Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » আমার ছেলেবেলার মহালয়ার সকাল || Pijush Kanti Das

আমার ছেলেবেলার মহালয়ার সকাল || Pijush Kanti Das

“বাড়ি আমার বহুত দূর -তথাকথিত ধ্যাড়- ধ্যাড়ে-গোবিন্দপুর,” এটা একটা বহুল প্রচারিত প্রবচন। আর আজকাল কার ইংরাজি মিডিয়ামে পড়া ছেলে মেয়েরা এগুলো কতটা জানে বা শুনেছে সে ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তা থাক আমার সন্দেহ আমার কাছে। আমি বরং যে কথাগুলো আপনাদের সাথে শেয়ার করতে এসেছি সেইটা বেলাবেলি বলে ফেলি কি বলেন ! এখন আমি চাকুরীর সূত্রে কলিকাতার শহরতলীর বাসিন্দা। কিন্তু এই ঘটনার স্থান কাল অন্যত্র। স্থান মেদিনীপুর জেলার রূপনারায়ণ নদের তীরে একটা প্রত্যন্ত গ্রাম। আর ঘটনা ক্রম, আজ থেকে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর আগের । তখন আমার বয়স ওই আট -নয় বছর । “লোকদীপ প্রকল্প “র দৌলতে এখন যেমন আলো ঝলমল গ্রাম দেখতে অভ্যস্ত, তখন কিন্তু এমনটা মোটেই ছিল না। কেরোসিন কুপি , লণ্ঠনই বেশির ভাগ বাড়ির ভরসা। কিছু কিছু বাড়িতে এক আধটা হ্যারিকেনও অবশ্য ছিল । আর ওই গুলোই হল তৎকালীন গ্রামীণ বাংলার আলোকবর্তিকা । রেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন দিয়ে সেই টুকু কেরোসিন জোগাড় করতে হিমশিম অবস্থা হতো সবার । এখনকার মতো ঘরে ঘরে টিভি, তখন ছিলো না। এমনকি প্রতিটি বাড়িতে রেডিও পর্য্যন্ত ছিলো না । গ্রামের সম্পন্ন দু -একটা বাড়িতে বেতার বাবাজির দর্শন মিলতো । যাদের বাড়িতে তাঁর দরশন মিলত সেই বাড়ির মালিকেরাও তাঁর অবস্থান হেতু আত্মশ্লাঘা অনুভব করতেন ॥


অমি খুবই নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে । রেডিও নামক যন্তরটি কি তা আমি আমার ওই গ্রামের ন্যাংটো বেলার বন্ধু ভুতোর বাড়িতে দু -একবার দেখেছি । ভুতোদের বাড়ির অবস্থা বেশ ভালোই । তার দুই কাকা কোলকাতাতে চাকুরী করে এবং গ্রামে জমি -জমাও তাদের যথেষ্ট । সেই ভুতো তার চেহারার গুনে আমাদের বন্ধুদের সব্বার কাছে ছিল স্বার্থকনামা, তবে তার মা, তাঁঁর কাছে সে সোনার চাঁদ ॥


সে বছর পূজো পড়েছে আশ্বিন আর কার্ত্তিক দু মাস মিলিয়ে। ভোরের দিকে শীত শীত ভাব আর কুয়াশা। মাথে ঘাটে কাশফুলের ছড়াছড়ি। আকশে সাদাসাদা কচি কচি মেঘের ছানাপোনার সারাদিন ছুটো ছুটি । জলে টইটুম্বুর পুকুরে দিঘিতে শালুক আর পদ্মের ঢল । সোনালীরোদের ছটায় চারিদিকে কেমন খুশী খুশী গন্ধ। প্রাইমারি স্কুলের মাঠ আমাদের খেলার দরবার। এখানে আমারা, হা ডু ডু, দাড়িয়াবান্ধা খেলি। ছুটোছুটি করা আর গল্প গাছা ও ওই মাঠেই। মহালয়ার আগের দিন বিকেল। আমি, ক্যাবলা, হারান, বিমল,গুজন, খোকন, বিলে, বংশী, চণ্ডী ,ভুতো সব্বাই মিলে হা ডু ডু খেলেছি অনেকক্ষণ ধরে। সারা গায়ে ধুলোবালি মাখা। খেলা শেষে মাঠের মাঝে বসে সব্বাই মিলে গুলতানি মারছি। এমন সময় ভুতো বলল , অ্যাই অ্যাই সব্বাই একটু চুপ করবি। নগেন বলল, কেন রে? কি ব্যাপার? —-কাল মহালয়া জানিস তো ?
আমি বললাম — জানি ,কিন্তু তাতে কি ?
—-কি মানে ? মহালয়া শুনবি না ?
—-কি করে শুনবো ? আমাদের বাড়িতে তো যন্তর টা তো নেই –
—–আমাদের তো আছে। বাবা বলেছেন কাল ভোরে ওটা বাইরে উঠোনের পাশে যে দলিজটা আছে ওখানে বের করে দেবেন যাতে সবাই মিলে শুনতে পায় ।
—–তাই ?
—-হাঁরে ঠিক্ তাই । কাল গ্রামের অনেক লোক -যেমন অমলজ্যাঠা -বিমলকাকু -রাসমণি ঠাম্মা -মাইতি কাকিমা বাড়িতে এসেছিলেন। তাঁরা বাবাকে বলেছেন সবাই মহালয়া শুনতে আসবেন – তোরাও আয় । বাবা বলেছেন মহালয়ার শেষে সবাই কে একটা জিনিস খাওয়াবেন ।
—কি জিনিস রে ?
—আরে গতবার মেজকা বাড়ি আসার সময় ওই যে কালো কালো -দানা -দানা কি একটা এনেছিলো -যেটা গরম জলে দিয়ে সাথে দুধ -চিনি মিশিয়ে গরম গরম খেতে হয় — । ওহ মনে পড়েছে, চা বলে বলেছিল মেজকা ।
—-সব্বাই কে দেবে ?
—-হাঁরে বাবা তো বললেন ছোট -বড় সব্বাই যে যে মহালয়া শুনতে বাড়িতে আসবে সব্বাই কে কাল দেওয়া হবে । আসছিস তো কাল ?
—কিরে ক্যাবলা যাবি নাকি কাল ? আমি ক্যাবলা কে জিগ্গেস করি ।
—-তুই যদি ডাকিস তবে দুজনে এক সাথেই যাবো ।
——তাহলে তোরা আসছিস -বল্ ?
আমি বলি —-ঠিক আছে আসবো ।
———পাক্কা ?
—–পাক্কা ।
ওই দিন রাতে আর ঘুম আসেনা । কখন যে ভোর হবে , কখন ভুতোদের বাড়ি যাবো –মহালয়া শুনবো আর তারপর সেই দুধ -চিনি -কালো গুঁড়ো দিয়ে তৈরী সেই মহার্ঘ্য পানীয়টা খাবো ! ছটপট করি বিছানায় । তারপর আনুমানিক রাত তিনটা -সাড়ে তিনটা হবে, ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ি । কোনরকমে দাঁতটা মেজে পাশের বাড়িতে গিয়ে হাঁক পাড়ি
—–এই ক্যাবলা , ক্যাবলা …। ওঠে কি আর সহজে। আমি ক্যাবলা যে ঘরে ঘুমায় সেই ঘরের জানালায় গিয়ে ধাক্কাই অ্যাই ক্যাবলা , ক্যাবলা…। এতক্ষণে আওয়াজ এলো
—–যাই -ই –।
ভুতোদের বাড়ি গ্রামের অন্যপ্রান্তে । অন্তত মিনিদশেক হাঁটাপথ । যেতে হয় ক্যানেল পাড় ধরে -শ্মশানতলার মাঠের পাশ দিয়ে । শ্মশানতলা পেরুলেই ভুতোদের বাড়ি। দুইবন্ধু যাচ্ছি , আঁধার রাতে এভাবে আমার যাওয়া হয়নি কোনদিন আগে ,গা টা একটু ছমছম করছে কেমন । জানি না ক্যাবলার হচ্ছে কিনা । পাশ দিয়ে হুশ করে কি যেন একটা বেরিয়ে গেল মনে হল । অমাবস্যার রাত -বুঝতে পারলাম না ঠিক । গা -ছমছমানি টা বেড়ে গেলো । ক্যাবলাও দেখি আমার হাতটা ধরলে । অকস্মাৎ সাঁতরা দের চালতে গাছ থেকে কেমন একটা শব্দ হতেই আমি আর ক্যাবলা গলাগলি -জড়াজড়ি। দুই বন্ধু ভয়ে ভয়ে এগুতে থাকি , কিছুটা যাবার পর ফিসফিস করে ক্যাবলা বলে —অ্যাই পীযূষ ! সামনে দ্যাখ –
—কি দেখবো ?
—-ওই যে ওই দিকে…। —-কোনদিকে ? – — ওই দ্যাখ ,তেঁতুল গাছের দিকে দ্যাখ !
দেখেতো আমিও থ ! দূর থেকে দেখি কি তেঁতুল গাছের ডাল থেকে সাদা রঙের শাড়ি পরে কেউ যেন পা দুলাচ্ছে ।
—অ্যাই পীযূষ -কাজলা কাকিমা নয়তো ?
সাথে সাথে মনে এলো মাসখানেক আগে গুঁড়িয়াদের কাজলা কাকিমা এই তেঁতুল গাছে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে ছিলেন ।
দুই বন্ধু ঠায় দাঁড়িয়ে । ওদিকে ভুতোদের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে —যা দেবী সর্ব ভূতে—-শক্তিরূপেন ——।
দুই বন্ধু ঠায় দাঁড়িয়ে তখনও । ক্রমে আঁধার আসে কমে । আবার ভেসে আসে ——–রূপং দেহি —–জয় – ——-দেহি —–যশো —–!!
আসলে দুদিন আগে -পার্টির মিটিং যেটা শ্মশানতলার মাঠে হয়েছিল তার ব্যানারের কাপড় বাতাসে উড়ে গিয়ে তেঁতুল গাছের ডালে বেঁধে হলেন কাজলা কাকিমা ।
হয়ে গেল আমাদের মহালয়া শোনা ।
শেষমেষ গেলাম ভুতোর বাড়ি -ওই কালো -কালো -দানা -দানা -দুধ -চিনি আর গরম জলে তৈরী মহার্ঘ্য পানীয় পান করেই বাড়ি ফিরলাম ॥

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *