ফিরে এসো সোনার খোকন সারাক্ষণ চুপি চুপি ডাকে
স্বপ্নের ভেতর থেকে গাঢ় স্বরে কে যেনো আমাকে।
তার ডাকে আমার ভেতরে বাজে টুংটাং হীরের গিটার
সারা মন ঢেকে দেয় মায়াবী রঙের পাখি ডানা দিয়ে তার।
কে তুমি আমাকে ডাকো রাশিরাশি কাজের ভেতরে
কোথা থেকে দাও ডাক সোনাঝরা লাল নীল স্বরে?
তোমার পালক ঢাকে আমার শরীর মুখ আঁকাবাঁকা চুল
রামধনু উড়ে এসে ছুঁড়ে দেয় রাশিরাশি রঙিন পুতুল।
আমি তারে বলি–কে তুমি ডাকছো হয়ে এতো স্নিগ্ধ লাল?
আস্তে বললো সে–আমি, আমি তো তোমার বাল্যকাল।
তার স্বরে আমার ঘরের জানালারা হয়ে গেলো গাছ
ঘরটাকে নদী ভেবে বইগুলো হয়ে গেলো মাছ,
দেয়ালের ঘড়িটিতে ডেকে ওঠে দশটি মধুর কোকিল,
আয়নায় দুলে ওঠে শাদা পদ্ম, শাদা আড়িয়ল বিল।
পাখি সব করে রব, খড়কুটো মেঠো ঘাস গেয়ে ওঠে গান,
খেলাঘরে খেলা করে ছেলেবেলা একরাশ স্বপ্নের সমান।
আমি বলি, ভোলো নি আমাকে তুমি সোনার পাখি?
কবুতর গেয়ে ওঠে : তা তো সহজ নয় তুমি জানো না কি?
আমি বলি তোমরা কেমন আছো তোমরা সবাই?
নেচে ওঠে ইলশে : ভালো আছি, আজ আমরা তোমাকেই চাই।
রূপোলি শিশির হয়ে গলে যেতে চায় চারতলা বাড়ি
আমাদের, কানামাছি ভোঁ ভোঁ চলে নিচ ঘরে, ছাদে আড়ি
পাতে কোমল কুয়াশা, বুক ভরে জোনাকিরা জ্বলে আর নেভে
তারা আজ রাতে সারাদেশে লাল নীল আলো জ্বেলে দেবে।
তোমাকে ফিরিয়ে নিতে এসেছি আমরা–গান গায় চিল,
আমার সোনালি ডানা দেখো তুমি সোনালি রুপোলি, খয়েরি ও নীল
তোমার জন্যে। বেহালা শোনাবো আজ, স্বপ্নের মতো রূপকথা
শোনাবো তোমাকে যাদের এসেছে ফেলে সেই পাতালতা।
আবার হিজল ফুল লাল হবে যদি তুমি আজ আসো ফিরে
গান হবে নদীতীরে কাশবনে টুপটাপ নিশির শিশিরে।
আমাকে ডাকলো এসে আমারই বাল্যকাল আজ রাতে
যখন কোমল হ’য়ে গলা বাড়িয়েছে চাঁদ এই আঁধার ঢাকাতে
একটি শিশুর জন্যে। আমাকে দেখেই দিলো মিষ্টি হাতছানি
সবচে রূপসী যিনি সেই আলোঢালী মায়াবতী আকাশের রানী।
তখন শহর ভ’রে অন্ধ লোকেরা সব পথে হাটে বাটে
ভীষণ খুশিতে ফুল ছিঁড়ে দুই হাতে ভাঙে ডাল আর গাছ কাটে।
নিঃশব্দ ব্যথায় কাঁদে গাছ হাহাকার করে ওঠে রাত
গাছের শরীর ফাড়ে মানুষেরা দুই হাতে ধারালো করাত।
চলো আমি যাবো তোমাদের সাথে বলি কেঁদে আমি।
একটি সোনালি চিল বকুলের মালার মতোই এলো নামি
আমার গলায়। বললো সে মনে তুমি রেখো না কো ভয়,
তোমাকে উড়িয়ে নেবো আমার ডানায়। আকাশকে জয়
করে বেঁচে আছি আমি। চিলের ডানায় আমি ও আকাশ
আমাদের সাথী হয় নীল মেঘ রোদ আর নরম বাতাস।
আবার ফিরেছি আমি বাল্যকালে, প্রিয় বন্ধুরা সবাই
আসে নাচে গান গায় ছড়া কাটে নাচে তাই-তাই।
আমি ইলিশ পদ্মার।
আমি মাছরাঙা।
বাকুম বাকুম আমি কবুতর।
তোমার খেলার মাঠ আমি।
আমি তোর আনন্দের স্বর।
আমি ঘুড়ি লাল রঙ।
আমি মারবেল।
আমি তোর বাঁশের লাটাই।
তুই নেই পড়ে আছি কী যে কষ্টে সময় কাটাই।
আমার বন্ধুরা ছুটে আসে তুলে নেয় সকলের কাঁধে,
আমার শৈশব নদীর জলের মতো বয়ে চলে উল্লাসে অবাধে।
দলে দলে আসে, চার দিকে জমে ওঠে ছবি আর ছবি,
গুনগুন গান গেয়ে আসেন আমার আদিমহাকবি
জীবনের। গান গান বাজিয়ে একতারা :
শোনো ভাই আছে যারা আমি আজ নিজহারা
নদীর মতোন,
অনেক রজনী জেগে পাখিদের বর মেগে
করেছি সৃজন
একটি মায়াবী গাথা মায়ের নকশী কাঁথা
অতি অপরূপ,
বাঁশির সুরের সাথে জ্বেলে দাও এই রাতে
সোনারঙ ধুপ।
ফুটুক গানের ফুল সকল গাছের মূল
জ্বেলে দিক সুর,
জোনাকিরা গাছে গাছে ফুল হয়ে ফুটে আছে
অত্যন্ত মধুর।
তোমাকে অনেক দিন দেখি নাই চোখহীন
হয়ে আছি তাই,
তুমি এলে বাঁশি বাজে মনের বনের মাঝে
বেজে ওঠে একতারা বেহালা সানাই।
আমার শৈশব বাজে বাঁশবনে ধানক্ষেতে নদীর কিনারে
ঢেউয়ে ঢেউয়ে কাশবনে শাদা চাঁদ মেঘের মিনারে
পুকুরের আয়নায় শাপলা কলমি পদ্মের ডাঁটায়
আকাশের নদী আর তারাদের জোয়ার ভাটায়
হিজলের ফুলে চিল বক মাছরাঙা ডাহুকের ডাকে
মাছেদের লাফে লাফে ছেলেবেলা ডাকছে আমাকে।
রুপোলি ইলিশ এসে ধরে হাত, আমরা দুজন
দাঁড় বেয়ে চলে যাই যেইখানে থেমে আছে স্বপ্নের ভুবন।
পদ্মার ঢেউয়ের তলে রুপোর দাগের মতো সারিসারি
থাম দিয়ে ছবি এঁকে কারা যেনো বানিয়েছে বাড়ি।
একটি বাড়িতে দুটি হাঁস ছড়া কাটে আগডুম বাগডুম
ছাদের ওপরে শাদাশাদা নীল নীল বাকুম বাকুম।
বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি রিংয়ে দোলে এক জোড়া মাছ
হাততালি দিয়ে হরিণের পিঠে উঠে দেখায় সার্কাস।
ভেসে উঠি জল থেকে, খেজুরের ডালে বসে একটি বাবুই
চোখের মতোন বাসা বুনে চলে ঠোঁটে নিয়ে সুতো সুই।
হঠাৎ দেখি
উড়ছে তারা
রোদের মধ্যে
ধুলোর মতো
চাঁদের থেকে
নামছে পরী
নূপুর বাজে
শত শত।
মেঘের মতো আসছে ছুটে কাশের শাদা ফুলের মালা
মাঝ নদীতে লাফিয়ে ওঠে একটি বিরাট রঙের থালা।
আকাশ ছুঁড়ে বাড়তে থাকে বলের মতো তালের মাথা
জ্যোৎস্নাবুড়ি বিছিয়ে দিলো তারায় গাঁথা নকশী কাঁথা।
খোকন তোমার কেমন লাগছে–আমাকে শুধায় পাখি।
দেখছি আমি ছায়াছবি, আমিও উঠি তারই মতোন ডাকি।
ধীরে এসে কাছে সে কেমন চোখ মেলে নীরবে তাকায়।
জানতে চায় ফিরে যেতে চাও আর হিংসুটে ঢাকায়?
যেইখানে মানুষেরা গাছ কাটে দুই হাতে ছিঁড়ে ফেলে ফুল,
মল্লিকা হাস্না নেই, গন্ধরাজ চম্পা আর নেই কো শিমুল?
যেখানে শিশুরা পাখির মধুর ডাক রেডিয়োতে শোনে
কল্পনায় স্বপ্নে হাজার রকম জাল সারাদিন বোনে?
সোনালি ধানের ছড়া কথা বলে স্বপ্নের কূজন,
এতো দূরে এতো কাল রয়েছি দুজন।
আমার জবাব নেই বলি শুধু চুপে মনে মনে
তোমাকে দেখেছি বন্ধু রঙিন টেলিভিশনে।
তোমাকে দেখার জন্যে কতো দিন ভেঙে গেছে বুক
তোমাকে দেখার জন্যে বুক জুড়ে গভীর অসুখ।
ফিরে আসি আবার ঢাকায়। দেখি ঘরের জালনায়
দুলছে দোয়েল, বাবুই বুনছে বাসা কাঠের আলনায়।
আয়নাটি জুড়ে নদী, কাশবন; দেয়াল ঘড়িতে
কোকিল মুখর করছে বাড়ি কুহু কুহু গীতে।
মেঝেটা আকাশ হয়ে গেছে, ছাদখানা হয়ে আছে চাঁদ,
বাড়ির দেয়াল মেঝে মিষ্টি গন্ধ কমলার স্বাদ।
ছড়ার বইয়ের চোখে নেমে আসে রূপকথা, স্বপ্নভরা ঘুম,
দেখি আমি হাতঘড়ি পাপড়ি মেলে হয়ে আছে বনের কুসুম।
আজকাল সবাইকে ফাঁকি দিয়ে না জানিয়ে আমি মনে মনে
গোপনে হারিয়ে যাই বাল্যকালে, কুয়াশায়, স্বপ্নের ভুবনে।
