তেসরা বৈশাখ
বীণা যখন বিছানায় গেল, দেখল অরুণ ঘুমিয়ে কাদা। সারাদিন কারখানায় যে হাড়ভাঙা খাটুনি, তাতে একটু বিশ্রাম পেলে দেহ যে আর টানতে পারবে না, সেটা আশ্চর্য কী। তবে বীণা মনে মনে অন্য কিছু ভেবেছিল।
আজ তেসরা বৈশাখ। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল।
গ্রামের মেয়ে সে। সাদাসিধে জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত। কিন্তু বিয়ে পাশের গ্রামের ছেলের সঙ্গে হলে কী হবে, ছেলে কাজ করে শহরে। তাই তো বিয়ের সাত দিন পরেই তাকে স্বামীর হাত ধরে চিরচেনা গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হল।
শহরের জীবন যে মেশিনের মতো সদা ব্যস্ত হবে, সেটা সে কেমন করে জানবে? এখানে মানুষেরা যেন মানুষ নয়—এক একটা তেল খাওয়া মেশিন। অনবরত শুধুই ছুটে চলা।
শহরে আসার দুসপ্তাহ যেতে না যেতেই তাই সে একদিন অরুণকে বলল,
—বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছি। আর সত্যি কথা বলতে কী, এখানে থাকলে আমি শীঘ্রই মারা পড়ে যাব। এখানকার এই বাতাসে আমার শ্বাস নিতে পর্যন্ত অসুবিধা হচ্ছে।
তার কথা শুনে অরুণ বলেছিল,
—তুমি তো জানতে আমি শহরে কাজ করি। তাহলে তখন বিয়ে করলেই বা কেন? আর তুমি না থাকলে তোমায় বিয়ে করে আমার কী লাভ হল?
সত্যি বলতে কী, অরুণের কথার উত্তর দেওয়ার মতো কোনও কথা তার কাছে ছিল না। তবুও সে কিছুতেই শহরে থাকতে চাইলো না।
শেষ পর্যন্ত অরুণ তাকে নিয়ে গেল গ্রামের বাড়িতে। বলল,
—তুমি কিছুদিন মায়ের কাছে থাকো। আমার ছুটি পেলেই আমি আসব।
বীণা রাজি হয়ে গেল।
কিন্তু সেই “কিছুদিন” আর কিছুদিন রইল না।
মাসের পর মাস কেটে যেতে লাগল। অরুণ মাসে একবার, কখনও দুমাসে একবার বাড়ি আসত। হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলত,
—সংসারটা চালিয়ে নিও।
বীণা টাকা নিত, কিন্তু অরুণের মুখের দিকে তাকাত না।
তার মনে হতো, টাকা দিয়ে সংসার চলে, মানুষ বাঁচে না।
আজ পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে।
সকাল থেকেই বীণার মনটা কেমন করছিল। সে ভেবেছিল, অরুণ হয়তো মনে রেখেছে।
সকালে উঠে সে পায়েস করেছিল। অরুণ খেতে বসে শুধু বলেছিল,
—আজ আবার এত আয়োজন কেন?
বীণা মৃদু হেসে বলেছিল,
—এমনি।
অরুণ আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
সারাদিন বীণা অপেক্ষা করেছে।
বিকেলে উঠোন ঝাঁট দিয়েছে। সন্ধ্যায় ঘর পরিষ্কার করেছে। তারপর আলমারি খুলে বিয়ের দিনের লাল শাড়িটা বের করেছে।
শাড়িটা এখনও যত্ন করে রাখা আছে।
সেই শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে একবার কেঁদেও ফেলেছিল সে।
তারপর রাতে অরুণকে না জানিয়ে একটা ছোট্ট প্রদীপ জ্বালিয়ে বিছানার পাশে রেখেছিল।
সে ভেবেছিল, অরুণ ঘুমোবে না।
দুজন পাশাপাশি বসে পুরনো দিনের কথা বলবে।
হয়তো অরুণ বলবে,
“বীণা, পাঁচ বছর হয়ে গেল।”
কিন্তু অরুণ ঘুমিয়ে পড়েছে।
বীণা বিছানার এক কোণে চুপ করে বসে রইল।
হঠাৎ অরুণ ঘুমের মধ্যে কেঁপে উঠল।
—বীণা…
বীণা চমকে তাকাল।
অরুণ আবার বলল,
—বীণা, আমাকে ক্ষমা করো।
বীণার বুকটা ধক করে উঠল।
অরুণ কি জেগে আছে?
সে ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে গেল।
—অরুণ…
কোনও উত্তর নেই।
অরুণ ঘুমের মধ্যেই কাঁদছে।
বীণা অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এমন সময় অরুণের বালিশের নিচ থেকে একটা খাম মাটিতে পড়ে গেল।
বীণা খামটা তুলল।
তার নিজের নাম লেখা—
“বীণার জন্য।”
হাত কাঁপতে লাগল তার।
খাম খুলে চিঠিটা বের করল।
অরুণের হাতের লেখা।
“বীণা,
আজ আমাদের বিয়ের পাঁচ বছর।
তুমি হয়তো ভাবছ, আমি এই দিনটার কথা ভুলে গেছি।
আসলে কোনওদিন ভুলিনি।
তুমি শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিন কাজ শেষে যখন ঘরে ফিরি, মনে হয় তুমি দরজা খুলে বলবে—‘এত দেরি করলে কেন?’
কিন্তু দরজা খুললে শুধু অন্ধকার দেখি।
তোমাকে গ্রামে পাঠিয়েছিলাম কারণ আমি চাইনি তুমি আমার মতো কষ্ট পাও।
কারখানার যে কাজটা করি, তার ধোঁয়া আর রাসায়নিকের গন্ধে ডাক্তার বলেছেন আমার ফুসফুস বেশিদিন ভালো থাকবে না।
তাই তোমাকে দূরে রেখেছি।
ভেবেছিলাম, আমি না থাকলেও তুমি যেন বেঁচে থাকতে পারো।
কিন্তু একটা কথা তোমাকে কোনওদিন বলতে পারিনি—
তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারছি না।
আগামীকাল চাকরিটা ছেড়ে দেব।
শহরের এই জীবন আর নয়।
তোমার সঙ্গে গ্রামে ফিরে যাব।
হয়তো অনেক টাকা থাকবে না।
কিন্তু তোমার পাশে বসে সন্ধ্যায় চা খেতে পারব।
সেটাই আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ।
—তোমার অরুণ।”
চিঠিটা পড়তে পড়তে বীণার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
সে অরুণের মাথায় হাত রাখল।
অরুণ তখনও ঘুমিয়ে।
বীণা আস্তে করে বলল,
—এতদিন পরে বললে?
অরুণ চোখ না খুলেই বলল,
—তুমি তো কোনওদিন জিজ্ঞেস করোনি।
বীণা চমকে উঠল।
—তুমি জেগে ছিলে?
অরুণ চোখ খুলল।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
কিছুক্ষণ কেউ কোনও কথা বলল না।
তারপর বীণা মাথাটা অরুণের বুকে রেখে বলল,
—কাল শহরে যাবে না তো?
অরুণ তার মাথায় হাত রেখে বলল,
—না।
—সত্যি?
—সত্যি।
—তাহলে কাল থেকে কী করবে?
অরুণ মৃদু হেসে বলল,
—তোমার সঙ্গে আবার নতুন করে সংসার করব।
বাইরে তখন রাত শেষ হয়ে আসছে।
পূর্ব আকাশে হালকা আলো ফুটেছে।
বীণা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
আজ তেসরা বৈশাখ।
পাঁচ বছর আগে এই দিনেই সে অরুণের হাত ধরে নতুন জীবনে পা রেখেছিল।
আর পাঁচ বছর পরে—
সেই একই দিনে, অরুণের হাত ধরে সে আবার নতুন জীবনের পথে হাঁটতে শুরু করল।
শুধু এবার পথটা শহরের দিকে নয়—
বাড়ির দিকে।
