Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » বউ নয় সঙ্গিনী || Sankar Brahma

বউ নয় সঙ্গিনী || Sankar Brahma

(পর্ব – এক)

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতে আজ অনেকটা দেরি হয়ে গেল। অনেকদিন পর, কাল সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে মদ-মস্তি করতে গেছিলাম। ঘরে ফিরতে বেশ রাত হয়েে গেছে। আমার বন্ধু লিটন সাহা যোগ দিয়েছে মিলিটারীতে। বর্তমানে পোষ্টিং আছে জলপাইগুড়ির বীরপারা মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে। সেখান থেকে লিটন কাল সকালে কলকাতায় ফিরেছে। বন্ধুদের জন্য সঙ্গে নিয়ে এসেছে পিটার স্কচের দু’টি বোতল। কাল তার সদ্ব্যাবহার করার জন্য দু’চারজনের সঙ্গে আমারও ডাক পড়েছিল তার বাড়ি। গেছিলাম সেখানে। কাল অনেকদিন পর বন্ধুদের সঙ্গে খুব মজায় কাটল অনেকটা সময়টা। নিজেদের মনের ভিতর বলার জন্য কত কথা জমে ছিল। নিজেরাও জানতাম না। কথা আর ফুরাতেই চায় না। সেইসব জমানো কথা খালাস করতেই বেশ রাত হয়ে গেল।

এখন বাজে সকাল এগারোটা দশ। দাঁত ব্রাস করে, হাত মুখ ধুয়ে, টেবিলে এসে বসে, শান্তাকে ডেকে বললাম, শান্তা, এক কাপ চা দাও। শান্তা ঘরের কাজের মেয়ে। রান্না-বান্নার হাত ভাল। ঘরের কাজ সব ও একাই করে। মাসে ছয় হাজার টাকা নেয়। সকাল ন’টার মধ্যে কাজে চলে আসে। দুপুর একটার মধ্যে সব কাজ সেরে বাড়ি চলে যায়। বাড়ি কাছেই, কাকুলিয়া বস্তিতে। আমি থাকি ফার্ণরোডের একটা ফ্ল্যাটে।

আমি কাজ করি একটা খবরের কাগজের অফিসে। দু’টোর পর সেখানে যাই। থাকি সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। তারপর কোনদিন যাই কফি হাউজে। কোন দিন খালাশি টোলা।

শান্তা চা নিয়ে এসে টেবিলে রাখল। সে সময় আঁচলটা তার গা থেকে খসে পড়তে দেখে, সে সামলে নিল নিজেকে। কিন্তু আমার চোখকে আমি সামলাতে পারলাম না। ওর উন্মুক্ত ভারি স্তন দু’টি আমার চোখে পড়ে গেল। সে চলে যেতেই আমি চায়ে চুমুক দিয়ে, একটা সিগ্রেট ধরালাম। এমন সময় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল।
মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে অন করে দেখলাম, সুবীর সান্যাল ফোন করছে। আমার এক শিল্পী বন্ধু। মাঝে মাঝে আর্ট গ্যালারীতে এক্সজিবিশন করে। বন্ধুদের ডেকে বলে তার এক্সজিবিশন দেখতে যেতে। হয়তো সে কারণেই ফোন করছে আমাকে, ভেবে তার ফোনটা রিসি়ভ করলাম না। ফোনটা কিছুক্ষণ বেজে থেমে গেল।
চা শেষ করে আমি বাথরুমে ঢুকে পড়লাম।
বাথরুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি অবনীবাবু বিষণ্ণ মুখে বসে আছেন। অবনীবাবু আমার পাশের ফ্লাটেই থাকেন, স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে। একটা ইনসিওরেন্স কোম্পানীতে কাজ করেন। তার স্ত্রী রমলা ডাক নাম লালী দেখতে খুব সুন্দরী। এমন সুন্দরী তরুণী কি করে অবনীবাবুর ভার্যা হলেন, ভেবে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। তার এত বড় মেয়ে, দেখলে বিশ্বাস হয় না। মেয়েটি দেখতে ডল-পুতুলের মতো। তাই তার নাম ডলি। মেয়েটির বয়স আর কত হবে, পনেরো ষোল।
– কি ব্যাপার অবনীবাবু?
– বড় বিপদে পড়েছি, সনাতনবাবু।
– কি হয়েছে?
– কাল বিকালে ডলি, তার এক বান্ধবীর বাড়িতে গেছিল জন্মদিন পালনের উৎসবে। বলে গেছিল রাত ন’টার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসবে। কিন্তু রাতেও সে বাড়ি ফেরেনি
– আপনি ফোন করেননি ডলিকে?
– করেছিলাম। কিন্তু সুইচ-অফ বলল।
– তারপর?
– যত বারই ফোন করেছি, ওই একই উত্তর এসেছে। বড় চিন্তায় পড়েছি। কি করব বুঝতে পারছি না।
– আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে খবর নিয়েছেন?
– সব জায়গায় খবর নিয়েছি। কোথাও যায়নি সে।
– যে বন্ধুর বাড়িতে গেছিল, সেখানে খবর নিয়েছেন?
– তাদের বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর কিছুই জানি না। বলে গেছিল, পার্ক সার্কাস চার নম্বর ব্রীজের পাশে দরগা রোডে তার বাড়ি।
– তার নাম বলেছিল?
– আমি জানি না। লালীর কাছে বলেছিল হয়তো।
– কেন, আপনি বাড়ি ছিলেন না?
– না, আমি অফিসে ছিলাম।
– তবে তো থানায় খবর দিতে হয়।
– আপনি একবার আমার সঙ্গে যাবেন থানায়।
– নিশ্চয়ই যাব। ডলির একটা ছবি সঙ্গে নিয়ে নিন। আর আপনাে স্ত্রীর কাছে জেনে আসুন, কি নাম বলেছিল তার বান্ধবীর?
– আচ্ছা। বলে অবনীবাবু নিজের ফ্ল্যাটে গেলেন ডলির ছবি আনতে আর নাম জানতে।

খবরের কাগজে কাজ করার সুবাদে, থানা পুলিশের সঙ্গে আমার কিছুটা যোগাযোগ আছে। আবার আমার কলেজের এক বন্ধু অভিরূপ সাহা এখন লালবাজারে কাজ করে। মাঝে মাঝে সে আমার মদ্যপানের সঙ্গী হয়। তার সঙ্গে একবার কথা বলে নিলে কেমন হয়? ভেবে আমি অভিরূপকে ফোন করলাম।
ফোন ধরে অভিরূপ বলল,
– হ্যাঁ বল।
আমি তাকে ঘটনাটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে বললাম। সব শুনে সে আমাকে ফোনে যা বলল, তার সারমর্ম হল, হঠাৎই কেউ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া সাধারণ ব্যাপার নাও হতে পারে। এমনকি ঘটনার পেছনে কোনো অপরাধী চক্র জড়িত থাকতে পারে। তাই কেউ হারিয়ে গেলে দেরি না করে থানায় জানিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করতে হবে। থানা থেকে জিডির কপিটি নিয়ে যত্ন করে রাখতে হবে। আর যদি সে অপহৃত হয়েছে এমন কোন সন্দেহ হয় তাহলে জিডি না করে এফআইআর করাটাই ভাল। এফআইআর দায়ের করার মাধ্যমে থানায় মামলা করতে হবে। এতে নিখোঁজ কারও সন্ধানে আইনগত সহায়তায় বেশি গুরুত্ব পায়। এফআইআরে অপহৃত ব্যক্তি কি কারণে নিখোঁজ হয়েছেন এই সংক্রান্ত যৌক্তিক কারণ এবং যাদের সন্দেহ হয় তাদের নাম পরিচয় উল্লেখ করতে হবে।
এফআইআর করার সময় আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া ভাল। কেননা অপরাধী পরবর্তীকালে ধরা পড়লে এফআইআর-য়ে অপরাধের সঠিক বর্ণনা না থাকলে উচ্চ আদালতে গিয়ে, তা খারিজ হয়ে যেতে পারে। আর যদি মোবাইল অথবা অন্য কোনো মাধ্যমে নিখোঁজ ব্যক্তির মুক্তিপণ হিসেবে কোনও অর্থ দাবি করা হয় সেটি সঙ্গে সঙ্গে আইন শৃঙ্খলা-বাহিনীকে জানাতে হবে। সুনির্দিষ্ট অপরাধ হওয়ায় আইন শৃঙ্খলা-বাহিনী সার্বিক সহযোগিতা করতে পারে। সুতরাং নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে পেতে প্রাথমিক খোঁজা-খুঁজির সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই আইনের আশ্রয় নিতে হয়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই, অবনীবাবু ডলির একটা সাম্প্রতিক তোলা ছবি নিয়ে ফিরে এলেন। আমি শান্তাকে ডেকে বললাম, এ ঘরের কাজ তোমার শেষ হয়ে গেলে, তুমি ফ্ল্যাট লক করে চাবিটা অবনীবাবুর ফ্ল্যাটে তার স্ত্রীর কাছে দিয়ে যেয়ো।
সে বলল, আচ্ছা।
আমি অবনীবাবুকে নিয়ে বালিগঞ্জ থানায় গোলাম। সেখানে গিয়ে ডলির ছবিটা দিয়ে, একটা জিডি করে অবনীবাবুকে নিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম। এফআইআর করা গেল না, কারণ
কি কারণে নিখোঁজ হয়েছে তা জানা নেই।
তাছাড়া, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহজনক ব্যাক্তির নামও জানা নেই।

ফেরার সময় পিকলুর দোকান হয়ে ফিরলাম। গড়িয়াহাটে পিকলুর একটা লটারির টিকিটের দোকান আছে। সে লটারির টিকিট বিক্রি করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশা নিয়ে, আমি মাঝে মাঝে তার কাছ থেকে লটারির টিকিট কিনি। আজ পর্যন্ত বড় কোনও পুরস্কার ভাগ্যে জোটেনি। তবুও আশা ছাড়তে পারিনি। আজও তার কাছ থেকে দু’খানা টিকিট কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
বাড়ি ফিরে স্নান খাওযা-দাওয়া সেরে দু’টোর মধ্যে অফিসে যেতে হলো। গিয়ে, বসে অফিসের কাজ-কর্ম সারছি, এমন সময় মোবাইল বেজে উঠল। ফোন খুলে দেখি, সুবীর সান্যালের ফোন। সকালেও একবার করেছিল, ধরা হয়নি বাথরুমে যাওয়ার দ্রুত তাগিদ ছিল বলে। এখন ধরলাম। বললাম, কিরে বল।
– তুই জানিশ, তুষার মারা গেছে?
– কোন তুষার?
– আরে আমাদের বন্ধু কবি তুষার মিত্র।
– জানি না তো? কবে মারা গেছে?
– কাল রাতে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। তুই একবার কালীঘাট শ্মশানে আসতে পারবি? আমি যাব।
– কখন?
– এখনই?
– আচ্ছা, আমি যাচ্ছি। বলে, হাতের কাজ-কর্ম দ্রুত সেরে, ফাইল-পত্তর গুছিয়ে, তুলে রেখে ছুটলাম কালীঘাট শ্মশানে। তুষার আমাদের অনেকদিনের বন্ধু। তখন সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছি। তখন ওর সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। কফিহাউজে গেলে, তুষার আমাদের নতুন লেখা কবিতা শোনাত। আমরাও কবে যেন ওর কবিতা শুনতে শুনতে ওর ভক্ত হয়ে, গেছি টের পাইনি। সেই তুষার আজ নেই! মারা গেছে? বিশ্বাস হতে চায় না আমার।
তুষার একদিন কফিহাউজে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, প্রেম করেছিস? কেমন বিয়ে পছন্দ তোর? সোসাল নাকি লাভ ম্যারেজ?
আমি তাকে বলেছিলাম, আমার ইচ্ছে নিজের পছন্দের মেয়ে বিয়ে করা।
তুষার জানতে চেয়েছিল, নিজের পছন্দের মেয়ে পেয়েছিস?
আমি বলেছিলাম, না এখনও পাইনি। তবে খোঁজ চলছে মনে মনে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই কালীঘাট শ্মশানে গিয়ে হাজির হলাম। তুষারের শবদেহ তখন ইলেকট্রিক চুল্লিতে দেওয়া হয়নি। এখন তার মুখখানা তখন সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা। তার মুখখানা মনে পড়ল আমার, একরাশ কোঁকড়া এলোমেলো চুল তার মাথায়। উজ্জ্বল চকচকে দু’টি চেখ। কথায় কথায় মিটিমিটি হাসে। মনেহল মুখের ঢাকনা খুলে, সে যেন হেসে বলে উঠল তার কবিতা।
“মন যখন স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে তখন আর দরকার হয় না কোন কথা বলা তার আগে যত কথার কারিগরি ভালবাসাকে চটকে তিতো করে ফেলা।

তোমার ইচ্ছে যখন আমার ইচ্ছে হয়ে ওঠে তখন আর কোন আলাদা ইচ্ছে অনিচ্ছেই থাকে না পরস্পরের ইচ্ছে তো আসলে তাই তোমার মুখের কথাই
এখন আমার প্রাণের ইচ্ছে তোমার খুশিই আমার খুশি হয়ে গেছে তোমার কষ্ট আমার কষ্ট তোমার আনন্দে আত্মহারা হই আমি এরই নাম ভালবাসা বুঝি?
জানি না বুঝি না কিছু তবু আমি কেন যেন তোমাকেই মনে প্রাণে ভালবাসতে চাই।”

তারপর আবার কাপড় দিয়ে মুখটা ঢেকে নিল। এ কি আমার চোখের ভুল? নাকি মনের বিভ্রম? জানি না।
এই কবিতাটা আমরা বহুবার তুষারের মুখে শুনেছি। এই কবিতাটা আমায় সেদিনও তুষার বলেছিল, যেদিন তুষার আমার কাছে জানতে চেয়েছিল, আমি প্রেম করি কিনা?

শ্মশানে পুরনো চেনা-জানা, অনেকের সঙ্গে দেখা হল, যারা তুষারের বন্ধু কিংবা তার কবিতার ভক্ত, সংখ্যায় কম নয়। সেখানেই আলোচনা করে ঠিক হল, সামনের রবিবার সন্ধ্যায় তুষারের স্মরণসভা হবে, কফিহাউজে। আমি আর সুবীর শ্মশান থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাসবিহারী মোড়ে চলে এলাম। সুবীর বলল, একটু মাল খাবি তো চল আমার সঙ্গে। হাজরায় একটা বার আছে।
– না।
– কেন?
– আমার অন্য কাজ আছে। (কথাটা মিথ্যে বললাম। আমার কোনও কাজই নেই।)
– কি কাজ?
– একটা লেখা লিখতে হবে কাল কাগজের জন্য।
– বেশ তো। দু’পেগ খেয়েই আমরা বেরিয়ে আসব। তারপর বাড়ি গিয়ে লিখবি। চল। বলে সুবীর আমার হাত ধরে টানল। আমি আর বারে না যাওয়ার জন্য, কোনও অজুহাত খাড়া করতে পারলাম না। গেলাম তার সঙ্গে।

সুবীর বারে ঢুকে দু’পেগ করে হুস্কির অর্ডার দিল দু’জনের জন্য। তখন আমাদের মধ্যে তুষার মিত্রের কবিতা নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হল। কবিতার শব ব্যচ্ছেদের মতো।
প্রথম দু’পেগ শেষ হওয়ার পর, সুবীর আর একপেগ হুস্কির অর্ডার দিল। ওর তখন কথার প্রসঙ্গ পাল্টে গেল। শুরু করল নিজের স্ত্রীর প্রসঙ্গে আলোচনা।
সুবীর বিয়ে করেছে জানি। আর বউ নিয়ে আলাদা থাকে তাও অজানা নয়। তার বেশি কিছু জানি না।
সুবীর বলতে শুরু করল, আমি রেজিষ্ট্রি করে দু’বছর আগে বিয়ে করেছি। বাবা মা এই বিয়ে মেনে নিতে পারেনি বলে, আমি মিতালিকে বিয়ে করে একটা ভাড়া বাড়িতে এসে উঠেছি। মাসে ছ’হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। সেখানেই আছি আমরা।
আজ সকালে, মোবাইলটা বেজে উঠল। ফোন তুলে দেখলাম, রুমি ফোন করছে। রুমি আমার ছোট বোন।
মিতালি চা দিতে এসে বলল, কে ফোন করেছে?
– রুমি
– কি চায়?
– জানি না।
– টাকা ছাড়া কি আর চাইবে?
– জানো যখন, তখন আবার প্রশ্ন করে আমাকে বিব্রত করছ কেন?
– টাকা চাইলে দেবে না।
মিতালিকে বলতে পারতাম, আমার টাকা আমি কাকে দেব, না দেব, সেটা আমার ব্যাপার। আমি বুঝব। সে ব্যাপারে তুমি নাক না গলাবার কে?
আমি কিছু বলতে পারলাম না। ভাবলাম সকালের এই উজ্জ্বল মনোরম পরিবেশটা, অস্থির অশান্তময় করে তুলে লাভ কি? তাই তাকে কিছু না বলে, চায়ে চুমুক দিলাম।
মিতালি আমাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে বলল, কি মনে থাকবে তো কথাটা।
আমি তারও কোন উত্তর দিলাম না। মুখ বুজে চা খেতে লাগলাম। তখনই প্রশান্তর কাছ থেকে ফোনে খবর পেলাম, তুষার কাল রাতে মারা গেছে হার্ট অ্যাটাকে। খবরটা শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। তখনই তোকে একবার ফোন করেছিলাম সকালে। ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেল।
– হ্যাঁ, আমি তখন বাথরুমে ছিলাম।
আমিও তাই ভেবেছি। কেউ ফোন করলে তুই তো না ধরার পাত্র নয়।
এরপর আবার তুষার প্রসঙ্গে ফিরে এলো। আলোচনা ফিরে এলো তুষারের কবিতা নিয়ে।
ফ্ল্যাটে ফিরতে আমার রাত ন’টা বেজে গেল।

(পর্ব – ২).

আজ খুব ভোরে ঘুম ভাঙল আমার। দেয়াল ঘড়িতে দেখি চারটে বাজতে তিন মিনিট বাকি। যাকে বলে ব্রাহ্ম-মুহূর্ত। বাথরুম সেরে এসে, জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম। ধীরে ধীরে আলো ফুটে উঠছে রাস্তায়। স্ট্রীট লাইটগুলি তখনও জ্বলছে। দু’একজন লোক রাস্তায় চলাচল শুরু করেছে। তাদের মধ্যে কোনও ব্যস্ততা নেই। মনোরম এক সকাল। আমি প্যান্ট শার্ট পরে, ফ্ল্যাট লক করে, ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। ভিতরের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গোলপার্কে চলে গেলাম। দেখলাম ফুটপাথের ধারে একটা চায়ের দোকান খুলেছে। মজুর শ্রেণীর কয়েকজন লোক সেখানে বসে আছে, চায়ের আশায়। চা তখনও তৈরি হয়নি। উনোনে জল ফুটছে। আমিও এককাপ চায়ের আশায় সেখানে দাঁড়ালাম। দেখলাম, অনেকে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছেন। তার মধ্যে বেশির ভাগই বয়স্ক মানুষ। এর মধ্যে মহিলারাও আছেন।
চা বানাতে দেরি হচ্ছে দেখে, চায়ের দোকান ছেড়ে, আমিও ওদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে ঢাকুরিয়া লেকের ভিতরে এসে ঢুকে পড়লাম। সেখানেও দেখলাম অনেকে মর্নিং ওয়াক করছে। আমি একটা বেঞ্চে বসে চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখতে লাগল। অদূরে দেখলাম একটা লোক, পরনে লুঙ্গি গায়ে গামছা জড়িয়ে এদিকেই আসছে। কাঁধে তার একটা বাক, তাতে দু’টি মেটে হাড়ি ঝুলছে। লেকে যারা হাঁটতে এসেছে, তাদের কাছে এই লোকটি বেমানন ও বিসদৃশ লাগছিল। কাছে আসতেই আমি তাকে ডোকে বললাম, হাড়িতে কি আছে?
– তাড়ি।
– মানে তালের রস?
– হুম।
– কত করে গ্লাস?
– পাঁচ টাকা, বাবু।
আমি মনে মনে ভাবলাম, চায়ের দামে তাড়ি। তারপর লোকটির কাছে জানতে চাইলাম,
– ভালোে হবে তো?
– হুম।
– দাও তবে এক গ্লাস।
হাড়ির ভিতরে একটা প্ল্যাস্টিকের মগ ডুবিয়ে, সে তাড়ি তুলে, কাচের গ্লাসে ঢেলে ভর্তি করে, আমার হাতে দিল।
আমি হাতে নিয়ে গ্লাসে চুমুক দিয়ে দেখলাম, তাড়ির স্বাদ বেশ। টকটক একটু ঝাঁজাল।
আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম,
– নাম কি তোমার?
– আজ্ঞে, সাধুচরণ।
– বাহ্, বেশ নাম তো। থাকো কোথায?
– কেয়াতলা বস্তিতে।

প্রথম গ্লাস শেষ করে আরও এক গ্লাস দিতে বললাম তাকে।
সে একই কায়দায় হাড়িতে প্ল্যাস্টিকের মগ ডুবিয়ে তাড়ি তুলে এনে গ্লাস ভর্তি করে ঢেলে দিল।
দু’গ্লাস তাড়ি গিলে, ভিতরে একটা রঙিন আবেশ তৈরি হল আমার। সেই আবেশ নিয়েই লেকের বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। সাধুচরণকে একটটা দশ টাকার নোট দিয়ে, তারপর বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বেশ চনমনে লাগছিল নিজেকে। অনেকদিন পর তাড়ি খাওয়া হলো। একবার ঘুটিয়ারি শরীফে শ্যামলের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে প্রথম তাড়ি খাওয়ার স্বাদ ভুলতে পারব না। তারপর একবার কেঁদুলী মেলায় যাবার পথে, বোলপুরে নেমে শ্যামলের সঙ্গে গিয়ে একটা উঁচু টঙের উপর বসে, এক কলসি তাড়ি কিনে, অনেকক্ষণ বসে তিনজনে মিলে খেয়েছিলাম। আমি শ্যামল আর অমিত গুপ্ত। অমিত বাউলদের ব্যাপারে খুব আগ্রহী। সেবার ওর উদ্যোগেই আমাদের কেঁদুলীেলায় যাওয়া হয়েছিল। খুব মজায় কেটেছিল সেবার কযেকটা দিন আমাদের। অনেক বাউলের গান তাদের সামনে বসে শুনেছিলাম। সনাতন দাস বাউল, পবন দাস বাউল ওদের আখড়ায় বসে গান শুনতে শুনতে, ওদের সঙ্গে বসে কলকেতে গাঁজা টেনে ছিলাম। সেই প্রথম গাঁজা খাওয়া আমার। তারপর আর কোনদিন কলকেতে গাঁজা খাইনি। এরপর নিতাইয়ের সঙ্গে বসে কয়েকবার সিগারেটে ভরে গাঁজা টেনেছি। নিতাই প্রথমে সিগারেটের ভিতরের তামাকগুলি বের করে নিয়ে, তার কিছুটা পরিমাণ রেখে, বাকি তামাকটা ফেলে দিয়ে, সেই তামাকের সঙ্গে গাঁজা হাতের চেটোয় নিয়ে ডলে ডলে গুড়ো করে নিয়ে মিশিয়ে আবার সেই সিগারেটের খালি খোলটার ভিতর নিপুনভাবে ভরে নিত। তারপর সিগারেটের সামনের দিকটা দু”আঙুল দিয়ে মুড়ে নিয়ে, সেটা আগুন দিয়ে ধরিয়ে সিগারেটের মতো টানত।
এইসব হিজিবিজি কথা ভাবতে ভাবতে সকাল সাতটার মধ্যে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম আমি। তারপর প্রাতঃকৃত্য সারার জন্য বাথরুমে ঢুকে পড়লাম।

সকালে থানা থেকে ফোন করে অবনীবাবুকে জানিয়েছে, কাল সকালে পার্কসার্কাস স্টেশনের কাছে রেল লাইনে একটি মেয়ের ডেডবডি পাওয়া গেছে, সেটা তাদের মেয়ে কিনা, দেখে সনাক্ত করে আসতে। অবনীবাবু আবার ছুটে এলেন আমার কাছে। একা যেতে ভরসা পাচ্ছেন না। আমাকে সঙ্গে নিযে সেখানে যেতে চান জানালেন। গেলাম তার সঙ্গে। পার্কসার্কাস স্টেশনে গিয়ে জি আর পি-র সঙ্গে যোগাযোগ করে, কথা বলে, তাদের কাছে মেয়েটির বডি দেখতে চাইলাম। তারা জানাল, এই স্টেশনে বডি সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা নেই বলে, বড়ি শিয়ালদহ স্টেশনে আছে। অবনীবাবুকে নিয়ে, শিয়ালদহ ছুটলাম আমি। সেখানে গিয়ে অবনীবাবু বডি দেখার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। তারপর বডি দেখে শান্ত হলেন। নিশ্চিন্ত হলেন যে, এটা ডলির লাশ নয়। সস্থি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম আমরা দু’জনে।

(পর্ব – তিন).

আজ সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। শান্তা আজ কাজে আসেনি। নিজেই রান্নাঘরে গিয়ে আমি, এককাপ লিকার চা করে নিয়ে এসে টেবিলে বসলাম। চায়ে চুমুক দিয়ে মনে মনে ভাবলাম। একটা জলজ্যান্ত মেয়ে হাওয়ায় কর্পূরের মতো উবে গেল কোথায়? তাও আবার এই কলকাতা শহরে, গ্রাম-গঞ্জে নয়। বালিগঞ্জ থানায় দু’একবার খোঁজ খবর নিতে গিয়ে জেনেছি, তারা কোনও খোঁজ-খবর পায়নি। খোঁজ পেলেই তার ফোন করে আমাদের জানাবেন।
তারা কি সত্যি সত্যিই খোঁজ খবর নিচ্ছেন? আমার মনে গোয়েন্দা-সুলভ সন্দেহ এই প্রশ্ন উঁকি মারে। আর এই প্রশ্ন আমার মনের ভিতরে কুরে কুরে খায়। কোনও স্বস্থিকর উত্তর পাই না। তাই মনে মনে ভাবলাম ‘একটি নিখোঁজ ও পুলিশের অসহযোগিতা’ এই নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখে আমাদের কাগজে প্রকাশ করলে কেমন হয়? অবশ্য এই ধরণের প্রতিবেদন প্রকাশ করার আগে মালিকের অনুমতি নিতে হবে। আগে প্রতিবেদনটা লিখি, তারপর মালিকের সঙ্গে কথা বলে, অনুমতি নেওয়া যাবে ভেবে আমি প্রতিবেদনটা লেখা শুরু করি একটু ঝাঁজালো কড়া ভাষায়, নারী নিখোঁজের ব্যাপারে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে। তথ্যসহ যুক্তি দিয়ে লেখাটি শেষ করে, প্রথমে লেখাটি আমাদের কাগজের প্রধান সম্পাদক অবিনাশ রায়কে দেখালাম। লেখাটা খুব বড় নয় তিনশ’ সাড়ে তিনশ’ শব্দ হবে। তিনি লেখাটা পড়ে চমকে উঠে বললেন, এ কী করেছেন আপনি? এমন কড়া ভাষায় পুলিশের বিরুদ্ধে লিখলে তো পুলিশ শমন পাঠাতে পারে পত্রিকার অফিসের বিরুদ্ধে এই লেখা ছাপার জন্য। আপনি বরং আপনার অভিযোগগুলি একটু নরম ভাষা প্রয়োগ করে লিখে সতীকান্তবাবুকে (কাগজের মালিক) দেখান। তিনি অনুমতি দিলেই ছাপা হবে।
– বেশ। বলে, আমি লেখাটা তার কাছ থেকে ফেরত নিয়ে চলে আসি।
লেখাটা ফেরত নিয়ে এসে, বেশ মোলায়েম
ভাষায়, নরম সুরে অভিযোগ করে প্রতিবেদনটা লিখে, সতীকান্তবাবু কাছে নিয়ে গেলাম। উনি তখন কী কাজে যেন ব্যস্ত ছিলেন। আমাকে লেখাটা তার কাছে রেখে আসতে বললেন। পড়ে দেখে, পরে জনাবেন বললেন।
– আচ্ছা। বলে আমি তার কাছ থেকে ফিরে এসে নিজের চেয়ারে বসে, অফিসে আমার করণীয় কাজগুলি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
কিছুক্ষণ পরেই পিওন ধারাধনকে দিয়ে, সতীকান্তবাবু আমাকে ডেকে পাঠালেন তার অফিস-ঘরে। আমি তার ঘরে গিয়ে ঢুকতেই তিনি আমায় বললেন, বসুন।
আমি তার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে, কি বলবেন আমায় শুনবার জন্য, তার মুখের দিকে তাকালাম। তিনি তার পাঞ্জাবীর ডান পকেট থেকে রুপোর ছোট কৌটো বের করে হাতে নিলেন। তারপর সেই কৌটো খুলে একটিপ নস্যি দু’আঙুলে তুলে নিয়ে, দু’নাকের ফুটোয় দিয়ে জোরে জোরে টানলেন। তারপর পাঞ্জাবীর বাঁ পকেট থেকে বড় মাপের ভাঁজ করা একটা রুমাল বের করে, নাক মুছে, দু’আঙুল মুছে আবার বাঁ পকেটে রুমালটা ভরে রেখে, নরম সুরে বললেন, তোমার এই লেখা ছাপলে, সরকার থেকে বছরে আমরা যে তিন লাখ টাকার মতো বিজ্ঞাপন পাই, সেটা বন্ধ হয়ে যাবে। তুমি কি সেটা চাও?
– না, তা চাই না। তবে জানতে ইচ্ছে করে কেন বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে যাবে?
– সরকারী পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে আমাদের কাগজে লিখলে, ওরা আমাদের বিজ্ঞাপন দেবেন ভেবেছো?
– তবে তো সরকারের বিরুদ্ধে কোন সত্যি কথাই লেখা যাবে না?
– ওদের বিরুদ্ধে লিখলে, ওদের শ্যেন দৃষ্টিতে পড়তে হবে আমাদের।
– আচ্ছা, লেখাটা তবে আমি নিয়ে যাচ্ছি।
আমার বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, তবে যে বলে সংবাদপত্র গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ, সেটা তাহলে কথার কথা মাত্র !
আমি আর কিছু না বলে লেখাটা তার কাছ থেকে নিয়ে চলে এলাম।
লেখাটি নিজের পত্রিকায় প্রকাশের জায়গা হল না দেখে, আরও কয়েকটি পত্রিকায় ডাকযোগে পাঠালাম লেখাটি। কোথায়ও প্রতিবদন নামে, আবার কোথায়ও চিঠিপত্র বিভাগে।
একটি ছোট পত্রিকার চিঠিপত্র বিভাগে লেখাটি ছাপা হলেও অন্য কোথায়ও লেখাটি ছাপা হল না। ছোট কাগজ বলে তার প্রতিক্রিয়াও জনমানসে তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারল না।
অন্য সব পত্রিকাগুলি কী তবে সরকারী জুজুর ভয়ে, লেখাটি প্রকাশ করতে সাহস পেল না? হবে হয়তো !
আমার মনে পড়ে গেল তুষারের সেই কবিতাটা।
“ভয় ভয় করে আর কত ভয় পাবে?
ভয় বুঝি গিলে শেষে তোমাকেই খাবে?
ভয়ের বিকল্প মনে সাহস সঞ্চয়
সে সাহস অর্জন কর আপনার মনে,
তারপর তা ছড়িয়ে দাও
প্রতি জনে জনে।”

তুষার আজ বেঁচে থাকলে, আমার বর্তমান মনের অবস্থাটা জানতে পারলে, কি বলত জানি না।
ছোটবেলায় দেখেছি পাড়া বা বেপাড়ার কেউ হারালে, পাড়ায় ঘুরে ঘুরে রিক্সায় চড়ে মাইকিং করে জানানো হত। তা’তে অনেক সময় হারানো ছেলে, মেয়ে বা মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া যেত।
আজকাল শহরে তা আর সম্ভবও না। এখানে একমাত্র ভরসা থানা পুলিশ। তারাই যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে,তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?

(পর্ব – চার).

বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেড়ার মতো, আশ্চর্যজনক ভাবে পিকলুর দোকান থেকে কেনা আমার ডিয়ার লটারির টিকিটে দ্বিতীয় প্রাইজ উঠেছে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। ট্যাক্স-ফ্যাক্স সব কেটেও হাতে প্রায় আঠাশ ত্রিশ লাখ টাকা পাওয়া যাবে। এত টাকা নিয়ে আমি কি করব ভাবছিলাম। হাতে টাকা পেলে প্রথমেই এই খবরের কাগজের অফিসের দাসত্বের চাকরিটা ছেড়ে দেবো। একটা নিউজ পোর্টাল চ্যানেল খুলব, যেখানে সত্যিকথাগুলি নির্দিধায় বলা যাবে। চ্যানেলটির নাম দেব ‘সত্যান্বেষী’।
এখনও হাতে আসেনি টাকা, তাই খবরের কাগজের অফিসের কাজটা ছাড়িনি। আমাদের কাগজের একটি হিন্দি সংস্করণ বের হয় মুম্বাই থেকে। সতীকান্তবাবু অফিসের কাজে আমাকে এক সপ্তাহের জন্য মুম্বাই পাঠালেন।
আমি চারদিনের মধ্যেই অফিসের সব কাজ সেরে ফেললাম। তারপর মুম্বাই ঘুরে দেখতে লাগলাম। একদিন জুহুুবিচে কাটালাম। সত্যেন্দ্র তিওয়ারী আমাদের ওখানকার একজন স্টাফ। বয়স পঁচিশ ত্রিশের মধ্যে হবে। ও আমাকে প্রায় জোর করেই নিয়ে গেল মুম্বাইয়ের এক সম্ভ্রান্ত পতিতালয়ে। সেখানে যাবার আমার কোন ইচ্ছে ছিল না। ওখানে যাবার কোন ইচ্ছে ছিল না, মানে এমন ভাবার কোনও কারণ নেই, আমি কখনও কোনও পতিতালয়ে যাইনি। বন্ধুদের সঙ্গে মাল খেয়ে সোনাগাজি দু’একবার গেছি। কিন্ত ওদের সঙ্গে যৌন চাহিদা পূরণ করার কোনও তাগিদ আমি কখনও অনুভব করিনি। আমার রুচি হয়নি। বন্ধুরা তাদের সঙ্-উপভোগ করলেও আমি ছিলাম নিরামিশ।
সাজানো গোছানো একটা এপার্টমেন্ট। ঘরে ঘরে উপভোগের জন্য নানা বয়সের নারী। তাদের এক একজনের এক একরকম রেট। তিওয়ারী সেখানকার একজন মোটাসোটা মহিলাকে দেখে, তাকে হিন্দিতে বলল, নয়া কুছ মাল আয়া হায়?
– জী, হ্যায়।
– দেখাও।
মোটাসোটা মহিলা পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে আমাদের যাকে দেখাল, তা দেখে আমি চমকে উঠলাম।
আমাদের পাশের ফ্ল্যাটের অবনীবা্ুর মেয়ে ডলি।
তা কি করে হবে? ভেবে আমি বিস্মিত হলাম। আমি তার সঙ্গ-যাপন করব বলে মহিলাকে জানালাম। তিনি আমাকে ওই রুমে রেখে, তিওয়ারীকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
ডলিও আমায় দেখে চিনতে পেরেছিল।
ওরা বেরিয়ে যেতেই ডলি দরজায় খিল তুলে দিয়ে, ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।
সব খুলে বলল আমাকে এখানে সে কিভাবে এসেছে। সাত আট মাস আগে একটি ছেলের সঙ্গে ফেসবুকে ফ্রেন্ডশিপ হয়। ছেলেটির আন্তরিক কথাবার্তা, আর তার অন্তরঙ্গ ভঙ্গি ডলিকে মুগ্ধ করে। মুগ্ধ হয়ে কিছুদিনের মধ্যেই ডলি তার প্রেমে পড়ে। ছেলেটি একদিন তার জন্মদিন উপলক্ষে, সন্ধ্যায় ডলিকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। সরল বিশ্বাসে ডলি সেখানে গিয়ে হাজির হয়ে দেখে বুঝতে পারে, সে ফাঁদে পড়েছে। তার মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। তাকে জোর করে একটা ইনজেকশন দিয়ে বেহুশ করা ফেলা হয়। যখন তার হুশ ফিরল, দেখল, সে একটা অচেনা রুমে পড়ে আছে। সেটা বাইরে থেকে লক করা। ধীরে ধীরে সে জানতে পারে, দশলাখ টাকার বিনিময়ে তাকে বিক্রি করা হয়েছে, পুরুষদের সম্ভোগের বস্তু করে। প্রথম শুনে সে খুব কেঁদে ছিল। তাতে কোন লাভ হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই তার অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য করে তাকে পুরুষদের সম্ভোগের বস্তু করা হয়েছে।
ডলির কাছে সব শুনে আমি মুম্বাই পুলিশের কাছে যাই। তাদের সহায়তায় ডলিকে সেখান থেকে উদ্ধার করে, তাকে নিয়ে কলকাতায় ফিরব বলে, মুম্বাই পুলিশের গাড়িতে চড়ে আমি রওনা দিই। একটা পেট্রোল বোঝাই গাড়ি পিছন থেকে এসে পুলিশের ভ্যানটাকে ধাক্কা মারে।পুলিশ-ভ্যানটা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। আমি কেঁপে উঠি।

না। সত্যি সত্যি বাস্তবে এটা ঘটেনি। এটা ছিল আমার স্বপ্নের মোহ-ঘোর। ঘুম ভাঙলে, ভিতরে ভিতরে আমি একটা স্বস্তি বোধ করি। আবার একটা অস্বম্তি মনটাকে কুরে কুরে খায়, স্বপ্নটা বাস্তব নয় বলে।

এরপর আমি আর একদিন মাঝরাতে, একটা স্বপ্ন দেখলাম।
আমাদের অফিসের পিওন হারাধনের বিয়েতে আমাকে সে নিমন্ত্রণ করে বলল, আপনাকে স্যার আমার বিয়েতে যেতে হবে। না গেলে আমি মনে খুব কষ্ট পাব।
– বেশ, বেশ। আমি যাব। কোথায় বিয়ে হচ্ছে তোমার?
– গ্রামে স্যার। গোচরণ। ট্রেনে করে যেতে যেতে হবে।
– আচ্ছা আমি যাব।

শিযারদহ-নামখানা ট্রেনে চড়ে হারাধনের বাড়িতে গোচরণ যাওয়ার পথে দু’পাশে চাষের জমি দেখে মনটা আমার আনন্দে ভরে গেল। ভাবলাম লটারীতে পাওয়া টাকা দিয়ে এখানে কয়েক বিঘা জমি কিনে চাষ-বাস করলে কেমন হয়? ভাবতে ভাবতে ট্রেনটা ছুটতে ছুটতে নিঃসীম অন্ধকারের ভিতর হারিয়ে গেল। আতঙ্কে ঘুমটা আমার ভেঙে গেল।

আমি বুঝতে পারি, লটারির প্রাইজ পাওয়ার পর থেকেই আজকাল আমার স্বপ্ন দেখার বাতিক অনেক বেড়ে গেছে।

(পর্ব – পাঁচ).

অবনীবাবু নিজের একমাত্র মেয়ে, ডলির শোকে পাথর হয়ে গেছেন। চোখের নীচে কালি পড়েছে। অফিসে যাওয়া বন্ধ করেছেন। ম্রিয়মান হয়ে অসহায়ের মতো ঘরে বসে কাটান। বাইরে বের হন না। পাছে প্রতিবেশীরা জানতে চায়, ডলি কোথায়? তাকে দেখছি না ক’দিন। কি জবাব দেবেন তিনি? তাই ঘরে মুখ লুকিয়ে থাকেন।
রমলা ম্যাডাম সেই তুলনায় অনেকটা ধাতস্ত আছেন।
এতদিন হাট-বাজার সব কাজ অবনীবাবু করতেন। ঘরে বসে থাকলে তো আর দিন চলবে না। তাই রমলা ম্যাডামকে হাটে-বাজারে বের হতে হয়। বের হবার সময় আমার ডোর বেল বাজায়।
আমি দরজা খুলে দিলে, তিনি হাসি মুখে বলেন, খুব ব্যস্ত আছেন নাকি?
– কেন?
– কিছু জিনিষ কিনতে একবার সুপার মার্কেট যেতে হবে। খুব ব্যস্ত না থাকলে আমার সঙ্গে একবার যেতে পারবেন?
খুব ব্যস্তই ছিলাম। কিন্ত ব্যস্ততা দেখিয়ে এই আপ্যায়ণ প্রত্যাখান করতে মন চাইল না। তাই বললাম, না, না। ব্যস্ততা কীসের? আপনি এসে ঘরে বসুন। আমি প্রস্তুত হয়ে আসছি।
তিনি এসে আমার ঘরে ঢুকে, সোফায় বসলেন। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমার ঘরটা দেখতে লাগলেন। দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলি দেখলেন।
দশ মিনিটের মধ্যে দ্রুত প্রস্তুত হয়ে আমি পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। আমি ফ্ল্যাটের ডোর লক করে, রমলার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। বড় রাস্তায় এসে একটা উবে বুক করে সুপার মার্কেট এসে নামলাম। রমলার শাড়ির আঁচলটা সিটের নীচে আটকে গেছিল বলে তাকে হাত ধরে উবে থেকে নামাতে হল। ভাড়া আমি দিয়ে দিলাম।
রমলা আপত্তি করে ভাড়া দিতে গেছিল। আমি হেসে তাকে নিরস্ত্র করলাম।
লিষ্ট ধরে সুপার মার্কেট থেকে সে জিনিষ কিনতে লাগল। আমি সঙ্গে রইলাম তার। কেনা-কাটা শেষ হলে, আমরা কফিশপে ঢুকে, বাটার-টোষ্ট আর কফি খেলাম। কফি খেতে কিছু কথা হল তার সঙ্গে। মূলতঃ তার ছোটবেলার কথা। রমলা খুব সুন্দর করে কথা বলে। বেশ লাগছিল শুনতে আমার। কফি আর টোষ্টের দাম মিটিয়ে দিয়ে, বেরিয়ে এলাম রমলাকে নিয়ে। আবার উবে ধরে বাড়ি ফিরে এলাম। উবেতে রমলা খুব সংলগ্ন হয়ে বসে ছিল আমার। তার খোলা পেলব পিঠে খুব হাত রাখতে ইচ্ছে করছিল। রমলার হাসিমাখা মুখখানা দেখে নিজেকে সংবরণ করলাম। নিজেকে সংযত করে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরে এলাম। রমলা খুশি মনে হাত নেড়ে নিজের ফ্ল্যাটের দিকে চলে গেল। আমি চাবি লাগিয়ে লক খুলে নিজের ঘরে ঢুকলাম।

কিছুদিন পর অবনীবাবুর মাথায় গোলমাল দেখা দিল। একা একা কথা বলেন।
আবার কখনও হাসেন একা একা। নিঃশব্দে একা একা কাঁদেন। তার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। কখনও কখনও অচেনা দৃষ্টিতে রমলার দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন কোনও অচেনা জীব। চিনতে পারেন না তাকে।

ডাক্তার দেখিয়ে, তাকে গোবরা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হল। অবনীবাবুর ব্যাঙ্কে জমানো টাকা ধীরে ফুরিয়ে আসতে লাগল। রমলার সঙ্গে ব্যাঙ্কে জয়েন্ট একাউন্ট ছিল বলে, রমলা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে অবনীবাবুর চিকিৎসার খরচ চালাতে পারল।
অবনীবাবুর স্বেচ্ছা-অবসরের (Voluntary retirement) জন্য ন্যাশানাল ইনসিওরেন্স কোম্পানীতে, অবনীবাবুর ডাক্তারি প্রেসক্রিপশন জুড়ে, আবেদন পত্র জমা দেবার জন্য, রমলা আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছিল। উবে-ট্যাক্সি করে সেখানে গেছিলাম। রমলা ভাড়া দিতে গেছিল। আমি তাকে ভাড়া দিতে না দিয়ে, নিজেই দিয়েলাম।
অবনীবাবুর অফিসের সব কাজ সারা হলে, রমলাকে নিয়ে আমিনিয়ায় ঢুকে বিরিয়ানি আর চিলি চিকেনের অর্ডার দিলাম। লটারীতে পাওয়া আঠাশ লাখ টাকা থেকে কিছুটা রমলার জন্য খরচ খরচ করলে আর ক্ষতি কি?

কাগজের অফিসের কাজটা এখনও ছাড়িনি। কিছুদিনের মধ্যে ছেড়ে দেব ভাবছি। কিন্তু ছেড়ে দিয়ে করবটা কী? সেটা বুঝে উঠতে পারছি না। মাথায় অনেক পরিকল্পনা আসছে। কিন্তু কোনটাই স্থায়ি হচ্ছে না। কি করব? মন ঠিক করতে পারছি না। তাই কাগজের কাজটা এখনও ধরে রেখেছি। তবে বেশি দিন ধরে রাখব বলে মনেহয় না। নিজে একটা কিছু করব।

বাড়ি ফিরে সুবীর সান্যালের ফোন পেলাম। ফোন ধরে বললাম, হ্যাঁ বল।
– পর্শু আর্ট গ্যালারীতে আমার একক প্রদর্শনী আছে। তুই আসবি তো?
– দেখি।
– না, দেখি বললে হবে না। তোকে আসতে হবে।
– কেন?
– প্রদর্শনীর শেষে আমরা কয়েকজন মিলে ট্রিংকাস-বারে বসব। তুই থাকলে জমে যাবে।
– তাই? তবে যাব।
– কখন আসবি?
– প্রদর্শনী কতক্ষণ পর্যন্ত চলবে?
– আট-টা পর্যন্ত।
– তার মধ্যে চলে যাব।
– বেশ। বলে সুবীর ফোনটা কেটে দিল।

কাজ সেরে কাগজের অফিস থেকে বেরিয়ে, সাড়ে সাতটার মধ্যে গিয়ে পৌঁছালাম আর্ট গ্যালরীতে। সুবীরের একক প্রদর্শনী দেখতে লোকের বেশ বেশ ভিড় হয়েছে। কুড়িটা ছবির মধ্যে ছ’টা ছবি কেনার জন্য অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। দু’একটা ছবি আমার বেশ ভাল লেগেছে। তার মধ্যে একটা ছবি অভয়াকে নিয়ে। অন্ধকার ঘরের মধ্যে একটা মেয়ে আতঙ্কগ্রস্থ চোখ নিয়ে আধশোয়া অবস্থায়, তার দিকে কতগুলি রোমশ হাত এগিয়ে আসছে। সেই ছবিটা একজন ডাক্তারবাবু বুকিং করেছে কুড়ি হাজার টাকা দিযে। পঞ্চাশ হাজার টাকায় তিনি ছবিটা কিনবেন। আর একটা ছবি আমার খুব ভাল লেগেছে। গভীর বনের ভিতর, একটা সিংহের নাকের উপরে বসে একটা কাঠবেড়ালি, নিশ্চিন্তে মনে পায়ের আঙুল দিয়ে নিজের কান চুলকাচ্ছে। এই ছবিটাও একজন পরিবেশবিদ কিনবেন চল্লিশ হাজার টাকা দিয়ে, পনেরো হাজার টাকা অ্যাডভান্স করেছেন। অ্যাডভান্স প্রাপ্তি সুবীরের প্রায় লাখখানেক হয়েছে। প্রদর্শনীর শেষে ট্রিংকাস-বারে তুমুল আড্ডা আর মদ্যপান হল। ট্রিংকাস-বার বন্ধ হওয়ার পর আমরা বের হলাম সেখান থেকে। তারপর যে যার বাড়ি। আমি একটা ট্যাক্সি ধরে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম। রাত তখন দশটার মতো বাজে। চাবি দিয়ে লক খুলে ঘরে ঢুকে জামা প্যান্ট ছেড়ে, গিজার চালিয়ে, বাথরুমে ঢুকে হট-অয়াটার ছেড়ে, হট-বাথ নিয়ে যখন বেরিয়ে এলাম, তখন কী ফুরফুরে লাগছিল শরীরটা। মনে হচ্ছিল, জীবনটা কী মজার।
পাজামা পরে, গায়ে গেঞ্জি দিয়ে ঘরে বসেছি সবে, এমন সময় ডোর-বেল বেজে উঠল। এমন সময় আবার কে? ভেবে বিরক্তি নিয়ে উঠে দরজা খুললাম। দেখলাম নাইটি পরে এসে রমলা দাঁড়িয়ে।
আমি কিছু জিঞ্জাসা করার আগেই সে বলল, একা একা ঘরে থাকতে আমার খুব ভয় করছে।
– তবে চলে এসো এখানে, ঘর লক করে। নেশার আবেশে কিছু না ভেবে কথাটা বলে ফেললাম আমি।
রমলা তাই করল।

(পর্ব – ছয়).

এবার আমার নিজের প্রসঙ্গে বলি। আমি একজন জারজ সন্তান। আমার মা বাবা বোধহয় কামনার বশবর্তী হয়ে, বিয়ের আগেই স্ফূর্তি করার ফলে, আমার মায়ের গর্ভে অযাতিতভাবে আমার আগমন ঘটে, তাতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তাদের সামাজিক সম্মান বজায় রাখতে, আমার জন্মের দায় এড়াবার জন্য, তারা আমাকে সাদার্ন এভিনিউ একটা ডাষ্টবিনের পাশে ফেলে রেখে আসে। ত্রিশ বছর আগে সাদার্ন এভিনিউর অবস্থা এখনকার মতো এতো ঝকঝকে তকতকে ছিল না। মাঝে মাঝে আবর্জনাময় সাধারণ রাস্তার মতোই ছিল।
আমার পালক পিতা হরিহর সামন্ত সেদিন তার স্ত্রী সনাতনীদেবীকে নিয়ে কালীঘাটে মা কালীর পুজো দিয়ে, ট্যাক্সি করে সাদার্ন এভিনিউ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ি ফেরার সময় ডাষ্টবিনের পাশে আমার কান্নার শুনে ট্যাক্সি দাঁড় করায়। ট্যাক্সি থামিয়ে জানলা দিয়ে, ডাস্টবিনের পাশে আমায় পড়ে থাকতে দেখে, ট্যাক্সি থেকে নেমে এসে, আমাকে কোলে তুলে নিলেন পরম মমতায়। নিয়ে বাড়ি এলেন। তাদের কোনও সন্তান ছিল না। সন্তানের জন্য পাঁচ বছর ধরে, এখানে-সেখানে, নানা জায়গায়, পুজো মানত করেছিলেন, বড়কাছারিতে গিয়েও পুজো দিয়ে ঢিল বেঁধে এসেছিলেন। কোন ফল পাননি। সেদিন কালীঘাটে পুজো দিয়ে ফেরার সময় আমাকে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়ে, ভেবেছিলেন, এটা কালী মায়েরই কৃপা। তাদের দিকে মা এবার মুখ তুলে তাকিয়েছেন। না হলে এভাবে কেউ পুত্র সন্তান রাস্তায় কুড়িয়ে পায়? কালীমায়ের ইচ্ছাতেই এসব সম্ভব হয়েছে। না হলে কখনও হয়? একথা তারা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেছিলেন। আমার পালনকারী মায়ের নাম অনুযায়ী বাবা আমার নাম রাখেন সনাতন। আমি এখন সনাতন সামন্ত নামে সকলের কাছে পরিচিত। হরিহর সামন্তের ছেলে। আমাকে পেয়ে তাদের সংসার পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বড় হয়ে মায়ের মুখে, এসব গল্প আমি অনেক শুনেছি। তারা আমাকে পুত্র স্নেহে বড় করে তুলেছেন। ভাল স্কুল কলেজে পড়িয়েছেন। আমরা তখন থাকতাম ঢাকুরিয়ার মহারাজ ঠাকুর রোডের দু’কাঠা জমির উপর একটা বাড়িতে। নিজেদেরই বাড়ি ছিল। যোদপুর বয়েস স্কুলে পড়েছি। তারপর সিটি কলেজ থেকে পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। পড়তে পড়তেই বাবা হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যাওয়ায় পড়া শেষ করতে পারিনি। বাবা চাকরি ব্যবসা কিছু করতেন না। কর্পোরেশন অফিসে দালালীর কাজ করতেন। কারও বার্থ বা ডেথ সার্টিফিকেট বের করে দেওয়া। কারও ট্রেড লাইসেন্স বের করে দেওয়া। কেউ পাকা বড়ি করবেন, তার প্ল্যান বের করে দেওয়া। এইসব আরকি। এইসব করে সংসার টানা-পোড়েনের মধ্য দিয়ে কষ্ট করে চলে যেত। বাবা মা আমাকে সেটা বুঝতে দিতেন না। আমার প্রায় সব ইচ্ছে পূরণ করতেন তার্। বাবা মারা যাওযার পর সংসার অচল হয়ে পড়েছিল। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া ছেড়ে দিয়ে একটা খবরের কাগজের অফিসে সামান্য বেতনে কাজে ঢুকি পড়ি। তারপর মাও আর বেশিদিন বাঁচলেন না। বাবা মারা যাওয়ার পরের বছরই মা মারা গেলেন সেলিব্রাল স্ট্রোকে। আমি তার চিকিৎসা করারও কোন সুযোগ পেলাম না। ভোরবেলা বিছানায় সেলিব্রাল স্ট্রোক হয়ে মারা গেলেন। ঘুম থেকে উঠে আমি দেখলাম, মার নাক কান মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়েছে। মা বিছানায় পড়ে আছেন। ডাক্তার ডাকা হল। তিনি দেখে বললেন, এক্সপায়ার্ড। বিশ্বাস হচ্ছিল না আমার। বুকের ভিতরটা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছল।
কলেজে পড়ার সময়ই সুবীর সান্যাল, লিটন বোসের সঙ্গে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। ওদের ফোন করে খবর দি। লিটন তখনও মিলিটারীতে চাকরি পায়নি। ওদের সহযোগিতায় মায়ের দাহ-কার্য ও পরে শ্রাদ্ধ-শান্তি অনুষ্ঠান সম্পন্ন করি। তারপর ওই বাড়িতে একা একা থাকতে আর আমার ভাল লাগছিল রা। মন টিকছিল না, মা-বাবার স্মৃতি বিজড়িত ওই বাড়িতে। দালাল ধরে বাড়িটা বিক্রর ব্যবস্থা করি। দু’কাঠা জমি সহ দুই কামরার একতলা পাকা বাড়ির দাম পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা চেয়ে ছিলাম। বত্রিশ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। বত্রিশ লাখ টাকা দিয়ে ফার্ণ রোডের এই তিনতলায় দু’কামড়ার একটা ফ্ল্যাটটা কিনে, একবছর আগে আমি এখানে চলে আসি। আমার আসার আগে থেকেই অবনীবাবুরা আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন। ফ্ল্যাটটায় মোট চারটি তলা আছে। একতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত আরও অনেক লোকজন ফ্ল্যাটটায় থাকেন। সকলের সঙ্গে আমার আলাপ পরিচয় হয়নি। পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন বলে, অবনীবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ পরিচয় হয়েছে। ওদের ঘরে আমি কখনও যাইনি। ওরাও আসেনি। সেদিনই প্রথম অবনীবাবু আমার ফ্ল্যাটে এসেছিলেন, বিষম বিপদে পড়ে, মেয়ের নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনায় বিভ্রান্ত হয়ে গিয়ে। তার আগে যাতায়াতের পথে ডলি আর রমলা ম্যাডামকে দেখেছি কয়েকবার। কথা হয়নি কোনও। অবনীবাবুর কাছে মেয়ের নাম ডলি আর স্ত্রীর নাম রমলা জেনেছি। রমলার ডাকনাম যে লালী তাও বলেছেন তিনি কথায় কথায়।

আমি ফ্ল্যাটে এসেই ঘরের কাজ-কর্ম আর রান্নার লোকের জন্য ফেসবুকে অ্যাড দিয়ে, কয়েকদিনের মধ্যেই শান্তাকে পেয়ে যাই। ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে, সকাল ন’টা থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত সে এখানে থেকে, আমার ঘরের কাচা, ঘর ঝাড় দেওয়ার, বাসন মাজার কাজ-কর্ম করে। তারপর তার বস্তির ভাড়া ঘর কাঁকুলিয়া রোডে চলে যায়। শুনেছি সে ডিভের্সি, মায়ের সঙ্গে থাকে। তাতে আমার কী এসে যায়? আমার ঘরের কাজ-কর্ম সে ঠিক মতো করলেই হল। কাগজের অফিসে কাজ করে পনেরো হাজার টাকা পাই। তার থেকে ছয় হাজার টাকা শান্তাকে দিয়ে দেওয়ার পর, নয় হাজার টাকা দিয়ে মাস চালাতে হত এতদিন। লটারির টাকা পাওয়ার পর খরচ অনেক বেড়ে গেছে। টাকা খরচ করার একটা মজা আছে, এতদিন হিসেব করে চলায়,তা বুঝতাম না। টাকা খরচ করলে নিজেকে বেশ লর্ড লর্ড মনেহয়।

শান্তা আমার ঘরে আট মাস ধরে কাজ করছে। গায়ের রঙটা চাপা হলেও, মুখটা তার লাবণ্য মাখান। বয়স পঁচিশের মধ্যে হবে। আচার আচরণ ভাল। বেশ হাসিখুশি স্বভাবের। হাসলে চোখ দু’টি খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। স্বভাব চরিত্রে কোন দোষ আছে বলে আমার মনে হয়নি। এমন মেয়েকেও কেউ ডিভোর্স দিতে পারে? কি করে পারে? আমি ভেবে পাই না। আমার তো বেশ ভালই লাগে শান্তাকে। তবুও তাকে পরের মাস থেকে আমাকে ছাড়িয়ে দিতে হল। কারণ, এর মধ্যে, রমলা আর আমার মধ্যে অন্তরঙ্গতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, এখন থেকে আর রমলা নিজের ঘরে নয়, আমার ঘরেই দু’জনের জন্য রান্না করে। জন্য রান্না করে, ঘরের কাজ-কর্ম সব করে। আমার সঙ্গে একঘরে থাকে। সে এখন আমার কাছে, রমলা ম্যাডাম থেকে লালী হয়ে গেছে, আর আমি এখন তার কাছে সোনাতনবাবু থেকে সোনা হয়ে গেছি।
মাঝে মাঝে লালীকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে, মানসিক হাসপাতালে গিয়ে অবনীবাবুকে দেখে আসি। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে তার বর্তমান অবস্থার কথা জেনে আসি। ডাক্তারা তেমন কোনও আশার বাণী শোনাতে পারেন না। তার জন্য যে লালীর কোনও রকম মন খারাপ হয়, তাকে দেখে আমার তেমন মনে হয় না। আমরা ঘরে ফিরে আসি। তারপর একসঙ্গে মদ্যপান করি। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে আমার সঙ্গদোষ লেগেছে লালীর। সেও মদ্যপানে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে। প্রথম দু’একদিন বমি করেছিল। এখন আর করে না। বরং খেয়ে বেশ স্ফূর্তি অনুভব করে। তার মনের ভিতরে চাপা পড়ে থাকা গোপন কান্নার কথাগুলি, যা এতদিন গুমড়ে গুমড়ে মরছিল। আমার মতো শ্রোতা পেয়ে সেগুলি নিঃসংকোচে বলতে পেরে লালী বেশ হাল্কা বোধ ক।

– আমার সাথে তো ওঁনার পাঁচ বছর আগে বিয়ে হয়েছে।
– তা হলে ডলি তোমার মেয়ে নয়?
– না, না।
– তবে ও কার মেয়ে?
– ওঁনার প্রথম বিয়ে হয়েছিল অনেকদিন আগে।
তাঁর মেয়ে ডলি।
– ডলির মা কোথায়? তিনি কি মারা গেছেন?
– না। ডলির যখন দশ বছর বযস, তখন ওর মা কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
বোধহয় মাথা খারাপ হয়ে গেছিল৷ ঠিক জানি না।
তারপর উঁনি অনেক খোঁজ করেছিলেন তার। কোনও খোঁজ পাননি। তার এক বছর পর, উঁনি আবার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন। ওঁনার অফিসের এক কর্মচারী, আমার মা যে বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন, ওই বাড়িতে থাকত। উনি মাকে বিয়ের সম্বন্ধের কথাটা জানান। মা দোজবরের একটা দশ এগারো বছরের মেয়ে আছে শুনেও, রাজি হয়ে যান আমাকে তার সঙ্গে বিয়ে দিতে। আমার মত ছিল না। আমার মতের আর কে মূল্য দেবে? মাও দেয়নি।
– কেন তোমার বাবা ছিলেন না?
– না। আমি যেবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিই, সেবার বাবা মারা যান।
– কিভাবে?
– আমরা থাকতাম হুগলীর শ্রীরামপুরে। বাবা ট্রেনে হকারী করতেন। একদিন চলন্ত ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে, পা পিছলে চাকার নীচে চলে যান।
– ইশ।
– মা তারপর হরিপদবাবুর বাড়িতে রান্নার কাজ নেন।
– হরিপদবাবু কে? আমরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। উনিই মাকে অবনীবাবুর বিয়ের সম্বন্ধের কথাটা বলেছিলেন। যাতে মা রাজি হয়ে গেছিল, আমাকে ওঁনার সঙ্গে বিয়ে দিতে।
– কেন?
– বীমা কোম্পানীতে কাজ করেন শুনে।
– তারপর?
– অবনীবাবু একদিন এসে তার বন্ধুর বাড়িতে আমায় দেখলেন। আমায় দেখে পছন্দ করে, বিয়ে করতে রাজি হয়ে চলে গেলেন। তারপর পঞ্জিকা দেখে একটা ভাল দিন ঠিক করে, মন্দিরে নিয়ে গিয়ে সিঁদুর পরিয়ে, আমাকে বিয়ে করে এনে তুললেন এখানে।
– এখন তোমার মা ওখানে আছেন?
– না, আমার বিয়ের এক বছর পরই তিন দিনের জ্বরে ভুগে মা মারা গেছেন।
– তুমি দেখতে গেছিলে?
– হ্যাঁ, উঁনি আমাকে নিয়ে গেছিলেন। উঁনিই সব ক্রিযা-কর্ম সমাধা করে, আমাকে নিয়ে ওখান থেকে চিরতরে এখানে চলে এসেছিলাম।
– তারপর আর কখনও শ্রীরামপুরে যাওনি?
– না।
– তারপর এখানে কি হল বল।
– মায়ের অভাবে ডলি ম্রিয়মান হয়ে থাকত সবসময়। উঁনি ভেবেছিলেন ডলি হয়তো আমাকে পেয়ে তার মায়ের অভাব ভুলতে পারবে। কিন্ত তা হল না। সে আমাকে প্রথম থেকেই কেন যেন সহ্য করতে পারত না। আর উঁনি আমাকে বারবার ডলির সব রকম অহেতুক বায়না, অবহেলা, অপমান সহ্য করে, মেনে নিয়ে চলতে বলতেন৷ আমিও ওঁনাকে খুশি রাখতে সব সময় তাই চেষ্টা করতাম। তবুও শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। ওর মায়ের মতো ডলিও চলে গেল। বল তো সোনা এতে আমার দোষ কোথায়?
আমি তার প্রশ্নের কোনও জবার দিতে না পেরে, লালীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকি। সে আমার সহানুভূতির স্পর্শ পেয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে। ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে শেষে ওকে আমি শান্ত করার জন্য, ওর চোখের পাতায় আলতো করে ঠোঁট রাখি।

(পর্ব – সাত).

কাগজের অফিস বলে, একই দিনে সকলরের ছুটি থাকা সম্ভব নয়। তাই, এক এক দিনে এক একজনের ছুটি থাকত। আমার ছুটি ছিল শনিবার। ছুটির দিনে আমি লালীকে নিয়ে ঘুরতে বের হতাম। কোনদিন মোহরকুঞ্জে গিয়ে বসতাম। কোনদিন লাইট হাউজে টিকিট কেটে সিনেমা দেখতাম। কোনদিন তাকে সাথে নিয়ে মানসিক হাসপাতালে গিয়ে অবনীবাবুর খবর নিয়ে আসতাম। আবার কোনদিন আমিনিয়ায় গিয়ে বিরিয়ানি আর চিলি-চিকেন খেয়ে বাড়ি ফিরতাম। এইভাবেই দিনগুলি আমাদের সুন্দর আনন্দে কেটে যাচ্ছিল। এক শনিবার লালীকে জিজ্ঞেস করলাম, একবার ঘুরে দেখে আসতে যাবে নাকি তোমার পুরনো পাড়া। শুনে লালী খুব উত্তেজিত হয়ে উঠল। উৎসাহিত হয়ে, যাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করল।
এরপর, একদিন সকালবেলা চা জল-খাবার খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম শ্রীরামপুরের উদ্দেশ্যে। হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে পৌঁছাতে আধ-ঘন্টার মতো লাগল। টিকিটের দাম মাত্র দশটাকা। সেখানে পৌঁছে লালীকে বললাম চলো কোথায় যাবে?
– পানপাড়া যাব। যে বাড়িটায় আমরা আগে ভাড়া থাকতাম। মা যে বাড়িতে রান্নার কাজ করত। সেই বাড়িটা দেখব।
– বেশ চলো।
আমি ওর সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে লাগলাম। লালী হাঁটতে হাঁটতে চারিদিকে তাকিয়ে দেখে বলছিল, মাত্র পাঁচ বছরে কত পাল্টে গেছে জায়গাটা।
যে জায়গাগুলি ফাঁকা ছিল, সেখানে এখন কত বাড়ি-ঘর উঠে গিয়ে, জায়গাটাকেই অপরিচিত করে তুলেছে। একেবারেই চেনা যায় না। তারা যে বাড়িটায় ভাড়া থাকত, সেটা এখন বহুতল ফ্ল্যাট হয়েছে। লালীর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে তার পুরনো পাড়াটা দেখলাম। লালীকে দেখতে পেয়ে চেনা একজন বলল, কে লালী না?
লালী তাকে ঘুরে দেখে বলল, হ্যাঁ পিসিমা। আপনি কেমন আছেন?
– এই বয়সে আর কেমন থাকব বাছা? হাঁপের টান, বাতের ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছি। এ কী তোর বর নাকি রে? তিনি আমাকে দেখিয়ে লালীর কাছে জানতে চাইলেন। লালী সম্মতিসূতক মাথা নাড়ল।
– শুনেছিলাম, তোর বর নাকি বুড়ো, এ তো দেখি জোয়ান-মদ্দ ছেলে।
লালী তার কোন উত্তর না দিয়ে, একগাল হেসে তার দিকে তাকিয়ে বলল, এবার আসি পিসিমা। বলে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, আমাকে বলল, চলো অনেক দেখা হয়েছে পুরনো পাড়া। এবার স্টেশনে যাই। আমরা ওখান থেকে একটা রিক্সা ধরে স্টেশনে ফিরে এলাম। তারপর সেখানে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে, ডাল তরকারী কাতলা মাছের কালিয়া দিয়ে ভাত খেয়ে, পরের ট্রেন ধরে হাওড়া ফিরে এলাম। সেখান থেকে ট্যাক্সি করে ফিবে এলাম নিজেদের ফ্ল্যাটে।

প্রায় সাত আট মাস এইভাবে কাটার পর একদিন ভোরবেলা গোবরা মানসিক হাসপাতাল থেকে ফোন করে ডাক্তারবাবু জানালেন কাল রাতে হার্ট অ্যাটাক হয়ে অবনীবাবু মারা গেছেন। খবর শুনে, সঙ্গে সঙ্গে লালীকে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। সেখানকার সব নিয়ম-কানুন (Formality) মেনে ফর্ম ফিলাপ করে লালী স্বাক্ষর করল, তারপর শবদেহ নিয়ে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম। বেরিয়ে এসে, একটা শব-বাহক গাড়ি ডেকে কালীঘাট শ্মশানে অবনীবাবুর শবদেহটা নিয়ে গেলাম। বৈদ্যুতিক চুল্রিতে শবদেহ দাহ করার পর বাড়ি ফিরলাম দুপুর দুটোর সময়। বাড়ি ফিরেই অফিসে ফোন করে জানিয়ে দিলাম, আমার পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোক হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। তার দাহকার্য শেষ করে এইমাত্র বাড়িতে ফিরলাম। আজ আর অফিসে যেতে পারব না। তারপর সুইগিতে খাবারের অর্ডার দিয়ে, দু’জনেই স্নান সেরে নিলাম। খাবার এলে, দু’জনেই খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। তারপর একসময় কখন লালীর দৃঢ় আকর্ষণে আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। তখন তার তীব্র কাম-বাসনা জেগে ছিল। তা পূর্ণ করে, তাকে তৃপ্ত করলাম। তৃপ্ত হয়ে সে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। আমার চোখে আর ঘুম এল না। আমি জেগে রইলাম। আর ভাবতে লাগলাম রমণীর কাম-বাসনা কখন তীব্র হয়, আর কী কারণেই বা তীব্র হয়ে ওঠে তা আমার মতো অনভিজ্ঞ পুরুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

ভাবতে ভাবতে তন্দ্রার মতো এসেছিল বোধহয়, মোবাইল বেজে ওঠার আওয়াজে তন্দ্রা-ভাবটা কেটে গেল। ফোন খুলে দেখলাম লিটন বোস ফোন করেছে। ফোন ধরে বললাম, হ্যাঁ, বল লিটন।
– আমি কলকাতায় ফিরেই বিয়ে করব ঠিক করেছি। দেখিস তো আমার জন্য একটা মেয়ে।
– কি রকম মেয়ে তোর পছন্দ?
– ডি়ভোর্সি হলেই ভাল হয়।
– কেন?
– আগে থেকেই সব অভিজ্ঞতা আছে যার, কিছু শেখাতে হবে না তাকে।

চিরকালই দেখেছি, ওর ভাবনা চিন্তাগুলি আমাদের মতো নয়। আমরা যেখানে পাশ করে কেরানি বা সম্পাদক হতে চেয়েছি। ও চেয়েছে, মিলিটারীতে যোগ দিয়ে, দেশ রক্ষা করতে।
লিটন আবার বলল, আমার সব কাজের ব্যাপারে খোঁজ নিই, সেই কাজে তার কোন অভিজ্ঞতা আছে কিনা। তবে বিয়ের ব্যাপারে সে নিয়মটা প্রযোজ্য হবে না কেন?
আমি এই কূটতর্কে না গিয়ে তাকে বললাম, ঠিক আছে আমি খোঁজ খবর করে দেখছি। তুই কবে কলকাতা ফিরবি?
– সম্ভবত কালী পুজোর পর।
– আচ্ছা, বেশ।
– তবে এখন রাখি। বলে, লিটন ফোনটা কেটে দিল। আমার সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল শান্তার কথা। ওর সাথে একবার এ ব্যাপারে কথা বলে দেখব নাকি?

মে মাসের মাঝামাঝি। প্রচন্ড গরম পড়েছে। রাস্তার পীচ গলতে শুরু করেছে।আমাকে ঘরের এসির আরাম ছেড়ে অফিসে বেরোতে হয়। এসি ট্যাক্সি ধরে অবশ্য অফিসে যাই। অফিসেও এসি আছে। তবু কেন আমার গরমে এত অস্বস্থি বোধহয়, আমি বুঝতে পারি না। লিটন শুনলে নিশ্চয় হেসে বলত, ও তোর লটারির টাকা পাওয়ার গরম। লিটন এভাবেই বেয়ারা সব কথা-বার্তা বলে। আমি তার এইসব কথার কোনও গুরুত্ব দিই না। আমি না দিলে কী হবে? অন্যরা তার কথার বেশ গুরুত্ব দেয়, আর তাই নিয়ে গুজব রটায়।
লিটন নিজের বিয়ের জন্য ডিভোর্সি মেয়ে খুঁজতে বলে, চার-পাঁচ মাস আর কোনও যোগাযোগ রাখেনি। ফোন করলে, মোবাইল সুইচ-অফ দেখাছে। ও কী তাহলে এখন আটারি-ওয়াঘা সীমান্তে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের ডিউটিতে আছে? সেখানে যাওয়ার কথা আছে আগে বলেছিল একবার। যেতেও পারে। ভাগ্যিস আমি আগে থেকে শান্তাকে বলিনি আমি কিছু। বললে, কী ভাবত শান্তা, কে জানে?

(পর্ব – আট).

বছর শেষ হয়ে আসছে দেখে, অফিস থেকে দু’দিনের জন্য ছুটি নিয়ে, সাতাশে নভেম্বর লালীকে সঙ্গে করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম।
তার দু’দিন আগে পঁচিশে নভেম্বর থেকেই তোড়জোড় শুরু হল বেরুবার জন্য। কাপড়-জামা গুছানো। জামা-কাপড় ছাড়া আর সঙ্গে কি কি নিতে হবে, তার ব্যস্ততায় দু’টো দিন লালীর কোথা থেকে কেটে গেল। আমি যথারীতি কাগজের অফিসে কাজ করতে গেছি।
আগে থেকেই এক ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে রেখেছিলাম, সকাল ছটায় সে গাড়ি নিয়ে আসবে। সেদিন লালীর তুমুল আদরে সারারাত ভাল করে ঘুম হল না। সকালে উঠে বেরবার জন্য বাথরুম সেরে, স্নান করে বেরিয়ে এসে, চা-বিস্কুট খেয়ে নিলাম দু’জনে। ঠিক ছটায় বাড়ির সামনে গাড়ি এসে হাজির হলো। দু’জনে গিয়ে উঠে বসলাম গাড়িতে।

গাড়ি চলতে শুরু করল। মুক্তির আনন্দে আমি মনের ভিতর ডানা মেলে দিলাম।প্রকৃতির কী মনোরম দৃশ্য, ঘর থেকে না বের হলে তা কখনও বুঝতাম না। রাতে ভাল করে ঘুম হয়নি তাই, দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন চোখটা লেগে এসেছিল। লালী জেগে বসে, মুগ্ধ হয়ে বাইরে দৃশ্য দেখছিল।
কলকাতা ছেড়ে হাওড়ায় ঢুকতে বিদ্যাসাগর সেতুতে টোল ট্যাক্স নিল দশটাকা। তারপরই সুমধুর বাতাসের আলিঙ্গনে দু’চোখ জুড়ে ঘুমটা এসেছিল আমার।
গাড়ি খড়গপুরে এসে পড়তে, অশোক ধানুকানি-খড়গপুর টোল পাজা চোখে পড়ল। সেখানে টোল ট্যাক্স নিল একশ পাঁচ টাকা। সোনাপেটিয়া (তমলুক- মিলন নগর) বলে আর এক জায়গায় নিল আশি টাকা টোল ট্যাক্স। এই ভাবে টাকা বিলোতে বিলোতে আমরা গাড়ি নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চললাম। চারিদিকে
অফুরন্ত মনোেরম দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে বিভোর হয়ে চলেছি। এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে চোখ এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ল। চোখ বুঝে রইলাম কিছুক্ষণ নিশ্চিন্তে। কখন তন্দ্রায় আবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম, টের পাইনি। তন্দ্রা ভাঙল হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ায়। লালী হুমড়ি খেয়ে এসে পড়ল আমার উপর।

তারপর আবার ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চলল দ্রুত গতিতে, জ্যামে পড়লেই গাড়ির গতি শ্লথ হয়ে আসে। এই ভাবে এগোতে এগোতে সাড়ে এগারোটায় এসে পৌঁছালাম, মন্দারমণি।
লালী আঙুল তুলে দেখাল, রাস্তার দুপাশে বিশাল বিশাল ভেড়ি, কোথাও বা একদিকে ভেরি আর অন্যদিকে উন্মুক্ত ধানক্ষেত। বেশির ভাগ ক্ষেতেরই ধান কাটা হয়ে গেছে। কোথাও কাটা ধান পড়ে আছে মাঠে, এখনও তোলা হয়নি গোলায়। এইসব দেখতে দেখতে ভিড় কাটিয়ে, জ্যাম এড়িয়ে মন্দারমণি পৌঁছাতে বেলা সাড়ে এগারোটা বেজে গেল।

ঘর আগে থেকে বুকিং করা ছিল না। কয়েকটা রিসর্ট খোঁজ করে দেখার পর, ‘সান রাইজ’ নামে একটা রিসর্ট পছন্দ হল, সেখানে উঠলাম। তারপর সেখানে খাওয়া দাওয়া সেরে বেরোলাম সমুদ্র দেখতে। তখন ভাটার টান, জল সরে গেছে অনেকটা দূরে। বিচ ধরে অনেকটা হেঁটে, সমুদ্রকে ছুঁয়ে এলাম। তারপর ঘরে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম নেমে এল দু’চোখ জুড়ে।

সন্ধ্যায় লালীর ডাকে ঘুম ভেঙে উঠে শুনি সমুদ্রের শো শো গর্জন। বিছানা ছেড়ে উঠে, লালীকে নিয়ে কাছে গিয়ে দেখি, সমুদ্র এগিয়ে এসেছে রিসর্টের সিঁড়ি পর্যন্ত। এখন জোয়ারের সময়। সামনেই পূর্ণিমা বলে আকাশে প্রায় পূর্ণ বিকশিত চাঁদের আলো, ঢেউগুলোর উপর পড়ে রূপালী রেখার ঝিকিমিকি করছে।
সে দৃশ্য শুধু অনুভব করা যায়, বর্ণনা করা যায় না। কিভাবে তার রূপ-বিভার বর্ণনা করব? চাঁদের মোহময় এক আকর্ষণে চোখের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরান যায় না।
একবার চাঁদ দেখি, আকাশের বুকে নক্ষত্রদের মিটিমিটি হাসি, দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সমুদ্রের গর্জন শুনে দৃষ্টি আবার নেমে আসে সমুদ্রের বুকে, তার তীব্র শো শো গর্জন অজান্তে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে আসে সেদিকে। মুগ্ধ বিস্ময়ে, বিমূঢ় ভাবে দু’ঘন্টা যেন মুহূর্তে কেটে গেল আমাদের ! বুকের ভিতর সমুদ্র তার রূপবৈভব নিয়ে ঢুকে পড়ে। রাতে এসে ঘুমের ভিতরও সে তার স্বপ্নের রাজ্য বিস্তার করে মুগ্ধ করে রাখে আমাকে।
বাস্তবে যা করতে পারিনি স্বপ্নে তা করে ফেলি। স্বপ্নের ভিতর সাতার কাটতে কাটতে মাঝ সমুদ্রে চলে যাই। সেখানে ঢেউ তত উত্তাল নয়। কত রকম সামুদ্রিক প্রাণী আমাকে দেখতে ছুটে কাছে চলে আসে। স্থলভূমির প্রাণীকে ওরা যেন বিমূঢ় বিস্ময়ে দেখে অভিভূত হয়। তাদের মধ্যে অতি উৎসাহী কেউ কেউ গা ছুঁয়েও দেখে যায় আমাকে। জলে ডাঙার উপদ্রপ ভেবে, সব শেষে একটা তিমি মাছ নাক দিয়ে জলের ফোয়ারা ছিটাতে ছিটাতে তীব্র গতিতে ছুটে আসে, যেন সে গিলে খাবে আমাকে। ভয়ে আমার ঘুমটা ভেঙে যায়। মনে মনে ভাবি, ভাগ্যিস স্বপ্ন ছিল এটা। না হলে এতক্ষণে আমি তিমির পেটে চলে যেতাম।
আমার স্বপ্নের কথা শুনে লালী বিস্ময়ের স্বরে বলে, তাই নাকি?
– হ্যাঁ।
– আমি সঙ্গে থাকলে, তিমি মাছটাকে মেরে তাড়াতাম।
তার কথা শুনে আমি হো হো করে হেসে ফেলি।
– হাসছো কেন?
– কোমড়ে আঁচল জড়িয়ে, তোমার রণচন্ডী মূর্তির কথা ভেবে।
শুনে, লালীও মুচকি হাসল।

প্রথমদিনটা এভাবেই মন্দারমণিতে সুন্দর কেটে গেলে আমাদের। রিসর্টে চা-বিস্কুটের অর্ডার দিয়েছি, ইন্টার কলের মাধ্যমে। এখনই এসে যাবে। লালী বাথরুমে ঢুকেছে, ফ্রেস হয়ে নিতে। আমি বিছানায় বসে আছি। একটি ছেলে এসে, একটা ট্রে-তে করে দু’কাপ আর বিস্কুট এনে দিয়ে গেল। চা পান সেরে বেলা দশটার মধ্যে আমরা তাজপুরের উদ্দেশ্যে গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম। সেখানে পৌঁচ্ছে সমুদ্রের সঙ্গে দেখা হল না। কারণ সে তখন ভাটার টানে অনেক দূরে সরে গেছে। অনেকগুলি পাথের স্ট্যাচু দেখলাম,
সবই সামুদ্রিক প্রাণীর – কোনটা কাঁকড়া, কোনটা মাছ, কোনটা বক এইসব নানা রকমের সামুদ্রিক প্রাণীর পাথরের স্ট্যাচু দেখে মুগ্ধ হলাম। ওখানে খু্ব ডাব বিক্রি হয় দেখলাম, সকলেই খাচ্ছে দেখে আমরাও খেলাম দুটো, প্রতিটির দাম নিল ত্রিশ টাকা করে।
সেখান থেকে বের হলাম বেলা বারটায়, দিঘার উদ্দেশে। চাউল খোলা জায়গাটা একটা জংশন। যেখানেই যাও, চাউল খোলা হয়ে যেতে হবে। আমাদের গাড়িও চাউল খোলা ফিরে এলো। তারপর গাড়ি ঘুরলো দিঘার দিকে। বিশ্ব বাংলার তৈরী দিঘার তোরণগেট পেরিয়ে গাড়ি চলল দিঘার সমুদ্র-তটের দিকে। খিদেও পাচ্ছে বেশ টের পেলাম। দিঘায় নেমে একটা হোটেলে ঢুকে পেট পুরে খেতে হবে।
দিঘায় এসে একটা ভাল হোটেল দেখে ঢুকে পড়লাম। সোখানে ভাত, ডাল, আলুভাজা, ফুল কপির তরকারি, মাছের-কারি, দই খেলাম তৃপ্তি করে। দাম মিটিয়ে দিয়ে দিঘার পাড়ে গিয়ে বসলাম কিছুক্ষণ। সামুদ্রিক উদ্দাম বাতাসে, শরীর জুড়িয়ে গেলো।
জোয়ারের টানে, সমুদ্র গর্জন করে এগোচ্ছে সামনের দিকে। কী মোহময় তার আকর্ষণ ! কোন ভাবেই উপেক্ষা করার উপায় নেই। মন্দারমণির থেকে এখানে সমুদ্রের উচ্ছাস অনেক বেশি। তাই যেন তার আকর্ষণও বেশি।
অনেকক্ষণ সেখানে বসে কেটে গেল। এবার আমরা যাব দিঘার মোহনা দেখতে যাব। তাই বাধ্য হয়ে এখান থেকে উঠে পড়তে হলো। একশোগ্রাম কাজু বাদাম কিনে নিলাম একশ টাকা দিয়ে। গাড়িতে উঠে দু’জনে কাজু বাদাম খেতে খেতে চললাম মোহনার উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌচ্ছাতে ছ’টা বেজে গেল।

এটা আন্তর্জাতিক মাছের বাজার। মাছের আসটে গন্ধে পরিবেশ মাতোয়ারা। গা গুলিয়ে উঠে। লালী নাকে শাড়ির আঁচল চাপা দিল। তবুও এগোলাম সামনের দিকে। গিয়ে পৌঁছালাম দিঘার মোহনায়। চম্পা নদী মিলেছে সমুদ্রের সঙ্গে। দুটি জলধারা দু’রকম। আর একটা থেকে আর একটা আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে, স্পষ্ট দু’টি জল ধারার গতি। রঙও ভিন্ন, জলের স্বাদও ভিন্ন। দুই ধারার জল হাতের কোষে তুলে নিয়ে আমি জিবে দিয়ে দেখেছি, নদীর জলের স্বাদ মিষ্টি, আর সমুদ্রের জলের স্বাদ নোনতা।

সেখানে এককেজি ইলিশ মাছের দর করলাম। দাম কম নয় মোটেও। কলকাতার মতোই দাম। বারশো টাকা করে চাইল। হাজার টাকা করে দেবে বলল। গড়িয়াহাট মার্কেটেও দরদাম করে হাজার টাকা করে কেনা যায়।
চম্পা নদীর ধারে একটা চায়ের দোকানে বসে চা খেয়ে, সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে, গাড়ি নিয়ে আবার চাউল খোলা হয়ে মন্দারমণির ‘সান রাইজ’ রিসর্টে ফিরে এলাম রাত ন’টায়। রিসর্টে দাম বেশি জেনেও সেখানে রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে দিলাম, রুটি আর মুরগীর কষা মাংস। তৃপ্তি করে খেলাম দু’জনে।
খাওয়া দাওয়া সেরে রিসর্টের সিঁড়ি দিয়ে নেমে সমুদ্র পাড়ে বসে কিছুটা সময় কাটিয়ে ঘরে ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম।সারাদিনের পরিশ্রমে দু’জনে এত ক্লান্ত ছিলাম যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টের পাইনি। এক ঘুমে ভোর হয়ে গেল। ভোরে একবার সঙ্গম করে, দু’জনেই গা গরম করে নিলাম।
তারপর গা-ঝারা দিয়ে উঠে পড়ে, দু’জনেই বাথরুমের কাজ সেরে, গায়ে গরম-চাদর জড়িয়ে নিয়ে, রুম লক করে রিসর্ট থেকে বেরিয়ে এলাম দু’জনে। দেখলাম রিসর্টের উল্টো দিকে খেজুরের রস বিক্রি হচ্ছে। এগিয়ে গেলাম সেদিকে। সেখানে দশটাকা করে দু গ্লাস টাটকা রস পান করে মনটা ভরে গেল আমাদের। শহরে রসের এ’রকম স্বাদ কখনও পাওয়া যাবে না। সেখানে গুড় জ্বাল দেওয়া হচ্ছে দেখে,একশটাকা কেজি দরে এক কেজি নলেন পাতলা গুড়, আর একশ চল্লিশ টাকা কেজি দরে এক কেজি নলেন পাটালি গুড় কিনে নিলাম।
মন্দারমনির সমুদ্র তীরবর্তী সৈকত অঞ্চলে, বা তার আশেপাশে থেকে কিছুটা দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু খেজুর গাছের সারি। এই গাছগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে গুড় তৈরির ব্যবস্থা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই খেজুর বনের আসে পাশে বা অনতিদূরে গুড় তৈরির কারিগররা অস্থায়ী বসতি গড়ে নিয়ে, বসবাস করে। খেজুর গাছগুলো ইজারা (Lease)৷ ৷ নেওয়া হয় । কারিগরদের অস্থায়ী বসতি তৈরি হয় বাঁশ, বেড়া ও শুকনো খেজুর পাতা দিয়ে। কারিগরদের অনেকেরই স্থায়ী বাড়ি কাঁথি এবং নন্দ কুমার। এরা এখানে গুড় তৈরী করতে আসে।

এবারে আসি গুড় তৈরির প্রক্রিয়ায়। খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরি করার পদ্ধতি সহজ হলেও তা বেশ পরিশ্রম সাপেক্ষ ও কষ্টকর কাজ। সন্ধ্যায় বা রাতে খেজুর গাছের মাথায় চড়ে পাত্র বেঁধে দিয়ে আসতে হয়, এবং আগের দিনের বাঁধা পাত্রটি রস সমেত খুব ভোরে উঠে নামিয়ে আনতে হয়। পাত্র হিসেবে আগে মাটির হাঁড়ি বা ঘট ব্যবহার করত। এখন প্লাস্টিকের বোতল, কৌটো বা ড্রাম জাতীয় পাত্র ব্যবহার করে। আগের দিনের রস সমেত পাত্রটি নামিয়ে এনে সেটার বেশিরভাগটাই গুড় তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। গুড় তৈরির জন্য সেই খেজুর রস একটি বিশাল আয়তকার পাত্রে (দেখে যতদূর মনে হয় পাত্রটি টিন বা অ্যালুমনিয়ামের তৈরি) ঢালা হয়। তারপর সেই পাত্র মাটির তৈরি উনুনের উপর কাঠের তীব্র জ্বালে বসিয়ে ফোটাতে হয়। মাঝে মাঝে শুকনো গোছা বাঁধা পাটকাঠি দিয়ে নেড়ে দিতে হয়। কাঠের জ্বালে সেই খেজুর রস ফুটতে ফুটতে ধীরে ধীরে গুড়ে পরিণত হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটা হতে সময় লাগে প্রায় সাত আট ঘণ্টা। কারিগররা সকালবেলা ছ’টা নাগাদ এই খেজুর রসের জ্বাল বসায় এবং তা গুড়ে পরিণত হতে প্রায় বেলা ১-২ টো বেজে যায়। তারপর সেই গুড় উনুন থেকে নামিয়ে বেতের চাটাই দিয়ে ঢেকে রাখা হয় ঠাণ্ডা করার জন্য। বিকেলবেলা টাটকা জমাট বাঁধা গুড় পাওয়া যায়। একটা আয়তকার পাত্র থেকে ২৫ থেকে ৩০ কেজি গুড় পাওয়া যায়।
খেজুর রসের বেশিরভাগটাই গুড় তৈরির কাজে ব্যবহৃত হলেও কিছুটা রস সকালের পানীয় হিসবেও বিক্নি করা হয়। স্বচ্ছ খেজুর রস খালি পেটে খেলে নাকি খুব উপকার পাওয়া যায়। পেটের সমস্যা কেটে যায়, হজম শক্তি বেড়ে যায়। তবে সেই রস পান করতে হবে সকাল সকাল-ই। যত সকাল সকাল খেজুরের রস খালি পেটে খাওয়া যাবে, ততই উপকার। তবে যত বেলা বাড়বে, স্বচ্ছ খেজুর রস তত ঘোলা হতে হতে হেজে যাবে। তখন তা নেশার পানীয়তে পরিণত হয়।

আজ এগারোটায় ঘর ছেড়ে দিতে হবে। তার আগেই সব গুছিয়ে ব্যাগে ভরে নিলাম। বাথরুমে ঢুকে, সেরে স্নান করে নিলাম। রিসর্টেই চা খেলাম দু’কাপ। পনেরো টাকা করে এককাপ চায়ের দাম নিল। ট্যুরিষ্ট প্লেস বলেই বোধহয় , এখানে সব কিছুরই দাম একটু বেশি করে নেয়, দেখলাম। রিসর্টের ভাড়া ছিল পার ডে দেড় হাজার টাকা করে। রিসর্টে এডভান্স কিছু দেওয়া ছিল, বাকি টাকা মিটিয়ে রিসর্ট ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম। এবার বাড়ি ফেরার পালা।
দুপুরে কোলাঘাটে গাড়ি থামিয়ে দুপুরের খাবার খেলাম। তারপর গাড়ি আবার দ্রুত বেগে চলতে শুরু করল কলকাতার উদ্দেশ্যে নিরিবিছিন্নভাবে । মাঝে মাঝে চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছে। তবু যতটা সম্ভব জেগে থাকার চেষ্টা করছি। চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ঘুমে ঢুলেও পড়ছি। আবার জেগে উঠে দেখছি যতটা সম্ভব হয়।
আমি বললাম, লালী কেমন লাগল আমাদের এই সফর?
লালী আবেগের সুরে বলল, এই দুটো দিন আমার জীবনের অমূল্য সঞ্চয় হয়ে রইল।
– সত্যি?
– নির্ভেজাল সত্যি, বিভিন্ন স্পটে তোলা ছবিগুলো ভবিষ্যতে দেখব, আর স্মৃতিচারণ করে মনে মনে অপার আনন্দ পাব। সেটাই বোধহয় এই সফরের স্বার্থকতা। তাই নয় কি, তুমি কি বল?
– একদম ঠিক বলেছ। আমি তার কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

(পর্ব – নয়).

অফিসে বসে কাজ করছি। বেলা তিনটা বাজে। এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠল। মোবাইল তুলে দেখি, সুবীর সান্যাল ফোন করেছে।
ফোন ধরে বললাম, বল, কি ব্যাপার।
– মিতালি আমায় ছেড়ে চলে গেছে।
– কি বলিস তুই?
– সত্যি বলছি। তুই একবার আসতে পারবি?
– কোথায়?
– আমার ফ্ল্যাটে?
– বেশ যাব।
– কখন আসবি?
– এখন তো অফিসে আছি, পাঁচটার পরে যাব।
– আচ্ছা ঠিক আছে।
সুবীর ফোন কেটে দিল।

বাড়ির অমতে বিয়ে করার পর, সুবীর থাকে পাটুলিতে একটা ভাড়ার ফ্ল্যাটে।
ওদের বাড়ি আসলে গড়িয়ার নয়াবাধে। সেখানে ওর মা বাবা আর এক বোন থাকে।
আমি পাঁচটার পর অফিস থেকে বেরিয়ে লালীকে একটা ফোন করলাম। লালী ফোন ধরতেই বললাম, একবন্ধুর ফ্ল্যাটে বিশেষ দরকারে যাচ্ছি। আমার ফিরতে একটু দেরি হতে পারে। তুমি খেয়ে নিয়ো।
– আচ্ছা।
– ঠিক আছে, রাখছি। বলে ফোন কেটে দিলাম আমি।
এরপর সুবীরকে ফোন করলাম।
সুবীর ফোন ধরতেই বললাম, তুই ফ্ল্যাটে আছিস তো? আমি আসছি।
– হ্যা, আয়।

রুবির সামনে থেকে অটো ধরে আধ ঘন্টার মধ্যে ওর ফ্ল্যাটে পৌঁছে গেলাম। ফ্ল্যাটের দরজা খোলা ছিল। ঠেলা দিতেই খুলে গেল। ঢুকে দেখলাম, দরজার দিকে পিঠ দিয়ে, উল্টো দিকে মুখ করে বসে, সুবীর মগ্ন হয়ে ইজেলের ক্যানভাসে ব্রাস বুলাচ্ছে। আমি ঢুকেছি, টের পায়নি। ওর বাঁ পাশে, অদূরে দেখলাম, টেবিলে গ্লাস আর হুইস্কির বোতল খোলা পড়ে রয়েছে। আমি ওর মনোসংযোগ নষ্ট না করে, টেবিলের পাশে, চেয়ারে গিয়ে বসলাম। গ্লাসে, বোতল থেকে খানিকটা হুইস্কির ঢেলে, জলের বোতল থেকে জল মিশিয়ে নিয়ে, একটা চুমুক দিয়ে সুবীরের ক্যাসভাসে ব্রাস বোলানো দেখতে লাগলাম। কখনও নীল রঙের ব্রাস, কখনও লাল রঙের ব্রাস আবার কখনও অন্য কোনও রঙের ব্রাস দিয়ে ক্যানভাস ভরে তুলছিল। এমন করে আধঘন্টা কাটল। আমি ততক্ষণে আমার গ্লাস শেষ করে ফেলেছি।
একসময় ও ব্রাস রেখে মদে চুমুক দিতে এসে, আমায় দেখে বলল, কিরে? কখন এসেছিস?
– এই কিছুক্ষণ।
– ওহ্। বলেই সুবীর খালি গ্লাসটায় খানিকটা হুইকি ঢেলে, জল না মিশিয়ে র-অবস্থায় গলায় ঢেলে দিল। তারপর ক্যানভাসটা একটা ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিয়ে এসে, একটা চেয়ার টেনে নিয়ে, আমার মুখোমুখি বসল। ঝিম মেরে খানিকক্ষণ বসে থাকার পর, বলল, ভালবাসার কোন মূল্য নেই। টাকাই সব।
আমি সুবীরের কথা শুনে বললাম, কেন?
– আমার ছোটবোন রুমির মুখে শুনেছি। রুমি দু’দিন আগে ফোন করে জানিয়েছিল, মায়ের খুব শরীর খারাপ হয়েছে, তারপরই খবর পাই আমার একটা ছবি ত্রিশ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। ভেবেছিলাম টাকাটা বাড়িতে পাঠাব।
ত্রিশ হাজার টাকায় আমার ছবি বিক্রি হয়েছে শুনে মিতালি বলল, ওই টাকায় ওকে একটা নেকলেস কিনে দিতে হবে। আমি বললাম না।
ওই টাকা আমি বাড়িতে পাঠাব, মায়ের খুব শরীর খারাপ।
– কে বলল?
– রুমি।
– বেশ, তুমি তোমার রুমিকে নিয়ে থাক, আমি চললাম। কী কথার শ্রী বল। তারপর, নিজের বাক্স গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে গেল। ভালবেসে বিয়ে করে, ওর কথায় আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে, দু’বছর ঘর করলাম। তার এই পরিণতি?
– তুই কিছু বললি না ওকে?
– না। রুমি আমার ছোট বোন। ওকে নিয়ে আমায় থাকতে বলেছে। এরপর আর কি বলব?
আমি কথা ঘোরাবার জন্য বললাম, তা এতক্ষণ মগ্ন হয়ে কি আঁকছিলি?
– মিতালির ছবি।
– কেন?
– মনের ভিতর চিরস্থায়ী করে ধরে রাখতে না পারলেও, ওকে আমার ছবিতে ধরে রাখব।
আমি আর কোন প্রশ্ন না করে, খালি গ্লাসে হুইস্কি ঢাললাম। জল মিশিয়ে ওর দিকে এগিয়ে দিলাম।সুবীর রান্নাঘর থেকে আর একটা গ্লাস নিয়ে এসে আমার সামনে রাখল। নিজের গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে, নতুন আনা গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে আমার দিকে এগিয়ে দিল। তারপর বলল, এখন আমি কি করি বলতো?
– ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে মা বাবার কাছে ফিরে যা।
– হ্যাঁ, তাই করব ভাবছি।

হুইস্কির বোতল শেষ করে, আমি সাড়ে সাতটার সময় ওর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এলাম। সাড়ে আটটার মধ্যে আমার ফ্ল্যাটে এসে ঢুকলাম। লালী তখনও খায়নি। দু’জনে একসঙ্গে খেতে বসলাম। আটার রুটি আর কষা মাংস।
খাওয়া-দাওয়া সেরে দু’জনে বিছানায় এসে বসে,
কিছুক্ষণ গল্প করে, চোখে ঘুম চলে আসায় টিউব-লাইট নিভিয়ে দিয়ে, নাইট ল্যাম্প জ্বেলে শুয়ে পড়লাম। মনে মনে ভাবলাম, লালীর পাশে এইভাবে শুয়ে থাকব, একবছর আগেও এটা অবিশ্বাস্য ছিল আমার কাছে। যেমন একবছর আগে সুবীরের কাছে অবিশ্বাস্য ছিল, মিতালি তাকে ছেড়ে চলে যাবে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, টের পাইনি। ঘুম ভাঙল লালীর ডাকে।
– ওঠে, হাত-মুখ ধুয়ে এসো, চা হয়ে গেছে।
আমি বিছানা ছেড়ে উঠে, বাথরুমে চলে গেলাম।
বাথরুমে দাঁত ব্রাস করতে করতে মনে পড়ল। আজ শনিবার। আমার অফিস নেই। আনন্দে মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে, চায়ে চুমুক দিয়ে, লালীকে বললাম।
– আজ কোথায যাবে বল?
– কোথাও যার না। সারাদিন তোমার সঙ্গে ঘরে বসেকাটাব।
– কি করে?
– লুডু খেলে।
শুনে আমি হো হো করে হেসে উঠলাম।
লালীও হি হি করে হাসতে লাগল।
আমি কৌতূকের সুরে বললাম, কি লুডু খেলবে, সিঁড়ি ভাঙা?
লালী রহস্যময় হেসে বলল, না সাপ-লুডু।
হাসলে লালীকে এত সুন্দর দেখায় আগে এটা লক্ষ্য করে দেখিনি। আজ দেখলাম, কী যে মিষ্টি
লাগে, কি বলব?
মনেহয় যেন একটা ঝরনা খিল-খিল করে হেসে আমার বুকে এসে ঝাপিয়েে পড়ছে। চা শেষ করে, আমি লালীকে নিবিড়ভাবে বুকে টেনে নিয়ে আশ্লেষে জড়িয়ে ধরলাম।

(পর্ব – দশ).

আমি নিজেকে যতটা বুদ্ধিমান, সাহসী আর প্রতিবাদী ভাবতাম, আসলে তা নয়, বুঝতে আমার ত্রিশ বছর কেটে গেল। আমিও আর পাঁচজন মানুষের মতো লোভী, স্বার্থপর ও ভীরু। লিটন কাছে থাকলে বলত, ভীরু নয়। ভেড়া।
আমি না পারি লিটনের মতো দেশ রক্ষার কাজে এগিয়ে যেতে। না পারি তুষারের মতো কবিতা লিখতে। যে লিখতে পারে, “হো হো করে হাসি বলেই / তোমরা আমার গোপন কান্না শুনতে পাও না।”
কিংবা
“মৃত্যুই শেষ কথা তারপর কিছু নেই আর”।

আমরা সকলেই এ কথা জানি, কিন্ত এভাবে বলতে পারি ক’জনে? আমি তো পারি না। আবার আমি সুবীরের মতো চিত্রকলায়, জীবন তুলে ধরতে পারি না। আমি খুব সাধারণ।
কিন্তু নিজেকে এতকাল অসাধারণ ভেবে এসেছি। কিন্তু তা নয়। আমার নিজেকে নিরাপদ অবস্থানে রেখে, মাঝে মাঝে গন্ডি পেরিয়ে বৃত্তের বাইরে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। কিন্তু সাহসের অভাবে তা আর কুলায় না।
লটারীর আঠাশ লাখ টাকা পাওয়ার পর ভেবেছিলাম, অন্যায় দুর্নীতির বিরুদ্ধ প্রতিবাদ করার জন্য কাগজের অফিসের কাজটা ছেড়ে দিয়ে নিজেই ‘সত্যান্বেষী’ নামে একটা নিউজ পোর্টাল চ্যানেল খুলব, তা খোলা হয়নি বোধহয় আমার মনের গোপন ভীরুতার জন্য। পরে ভেবেছিলাম দক্ষিণ চব্বিশ-পরগণা জেলার কোনও গ্রামে গিয়ে কিছু জমি কিনে কৃষি-খামার তৈরী করব। উদ্যোগের অভাবে, তাও করা সম্ভব হয়নি। একবছর পার হয়ে গেছে।
এখন মনেহয় এসব ঝামেলায় মধ্যে না জড়িয়ে পড়ে, কোন রকম সামাজিক বন্ধনের মধ্যে জড়িয়ে না পড়ে, এই তো বেশ নিশ্চিন্তে দিন কাটছে আমার অবনীবাবুর বিয়ে করা বউকে নিয়ে। ওকে আমার নিজের বউ বলে মনেহয় না। মনেহয় আমার প্রেমিকা। বন্ধনহীন বন্ধন যেন। লালীর প্রতি আমার দায় আছে ঠিকই। কিন্তু বিয়ে করা বউয়ের মতো অতটা দায়ভার নেই। অনেকটা ফুরফুরে সম্পর্ক। লালীকে দেখে, তার আচার-আচরণ দেখে মনেহয়, সেও বেশ নিশ্চিন্তে আছে, আমাকে জীবন-সঙ্গী পেয়ে। অবনীবাবুকে হারিয়ে তার মনে কোনও আপসোস আছে বলে মনেহয় না আমার।
লালীর সম্পর্কে আমার দায় আছে বলেছি। কেমন দায় আছে?
তার ইচ্ছে খুশি পূরণ করা। শরীর খারাপ হলে ডাক্তার দেখানো। তার সুবিধা অসুবিধা দেখা।
আর দায়ভার নেই বলছি কেন?
লালীর আমার কাছে কোন দাবী নেই। না সিঁদুর পরে স্ত্রীর মর্যাদা পাওয়ার দাবী। না সম্পতির ভাগীদার হবার দাবী। না সন্তানের দাবী।
আর বলেছি মুক্ত জীবন এই কারণে যে, সে আমার কোনও কাজে কখনও বাধা দেয় না।
আপনারা যদি ভাবেন, লালীকে নিয়ে আমি সুখি?
ভীষণ সুখি, সন্দেহ নেই। আমার মনে পড়ছে, তুষার মিত্রের সেই কবিতাটা –
‘সন্তান চাই না আমি
শুধুমাত্র তোমাকেই চাই,
এই শর্তে ভালবাসা হোক।’
এইকথা বলে এক চতুর যুবক
যদি জালে দেয় টান,
সমাজ সংসার ভেঙে
হয়ে যেতে পারে খানখান।
গেলে যাক
এইসব কূট তর্ক
কালের ঝাঁপিতে তোলা থাক।

এই কথাগুলো একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে ভালোবাসার দাবি এবং সামাজিক রীতিনীতির মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যায়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, সম্পর্ক এবং সমাজের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হতে পারে।
এই পংক্তিগুলিতে, একটি ছেলে (“চতুর যুবক”) তার ভালোবাসার নারীকে বলছে যে, সে সন্তান চায় না, শুধুমাত্র তাকেই চায়, এবং এই শর্তে সে ভালোবাসতে রাজি আছে। এই কথাটি আপাতদৃষ্টিতে ভালোবাসার গভীরতা দেখালেও, এটি সমাজে প্রচলিত ধারণা ও রীতিনীতির বিপরীত। এই ধরনের সম্পর্ক সমাজের চিরাচরিত ধারণা ও মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষ সৃষ্টি করে।
যদি এই শর্তে কেউ ভালোবাসতে রাজি হয়, তবে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক হয়তো টিকে যেতে পারে, কিন্তু এর ফলে সামাজিক কাঠামোতে আঘাত লাগতে পারে। কারণ, সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, একটি সম্পর্কে সন্তান আসাটা স্বাভাবিক এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিতও বটে। এখানে, “সমাজ সংসার” বলতে প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি, বিবাহ এবং পরিবারকে বোঝানো হয়েছে। কেউ যদি সন্তান ধারণের সামাজিক বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হয়ে শুধুমাত্র ভালোবাসার সম্পর্কটিকে গুরুত্ব দিতে চায়। তবে, এই চাওয়া সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ও সংস্কারের বাইরে, যা ভাঙন সৃষ্টি করতে পারে।এই পরিস্থিতিতে, ছেলেটির এই শর্ত ভালোবাসার গভীরতার চেয়ে বেশি, সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির প্রতি একটি বিদ্রোহের ভাব প্রকাশ করেছে।
যদি এমন পরিস্থিতিতে কেউ পা দেয়, তবে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেমন ভাঙতে পারে, তেমনি সামাজিক সম্পর্কও ভেঙে খান খান হয়ে যেতে পারে। কারণ, এই ধরনের সিদ্ধান্ত সমাজের বৃহত্তর অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
সুতরাং, এই পংক্তিগুলি একটি জটিল পরিস্থিতি উপস্থাপন করে, যেখানে ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব দেখা যায়।
এখন আমার প্রশ্ন, আমি কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দেব? সামাজিক প্রত্যাশা নাকি আমার ব্যক্তিগত পছন্দ? অবশ্যই আমার ব্যক্তিগত পছন্দ। সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে আমি আমার আমার ব্যক্তিগত পছন্দ জলাঞ্জলি দিতে যাব কেন? যেখানে সমাজে বদনামের ভয়ে আমার জন্মদাত্রী, জন্মের পরেই আমাকে গোপনে রাস্তার পাশে ঝোঁপের আড়ালে, জলাঞ্জলি দিয়ে চলে গিয়ে সামাজিক প্রত্যাশা পূরণ করেছিল। তাতে সমাজের লাভ হয়েছে কতটা?

(পর্ব – এগারো).

মাস পাঁচেক কেটে গেছে। লিটনের কাছ থেকে কোনও ফোন পাইসি। মাঝে দু”একবার ওকে ফোন করে, সুইচ অফ দেখেছি।
আজ হঠাৎ সুবীর ফোন করে জানাল, আজ লিটনের কফিন বাড়িতে আসবে। তুই কি আসবি?
– বলিস কি তুই?
– হ্যাঁ লিটন পাক রেঞ্জারের গুলিতে মারা গেছে।পাঁচজন পাক সৈন্য খতম করে বীরের মতো যুদ্ধ করে নিহত হয়েছে আমাদের লিটন। দেশের গর্ব।
সুবীরের কোন কথা আমার মনে ঢুকে হৃদয় স্পর্শ করছিল না। ভাবতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, যে লিটন আর বেঁচে নেই।
দেশ রক্ষার ব্রত নিয়ে, সে নিজেই নিজেকে রক্ষা
পারল না। আপ্রাণ শত্রুর সঙ্গে য়ুদ্ধ করে প্রাণ দিল। তাতে দেশের হয়তো লাভ হল। কিন্তু লিটনের মতো একটা প্রাণ উচ্ছ্বল ছেলের কি লাভ হল ভাবি আমি স্বার্থপরের মতো। লিটন তো পারত শান্তাকে বিয়ে করে একটা সুখি জীবন, যাপন করতে। ভাগ্যিস ওয়াঘা ফ্রন্টে যাওয়ার আগে বিয়ে করে যায়নি। তাহলে তো শান্তা আজ, ডিভোর্সি থেকে বিধবা হতো। এতে হয়তো তার আর্থিক কিছু লাভ হতো। শান্তার জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আসত। তাও তো মন্দ হতো না।
লিটনের কথা ভাবতে ভাবতে আমি আমার পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা জীবনের কথা ভাবি। আমাকে তো আমার জন্মদাত্রী আমার মরণ কামনা করে রাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে গেছিল নিশ্চিন্ত মনে। আমার পালক পিতা হরিহর সামন্তের অসীম কৃপায়, এক পুটলি শিশুর প্রাণ বাঁচিয়ে, নিজের সন্তানের পরিচয়ে তিনি আমাকে বড় করে, পড়াশুনা শিখিয়ে মানুষ করেছেন, এই সমাজে আমাকে সসম্মানে বাঁচার অধিকার দিয়েছেন। মার অসীম স্নেহে আমি জন্মদাত্রীর অভাব বোধ করিনি কখনই। হঠাৎ বাবার মৃত্যুর পর, কি করব আমি বুঝতে পারিনি। কি করে সংসার চলবে? খবরের কাগজের অফিসে সম্পাদকের সহকারী হিসাবে কাজ করার, একটা সুযোগ আসায়, আমি তা’তে ঢুকে পড়ি। তারপর ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে লটারির পঞ্চাশ লাখ টাকা প্রাপ্তি (হাতে প্রাপ্তি আঠাশ লাখ)। সব শেষে প্রাপ্তি জীবন সঙ্গী হিসাবে লালীর সান্নিধ্য লাভ।
এইসব প্রাপ্তি নিয়ে বর্তমানে আমি বেশ সুখেই আছি।
সুবীর আবার জানতে চাইল, তুই কি আসবি?
– কোথা থেকে ফোন করছিস তুই?
– পাটুলি থেকে।
– তুই কি এখনও ওখানেই আছিস?
– হ্যাঁ। তোকে বলা হয়নি মিতালি আবার ফিরে এসেছে।
– কবে?
– দু’তিন দিন পরই।
– তাই নাকি? বেশ ভাল খবর। কংগ্রাচুলেশন।
– তুই কি আসবি?
– না। বলে আমি ফোনটা কেটে দিলাম।
লিটনের মতো একজন প্রাণবন্ত বন্ধুর লাশ দেখতে মোটেও ইচ্ছে হচ্ছে না আমার।
পুরনো দিনের লিটনের স্মৃতিচারণে বিভোর হয়ে পড়লাম। একদিনের কথা মনে পড়ল। আমার বয়স তখন মাত্র উনিশ, সাউথ সিটি কলেজে পড়ি। আমি আর আমার বন্ধু লিটন প্রায়ই গড়িয়াহাট মোড়ে অফ পিরিয়ডে, চা সিগ্রেট টানতে টানতে আড্ডা দিতাম।
পুজোর সময় দু’জনে একসঙ্গে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়াতাম, প্রতিমা দেখতে নয়, প্রতিমার মতো মুখ খুঁজতে। তবে আমরা আজ-কালকার ছেলেদের মতো, আওয়াজ দিতাম না মেয়েদের, তবে কোন সুন্দরী মেয়ে দেখলে বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠত।
সে’বার ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে, আমি আর লিটন হাঁটছি, গল্প করছি, সিগ্রেট টানছি, কিন্তু চোখ দু’টি উৎসুক হয়ে খুঁজছে কোনও সুন্দরী মুখ। দেশপ্রিয় পার্কের পূজা প্যান্ডেলে বেশ ভিড়। হঠাৎ এক পলকের মধ্যেই আমার চোখ আটকে গেল একটি কিশোরীকে দেখে। যেন আমার নিজের আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমার একার।
পরনে ডুরে শাড়ি, কপালে সবুজ টিপ, কানে মুক্তোর দুল, সারা শরীর দিয়ে যেন লাবণ্য ঝরে পড়ছে। সে পিছনে ফিরে তাকাতেই চোখাচুখি হয়ে গেল। বুকের ভিতর ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। মনেহল এমন রূপ যেন আমি কখনও কোথাও দেখিনি। পর মুহূর্তেই কিশোরী আবার ফিরে তাকাল। বুকের ভিতর এবার দামামা বাজতে শুরু করল আমার।
তারপরই মেয়েটি দু’হাত দিয়ে মুক্তোর দুল দুটি, আমাকে দেখে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যেন আমি কোন চোর-ছিনতাইকারী। এ’রকম চূড়ান্ত অপমান বোধ আমি এর আগে কখনও অনুভব করিনি। মনটা তিতো হয়ে গেল একেবারে। সে কথা জেনে, লিটন বলল, ছাড়তো। কালীঘাটে সংঘশ্রীর ঠাকুর দেখব, চল। ওখানে এর চেয়েও সুন্দর মুখ খুঁজে পাবি।
সেই লিটন আজ বেঁচে নেই। এরকম অন্তরঙ্গ বন্ধু, আমার জীবনে আর আমি কখনও পাব না। হতাশায় আমার মনটা ভরে গেল।
হতাশাভাব কখনও লিটনের মধ্যে দেখিনি। তখন থেকেই ওর সদর্থক অন্যরকম নিজস্ব চিন্তা-ভাবনাগুলি আমায় আকর্ষণ করত। কলেজ পাশ করার পরও, ওর সঙ্গে তাই সম্পর্ক টিকে ছিল আমার। আজ একেবারে ছিন্ন হয়ে গেল। স্বজন হারানোর ব্যথা অনুভব করে মনে মনে কান্না পেল আমার।। চিরকালই আমার বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা কম। মাত্র দু’চার জন ছিল। তার মধ্যে দু’জন গেছে। কবি তুষার মিত্র। আর গেল লিটন বোস (দেশরক্ষী সৈনিক)। এখন আছে সুবীর ছাড়া আর দু’এক জন।

লটারিতে যে আঠাশ লাখ টাকা পেয়েছিলাম তার থেকে কুড়ি লাখ টাকা ফিক্সড করে দিয়েছি দশ বছরের জন্য। প্রতি বছরের শেষে সুদের টাকাটা তুলে নেব। আট লাখ টাকা ক্যাশ রেখেছি। কাগজের অফিসের পারিশ্রমিক পনেরো হাজার টাকা ছাড়া বাড়তি খরচ ওই ক্যাশ টাকা থেকেই করছি।
ভেবে রেখেছি দশবছর পর চাকরি করার পর ছেড়ে দিয়ে গ্রামে গিয়ে জমি কিনে, সেখানে ঘর তুলে বসবাস করব। বাকি জীবনটা সেখানেই কাটিয়ে দেব। বছরে দু’একবার করে লালীকে নিয়ে বাইরে কোথাও ঘুরতে যাব। জীবনে আর কী চাই?

Pages: 1 2
Pages ( 1 of 2 ): 1 2পরবর্তী »

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *