ মুখ…!সে আর্থারের দুইহাতে হাত রেখে… আলতো চাপ দিয়ে বলে উঠল…”তুমি যদি রাজি থাকো…তো আমি আর তুমি… দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যে পাড়ি দেব। ড্যানিয়েল সোনার শহর খুঁজে বার করার আগেই আমরা পাড়ি দেব সেখানে…! এইটাই হবে এখন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য…বলো ভাই… তুমি রাজি?”

কয়েক মিনিট চিন্তা করার পর … আর্থার হঠাৎ নীরবতা ভেঙ্গে বলে উঠল…”ঠিক আছে ভাই লুকাস…আমি রাজি…!”

দৃশ্য পাঁচ

তারপর… তারপর কি হল দাদু?

রিমঝিম জিজ্ঞাসা করে উঠল…।

চিন্ময় বাবু বললেন…

—তারপর? অভুক্ত উদরে…বিনা দোষে মার খেতে খেতে যখন আমার মরো মরো অবস্থা…ঠিক এই সময়ে…ওই ভীড় ঠেলে… এগিয়ে এল… আমার ই বয়সী এক রোগা পাতলা ছেলে।

ওই ষন্ডামার্কা লোকগুলোর সামনে এসে দাঁড়াল সে। তারপর নির্ভীক দেহভঙ্গিমা নিয়ে বলে উঠল…”আপনারা এই ছেলেটাকে ছেড়ে দিন। আপনারা যাকে খুঁজছেন…সে ছুটতে ছুটতে ওইদিকে পালিয়ে গেছে।এই বলে সে… অঙ্গুলি নির্দেশে করে… একটা নির্দিষ্ট দিক দেখাল ওদের কে। এইবার আমি পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম।

কিছুক্ষণ আগেই… এদের মালিকের কাছ থেকে… কৌশলে…মোটা অঙ্কের কিছু টাকা সরিয়ে… কোনো তস্কর এইদিক দিয়েই পালাচ্ছিল।এই লোকগুলো ওই তস্করের পিছনে পিছনে ছুটতে ছুটতে… এইদিকে যতক্ষণে চলে এসেছে… তস্কর ততক্ষণে অন্যত্র পালিয়ে গিয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত…ওই তস্করের পোশাক পরিচ্ছদ বা চেহারার সাথে… আমার মিল থেকে থাকবে…!এরা উন্মত্তের মতো ছুটতে ছুটতে… কোনো চিন্তাভাবনা না করেই… আমাকেই চোর ঠাউরে… মারধর শুরু করে দিয়েছে।

আমার ওপরে ওরা এতটাই উন্মত্তের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল…যে ছেলেটির কথা ওদের কর্ণগোচরে আসতে কিছু টা সময় লাগল।ওই ষন্ডামার্কা লোকগুলো এমনিতেই তখন ক্ষেপে লাল হয়ে ছিল। ওদের কাজে বাধা পড়ার ফলশ্রুতি তে রেগে গিয়ে… ক্রমাগত কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে চলা ওই রোগা পাতলা ছেলেটাকেও ধুমধাড়াক্কা কিলিয়ে দেওয়াটাও অসম্ভব ছিল না।

কিন্তু… ছেলেটার রীতিমতো বুকের পাটা নিয়ে… ক্রমাগত লোকগুলো কে আসল ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করে চলল।

কিছু সময় পরে… অবশেষে ছেলেটার কথা ওই লোকগুলোর কর্ণগোচর হল।

ক্রমেই ওদের এটা বোধগম্য হল… এতক্ষণ ধরে ওরা চোর ভেবে… একজন নিরীহ লোককে ধরে পিটিয়ে গিয়েছে…আর ফাঁক বুঝে…আসল চোর বেপাত্তা হয়ে গিয়েছে।নিজেদের ভুল টা ওরা যখন বুঝতে পারল… তখন চারপাশের সব লোকেরাও সমস্বরে বলতে শুরু করে দিয়েছে…”হ্যাঁ হ্যাঁ…আমরাও এই একই রকমের পোশাক পরা…এমন চেহারার এক লোককে এখান দিয়ে এই কিছুক্ষণ আগেই ছুটে পালিয়ে যেতে দেখেছি।

এতক্ষণ ধরে যারা চুপচাপ দাঁড়িয়ে তামাশা দেখে যাচ্ছিল… তাদের মুখে এতক্ষণে বোল ফুটল। লোকগুলো এবার আমাকে মারধর করা থামিয়ে দিয়ে… চারপাশে জমায়েত হওয়া লোকগুলো কে উত্তেজিত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল…”বদমাশ টা কোনদিকে গেছে?

এইবার সকলে মিলে সেইদিকে আঙ্গুল দেখাল… যেদিকে ওই রোগা পাতলা ছেলে টা অঙ্গুলি নির্দেশ দিয়ে দিকনির্দেশ করেছিল।

লোকগুলো নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে…আমার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল…”ভারী ভুল হয়ে গিয়েছে ভাই… দুঃখিত…।”

এই বলে তারা আবার সেই দিকে পাই পাই করে দৌড় লাগাল…যেদিকে সবাই অঙ্গুলি নির্দেশ করে এখন দেখাচ্ছে।

আমি গা হাত পায়ের ধূলো ঝেড়ে নিয়ে… কোনোমতে যখন উঠে দাঁড়ালাম…তখন আমার চারপাশে জমায়েত হওয়া ভিড় টা হালকা হতে শুরু করেছে।

ওই লোকগুলো আমাকে এমনভাবে মেরেছে…যে আমার উঠে দাঁড়াতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল।উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে…আমি পড়ে গেলাম।কিন্তু সাথে সাথে আমাকে ওই রোগা পাতলা ছেলে টা ছুটে এসে ধরে ফেলল।আমি অবাক হয়ে দেখলাম… এতক্ষণে…ভিড় হাল্কা হয়ে সবাই যার যার নিজের রাস্তায় সরে পড়লেও… শুরু এই ছেলেটাই এইভাবে আমাকে একলা ফেলে চলে যেতে পারেনি।

ছেলেটা ওর রোগা পাতলা… দুর্বল শরীরেই… আমাকে বেশ জুত করে ধরে নিল।

আমার শরীর তখন এতটাই কাহিল হয়ে পড়েছিল…যে কথা বলার মতো অবস্থাতেই ছিলাম না।সারা শরীর জুড়ে ফুটে উঠেছে…দাগড়া দাগড়া কালশিটের দাগ। ওষুধ না জুটলেও…এই ক্ষতস্হানগুলোতে একটু জলের স্পর্শ দেওয়ার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল আমার।ওই রোগা পাতলা ছেলে টি…যেমন দেবদূতের মতো ছুটে এসে আমাকে ওই লোকগুলোর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল…তেমন ই… অন্তর্যামীর মতোই পড়ে ফেলল আমার মনের কথা…!

সে আমাকে নিজের দুই বাহু দ্বারা শক্ত করে ধরে নিয়ে বলে উঠল…”ভাই… তোমার খুব ব্যথা হচ্ছে তাই না? তোমাকে আর কষ্ট করে কলের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। তুমি এইখানে থাকো…আমি জল এনে তোমার ক্ষতস্হানে দিয়ে দিচ্ছি…।

এই বলে…সে একছুটে সেখান থেকে চলে গেল।আর তার খানিকক্ষণ পরেই…একটা পাত্রে করে কিছু পরিমাণ জল নিয়ে এল আমার কাছে। তারপর হাঁটু মুড়ে বসে…সে আমার শরীরে দগদগে হয়ে থাকা সব কালশিটের দাগগুলোর ওপর… আলতো করে শীতল জলের স্পর্শ দিতে থাকল।

আমার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিল চাপা উফ আফ শব্দ।

দেখছিলাম… ক্ষণিকের পরিচিত এক গোবেচারা ছেলে…পরম মমতায় আমার ক্ষতস্হান গুলিতে জলের স্পর্শ দিতে দিতে আমাকে আশ্বাস দিয়ে বলছে…”এই তো… ঠান্ডা জল পড়ছে… তোমার আরাম লাগছে না?ব্যথাও কমে আসবে আস্তে আস্তে…!”

নিজের পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে… যেদিন থেকে আমি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি… সেদিনের পর…এই প্রথম আমি এমন কোনো মানুষের সংস্পর্শে এলাম…যার ভিতরে আমি নিজের পরিবারের স্পর্শ অনুভব করলাম।

মনে হল… বহুদিন পর… আমি কোনো কাছের মানুষের স্পর্শ পাচ্ছি।

ক্রমে আমার যন্ত্রনার তীব্রতা কমে আসতে শুরু করল।

আমি ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করলাম…”তোমার নাম কি ভাই? কোথায় থাকো তুমি?”

ছেলেটি হেসে উত্তর দিল…”আমার নাম অভিরাম।ওই যে একটা ভাতের হোটেল দেখছ…আমি ওইখানেই থাকি…ওইখানেই কাজ করি।”

কিছুক্ষণের নীরব সময় অতিবাহিত হওয়ার পর… ছেলেটি আবার বলে উঠল…”তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে… কদিন ধরে তোমার পেটে কিছু পড়েনি…তুমি চলো আমার সাথে…এখন হাঁটতে পারবে তো?”

অভিরামের শুশ্রূষায়… আমার যন্ত্রনা…প্রায় ফুরফুরে বাতাসের সাথে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছিল।ওর কন্ঠস্বরে…এমন একটা আন্তরিকতা মেশানো আশ্বাস ছিল…যে আমি বড় নিশ্চিন্ত বোধ করতে শুরু করেছিলাম। আমি ওকে বললাম… হ্যাঁ… এখন হাঁটতে পারব।”

আস্তে আস্তে… খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে…অভিরামের কাঁধে ভর দিয়ে…আমি চলতে শুরু করলাম এক অজানা গন্তব্যের পথে।তবে খুব বেশী দূর হাঁটতে হল না।স্বল্প দূরত্ব অতিক্রম করার পরেই…আমরা পৌঁছে গেলাম যেখানে… সেই জায়গা টা একটা ছোট হোটেল।অভিরাম আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠল…”আমার তো নিজের কোনো ঘর নেই ভাই…এই হোটেলের ভিতরে থাকি… এইখানেই কাজ করি। হোটেলের মালিক কে না জিজ্ঞাসা করে…আমি তো তোমাকে এখন ই খাবার দিতে পারব না ভাই… এখন এই হোটেলের বাইরে একটু বসো…জল দিচ্ছি খাও…আজ দুপুরবেলা আমি তোমার জন্য ভাতের ব্যবস্থা করব।”

বহুদিন পর…এক থালা গরম ভাত পাওয়ার আশায়…আমার এই ক্ষুধার্ত উদরে চেপে রাখা হাজারো যন্ত্রনাগুলো… একসঙ্গে কঁকিয়ে কেঁদে উঠল‌। সেই পরিস্থিতিতে…আমি আগে পিছে আর কোনোকিছুই ভাবিনি।যে ছেলেটা নিজেই এই দুনিয়ার বুকে অসহায়…অন্যের দেওয়া সামান্য চাকুরি কে অবলম্বন করে…তারই আশ্রয়ে… নিজের ক্ষুদ্র জীবন খানা কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে…সে পথের ধারে পড়ে থাকা এক অসহায় মানুষ কে পেট ভরে খেতে দেবার সামর্থ্য কিভাবে পাবে!

ছেলেটা…আমাকে হোটেলের বাইরে রাস্তায় বসিয়ে রেখে… চলে গেল ভিতরে। কিছুক্ষণ পরেই…সে আমার সামনে এল।ওর হাতে একটা জলভর্তি স্টিলের গ্লাস। বাস্তবিকই… আমার প্রচন্ড তেষ্টা পেয়েছিল।অভিরাম আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে…জলটা এগিয়ে ধরতেই…আমি তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো…ওর হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে…চোঁ চোঁ শব্দ সহকারে…পুরো গ্লাসটা খালি করে ফেললাম এক নিমেষে।

হোটেলের ভিতর থেকে… গম্ভীর গলায় একজন বয়স্ক মানুষ জোরে হাঁক পেরে ডাক দিল।

“অভিরাম… অভিরাম… তাড়াতাড়ি ভিতরে এসে…সোজা কলতলায় বসে পড়ো… অনেক বাসন জমে গেছে…।”

অভিরাম এবার আমার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে বলে উঠল…”তুমি এখানেই বসে থাকো ভাই… কোথাও চলে যেও না যেন…আমি দুপুরে এসে তোমাকে ভাত দেব।”

দৃশ্য পাঁচ

অভিষেক হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই… অসহনীয় যন্ত্রনায়… ছটফট করতে করতে সকলের চোখের সামনে মারা গেল হুনজাহুয়া…! এতক্ষণ ধরে চারপাশটা যে আনন্দ উৎসবে মুখরিত হয়ে উঠেছিল…তা অল্প সময়ের মধ্যেই… বদলে গেল মর্মান্তিক শোকের আবহে…!

বিলাপ ও রোদনের সাথে সাথে… এখন সকলের মনের ভিতরে বদ্ধমূল হয়ে যেতে শুরু করল একটিমাত্র চিন্তা…প্রাণে বাঁচতে হয় যদি… তাহলে স্পেন থেকে আগত ওই বিদেশী শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করা ব্যতীত…আর কোনো উপায়ই নেই। সোনার শহর এল ডোরাডো র খোঁজ তাদের দিতেই হবে। বিদেশী দের কাছে লিখে দিতে হবে দাসখত…!আপন স্বজাতির সমস্ত অস্তিত্ব, প্রাচুর্য ও গরিমা…বিনা শর্তে তাদের হাতে অর্পণ করে তাদের পায়ে পড়ে জানোয়ারের থেকেও নিকৃষ্ট জীবনযাপন করতে হবে…! তাদের নিজেদের সত্ত্বা… কোনো অস্তিত্ব বলতে আর কোনোকিছুই অবশিষ্ট থাকবে না আর…!

হুনজাহুয়া…অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে শেষমেষ প্রাণ ত্যাগ করলেন…!

হুনজাহুয়া মারা যাওয়ার প্রায় সাথে সাথেই…গুয়াটাভিটা হ্রদের চারপাশটা… ঘিরে ফেলল কনকুইস্টাদর…অর্থাৎ স্পেনীয় সেনারা।

বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই…তারা হঠাৎ করেই… ঝড়ের মতো এবং এসে মুইসকাদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল…!আকস্মিক এহেন আক্রমণে… নতুন রাজা র অভিষেক উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবের ভাগীদার হতে আসা মুইসকা প্রজাতির সাধারণ জনমানুষের ভিতরে প্রচন্ড ত্রাসের সৃষ্টি হল…!ওরা ভালো করেই জানে… এখন এই বিদেশীরা ভীষণভাবে ক্ষেপে রয়েছে।এল ডোরাডো র সঠিক সন্ধান পাওয়ার জন্য…ওরা হয়ে উঠেছে মারমুখী…মরিয়া…!

এল ডোরাডো… অর্থাৎ সোনার শহরের সন্ধান পাওয়ার জন্য…ওরা প্রতিনিয়ত…নির্মমভাবে রক্ত ঝরিয়ে চলেছে…মুইসকা প্রজাতির মানুষ দের…! নির্যাতনের নৃশংসতায়… এতটুকুও খামতি রাখছে না তারা…!নারী পুরুষ নির্বিশেষে…তারা প্রতিনিয়ত কসাই এর মতোই…কখনো জনসমক্ষে তাদের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আগুনে ঝলসে পুড়িয়ে… কখনো তাদের শরীর চিরে ফালাফালা করে… যন্ত্রনা দিয়ে… শুধু তাদের পেট থেকে একটাই কথা বার করার জন্য মরিয়া হয়ে ছিল…!

এল ডোরাডো… অর্থাৎ সোনার শহর কোথায় আছে…এই প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়ার জন্য…তারা এতটাই নির্মম ও পৈশাচিক হয়ে উঠেছে…যে অশীতিপর বৃদ্ধ অথবা ছোট শিশুদেরকেও এতটুকুও রেয়াত করছে না।

কিন্তু না…প্রাণ থাকতে…মুইসকা প্রজাতির একজন ও স্বজাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতার পথে যায়নি। দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যের ভিতরে…এল ডোরাডো… অর্থাৎ সোনার শহরের সন্ধান… ওদের মধ্যে থেকে একজনের কাছ থেকেও বার করা… স্পেনীয়দের পক্ষে সম্ভব হয়নি…।মুইসকা উপজাতির মানুষদের…হাসিমুখে… নৃশংসতার হাঁড়িকাঠে স্বেচ্ছায় নিজেদের বলি দিয়ে…রক্তের স্রোতে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার এমন রোখ… স্পেনীয়দের অত্যাচারের মাত্রাকে ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছিল।

এহেন পরিস্থিতিতে…মুইসকাদের…বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া অশক্ত বৃদ্ধ রাজা প্রমাদ গুনলেন…!তিনি বুঝেছিলেন… এখন তাঁর সিংহাসন হতে বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে…!এই দুরন্ত ও দুর্দম বিদেশি শক্তি কে ঠেকানোর জন্য এখন দরকার… প্রাণোচ্ছ্বল তারুণ্যের তপ্ততায় লালায়িত… দুর্বার… দুর্দমনীয় রক্তধারী কোনো উত্তরসূরী…!

দৃশ্য পাঁচ

জল পেটে পড়ার পর… সামান্য একটু স্বস্তি এল শরীরে।আমার হাত থেকে গ্লাস টা নিয়ে… অভিরাম… রীতিমতো তাড়া খাওয়া হরিণের মতো একছুটে ভিতরে ঢুকে গেল।আমি বুঝতে পারলাম… নিজের কাজ ফেলে রেখে ও আমার কাছে এসে আমার দেখভাল করছিল এতক্ষণ।

হোটেলের মালিকের গলা শুনেই বুঝলাম… কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য… তিনি মারাত্মক রকমের খচে গিয়েছেন অভিরামের ওপরে। এবার আমার খুব খারাপ লাগতে শুরু করল। মনে মনে প্রার্থনা করলাম…বেচারা ভালো মানুষ ছেলেটা… শেষকালে… আমার জন্য মালিকের কাছে যেন তিরস্কৃত না হয়…।

কিন্তু আমার এই প্রার্থনা টুকুও ভগবান শুনলেন না। আমি রাস্তায় বসে বসেই শুনতে পেলাম… হোটেলের মালিক… অভিরাম কে প্রচন্ড বকাঝকা করছেন… সকাল থেকে কাজে গরিমসি করার কারণে…!

বিপদে পড়া একটা মানুষের পাশে থেকে… তাকে দেখভাল করল যে মানুষটা…তার নিজের জীবনটাই যে আসলে কতখানি যন্ত্রনাময়…এ আমি অচিরেই বুঝতে পারলাম। আমি আন্দাজ করে নিলাম…যে ভাত ও আমাকে খাওয়ানোর কথা বলেছিল… সেই ভাতের দাম চোকাতে… ওকে না জানি কত যন্ত্রনা ভোগ করতে হবে…!

আমি মনস্থির করলাম… অভিরাম কে না জানিয়েই আমি এখান থেকে চলে যাব।তাতে ও হয়তো আমাকে খারাপ ভাবতে পারে…কিন্তু এতে…ও আরো খারাপ ভাবে তিরস্কৃত হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে।

আমি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে…এক পা এক পা করে হাঁটবার চেষ্টা করতে শুরু করলাম।আর সেই চেষ্টা করতে গিয়েই আমি বুঝলাম… আমার হাতে পায়ে এতটাই বিষের মতো ব্যথা…যে হাঁটাচলা করাটা এই মুহুর্তে আমার জন্য খুবই যন্ত্রনাদায়ক।আমি তবুও ভাবলাম… শরীরের এই ভীষণ ব্যথা নিয়ে হলেও… আমি আস্তে আস্তে করে হেঁটে…এই হোটেল চত্বর থেকে অনেকটা দূরে চলে যাব… যাতে অভিরাম আমার কোনো খোঁজ ই না পায়।কিন্তু আমার পরিস্থিতি আমায় সাথ দিল না। যন্ত্রণায়… আমার সারা শরীর এতটাই কাহিল হয়ে পড়েছে…যে আমি আর এক পাও আর হাঁটতে পারলাম না।

কি আর করা… অগত্যা…আমি ওই হোটেলের সামনেই রাস্তার মাঝে অসহায়ের মতো বসে রইলাম। অভিরাম আমার জন্য ভাত নিয়ে দুপুরে আমার কাছে আসবে… এটা আমি জানতাম। কিন্তু তাও…বহুদিন ধরে ক্ষুধার্ত থাকা আমার ভিতরে…খুশির চাইতে… অভিরামের জন্য দুশ্চিন্তাটাই দেখা দিতে থাকল বেশি করে।

সূর্য যখন প্রায় মাথার ওপরে… তখন অভিরাম… আমার কাছে এল।একটা থালা এগিয়ে ধরল আমার দিকে।আমি দেখলাম…ওর মুখটা…এক অনাবিল প্রসন্নতায়…উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।আমি ওর হাতে ধরা ওই থালার দিকে চেয়ে দেখলাম…ওতে রয়েছে…অল্প ভাত… সাথে যৎসামান্য একটু সব্জির তরকারি…আর সাথে…ছোট একটা বাটিতে করে একটু ডাল। আমার বুঝতে বাকি রইল না… অভিরাম ওর নিজের ভাগের খাবারটাই আজ আমার হাতে তুলে দিচ্ছে।

আমি অভিরামের হাতদুটো ধরে বলে উঠলাম…”আমি ভাত খাব একটাই শর্তে… তোমাকেও আমার সাথে এই থালাতেই খেতে হবে।”

আমার কথার মধ্যে এমন জোর ছিল…যে অভিরাম আমার কথা না শুনে আর পারল না।খোলা রাস্তার মাঝখানে… স্বল্প ভাত…ডাল আর বিস্বাদ তরকারি…দুজনে মিলে ভাগ করে খেতে শুরু করলাম পরম তৃপ্তির সাথে…!

একটানা বহুদিন ধরে ক্ষুধার্ত থাকার পরে…গলা দিয়ে যখন গরম ভাত নামছিল… তখন সেইটা আমার কাছে অমৃত মনে হচ্ছিল। দুজনে মিলে তৃপ্তি করে খাওয়া সেরে নিলাম।খাওয়া শেষ করে…অভিরাম খানিকক্ষণ বসল আমার পাশে।দুপুরের এই সময়টুকু হোটেলের কাজে ও একটু বিরতি পায়। হাতমুখ ধুয়ে… কিছুক্ষণ বসে কথায় মশগুল হয়ে পড়লাম আমরা দুজনে।খাবার পেটে পড়ার পর…শরীরের ব্যাথাগুলো আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়েছে।কিন্তু অভিরামের সঙ্গে মনের দুটো কথা বলে হাল্কা হওয়ার যে অনির্বাচনীয় পরিতৃপ্তি…তার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে মন চাইল না‌।আমি ওই হোটেলের কাছে রাস্তায় যেমনভাবে পড়ে ছিলাম… তেমনভাবেই আরো কিছুক্ষণ রাস্তাম বসে… অভিরামের সাথে সুখ দুঃখের গল্পে মশগুল হয়ে উঠলাম। অভিরামের কাছে আমি আমার জীবনের সব কাহিনীর ঝুড়ি উপুড় করে দিলাম।অভিজাত ঘরের সন্তান হয়ে…আজ ভাগ্যের ফেরে… অভুক্ত অবস্থায়… ভিখারীর মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছি একটা কোনো কাজের সন্ধানে…এই মর্মবিদারক কাহিনী ওর কাছে ব্যক্ত করলাম। অভিরাম ও শোনাল ওর নিজের কাহিনী‌।আর তার থেকে আমি জানতে পারলাম… অভিরাম আর আমার অবস্থা এক্কেবারে এক‌।

দৃশ্য ছয়

এতদিন ধরে…তারা সকলে শুধুমাত্র তাদের নতুন রাজা র অভিষেকের এই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য দিনরাত এক করে…প্রহর গুনে চলেছিল…!ভাবী রাজা হুনজাহুয়া র ওপরে ছিল তাদের অগাধ বিশ্বাস ও ভরসা। নতুন রাজার অভিষেকের সেই শুভক্ষণে… যুবক থেকে প্রৌঢ়… বাচ্চা থেকে যুবক…নির্বিশেষে…মুইসকা প্রজাতির সকল মানুষের মৃতপ্রায় জীবনে যেন উদ্দীপিত হতে শুরু করেছিল প্রাণের সঞ্চার… তাদের শিরায় শিরায়… রক্তস্রোতের সাথে…যেন জেগে উঠতে শুরু করেছিল… জীবনের জয়গান…! কারণ তারা সকলেই নিশ্চিত ছিল… তাদের নতুন রাজা হুনজাহুয়া… সিংহাসনে আরোহণ করার পর… দুর্দমনীয় শক্তির সাথে…এই বিদেশী শক্তির সাথে লড়াই করে… রক্ষা করবে মুইসকা প্রজাতির আপন সত্ত্বা…! স্পেনীয়দের চিরতরে উৎখাত করে… ছিনিয়ে আনবে মুইসকা প্রজাতির গৌরব এবং স্বাধীনতা…!

কিন্তু তারা কেউই দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি… অভিষেক সম্পূর্ণ হওয়ার সাথে সাথেই…সিংহাসনে আরোহন করার ঠিক আগের মূহূর্তে…বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এমন অপার্থিব…এমন ভয়াবহ মৃত্যু… এসে নতুন রাজা হুনজাহুয়ার ইহজীবনের পথে চিরতরে ইতি টেনে দেবে…!

এমন এক ঝলমলে দুপুরে…গুয়াটাভিটা হ্রদের তীরে জমায়েত হওয়া সকল মানুষের যেন রক্ত শুকিয়ে গেল! ক্রমেই তারা বুঝতে পারল…এই দুর্বার বিদেশী শক্তির কবল থেকে…আর তাদের কোনো পরিত্রাণ নেই…! তাদের মাথার ওপরে আর কোনো শক্তি নেই…যে তাদের হয়ে এই বিদেশী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে… তাদের আপন সত্ত্বা… এবং সর্বোপরি মুইসকা প্রজাতির সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম…!

যখন স্পেনীয় সেনারা… ক্ষ্যাপা নেকড়ের মতো…গুয়াটাভিটা হ্রদের তীরে জমায়েত হওয়া… আবালবৃদ্ধবনিতা…সকল মানুষের ওপরে নির্মম ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল একরাশ হিংস্রতা ও ক্ষীপ্রতা নিয়ে… তখন…মুইসকা প্রজাতির এই সাধারণ মানুষেরা মনে মনে একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে গেল…প্রাণে বাঁচার আর কোনো আশা ই নেই তাদের একজনেরও…!যে দাবী নিয়ে এরা দিনের পর দিন মুইসকা প্রজাতির এই সাধারণ মানুষগুলোর ওপরে পশুর চেয়েও নৃশংস ও মর্মান্তিক অত্যাচার করে গিয়েছে… তাদের সে দাবী কোনোদিনই পূরণ হওয়ার নয়।হাজারো নারীর ইজ্জত…লাখো মানুষের সামনে কুৎসিত ভাবে বেআব্রু করে…অথবা মায়ের সামনে তার দুধের শিশু কে কসাইয়ের মতো টুকরো টুকরো করে ফেলেও… তাদের এই অভিপ্রায় পূর্ণ হওয়ার নয়…!

সমস্ত ভয়ডর…এক লহমায় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে…তারা সবাই মিলে এবার রে রে করে উঠল। তাদের সকলের চোখেমুখে একটাই অভিব্যক্তি…!

“আমাদের ওপর তোদের যা অত্যাচার করার কর…এই গুয়াটাভিটা হ্রদের তীরবর্তী সমস্ত গ্রাম এক রাতের মধ্যে শ্মশান পুরি বানিয়ে ফেললেও…সোনার শহরের সন্ধান… কোনোদিন পাবি না তোরা…!”

দৃশ্য সাত

সাম্প্রতিক দাঙ্গায়… অভিরাম ও নিজের পরিবারের মানুষদের চোখের সামনে মরতে দেখে‌।এই গোটা দুনিয়ায়…ওও পুরোপুরি স্বজনহারা…একা হয়ে পড়ে।এই হোটেলের মালিকের সাথে… অভিরামের বাবার একটা পরিচিতি ছিল। সেই সূত্রে… অভিরাম তার এই হোটেলে একটা কাজ পেয়ে যায়।এই কাজ করে…এই হোটেলের রান্নাঘরের একটা কোণায় পড়ে থেকে… জীবন টা কোনোমতে কাটিয়ে নিচ্ছে অভিরাম।দুজনে দুজনের কথা শুনলাম মনোযোগ সহকারে।আমরা দুজনেই যে একই পরিস্থিতির শিকার… এবং বর্তমানে একই পথের পথিক…সেটা বুঝতে পারার পর… দুজনেই কেমন যেন একাত্মতা অনুভব করলাম।এই এত বড় দুনিয়ায়… পরিবার পরিজনকে হারিয়ে… কোনোমতে একটা দিন গুজরানের রাস্তা করার চেষ্টা করে চলেছি আমরা দুজনেই।হঠাৎ অভিরাম আমার হাতে আলতো চাপ দিয়ে বলে উঠল…”ভাই…তুমি হোটেলে কাজ করবে?”

কাজের কথা শুনে…আমার ভিতর থেকে যেন কয়েক মণ ওজনের ভারি পাথর নেমে গেল। আমি অভিরামের হাতদুটো ধরে বলে উঠলাম…”তোমাদের হোটেলে আছে কোনো কাজ?”

সত্যিই… পরিস্থিতি মানুষ কে কোথায় এনে দাঁড় করায়…! পড়াশোনা শেষ করেছিলাম সবে…একটা ভালো চাকরির জন্য চেষ্টা করতে শুরু করেছিলাম।আমি কোনোদিন দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি…একটা হোটেলে যেকোনো ধরনের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনার কথা কর্ণগোচর করে…এইভাবে আনন্দে দিশাহারা হয়ে পড়ার মতো দুর্দশা কোনোদিন আমার হতে পারে…!

বলা বাহুল্য…ওই সময়ে এইসব কোনোকিছুই আমার চিন্তায় আসেনি।আমি শুধু তৃষ্ণার্ত চাতকের ন্যায়ে অভিরামের হাত দুখানি ধরে… তাকিয়ে রইলাম অসহায়ের মতো।

অভিরাম আমাকে নিরস্ত করে বলে উঠল…”হ্যাঁ ভাই… আমাদের ওই হোটেলে তোমার জন্য কাজ আছে‌।বেয়ারার কাজ‌। তুমি করবে?”

আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে বলে উঠলাম…”হ্যাঁ ভাই… করব…করব…!”

অভিরাম বলে উঠল…”মালিক দিনকয়েক আগে…বেয়ারার কাজের জন্য কোনো অল্পবয়সী ছেলে খুঁজছিলেন।বেয়ারার কাজ করার সাথে সাথে… অল্পবিস্তর ভারি কাজ ও করতে হবে।”

আমি উদ্বেলিত কন্ঠে বলে উঠলাম…”আমি সব করতে পারব। তুমি শুধু ওই হোটেলে আমার কাজের একটা ব্যবস্থা করে দাও…যেমন করে হোক…!”

অভিরাম বলল…”ঠিক আছে…আমি মালিকের সাথে কথা বলব। আজকেই…‌তুমি এখন হাঁটতে পারবে তো?”

এতক্ষণে আমার ব্যথা অনেকটা কমে গিয়েছে। ইতিমধ্যে হোটেলের ভিতর থেকে ফের রুক্ষ স্বরে হাঁক ডাকের শব্দ এল।

“অভিরাম… অভিরাম…!”

অভিরাম সাথে চেঁচিয়ে উত্তর দিল…”আজ্ঞে এক্ষুনি আসছি বাবু…!”

বসা থেকে…হন্তদন্ত হয়ে উঠে পড়ল অভিরাম। দিনকয়েকের অভুক্ত উদরে খাবার পড়ার সাথে সাথে… অভিরামের সেবা শুশ্রূষা পাওয়ার পর…শরীরের ব্যথা অনেকটাই কমে এসেছিল আমার।আমিও আস্তে করে উঠে দাঁড়ালাম।আমি উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে উদ্যত হওয়ায়…অভিরাম আমাকে দেখে বেশ খুশি হলো। আমার পিঠে হাত দিয়ে বলে উঠল…”চলো ভাই… তোমাকে আমার মালিকের কাছে নিয়ে যাই।”

অভিরাম বাস্তবিকই… আমার এই বিপদসঙ্কুল জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এল।ওই হোটেলে… আমার বেয়ারার চাকরি টা হয়ে গেল।ব্যস্… এরপর… আমাকে আর দু মুঠো ভাতের জন্য কেঁদে মরতে আর হয়নি।আর যে কাজ পেলাম… সেইটাও বেশ মন লাগিয়ে করতে শুরু করে দিলাম।এই জীবনটাকেই আমি অদৃষ্টের লিখন বলে মেনে নিয়ে… নতুন করে

… নতুন রূপে পাওয়া এই জীবনটা বেশ আনন্দের সঙ্গেই বাঁচতে শুরু করলাম। আর আমার সঙ্গে রইল আমার সুখ দুঃখের সঙ্গী অভিরাম।এঁটো বাসন ধোয়া হোক…কি ভারি জিনিস বহন করা…কি বেয়ারার কাজ করা…সব কাজ ই আমরা আনন্দের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে করতাম।

অভিরাম ক্রমে আমার বড়ো কাছের মানুষ হয়ে উঠল। কিন্তু…ওর সাথে থাকতে থাকতে…আর কাজ করতে করতে আমি ক্রমশ বুঝতে পারি…ওর ভালোরকম মস্তিষ্ক বিকৃতি রয়েছে। মাঝে মাঝে ও এমন সব কথা বলে…যার মাথামুন্ডু আমি কিছুই অনুধাবন করতে পারি না‌।ওর ওইসব অদ্ভুত কথাবার্তার না আছে কোনো মানে…না আছে কোনো বাস্তব ভিত্তি।এইসব কথাগুলো যখন ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে…আমি তখন ওকে সাবধান করে বলি…”ওরে…চুপ কর…এইসব কথা যে শুনবে…সে ই তোকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করবে।”

আমি ওকে এইভাবে বলতাম…কারণ আমি ওকে মন থেকে ভালোবাসতাম।ওকে নিয়ে কেউ হাসাহাসি করলে… আমার খুবই খারাপ লাগত। কিছু কিছু অদ্ভুত অদ্ভুত কথা… অদ্ভুত আচরণটুকু বাদ দিয়ে…মন থেকে ছেলেটা খুবই ভালো ছিল‌।

দৃশ্য আট

গুয়াটাভিটা হ্রদের তীরে হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া এই রণক্ষেত্রের মাঝে দাঁড়িয়ে… হঠাৎ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল এই স্পেনীয় দস্যু দলের মূল পান্ডা…!

ততক্ষণে মুইসকা প্রজাতির সাধারণ মানুষেরা… ওদের হাতে বন্দি হয়ে গিয়েছে।সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে… চিৎকার করে বলে উঠল…”মূর্খের দল সব…তোরা কাকে নিজেদের রাজা র পদে অধিষ্ঠিত করে সিংহাসনে বসাতে চলেছিলি?যে তলায় তলায় তোদের সঙ্গে প্রবঞ্চনা করেছে… আমাদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে এক হয়ে গিয়েছে…তোরা তাকে নিজেদের রক্ষাকবচ ভেবে নিয়েছিলি!মুইসকা প্রজাতির রাজাদের জন্য তো সিংহাসনে বসার সাত দিনের ভিতরে… কোনো নারীর সংস্পর্শে না আসার জন্য কড়া নিয়ম রয়েছে…!কিন্তু এই নিয়মটাও ভঙ্গ করেছে তোদের প্রাণের রাজা হুনজাহুয়া…! বিশ্বাস যদি না হয়… তাহলে বিগত সাতদিন… হুনজাহুয়া যে গুহায় একাকী নির্জনে বাস করছিল…তার সন্নিকটে বাসরত পুরোহিতদের জিজ্ঞাসা করে দেখ…!”

এই কথাগুলো শোনামাত্র… ভীষণ ভাবে চমকে গেল অত্যাচারিত…নিপীড়িত দুর্বল মানুষগুলি…!তারা যেন নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না…!

কিন্তু তার চাইতেও বিস্ময়কর ব্যাপার হল…

ওই পুরোহিত রা… সকলের সম্মিলিত জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে…নত মস্তকে দাঁড়িয়ে রয়েছে নীরবে…! নীরবতাই যে সম্মতির লক্ষণ…এটা বুঝতে…দেরি হল না কারোরই…!মুইসকা প্রজাতিতে… নতুন রাজা অভিষিক্ত হওয়ার পূর্বে… তাকে কিছু কঠোর নিয়মের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার নিদান রয়েছে।আর এই নিয়মের মধ্যে একটি… অভিষেক সম্পূর্ণ হওয়ার সাতদিনের মধ্যে…ভাবী রাজার… নারী শরীরের সংস্পর্শে আসা নিষিদ্ধ…! নির্জন স্থানে…তাই ভাবী রাজার অস্হায়ী বাসস্থানের চারপাশে পুরোহিত রা…একটি মন্ত্রঃপূত গন্ডি তৈরি করে দেন…!ওই গন্ডি যদি কোনো নারী পার হয়ে ভিতরে প্রবেশ প্রবেশ করে…তার ফলে…তার ওপরে নেমে আসবে ভয়াবহ মৃত্যু…!ওই গন্ডির ভিতরে পা রাখলেই…ওই নারীর সারা শরীরে লেলিহান শিখায় আগুন জ্বলে উঠবে…আর কিছুক্ষণের মধ্যেই…ওই নারী… আগুনে জ্বলে পুড়ে মারা যাবে…!কিন্তু…ভাবী রাজা নিজে যদি ওই সময়ে নারী শরীর কে কামনা করে… শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই…ওই গন্ডি পেরোনোর পরেও… কোনো নারীর পক্ষে অক্ষত থাকা সম্ভব…!

আর গতকাল গভীর রাতে… পুরোহিত রা…নির্জন গহিন অরণ্যের ভিতরে…রাজার অস্হায়ী বাসস্থান… পাহাড়ী গুহার বেষ্টিত ওই গন্ডি পেরিয়ে…এক অপূর্ব সুন্দরী…উদ্দাম যৌবনে স্নাত কোনো কামুক নারী কে বেরিয়ে আসার দৃশ্য চাক্ষুষ করেছিলেন…সে কথা আর তারা অস্বীকার করতে পারলেন না…!

চাবুক হাতে স্পেনীয় দস্যুদল অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

চারদিকে শুধু একটাই কথা প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল।

“যাকে তোরা নিজেদের রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসাতে চলেছিলি তোরা…সে আসলেই একজন বিশ্বাসঘাতক…ঠগ… প্রবঞ্চক…!”

এই সাংঘাতিক আঘাত টা নিতে… সকলের বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল।ওরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না… সদ্য সিংহাসনে আরোহণ করে…মুইসকা প্রজাতিকে বিদেশি শক্তির অত্যাচার থেকে রক্ষা করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল যে বজ্রকঠিন মানুষটি…সে আসলেই একজন ভন্ড…!

অদূরেই পড়ে রয়েছে সদ্য রাজার পদে অধিষ্ঠিত হওয়া হুনজাহুয়া র যন্ত্রনা ক্লিষ্ট মৃতদেহ…!

গুয়াটাভিটা হ্রদের তীরে জমায়েত হওয়া মুইসকা প্রজাতির হাজারো মানুষ এই এতবড় ধাক্কা টা সামলে উঠতে যতটুকু সময় নিয়েছে…তার মধ্যে স্পেনীয় দস্যুদল ওদের সবাইকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে… বন্দি বানিয়ে… পুরোপুরি নিজেদের কব্জায় নিয়ে এসেছে।

এরপর হঠাৎ দস্যু দলের পান্ডা… ধোপদুরস্ত পোশাকের দ্বারা সূসজ্জিত… বলিষ্ঠ এক যুবক গগনভেদী হুংকার দিয়ে উঠল।

“তোমাদের ভাবী রাজা হুনজাহুয়া র শেষ পরিণতি তো তোমরা সবাই দেখলে…ওর মতো নরাধমের এইটাই উচিত শাস্তি ছিল। কারণ ও একজন ঠগ প্রবঞ্চক ও বিশ্বাসঘাতক!ও তলায় তলায় তোমাদের সকলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাদের সাথেই হাত মিলিয়েছিল। এরপর পরিশেষে আমাদের সঙ্গেও ও বিশ্বাসঘাতকতা করে। সোনার শহর এল ডোরাডো র খোঁজ আমাদের ও দিয়েছে। কিন্তু তার সত্ত্বেও তা আমাদের কাছে আজ পর্যন্ত অধরা…!

এখন তোমরা যদি আমাদের কথামতো না চলো…তাহলে আমি তোমাদের সবার শিরশ্ছেদ করে ওই ছিন্ন মস্তক গুলি এই গুয়াটাভিটা হ্রদের জলে ভাসিয়ে দেব…!

এই হুংকার শোনামাত্র… ক্ষণিকের মধ্যেই…চারপাশে ছড়িয়ে গেল একটা প্রচন্ড আতঙ্কের আবহ…!ভয়াবহ কোনো প্রলয় আসার আগে… হঠাৎ সবকিছু যেমন নিশ্চুপ… শান্ত হয়ে আসে…সেইরকমই আদিম নির্জনতায় আবৃত হয়ে পড়ল গুয়াটাভিটা হ্রদের তীরবর্তী এই সুবিশাল প্রান্তরখানি…!তারা জানে…এই স্পৈনীয় স্বৈরাচারী দস্যুদের কবল থেকে এখন ওদের রক্ষা করার কেউ নেই…! সকলের মনের ভিতরে ছেয়ে যেতে শুরু করল চাপা আতঙ্কের এক অদৃশ্য কালো মেঘ…! অকস্মাৎ মাথার ওপর থেকে নিশ্চিন্ত ভরসার আশ্রয় মুছে যাওয়ায়… সবাই কেমন যেন মৌন… ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই… স্পেনীয় দস্যুদল মুইসকা প্রজাতির সাধারণ মানুষদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে… বন্দি বানিয়ে… নিজেদের কব্জায় এনে ফেলল।

ঠিক সেই সময়ে… আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে… হঠাৎ শুরু হল‌ প্রচন্ড ঝড়ের তান্ডব…!ওই ঝড়ের সাথে মিশে…যেন হিসহিসে কন্ঠে কথা বলে উঠল একটা যন্ত্রনা ক্লিষ্ট পুরুষ কন্ঠ…!

শোঁ শোঁ শব্দে বইতে থাকা বাতাসের তীব্র মর্মর ধ্বনির তলায় আষ্টেপৃষ্ঠে চাপা পড়ে যাওয়ার আগে…ওই পুরুষ কন্ঠ একটি মাত্র কথা বলে গেল…”তোমরা সবাই ভুল বুঝছ তোমাদের রাজা কে…আমি…মুইসকা রাজা… হুনজাহুয়া… কদর্য ষড়যন্ত্রের শিকার… ওদের ফাঁদে পা যদি পা দাও…তোমাদের সকলের জন্য অপেক্ষা করছে ভয়ঙ্কর পরিণতি…শত শত বছর ধরে অনন্ত অনলে দগ্ধে মরতে হবে তোমাদের সবাইকে… ওদের ফাঁদে পা না দিয়ে…তোমরা সবাই গর্জে ওঠো… আমাদের সোনার শহর আমাদের আমানত… সেখানে প্রবেশ পথের চাবি যেন কোনো স্বার্থান্বেষী লোভী মানুষের হাতে না যায়…!

কিন্তু হায়…ওই তীব্র ঝড়ের দাপটে… ধরিত্রী কাঁপানো শোঁ শোঁ আওয়াজের তলায়…চাপা পড়ে গেল সেই মর্মবিদারক আকুতি…!

সদ্য সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরক্ষণেই মর্মান্তিক মৃত্যু সংঘটিত হয়েছে তাঁর.. কিন্তু নিজের প্রজাদের ছেড়ে চলে যেতে পারছে তার বিদেহী আত্মা… তিনি বারবার করে প্রিয় প্রজাদের সাবধান করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু হায়… ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস…!তাঁর হৃদয় চিরে নির্গত হতে থাকা সাবধান বাণী… কারোর কানে পৌঁছাল না।রাজা হুনজাহুয়ার বিদেহী আত্মা অনির্বাচনীয় যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে শেষবারের মতো চিৎকার করে বলে উঠল… “আমি ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি…সোনার শহরের নাগাল… কোনো অর্থলোভী পিশাচ কে পেতে দেব না আমি… আমি তোমাদের সবার মুক্তির ব্যবস্থা করব… আমি এক না একদিন ঠিক ফিরে আসব…!

দৃশ্য নয়

লুকাস আর আর্থার দুজনেই আর দেরি না করে… দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যে পা রাখবার জন্য তৈরি হল।

ব্যাগপত্র গোছানোর সময়ে হঠাৎ লুকাস আর্থারকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করল…”আর্থার… মিস্টার রেলি র তৈরি মানচিত্র আর পুঁথি টা ব্যাগে ভরে নিয়েছিস তো?ওটা কিন্তু আমাদের যাত্রার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।”

উত্তরে আর্থার বলল…” তুই কোনো চিন্তা করিস না…আমি ওগুলো আমার আগেই ব্যাগে ভরে নিয়েছি। আমাদের সাথে আর যে তিনজন সঙ্গী যাচ্ছে… তাদের সাথে আমার আলাপ নেই।তারা কি খাবার পছন্দ করে তা তো জানি না…আমি কিছু ফল,আর কেক নিয়ে নিলাম… সবার জন্য… ঠিক আছে তো?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল…”একদম ঠিক আছে। তুই দুপুর নাগাদ তোর ব্যাগপত্র গুছিয়ে… আমার ঘরে চলে আসবি… সেখানে বসেই আমরা পথঘাট সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে একটু আলোচনা করে নেব। ঠিক আছে?”

এরপর আর্থার আর দেরি না করল না।…গুছিয়ে রাখা ব্যাগপত্র সব এক জায়গায় জড়ো করে রেখে… স্ত্রী আর সন্তানদের ছবি বুকে আঁকড়ে ধরে বলে উঠল…”তোমাদের প্রাণ আমি বাঁচাতে পারলাম না…আমি যতদিন বাঁচব…এই যন্ত্রনা আমাকে কুরে কুরে খাবে। কিন্তু…আজ আমি শয়তান যাদুকরের কবল থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য ব্রতী হয়েছি।আমি জানি না…এল ডোরাডো বা সোনার শহরে বলে আদৌ কোনোকিছুর অস্তিত্ব আছে কিনা…!জীবন আর মৃত্যু দুইই এখন আমার কাছে সমার্থক…!

তোমরা আমার হৃদয়ে…আমার সাথে…রয়েছ সবসময়…আর সারা জীবন থাকবে… প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তোমরাই আমার মনোবল আর শক্তি…!

সূর্যাস্তের সময় হয়ে এসেছে…আর্থার নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে লুকাসের কাছে চলে এল।লুকাস আর্থারকে দেখে উৎফুল্ল চিত্তে বলে উঠল…”আরে এসো এসো ভায়া… তোমার ই অপেক্ষায় ছিলাম আমরা‌।”

দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যের পথে পাড়ি দেওয়ার জন্য ওর সাথে যোগ দেওয়া বাকি চারজন সঙ্গী…পল, গ্যাব্রিয়েল , ম্যাথিউ এবং সাইলাসের সাথে আলাপ করিয়ে দিল লুকাস।

তারপর বলল…”ভাই সব…চলো একটু বাইরে ঘুরে আসা যাক…। সামনের একটা হোটেলে ভালো চা জলখাবার করে… তোমাদের কেও একটু টেস্ট করাই…!

সকলে সমস্বরে বলে উঠল… হ্যাঁ ভাই চলো…এমন একটা রোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়ার সময় উপস্থিত হওয়ার পর… ঘরের ভিতরে আর মন টিকছে না…!

ছয়জনে মিলে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল।

চারপাশের বাতাসের প্রতিটি কণায় যেন প্রতিনিয়ত গর্জে উঠছে ভারতীয়দের সাথে ব্রিটিশ দের স্বাধীনতার যুদ্ধের অগ্নিগর্ভ আবহ…!

যখন তখন গোলাগুলি আরম্ভ হতে পারে বা বোমা পড়তে পারে।তাই ওরা বেশি দূরে না গিয়ে… কাছাকাছিই একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসল।গরম কফি আর পাকোড়ার অর্ডার দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই… একটা সুদৃশ্য প্লেটে করে খাবার নিয়ে ওদের সামনে হাজির হল অভিরাম। হঠাৎ এমন সময়ে… লুকাসের পায়ের সাথে অভিরামের পায়ের সামান্য ধাক্কা লেগে গেল ‌।আর তার ফলে…গরম কফি আর্থারের গায়ে সামান্য একটু চলকে পড়ে গেল। অভিরামের এই কান্ড দেখে… ভীষণ খচে গেল লুকাস।সে ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে উঠল… “তুমি দেখে চলতে পারো না নাকি হে ছোকরা? গরম কফি টা দিলে তো জামার ওপরে ঢেলে?”

লুকাস কে সমর্থন করে গ্যাব্রিয়েল বলে উঠল…”যা বলেছ ভায়া…আর তুমি… তোমাকে বলছি…যে কোর্টের ওপরে তুমি গরম কফি ফেললে এক্ষুনি…তার দাম কত সে বিষয়ে কোনো ধারণা আছে তোমার? তোমাকে বিক্রি করলেও তো ওই কোর্টের দাম উঠবে না ভাই…!”

ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় বলা এই কথাগুলো শুনে…একটুও রাগল না অভিরাম। বরং একগাল হেসে বলল… ছেঁড়া জামা পড়ে আছি বলে আমায় নিয়ে উপহাস করছেন বাবুরা?আমি সোনার শহরের রাজা আমি… দক্ষিণ আমেরিকার মুইসকা প্রজাতির স্বর্ণ সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়েছিলাম হাজার বছর আগে…!

অভিরামের মুখে এমন কথা শুনে…ওরা স্তম্ভিত হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করল।

খাবারগুলো টেবিলের ওপরে রেখে… অভিরাম ফের বলে উঠল…”এখনো মাঝে মাঝে ডাক শুনতে পাই জানেন… আমার অসম্পূর্ণ কাজ টা আমাকে এই জন্মে সম্পূর্ণ করতে হবে যে… আমার জন্মভূমি… সোনার শহরে যখন আমি পা রাখব… তখন আমি আপনাদের এত এত সোনা দেব।ওই সোনা বিক্রি করে… আপনারা এমনধারা কোর্টের ব্যবসা খুলে বসতে পারবেন বাবুরা…!আজ আমার এই ভুল টা দয়া করে মার্জনা করে দিন…!

অভিরামের কথা শুনে… লুকাস, আর্থার সহ সকলেই এক্কেবারে হা হয়ে গেল।

ঠিক এমন সময়ে… রেস্টুরেন্টের মালিক ছুটে এসে… তাঁর খদ্দেরদের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাইলেন। বললেন…”এই পাগলের এমনধারা কাজে আর কথায় কিছু মনে করবেন না বাবু রা…! উল্টোপাল্টা প্রলাপ বকা এই ছোকরাকে… অনেক দিন সহ্য করে নিয়েছি আমি…আর না…আজকেই আমি এটাকে ঘাড় ধরে আমার দোকান‌ থেকে বিদায় করব…!”

রাগে ফুঁসতে থাকা মালিকের উদ্দেশ্যে…বেশ প্রফুল্ল চিত্তেই তাকিয়ে…বেশ নরম স্বরে কথা বলে উঠল লুথার।

“আপনি একে কোথা থেকে পেয়েছেন?”

লুথাসের প্রশ্ন শুনে… জবুথবু কন্ঠে… মালিক উত্তর দিল…”আর বলবেন না হুজুর… দাঙ্গায় এর পরিবারের সবাই মারা গিয়েছে।এর বাপ আমার পরিচিত ছিল…সেই সূত্রেই একে আমার দোকানে একটা কাজ দিয়েছিলুম…যাতে ছোকরা নিজের পেটের ভাত জোগাড় করার একটা রাস্তা পায়… কিন্তু এই পাগল টা তো দেখছি আমার হাতেই হ্যারিকেন ধরিয়ে ছাড়বে…আমি আজকেই ওকে আমার দোকান থেকে তাড়িয়ে দেব…!”

লুকাস এবার সহাস্যে বলে উঠল…”আহা…রাগ করছেন কেন…ওকে নিয়ে আমাদের কোনো অভিযোগই নেই। তবে একটা কথা বলুন তো…ও কি প্রায় ই এমন অদ্ভুত কথা বলে নাকি এই এখন ই বলছে?”

খদ্দের রা ক্রুদ্ধ হয়নি জেনে… একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন রেস্টুরেন্টের‌ মালিক। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন…”আর বলবেন না হুজুর…ওর ওইসব প্রলাপ শুনলে যেকোনো মানুষেরই মাথা খারাপ হয়ে যেতে বাধ্য।

মাঝেমধ্যেই বলে…ও নাকি হাজার বছর আগে… দক্ষিণ আমেরিকার কোন জঙ্গলের নাকি রাজা ছিল… সেখানে নাকি ওর কিসব কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে…ওই জঙ্গলে নাকি পৃথিবীর মানুষের অগোচরে রয়েছে আস্ত একখানা সোনার শহর…সেটা রক্ষা করার দায়িত্ব নাকি আবার এই ছোকরার ই ওপরে…!

এইসব প্রলাপ শুনলে আমার ই মনে হয়…ওর কাজ নয়… ঝাড়ফুঁকের প্রয়োজন…!আর এইসব প্রলাপ বকা ওর তখন থেকেই ছিল… যবে থেকে এ কথা বলতে শিখেছে…!”

সবটা শুনে… প্রচন্ড একটা উৎফুল্লতা… যেন লুকাসের চোখেমুখে ঝিলিক দিয়ে গেল।সে রেস্টুরেন্টের মালিকের দুইহাত ধরে বলে উঠল…”আপনি দয়া করে এই ছেলেটাকে আমাদের হাতে তুলে দিন…এর জন্য কত টাকা চাই বলুন… আমরা দিতে এতটুকুও কার্পন্য করব না…!”

লুকাসের মুখ থেকে এমন কথা শোনার পর…লোভে রেস্টুরেন্টের মালিকের চোখ চকচক করে উঠল। তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন…এই খদ্দের দের টাকাপয়সা অঢেল।এমন একটা পাগল ছেলের আবোল তাবোল প্রলাপ শুনে… অভিভূত হয়ে একে সাথে করে নিয়ে যাওয়ার এমন অদ্ভুত খেয়াল ওঠার কারণে টাকা পয়সা ওড়াতে এরা ভালোই পারবে।অতএব ভালো পরিমাণ টাকা পয়সা হাতে পাওয়ার এমন সুযোগটা… কোনোমতেই হাতছাড়া করা যায় না। রেস্টুরেন্টের মালিক লুকাসের সামনে হাত কচলাতে কচলাতে বলল…”এ ছেলে কে এমনিও আমি আর আমার দোকানে কাজে রাখতুম না।আপনারা একে সাথে করে নিয়ে যেতে পারেন… আমার কোনো আপত্তি নেই…!বলা বাহুল্য… অভিরাম কে যে সকলে আলাদা কোনো মানুষ হিসেবে গণ্য ই করছিল না এখানে।আর না ওর কোনো মতামতের কোনো মূল্য রয়েছে।যে যেমনভাবে ওকে চালিত করবে… ও যে কাঠ পুতুলের মতো সেইমতোই চলবে…এ বিষয়ে কারোর কোনো সন্দেহের উদ্রেক নেই। রেস্টুরেন্টের মালিকের কাছে ও একটা বদ্ধ পাগল…আর লুকাসের কাছে… অভিরাম এক জাতিস্মর…যে ওদের সোনার শহর অর্থাৎ এল ডোরাডোর পথের দিশা দিতে পারবে। লুকাস একটা ভালো অঙ্কের টাকা এক চেকে সই করে রেস্টুরেন্টের মালিক কে দিল। রেস্টুরেন্টের মালিক…গদগদ চিত্তে সে চেক খানি হাতে নিয়ে… সুমিষ্ট স্বরে অভিরামের উদ্দেশ্যে বলে উঠল…”যাও বাবা অভিরাম… এনাদের সঙ্গে যাও…!আজ থেকে এই রেস্টুরেন্টের কাজ থেকে তোমার ছুটি…!

এতক্ষণে বোধহয় হুঁশ ফিরে এসেছে অভিরামের… বাস্তবের মাটিতে হঠাৎ করেই যেন পা পড়ল ওর…!

এতক্ষণ ধরে চারপাশে কি কথাবার্তা হচ্ছিল…সে বিষয়ে ও ছিল পুরোপুরি সন্দিহান।

এতক্ষণে বোধহয় হুঁশ ফিরে এসেছে অভিরামের… বাস্তবের মাটিতে হঠাৎ করেই যেন পা পড়ল ওর…!

এতক্ষণ ধরে চারপাশে কি কথাবার্তা হচ্ছিল…সে বিষয়ে ও ছিল সন্দিহান! হঠাৎ করে মালিক…হোটেলের কাজ থেকে ছুটি দিয়ে…ওকে কতগুলো অচেনা মানুষের সাথে যেতে কেন বলছে…সেটা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না অভিরাম।

লুকাস অভিরামের কাঁধে হাত রেখে বলল…”আমরা দূর দেশে যাচ্ছি… ভ্রমণের জন্য। আমাদের সাথে তোমাকে নিয়ে যেতে চাই আমরা…তুমি আমাদের সাথে চলো… দেখবে… তোমার আর কোনো ভাবনা থাকবে না।কোথাও খেটে খেতে হবে না তোমাকে। তুমি একটু আগে নিজেকে রাজা বলছিলে না? তোমাকে একদম রাজার মতো করেই রাখব আমরা।

অভিরাম ছেলে টা স্বভাব চরিত্রের দিক থেকে একেবারেই ভোলাভালা। যেকোনো মানুষকেই ও চট করে বিশ্বাস করে নেয়। এক্ষেত্রেও সেটার কোনো অন্যথা হয়নি।

কিন্তু… অভিরাম ব্যাকুল কন্ঠে শুধু বলে উঠল…”এখন ই যেতে হবে?”

লুকাস বলে উঠল…”হ্যাঁ ভাই… তুমি এক্ষুনি তোমার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরি

ঠিক আছে…সে নয় যাব… কিন্তু দেবুটাকে একটিবার বলে গেলে হত না?ও বেচারা ফিরে আসার পর তো আমাকে না দেখতে পেলে বেজায় মন খারাপ করবে…!

“দেবু…সে আবার কে?”

ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় জিজ্ঞাসা করল লুকাস।

অভিরাম বলল…”আমার খুব কাছের বন্ধু গো বাবু রা…!ও একটু বাইরে গেছে কাজে…।ওর ফিরতে সন্ধ্যা হবে।ও ফিরে এসে যদি আমায় দেখতে না পায়… তাহলে বড়ো মন খারাপ করবে যে…!”

অভিরামের কথা শুনে… লুকাস হেসে উঠে বলল…”কিন্তু ভাই… আমাদের জাহাজ যে আজ সন্ধ্যার পরেই যাত্রা শুরু করবে…!তুমি এখন বরং তোমার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে আমাদের সাথে চলো…পরে ফিরে এসে নাহয় তোমার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করে… তাকে তোমার রোমহর্ষক অভিযানের কাহিনী শোনাবে…কেমন…!”

না…লুকাসের এই কথাটা একেবারেই মনঃপুত হল না অভিরামের…! প্রিয় বন্ধু দেবজ্যোতি কে না জানিয়ে…দূর দেশে পাড়ি দিতে হবে…এমন কথায় চোখে জল এল অভিরামের…!

মালিক এবার… অভিরাম কে নিজের বুকে টেনে নিলেন। কাজের শুরুর দিন থেকে যে ছেলেটাকে দিয়ে নিজের ও খদ্দেরদের শুধুমাত্র হুকুম তামিল করার কাজ করিয়ে এসেছেন… তাকে পরম স্নেহ আর ভালোবাসার সাথে তিনি বলে উঠলেন…”চিন্তা কি তোর…দেবু এলে আমি ওকে সব বলে দেব। তুই বরং আর দেরি করিস না… বাবুদের সাথে জাহাজে উঠতে হবে একটু পরেই… তাড়াতাড়ি জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরি হয়ে নে…!”

কি আর করা… চোখের জল মুছে… অভিরাম নত মস্তকে ভিতরে চলে গেল… নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার জন্য…!

লুকাস খুশি হয়ে…ব্যাগ থেকে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক বার করে…হোটেল মালিকের দিকে এগিয়ে দিল। বলল… আপনি এতে আপনার ইচ্ছামতো অ্যামাউন্ট বসিয়ে নিন… অভিরাম কে আমাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য এটা হল বিনিময় মূল্য।আমরা আজ সন্ধ্যায় জাহাজে উঠে আমাদের গন্তব্যে রওনা দেব। কাছাকাছির মধ্যে কোনো একটা নিরুপদ্রব জায়গায় একটা চা টিফিনের হোটেল খুঁজে না পাওয়ায়… আপনার এই গুমটির মতো ছোট জায়গাতেই আসতে হল আমাদের… হয়তো এটাই ভগবানের ইচ্ছা ছিল…তাই এই ছেলেটাকে খুঁজে পেলাম আমরা…! আজকের দিনটা আপনার উদযাপনের দিন… টাকা ওড়ান… আনন্দ স্ফূর্তি করুন…!আমরা তবে অভিরাম কে নিয়ে বেরোব এখন…!

লুকাসের হাস্যমুখের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা প্রচ্ছন্ন অপমান টা… হাসিমুখে হজম করে নিল হোটেল মালিক।লুকাসের হাত থেকে ব্ল্যাঙ্ক চেকটা প্রায় চিলের মতো লুফে নিল সে…। তারপর হাতজোড় করে বলল…”যে আজ্ঞে বাবু রা…!”

এতক্ষণ আর্থার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা শুধু দেখছিল।এবার লুকাসের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে চাপা স্বরে বলে উঠল…”কি বোকার মতো কাজ করছ তুমি লুকাস… একটা আবোল তাবোল প্রলাপ বকা ছেলে কে আমাদের সাথে নিয়ে যাবার জন্য ক্ষেপে উঠেছ কিসের জন্য? তুমি যা ভাবছ… সেরকম টা তো নাও হতে পারে…!হয়তো এল ডোরাডো বা সোনার শহর বলে কোনোকিছু ওর কানে এসে থাকবে… মালিকের কাছ থেকে বকা খাওয়ার থেকে বাঁচার জন্য সেই নিয়ে আবোল তাবোল প্রলাপ বকে পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়ার এটা ওর একটা চেষ্টা মাত্র…এর জন্য তুমি এই হোটেলের মালিক কে খুশি হয়ে ব্ল্যাঙ্ক চেকে সই করে দিয়ে দিলে?এটা কিন্তু মস্ত বড় একটা আহাম্মকি করছ তুমি…!”

লুকাস আর্থারের পিঠে হাত রেখে বলল…”আরে ভাই শান্ত হও… আহাম্মকের মতো কোনো কাজ করার বান্দা আমি নই… একে দেখেই আমি বুঝেছি… জীবনেও কলম ধরেনি এ ছেলে…আর এর মুখের ভাষা শুনেও বুঝতে আমার বাকি নেই…এর বাপ ঠাকুর্দা… চোদ্দোগুষ্ঠির কাছে কোনোমতে খাওয়া পরা টুকু যোগাড় করাটাই বেঁচে থাকার একমাত্র মানে…! সেখানে সুদূর দক্ষিণ আমেরিকার বুকে কোথায় এল ডোরাডো বা সোনার শহর রয়েছে…এটা ওই ছেলেটার পক্ষে জানা এবং বলা দুইই রীতিমতো অসম্ভব।আর ও যখন কথাগুলো বলছিল…ওর দু চোখের জ্যোতি…ওর আত্মবিশ্বাস দেখেছিস? একটা মিথ্যা গল্প বা প্রলাপ বকা কোনো মানুষের চেহারা ফুঁড়ে এমন অদ্ভুত দাপট বেরিয়ে আসতে পারে না‌।এ ছেলে যে আসলেই জাতিস্মর…এ বিষয়ে আমি একশো শতাংশ নিশ্চিত।এই ছেলেটাকে আমাদের সাথে নিলে…ওকে ব্যবহার করেই আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে যাব অতি সহজেই…!

দৃশ্য দশ

রনি জিজ্ঞাসা করল…”কি অদ্ভুত কথা সে বলত দাদু?”

রনির এই প্রশ্ন শুনে… একটু গলা খাকারি দিয়ে দেবজ্যোতি বাবু বলে উঠলেন…”সে যেসব কথা বলত…সেসব কথা কিন্তু আদৌ পাগলের প্রলাপ ছিল না…!ওইসব কথা র এমন কিছু গূঢ় অর্থ ছিল…যা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না।ও এমন এক শহরের কথা বলত…যার সন্ধান আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো মানুষ পায়নি। সূদূর দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যের ভিতরে… পৃথিবীর মানুষের অগোচরে রয়েছে…এক অদ্ভুত অলীক শহর! সোনার শহর! সেখানে প্রতিটি ঘরবাড়ি… রাস্তাঘাট সোনা দিয়ে তৈরি…!”

টুকাই অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল… “এমন শহর কি সত্যিই আছে দাদু?”

দেবজ্যোতি বাবু টুকাই এর গালটা আলতো করে টিপে দিয়ে বলে উঠলেন…”হ্যাঁ… আছে বৈকি বাবা…সে শহরে একবার যদি পা রাখো… তাহলে তোমার মনে হবে… পৃথিবীর বাইরে…অন্য কোনো অচিন গ্রহে… কোনো অদ্ভুত জগতে পা রেখেছ তুমি…সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহের মতোই শিহরণ খেলে উঠবে…!”

রিমঝিম বলে উঠল…”দাদু… তুমি তো এমনভাবে বলছ…যেন তুমি নিজে কোনোদিন পা রেখেছিলে‌ সেখানে…!”

দেবজ্যোতি বাবু নাতনির দিকে একটু রহস্যাবৃত দৃষ্টি তে তাকিয়ে বললেন…”হ্যাঁ মা…আমি পা রেখেছিলাম সোনার শহরে…ওই শহরে প্রবেশের চাবি যে এখন আমার কাছেই রয়েছে…সে কাহিনী ই তো শোনাতে বসেছি তোমাদের…!”

দেবজ্যোতি বাবুর তিন নাতি নাতনির মধ্যে রনি একটু বড়।ও পড়ে ক্লাস এইটে।ও নাক সিঁটকে বড় বলে উঠল…”সূদূর দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যের ভিতরে লুকনো সোনার শহর…যে জায়গার খোঁজ আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ পায়নি… সেই সোনার শহরে প্রবেশ করার চাবি তোমার কাছে আছে?কি যে বলো তুমি দাদু…এই লোডশেডিং এ… মোমবাতির আলোয়… তুমি আষাঢ়ে গপ্পো ফাঁদছ!

দেবজ্যোতি বাবু‌ সহাস্যে বলে উঠলেন…”আষাঢ়ে গপ্পো নয় দাদুভাই… তোমরা যেমন তোমাদের চোখের সামনে আমাকে যেমন দেখছ… ঠিক তেমনভাবেই আমি চাক্ষুষ করেছি দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সোনার শহর…এল ডোরাডো কে‌।শুধু তাই নয়…ওই স্বর্ণ নির্মিত স্বপ্ন নগরীর বুকে আমি পা রেখেছি‌। সেই কাহিনী ই এখন শোনাতে বসেছি তোমাদের…মন দিয়ে শোনো…!

এই বলে দেবজ্যোতি বাবু ফের শুরু করলেন গল্প…!

দৃশ্য এগারো

হোটেলে কাজ করে… অভিরামের সঙ্গে সুখ দুঃখের কথা বলে… আমার দিন কাটছিল বেশ… কিন্তু হঠাৎ যে এইভাবে সবকিছুর ছন্দপতন হবে…এটা আমি দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করিনি।

একদিন… হোটেলের মালিক… আমাকে বাইরে পাঠিয়েছিল একটা দরকারে।কাজ সেরে আমি যখন ফিরে আসলাম…তখন দেখি… অভিরাম হোটেলের কাজ ছেড়ে দিয়ে ওর পাততাড়ি গুটিয়ে বিদায় নিয়েছে।এটা শুনে এবং পরিশেষে নিজের চোখে দেখেও আমি কোনোমতে ব্যাপার টা বিশ্বাস করতে পারলাম না।এই হোটেল ছেড়ে অন্য কোথাও কাজ খুঁজে নিয়েছে অভিরাম…এটা আমার বিস্মিত হওয়ার কারণ নয়। আশ্চর্যের বিষয় হল…ওর আর আমার মধ্যে… কোনো কথাই চাপা থাকে না।এই হোটেলের কাজ ছেড়ে… অন্যত্র কাজ করার মতো কোনো চিন্তা ভাবনা যদি ওর আসত… তাহলে এই কথাটা সবার আগে ও আমাকে বলত।আমাকে কিচ্ছুটি না জানিয়ে… এইভাবে নিজের সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে চলে যাওয়ার মতো ছেলে তো ও নয়…!ওর এই অকস্মাৎ অন্তর্ধানে…

আমার সন্দেহ ঘনীভূত হতে শুরু করল।আমি মালিক কে বারংবার অভিরামের কথা জিজ্ঞাসা করা তে… মালিক এবার আমার ওপরে যারপরনাই খচে গিয়ে বলে উঠল…”দুত্তোর…এ তো মহা জ্বালায় পড়া গেল দেখছি…শোনো বাপু…আমি তোমাদের কাউকে পায়ে ধরে সেধে সেধে এখানে কাজে রাখিনি।বা কাউকে আমার ক্রীতদাস করেও রাখিনি। কারোর যদি এখানে কাজ করতে মন না লাগে…তার জন্য দরজা খোলা আছে। কারোর জন্য কাউকে কৈফিয়ত দেওয়ার ঠেকা আমার নেই। তবে হ্যাঁ… তুমি যদি এখানে কাজ করতে চাও… তাহলে এক্ষুনি মুখে তালাচাবি লাগাও‌।নইলে তোমাকে তোমার জিনিসপত্র সমেত কাজ থেকে বার করে দিতে আমার দু মিনিট ও লাগবে না‌।ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না…!

মালিকের এহেন চোখ রাঙানি আর অপমান আমি মুখ বুজে হজম করে নিলাম।আর কোনো প্রশ্ন না করে… চুপচাপ সরে পড়লাম। আমার মনে বারে বারে ভেসে উঠতে শুরু করল অভিরামের হাসিমুখ খানি…!

অভিরাম কে নিয়ে আমার বড়ো দুশ্চিন্তা হতে শুরু করল। আমার মন বারে বারে বলে উঠতে লাগল…”ও নিশ্চয়ই এখন কোনো বিপদের মধ্যে রয়েছে।ওর এখন সাহায্যের প্রয়োজন…ও দুহাত বাড়িয়ে এখন ডাকছে আমায়…আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না‌।আমার মনের ভিতরে ভীষণ রকমের একটা ছটফটানি শুরু হল।ওর কাছে যাওয়ার জন্য আমার মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল…!

জাহাজের ভিতরে… একটা কোণায়… আনমনে বসেছিল অভিরাম।ওর চোখের কোণায় চিকচিক করে জমে উঠেছিল জলের চিহ্ন…!এই এতবড় পৃথিবীতে…একলা অভিরামের আসলেই ছিল বেঁচে থাকবার কোনো মানসিক অবলম্বন ছিল না।এমন কেউ ছিল না…যার জন্য ও দু ফোঁটা চোখের জল ফেলবে…!

মাত্র দিনকয়েক আগে… আমাকে আহত অবস্থায় রাস্তা থেকে বলতে গেলে কুড়িয়ে এনে নিজের কাজের জায়গায় একটা ঠাঁই পাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল নিজের সবটুকু চেষ্টা দিয়ে…আর সেই সাথে… আমার সঙ্গে জুড়ে নিয়েছিল এক অনাবিল আত্মিক বন্ধন…যার দৃঢ়তা এক জন্মের নয়…যেন জন্ম জন্মান্তরের…!

হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই‌ এইভাবে সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় অভিরামের মন টা ভেঙ্গেচুরে খানখান হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটা বড্ড ভোলাভালা… সাদাসিধে এবং একটু আপনভোলা ধরনের…!ও বাস্তবের মাটিতে চলে কম। স্বপ্নে দেখা কোনো এক অলীক জগতেই ওর সর্বক্ষণের বিচরণ…!সেই সময়ে ওর ভিতরে ফুটে ওঠে এক রাজকীয় গাম্ভীর্য এবং দাপট…!কিন্তু হঠাৎ হোটেলের মালিকের হাঁক পাড়ার সঙ্গে সঙ্গে…ওর সেই রাজশাহী ব্যক্তিত্ব ও তেজোদীপ্ত চোখের দীপ্তি…এক নিমেষে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।আর রয়ে যায় একটা বোকাসোকা ভোলাভালা ছেলের ভীরু চাহনি ও হুকুম তামিল করার জন্য উদ্বিগ্নতা…!

অভিরামের ভিতরে একটি নয়…দুটি মানুষের সত্ত্বা রয়েছে…সেটা আর কেউ বুঝুক না বুঝুক…আমি ঠিক ই বুঝেছিলাম। রসায়নের কৃতী ছাত্র ছিলাম আমি। সোনার শহর বা এল ডোরাডো সম্বন্ধে আমার কোনো ধারনা ছিল না যদিও… কিন্তু এতটুকু আমি ঠিক ই বুঝতে পারতাম… সম্পূর্ণরূপে নিরক্ষর অভিরামের পক্ষে… সূদূর দক্ষিণ আমেরিকা ও তার গহিন জঙ্গলের ভিতরে মুইসকা নামে কোনো প্রজাতির নীতি…আদর্শ ও জীবনধারার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়া টা…এক কথায় অসম্ভব…! শুধু তাই নয়… যে রাজকীয় দাপট নিয়ে ও বলত…মুইসকা প্রজাতির কিছু হতভাগ্য মানুষের যন্ত্রনা ক্লিষ্ট আত্মা শত শত বছর ধরে শুধু ওর প্রতীক্ষায় রয়েছে…তাতে আমি অন্তত অনেক টা সময় পার হয়ে যাওয়ার পর বুঝতে পেরেছিলাম…ও কোনো পাগলের আবোল তাবোল প্রলাপ নয়… অভিরাম আসলে একটি সিধেসাধা ভোলাভালা… এবং আপনভোলা একটি ছেলের আবরণে… একজন জাতিস্মর…যার আগের জন্মের পরতে পরতে মিশে রয়েছে কোনো এক মর্মবিদারক যন্ত্রনার কাহিনী…!

অভিরাম যেমন আমাকে নিজের মন প্রাণ দিয়ে আপন করে নিয়েছিল…আমিও ঠিক একইভাবে ওকে নিজের আত্মার সাথে জুড়ে নিয়েছিলাম অবিচ্ছেদ্যভাবে।আর সেই টানেই হঠাৎ করে ওর এমন অন্তর্ধানে আমি প্রচন্ড ভাবে উচাটন হয়ে পড়েছিলাম।

হোটেলের অন্যান্য কর্মচারীদের কাছ থেকে খোঁজ খবর নিয়ে আমি পুরো ব্যাপারটা জানতে পারি। লুকাসের বাংলোর বাগানের মালি হিসেবে কাজ করে ওদের ই একজনের এক আত্মীয়। সেই সূত্রেই আমি লুকাসের ঠিকানা পেয়ে যাই।আর তারপরেই আর কালবিলম্ব না করে… নিজের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নিয়ে… হোটেলের মালিকের সাথে কথা বলে… চিরতরে কাজে ইস্তফা দিয়ে দিলাম…আর তারপর পা বাড়ালাম যে পথে…সে পথে পাখির চোখ শুধুমাত্র একটাই…! সমস্ত রকমের বিপদ থেকে অভিরাম কে সুরক্ষা দিয়ে… ওকে বাঁচিয়ে আনা। লুকাসের বাংলোয় গিয়ে পৌঁছলাম যখন…তখন ওর বাগানের বৃদ্ধ মালি… চিরতরে নিজের গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য নিজের জিনিসপত্র গোছাতে ব্যস্ত।তার কাছ থেকেই বাকি সব খোঁজ খবর আমি পেয়ে গেলাম।মালি শুধু এতটুকুই জানাল আমায়… লুকাস এই বাংলো ছেড়ে দিয়ে… জাহাজে করে পাড়ি দিতে চলেছে দূর দেশে…!

আমি তৎক্ষণাৎ আমার আগামী পদক্ষেপ সম্পর্কে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।লুকাসের জাহাজের গন্তব্য যদি কোনো ফায়ারিং স্কোয়াড হয়… তাহলেও আমার আগামী পদক্ষেপের লক্ষ্য ওই জাহাজ ই…!

আমি তৎক্ষণাৎ মনস্থির করে নিলাম…ওই জাহাজ ই এখন আমার গন্তব্য… কিন্তু সেখানে আমাকে লুকিয়ে প্রবেশ করতে হবে। আমাকে এমনভাবে থাকতে হবে…যাতে ওরা কেউ যাতে টের না পায়…ওই জাহাজে একজন অতিরিক্ত মানুষ রয়েছে…!

তখন রাত হয়ে এসেছে… নিপুণ কৌশল অবলম্বন করে… মানুষজনের চোখ এড়িয়ে… তস্করের মতো আমি অবশেষে পা রাখতে সক্ষম হলাম…সেই জাহাজের ভিতরে…যেখানে অভিরাম কে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিজেদের কোনো স্বার্থ সিদ্ধির জন্য দূর দেশে পাড়ি দিয়েছে কয়েকজন অপরিচিত মানুষ…!

আমার মন ভীষণভাবে কু ডাকতে শুরু করেছিল। আমার মনে জেগে উঠছিল হাজারো দুশ্চিন্তা আর অজানা উদ্রেক…!

ওরা যদি অভিরামের ওপর কোনো অত্যাচার করে বা খেতে না দেয়… তাহলে আমি কিভাবে ওকে রক্ষা করব!

কিন্তু জাহাজে পা রাখার খানিকক্ষণের মধ্যেই আমি বুঝতে পারলাম… আমার সব আশঙ্কাই ছিল নিরর্থক।ওরা অভিরামের জন্য… জাহাজের ভিতরে একখানা সুন্দর কামরার বন্দোবস্ত করেছে।

রাতে যখন একজন কর্মচারী…ওর ঘরের দরজায় গিয়ে টোকা দিল রাতের খাবার দেওয়ার জন্য…আমি তখন আড়াল থেকে দেখলাম‌ সবটা।

অভিরাম কে যে ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছে… সেটা অপূর্ব… এবং খুব সুন্দর করে সাজানো গোছানো।আর ওকে খেতেও দেওয়া হয়েছে ভালো খাবার।ভাত,রুটি, একটা কোনো তরকারি আর মাংস আর মদ। রান্না করা খাবারগুলো থেকে এত সুন্দর সুবাস আসছে যে আমার পেটে এবার ছুঁচোয় ডন মারতে শুরু করল।কিন্তু অধৈর্য্য হলে চলবে না। আমাকে লুকিয়ে থেকে সবটা লক্ষ্য করতে হবে। অভিরাম কে নিয়ে আর যে দুশ্চিন্তা করার দরকার নেই…সেটা আমি অচিরেই বুঝতে পারলাম। কিন্তু… সেইসাথে আমার মনে দেখা দিল একটা প্রবল খটকা। ওদের মতলব টা কি?কি উদ্দেশ্যে ওরা অভিরামের মতো সহজ সরল আপনভোলা একটা ছেলে এই জাহাজে রেখে এইভাবে খাতির যত্ন করছে… ওকে নিজেদের সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে দূর দেশে?

আমি আড়ালে লুকিয়ে থেকে সবটা শুধু লক্ষ্য করে যেতে থাকলাম চুপিসারে।

অভিরাম খাবারের প্লেট টা হাতে নিয়ে বলে উঠল… আমি তো মদ খাই না ভাই…এ তুমি নিয়ে যাও।এ কথা শুনে ওই কর্মচারী অভিরামের হাত থেকে মদের বোতল টা নিয়ে ফিরে গেল।

অভিরাম ওর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।

ওদিকে…সবার চোখ কে ফাঁকি দিয়ে..

আমি জাহাজের ভিতরে একটা আড়াল খুঁজে নিয়ে… সেইখানে আত্মগোপন করে ছিলাম।ওইভাবে কেটে গেল অনেক্ষন সময়। হঠাৎ… আমি কাছাকাছি মানুষের পায়ের শব্দ শুনলাম। আমি আরো সচেতন হয়ে গেলাম… যাতে এই জাহাজের ভিতরে অতিরিক্ত একজন মানুষের অস্তিত্ব কেউ যেন কোনোমতে টের না পেয়ে যায়।

ওদের কথোপকথন আমার কানে এসে পৌঁছতে শুরু করল আস্তে আস্তে…!

—“লুকাস… তুমি এমন এক একটা কাজ করো… যেসবের আদৌ কোনো মানে হয় না। তোমার কথা যদি ধরেও নিই… যাকে হোটেলের কাজ থেকে তুলে এনেছ…ও ছেলে এক জাতিস্মর… এবং এল ডোরাডোর পথের হদিস সে জানে… কিন্তু সে হদিস ও আমাদের কেন দেবে? তুমি শুনছ না…ও যখন ই ওর ভাবের ঘোরে চলে যাচ্ছে… তখন ই কেবল একটাই কথা বলে চলেছে…”ও নাকি সোনার শহরের সিংহাসনে উপবিষ্ট একজন রাজা…! বাইরের মানুষের লোভাতুর দৃষ্টির কবল থেকে সোনার শহর ও মুইসকা প্রজাতিকে রক্ষা করাই ওর রাজধর্ম। এহেন কথাবার্তা যার মুখে…সে তোমাকে আমাকে সোনার শহরের সন্ধান আদৌ দেবে? আমার কাছে তো অসম্পূর্ণ হলেও…এল ডোরাডোর মানচিত্রের নক্সা আর পুঁথি রয়েছে…এই ছেলের ওপর ভরসা করাটা কি আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ হবে?মাঝে থেকে তুমি একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক তুলে দিলে ওই হোটেলের মালিকের হাতে… কিন্তু একবারো এটা ভেবে দেখেছ…এখন যে সব টাকা খরচ করছ তুমি… সেসব টাকা আদৌ কিন্তু তোমার নিজের নয়…আঙ্কেলের…! আঙ্কেলের ব্যক্তিগত জাহাজ টা মিথ্যা বলে তাঁর কাছ থেকে নিয়ে এই কাজে ব্যবহার করছ তুমি…!উনি যদি একবার জানতে পারেন আসল ব্যাপারটা…সেটা কি তোমার পক্ষে খুব সুখকর হবে?

অপরজন সহাস্যে বলে উঠল…”আরে তুমি চিন্তা কোরো না ভায়া… আমি সবদিক ভেবেচিন্তেই ছেলেটাকে নিজেদের সাথে‌ করে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত টা নিয়েছি। তুমি এখনো বুঝতে পারছ না… অভিরাম আমাদের লক্ষ্য পূরণের দাবা র সবচেয়ে বড়ো ঘুঁটি। ওকে ঠিকভাবে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে পারলে… আমাদের কাজটা ভীষণ সহজ হয়ে যাবে।এখন বরং তোমার ওই অসম্পূর্ণ মানচিত্র আর পুঁথি র চাইতে…এই ছেলেটাকেই আমাদের কাজে লাগবে বেশি। আমাদের কাজ হয়ে গেলে…একে আমাদের সাথে করে নিয়ে আসার আদৌ আর দরকার হবে না।যখন ও অন্য জগতে হারিয়ে যায়… তখন…ও নিজেকে যাদের রাজা বলে… ওকে সেই মুইসকা প্রজাতির সাথেই রেখে আসব আমরা…আর সোনার শহর হতে এত ধনসম্পদ সাথে নেব…যে স্বদেশে ফেরার পর…পৃথিবীর সমস্ত দেশ আমাদের পা চাটবে…!এখন আমি বলি কি…এত বেশি না ভেবে শান্তি করে একটু ঘুমিয়ে নাও…!

রাত গভীর! জাহাজের ভিতরের চারপাশটা একদম নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে।আমি আড়াল হতে সতর্কতা অবলম্বন করে… বেরিয়ে এলাম নিঃশব্দে। তারপর অভিরামের ঘরের দরজায় আস্তে করে টোকা দিলাম। হোটেলের রান্নাঘরের মেঝেতে একসাথে ঘুমোতাম আমরা।আমি জানি…ওর ঘুম খুবই পাতলা।অল্প শব্দেই ওর ঘুম ভেঙ্গে যায়।আর এইভাবে হঠাৎ করে একটা নতুন জায়গায় ওর যে চট করে ঘুম আসবার নয়…এও আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। আমার আন্দাজ মিথ্যা হয়নি।আমি একবার দরজায় টোকা দিতেই… দরজা খুলে দিল অভিরাম।দরজা খুলে আমাকে দেখামাত্র…ওর ভিতরে যেন ডানা ঝাপটে উঠল এহেন আকস্মিক বন্দিত্ব হতে মুক্তির সমস্ত আকুতি…!ওর চোখমুখ দেখে আমি পরিষ্কার বুঝলাম…ওর ভিতরে ভিতরে তেড়েফুঁড়ে উঠেছে একটা অজানা ভয়।এই ভোলাভালা সরল ছেলেটাও এখন বুঝতে পারছে…বলির পাঁঠা কে যেরকম উদ্দেশ্য নিয়ে যত্নে রেখে…ঘাস খাওয়ানো হয়…ওর সাথেও এখন ঠিক সেরকমটাই করা হচ্ছে। একটা ভয়ঙ্কর ফাঁদে পড়ে গিয়েছে ও… যেখান থেকে বেরিয়ে আসার আর কোনো উপায়ই অবশিষ্ট নেই। আমাকে দেখামাত্র…ও আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল…! কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকল…”ভাই দেবু… তুমি কেন এত দেরি করলে? আমার মন বলছে…এই লোকগুলো ভালো নয়…! তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো ভাই… নিয়ে চলো…!”

আমি সাথে সাথে দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে… ওকে আরো বেশি করে নিজের বুকে টেনে নিয়ে বললাম…”শান্ত হও ভাই…এখন থেকে তুমি আর কোনো দুশ্চিন্তা কোরো না।আমি আছি তোমার সাথে…আর তোমার কোন চিন্তা নেই।”

এতক্ষণে… অভিরাম কে এই জাহাজে… নিজেদের সাথে করে এরা কোথায়…কি উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছে… এটা আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।

আমি অভিরাম কে অভয় দিয়ে বললাম…”তোমার আর কোনো চিন্তা নেই… তোমার কোনো ক্ষতি যদি কেউ করতে চায়… তাহলে তাকে আমার সাথে মোকাবিলা করতে হবে। আমি এখন থেকে তোমার সাথে… তোমার এই ঘরের ভিতরেই আত্মগোপন করে থাকব।ওরা কেউ যেন টের না পায়… ওদের এই জাহাজের ভিতরে অতিরিক্ত একজন মানুষ রয়েছে…!”

আমার কথায় অবশেষে আশ্বস্ত হল অভিরাম। তারপর নিজের ওই সুন্দর সাজানো ঘরে… আমার গা ঢাকা দিয়ে আত্মগোপন করে থাকার বন্দোবস্ত কিভাবে করা যায়…সেই চিন্তায় মনোনিবেশ করল।

সেই থেকে আমি লুকাস নামের এক অপরিচিত ব্যক্তির জাহাজের একটি ঘর… যেখানে অভিরাম কে থাকতে দেওয়া হয়েছে… সেখানে আত্মগোপন করে থাকতে শুরু করলাম। অভিরাম যা খাবার পেত… সেটাই আমরা দুজনে ভাগ করে খেতাম।

দিন যত এগোতে থাকল… অভিরামের ভিতরে একটা আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করল।ওর চোখে মুখে ফুটে উঠতে থাকল এক রাজকীয় দাপট ও গাম্ভীর্য…! শুধু তাইই নয়…ওর ভিতরকার সলজ্জ ভীরু মানুষ টা প্রতিদিন একটু একটু করে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে শুরু করল‌।জাহাজ যত গন্তব্যের অভিমুখে এগোতে থাকল… অভিরামের ভিতরে এই পরিবর্তন টা আরো যেন প্রকট হতে শুরু করল।ওর ভিতরের সহজ সরল ভীরু…ভালো মানুষ টা যেন ভঙ্গুর মাটির আবরণের মতো ই খসে পড়তে শুরু করল…আর ওর ভিতর থেকে তেড়েফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করল এক দুর্দম গাম্ভীর্য ও রাজকীয়তায় পরিপূর্ণ এক প্রজাবৎসল রাজা।

হোটেলে কাজ করার সময়ে…যে সত্ত্বা টা ওর ভিতরে আত্মপ্রকাশ করে উঠত মাঝে মাঝে…এই জাহাজের গন্তব্যের পথে এগিয়ে চলার সাথে সমান তালে পাল্লা দিয়ে… অভিরামের পার্থিব অস্তিত্ব জুড়ে… পরিপূর্ণভাবে জেগে উঠেছে সেই সত্ত্বাখানি…!দেড় মাস মতো কেটে গিয়েছে এই জাহাজের ভিতরেই।না…এই সময়টায় ওরা কেউ অভিরাম কে কোনোপ্রকার বিরক্ত করতে আসেনি।আর জাহাজের ভিতরে অতিরিক্ত কোনো মানুষের অস্তিত্ব ওরা টের ও পায়নি।

দেড় মাস পার হওয়ার পর…আমরা বুঝতে পারলাম…জাহাজ তার গন্তব্যের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।

আরো দিনকয়েক পরে…জাহাজটা থামল দক্ষিণ আমেরিকার কাছাকাছি একটা নির্জন দ্বীপের কিনারায়। আমরা বুঝতে পারলাম… এই দ্বীপ ই এই জাহাজের গন্তব্যস্থল। এই দেড় মাসে…অভিরাম শরীরে…মনে এসে গিয়েছে আমূল পরিবর্তন।ওর রোগা পাতলা শরীরে ফুটে উঠেছে এক পেশীবহুল শক্তিশালী পুরুষের অবয়ব!আর ওর ভীরু চাহনি পূর্ণ চোখের দৃষ্টিতে এসেছে এক রাজকীয় দাপট…! গন্তব্যে‌ পৌঁছনোর পর… লুকাস নিজে অভিরামের ঘরের দরজার কাছে এসে ওকে বলল…”তোমার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে তৈরি হয়ে নাও অভিরাম… আমরা পৌঁছে গিয়েছি।এখন আমাদের সবাইকে নামতে হবে।আমি আড়াল লুকিয়ে থেকে সব শুনলাম। অভিরাম ঘরের দরজা বন্ধ করে… আমাকে বেরিয়ে আসতে বলল… তারপর চিন্তিত কন্ঠে বলল…”এই দেড় মাস তো আমার ঘরে লুকিয়ে রেখেছি তোমায়…এখন তুমি লুকোবে কোথায়?”

আমি ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম…”তুমি আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না…আমি সাঁতার জানি।এদের সকলের চোখের আড়ালে কৌশলে… আমি এই সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দেব …আর সাঁতরে পৌঁছে যাব দ্বীপের কিনারায়…!

অভিরাম কে নিয়ে আমার বাস্তবিকই…আর কোনো দুশ্চিন্তাই ছিল না আমার তখন। আমি বুঝতে পারছিলাম… দশজন শক্তিশালী শত্রুকেও…একা হাতে কাবু করতে সক্ষম এখন অভিরাম। গন্তব্যে পৌঁছোনোর পর… সবাই যখন জাহাজ থেকে নামতে ব্যস্ত… ঠিক ওই সময়ে… সুযোগ বুঝে আমি অতল সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিলাম সকলের অগোচরে…! এরপর সাঁতরে পৌঁছে গেলাম… দ্বীপের কিনারায়…!কিন্তু না… লুকাসের দলের কেউই আমাকে তখনো লক্ষ্য করেনি।

কিন্তু দ্বীপের কিনারায় পৌঁছনোর পর… হঠাৎ আমি ভীষণভাবে অসুস্থ বোধ করতে থাকি।আমার শরীরের অবস্থার এতটাই অবনতি হয়…যে আমি অচৈতন্য হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি।এরপর কতটা সময় পার হয়ে গিয়েছে আমি জানি না।রাত গভীর!আস্তে আস্তে চোখ মেলতে শুরু করি আমি। অদূরেই চিড়বিড় করে কাঠপোড়ার শব্দ হচ্ছিল।আর সেইদিকে তাকালাম। দেখলাম…ওই অগ্নিকুন্ডের পাশেই তিনজন মেয়ে কে হাত পা বেঁধে… খুঁটি তে বেঁধে রাখা হয়েছে! মেয়েগুলির মুখ খড়বিচালি দিয়ে এমনভাবে চেপে দেওয়া হয়েছে…যে বেচারিরা মুখ দিয়ে এতটুকুও শব্দ বার করতে পারছে না‌। আমি ভালো করে মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলাম… ওদের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে এক ভয়াবহ আতঙ্কের ত্রাস…!

ওরা পরে আছে অদ্ভুত ধরনের পোশাক। উর্ধাঙ্গে একটি কালো চাদর… এবং নিম্নিঙ্গে স্কার্টের মতো একখানি পোশাক। আতঙ্কগ্রস্ত মেয়েগুলিকে ঘিরে… পুরুষরা অদ্ভুত তন্ত্র সাধনায় ব্রতী হয়েছে।ক্রমে চারপাশের আকাশ বাতাস গমগম করে উঠল দুর্বোধ্য কোনো মন্ত্রোচ্চারণের তেজোদীপ্ততায়..! এরপর একে একে সেখানে জড়ো হতে শুরু করল বিভিন্ন বয়সী মহিলারা। ওদের পরনেও রয়েছে এক ই ধরনের পোশাক।ওদের প্রত্যেকের হাতে রয়েছে একটা করে মড়ার খুলি…! আমি আস্তে আস্তে উঠে বসতে শুরু করলাম…! আমার সর্বাঙ্গে বিষের মতো ব্যথা তখন। চারপাশে এমন গা ছমছমে ভয়াবহ আবহ চাক্ষুষ করে…আমি বেশ ঘাবড়ে গেলাম…!

কে যে আমাকে এখানে আনল…কিছুই ঠাহর করতে পারলাম না। তবে এদের ভাষা আমি অল্প অল্প অনুধাবন করতে পারলাম।যে দেড় মাস আমি অভিরামের সাথে জাহাজের ভিতরে একটা ঘরে আত্মগোপন করে ছিলাম… সেখানে অভিরাম তথা মুইসকা প্রজাতির রাজার সংস্পর্শে থাকতে থাকতে…মুইসকাদের ভাষা “চিবচা”… একটু একটু করে বোধগম্য হতে শুরু করেছিল আমার। মন্ত্রোচ্চারণ শেষ করে…ওরা সকলে… নিজেদের কন্ঠে এক পৃথিবী ঘৃণায় পরিপূর্ণ করে তুলে…চিবচা ভাষায় তীব্র ধিক্কারের সাথে বলে উঠল…”শয়তান রাজা হুনজাহুয়ার বিদেহী আত্মা নিপাত যাক…হে হুইতাকা…ওই দুরাত্মার কবল থেকে আমাদের রক্ষা করো… তোমার চরণে প্রদত্ত বলি গ্রহণ করো…!”

সকলে মিলে সমস্বরে আকাশ ফুঁড়ে চিৎকার করে যখন এই কথা বলে উঠল… ঠিক তার পর মূহুর্তেই… ধারালো অস্ত্রের এক কোপে খুঁটিতে বাঁধা তিনটি মেয়ের শিরশ্ছেদ করা হল একসঙ্গে। মেয়েগুলির ছিন্ন মস্তক ছিটকে গিয়ে পড়ল চিড়বিড় শব্দে জ্বলতে থাকা লেলিহান শিখার অগ্নিকুন্ডে…!

সবাই মিলে একযোগে চেঁচিয়ে উঠল…জয় হুইতাকা র জয়…!”

সব ঘটনাগুলো এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল…যে আমি কোনোকিছুর কোনো কূলকিনারা করে উঠতে পারলাম না…! একটা অজানা আতঙ্কে…যেন আমার শিড়দাড়াতেও একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল…!

অভিরাম আর আমার মধ্যে আগে থেকেই কথা হয়েছিল…দিন কয়েক আমরা কেউই কারোর খোঁজ করব না‌। দ্বীপে পৌঁছনোর পর… নিজের যা হোক একটা ঠাঁই এর ব্যবস্থা করে নিয়ে…আমি কৌশলে সখ্যতা স্হাপন করব লুকাসের দলের সঙ্গে… এবং ধীরে ধীরে ওই দলে ভিড়ে যাব। এমনভাবে চলব…যে কেউ জানতেও পারবে না… আমার আর অভিরামের মধ্যে আগে থেকে পরিচয় রয়েছে…!

আপাতত আমি অভিরাম কে নিয়ে যাবতীয় চিন্তা একপাশে সরিয়ে রাখলাম…আর দুচোখ বন্ধ করে মনে মনে ভাবতে থাকলাম…”হায়…এ আমি কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য ই না চাক্ষুষ করলাম…!

হঠাৎ… অদ্ভুত পোশাক পরিহিত এক বৃদ্ধ মানুষ… হাতে একটা মাটির পাত্র নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসলেন।চিবচা ভাষায় বলে উঠলেন… “অনেক টা পথ হেঁটে হেঁটে তুমি ভীষন ক্লান্ত হয়ে পড়েছ।নাও…এই ভুট্টার স্যুপ টা খেয়ে নাও…!

বাস্তবিকই… আমার খুবই ক্ষিদে পেয়েছিল। আমি আর কোনো কথা না বলে… বৃদ্ধের হাত থেকে বাটি টা নিয়ে স্যুপ টা এক চুমুকেই শেষ করলাম।আঃ… ক্ষিদের পেটে… মনে হল যেন স্বর্গ…!

পরে জানতে পারলাম… জ্বালানীর কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে… গহিন অরণ্যের ভিতরে অসুস্থ অবস্থায় আমায় দেখতে পায় ওদের একজন।ওরাই আমাকে ওদের এই আস্তানায় তুলে নিয়ে আসে। এরপর থেকে আমি ওদের সাথেই থাকতে শুরু করি‌।চিবচা ভাষায় ওদের সাথে কথা বলতে এবং ওদের কথা বুঝতে আমার খুব একটা অসুবিধা হচ্ছিল না।তার ওপর আমি ছোটখাটো ডাক্তারী বিদ্যায় সিদ্ধহস্ত ছিলাম। ওদের টুকিটাকি অসুখ সারিয়ে তোলার উপায় বাতলে দিচ্ছিলাম অনায়াসে…!মুইসকা প্রজাতির ওই গ্রাম্য মানুষদের সাথে আমার একটা সখ্যতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল‌।

বোহিও নামের ওই শক্ত খুঁটি কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৃত্তাকার বা শঙ্কু আকৃতির ঘরের ভিতরে থাকার মজা টা…বেশ অন্যরকম ই ছিল। কিন্তু এখানে আর বেশি সময় থাকা সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে…! লুকাস ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা অভিরাম কে সাথে নিয়ে কোথায় ঘাঁটি তৈরি করেছে…সে বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে…যত তাড়াতাড়ি সম্ভব… আমাকে অভিরামের কাছে পৌঁছতে হবে‌।

আর তার ওপরে… একটা খটকা আমার মনের ভিতরে খুবই তোলপাড় শুরু করেছিল।গভীর রাতে… তিনজন মেয়ে কে একটা করে খুঁটি তে বেঁধে… তারপর ওদের শিরশ্ছেদ করে ওদের ছিন্ন মস্তক লেলিহান অগ্নিশিখায় নিক্ষেপ করা হল কেন…! চারশো বছর আগের মুইসকা রাজা র প্রতি ওদের কিসের এত ক্ষোভ আর ঘৃণা…!আর বর্জ্য নিক্ষেপের মতো সেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে…এ কোন নৃশংস তন্ত্র সাধনা ও তার আচার অনুষ্ঠান পালনে মত্ত হয়ে উঠেছিল এরা?

এই সব প্রশ্নের উত্তর দাও আমি পেলাম অচিরেই…!যে বৃদ্ধ মানুষ টি আমায় মাটির পাত্রে করে খাবার দিয়ে আমার ক্ষুধার নিবৃত্তি করেছিলেন…তমসাচ্ছন্ন এক গভীর রাতে… তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে শুধালেন…এই গভীর রাতে একলা বসে রয়েছ কেন…কি এত ভাবছ?”

আমি নিরুত্তর থাকলাম…তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে…!

বৃদ্ধ বলে উঠলেন…”তুমি কি ভাবছ…তা হয়তো আমি আন্দাজ করতে পারছি‌।

সেদিন তুমি তিনজন যৌবনবতী মেয়ের শিরশ্ছেদ হতে দেখেছ স্বচক্ষে…!এমন দৃশ্য চাক্ষুষ করার অভ্যাস তোমার নেই। কিন্তু এ দৃশ্য আমাদের…এই মুইসকা প্রজাতির মানুষদের কাছে রোজনামচার মতোই সাধারণ একটা ব্যাপার।প্রতি ছয় মাস অন্তর… আমরা এই তন্ত্র সাধনা করে থাকি।

চারশো বছর আগে… রাজা হুনজাহুয়া যে পাপ করে গিয়েছেন…মুইসকা প্রজাতির মানুষদের সাথে যে বেইমানি করে গিয়েছেন…তার ই প্রায়শ্চিত্ত করে চলেছি আমরা চারশো বছর ধরে…!

রাজা হুনজাহুয়া র নাম শোনা মাত্র আমি একেবারে নড়েচড়ে বসলাম।এই নাম এখন আমার অপরিচিত নয়‌।আমি উদ্বিগ্ন কন্ঠে বৃদ্ধ কে শুধোলাম…”রাজা হুনজাহুয়া কি বেইমানি করেছিলেন?সেই কারণে চারশো বছর ধরে আপনারাই বা কেন এমন নৃশংস তন্ত্র সাধনা করে চলেছেন?”

বৃদ্ধ বললেন…”দেখো বাবা… আমি তোমাকে যতটুকু দেখেছি… তোমাকে বিশ্বস্ত বলেই মনে হয়েছে আমার। তোমাকে সবটা খুলে বলাই যায়।

সে প্রায় চারশো বছর আগের কথা… স্পেনের দস্যু রা… তখন মরিয়া হয়ে উঠেছিল…এই গহিন অরণ্যের বুকে লুকিয়ে থাকা সোনার শহরের সন্ধানে…!

আর সোনার শহরের সন্ধান পাওয়ার জন্য… ওরা মুইসকা প্রজাতির মানুষদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাত।

সাধারণ মানুষদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিত… জনসমক্ষে নারীদের বেআব্রু করে তাদের অসম্মান করত…! ওদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল একটাই…। ওরা সাফ জানিয়ে দিয়েছিল… সোনার শহরে প্রবেশের গুপ্ত দরজার চাবি ওদের হাতে তুলে দিলেই ওরা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেবে এই নারকীয় নির্যাতন…!

কিন্তু এটা কখনোই সম্ভব ছিল না‌। প্রাণ গেলে যাক…লাজ গেলে যাক…তবু কোনো মূল্যে সোনার শহরের সন্ধান… বাইরের কোনো লোভী মানুষকে দেব না… এটাই আমাদের চিরাচরিত অঙ্গীকার…!

সোনার শহর এল ডোরাডো… আমাদের নিজেদের আমানত… বাইরের মানুষের কুনজর হতে তাকে রক্ষা করে চলাটাই আমাদের একমাত্র প্রতীজ্ঞা…! কিন্তু… চারশো বছর আগে… স্পেনীয় দস্যুদলের সাথে গোপনে হাত মেলান আমাদের পূর্বতন রাজা হুনজাহুয়া।

সভ্য সমাজের আধুনিক জীবন যাপনের ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি তিনি।গোপনে তিনি বৈদেশিক শক্তির সাথে হাত মিলিয়ে… তাদেরকে সোনার শহরের সন্ধান দিতে উন্মুখ হয়ে উঠেছিলেন।

অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার এই ব্যাপারটা নগ্নভাবে বেরিয়ে আসে সকলের সামনে।রাজা হুনজাহুয়ার পূর্বে এই মুইসকা প্রজাতির রাজা ছিলেন তাঁর মাতুল চিচাকুম‌।

আমাদের প্রজাতিতে উত্তরাধিকার সূত্রে রাজ সিংহাসনে উপবিষ্ট হওয়ার অধিকার পান পূর্বতন রাজার আপন ভগ্নী র পুত্র… রাজার আপন পুত্র নয়…!আর এই নিয়েই হুনজাহুয়ার মাতুল পুত্র কুচুকা প্রচন্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাঁর দাবি ছিল… পিতার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী তিনি…তার ভগ্নী পুত্র নয়…!

কিন্তু আমাদের চিরাচরিত রীতি অনুসারে… তাঁর এই দাবি ছিল পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক।

তাই তাঁর কথার তোয়াক্কা না করে…চিচাকুম… হুনজাহুয়া কেই রাজা ঘোষণা করলেন। কুচুকা এই ব্যাপারটা একেবারেই মেনে নিতে পারলেন না। তিনি এমন গন্ডগোল আরম্ভ করলেন…যে সুষ্ঠুভাবে তাঁর অভিষেকের আয়োজন করা সম্ভব ই হচ্ছিল না। হুনজাহুয়া সবাই কে ডেকে ঘোষণা করলেন…”আমি তোমাদের রাজা… নিজের প্রাণের বিনিময়ে হলেও…মুইসকা প্রজাতি ও সোনার শহর কে রক্ষা করার দায়িত্ব আমি নিজের কাঁধে তুলে নিলাম‌।তোমরা সকলে আমার সাথে থেকো… পাশে থেকো… অনুষ্ঠান করে আমার অভিষেক করার কোনো প্রয়োজন নেই।এই ব্যাপারটায় সকলেই খুব মনমরা হয়ে গিয়েছিল। নতুন রাজা সিংহাসনে বসল… অথচ তার কোনো অভিষেক হল না…এটা মেনে নিতে পারছিল না কেউই…।

বেশ কিছু সময় পার হওয়ার পর… সকলে মিলে মনস্থির করল… যেমনভাবেই হোক… নতুন রাজা হুনজাহুয়ার অভিষেকের জাঁকজমকপূর্ণ একটা অনুষ্ঠান করতেই হবে।

ওই একই সময়ে… ভয়ঙ্কর অপদেবতা হুইতাকা ভীষণভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছিল।এই ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারছিল সকলে‌।

কিন্তু…কে যে তাকে জাগিয়ে তুলতে শুরু করেছে…এটা কারোরই জানা ছিল না। কোনো নারীর ভিতরে ওই অপদেবী জেগে উঠত যখন তখন…আর তখন মুইসকা প্রজাতির পুরুষ রা সমস্ত সংযম হারিয়ে ফেলত।আর তারপর নিজেদের… পরিবার পরিজনের ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের ধ্বংস সাধন করতে শুরু করত‌। অপদেবতা হুইতাকাকে কে জাগিয়ে তুলেছে…সেই প্রশ্নটাই তখন সকলের ভিতরে ভিতরে গুমরে থাকা চাপা আতঙ্ক হয়ে ঘোরাফেরা করছিল।এটা বুঝতে কারোর বাকি ছিল না…হুইতাকাকে নিদ্রিত করতে না পারলে… সর্বনাশ আর বেশি দূরে নেই।

মনের ভিতরে জমে উঠতে থাকা চাপা কালোমেঘ টাকে… সাময়িক ধামাচাপা দিয়ে… সকলে মেতে উঠেছিল রাজা হুনজাহুয়ার অভিষেকের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজনে…! কিন্তু হায়… অদৃষ্টের কি পরিহাস…রাজা হুনজাহুয়ার অভিষেকের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই… নগ্নভাবে সকলের

সামনে এল আসল সত্য…!

গোপনে…রাজা হুনজাহুয়া… তন্ত্র সাধনার দ্বারা জাগিয়ে তুলেছেন অপদেবতা হুইতাকাকে…!

হাত মিলিয়েছেন বিদেশি লুন্ঠন কারীদের সঙ্গে।মুইসকা প্রজাতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে… তিনি তাদের দিতে উদ্যত হয়েছিলেন সোনার শহর এল ডোরাডোর সন্ধান‌।

কিন্তু… শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করলেন। অভিষেকের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার খানিক পরেই… কোনো এক অদ্ভুত অপার্থিব শক্তি… বড়ো নির্মমভাবে তার ওপরে মৃত্যু রূপে বর্ষিত হয়।করায় মাটি যেভাবে ফুটিফাটা হয়ে যায়…ঠিক সেভাবেই তাঁর সারা শরীর জুড়ে ফুটিফাটা হয়ে যেতে শুরু করল সকলের চোখের সামনে…!ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করল তাঁর ওই ক্ষতবিক্ষত শরীর জুড়ে…! অবর্ণনীয় যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন অল্প সময়ের মধ্যেই…!

তবে তাঁর ওই আকস্মিক মৃত্যু আসলেই ছিল দেবতা বোচিকা র আশীর্বাদ!

ওই সময়ে তাঁর মৃত্যু না হলে… স্পেনীয় লুন্ঠনকারী রা ওইদিন ই পেয়ে যেত সোনার শহরের সন্ধান।

সিংহাসনে উপবিষ্ট হওয়ার পরেই…রাজা হুনজাহুয়া স্পেনীয় লুন্ঠন কারীদের সোনার শহরের সন্ধান দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন।কিন্তু তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুর ফলে…ওই বিদেশি রা…ক্ষ্যাপা নেকড়ের মতো এল ডোরাডোর সন্ধান‌ পাওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে মুইসকা প্রজাতির সাধারণ মানুষদের ওপরে‌। কিন্তু না… অনুষ্ঠানে জমায়েত হওয়া আবালবৃদ্ধবনিতা সকল মানুষদের ধরে নিয়ে গিয়ে অকথ্য নির্যাতন করে এবং পরিশেষে প্রত্যেককে এক এক করে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করার পরেও তারা এল ডোরাডোর সন্ধান পেল না। অগত্যা…এরপর তারা শুন্য হাতেই নিজেদের দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

কিন্তু…এত সবকিছুর মধ্যেও…একটা সর্বনাশ তখনো আমাদের পিছু ছাড়ল না।অপদেবতা হুইতাকাকে জাগিয়ে তুলেছেন রাজা হুনজাহুয়া।যাঁর হাতে হুইতাকা জাগ্রত হন… শুধুমাত্র তাঁর ই… নিদ্রিত করবার ক্ষমতা রয়েছে ওই অপশক্তিকে…! কাজেই…হুইতাকাকে পুনরায় নিদ্রিত করার আর কোনো সম্ভাবনাই যে নেই… এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তাই সেই অভিশপ্ত দিনের পর থেকে… অপদেবতা হুইতাকার অপশক্তি কে ঠেকিয়ে রাখার জন্য… আমরা প্রতি ছয়মাস অন্তত অন্তর…তিনটি করে যৌবনপ্রাপ্ত মেয়েকে বলি হিসেবে উৎসর্গ করি।এই বলির রক্ত না পেলে…হুইতাকা ভীষণ রুষ্ট হবেন এবং তার রোষানল বর্ষিত হবে আমাদের সবার ওপরে…!নৃশংস ধ্বংস লীলা চালিয়ে… পৃথিবীর বুক থেকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেবে এই মুইসকা প্রজাতিকে…! তুমি হয়তো ভাবছ…এই মুইসকা প্রজাতির মানুষগুলো কি ভয়ঙ্কর নৃশংস…! আসলে তুমি ভুল ভাবছ।প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর আমাদের মধ্যে থেকে তিনজন করে প্রাণবন্ত উচ্ছ্বল মেয়েদের চিহ্নিত করে… তাদের এমন নির্মমভাবে মৃত্যুর অতল গহ্বরে ঠেলে দিতে আমাদের ও বুকটা চিনচিন করে ওঠে…! কিন্তু আমরা পুরোপুরি নিরুপায়।চারশো বছর আগে রাজা হুনজাহুয়া যদি হুইতাকাকে না জাগিয়ে তুলতেন… তাহলে এইভাবে ছয় মাস অন্তর অন্তর তিনজন করে মেয়ের গলায় কোপ বসাতে হত না আমাদের…!

সবটা শুনেটুনে…আমি পুরোপুরি থ হয়ে গেলাম। বৃদ্ধের বলা কথাগুলো যে কোনো অলীক গল্পগাঁথা নয়…এটা আমি ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলাম।হুইতাকাকে বলি প্রদান করার পরেই দক্ষিণ আমেরিকার এই গহিন অরণ্যের মাথার ওপরে থাকা আকাশের বুক থেকে সরে গিয়েছে কালচে মেঘের আবরণ।ফুলপাতাহীন ন্যাড়া গাছে গাছে সজীব পাতা আর ফুলে ফলে ভরে গিয়েছে একটি রাতের ব্যবধানেই…! এই সবকিছুই নেহাতই কাকতালীয় ব্যাপার নয়…!

মুইসকাদের রাজা হুনজাহুয়া যে ফিরে এসেছেন চারশো বছর পরে… তাদেরকে অভিশাপ মুক্ত করে নতুন জীবন দিতে…এই কথাটা আর

বৃদ্ধকে বলা হল না আমার…!

কাটল আরো দুই তিন দিন। ইতিমধ্যেই একটা ঘটনা… আমাকে খুব ই উদ্বিগ্ন করে তুলল।মুইসকা প্রজাতির যে গ্রামবাসীদের মধ্যে থাকতাম আমি… তাদের মধ্যে একদিন আমি দেখতে পেলাম আর্থার কে…! আর্থারের সাথে যেহেতু আমার পরিচয় ছিল না…তাই এক্ষেত্রে আমাকে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।

আমি দেখলাম…মুইসকা প্রজাতির একটি স্হানীয় গ্রাম্য মেয়ে… জুলিয়া র সঙ্গে আর্থার… রীতিমতো তাড়া খাওয়া হরিণের মতোই এখানে এসে উঠেছে… একটু মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই পাওয়ার আশায়…! হয়তো ও খোঁজার চেষ্টা করে চলেছে…আত্মগোপন করে থাকবার জন্য নিরাপদ কোনো আশ্রয়…!পরে শুনলাম…জুলিয়া বলে এই স্থানীয় গ্রাম্য মেয়ে টি জঙ্গলে জ্বালানির কাঠ সংগ্রহে বেরিয়ে… আর্থার কে ক্ষতবিক্ষত ও আহত অবস্থায় দেখতে পেয়ে…ওর নিজের সাথে করে নিয়ে আসে এখানে। আমি এখানে এই গ্রাম্য মানুষদের সাথে যেটুকু সময় কাটিয়েছি…তাতে এতটুকু বুঝেছি…এই মুইসকা প্রজাতির গ্রাম্য মানুষগুলো খুব ই আন্তরিক ও অতিথি বৎসল।আর বিশেষ করে জুলিয়া বলে এই গ্রাম্য মেয়েটি… নতুন অতিথির খুব ই সেবাযত্ন করে চলেছে…!

আর্থারের এহেন দুরবস্থা দেখে… অভিরামের জন্য আমার মনের ভিতরে ঘনীভূত হতে শুরু করল দুশ্চিন্তার কালোমেঘ…!যদিও এখন অভিরাম কে নিয়ে দুশ্চিন্তা করার মতো পরিস্থিতি টা এখন আর নেই… কিন্তু তার সত্ত্বেও… আমার মনে যেন কু ডাকতে শুরু করল।

ওর সারা শরীর যেভাবে আহত ও রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল তাতে এটা বুঝতে আমার কোন অসুবিধা নেই…ও রীতিমতো যমের দ্বার থেকে বেঁচে বেরিয়ে এসেছে কোনোমতে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনোমতে অন্যের ওপর ভর দিয়ে চলছে।ওর দুটো হাত প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে।জুলিয়া ওর সেবাযত্ন করে চলেছে প্রাণপণে…!

ইতিমধ্যে… আর্থার খড়ের শয্যায় শায়িত অবস্থাতেই… আমাকে কাছে ডাকল।আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম…ওর কাছে কি তবে আমি কোনোভাবে ধরা পড়ে গেলাম?ও কি কোনোভাবে বুঝতে পেরে গিয়েছে যে ওদের জাহাজে করেই চোরের মতো আমি পাড়ি দিয়েছি এখানে!

অপার কৌতূহল আর মনে জেগে উঠতে থাকা হাজারো প্রশ্নের আনাগোনা কে কোনোভাবে ধামাচাপা দিয়ে… আমি এগিয়ে গেলাম আর্থারের দিকে…!

ইংরেজি ভাষাতে আমি ছিলাম অভ্যস্ত।তাই কথোপকথনের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু ও যে কি বলার জন্য আমাকে একান্তে ওর কাছে ডাকছে…সেই প্রশ্ন ই আমার ভিতরটা রীতিমতো তোলপাড় করে তুলছিল।

আমি ধীরপায়ে ওর কাছে এগিয়ে গেলাম।ওর কাছে গিয়ে বসলাম। আর্থার আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠল…”তোমার কাছে আমি একটা সাহায্য প্রার্থনা করছি।যদি সাহায্য করো…আমি জীবনভর তোমার কাছে ঋণী হয়ে থাকব।”

আমি ইতস্তত কন্ঠে বললাম…”বলুন আমি কি সাহায্য করতে আপনাকে?”

আর্থার একটু গলা খাকারি দিয়ে…চোস্ত ব্রিটিশ ইংরেজি তে বলে উঠল…”শোনো ভাই… আমার কাছে কোনোকিছু লুকোনোর প্রয়োজন নেই তোমার। জাহাজের ভিতরে… অভিরামের ঘরে যে তুমি আত্মগোপন করে ছিলে এই কদিন…এটা আর কেউ না বুঝুক…আমি ঠিকই বুঝেছিলাম।”

আর্থারের কথা শুনে… আমি প্রচন্ডভাবে চমকে উঠলাম।তার মানে আমি এতক্ষন যা আশঙ্কা করছিলাম সেটাই সত্যি হল। কিন্তু না… আর্থারের চোখমুখে ভাষায় ছিঁচকে চোরের কলার ধরে লাল চোখে তাকানোর মতো কোনো ক্রোধের অভিব্যক্তি নেই।তার বদলে সেই মুখে ফুটে উঠেছে একরাশ যন্ত্রনা ও এক অব্যক্ত আকুতি…!

আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আর্থারের সামনে গিয়ে বসলাম।

আর্থার…আকাশের দিকে তাকিয়ে…যন্ত্রনা ক্লিষ্ট কন্ঠে বলে উঠল…”এসব কথা তোমাকে বলছি…কারণ তোমার জানা দরকার…তুমি আর তোমার বন্ধু অভিরাম কত বড় শয়তানের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছ নিজেদের অজান্তেই…!আমার সব থেকে বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল লুকাসের সঙ্গে জাহাজে করে এই সূদূর দক্ষিণ আমেরিকার বুকে পাড়ি দেওয়া…!

জাহাজে পা রাখার পর আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম ওর আসল মতলবটা।ওই শয়তান… নরপিশাচ টা… আমাকে ভুল বুঝিয়ে হাত করে… নিজের সাথে করে নিয়ে এসেছে… শুধুমাত্র আমার পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া অসম্পূর্ণ একটি পুঁথি ও সোনার শহর এল ডোরাডোর মানচিত্র টা নিজের হাতে পাওয়ার জন্য। আমার কাছে মিথ্যা গল্প ফেঁদে… আমাকে হাত করে… ওইগুলো হাতানোর তালে ছিল ও। আমার এতদিনের পরিচিত কাছের বন্ধু কে চিনতে…আমি এত বড় ভুল কি করে করতে পারলাম… মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ওর আসল রূপ টা আমি দেখতেই পাইনি কোনোদিন…!

যন্ত্রনাক্লিষ্ট এক আকুতি নিয়ে… একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে… আর্থার তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে।আমি কি বলব…কিছুই ভেবে পেলাম না… হতভম্বের মতো আমিও চুপ করে বসে রইলাম।

নীরবে কয়েক মূহুর্ত কেটে যাওয়ার পর… আর্থার আবার কথা বলতে শুরু করল।

“চিরকাল ই ওই শয়তানটার নজর ছিল আমার পূর্ব পুরুষের রেখে যাওয়া ওই পুঁথি ও মানচিত্রের দিকে…। আমার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি করার আসল কারণ ছিল শুধু ওইগুলো। আমার সাথে যেনতেনভাবে একটা সুসম্পর্ক তৈরি করে…ও ওইগুলো হাত করার তালে ছিল।আমি ওর মনের কথা টা কোনোদিনই ধরতে পারিনি। ওকে নিজের কাছের বন্ধু হিসেবে স্থান দিয়েছিলাম অনায়াসে।আর সেই সুযোগ টা কাজে লাগিয়েই…ও আমার ঘরে চুরি করার তাল খুঁজতে থাকে…!

ওই সময়ে…আমি কিছুদিনের জন্য শহরের বাইরে ছিলাম। আমার অনুপস্থিতির এই সুযোগটাকেই কাজে লাগায় লুকাস।গভীর রাতে আমার বাড়িতে সে চুরি করতে আসে। আমার স্ত্রী সন্তান রা… গভীর রাতে…চাদর দিয়ে মুখ ঢাকা এক চোর

কে মানচিত্র ও পুঁথি সমেত দেখতে পেয়ে চিৎকার চ্যাঁচামেচী শুরু করে দেয়।

তখন ওই শয়তানটা… আমার স্ত্রী আর ছোট তিন সন্তানের গলায় ছুরি বসায় কসাইয়ের নৃশংসতা নিয়ে…! ওদের চিৎকার চ্যাঁচামেচী শুনে পাছে কেউ যদি চলে আসে… তাহলে দীর্ঘ দিন ধরে কাঠখড় পুড়িয়ে চেষ্টার ফলপ্রসূ…সদ্য সোনার শহরের মানচিত্র আর পুঁথি হাতে আসার পরেও…তা হাত থেকে বেরিয়ে যাবে যে…!

ওই শয়তানটা আমার প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রী সন্তানদের গলার নলি কেটে খুন করেছে।আমার পরিবার কে নিজের হাতে শেষ করে আমায় একা করে দিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও…সে যা চুরি করতে এসেছিল… সেগুলো নিয়ে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে পারেনি।কারণ… আমার বাড়ির পোষা কুকুর টমি ততক্ষণে ওর বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে ছুটে এসে লুকাসের ওপর আছড়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণ তুমুল ধ্বস্তাধ্বস্তি চলার পর… অবশেষে লুকাস ওই পুঁথি ও মানচিত্র ফেলে রেখেই রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।অ্যালসেসিয়ান কুকুর টমি রাতে বাঁধা ই থাকে।তাই ওকে নিয়ে আলাদা করে কোনো চিন্তা বা পরিকল্পনা করে আসেনি লুকাস… সেটা আমার কাছে পরিষ্কার। কিন্তু প্রভুর বিপদে…ও যে ওইভাবে মরিয়া হয়ে বাঁধন ছিঁড়ে… আক্রমণকারীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে…এটা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি লুকাস।ওই মর্মান্তিক ঘটনার পরের দিন দুপুরে আমি ফিরে আসি। ফিরে এসে আমার প্রিয় মানুষদের মৃতদেহগুলো দেখে…শোকে উন্মাদ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল আমার।টমি মৃতদেহর পাশে বসে করুণ স্বরে কাঁদছিল কুঁই কুঁই শব্দে…!সকাল থেকে ওকে খেতে দেওয়ার কেউ না থাকলেও…ও ওই জায়গা ছেড়ে এতটুকুও নড়েনি।

টমি রাতের দিকে বড় হিংস্র হয়ে ওঠে বলে আমরা ওকে ওই সময়টা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখতাম। ফিরে আসার পর…ওই দড়ি ছেঁড়া অবস্থায় রয়েছে…আর ধ্বস্তাধ্বস্তির ফলপ্রসূ ছত্রাকার হয়ে থাকা ঘরের মাঝখানে আমার স্ত্রী সন্তানদের পাশে বসে টমি অনবরত কেঁদে চলেছে…এই দৃশ্য দেখে আমার বোঝার কিছু বাকি রইল না।

আমার অনুপস্থিতিতে আমার ঘরে ঠিক কি ঘটেছে…এটা বুঝতে আর বাকি রইল না আমার।

কিন্তু আততায়ী যে কে…এটা জানার মতো কোনো রাস্তা ই আমার কাছে খোলা ছিল না।পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও কোনো লাভ হল না।আমার পরিবারের মানুষ দের হত্যাকারী অধরাই রয়ে গেল।

এরপর টমিটাও আর বেশি দিন বাঁচল না।ওও যখন আমাকে ছেড়ে চলে গেল… তখন আমার মনে হল…এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে আমিও ওদের সবার কাছে চলে যাই…!স্বজন হারানোর এই চরম শোক টা নিয়তি বলেই মেনে নিতে শুরু করি আস্তে আস্তে…।এই ঘটনার মাস খানেক পর…এক সময়ে আমার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ল।মা রয়েছেন বাবার কাছে… ভারতের কলকাতায়। তবে বাবার ওই বিলাসবহুল বাংলোয় গিয়ে ওঠা তো দূরের কথা… ওনার মুখ দর্শন করার কোনো ইচ্ছা ছিল না আমার।কারণ তাঁর চিন্তাভাবনা আর কাজকর্মগুলো সম্পূর্ণরূপে অনৈতিক… এবং সেসব আমি একেবারেই সমর্থন করি না।যাই হোক…আমি জেনেছিলাম… লুকাস ও কদিন ছুটি কাটানোর জন্য ভারতে গিয়েছে। কলকাতাতেই গিয়ে উঠেছে। আমি তাই ওকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে জানাই… আমি কটাদিন কলকাতায় আসব মায়ের সঙ্গে দেখা করতে… এবং থাকব ওর সাথে ওর বাংলোয়।সেইমতো…আমি নির্দিষ্ট সময়ে ওর বাংলোয় পৌঁছে যাই… এবং তারপর থেকেই ওই শয়তানটা…ওর সামনে বসে থাকা একজন স্বজন হারা এবং মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়া একজন মানুষ কে শেষ পর্যন্ত ভুল বুঝিয়ে…নানান মিথ্যা গল্প ফেঁদে… শেষটায় রাজি করিয়ে ছাড়ল ওর সোনার শহরে অভিযানে আমাকেও ওর সঙ্গ দেওয়ার জন্য।

ও ভালো করেই জানত… আমার পূর্ব পুরুষের নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা অনুসারে… তাঁর রেখে যাওয়া এল ডোরাডোর অসম্পূর্ণ মানচিত্র ও পুঁথিখানি…আমি আমার নিজের পরিবারের বাইরের কোনো ব্যক্তি র হাতে কখনোই দিতে পারি না।সরাসরি আমার ওটা আমার কাছ থেকে একবার হাতে নিয়ে দেখবার ও কোনো উপায় ওর নেই। চুরি করার চেষ্টা করতে গিয়েও কোনো লাভ হল না।তাই অগত্যা…ওই মানচিত্র ও পুঁথি হাতানোর জন্য…ও অন্য কৌশল অবলম্বন করেছিল।না জেনে আমি ওর পাতা সেই ফাঁদেই পা দিয়েছি…আর সেই ভুলের ই মাসুল চোকাচ্ছি এখন।আমাকে নিয়ে এই অভিযানে আসার উদ্দেশ্য ওর একটাই…ওই মানচিত্র আর পুঁথি জোরজবরদস্তি আমার কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়ে… আমাকে শেষ করে দেওয়া।বিখ্যাত যাদুকর ড্যানিয়েল ওর ঘনিষ্ঠ পরিচিত একজন ব্যক্তি…এ আমি আগেই জানতাম ‌।তাঁকে নিয়ে ও আমার কাছে মিথ্যা গল্প ফাঁদে‌।

ও আমাকে বলে… যাদুকর ড্যানিয়েল সোনার শহরে পা রাখার জন্য সেদিন গভীর রাতে আমার ঘরে এসে ওই মানচিত্র ও পুঁথি চুরি করতে তৎপর হয়… কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার স্ত্রী সন্তানরা তাকে নগ্ন হাতে ধরে ফেলে এবং চিৎকার চ্যাঁচামেচী শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পেরে… ড্যানিয়েল ই নাকি আমার স্ত্রী সন্তানদের গলার নলি কেটে তাদের হত্যা করে।এইসব কথা…খোদ ড্যানিয়েল ই নাকি লুকাস কে বলেছিলেন…আর তারপর কোনোপ্রকার মানচিত্র বা পুঁথি ছাড়াই পাড়ি দিয়েছেন দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যে। সেখানে যদি একবার তিনি সোনার শহরের সন্ধান পেয়ে যান ও সেখানে পা রাখেন… তাহলে কালো যাদুর দ্বারা পৃথিবীর বুকে নেমে আসবে ঘনঘোর বিপর্যয়…!ওই অঘটন আটকাতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের এবার যাওয়া উচিত সোনার শহরের খোঁজে….!

আমি তখন ওর কথায় অন্ধের মতো বিশ্বাস করে নিই… এবং ওর সাথে পাড়ি দিই এই দক্ষিণ আমেরিকার গহিন অরণ্যের পথে…!কিন্তু জাহাজে থাকাকালীন আমি ক্রমশ বুঝতে পারলাম…ভালো বন্ধু র মুখোশের আড়ালে… লুকাস আমার সঙ্গে কতবড় প্রতারণা করছে…!

আসল সত্যিগুলো এক এক করে আমার সামনে এল।আর পরিশেষে আমি জানলাম… সবচাইতে ভয়ঙ্কর একখানি তথ্য…!

বিখ্যাত যাদুকর ড্যানিয়েল আসলেই লুকাসের জন্মদাতা পিতা। শুধু তাই ই নয়… তিনি হলেন সেই স্পেনীয় দস্যুদলের বংশধর…যারা চারশো বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার বুকে পদার্পণ করে…মুইসকা প্রজাতির সাধারণ গ্রাম্য মানুষদের ওপরে অকথ্য নির্যাতন করে এল ডোরাডোর সন্ধান পাওয়ার জন্য।

শুনেছি…হুনজাহুয়া নামের এক মুইসকা রাজা ওদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে দেন। তিনি সোনার শহরে প্রবেশদ্বারের চাবি এমন জায়গায় লুকিয়ে রাখেন…যে তার খোঁজ এক তিনি ছাড়া পৃথিবীর কেউ সেটা জানতে পারেনি। ড্যানিয়েলের পূর্ব পুরুষ সোনার শহরের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি। জীবদ্দশায় তিনি কালো যাদু তে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তিনি হুনজাহুয়া র মাতুল পুত্র কুচুকা র দেওয়া তথ্যের সাহায্যে মুইসকা প্রজাতির অপদেবতা হুইতাকাকে জাগিয়ে তোলেন।হুইতাকা জেগে ওঠার পর… অপূর্ব সুন্দরী নারীর রূপ ধরে…মুইসকা প্রজাতির মানুষদের ভিতরে জ্বালিয়ে দিতে শুরু করেন পাপের লেলিহান অগ্নিশিখা…! অপবিত্র করে দিতে শুরু করেন সমস্ত কিছু…! সবকিছু ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে যেতে শুরু করে। এইসব কিছুর দায়…খুব কায়দা করে… স্পেনীয় দস্যু রা চাপিয়ে দেয় মুইসকা রাজা হুনজাহুয়ার ওপরে…! এমনকি…রাজা হুনজাহুয়া যখন তাঁর অভিষেকের পূর্বে নির্জনে এক গুহায় বসবাস করতে শুরু করেন এবং বোচিকার সাধনা করে সমস্ত আচার পালন করায় ব্রতী হন…তখন হুইতাকা এক কামুক নারীর ছদ্মবেশে চুপিসারে তাঁর গুহায় প্রবেশ করে…হুনজাহুয়ার অন্তরাত্মা কে নিদ্রিত করে দেন এবং তাঁর শরীরে জাগিয়ে তোলেন এক চরিত্রহীন পুরুষের কদর্য সত্ত্বা…! হ্যাঁ…হুনজাহুয়ার মাতুল পুত্র কুচুকা হুনজাহুয়ার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে শেষ করার অভিপ্রায় নিয়ে বিদেশী শত্রুদের সাথে হাত মেলান। সোনার শহরের হদিস তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য ও সে প্রস্তুত ছিল…! কিন্তু…ওই রাতেই সে বজ্রাঘাতে তার মৃত্যু হয়‌।

এরপরে যখন জনসম্মুখে রাজা হুনজাহুয়া মৃত্যু বরণ করলেন তারপর স্পেনীয় দস্যু রা ক্ষ্যাপা নেকড়ের রূপ ধারণ করে। কিন্তু মুইসকা প্রজাতির মানুষদের ওপরে অকথ্য নির্যাতন চালিয়েও যখন সোনার শহরের সন্ধান তারা পেল না… তখন তাদের সকল কে… জ্বলন্ত অগ্নিশিখায় জীবন্ত নিক্ষেপ করে তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।

রাজা হুনজাহুয়া দেবতা বোচিকাকে সন্তুষ্ট করেছিলেন সাধনার দ্বারা… এবং নিজেকে বোচিকার পায়ে বলি প্রদান করেন। নিজের অভিষেকের জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান চলার সময়ে সকলের অজ্ঞাতে আসে বোচিকার কাছে নিজেকে বলি রূপে অর্পণ করার মাহেন্দ্রক্ষণ…! অনুষ্ঠানে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষের ভিড়ে… রাজা হুনজাহুয়া অসহনীয় যন্ত্রনার মৃত্যু বরণ করেছিলেন স্বেচ্ছায়…মুইসকা প্রজাতির সকল মানুষের মঙ্গলার্থে…!

রাজা হুনজাহুয়ার অকস্মাৎ মৃত্যুর নেপথ্যের আসল কাহিনী টা স্পেনীয় দস্যুদল জেনেছিল অনেক পরে।

আর তার সাথে এও জেনেছিল… রাজা হুনজাহুয়া সোনার শহরের প্রবেশদ্বার নিজে বন্ধ করে গিয়েছেন।আর সোনার শহরের প্রবেশদ্বারের চাবি রেখে গিয়েছেন এক ভয়ঙ্কর গুহায়… যেখানে শত শত বছর ধরে পাহারায় থাকবে এক বিশালাকৃতি রাক্ষুসে অ্যানাকোন্ডা সাপ…!ওই ভয়ঙ্কর সাপের অবিনশ্বর শরীর হতেই যুগ যুগ ধরে বিকিরিত হবে বোচিকার শক্তি…!

সোনার শহরে প্রবেশের পথ চিরতরে বন্ধ জেনেও…হার মানেননি ড্যানিয়েলের পূর্ব পুরুষ। তিনি জানতেন… চারশো বছর অতিবাহিত হওয়ার পর রাজা হুনজাহুয়া ঠিক ফিরে আসবেন দক্ষিণ আমেরিকার এই গহিন জঙ্গলে… অকথ্য নির্যাতনের পর পরিশেষে ঝলসে পুড়িয়ে দগ্ধ করে মুইসকা প্রজাতির যে গ্রামবাসীদের তিনি হত্যা করিয়েছিলেন… তাদের আত্মাকে মুক্তি দিতে…!

ড্যানিয়েলের পূর্ব পুরুষ হাল ছাড়েননি। তিনি মনস্থির করলেন… তিনি নিজে যদি সোনার শহরে পা রাখতে না পারেন… তাহলে তার বংশধর যাতে সোনার শহরে পা রাখে…তার ব্যবস্থা তিনি করবেন।তিনি জানতেন… চারশো বছর পরে মুইসকা রাজা হুনজাহুয়া যখন পুনরায় এই দক্ষিণ আমেরিকার মাটিতে পা রাখবেন…সেই সময়েই ওই সুবিশাল অ্যানাকোন্ডা সাপকে এই নিদ্রিত করা সম্ভব।তিনি নিজের দেশে ফিরে আসেন এবং তার বংশধরদের নির্দেশ দেন… ১৯৪৭ সালে তার বংশের ওয়ারিশ যেন দক্ষিণ আমেরিকার অভিমুখে যাত্রা করে। সোনার শহর এল ডোরাডো খুঁজে বার করে… সেখানে নিজের রাজত্ব কায়েম করে… তাঁকে জিতিয়ে দেয়…! ড্যানিয়েল তার পূর্ব পুরুষের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে।সে নিজে তন্ত্রসাধনার মাধ্যমে… রাক্ষুসে অ্যানাকোন্ডা সাপকে নিদ্রিত করার জন্য শক্তি সঞ্চয় করা তে মনোনিবেশ করে… এবং সেই কারণেই… নিজের মাতৃহারা সদ্যজাত পুত্রসন্তান লুকাসের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার সময় করে উঠতে তিনি অক্ষম থাকতেন।তাই কৌশলে… পঁচিশ বছর আগে…তিনি লুকাসের বর্তমান পিতার সদ্যজাত শিশুপুত্র কে…তার মায়ের অগোচরে গলা টিপে হত্যা করে… সেই স্থানে লুকাস কে রেখে আসেন। সদ্য মা হওয়ার পর নিজের সন্তান কে চোখের দেখা না দেখে… ভদ্রমহিলা নিজের ছেলে ভেবে লুকাস কেই লালন পালন করতে থাকেন…! লুকাসের যখন কুড়ি বছর বয়স… তখন ওকে আড়ালে ডেকে ড্যানিয়েল সব সত্য প্রকাশ করে এবং বলে… লুকাস সেই বংশের ছেলে… যার পূর্ব পুরুষ পরাজম স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল।ওর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হল সোনার শহরের সন্ধান করে সেখানকার অপার ঐশ্বর্যের ওপরে নিজের নিজের আধিপত্য বিস্তার করা। এবং পরিশেষে গোটা পৃথিবীর বুকে নিজের কতৃত্ব কায়েম করা…!

জাহাজে আসার পথে আমি এই সমস্ত বৃত্তান্ত একে একে জানতে পারি। রাগে ঘৃণায় আমার সারা শরীর রি রি করে ওঠে। আমি মনস্থির করে নিই…যে মানচিত্র আর পুঁথি হাতে পাওয়ার জন্য লুকাস আমার সঙ্গে এতবড় প্রতারণা করল… ওইগুলো যাতে ও ছুঁতে পর্যন্ত না পারে… আমি তার ই ব্যবস্থা করব‌। কিন্তু আমার মনের কথা অচিরেই টের পেয়ে গেল লুকাস… যখন আমাদের জাহাজ দক্ষিণ আমেরিকার ভূখন্ড স্পর্শ করল।ওই পুঁথি আর মানচিত্র হাতে পাওয়ার জন্য… লুকাস সদলবলে আমার ওপরে চড়াও হয় হিংস্র ক্ষ্যাপা নেকড়ের মতো…! কিন্তু ওদের হাতে মার খেয়ে রক্তাক্ত হয়ে গিয়েও আমি কোনোভাবে ওই মানচিত্র আর পুঁথি ওদের স্পর্শ করতে দিইনি‌।আমি কোনোমতে ওইগুলো নিয়ে আহত… রক্তাক্ত অবস্থায় পালিয়ে যাই…আর তারপর গহিন অরণ্যের ভিতরে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকি।

সেই সময়ে… যীশু র অশেষ কৃপা… জুলিয়া জঙ্গলে কাঠ কাটতে এসে আমাকে দেখতে পায়‌। তারপর সাথে করে আমাকে নিয়ে আসে ওদের এই গ্রামীণ বসতি তে…!সেই মানচিত্র আর পুঁথি আমার সঙ্গেই রয়েছে‌। আমি জানি… আমি আর বেশিদিন বাঁচব না‌। আমার নিজের রক্তের কোনো ওয়ারিশ নেই এ দুনিয়ায়‌।তাই…মরার আগে… এইগুলো আমি তোমার হাতে দিয়ে যেতে চাই… এগুলো তুমি নিজের কাছে রেখে দিও…!”

এতক্ষণ একটানা কথা বলার পর… হাঁপাচ্ছিল আর্থার।আমি ওর দিকে একটা মাটির পাত্রে করে একটু জল এগিয়ে দিলাম। তারপর বললাম…”সব বুঝলাম… কিন্তু তুমি এইগুলো আমার হাতে দিতে চাইছ কেন?”

উত্তরে আর্থার বলল…”কারণ… আমি জানি এই দক্ষিণ আমেরিকার মাটিতে রাজা হুনজাহুয়া র পদধূলি পড়েছে।অভিরাম বলে যে ভোলাভালা ছেলেটার সাথে এতদূর দেশে পাড়ি দিয়েছ তুমি…তার আসল পরিচয় টা বুঝতে এখন আর কোনো বাকি নেই আমার। অভিরামের খোলসের ভিতরে এতদিন লুকিয়ে ছিলেন মুইসকা প্রজাতির রাজা হুনজাহুয়া… যিনি সবসময় সকল মানুষের মঙ্গল সাধন করতেন। ষএকটা রোগা পাতলা ভীরু ছেলের আবরণ ফুঁড়ে… এখন বেরিয়ে এসেছে রাজকীয় শক্তিধারী রাজা হুনজাহুয়া।তিনি এখন সোনার শহরের সামনে উপবিষ্ট হয়ে চারশো বছর আগে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করা মুইসকা প্রজাতির মানুষগুলির আত্মা র মুক্তি ঘটানোর জন্য সচেষ্ট হয়েছেন।এই সময়ে…অন্য কোনোদাকে তাঁর মনোযোগ নেই। তুমি আর দেরি কোরো না…এই মানচিত্র আর পুঁথি নিয়ে এগুলির সাহায্যে…যতটা পারো… এগিয়ে যাও…আর ছলে বলে কৌশলে আটকাও ওই‌ স্বার্থান্বেষী লোভাতুর শয়তানের দলকে।আমি জানি তুমি পারবে।নিজের প্রিয় বন্ধুর জন্য যে ভয়ডর তুচ্ছ করে এতদুরে পাড়ি দিতে পারে বিনা দ্বিধায়…সে মানুষের ভিতরে ক্ষুদ্র স্বার্থ…লোভ এই রিপু গুলি একেবারেই নিষ্ক্রিয়…সেটা বুঝতে বাকি নেই আমার।

তুমি গিয়ে ওদের না যদি আটকাও… তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে…ওই কালো যাদু র উপাসক ড্যানিয়েল ও তার যোগ্য উত্তরসূরি লুকাস যদি একবার সেখানে পা রাখতে সক্ষম হয়…আর সাধনারত রাজা হুনজাহুয়ার সাথে থাকা সোনার শহরের চাবি টা তার অজ্ঞাতে চুরি করে পা রাখে স্বর্ণ নগরীতে… তাহলে পৃথিবীর বুকে নেমে আসবে ভীষণ সর্বনাশ…! এই সর্বনাশ আটকাতে একমাত্র তুমিই পারবে… তুমি আর দেরি কোরো না… তাড়াতাড়ি রওনা দাও…!

আর্থারের কথাগুলো শোনার পর… আমার মুখ থেকে আর কোনো কথা সরল না।আমি হতভম্ব হয়ে তার মুখের দিকে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

হঠাৎ এমন সময়ে… জুলিয়া… একটা মৃৎ পাত্রে বেশ খানিকটা ভেষজ পথ্য নিয়ে এল। আর্থারের পায়ের কাছে বসে… সযত্নে মালিশ করতে শুরু করে দিল।

আর্থার জুলিয়া র কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল…”আমার এত সেবা কেন করছ জুলিয়া… আমার এই ক্ষতবিক্ষত হাত পা শরীর ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়েছে…পচন ধরতে শুরু করেছে…!আমি আর বেশিদিন বাঁচব না…!”

এ কথা শোনামাত্র… জুলিয়া র হাত থেকে ভেষজ পূর্ণ মৃৎপাত্র টা পড়ে গেল মাটিতে। এক লাফে উঠে…সে আর্থারের মুখে চেপে ধরল নিজের হাত। তারপর বলল…”এমন কথা যেন আর কক্ষনো তোমার মুখে না শুনি…!”

এমন দৃশ্য দেখে…মনটা ভালো হয়ে গেল আমার।আর সেই সাথে ‌বুঝলাম…এই অল্পক্ষণের মধ্যেই আর্থার চিবচা ভাষাটা অল্প অল্প রপ্ত করে নিয়েছে।

গভীর অরণ্যের ভিতর দিয়ে আমি এগিয়ে চলেছি… সোনার শহর এল ডোরাডোর অভিমুখে…! আমাজনের ঘন জঙ্গলের একেবারে গভীরে পৌঁছে গিয়েছি আমি‌। চারপাশে বিশাল আকৃতির রাক্ষুসে বৃক্ষ যেন ধরিত্রীর বুকে প্রহরীর মতো ছত্র ধরে… সূর্য রশ্মি কে পৃথিবীর মাটি স্পর্শ করার থেকে প্রতিনিয়ত বাধা দিয়ে চলেছে।দিনের বেলাতেও চারপাশে এমন অদ্ভুত এক আদিম অন্ধকারের রাজত্ব…যেন মনে হচ্ছিল… আমি এই ধরিত্রীর বাইরে… কোনো অজ্ঞাত দুনিয়ায় পা রেখেছি।চারপাশে অজানা কীটপতঙ্গ…পাখি এবং সর্বোপরি…এই গা ছমছমে আদিমতার বন্য গন্ধ পরতে পরতে মাখানো বাতাসে পরিপূর্ণ অদ্ভুত পরিবেশে আসার পর… বাস্তবিকই… আমার বড়ো গা ছমছম করতে শুরু করল। বিশালাকৃতি বৃক্ষরাজির ফাঁকফোকর দিয়ে যৎসামান্য যেটুকু আলো এসে পৌঁছচ্ছে…তাতেই আমি আমার হাতে থাকা এল ডোরাডোর মানচিত্রতে অতিকষ্টে দৃষ্টিপাত করতে সক্ষম হচ্ছিলাম। চারপাশে বন্য ও হিংস্র জীবজন্তু র ডাক শুনে… আমার অন্তরাত্মা যেন কেঁপে উঠছিল। কিন্তু না… পিছিয়ে আসার কথা আমি কখনোই ভাবিনি…। সোনার শহর এল ডোরাডো…যেটা নিয়ে শত শত বছর ধরে মানুষের এত কল্পনার অবতরণা…এত বিশ্লেষণ… তাকে খোঁজার ক্লান্তিহীন চেষ্টা… এই সবকিছুই কি শুধুমাত্র আলেয়ার পিছনে ছোটা…নাকি সত্যিই এই পৃথিবীর বুকে সোনার শহরের অস্তিত্ব রয়েছে?

এক দুর্দম কৌতূহল আমাকে চেপে ধরেছিল। সত্যি বলতে কি… নিজের পরিবারকে একসাথে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মরতে দেখার পর থেকে… পার্থিব ভোগ…লোভ বা মোহমায়ার সম্পূর্ণ উর্দ্ধে উঠে গিয়েছিলাম আমি। কিন্তু আমার খুব জানতে ইচ্ছা হচ্ছিল… সোনার শহর কি সত্যিই আছে?যদি সত্যিই থাকে…একবার যদি সেখানে পা রেখে…তা চাক্ষুষ করতে পারি… তাহলেই আমার জীবন স্বার্থক।এই তাড়নাতেই…আমি ভয়ডর সবকিছু তুচ্ছ করে… সামনের দিকে এগিয়ে চললাম।

হঠাৎ…আমি শুনতে পেলাম এক ক্ষুধার্ত হিংস্র জানোয়ারের ডাক‌। চারপাশে তাকিয়ে দেখতেই আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। আমার পশ্চাতে… অদূরেই আমার দিকে লালা ঝরা ক্ষুধা মিশ্রিত হিংস্রতা নিয়ে ছুটে আসছে একটি বন্য জাগুয়ার…!আমি আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে… ঝড়ের গতিতে দৌড়াতে শুরু করলাম।

দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে অনেক্ষণ দৌড়াতে দৌড়াতে সামনে একটি পাহাড়ের উচু টিলার ভিতরে একখানি গর্ত দেখে…আমি সেখানেই ঢুকে পড়লাম।এই গর্তের ভিতরে ওই হিংস্র জাগুয়ার যে কিছুতেই ঢুকতে পারবে না…এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম।বেশ খানিকক্ষন পরে…আমি গর্ত থেকে বেরিয়ে ফের যখন এগোতে শুরু করলাম… হঠাৎ একটা শব্দ শুনে… আমার বুকের ভিতরে হাতুড়ি পিটতে শুরু করল।এ শব্দ কোনো বন্য জানোয়ারের পায়ের শব্দ নয়‌।এ যে মানুষের পায়ের শব্দ…এ বিষয়ে আমার সন্দেহের উদ্রেক রইল না।

নিজেকে একটু আড়াল করে… আমি চারপাশটা লক্ষ্য করলাম। হ্যাঁ… আমার আন্দাজ একেবারে নির্ভুল। লুকাস ও তার দলবল টহল দিচ্ছে চারপাশে।হঠাৎ ওদের একজন আমাকে দেখে ফেলে।আর সবচাইতে সর্বনাশ টা হল আমার হাতে শক্ত করে ধরে থাকা এল ডোরাডোর মানচিত্র টা সমেত ই ওরা দেখে ফেলে আমায়…!ব্যস…আর দেখতে হল না…ওরা সবাই মিলে হিংস্র জাগুয়ারের চাইতেও… আরো শতগুণ হিংস্রতা নিয়ে আমার দিকে তেড়ে এল।না…প্রাণ থাকতে…আমি এই পুঁথি ও মানচিত্র ওদের মতো লোভী নরপিশাচদের হাতে কিছুতেই তুলে দেব না‌। অভিরাম যে ওদের সাথে নেই…এ আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম।আর এই সময়ে ও কোথায় রয়েছে…সেটাও আমি আন্দাজ করতে পারছিলাম। আমি বুঝতে পারলাম…এই অসম্পূর্ণ পুঁথি ও মানচিত্র দেখে… যতটা সম্ভব আমি এগিয়ে এসেছি…আর এই মানচিত্র দেখে এগোনো আমার পক্ষে সম্ভব নয়।এল ডোরাডো নিজের চোখে দেখবার সৌভাগ্য হয়তো আমার কপালেই লেখা নেই…! কিন্তু এই লোভী নরপিশাচগুলোর গতি মন্হর করবার একটা কোনো ব্যবস্থা আমাকেই করতে হবে‌।

আমি আর কালবিলম্ব না করে… বিদ্যুৎ গতিতে ওই পুঁথি ও মানচিত্র আমি একটা বড়ো পাথরের চাঁই এর আড়ালে লুকিয়ে রাখলাম ওদের অলক্ষ্যে। তারপর সাময়িকভাবে গা ঢাকা দিতে ফের ঢুকে লুকিয়ে পড়লাম ওই পাহাড়ী টিলার গর্তের ভিতরে।ওরা যখন আমাকে খোঁজার জন্য তৎপর হয়ে চারপাশে তল্লাশি শুরু করবে… তখন আমি ওদের পিছন থেকে আক্রমণ করব…এই ছিল আমার পরিকল্পনা…!

কিন্তু ওই পাহাড়ী টিলার ভিতরে ঢুকে আমি দেখলাম এক অদ্ভুত দৃশ্য… চামড়ার তৈরি অদ্ভুত পোশাক পরিহিত এক বৃদ্ধ… ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে রয়েছেন।কে এই বৃদ্ধ…এই গর্তে বসে এইভাবে কোন সাধনায় রত ইনি?

হঠাৎ ওই বৃদ্ধ চোখ মেললেন। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে যেন উপচে পড়ছে এক অনির্বচনীয় আনন্দ…! শুদ্ধ ইংরেজি ভাষায় ওই বৃদ্ধ বলে উঠলেন…”পেয়েছি…আমি পেয়েছি তোকে…আমি তন্ত্র সাধনার দ্বারা আগেই জানতে পেরেছিলাম সোনার শহরের মানচিত্র ও পুঁথি হাতে একজন এই গর্তের ভিতরে আসবে‌। কোথায় মানচিত্র… কোথায় পুঁথি…আরে দে দে… ওগুলো সব আমার হাতে দিয়ে দে…! দীর্ঘ বছর ধরে এই জঙ্গলের ভিতরে বাস করেও সোনার শহরের সন্ধান পেলাম না…ওই মানচিত্র হাতে পেলেই আমার সব অভীষ্ট পূরণ হবে…দে দে…!”

বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এমন এক উটকো ঝামেলা… এমনভাবে আমাকে খামচে ধরল…যে আমি একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম।

আমি তৎক্ষণাৎ ওই গর্ত থেকে বেরোনোর জন্য তৎপর হলাম…আর সাথে সাথে লুকাস ওর দলবল নিয়ে ওই গর্তের সামনে চলে এল। আমার বেরোনোর রাস্তা আটকে দিয়ে লুকাস ওই বৃদ্ধের উদ্দেশ্যে বলে উঠল…”আর কোনো চিন্তা নেই বাবা… সোনার শহর এখন আমাদের হাতের মুঠোয়…!”

এই কথা শুনে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। আমার কাছে সবকিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। পশুর চামড়ার তৈরি পোশাক পরিহিত… এই গহিন অরণ্যের ভিতরে বন্য জীবন যাপন করা এই বৃদ্ধ মানুষটিই তবে ড্যানিয়েল!

আমি সাথে সাথে বুঝতে গেলাম…আমি এবার একটা ফাঁদে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছি… যেখান থেকে পরিত্রাণের একটাই রাস্তা… মুষ্ঠি যুদ্ধ…! আমার দুইটা হাতের তালু মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে এল।ওই লোভী নরপিশাচগুলোর প্রতি আমার জমে ওঠা সমস্ত ক্রোধ বাইরে বেরিয়ে এল।আমি আর কালবিলম্ব না করে… ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শুরু করে দিলাম প্রচন্ড লড়াই…!

লড়াইয়ের একদিকে পাঁচজন তাগড়া জোয়ান ছেলে…আর অন্যদিকে কুস্তি ও ক্যারাটের পাঞ্জায় সিদ্ধ হস্ত আমি।ভয়ঙ্কর তান্ডব যুদ্ধ চলল বেশ কিছুক্ষণ ধরে…!তবে ওই চারজন বলশালী ছেলে আমার একার সঙ্গে লড়াই করতে এসেও বিশেষ সুবিধা করতে পারল না। প্রচন্ড লড়াই করতে করতে… ক্রমশ সকলে এসে পড়লাম এমন একটা জায়গায়… যেটি আসলে একটা তীক্ষ্ণ ও খাড়াই পাথরের শৃঙ্গ। সামান্য পা হড়কালেই সোজা গিয়ে পড়তে হবে উত্তাল জলপ্রপাতের ক্রোড়ে।এই জলপ্রপাত গিয়ে মিশেছে নদী তে।জায়গাটা এতটাই দুর্গম…যে প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে জীবন মৃত্যুর ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ…!

হঠাৎ ওদের মধ্যে একজন কে ধরে নিয়ে গেল ক্ষুধার্ত এক জাগুয়ার।তার মর্মবিদারক আর্তনাদে… আকাশ বাতাস যেন কেঁপে উঠল…! কিন্তু আমি এক মুহুর্ত ও না থেমে …বাকিদের সাথে আমি লড়াই করতে থাকলাম সমান তালে…! আমার উদ্দেশ্য শুধু একটাই…রাজা হুনজাহুয়া যতক্ষণ সাধনারত অবস্থায় রয়েছেন…ততক্ষণ ওদের গতিকে শ্লথ রাখা…! কিন্তু ওদের উদ্দেশ্য… আমাকে হত্যা করে হলেও… সোনার শহরের ওই সময় অসম্পূর্ণ মানচিত্র ও পুঁথি টা হাতে পাওয়া…!ওরা এখন চারজন…আর আমি একা!অসম লড়াই… সন্দেহ নেই…! কিন্তু… আমি একটুও দমে যাইনি। ওদের সাথে পাল্লা দিয়ে সমান তালে আমি লড়াই করে যাচ্ছিলাম। লড়াই চলাকালীন… ওদের মধ্যে দুজন জলে পড়ে গেল।আর সাথে সাথেই দুটি সুবিশাল পিরানহা ওদের শরীর থেকে মাংস খুবলে খুবলে খেতে শুরু করল।এমন ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে… আমার সারা শরীর শিউরে উঠল। এখন আমার বিপরীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে শুধু লুকাস।ও চিৎকার করে আমার উদ্দেশ্যে বলে উঠল…”এখনো সময় আছে…ভালো চাস তো ওই মানচিত্র আর পুঁথি আমার হাতে দিয়ে দে…নইলে…!”

কথাটা অসম্পূর্ণ রেখেই ও হিংস্র নেকড়ের মতো তেড়ে এল আমার দিকে‌।আমি টাল সামলাতে পারলাম না…! আমার পা টা পিছলে গেল।এর ফলে…আমি আর লুকাস দুজনেই সোজা গিয়ে পড়লাম জলে। জলের মধ্যেও আমার আর লুকাসের মধ্যে চলতে থাকল ভয়ঙ্কর লড়াই। পিরানহা মাছ তাদের ক্ষুধা মিটিয়ে নিয়েছে আগেই…তাই হয়তো…আমার আর লুকাসের ওপরে আক্রমণ করা থেকে হিংস্র মাংসাশী পিরানহা মাছ বিরত রইল। অনেক্ষন ধরে জলের মধ্যে তুমুল লড়াই করতে করতে… কখন যে আমরা দুজনেই ফের ডাঙ্গায় পৌঁছে গেলাম…এটা আমরা কেউই টের পেলাম না। ডাঙ্গায় পৌঁছনোর পর…লুকাস বা আমার কারোর মধ্যেই আর শক্তি অবশিষ্ট রইল না। আমরা দুজনেই রীতিমতো বিদ্ধস্ত হয়ে পড়লাম।

ডাঙ্গায় পৌঁছে…আমরা দুজনেই তখন রীতিমতো হাঁপাচ্ছিলাম।একটা সুবিশাল অ্যানাকোন্ডা সাপ কখন যে ধীরগতিতে আমাদের সামনে চলে এসেছে… এটা আমরা কেউই টের পাইনি। সামনে থেকে এতবড় একটা রাক্ষুসে আকৃতির সুবিশাল সাপ দেখে…আমার হৃৎপিন্ডটা খুলে হাতে চলে আসার মতো অবস্থা হল।

কিন্তু তারপর আমি নিজে কে সামলে নিলাম।মুইসকা প্রজাতির ওই গ্রামীণ মানুষদের সাথে থাকবার সময়ে…যে বৃদ্ধের কাছ থেকে আমি রাজা হুনজাহুয়া র সমস্ত বৃত্তান্ত শুনি… তাঁর দেওয়া বর্ণনার সাথে এই অ্যানাকোন্ডা সাপের শরীরের কারুকার্য ও বর্ণ একেবারে মিলে গিয়েছে।আমি বুঝতে পারলাম…এইই হল সেই অ্যানাকোন্ডা সাপ…যে শত শত বছর ধরে সোনার শহর এল ডোরাডো কে পাহারা দিয়ে রেখেছে…! অ্যানাকোন্ডা সাপটি… ধীরে ধীরে পরিশ্রান্ত লুকাসের কাছে এসে… ওকে জ্যান্ত গলাধঃকরণ করতে শুরু করল ধীরে ধীরে…! লুকাসের গগন বিদারক আর্ত ধ্বনি তে কেঁপে উঠল আকাশ বাতাস…!আমি মনে মনে ভাবলাম… লুকাসের মতো লোভী মানুষের হাত থেকেই এই অ্যানাকোন্ডা সাপটি শত শত বছর ধরে মুইসকা প্রজাতির আমানত… সোনার শহর কে রক্ষা করে চলেছে।এই শাস্তি ওর পাওনা ছিল। হঠাৎ আমি দেখলাম… অদূরে…ওই পাহাড়ের শৃঙ্গ থেকে নিজের সন্তানের এমন করুণ পরিণতি চাক্ষুষ করে…দু হাতে বুক চাপড়ে চলেছেন ড্যানিয়েল…! পরিশেষে প্রচন্ড শোকে… তিনি নিজেও ঝাঁপিয়ে পড়লেন প্রবাহমান নদীর তুমুল স্রোতের মাঝে…!

আমার চারপাশে…ঝলমল করে জেগে উঠতে শুরু করেছে সোনার শহর…! হাঁটতে গিয়ে দেখি… আমার প্রতিটি পদক্ষেপে…নুড়ি কাকড় বালি র মতোই পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে স্বর্ণমুদ্রা…!আমি এক পৃথিবী বিস্ময় নিয়ে চেয়ে দেখতে থাকলাম শুধু…এমন অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য…! সোনার শহরের স্বর্ণ নির্মিত পথে বিস্ময়ে বিভোর হয়ে চলতে চলতে… হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম‌। আমার সামনে সাধনারত অবস্থায় বসে রয়েছে অভিরাম…থুড়ি…মুইসকা রাজা হুনজাহুয়া…! তাঁর অপূর্ব সুন্দর পেশীবহুল শরীরে স্বর্ণের আভা পড়ে… তাঁকে যেন স্বর্গের কোনো দেবতার মতোই দেখতে লাগছে…!আপনা থেকেই…আমার হাত দুটো জড়ো হয়ে এল…!আমি হাতজোড় করে অভিরামের পায়ের কাছে এসে হাঁটু মুড়ে বসলাম! অভিরামের ধ্যানভঙ্গ হল।সে আপ্লুত কন্ঠে আমাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর বলল… তুমি অবশেষে এসেছ বন্ধু…! তুমি যদি না থাকতে…ওই নরপিশাচগুলোকে না ঠেকিয়ে রাখতে… তাহলে ওরা আমার ধ্যানভঙ্গ হওয়ার আগেই হয়তো এই সোনার শহরে প্রবেশ করে লুটতরাজ শুরু করে দিত…! আমার ধ্যানমগ্ন থাকার সময়টুকু যে এই সোনার শহরের প্রহরীও নিদ্রিত অবস্থায় চলে গিয়েছিল…!ওরা এই সোনার শহরের অনেকটাই কাছে চলে এসেছিল।ওই সময়ে তুমি ওদের ঠেকিয়ে না রাখলে… সর্বনাশ হয়ে যেত…!

আমি অভিরামের দুই হাত নিজের দুই হাতে নিয়ে বললাম…”কি বলছ তুমি ভাই…এ তো আমার কর্তব্য…!”

অভিরাম আমার কাঁধে হাত রেখে বলল…”আজ আমার বড়ো শান্তির দিন বন্ধু… দীর্ঘ বছর পরে অবশেষে সমস্ত ভুল বোঝাবুঝির ইতি ঘটল‌।ওই স্পেনীয় দস্যুদল যে নিরপরাধ মানুষদের আমার সম্পর্কে ভুল বুঝিয়ে… পরিশেষে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে না পেরে… ওদের সবাইকে জীবন্ত অবস্থায় জ্বলন্ত অগ্নিতে নিক্ষেপ করেছিল… তাদের অতৃপ্ত আত্মা কে আজ আমি মুক্তি দিতে পারলাম‌‌…!

অভিরামের চোখে মুখে খুশি র যে দীপ্তি খেলে উঠল…তা আমার অন্তরাত্মাকেও যেন এক অনাবিল আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে গেল…।

নীরব কিছু মূহুর্ত কাটবার পর…আমি অভিরামের উদ্দেশ্যে বললাম…”তা হলে… এখন থেকে কি তুমি তবে এখানেই থাকবে?”

অভিরাম তথা রাজা হুনজাহুয়া বলে উঠলেন…”আমার কাজ শেষ হয়েছে। এবার পৃথিবী থেকে আমার বিদায় নেওয়ার পালা‌। আমাকে এবার পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে যেতে হবে দেবু…!”

ওর এই কথায় আমার চোখে জল এল।আমি বিগলিত কন্ঠে ওর দুহাত জড়িয়ে ধরে বলে উঠলাম…কেন ভাই কেন?এত তাড়াতাড়ি কেন তুমি চলে যাবে?আর কিছুদিন থেকে গেলে হত না?”

অভিরাম আমার কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল…না ভাই…তা হয় না…! আমাকে এক্ষুনি চলে যেতে হবে। তবে আমি একদিন আসব… তোমার কাছেই আসব‌‌।

এই কথা শুনে আমি চোখের জল মুছে বললাম…”কবে…কবে আসবে তুমি?”

আজ থেকে ঠিক ষাট বছর পরে…এই দিনেই আমি আসব… তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যাব। তুমি তৈরি থেকো…।সোনার শহরের‌‌ প্রবেশদ্বারের চাবি আমি তোমার কাছে গচ্ছিত রেখে যাব। যন্ত্রনাক্লিষ্ট মানুষগুলির আত্মা কিছুক্ষণ আগে মুক্তি পেয়েছে।কিন্তু চারশো বছর ধরে জমতে থাকা ওদের যন্ত্রনার রেশ… এখনো এখানকার বাতাসে তাজা রক্তের গন্ধের মতোই ছড়িয়ে রয়েছে।এই যন্ত্রনার রেশ কাটতে ষাট বছর সময় লাগবে। ততদিন এই সোনার শহরে মুইসকা প্রজাতির মানুষদের পা রাখা সম্ভব নয়।এই সোনার শহর আমাদের মুইসকা প্রজাতির আমানত… কিন্তু এখনো তারা আমাকে ভুল বুঝে রয়েছে। আজকের রাত টা কেটে সূর্যোদয় হওয়ার পরে…এই নির্মল স্বচ্ছ ভোরের হিমেল বাতাসে ভেসে থাকা এই সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বিদেহী আত্মাদের ফিসফিসানির সাথে ওরা আসল সত্যটা জানতে পারবে। কিন্তু আমাকে যে এখন ই পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিতে হবে…!তাই আমি তোমার কাছেই গচ্ছিত রেখে যেতে চাই এই সোনার শহরের প্রবেশ দ্বারের চাবি…! তুমি আমাকে কথা দাও বন্ধু…এই চাবি তুমি নিজের কাছে সযত্নে রাখবে মুইসকা প্রজাতির অমূল্য আমানতের রক্ষক হিসেবে…!

আমি অভিরামের হাতে হাত রেখে বলে উঠলাম…”নিশ্চয়ই রাখব বন্ধু… তুমি কোনো চিন্তা কোরো না।”

অভিরাম তথা মুইসকা রাজা হুনজাহুয়া আমার কথা শুনে নিশ্চিন্ত হলেন। তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন… সোনার শহর এল ডোরাডোর প্রবেশ দ্বারের চাবি…! আকাশের বুকে সূর্য ঝলমল করে উঠেছিল…আর চারপাশে বইছিল মৃদুমন্দ বাতাস…!এই ধরিত্রী তে…এই অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী থাকল শুধু তারাই…!

এরপর তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন…এক অপূর্ব কারুকার্যখচিত মাঝারি আকৃতির বাক্স।আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম…”এতে কি আছে…?”

রাজা হেসে বললেন…”এই বাক্সে ভর্তি রয়েছে সোনার কয়েন। এটা মুইসকা রাজার তরফ থেকে তোমার জন্য একটা ছোট্ট উপহার‌।এ তোমাকে নিয়েই হবে। তোমার কোনো আপত্তি শুনব না‌।এই স্বর্ণমুদ্রা সাথে নিয়ে… তুমি ফিরে যাও তোমার জন্মভূমি তে… নিজের মতো করে একটা ব্যবসা শুরু করে…সুখে জীবন অতিবাহিত করো…আজ থেকে ষাট বছর পরে…আমি নিজে আসব তোমার কাছে… তোমার কাছে গচ্ছিত রাখা এই চাবিটা নিতে…আর সেই সাথে তোমাকেও… তুমি তৈরি থেকো কিন্তু…!

আমি অভিভূত হয়ে… একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম…কি যে বলব… কিছুই ভেবে পেলাম না।

মুইসকা রাজা আবার বলে উঠলেন… তুমি যখন ফিরে যাওয়ার পথ ধরবে… তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখবে… একটা ঈগল তোমার ঠিক মাথার ওপরেই থাকবে।সেই তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে তোমার গন্তব্যে…!

আমার সবচাইতে কাছের বন্ধু কে এইভাবে চিরতরে হারাতে হবে… একথা চিন্তা করে… আমার চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করল।আর সেই সাথে আমি দেখলাম…এক অপার্থিব দৃশ্য…!মুইসকা রাজা হুনজাহুয়া তথা অভিরামের সুঠাম… রাজকীয়… পেশীবহুল শরীরখানি… একটু একটু করে বাতাসের সাথে মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে…!

দৃশ্য বারো

সোনার শহরে থেকে বেরিয়ে আসার পর… আমি দিন কয়েকের জন্য মুইসকা প্রজাতির গ্রামীণ মানুষদের সাথেই থেকে গেলাম।তার অবশ্য এক জোরালো কারণ ছিল…!ব্যাপারটা খুলেই বলি… আর্থার ভেবেছিল…ও আর বেশিদিন বাঁচবে না…! এটা শুধু ওর কথা ছিল না…!ওই শয়তানগুলো মানচিত্র ও পুঁথি হাতে পাওয়ার জন্য… আর্থার কে যেভাবে মেরেছিল…তাতে ওর হাড়গোড়ে ভেঙ্গে… শরীরে ভয়ানক ঘা হয়ে… ভয়ঙ্কর অবস্থা হয়ে গিয়েছিল…যে ওর অবস্থা দেখে আমার ও একই কথা মনে হয়েছিল। কিন্তু… অদ্ভুত ব্যাপার…মুইসকা প্রজাতির গ্রামীণ মেয়ে জুলিয়া…এই চার মাস ধরে লাগাতার… নিজের নাওয়া খাওয়া ভুলে দিনরাত এক করে ওর সেবা শুশ্রূষা করে গিয়েছে…আর সৃষ্টিকর্তার কাছে ওর আরোগ্য কামনা করে ব্যাকুল চিত্তে প্রার্থনা করে গিয়েছে। তিনি ওর সে ডাক শুনেছেন…! এখান থেকে এল ডোরাডোর পথে যাত্রা করার সময়ে… আর্থার কে যে অবস্থায় দেখে গিয়েছিলাম…ও এখন আর সেই অবস্থায় নেই।

ও এখন হাঁটাচলা তো বটেই…রীতিমতো দৌড়ঝাঁপ করার মতো সক্ষম হয়ে গিয়েছে।আর সেই সাথে ওর ভিতরে চলে এসেছে একটা আমূল পরিবর্তন…! জাহাজে পা রাখার পর থেকে আমি ওকে যতটুকু দেখেছি… নিজের জীবন মৃত্যু নিয়ে কোনো পরোয়াই ছিল না ওর। বেঁচে থাকাটাই ছিল ওর কাছে পুরোপুরি অর্থহীন…!কিন্তু আজ ওর ভিতরে জীবন যেন হাজারো রঙিন পুষ্পে সজ্জিত বসন্তের ডালি নিয়ে ওকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত… প্রাণবন্ত করে তুলেছে…!ওর চোখে মুখে ফুটে উঠেছে এমন দীপ্তি…যেন হাজার বছর ও ওর জীবনের আকাঙ্ক্ষার থেকে তুচ্ছ…!আর তা হবে নাই বা কেন…! চারপাশে যে শুরু হয়ে গিয়েছে আর্থার আর মুইসকা কন্যা জুলিয়া র বিয়ের উৎসব…!দুজনের মন দেওয়া নেওয়ার সুমধুর পর্ব আমার চোখে পড়েছিল আগেই…আজ তা‌ পরিণতি পেল।

আর্থার ওর নিঃসঙ্গ জীবনে এমন ফুলের মতো সুন্দর একটি মেয়েকে সাথী হিসেবে পেয়েছে… এটা দেখে আমার খুবই ভালো লাগল। ব্রিটিশ ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে অভ্যস্ত আর্থারের মুখে আধো আধো চিবচা ভাষা শুনতে খাসা লাগছিল আমার…!

অন্যদিকে… দীর্ঘ চারশো বছর ধরে মুইসকা গ্রামবাসীদের মনে যে ভ্রান্ত ধারণা সযত্নে পালিত হয়ে আসছিল…তার অবসান হল। চারশো বছর আগে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হয়ে মুইসকা প্রজাতির যে হতভাগ্য মানুষেরা মারা গিয়েছিল…রাজা হুনজাহুয়ার সাধনার ফলপ্রসূ সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ওই বিদেহী আত্মারা…পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেওয়ার পূর্ব মুহূর্তে… এখানকার বাতাসের প্রতিটি কণার সাথে হঠাৎ জেগে উঠেছিল।আজ এই মানুষরা জেনেছে…রাজা হুনজাহুয়ার মাহাত্ম্য ও আত্মত্যাগের কথা…!তার ই সাধনার ফলপ্রসূ…দীর্ঘ চারশো বছর পরে এখানে জেগে উঠেছেন দেবতা বোচিকা… এবং চিরতরে নিদ্রিত হয়ে গিয়েছে অপদেবতা হুইতাকা…!আর কোনোদিন এই গ্রামে হুইতাকা কে বলি প্রদান করার জন্য ঝরাতে হবে না অল্পবয়সী কুমারী মেয়ের শিরশ্ছেদের রক্ত…! গোটা গ্রাম জুড়ে… ছেয়ে গিয়েছে এক অনাবিল খুশির স্নিগ্ধ বাতাস…!

গ্রামের ঠিক মাঝখানে… রাজা হুনজাহুয়ার নামে একটি বেদী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।সেখানে এখন গ্রামের মানুষেরা রাজার কাছে নিজেদের ভক্তি…ও পূজা… অর্ঘ্য দেয় নিয়মিত।

মুইসকা প্রজাতির গ্রামের মানুষদের সাথে… আনন্দ উৎসবে সামিল হয়ে… কাটিয়ে দিলাম বেশ কিছুদিন।তারপর… আর্থার আর জুলিয়া… এবং আমি… একসাথে… দক্ষিণ আমেরিকার ভূখন্ড কে বিদায় জানিয়ে…পাড়ি দিলাম নিজেদের মাতৃভূমি র অভিমুখে…!

আর্থার জুলিয়া কে নিয়ে চলে গেল ব্রিটেনে…ওর নিজের বাংলোয়…আর আমি ফিরে এলাম কলকাতায়…!কলকাতায় ফিরে… আমি নতুন করে জীবন শুরু করলাম। সঙ্গে করে আনা স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি ওই বাক্সটা আমার সাথেই ছিল।ওই স্বর্ণমুদ্রা বিক্রি করে… আমি একটা সুবিশাল বাংলো কিনলাম…আর সেই সাথে… নিজের একটা ব্যবসা দাঁড় করিয়ে নিলাম। এরপরেও আমার কাছে অতিরিক্ত স্বর্ণমুদ্রা ছিল। সেগুলো আমি গরীব দুঃখীদের দান করে দিলাম। দীর্ঘ ষাট বছর পেরিয়ে গিয়েছে…।আমি বৃদ্ধ হয়েছি। এখন আমি শুধু অপেক্ষা করে রয়েছে আমার বন্ধু র জন্য…যে আমার কাছে আসবে বলে আমায় কথা দিয়েছিল। আমার কাছে যে সোনার শহরের প্রবেশ দ্বারের চাবি গচ্ছিত রেখে গিয়েছিল…!আমাকে যে সেটা তার হাতে তুলে দিতে হবে…! তাহলেই যে আমার মুক্তি…!”

উদাস কন্ঠে দেবজ্যোতি চক্রবর্তী… আকাশের দিকে চেয়ে কথাগুলো বললেন।

রনি,টুকাই আর রিমঝিম… অপার বিস্ময় নিয়ে মুখ চাওয়া চাওয়ি করল…! জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে গোল থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদ…!

তার সামনে দিয়ে উড়ে গেল কয়েক টা রাতচরা পাখি…!

টুকাই এবার একটা প্রশ্ন না করে আর পারল না।সে গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠল…”আচ্ছা দাদু…তার মানে… সোনার শহরের প্রবেশ দ্বারের চাবি এখনো রয়েছে তোমার কাছে?”

— হ্যাঁ দাদুভাই…!

—“এইবার বুঝতে পারলাম… আমার বাবা কাকা সবাই ফিসফিসিয়ে সব সময় যে আলোচনা করেন…তার আসল রহস্য…!

রনি বলে উঠল…

—“হ্যাঁ… ঠিক বলেছিস… ওঁরা মাঝে মাঝেই ফিসফিস করে বলাবলি করেন… দাদুর কাছে নাকি এমন কোনো গুপ্তধন রয়েছে…যা হাতে পেলে নাকি তারা আরো মস্ত ধনী হয়ে উঠবে…! তবে এখন আমি বুঝতে পারছি…ওনারা কিছু টা আভাস পেয়েছেন মাত্র… কিন্তু সবটা জানেন না।

— হ্যাঁ ঠিক বলেছিস… সবটা শোনার পর…এখন আমি বুঝতে পারছি…দাদু… আমাদের বাবা….কাকার থেকে চরিত্রগত দিক দিয়ে কতখানি আলাদা…! দাদুর কাছে লুক্কায়িত যে গুপ্তধন হাতে করার জন্য তাঁরা এতটা উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন…তার বিশালতা সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই তাঁদের…!”

—“হ্যাঁ… ঠিক বলেছিস…!

দেবজ্যোতি বাবু হঠাৎ বলে উঠলেন… “আচ্ছা… এখন অনেক রাত হয়েছে…তোমরা এখন যার যার ঘরে যাও…কেমন… আমার এখন বড়ো ঘুম পাচ্ছে… আমি এখন একটু ঘুমোব।”

রনি অবাক হয়ে বলে উঠল…এই অসময়ে ঘুম পাচ্ছে তোমার দাদু?”

—“হ্যাঁ দাদুভাই… বড়ো ঘুম পাচ্ছে… আমি এখন দরজা জানালা বন্ধ করে একটু ঘুমোব।”

রনি, টুকাই আর রিমঝিম বলে উঠল…”আচ্ছা ঠিক আছে দাদু…আমরা এখন আমাদের ঘরে গেলাম।পরে খাওয়ার সময় হলে তোমাকে ডাকব।”

বিছানা থেকে ওরা নামতে যাবে…এমন সময়ে ওরা দেখল… দাদুর নতুন অতিথি হুনজু… বিছানায় ঘুমিয়ে একেবারে কাদা হয়ে গিয়েছে।দাদু বললেন…”ও থাক এখানে…এই বিছানাতেই ঘুমোক আমার সঙ্গে…! তোমরা এখন এসো…!”

টুকাই বলল…”আচ্ছা ঠিকাছে… আমরা তাহলে এখন ঘরে গেলাম দাদু…!”

কারেন্ট তখনো আসেনি। চারপাশে যেন শুরু হয়েছে অন্ধকারের রাজত্ব…!

একটু পরেই মা কাকিমা রা রাতের খাবারের জন্য ডাক দেবেন।ওরা ঘর থেকে বেরোতেই…দাদু সাথে সাথে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। টুকাই নিজের ঘরে ফিরে তো এল… কিন্তু একটা খটকা ওর মনে তৈরি হয়েছে ইতিমধ্যে। মনটা ভীষণভাবে খচখচ করছে ওর। দাদুর ঘরে… তাঁর বিছানায় শুয়ে বছর আটেকের যে বাচ্চা ছেলেটা এখন ঘুমিয়ে রয়েছে…তার নাম টা ভারি অদ্ভুত…”হুনজু”…!

এতক্ষণ ধরে দাদু ওদের যে কাহিনী শোনালেন…সেই সবকিছুর সঙ্গে এই নামের যেন একটা অদ্ভুত সংযোগ রয়েছে…!

ওর মনের খচখচানিটা এতটাই তীব্র হল…যে আর থাকতে না পেরে ও পা টিপে টিপে ফের দাদুর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দাদুর ঘরের সব দরজা জানলা এখন বন্ধ। টুকাই দাদুর ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে… আস্তে করে দরজার সাথে লাগোয়া জানলার পাল্লা টা খুলে ফেলল নিঃশব্দে…!এই জানলার ছিটকিনি টা খারাপ হয়েছে কদিন হল।সারাব সারাব করে সারানো টা আর হয়ে ওঠেনি।এই ভুলটাই আজ টুকাই এর সামনে খুলে দিল এক অপার্থিব দুনিয়ার দরজা…! জানলার পাল্লা টা নিঃশব্দে সরিয়ে ও যা দেখল…তাতে ওর পিঠ দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল যেন…!ও দেখল…হুনজু নামের আট বছরের বাচ্চা ছেলে টার সারা শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে এক অদ্ভুত দ্যুতি…যা ঘরের ভিতর টা আলোয় আলোকিত করে তুলেছে।ওর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দাদু।ওর হাতে তুলে দিচ্ছেন সূর্যের মতো দীপ্তি পূর্ণ একটি উজ্জ্বল সোনার চাবি।সবটা বুঝতে…টুকাই এর আর বাকি রইল না।রাজা হুনজাহুয়া এক আট বছরের বালকের ছদ্মবেশে… দীর্ঘ ষাট বছর পরে… দাদুর সামনে এসে… দাদুর কাছে দীর্ঘ ষাট বছর ধরে সযত্নে সংরক্ষিত থাকা সোনার শহরের প্রবেশ দ্বারের চাবি নিজের হাতে তুলে নিচ্ছেন…!

বিস্ময়ে টুকাই এর সারা শরীরে শিহরণ খেলে গেল।ও দেখল… ধীরে ধীরে দাদুর পার্থিব শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে তাঁর বিদেহী আত্মা…!বালক রূপী রাজা হুনজাহুয়া দাদুর বিদেহী আত্মার দিকে বাড়িয়ে দিল নিজের হাত… তারপর হাত ধরাধরি করে… দুজনের অপার্থিব বায়বীয় সত্ত্বা… জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল…!

পরদিন সকালে এই চক্রবর্তী পরিবার জুড়ে নেমে এল শোকের অন্ধকার…!না… দাদুর এমন অকস্মাৎ মৃত্যু নিয়ে টুকাই এর বাবা মা… কাকা… কাকিমা… কারোর ই খুব একটা শোকতাপ ছিল না। সকলে দাদুর ঘরে গিয়ে তাকে অচৈতন্য অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে… ওরা সবাই ডাক্তার কে খবর দেয়। ডাক্তার এসে জানায়… দেবজ্যোতি চক্রবর্তী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন অনেক আগেই…!এটা শোনার পর… দাদুর দেহ সৎকার করে ফেলতে ওঁরা সময় নেননি একেবারেই…! কিন্তু আসল শোকের সময়টা তখন ই এল… যখন দাদুর ঘরখানা ছত্রাকার করে তল্লাশি চালিয়েও ওঁরা শেষ পর্যন্ত কোনো গুপ্তধনের সন্ধান পেলেন না…!

টুকাই এতে মনে মনে খুশি হল।

পরে রাতের অন্ধকারে ও চুপিসারে আবার এল দাদুর এই ঘরে।সামনের সপ্তাহ থেকেই এই ঘরখানা মেরামত করে…নতুন আসবাবপত্র দিয়ে একদম নতুন করে সাজানো হবে। পারিবারিক ব্যবসার কাঁচামাল রাখার অতিরিক্ত একটি গুদাম ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হবে এই ঘরটাকে।

টুকাই জানে। কদিন পর থেকে এই ঘরের সবকিছু পাল্টে যাবে। এখনো এই ঘরে রয়েছে একটা চেনা গন্ধ।এই গন্ধ টা আসলে ইমানদারির গন্ধ।… সারাজীবন ধরে মেরুদন্ড সোজা রেখে চলা একজন সৎ মানুষের স্পর্শ মাখা বাতাসের স্নিগ্ধতা এই ঘরের বাতাসের পরতে পরতে…! টুকাই এর মনে হল…এই ঘরের বাইরের চারপাশে দূষিত বাতাসের প্রাচুর্যে…এই ঘরের ভিতরকার এক টুকরো বাতাস বড়ই দুর্লভ…!এই ঘরের ভিতরে…টুকাই একটা লম্বা শ্বাস নিল প্রাণভরে…!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *