Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » আমাদের বন্ধুরা || Tapas Jana

আমাদের বন্ধুরা || Tapas Jana

(নভেম্বর এর মাঝামাঝি, দিল্লির তাপমাত্রা সবে নামতে শুরু করেছে। বিকাল টা এখন মনোরম হলেও, পরিবেশ মোটেই মনোরম নয়।

শর্মিলার একমাত্র ছেলে বিজন ক্লাস সিক্স এ পড়ে। স্কুল থেকে ফিরে সামান্য জল খাবার খেয়ে ব্যাট টা নিয়ে পার্কে যাবে বলে তৈরি হয়)

বিজন : মা, বেরোচ্ছি আমি, দরজাটা বন্ধ করে দাও।
মা : (রান্নাঘর থেকে বেরোতে বেরোতে) এই, এই … দাড়া …দাড়া। কোত্থাও যাবি না এখন।
ছেলে: আমি তো পার্কে যাচ্ছি। প্রতিদিন ই তো যাই।
মা: এখন থেকে কিছুদিন তুই আর পার্কে যাবি না।
ছেলে : কেনো ?
মা: দেখছিস বাইরের অবস্থা। চারিদিকে কি বীভৎস পলিউশন। একদম বাইরে যাওয়ার দরকার নেই, বসে কারাম বা চেস খেল বরং।
ছেলে : চেস খেলব, এখন ?
মা: হুম, এখন থেকে স্কুল ছাড়া আর বাইরে যাওয়ার নেই, যতদিন না এই পলিউশন কমে।
ছেলে: (ঘরের ভিতর থেকে একটা মাস্ক মুখে লাগিয়ে নিয়ে এসে) এই নাও, আমি মাস্ক পরে নিয়েছি। এবার তো যাই। সবাই চলে আসবে পার্কে।
মা: খেলতে গিয়ে তোর মাস্ক যে কোথায় থাকবে সে আমি জানি। আর আমার সাথে বিহান, আবিন সবার মা ‘ এর কথা হয়েছে, কেউ আসবে না আজ থেকে।
ছেলে : মা!
মা : তুই জানালা দিয়ে দেখ, কেউ আসছে কি না ?
(সোফার উপরে বসে পর্দাটা সরিয়ে দেখতে থাকে। কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারে, মা এর কথাটা ঠিকই, কেউ আজকে আসেনি। বিষণ্ণ মুখ করে, মুখের উপর থাকা মাস্কটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় বিজন)

রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে শুতে যাবে, এমন সময় কেশে ওঠে বিজন)

মা: দেখেছিস, বার বার বলি বাইরে বেরোবি না, স্কুলে গিয়ে মাস্ক খুলবি না। বাধা কাশি টা এখন। এই কাশি সারা শীত ভোগাবে।
ছেলে: মা ! (বলে নিজের ঘরে ঘুমাতে চলে যায় বিজন)


বিজন: তোমাকে তো পার্কে কোনোদিন দেখিনি। কি নাম গো তোমার?
শ্যামল : আমি তো তোমাকে রোজ এখানে খেলতে দেখি। তোমরা আমাকে না দেখলেও আমি কিন্তু সবসময় তোমাদের সঙ্গেই থাকি। আমার নাম শ্যামল।
বিজন : আচ্ছা শ্যামল! তোমার গায়ের রঙটা এরকম কেনো ? (একটু ভেবে) নারকেলের ছোবরার মতো লাগছে।
শ্যামল : কী আর করি বলো। তোমাদের জন্যই তো আমার এই অবস্থা।
বিজন: আমাদের জন্য!
শ্যামল : সারাদিন তোমাদের ঠান্ডা বাতাস দিই, সুন্দর সুন্দর ফল দিই, ফুল দিই আর তোমরা ? সব ভুলে গিয়ে, নিজেদের সুবিধার জন্য আমাদের উপড়ে ফেলতে একটুও কষ্ট পাও না। ডাল – পালা গুলো মট মট করে ভেঙে ফেলো। আমাদের নরম – সবুজ থাকতে তোমরা আর দিচ্ছ কোথায় বলো ! আর সেইজন্য তোমাদেরও এই অবস্থা, থাকো সবসময় মাস্ক পরে। নোংরা ধোঁয়ায় চারিদিক ভরে আছে।
(কুসুমের প্রবেশ)

বিজন : বা: , তোমাকে দেখতে কি সুন্দর কিন্তু তোমার মুখে এতো কালো দাগ কিসের?

কুসুম : আমি কুসুম কিন্তু তোমরা মানুষেরা আমাকে আর সুন্দর থাকতে দিলে কোথায় বলো। আমাদের দুই ভাই বোনকে, তোমরা তো যার পর নাই শেষ করতেই ব্যস্ত। আর ঐ কালো দাগের কথা বলছো, তা তোমাদেরই দান বন্ধু। যেভাবে বড় বড় বিল্ডিং বানাতে গিয়ে সব সবুজকে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছ তাতে ধুলো ছাড়া আর কী থাকবে বলো। অথচ দেখো তোমাদের পুজো -পার্বণ ইত্যাদি সব কিছুতে কত সুন্দর করে সাজিয়ে দিই আমি, আমার সুবাস কত দূর অবধি ছড়িয়ে পরে, বছরের পুরোটা সময় তোমাদের চারপাশ কত রঙীন করে রাখতে চেষ্টা করি আর তার বিনিময়ে তোমরা – আমাদের নষ্ট করতেই ব্যস্ত। ধুলো – বালি আর নোংরা ছাড়া আর কিই বা পাবে বলো?

বিজন : আমাদের জন্য তাহলে তোমাদের অনেক কষ্ট, তাই না?

শ্যামল : হুন (ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে) তা যদি তোমরা বুঝতে! গোটা পৃথিবীকে আমরা কচি ঘাসে ভরিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু তোমাদের তা ভালো লাগে কই? তোমরা চাও যুদ্ধ, অন্যের ধন কেড়ে না নিলে তোমাদের শান্তি কোথায়? তোমরা কামান আনলে, মেশিন আনলে … তার বদলে সুন্দর সবুজ বনভূমি হঠিয়ে মরুভূমি নিয়ে এলে। তপ্ত হাওয়া আর ধুলো বালি তো ভরবেই তোমাদের চোখে – মুখে।

(সলিলের প্রবেশ)

বিজন : তুমি আবার কে? তোমাকেও তো কোনোদিন দেখিনি। কেমন নীল নীল দেখতে, ভারী সুন্দর কিন্তু তোমার গায়ে ওরকম সাদা সাদা দাগ কেনো?

সলিল : চিনতে পারলে না, আমাকে ? আমি সলিল। আমাকে ছাড়া তোমাদের একটা দিনও অচল। আমরাই মেঘ হয়ে বৃষ্টি ছড়াই, পৃথিবীকে শস্য শ্যামলা করে রাখি, তোমাদের জন্য আমার বুকে জমিয়ে রাখি মণি, মুক্ত, মাছ আরও কত কী । তোমরাই আমার নাম দিয়েছো জীবন। কিন্তু দেখো কি কান্ড! আমার বুকেই ভাসিয়েছো যুদ্ধ জাহাজ, তোমাদের ঘর বাড়ি থেকে শুরু করে, কল – কারখানা, যেখানে যত জঞ্জাল পেয়েছো, ছুঁড়ে ফেলেছো আমারই মুখে। আমার এই অবস্থা হবে না তো কার হবে বলো?

(সকলে মিলে) তোমরা কুৎসিৎ, তোমরা নির্দয়।

বিজন: না, না এরকম করে বলো না। আমরা তোমাদের খুব ভালো বাসি।

কুসুম: ভালোবাসি না কচু! যদি ভালোবাসতে তাহলে এভাবে সুন্দর কে ধ্বংস করতে পারতে?

শ্যামল : পারতে আমাদের ডাল পেলে কেটে দিতে? মাটি থেকে উপরে ফেলতে? চেনো তোমরা ব্যাঙ্গোমা আর বাঙ্গ্যমিকে? দেখেছো সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি? তোমাদের লোভই
তোমাদের এত রোগ আর এত দুঃখের কারণ।

সলিল : এমনকি বসুমতী, যে তোমাদের মা, তার বুক থেকে পর্য্যন্ত রসটুকু নিংড়ে মুচড়ে নিতে তোমাদের এতটুকু অসুবিধা হয় না। তোমরাই তোমাদের ‘জীবন’ মানে জলের অপব্যবহার করে, নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই ডেকে আনছো। তোমরা মানুষেরা দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম কোনোদিনই বুঝলে না।

কুসুম: আমরা কেউ থাকব না তোমাদের সাথে।

মরো তোমরা মরো (সবাই মিলে, বলতে বলতে বেরিয়ে যায়)

(প্রচণ্ড গরম হাওয়া আর ধুলো উড়তে থাকে, তীব্র গরম অনুভূত হয়, সাথে তীব্র জলকষ্ট)

বিজন: উফ্, একি হলো! চারিদিকে এত ধুলো কেনো, কি প্রচণ্ড গরম। আমি শ্বাস নিতে পারছিনা কেনো। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। একটু জল, একটু জল। (ছট ফট করতে করতে মাটিতে পরে যায় বিজন)

আমাকে ছেড়ে যেও না তোমরা। ফিরে আসো । আমি তোমাদের বন্ধু হতে চাই।

(পর্দার পিছন থেকে সবাই মিলে)
তোমরা বড় হিংসুটে, স্বার্থপর।

বিজন: একবারের জন্য এই বন্ধুকে একটু বিশ্বাস করো।

(একে একে প্রবেশ করে)

কুসুম : কি করে বিশ্বাস করব তোমায়? সব মানুষই একই রকম।

বিজন: তোমরা সবাই আমার বন্ধু। আমি মানুষকে বোঝাবো আর গাছ কাটা নয়, জল নোংরা করা নয়। আমাদের আরো বেশি করে গাছ লাগাতে হবে, জল অপচয় বন্ধ করতে হবে। তোমরা না থাকলে, আমরাও বাঁচবো না।

পারবে তুমি ? (সবাই মিলে)

বিজন : হ্যাঁ পারবো আমি। আমি বোঝাবো প্রকৃতিকে নষ্ট করে, যুদ্ধ করা কোনো ভালো কাজ নয়। প্রকৃতি হলো আমাদের সোনার জিয়ন কাঠি, তাকে ভালো রাখলেই, আমরাও ভালো থাকবো। আমি তোমাদের কথা দিচ্ছি। আমি সবাইকে বলব তোমাদের দুঃখের কথা, বন্ধুদের শোনাবো ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমির গল্প, সব্বাই কে শেখাবো ভালোবাসার মন্ত্র “গাছ বাঁচাও, প্রাণ বাঁচাও।”

(সকলে মিলে) তাহলে তাই হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *