বৌ নয় সঙ্গিনী
(পর্ব – বারো).
গড়িয়াহাট মার্কেটে, এক মাছওয়ালার কাছ থেকে মাছ কিনছিলাম। শান্তা আমাকে দেখতে পেয়ে বলল, কেমন আছেন দাদাবাবু?
– চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি শান্তা।
অনেকদিন পর শান্তাকে দেখলাম। পরনে একটা সবুজ রঙের ডুরে শাড়ি। কপালে সিঁদুর। চুলগুলি যন্ত করে আঁচড়ে খোঁপা বাঁধা। আগে ওকে আমি আগে দেখতে পাইনি।
– ভাল। তুমি কেমন আছ?
– ভাল আছি।
– কপালে সিঁদুর দেখছি। বিয়ে হল কবে?
– মাস তিনেক আগে।
– কার সাথে?
আমি যে মাছওলার কাছ থেকে মাছ কিনছিলাম, তাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে লাজুক হাসল। তারপর মাছের বাজারের মধ্যেই নীচু হয়ে আমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল।
– থাক থাক। বলে আমি ওর হাত ধরে উঠিয়ে দাঁড় করালাম।
উঠে দাঁড়াতেই আমি তার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলাম।
– সুখি হও।
তারপর মাছের দাম মিটিয়ে দিয়ে, ভালো থেকো, বলে একগাল হেসে বিদায় নিয়ে, অন্যান্য টুকটাক বাজার সেরে ফ্যাটে ফিরে এলাম।
মন যে কখন কি চায়, বোঝা দায়। সেদিনই রাতে স্বপ্ন দেখলাম। শান্তা আমার ঘরের কাজ করছে। আমি লুকিয়ে তার যৌবন দেখছি। লেখার কাজে মন বসাতে পারছি না। আমার ভিতরের লম্পটটা জেগে উঠতে চাইছে। এমন সময় লালী এসে আমাকে বলল, কি দেখছো, ওভাবে লুকিয়ে।
আমি তার কাছে ধরা পড়ে গিয়ে, নির্লজ্জের মতো হেসে বললাম, ওর যৌবনের আকর্ষণ তোমার চেয়ে বেশি কিনা, তাই দেখে বোঝার চেষ্টা করছিলাম।
– কি বুঝলে?
– তোমারটাই বেশি।
– আমার মন রাখার জন্য বলছ?
– একদম না। সত্যিই তোমার যৌবন ওর চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়।
– সত্যি।
– তিন সত্যি।
শুনে লালী এসে আমার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
স্বপ্নটা আচমকা ভেঙে গেল। জেগে উঠে দেখি লালী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। ম্যাক্সিটা এলোমেলো হয়ে হাঁটুর উপরে উঠে গেছে। তবু কী অপরূপ পবিত্র ও নিষ্কলঙ্ক দেখাচ্ছে ওর মুখখানা। ঠোঁট দুটি সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। ফাঁকটুকুতে ঠোঁট ছোঁয়াবার লোভ সমলাতে পারলাম না। তাতে ও জেগে উঠে, আমার মুখের দিকে একটুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। তারপর ক্রীয়াশীল হয়ে উঠল। আমি চোখ বুঁজে শান্তাকে মনে মনে খুঁজবার চেষ্টা করলাম। শান্তা কি এমন ভাবেই তার বরকে আদর করে? জানি না। আমি চোখ খুলে লালীকে দেখলাম। এ যেন আমার কাছে একটা মজার খেলা হয়ে উঠল। চোখ বুঁজলে শান্তা। চোখ খুললে লালী। এই খেলা খেলতে খেলতে আমি ভাবতে লাগল। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত চাকরীজীবী যেভাবে তার সঙ্গীনীকে আদর করে, মাছওলাও কি সেভাবেই আদর করবে শান্তাকে? নাকি ভিন্ন রকমভাবে? অবনীবাবু কিভাবে উপভোগ করত লালীর আদর, আমি জানি না। তবে আমি যেভাবে লালীকে উপভোগ করি, তাতে নিজের ভিতরে লালী কি দু’জনের মধ্যে কোনও পার্থক্য অনুভব করে? ব্যাপারটা আমায় বেশ ভাবিয়ে তুলল। ভেবে ভেবে, আমি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলাম। লালী সেটা টের পেয়ে বলল, কি হল?
আমি বললাম, অবনীবাবু তোমাকে কিভাবে আদর করত?
– কি হবে তোমার জেনে?
– আমিও তবে, তোমাকে সেভাবে আদর করে সুখি করতে চাই।
– আমাকে সুখি করতে চাও? লালী গভীর দৃষ্টিতে আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে রইল। চোখে রহস্যময় হাসি। আমি তার চোখের অতল গভীরে ডুবে যেতে থাকলাম। ডুবে যেতে যেতে ভাবতে লাগলাম। ব্যক্তিত্ব বদলে গেলে কি কামনার ভাষা কিংবা আচরণও সেই ভাবে বদলে যায়? আমি জানি না।
প্রথমে মজার খেলা হিসাবে নিয়ে, অভ্যাসটা শুবু করার পর আমি এমনভাবে এ খেলায় আসক্ত হয়ে পড়লাম যে, সেটা শেষপর্যন্ত নেশায় পরিণত হল। লালীর ভিতর নানা নারীকে প্রতিষ্ঠা করে আমি লালীর মাধ্যমে তাদের সঙ্গে মিলনে যৌন তৃপ্তি খুঁজতে লাগলাম। আমার ভিতরে নিজের অজান্তেই একটা বিকৃত বাসনার সৃষ্টি হল। নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগল। লালীর সাথে আগের মতো আর স্বাভাবিক আচরণ করতে পারি না। এখন ওকে আমার একটা যৌন উপাচার ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। আগের মতো তেমন আর আকর্ষণ বোধ করি না ওর ভালবাসার প্রতি। বরং মাঝে মাঝে অকারণে ওকে নিষ্ঠুরভাবে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাই মনে মনে। আমার এই ধরণের বিকৃত রুচি ক্রমশ আমার ভিতরে ডাল-পালা ছড়াতে লাগল। আগের আমি আর এই আমির মধ্যে অনেক তফাৎ, আমি নিজেই মনে মনে টের পাই।
লালীও হয়তো সেটা অনুভব করতে শুরু করেছে। সেও আর আগের মতো আমার কাছে সহজ স্বাভাবিক হতে পারে না। আমাদের মাঝখানে যেন একটা অদৃশ্য আড়াল তৈরি হচ্ছে।
(পর্ব – তেরো).
সকালে ঘুম থেকে উঠে, বাথরুমে ঢুকে, আয়নায় চোখ পড়তেই, নিজের মুখটা দেখে চমকে উঠলাম। এ কার মুখ? লম্পটের মতো দেখতে, কামুক দুষ্টি, একটা ধর্ষক যেন।
না আমি কাউকে ধর্ষণ করিনি। সে সাহস আমার নেই। বরং আমি প্রকাশ্যে ধর্ষণের প্রতিবাদ করছি। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল, ভীরু স্বভাবের বলে মনে মনে আমি অনেককে ধর্ষণ করছি কল্পনায়। সেটা বিচারাধীন বিষয় নয়। কারণ, তার কোন প্রমাণ বা সাক্ষী নেই। আমিই একমাত্র সাক্ষী। কেউ কি কখনও নিজের বিরুদ্ধে প্রমাণ দাখিল করে? আমি জানি না। তবে আমি করতাম না।
সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। সন্ধ্যাবেলা অফিস থেকে বাড়ি ফিরে, বাথরুমে ঢুকে ভিজে জামা প্যান্ট ছেড়ে রেখে, গীজার চালিয়ে গরম জলে স্নান করলাম। বেরিয়ে এসে ভাবলাম, লালীকে বলি চা করতে। তারপরেই মনেহল, না চা নয়। দু’পেগ হুইস্কি খেলে শরীরটা চাঙ্গা লাগবে। লালী রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত ছিল।তাই তাকে কিছু না বলে, নিজেই ফ্রীজ থেকে হুইস্কির বোতল বের করে এনে, লেখার টেবিলে বসলাম। তাকে বললাম, হাতের কাজ শেষ হলে একটা গ্লাস দিয়ে যেয়ো। একটু পরেই সে একটা গ্লাস দিয়ে গেল। আমি এক পেগ হুইস্কি ঢেলে, তাতে জল মিসিয়ে একটা চুমুক দিলাম। খনিকক্ষণ পরেই লালী একটা প্লেটে করে, চিংড়ি মাছ ভাজা এনে আমার টেবিলে রেখে গেল। যাওয়ার সময় আমি বললাম, তুমি একটু খেলে আর একটা গ্লাস নিয়ে এসো।
– না, আমি খাব না?
– কেন? একটু খাও।
কিছু না বলে সে রান্না ঘরে চলে গেল।
আমি একপেগ শেষ করে, আর একপেগ ঢেলে নিলাম গ্লাসে। জল মেশালাম। আমার মধ্যে বিকারের ভাবটা জেগে উঠতে শুরু করেছে।
এমন সময় লালী রান্নাঘরের কাজ শেষ করে ফিরে এলো।
আমি বললাম, রাতে কি রান্না করলে?
– চিংড়ি পোলাও।
– বাহ্। তোমার জন্য একটা গ্লাস নিয়ে এসো।
– আমি খাব না।
– কেন?
– ইচ্ছে করছে না।
– খুব যে সতীপনা দেখাচ্ছ যে।
আমি হাল্কা নেশার আমেজে অপমান করার জন্যই কথাটা বললাম তাকে।
লালী ক্ষণকাল স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, তুমি এভাবে কথা বলছ কেন, কি হয়েছে তেমার? তুমি তো আগে কখনও এভাবে কথা বলতে না।
– কি হবে আবার?
– তুমি দিন দিন কেমন ধারা হয়ে যাচ্ছ যেন।
– কেমনধারা?
– অন্যরকম।
– কি রকম?
– তুমি আর তোমার মধ্যে থাক না মনেহয়।
– কি করে বুঝলে?
– তোমার কথাবার্তা শুনে, তোমার আচরণ দেখে।
– কেমন আচরণ?
– এই যেমন কথাটা বললে এখন। আগে কখনও এভাবে তুমি কথা বলতে না। তা’ছাড়া আজকাল তুমি সহবাসের সময়ও এমন আচরণ কর, তখন তোমাকে দেখে মনেহয় তুমি নয়, তোমার ভিতরে থেকে অন্য কেউ সেটা করছে।
– অন্য কেউ মানে?
– কোনও রিক্সাঅলা, ঠেলাঅলা …
– মাছঅলা? আমি বললাম।
– হুম।
– আগে কখনও বলনি তো?
– বলব কি? তোমার আচরণ অনুভব করতাম। আর ভাবতাম এটা কেমন করে হয়? আর ভাবতাম, হয় তো এটা আমারই ভুল। তাই আর কিছু বলতাম না তোমায়।
লালী বুঝতে না পারলেও, আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু নিজের অপরাধের কথা তার কাছে স্বীকার করতে পারছি না সংকোচে। আমার এই স্খলন থেকে, আমার নিজেকেই উদ্ধার করতে হবে। না হলে তো আমি সত্যিকারে বেজন্মা হয়ে যাব।
আমি গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে, গ্লাস টেবিলে নামিয়ে রেখে, লালীকে হঠাৎ বললাম, দার্জিলিং যাবে?
– মানে?
– হ্যাঁ, হঠাৎই ইচ্ছে হল, পাহাড়ে ঘুরতে যাবার।
– কবে যাবে?
– সামনের সপ্তাহে।
– বেশ। এখন খাবার বাড়ব?
– হ্যাঁ, বাড়।
লালী চিংড়ি পোলাও বাড়তে রান্নাঘরে চলে গেল।
পরদিন আমি অফিসে গিয়ে সাত দিনের জন্য ছুটির দরখস্ত করে দিলাম। এক ট্রাভেল এজেন্টের কাছ থেকে পদাতিক এক্সপ্রেসের স্লিপার-কোচের দু’টি টিকিট বেশি দাম দিয়ে কিনে নিলাম। হাওড়া থেকে এন জি পি যাওয়ার জন্য। সেখান থেকে দার্জিলিংয়ের তিনচুলা (হাম তুকদহ খাসমহাল) যাওয়ার জন্য এজেন্ট মারফত গাড়িও বুক করে নিলাম।
যাওযার জন্য প্রস্তুত হয়ে, একটা বড় ব্যাগের মধ্যে অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিষের সঙ্গে, দু’জনের গরম জামা কাপড় সহ ‘ওল্ড মঙ্ক’-য়ের দু’টি বড় বোতল ভরে নিলাম।
(পর্ব – চোদ্দ).
সমস্ত জিনিশ আগেই ছোটব্যাগে গুছিয়ে রাখা হয়েছিল। নতুন টুথব্রাস, পেষ্ট, সাবান-শ্যাপু, দাড়িকাটার ব্লেড-রেজার, কয়েক রকমের বিস্কুট ও চিপসের প্যাকেট প্রভৃতি নানা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। দু’টো ব্যাগ হয়েছে। একটি বড় আর একটি ছোট। একটি ট্যাক্সি নিয়ে রাত পৌঁনে এগারোটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম শিয়ালদহ। এগারোটা কুড়িতে গাড়ি, পদাতিক এক্সপ্রেস। বারো নম্বর প্ল্যাটফর্মে গাড়ি। কুলির মাথায় দু’টি ব্যাগ চাপিয়ে, এগারোটা দশের মধ্যে ট্রেনের ভিতরে ঢুকে নিজেদের সিট দু’টি খুঁজে পেয়ে বসে পড়লাম। ট্রেন ছাড়ল নির্ধারিত সময়ই। রাতের ট্রেনের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার মতো কিছু নেই। এন জি পি – তে এসে পৌঁছালাম সকাল সোয়া-ন’টায়। সেখানে গাড়ি বলা ছিল। সে আমাদের আগেই এসে সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। তাকে ফোন করায়, সে এসে আমাদের স্টেশন থেকে গাড়িতে তুলে নিল। গাড়ি চলকের নাম তার সুদেন তামাং। সুদেন তামাংয়ের মাথায় মেয়েদের মতো বড় বড় চুলগুলি মাথার উপরে ঝুঁটি করে বাঁধা।
তা দেখে লালী আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। আমি ইশারায় জানতে চাইলাম, কী? লালী ফিসফিসিয়ে বলল, কাকাতুয়া পাখির মতো মাথায় ঝুঁটি। ওর কথা শুনে আমিও হাসলাম। সুদেন তামাংয়ের বয়ম ছেচল্লিশ বছর,পঁচিশ বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছে। পাকা হাতের গাড়ি চালক। সে শিলিগুড়ি বাইপাশ হয়ে সেবক রোড ধরে, পাহাড়ের পাক খাওয়া চড়াই উৎড়াই পথ ঘুরে ঘুরে উঠতে লাগল। বাইরের মনোরম দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে, গাড়ির ভিতরে তন্ময় হয়ে, লালী ছবির মতো বসে ছিল। আমি ওর তন্ময়তা ভাঙালাম না। আমি দেখলাম, আকাশ তখন ঝকঝকে নীল। ড্রাইভার সুদেনের কাছে শুনলাম, দু’দিন আগেও নাকি এখানে বৃষ্টি হয়েছে। সেবক রোড পেরিয়ে গাড়ি যত উপরে উঠতে লাগল তত হিমল বাতাসের ধার বাড়তে লাগল। এরপর তাগদা ছাড়িয়ে আরও উপরে প্রায় সাড়ে আট হাজার ফিটের মতো উঁচুতে উঠ আমরা তিনচুলে হাম তুকদহ খাসমহালে এসে পৌঁছালাম। নির্ধারিত বুক করা ‘কৃপা-কুটি’ স্টে-হোমে (হাম তুকদহ খাসমহাল) বিকেল সাড়ে তিনটার সময়। সেখানকার মালিক রাজা রাই অমায়িক মানুষ। আমাদের সাদর আমন্ত্রণ জানলন পরম আত্মীয়ের মতো। জিজ্ঞাসা করলেন, চা খাবেন তো? বললাম, দিন। তারপর দু”জনে সেখানে এক কাপ চা খেয়ে, গীজারের গরম জলে বাথরুমের কাজ ও স্নান সেরে, আমরা খেতে বসলাম বিকেল চারটায়। খেলাম ভাত ডাল আলুভাজা পটলের তরকাড়ি আর ডিমেরকারি। খেয়ে দেয়ে টানা একঘুম দিলাম। দরজার কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙল ছ’টায়। দরজা খুলে দেখি চা আর গরম গরম মো মো নিয়ে রাজা রাই নিজেই হাজির হয়েছে দরজায়। সেগুলি তাকে টেবিলে রাখতে বললাম।
তারপর হাত মুখ ধুয়ে, সেগুলি তৃপ্তি করে খেয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে আমাদের ঘুমের জড়তা কাটল যেন অনেকটা। ভেবে ছিলাম এরপর বাইরে থেকে একবার ঘুরে আসব। কিন্তু বাইরে এত ঠান্ডা, বেরোবার উপায় নেই, ভীষণ ঠান্ডা, হাড়ে কাঁপুনি ধরে যায়। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি এখন। একটু আগেই সুবীর সান্যাল ফোন করে জানিয়েছে, কলকাতায় ২৮/৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা। কলকাতার লোকেরা গরমে ঘেমে উঠছে এখন । আর এখানে এখন তাপমাত্রা ১০/১১ ডিগ্রি। হিমশীতল পরিবেশ। তাছাড়া রাস্তা ঘাট বিপদসংকুল হওয়ায় সন্ধ্যার পর সাধারনতঃ এখানে কেউ আর তেমন কলকাতা শহরের মতো ঘুরতে বের হয় না। তাই ঘরে বসে মোবাইল খুলে বসলাম। সাড়ে আট হাজার ফিট উচ্চতার কারণে
দেখি নেট কাজ করছে না, বড় স্লো। চাকা ঘুরে যাচ্ছে তো ঘুরেই যাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে তোলা ছবিগুলি দেখতে লাগলাম। হঠাৎ লোড শেডিং হয়ে গেল। এখানেও তাহলে লোডশেডিং হয়? কোনও ধারণা ছিল না আমাদের। কিছুক্ষণ পর অবশ্য বিদ্যুৎ ফিরে এলো। এখন মাত্র সাড়ে সাতটা বাজে ঘড়িতে। ঠান্ডার মধ্যে আর কিছু করার নেই দেখে, লালীকে বড় ব্যাগ খুলে একটা বোতল বের করতে বললাম। আর আমি বিছানায় শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে আমার ভাগ্যের কথা ভাবতে লাগলাম। যার রাস্তায় মরে যাওযার কথা ছিল, অন্ততঃ তার জন্মদাত্রীর সেরকমই চেয়েছিল। অথচ আদি-ভৌতিক প্রকৃতির কী বিচিত্র লীলা। সে এখন বিয়ে না করেও, অবনীবাবুর বউকে নিয়ে দার্জিলিংয়ে ঘুরতে এসেছে।
লালীকে আমি কতটা ভালবাসি জানি না, লালী আমায় খুব ভালবাসে বুঝতে পারি। ওর ভিতরে একটা প্রাণবন্ত মন আছে, যে কারণে সে নিজেকে সব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে, আনন্দে বিষাদে দুঃখে আন্তরিক ভাবে বাঁচতে জানো। যা অনেকে পারে না নানা রকম সংস্কারের কারণে, লালীর ভিতরে সেটা নেই।
ট্রেনের হকারের গরীর সংসারের একজন আটপৌরে মেয়ে, কেরানির বিয়ে করা বউ, পরপুরুষের সঙ্গে কোনও রকম শর্তহীনভাবে, নিঃসংকোচে দিনযাপন করতে পারে। তার সুখের জন্য মদ্যপানের সঙ্গী হতে পারে। এরকম রমণী আমার কাছে পরম বিস্ময়ের।
লালী ওল্ড মঙ্কের সাড়ে সাতশ’ এম.এলের বোতল আর দু’টো গ্লাস নিয়ে এসে রাখল টেবিলে। তারপর জলের বোতল আনতে গেল। ফিরে এসে সে বোতল খুলে দু’টো গ্লাসে অল্প করে মদ ঢালল। আমাকে বলল, ওঠো। কতটা জল নেবে দেখ।
আমি ভাবনা ঝেরে, বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম।
আমার গ্লাসে একটু কম জল মিশিয়ে, লালীর গ্লাসে একটি বেশি জল মেশালাম। যাতে ঝাঁজটা কম লাগে। দু’জনে নানা কথা বলতে বলতে গ্লাসে চুমুক দিতে লাগলাম। কথায় কথায় গ্লাস খালি হয়ে গেল। আমি দু’টো গ্লাসেই আর এক পেগ করে ঢেলে জল মিশিয়ে নিলাম পরিমাণ মতো।
তারপর গ্লাসে চমুক দিয়ে আমি লালীর কাছে জানতে চাইলাম, আচ্ছা লালী একটা কথা জিজ্ঞাসা করব, তুমি কিছু মনে করবে না তো?
– কি কথা?
– আমার সঙ্গে মিলনের সময় তোমার কখনও অবনীবাবুর কথা মনে পড়ে না?
– হ্যাঁ, পড়ে।
– আমাকে তখন তোমার অবনীবাবু মনেহয়?
– না।
– কেন?
– কেন মনে হবে ? তুমি আর সে আলাদা। দু’জনের দু’রকমের আবেগের প্রকাশ, মননের ভাষাও আলাদা।
– ওহ্ আচ্ছা।
– কখনও আমার সঙ্গে সহবাসের সময়, আমাকে তোমার অন্য কেউ বলে মনেহয়?
লালী আমার কাছে জানতে চাইল।
আমি সত্যি কথাটাই ওর কাছে স্বীকার করলাম।
– হ্যাঁ, হয়। সেই জন্যই আমার ভিতরে একটা বিকারের জন্ম হয়েছে। আমি কি ভাবে এর থেকে মুক্তি পাব, বলতে পার?
– তা আমি কি করে বলব?
– তোমাকে বলতেই হবে লালী, বলে আমি আবেগে তার হাত দু’টো চেপে ধরলাম।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। আমি লালীর হাত ছেড়ে দিয়ে ঘড়িতে দেখলাম ন’টা বাজে।
দরজা খুলে দিতেই রাজা রাইয়ের স্ত্রী ঘরে খাবার দিয়ে গেল। রুটি আর চিকেনকষা সঙ্গে স্যালাড। খুব তৃপ্তি করে খেলাম। চমৎকার হয়েছে রান্না করা মাংসটা।
খেয়ে, হাত-মুখ ধুয়ে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ব্র্যাঙ্কেট গায়ে তুলে নিতেই, উষ্ণতায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমে তলিয়ে গেলাম। ঘুম ভাঙল মাঝরাতে একবার। বাথরুম সেরে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল এরপর সকাল সাড়ে ছ’টায়। লালী তখন ব্র্যাঙ্কেটর ভিতর নিঃসারে ঘুমাচ্ছে। দরজা খুলতেই ধারাল শীতল বাতাস ঢুকে শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। এখন এখানে দশ ডিগ্রি টেম্পারেচার। ঘরে ঢুকে আবার দরজা বন্ধ করে দিলাম। তারপর ব্র্যাঙ্কেটর ভিতর
ঢুকে লালীকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লাম।
সকাল সাতটায় দরজায় টোকা পড়ল। রাজা রাই ঘরে এসে চা আর গরম গরম লুচি দিয়ে গেল। চা লুচি খেয়ে প্রাত্যহিক কর্ম সেরে নিলাম। তারপর আটটায় টিফিন এলো পুরি আর আলু মটরের তরকারী। খুবই সুস্বাদু হয়েছে খেতে। খেয়ে নিয়ে তৈরী হয়ে নিলাম। সাড়ে আটটায় আসবে সুদেন তামাং গাড়ি নিয়ে। আজ সে দেখাতে নিয়ে যাবে – গুম্বা ডেরা, লাভার মিট পয়েন্ট আর টি-গার্ডেন। হঠাৎ সে খবর পাঠাল, তার বমি পায়খানা হচ্ছে। শরীর খারাপ লাগছে, আজ সে আসতে পারবে না।
আমি লালীকে বললাম, কি করবে?
– চল, আমরা নিজেরাই হেঁটে হেঁটে কিছুক্ষণ কাছাকাছি কোথাও থেকে ঘুরে আসি।
– বেশ চলো।
আমি থামস্ আপের খালি বোতলে খানিকটা ওল্ডমঙ্ক ঢেলে, জল মিশিয়ে নিলাম। বোতলটা কাঁধের ঝোলা ব্যাগে ভরে নিলাম। তারপর ঘর লক করে ঘুরতে বের হলাম। বের হবার সময় রাজা রাইয়ের স্ত্রী জানতে চাইল, আপনারা ফিরেবেন কখন?
– কখন ফিরলে সুবিধা হবে?
– বারোটার মধ্যে রান্না হয়ে যাবে। এর মধ্যে ফিরে এলে গরম গরম খাবার পাবেন।
– বেশ, বারেটার মধ্যেই ফিরব।
কিছুক্ষণ আশেপাশে ঘুরে ফিরে, দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে থামস্ আপের খালি বোতলে ভরা, ওল্ডমঙ্কটুকু চুমুকে চুমুকে শেষ করে, বেলা বারোটার আগেই ঘরে ফিরে এলাম। গরমজলে স্নান সেরে, অল্পক্ষণ বসার মধ্যেই ডাইনিং রুমে যাবার জন্য ডাক এলো। মুগের ডাল, ঝিরিঝিরি কাটা আলুভাজ, আলু কুমড়ার ছক্কা আর মুরগির মাংসের কারি দিয়ে, তৃপ্তি করে দু’জনে খেয়ে ঘরে ফিরে এলাম।
(পর্ব – পনেরো).
পরের দিন দশটার সময় সুদেন তামাং গাড়ি নিয়ে এলো। আমি আর লালী এককাপ করে চা খেয়ে, গিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। কাঁধের ঝোলা ব্যাগে ওল্ডমঙ্কের বোতলটা ভরে নিয়েছিলাম।
আমাদের গড়ি চড়াই উৎড়াই রাস্তা দিয়ে পাহাড়কে প্রদক্ষিণ করে নীচে নামতে লাগল। দু’পাশে সারি সারি পাইনের বন, সেদিকটা খাদের দিক উল্টো দিকে খাড়া পাহাড় উঠে গেছে। মাঝখান থেকে পাহাড় কেটে সরু রাস্তা করা হয়েছে। এতটা সরু যে একটা গাড়ি চলার মতো। উপর থেকে যদি কোন গাড়ি নীচে নেমে আসে ,তখন উপরে ওঠা কোন গাড়ি সেই গাড়িটাকে দেখে খাদের গা ঘেষে একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, সেই গাড়িটাকে নামার রাস্তা করে দেওয়ার জন্য। এই ভাবে অনেক সময় পাঁচ- সাতটা গাড়ির লাইনও পড়ে যায় নীচে নামার। উপরের গাড়িগুলি নীচে নেমে যাওয়ার পর নীচের গাড়িগুলি উপরে ওঠা শুরু করে সারি সারি ভাবে। আগে নীচের গাড়িগুলিকে নামার সুযোগ করে দিতে হয়। কারণ সেই গাড়িগুলিকে নামার রাস্তা করে না দিলে, নীচের গাড়িগুলি উপরে ওঠার সুযোগ পায় না।
পাহাড়ের গায়ে গায়ে কোনও শিল্পীর নিখুঁত আঁকা ছবির মতো সুন্দর করে সাজানো চা- বাগান। দেখে মনেহয় কী মনোরম দৃশ্য। দেখে চোখের আরাম হয়। একবার দেখে আশ মেটে না। বারবার দেখার জন্য অজান্তেই চোখ চলে যায় সেদিকে। আর দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় আপনা থেকেই। এইসব মনোহর দৃশ্য দেখতে দেখতে প্রায় চল্লিশ মিনিট পর এসে পৌঁছালাম গুম্বা ডেরা। সেখান থেকে তাকিয়ে দেখলাম সুদূরে সিকিম পাহাড়ের সারি। তার ওপাশ থেকে পাহাড়ের ধাপ নীচে নামতে নামতে এসেছে ,আর এপাশ থেকে নেমে যাওয়া ধাপ গিয়ে মিশেছে সেখানে। সারি সারি পাইন ফার গাছ ধাপে ধাপে নেমে গেছে। অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। দেখে মন ভরে যায়। এই দৃশ্য থেকে অন্যদিকে চোখ ফেরালে দেখা যায় যে, অন্যদিকে ধাপে ধাপে চা-বাগানের সাজানো সারি যেন ধাপে ধাপে ওপাশের উপর দিকে উঠে গেছে। প্রতিদিনই এই স্পট দেখার জন্য অনেক ট্যুরিষ্ট আসে এখানে। ফলে গড়ে উঠেছে অনেকগুলি চা-সিগ্রেট ও মনোহারী দোকান। সুদেন তামাং গাড়ি সেখানে দাঁড় করালো। আমি আর লালী গাড়ি থেকে নীচে নেমে এলাম। মনিহারী দোকান থেকে এক বোতল মিনারেল ওয়াটার কিনে ওল্ডমঙ্কের বোতলে মিশিযে নিয়ে মিনারেল ওয়াটার বোতলটা ওদের আবর্জনা ফেলার পাত্রের ভিতর ফেলে দিলাম। তারপর লালীকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রকৃতির মুগ্ধ শোভা দেখে এগোতে লাগলাম। মাঝে মাঝে কাঁধ-ব্যাগ থেকে বোতল বের করে চুমুক দিতে লাগলাম। একবার আমি চুমুক দিই, পরের বার লালী। এইভাবে বোতলটা খালি হয়ে গেল। বৃদ্ধসন্ন্যাসীকে আদর করে একটা পাইন গাছের নীচে বসিয়ে রেখে এলাম। আমাদের মনের মধ্য একটা রঙিন আবেশ সৃষ্টি হলো।
আমি একটা গোল্ডফ্লেক সিগারেট ধরালাম। লালীকে বললাম, চলবে নাকি?
– দাও। বলে লালী নিজেই প্যাকেট খুলে, একটা
গোল্ডফ্লেক বের করে নিয়ে, আমার কাছে লাইটার চেয়ে নিয়ে নিজেই লাইটার জ্বেলে ধরাল। তারপর একটা টান দিয়ে, খক্ খক্ করে খানিকক্ষণ কাশতে লাগল। তারপর কাশি থামলে, আবার টানতে লাগল। এই ভাবে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে প্রাকৃতিক অপূর্ব দৃশ্যাবলী দেখার পর, সেখানকার কিছু ছবি তুলে নিয়ে, গাড়ির কাছে ফিরে এলাম।
ফিরে এসে আবার গিয়ে, গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করল, কখনও ডাইনে বেঁকে কখনও বাঁয়ে বেঁকে চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে ‘লাভার্স মিট পয়েন্ট’-এর উদ্দেশ্য। সেখানে গ্রেটার রঙ্গীত নদের সঙ্গে তিস্তা নদীর মিলন ঘটেছে, তাই এই স্থানের নাম ‘লাভার্স মিট পয়েন্ট’ রাখা হয়েছে। সেখানে পৌঁছাতে আধ-ঘন্টার মতো সময় লাগল। এসে নামলাম সেখানে।
আমরা পাহাড়ের নীচের দিকে আছি। নীচের দিকে পাইন ফারের বন। তারও নীচে দেখা দেখলাম, রঙ্গীত নদ এসে তিস্তা নদীর সঙ্গে মিলেছে। দু’টি জলধারা দু’রঙের। একটি গভীর নীল আর অন্যটা হাল্কা ফিকে নীল। অপূর্ব দৃশ্য। অনকেক্ষণ তাকিয়ে রইলাম সেদিকে। চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করছিল না অন্যদিকে। দুটির ধারা যেন নিবিড় ভাবে মিলে-মিশে গিয়ে একটি নতুন রসধারার সৃষ্টি করেছে সেটা আকাশী নীল রঙের।
সেখানে দাঁড়িয়ে লালী কিছু ছবি তুলল সেই সব মনোরম দৃশ্যের। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে সেখানকারই একটি চায়ের দোকানে বসে এক কাপ করে চা খেলাম দু’জনে।প্রতি কাপ দশটাকা করে দাম নিল। অপূর্ব চায়ের স্বাদ, জিবে লেগে থাকার মতোন। দোকানী মহিলার ব্যবহার আপনজনের মতো, কত কালের চেনা আমরা যেন তার পাড়া-পড়শী। চা শেষ করে সিগ্রেট ধরালাম একটা। সিগ্রেট টানতে টানতে প্রকৃতির শোভা মুগ্ধ হয়ে দেখলাম আরও কিছুক্ষণ। চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করছিল না এই সব অপূর্ব মনোেরম দৃশ্যাবলী থেকে।
এখান থেকে বেরিয়ে এবার গন্তব্যস্থল ‘পেশক টী-এস্টেট’। সেখানে পৌঁছাতেও আধঘন্টার মতো সময় লাগল আরও। যখন পৌঁছালাম, দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। সারি সারি চা বাগান। যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুধু চা বাগান পাহাড়ের ধাপে ধাপে নেমে গেছে নীচে দিকে অনেক দূর পর্যন্ত। দু’পাশের চা বাগান দেখতে দেখতে ধাপে ধাপে অনেকটা নীচে নেমে গেলাম আমরা। চারপাশে ও উপরে নীচে চা বাগান দিয়ে ঘেরা আমাদের কিছু ছবি তুললাম মনের সুখে। তারপর আবার ধাপে ধাপে উপরের দিকে উঠে এলাম। এসে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে দেখলাম, কাছেই একটা চা বাগানে একদল মেয়েরা নিপুণ হাতে চা পাতা তুলে পিঠের ঝুড়িতে বোঝাই করছে। সেই দুশ্য দেখে, মনের ভিতরে অদ্ভুত এক খুশির আবেগ ছড়িয়ে পড়ল। নিবিড় সুখে, দু-চোখ যেন সবুজের সজীবতায় ডুবে গেছে। চা শেষ করে একটা সিগ্রেট ধরালাম। সিগ্রেট টানতে টানতে মুগ্ধ আবেশে চা বাগান দেখতে লাগলাম। সিগ্রেট টানা শেষ হলে, সেখানে দাঁড়িয়ে আমরা আরও কিছু ছবি তুললাম। তারপর গাড়িতে এসে উঠে বসলাম।গাড়ি চলতে শুরু করল। এবার ফেরার পালা।
ফেরার সময় পাহাড়ের গায়ে দু-একট কবর দেখতে পেলাম। তা দেখে ড্রাইভার সুদেনের কাছে জানতে চাইলাম, মারা যাবার পর তোমাদের কি কবর দেওয়া হয়?
শুনে সুদেন বলল, না আমাদের দাহ করা হয়। তবে আমাদের মধ্যে অন্য সম্প্রদাযের লোকদের কবর দেওয়া হয়। যেমন আপনারা যেখানে উঠেছেন ‘কৃপা-কুটি’ হোম স্টে-র মালিক রাজা রাইদের কবর দেওয়া হয়। শুনে কিছুটা আশ্চর্য হলাম বইকি ! সে যাই হোক।
গাড়ি পাহাড়ের চড়াইয়ের আঁকা বাঁকা পথ ধরে উপরে উঠতে লাগল। চলার পথ এতটাই সংকীর্ণ যে উপর থেকে কোন গাড়ি এলে আমাদের গাড়িটাকে পাহাড়ের খাদ ঘেষে দাঁড় করাতে হচ্ছে , না হলে উপরের গাড়িটা নামতে পারছে না। আর উপরের গাড়িটা না নামলে আমাদের গাড়িও উপরে ওঠার কোন পথ পাচ্ছে না, এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে বহুবার ফেরার সময়ে। ঘরে এসে পৌছাঁলাম বিকেল চারটার সময়। এরপর গীজার ছেড়ে, গরম জলে দু’জনে একসঙ্গে উদোম হয়ে স্নান সেরে নিলাম। তারপর ভাত ডাল সবজির একটা তরকারি আর মুরগীর মাংসের কষা দিয়ে, খাওয়া-দাওয়া সেরে নিলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমি একটা গোল্ডফ্লেক ধরালাম। লালী ব্র্যাঙ্কেটের ভিতর ঢুকে পড়ল।
(পর্ব – ষোল).
পরদিন সকাল আটটায় দু’জনে ঘুম থেকে উঠলাম। গরম জলে হাত মুখ ধুয়ে, গাজর আর বাঁধা কপির মিক্সড সুপ দিয়ে আলুর পরোটা খেলাম। তারপর চা খেয়ে দু’জনে ঘুরতে বের হলাম সকাল নটার পর। ততক্ষণে গাড়ি নিয়ে এসে হাজির হয়েছে সুদেন তামাং। আজকে দেখবো, ঘুম মসেস্ট্রি, ঘুম টয় ট্রেন স্টেশন, বাতসিয়া লুপ প্রভৃতি জায়গাগুলি।
গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলাম। গাড়িতে যেতে যেতেই চোখে পড়ল টয়-ট্রেন স্টেশন, সেখান থেকে টয়-ট্রেন ছেড়ে, সারা শহর পাঁক খেতে দার্জিলিং পৌঁছায়। তাতে সময় লাগে আট ঘন্টার মতোন। তবে ভাড়াটা খুব বেশি। জন প্রতি আড়াই হাজার টাকা। ইচ্ছে থাকলেও অনেকের পক্ষেই এতটাকা ভাড়া দিয়ে, তাতে চড়া সম্ভব হয় না।
আমাদের গাড়ি এসেে ঘুম মনেস্টিতে পৌঁছাল। গাড়ি থামিয়ে পার্কিং স্টেশনে রেখে, মনেস্ট্রির ভিতরে ঢুকলাম দু’জনে। ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখলাম। দেখে মন ভরে গেল। তবে হেঁটে হেঁটে অনেকটা উঁচুতে উঠতে হয় বলে, কিছুটা কষ্ট স্বীকার করতে হলো।
সব কিছু দেখে, আধঘন্টার মতো সেখানে কাটিয়ে নীচে নেমে এসে (মনেস্ট্রি থেকে বেরিয়ে) ড্রাইভারকে ফোন করলাম, গাড়ি নিয়ে এখানে আসার জন্য। এখান থেকে গাড়িটা অনেকটা দূরে পার্কিং স্টেশন রাখা ছিল।
ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে এলে তাতে আমরা উঠে বসলাম। এবার আমাদের গন্তব্য বাতাসিয়া লুপ। গাড়ি চলতে শুরু করল। চলতে চলতে গাড়ি লবচু মার্কেট পেরিয়ে গেল, তার কিছুক্ষণ পরে এলো সিক্থ ম্যাল মার্কেট। লোকজনের বেশ ভিড় চোখে পড়ল সেখানে। সকলেই তাদের প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র কেনা-কাটায় ব্যস্ত। তার পাশ দিয়েই চলে গেছে টয়-ট্রেনের সরু লাইন। সেই লাইন দিয়ে গাড়িও যেতে দেখলাম। কু ঝিক ঝিক আওয়াজ তুলে কয়লা ইঞ্জিনের গাড়িটা এগিয়ে গেল সামনের দিকে। গাড়িতো মাত্র দু’টি বগি। দেখতে অনেকটা কলকাতায় চলা ট্রামের মতোন। বোধহয় একশো লোকের বেশি ধরে না দু’টি বগিতে। টয়-ট্রেন দেখে আনন্দে-উচ্ছাসে কিশোরীর মতো হাত তালি দিয়ে, লালী বলে উঠল – টয়-ট্রেন, টয়-ট্রেন। সেই অনন্য সুন্দর দৃশ্য আমি মোবাইলে ধরে রাখলাম। এ লালী যেন অন্য কেউ, যে এতদিন একসঙ্গে আমার আছে, সে নয়। প্রাণবন্ত অন্য কিশেরী এক।
কয়লা ছাড়াও ডিজেল ইঞ্জিনের টয়-ট্রেন গাড়িও আছে কিছু। তবে তার সংখ্যা খুব বেশি নয়। কয়লার ট্রেনে ভাড়া দেড় হাজার (১৫০০) টাকা,আর ডিজেল ট্রেনের ভাড়া বারোশ” (১২০০) টাকা। আধঘন্টায় দার্জিলিং শহরের বিশেষ বিশেষ জায়গাগুলি ঘুরিয়ে দেখায়। যেমন, ঘুম মনেষ্ট্রি,বাতাসিয়া লুপ প্রভৃতি।
এসব দেখতে দেখতে এসে পৌঁছালাম বাতাসিয়া লুপে। অপূর্ব দৃশ্য। বাতাসিয়া লুপ দেখে হৃদয়ে এক অপার্থিব অনুভূতির সঞ্চার হলো। কী আশ্চর্য সুন্দর ভাবে প্রকৃতি তার পৃথিবীকে সাজিয়ে রেখেছে। দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। অনেকক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম দু’জনে সেদিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে অনেকগুলি ছবি তুললাম আমরা। তারপর ফিরে এসে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম।
এখান থেকে এবার যাব দার্জিলিংয়ের মোহিত হোটেলে। যেখানে ঘর বুক করা আছে দু’দিনের জন্য। সেখানে দু’দিন আমরা থাকব। এখানে দু’দিন থেকে দার্জিলিং ঘুরে দেখে তারপর কলকাতায় ফিরব। মোহিত হোটেলে এসে পৌঁছালাম বিকেল চারটায়। এখন হোটেলে কোনও খাবার পাওয়া যাবে না, তাই বাইরে থেকে দু’টো চিকেন-রোল কিনে ঘরে ঢুকলাম। গীজার ছেড়ে গরম জলে স্নান সেরে নিলাম দু’জনে। তারপর ঘরে এসে বড় ব্যাগ খুলে, শেষ ওল্ডমঙ্কের বোতলটা বের করে নিলাম। চিকেন-রোল দিয়ে দু’জনেই দু’পেগ করে গ্লাসে ঢেলে খেলাম। তারপর আমি লালীকে জড়িয়ে ধরে কিশোরী প্রেমিকার মতো আদর করতে শুরু করলাম। তখন লালীর মুখ দিয়ে শুধু অস্ফুট স্বরে ‘উমহ্ উমহ্’ আওয়াজ বের হচ্ছিল। যা আমাকে ক্রমশ উত্তেজিত করে তুলছিল। এরপর লালীকে আমি পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানায় গেলাম।
রাত ন’টার সময় হোটেলের অভ্যর্থনা ঘরে (reception room) খাবারের জন্য আমাদের ডাক পড়ল। ভাত, নানরুটি, ছোলা- মটর, পনিরের কারি, চিকেন-কষা, সন্দেশ, রসগোল্লা প্রভৃতি খাবার ছিল। কেউ ভাত, কেউ নান-রুটি, যে যার রুচি মতোন খাবার প্লেটে করে নিয়ে এসে খেতে শুরু করেছিল। আমরা দু’টি করে নান রুটি, আলু-মটর ও চিকেন-কষা, দুটো সন্দেশ প্লেটে করে নিয়ে এসে, খাওয়া শুরু করলাম। খাওয়ার পর লালী বলল, বেশ ভাল রান্না হয়েছে। খাওয়া সেরে, হাত-মুখ ধুয়ে, আমরা রুমে ফিরে গেলাম। কিছুক্ষণ বসে, আমি একটা সিগারেট ধরালাম, সিগারেট টানতে টানতে, আজকের ঘুরে দেখা বিষয়গুলি নিয়ে লালীর সঙ্গে গল্প করতে লাগলাম। তারপর বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম।
পরদিন ভোর তিনটার সময় ঘুম থেকে উঠে পড়তে হলো, গাড়ি আসবে সাড়ে তিনটার সময়। টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখাতে নিয়ে যাবে। তার আগে বাথরুমের সকালের প্রাত্যহিক কাজ সেরে নিতে হল। গাড়ি এল ঠিক সাড়ে তিনটায়। কী ঠান্ডা রে বাবা। যত গরম পোষাক ছিল সব গায়ে জড়িয়ে নিলাম। তার উপরে গায়ে একটা সবুজ শাল জড়ালাম। লালীও তার গরম পোষাক পরে নিয়ে, গায়ে জড়াল একটা লাল শাল। আমরা গিয়ে চড়ে বসলাম গাড়িতে। গাড়ি চলতে শুরু করল, পাহাড়ের গা ঘেঁষে ডাইনে বাঁয়ে আঁকা বাঁকে পথের চড়াই উৎড়াইয়ের বাঁক পেরিয়ে উপরের দিকে। গাড়ি যত উপরে উঠছে ঠান্ডা তত বাড়ছে।
টাইগার হিলে যখন এসে পৌঁছালাম, তখন তাপমাত্রা সাত ডিগ্রি। কনকনে ঠান্ডা হাড়ে বিঁধে যাচ্ছে যেন। হাতের আঙুলগুলি ঠান্ডায় অবশ অসার হয়ে গেছে। নাড়তে পারছি না। হাতে মোবাইল ধরে রাখতে পারছি না আমি। মনে হচ্ছে মোবাইলটা নীচে পড়ে যাবে, এমন অসার আঙুলগুলি। এত কষ্ট করে সূর্যোদয় দেখতে আসা। লালীও কাঁপছে শীতে।
আকাশটা স্বচ্ছ নীল। আবওহাওয়া মনোরম। আধ-ঘন্টার মধ্যে এসে পৌঁছালাম টাইগার হিলে। একটু পরেই সূ্র্যোদয় ঘটল। যে দৃশ্য দেখলাম, তা বর্ণনার অতীত। ধীরে ধীরে সূর্যদেবের আগমন ঘটছে। পাহাড়ের রঙ ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করল। প্রথমে কালো থেকে হাল্কা নীল। তারপর ধীরে ধীরে সবজে নীল। তারপর রূপালী রঙ ধরলো। তারপর কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রথম চূড়া দেখা গেল। সেখানে সূর্যের আলো পড়ে সোনালি হয়ে উঠল। তারপর দ্বিতীয় চূড়াটির মাথায় সোনালি রঙ ধরল। এরপর তৃতীয় চূড়াটি দেখা গেল একই রঙে রঙিন হয়ে উঠল। সব চূড়াগুলিই দেখে এখন মনে হচ্ছে সোনার চূড়া। যেন সোনার মুকুট মাথায় পরে আমাকে দেখা দিল কাঞ্চনঘঙ্ঘা। অপূর্ব চোখ জুড়ানো দৃশ্য। সেই দৃশ্য লালী মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল। অসাধারণ অনুভূতি আমাদের মনের ভিতর। মনের আশ মিটিয়ে সেই দৃশ্য দেখতে বিহ্বল হয়ে পড়লাম। মন ভরে প্রচুর ছবি তুললাম আমরা। তারপর রোদ এসে টাইগারে হিলে পড়তে শুরু করল। তা দেখে সেখানে আরও কিছুক্ষণ কাটিয়ে নীচে নেমে এলাম আমরা।
যা দেখলাম এতক্ষণ ধরে, তা দেখে মনে হল, ভোর থেকে এতক্ষণ ধরে যত কষ্ট সহ্য করেছি, তা যেন সার্থক হয়েছে। লালী বলল, এমন মনোহর হৃদয় মাতানো রূপ এত কষ্ট সহ্য করে এখানে না এলে বোধহয় জীবনে আর কখনোই দেখা হত না।
আকাশ মেঘলা থাকলে, মোটেও কাঞ্চনজঙ্ঘার এই মোহময় রূপ দেখা যায় না। সবই আমাদের প্রতি, প্রকৃতির সদয় অনুকম্পা বটে।
নীচে নেমে এসে সেখানে একটা দোকানে ঢুকে গরম গরম আলুর পরটা আর কফি দিয়ে টিফিন সারলাম আমরা। তারপর একটা সিগ্রেট ধরালাম আমি, আয়েস করে সিগ্রেট টানতে লাগলাম। চোখ এখনও কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ-মোহে বিভোর হয়ে আছে। সিগ্রেট শেষ করে খাবারের দাম মিটিয়ে আমরা দোকান থেকে বেরিয়ে এলাম। ততক্ষণে সূর্য অনেকটা উপরে উঠে গেছে। গাড়ি করে আমরা আবার নীচে নামতে শুরু করলাম ‘মোহিত হোটেল’-য়ে ফেরার জন্য। সাড়ে আটটায় হোটেলে ফিরে এলাম। গীজার ছেড়ে গরম জলে স্নান সেরে নিলাম দুজনে। হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার দেখতে বেরোতে হবে – জাপানিস টেম্পেল (পীস প্যাগোডা), দার্জিলিং জু, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনসটিটিউট, দার্জিলিং জু মিউজিয়াম, HMI মিউজিয়াম, তেনজিং রক আর চিত্রা টি এস্টেট।
(পর্ব – সতেরো).
এগারোটা খাওয়া- দাওয়া সেরে আমরা আবার গাড়ি নিয়ে বের হলাম। প্রথমে গেলাম জাপানিস টেম্পেল (পীস প্যাগোডা) দেখতে। অনেকটা সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হল বটে। সেখানে দেখে কয়েকটা ছবি তুলে আবার নীচে নেমে এলাম সিঁড়ি ভেঙে।
এরপর আমরা যাব দার্জিলিং জু। জু-তে এসে পৌঁছালাম আধ-ঘন্টার মধ্যেই। সেখানেও সিঁড়ি বেয়ে অনেকটা উপরে উঠতে হল। এন্ট্রি ফি জনপ্রতি ষাট টাকা করে দিয়ে, দু’টি টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। সেখানে জু-তে দেখলাম লেপার্ড (চিতা-বাঘ), বিয়ার (ভালুক), ব্ল্যাক প্যান্থার ( কালো চিতা-বাঘ) ছাড়াও রয়েছে অনেক রকমের পাখি। সব ঘুরে ঘুরে দেখলাম। তারপর সেখান থেকে দেখতে গেলাম – ‘হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনসটিটিউট’ যেখানে পাহাড়ে ওঠার নানা রকম সামগ্রী সাজানো আছে। নানারকম পোষাক আর মুখে পরার নানা রকমের মাক্স থেকে নানা ধরনের জুতো, লোহার কুঠার যা, দিয়ে বরফে গেঁথে সেটা চেপে ধরে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে একধাপ উঠে, আবার অন্য হাতের কুঠার বরফে গেঁথে দ্বিতীয় ধাপ উঠতে হয়। এই ভাবে বরফের পাহাড়ে ওঠে আরোহীরা। কুঠারটির নাম নাম ‘স্নো এক্স’।
সেখান থেকে বেরিয়ে দেখলাম H M I মিউজিয়াম। এইসব দেখে সেখানে প্রায় দেড় ঘন্টা কেটে গেল আমাদের। এরপর আবার সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে এলাম। নেমে এসে গাড়ির জন্য ড্রাইভারকে ফোন করলাম, কারণ এখানে সব জায়গায়ই গাড়ি স্ট্যান্ডে রাখতে হয়, তার জন্য ভাড়া দিতে হয় ১০০/১৫০ টাকা।
ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে এলে, এবার আমরা দেখতে যাব তেনজিং রক। যে শৈল-পাহাড়ে (Rock) প্রথম তেনজিং নোরকে পা রেখেছিল এভারেষ্ট জয় করার জন্য। সেখানে দড়ি ঝোলানো আছে। কেউ আগ্রহী হলে দড়ি ধরে ঝুলে ঝুলে সেই রকের চূড়ায় উঠতে পারে। অবশ্য তার জন্য তাকে একশো টাকার টিকিট কাটতে হবে। আমরা যখন গেলাম, তখন অবশ্য কাউকে দড়ি ধরে ঝুলে ঝুলে উপরে উঠতে দেখিনি। সেখানে কিছু ছবি তুললাম আমার মোবাইলে। আধ ঘন্টার মতো কাটল সেখানে।
এবার আমাদের গন্তব্যস্থল ‘চিত্রা টি এস্টেট’। চা বাগান দেখতে যাব। সেখানে রওনা দিলাম। রাস্তা জ্যাম থাকার ফলে আধ ঘন্টার বেশি সময় লাগল সেখানে পৌঁছাতে। সেখানে পৌঁছে চোখ জুড়িয়ে গেল আমাদের। নীচের দিকে পাহাড়ের ধাপে ধাপে সারি সারি চা বাগান নেমে গেছে। ধার দিয়ে আঁকা বাঁকা গতিতে সর্পিল একটা পথ নেমে গেছে নীচের দিকে নেমে যাবার জন্য। নেমে যেতে যেতে নীচ থেকে চা বাগানগুলি দেখতে অপূর্ব সুন্দর লাগে। অনেক দর্শনার্থীরাই নীচে নেমে যাচ্ছে। সিঁড়ি ভেঙে নীচে নেমে যাচ্ছে, নীচ থেকে উপরদিকে তাকিয়ে বাগানগুলি দেখবার জন্য। আমরাও তাদের দেখা-দেখি খানিকটা নীচে নেমে গেলাম। আহা কী অপূর্ব লাগছে দেখতে ! আমরা দাঁড়িয়ে আছি নীচে , আমাদের চারপাশ ঘিরে ধাপে ধাপে চা বাগানগুলি উঠে গেছে উপরের দিকে। যেন আমরা চা-বাগান ঘেরা একটা কূপের মধ্য পড়ে আছি।
সেখানে দাঁড়িয়ে অনেকগুলি ছবি তুললাম আমরা। তারপর ধীরে ধীরে আবার উপরে উঠতে লাগলাম। উপরে উঠে রাস্তায় এসে দেখলাম চা বাগানের দিকে সারি সারি কুড়ি-পঁচিশটির মতো চায়ের গুমটি দোকান। এখানে বিক্রি হয় এইসব বাগানের চা-পাতা। এখানে ওদের বানানো চা পান করে তার স্বাদ গ্রহণ করেও চা-পাতা কিনতে পারা যায। ৬০০ টাকা কেজি থেকে শৃরু করে ১২০০ টাকা কেজি পর্যন্ত দামের চা কিনতে পাওয়া যায় এখানে। আমরা ওদের বানানো ১২০০ টাকা কেজি দামের চা পান করে, তার স্বাদ অপূর্ব লাগায়, ৫০০ গ্রাম কিনে নিলাম ৬০০ টাকা দিয়ে। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে আরও একবার মন ভরে চা বাগানগুলি দেখে, আমরা গাড়িতে এসে উঠে বসলাম, এবার যাব রোপ-ওয়ে চড়তে। আজকের মতো আমাদের শেষ গন্তব্যস্থল।
চাপপাশের পাহাড়ী মনোরম দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে কিছুক্ষণ পর এসে পৌঁছালাম রোপ-ওয়ের কাছে। রোপ-ওয়েতে চড়ার জন্য বহুলোক দাঁড়িয়ে আছে লাইন দিয়ে। আমরাও গিয়ে দাঁড়ালাম লাইনে। বেশ কিছুক্ষণ পর টিকিট কাউন্টারের কাছে এসে পৌঁছালাম। এপার ওপার যাতায়াতের জন্য একজনের টিকিটের দাম বারশো টাকা করে।
চব্বিশশো টাকা খরচ করে আমাদের জন্য দু’খানা টিকিট কাটলাম। তারপর গিয়ে চড়ে বসলাম রোপ-ওয়েতে। পাহাড়ের একটা টিলা থেকে আর একটা টিলায় নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দেয় । নীচের দিকে তাকালে দেখা যায় ভয়াল আতঙ্ক সৃষ্টিকারী পাহাড়ী খাদ আর চোখ জুড়ানো পাইন গাছের সারি। তা দেখতে দেখতে আমরা কখন পৌঁছে গেলাম ওপারের টিলায় টের পেলাম না। রোপ-ওয়েতে একবারে চারজন করে বসা যায়। একটা রোপ-ওয়ে যখন যায় ওপারে, তখন আর একটা এপারে আসে।
রোপ-ওয়েতে চড়ে বসলে রোমহর্ষক অভূতপূর্ব এক আবেগ তৈরী হয় মনের ভিতরে। লালী বিমুগ্ধ হয়ে বিস্ময়ে চারপাশ দেখছিল। আমি ওকে বললাম, কি হল?
– এত আনন্দ আমি জীবনে পাব, কখনোই ভাবতে পারিনি। সুখে এখন আমার, এখান থেকে ঝাঁপ দিয়ে নীচে পড়ে গিয়ে, মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
আমি ওর একটা হাত মুঠোর মধ্যে নিয়ে, আলতো করে চাপ দিলাম।
লালী আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
রোমাঞ্চকর এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা মনে সঞ্চয় করে, এক মুগ্ধ আবেশ নিয়ে আমরা এসে গাড়িতে উঠে বসলাম। এবার আমাদের ফেরার পালা।
রওনা দিলাম মোহিত হোটেলে ফেরার উদ্দেশ্যে। বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমরা হোটেলে এসে পৌঁছালাম। পোষাক বদলে দু’জনেই গরম জলে স্নান করে নিলাম। তারপর লালীকে বললাম, বড় ব্যাগ থেকে বোতলট বের করে আনতে। ব্যানানা চিপস্, পটেটো চিপস্ সহ ওল্ডমঙ্ক গ্লাসে ঢেলে, তাতে পরিমাণ মতো জল মিশিয়ে নিয়ে আমরা পান করতে শুরু করলাম। খেতে খেতে আজকের দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে উচ্ছসিত প্রশংসা করল লালী। বলল, আমার জীবনে এমন সুযোগ কখনও আসবে, আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। শুধু তোমার জন্যই রোপ-ওয়েতে চড়ার আনন্দ আমি উপভোগ করতে পেরেছি। বলেই সে ঝুঁকে পড়ে আমার ঠোঁটে গভীর আশ্লেষে চুমু খেল। দু’পেগ খাওয়ার পর লালী বলল, চলো আমরা বিছানায় যাই।
কালকের মতো আজও রাত ন’টার সময় হোটেলের অভ্যর্থনা ঘরে (reception room) খাবারের জন্য আমাদের ডাক পড়ল। খাবারের মেনু কালকের মতোই। শুধু চিকেন-কষার জায়গায় আজকে মাটন-কষা।
খাওয়-দাওয়া সেরে, হাত-মুখ ধুয়ে আমরা এসে রুমে ঢুকলাম। এসে আমি একটা সিগারেট ধরালাম। প্যাকেট থেকে বের করে লালীও একটা সিগারেট ধরাল। দু’জনের সিগারেট টানা শেষ হলে, আমরা দু’জনেই গিয়ে ব্ল্যাঙ্কেটের ভিতর ঢুকে পড়লাম।
(পর্ব – আঠারো).
সকালে ঘুম ভাঙল আটটার সময়। ফোন করে চায়ের অর্ডার দিলাম। দশ মিনিটের মধ্যে চা এসে গেল রুমে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে দূরের পাহাড় দেখছিলাম। দেখতে দেখতে মনটা খারাপ হয়ে গেলে আমার, এই ভেবে যে আজ এই মনকাড়া মনমোহিনী পাহাড়কে বিদায় জানাতে হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। ফেরার জন্য ‘উত্তরবঙ্গএক্সপ্রেস’ – ট্রেনে আমাদের টিকিট কাটা আছে। সন্ধ্যা ৫-৪৫ মিনিটে ‘উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস’ ট্রেন ছাড়বে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে। সেখানে তার আগে আমাদের পৌঁছাতে হবে। বিদায় জানাতে হবে এই পাহাড়-সুন্দরী দার্জিলিং শহরকে। মনে শুধু তার সৌন্দর্যের মুগ্ধতার স্মৃতি আর তার রেশ নিয়ে আমাদের ফিরতে হবে স্বার্থপরের মতো।
সকালের প্রাত্যহিক কাজ কর্ম সেরে দ্রুত লাগেজ গুছিয়ে তৈরী হয়ে নিলাম আমরা। বেলা এগারোটার মধ্যে হোটেলের সমস্ত হিসেব-নিকেশ মিটিয়ে দিয়ে, ফর্মালিটির ফর্মে সই সাবুদ করে, দুপরের খাবার খেয়ে হোটেল ছেড়ে গাড়ি নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বেলা এগারোটায়।
ফেরার পথে কার্শিয়াং হয়ে শিলিগুড়ি নামবে গাড়ি। তার মধ্যে রাস্তায় যা যা দেখবার আছে সব আমরা দেখে নেব মনে মনে ভাবলাম।
গাড়ি নীচে নামতে শুরু করল দার্জিলিং হয়ে, ঘুম টয়-ট্রেন স্ট্যাশন ছুঁয়ে, জল বাংলা রোড হয়ে (তার উপরে মিলিটারী ক্যাম্প), সেখানে দেখলাম হিন্দি সিনেমার অভিনেতা গোবিন্দার বাড়ি। তার বাড়ির বিপরীত দিকেই বাতসিয়া লুপ। তার বাড়ির ছাদ থেকে দেখা যায় বোধহয়।
জল বাংলা রোড পার করে, ‘সোনাদা’ হয়ে, হিলকার্ট রোড় ধরল গাড়ি। হিলকার্ট রোড ধরে এসে গাড়ি পৌঁছাল কার্সিয়াং বাজারে। সেখানে নেমে পছন্দসই কিছু গরম পোষাক আমরা কিনে নিলাম। তারপর কার্শিয়াং টয়ট্রেন স্টেশন, কার্শিয়াং রেডিও স্টেশন দেখলাম খানিকক্ষণ ঘুরে। একটা দোকানে বসে চা খেলাম এক কাপ করে। চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে ছবি তুললাম কিছু আশে পাশের পরিবেশের দৃশ্যাবলীর। তারপর একটা সিগ্রেট ধরিয়ে গাড়িতে এসে বসলাম।
এরপর গাড়ি চলতে শুরু করল। খনিকটা পথ পেরিয়ে এসে বালাসোম নদী পেলাম। বালাসোম নদীর উপরে ব্রীজ পেরিয়ে, তিনবাতি মোড় হয়ে নীচে নামতে শুরু করল গাড়ি। তারপর এন জি পি রোড হয়ে গাড়ি শিলিগুড়ির সমতল ভূমিতে নামতে শুরু করল। সেখান থেকে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পৌঁছালাম নিউ জলপাইগুড়ি ষ্ট্যেশনে, বেলা পৌঁনে চারটার সময়।
আমাদের স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে, শুভেচ্ছা জানিয়ে ড্রাইভার বিদায় নিল। আলবিদা।
তাপপর একটা হোটেলে ঢুকে, লাগেজ রেখে, হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে নিয়ে চা টোষ্ট খেলাম। দাম মিটিয়ে দিয়ে, হোটেলের বাইরে এসে একটা সিগ্রেট ধরালাম। ঘড়িতে দেখলাম ৪-৪৫ মিনিট। তার মানে ট্রেন ছাড়তে আরও একঘন্টা বাকি।
ধীরে সুস্থে এক্সেলেটারে উঠে, হেঁটে ওভার ব্রীজ পেরোতে আরও পাঁচ- সাত মিনিট লাগল। ওভার ব্রীজ থেকে নীচে নেমে এসে, খবর নিয়ে জানলাম, ‘উত্তরবঙ্গএক্সপ্রেস’ দুই নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে। সেখানে পৌঁছে, লাগেজ সামনে রেখে একটা বসার সীট পেয়ে, সেখানে গিয়ে বসলাম দু’জনে।
৫-২০ মিনিটে দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে ‘উত্তরবঙ্গএক্সপ্রেস’ ট্রেন দিল। হুড়োহুড়ি করে কিছু লোক উঠে যাবার পর, একটু ফাঁকা হলে ধীরে সুস্থে আমরা গিয়ে ট্রেনে উঠলাম। আমাদদের সীট নম্বর খুঁজে নিয়ে, সেখানে গিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসলাম। কিছুক্ষণ পর ঠিক ৫-৪৫ মিনিটে ট্রেন ছেড়ে দিল। ধীরে ধীরে ট্রেনের গতি বাড়তে লাগল। আমাদের পিছনে পড়ে রইল শৈলজা সুন্দরী দার্জিলিং।
রাত সাড়ে আটটার সময় ট্রেনের ভেন্ডার এসে দু’প্লেট ডিমের কারি আর চারখানা রুটির অর্ডার নিয়ে গেল। রাত ন’টার মধ্যে খাবার দিয়ে গেল। বোতলে খানিকটা ওল্ডমঙ্ক ছিল। খাবার খেতে খেতে সেটুকু একা শেষ করলাম। তারপর আমি বোতরটা জানলা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। খাবার খাওয়া শেষ করে, আমরা সীটে চাদর পেতে শুয়ে পড়লাম। গভীর ঘুমের মধ্যে সারারাতটা কেটে গেল আমার। ভোর ৪-৪৫ মিনিটে এসে গাড়ি পৌঁছালো জনাকাীর্ণ শিয়ালদা স্টেশনে। সেখান থেকে ভাড়ার-গাড়ি বুক করে ছ’টার মধ্যে এসে বাড়ি পৌঁছে গেলাম। এই কয়টা দিন দার্জিলিং সুন্দরীর সান্নিধ্য, অনাবিল আনন্দে কাটিয়ে যেন আমার মনের ভিতরের বিকার অনেকটা কেটে গেছে। এই দিনগুলি আমাদের স্বপ্নের মতো একটা ঘোরে কেটে গেছে।
আবার জীবনের কর্ম-ব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়তে হবে আমাদের কাল থেকে।
এতদিনে আমি বেশ বুঝে গেছি, লালী আমার বিয়ে করা বউ নয় বটে, তবে প্রিয় সঙ্গিনী। ওকে ছাড়া আমি আর বোধহয় কখনও ভাল থাকতে পারব না।
