আজও শিউরে উঠি
পদ্মাপাড়ের বাংলাদেশ আজ অশান্ত। প্রশাসনের আগ্ৰাসী মনোভাব।সর্বদা সংখ্যালঘু হিন্দুদের দেশ থেকে বিতাড়িত করবার স্লোগান। হিন্দুবিদ্বেষী এমন খবরে বিভাসের দাদু আতঙ্কিত। তাঁর খুড়তুতো ভাইয়ের ছেলে যে এখনো সেদেশে আছে। ঠিকমত কোনো খবর পাচ্ছেন না। উদ্বিগ্ন দাদু বিভাসকে শোনালেন ১৯৭১ সালে হিন্দুদের উপর বিভৎস অত্যাচারের কথা। কিভাবে ভিটেমাটি ছেড়ে এককাপড়ে উদ্বাস্তু হয়ে রাতারাতি পালিয়ে আসতে হয়েছিল তাঁদের। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তাঁদের ভূমি পূর্বপাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৬৫ সালে,ছয়দফা আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় ভাষা উর্দু করলে বাঙালিরা প্রতিবাদ করে। ১৯৬৯ সালে বাংলাভাষার দাবীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীকারের জন্য আলাদা রাষ্ট্র বাংলাদেশ দাবি করে। সেইসময় ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১সালের ২৫শে মার্চ রাতে “অপারেশন সার্চলাইট” শুরু করে। প্রচুর গণহত্যা, মহিলাদের ধর্ষণ, পুরুষদের তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা, লুটপাট অবাধে হতে থাকে। প্রবল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর পাক সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে ভারত -বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর কাছে। সেইসময় পাকিস্তানের খানসেনারা হিন্দুদের ঘরে ঢুকে মেয়েদের ইজ্জত লুণ্ঠন, পুরুষদের খুন, এমনকি শিশুদের পর্যন্ত রেয়াত করেনি।
প্রাণ বাঁচাতে হিন্দুদের শুরু হয় অস্তিত্বের লড়াই। যে যেভাবে পেরেছে সব ছেড়ে তারা ভারতে চলে আসতে থাকে। আমার খুড়তুতো ভাইকে তার বাল্যবন্ধু আরিফ, মুসলমান সাজিয়ে তাদের বাড়ি আশ্রয় দেয়। সেই থেকে ভাই ওদেশে থেকে যায়।
সিলেট শহরের আমাদের বিশাল চা বাগান ছিল। সেইসময় একদিন রাতে পাকসেনা হানা দিয়ে আমার বাবা, কাকা আর দাদাকে তুলে নিয়ে চলে যায়। আমার দাদু তাড়াতাড়ি মেয়েদের এবং সবাইকে বলে বাড়ির পিছন দরজা দিয়ে পালিয়ে যেতে । বললেন, আমি ওদের সামলাচ্ছি। আমরা সাপ, হিংস্র জন্তুর ভয় তুচ্ছ করে চা বাগানে হামাগুড়ি দিয়ে সব পালাতে শুরু করি। কিছুদূর গিয়ে দাদুর আর্তনাদ শুনে বুঝলাম ওরা দাদুকে হত্যা করছে। একসময় আমরা শিলচরে এসে পৌঁছলাম। ভারত সরকার তখন উদ্বাস্তুদের থাকার জন্য বিভিন্ন জায়গায় শিবির তৈরী করেছে। কাতারে কাতারে হিন্দুরা ভিটেমাটি ছেড়ে শিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে। আমাদের কিছু আত্মীয় কোলকাতায় থাকায় আমরা তাঁদের সন্ধানে কোলকাতায় সল্টলেক শিবিরে আসি।
এখন সল্টলেক অভিজাত এলাকা। কিন্তু একাত্তর সালে ছিলো জলাভূমি। শরণার্থী শিবির তৈরীর জন্য সেখানে মাটি ভরাট করে বসবাসের উপযোগী করা হয়। কিন্তু সেখানে পায়খানা তৈরী কঠিন হলো। কারণ মাটি খুঁড়লেই জল উঠছে। শরনার্থীরা পায়খানার জন্য বেছে নেয় জলাধারের আশপাশ অঞ্চল। কী নারকীয় অবস্থা! একই জলাধার ছিলো স্নান, রান্না, মলত্যাগ, শৌচকাজ এবং পানীয় জলের উৎস। বৃষ্টি হলে, বর্ষার সময় সব মিলেমিশে ভয়ঙ্কর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এমন বিভৎস দৃশ্য আজও ভুলতে পারিনা। অত বড় বাড়ি ছেড়ে দাদুভাই আমরা ভিখিরির মত সেই শিবিরে কী কষ্টে কাটিয়েছি আমরাই জানি। দুষিত পরিবেশে শিশুসহ, অগণিত লোক আন্ত্রিক ,কলেরায় মারা যায়। অনেকদিন পর আত্মীয়দের সাহায্যে আমরা কসবায় এখানে আসি। তাই ভাবনা, এবার কী ওর অস্তিত্বের লড়াই শুরু!
