তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি (একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত)
আমি হাসান মোহাম্মদ মুক্তার। আমার জীবনের গল্পটা শুরু হয় ছোটবেলা থেকে, যখন কম্পিউটার আর ইন্টারনেট আমার কাছে যেন এক অজানা জগতের দরজা খুলে দিয়েছিল। সেই সময় থেকেই আমি তাদের প্রতি বিশেষ আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। স্কুলের পরে বাড়িতে বসে কল্পনা করতাম, কীভাবে এই ডিজিটাল দুনিয়া আমাকে নিয়ে যাবে দূরের দেশে, অজানা মানুষের কাছে। সেই আকর্ষণ কখনো কমেনি, বরং বেড়ে চলেছে দিন দিন।
২০০৭ সালে আমার বন্ধু আবুল কালাম আমাকে একটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়। তখন ফেসবুক এখনকার মতো জনপ্রিয় ছিল না, এটা ছিল শুরুর দিককার একটা নতুন জিনিস। অ্যাকাউন্ট খোলার পর আমি প্রায় প্রতিদিন আমাদের বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের চিটাগাং রোডের একটা সাইবার ক্যাফেতে যেতাম। ঘণ্টায় পঞ্চাশ টাকা দিয়ে ফেসবুক চালাতাম, বিভিন্ন সাইট ব্রাউজ করতাম। সেই সময়টা আমার কাছে যেন এক অদ্ভুত মায়ায় ভরা। ইন্টারনেটের প্রতি আমার ভালোবাসা আরও গভীর হয়ে উঠল, আর আমি দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে বসে থাকতাম, যেন সময়ের হিসাব ভুলে যেতাম।
সময় যেতে থাকল। তখনকার মোবাইল ফোনগুলো ছিল সাধারণ, অ্যান্ড্রয়েড ফোন তো ২০১০-১১ সালের দিকে আসে, আর সেগুলো ছিল ধনীদের জন্য। আমাদের মতো গরিব মানুষের কাছে সেটা স্বপ্নের মতো। তাই আমি একটা নোকিয়া ব্র্যান্ডের বাটন ফোন কিনলাম। সেই ফোনে ফেসবুক চালানো যেত, চ্যাট করা যেত, কিন্তু নেটওয়ার্ক ছিল খুব দুর্বল। একটা মেসেজ পাঠালে, আবার ব্রাউজ করে লোড করলে তবে নোটিফিকেশন আসত। কিন্তু সেই অসুবিধা সত্ত্বেও আমার উৎসাহ কমেনি। ফেসবুক আমার জীবনের অংশ হয়ে উঠল, যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা।
২০১১ সালে হঠাৎ একটা পরিচয় হয় মেহেরি অক্সেনডাজের সাথে। তার বাড়ি আজারভাইজানে। তার প্রোফাইলে নিজের ছবি ছিল না, ছিল একটা মেয়ের ছবি যে ভায়োলিন বাজাচ্ছে—কালো চুল, কালো জামা পরা। আমার প্রোফাইলে ছিল আমার নিজের ছবি। হয়তো সে আমাকে দেখেছে, কিন্তু আমি তাকে দেখিনি। সেই ছবিটা তার নিজেরও হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। কিন্তু সেই পরিচয় থেকে শুরু হলো আমাদের চ্যাটিং। নানান বিষয়ে কথা, যেন আমাদের মধ্যে অদ্ভুত মিল। সেই মিলের কারণে আমাদের সম্পর্ক গভীর হয়ে উঠল। যেন দু’জনের মন একই সুরে বাজছে।
সময় যত যায়, আমাদের চ্যাটিং আরও ঘন হয়ে ওঠে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা আমরা চ্যাট করতাম—দু’মিনিট, তিন মিনিট, চার মিনিট অন্তর। ব্যস্ততা থাকলেও আমরা যোগাযোগ ছিন্ন করতাম না। রাতের অন্ধকারে, দিনের আলোয়—সব সময় আমরা একসাথে। সেই সময়টা আমার কাছে যেন এক স্বপ্নের মতো। এক পর্যায়ে আমি তাকে আমার মনের কথা প্রকাশ করলাম। সে একটু ইতস্তত করল, রাজি ছিল আবার ছিল না। কিন্তু ছয় মাস পর সে নিজেও তার মনের ভাবনা বলল, ভালোবাসার কথা স্বীকার করল। “আমিও তোমাকে ভালোবাসি,” সেই কথাটা আমার হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে দিল।
আমাদের সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়ে উঠল। ভালোবাসার গভীরতা যেন সমুদ্রের মতো অসীম। একদিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে সারপ্রাইজ দেবো। আমার এক বন্ধু আজারভাইজানের তুরাল মেমোদোভ সাহায্যে মালয়েশিয়ার কোয়ালালাম্পুর থেকে আজারভাইজানের ভিসা তুললাম, তিরিশ দিনের জন্য। ভাবলাম, হঠাৎ গিয়ে তাকে চমকে দেবো। কিন্তু যাওয়ার আগে তাকে জানালাম । ভিসা হাতে পেয়ে তার ছবি পাঠালাম। সে দেখে খুব রাগ করল, কষ্ট পেল। ফোনে দু’একবার কথা হয়েছে আগে, ইংরেজিতে—কেমন আছো, এমন টুকটাক। কিন্তু সে বলল, সময় চাই। কয়েক দিন পর সে তার বাবাকে সব জানায়।
তার বাবা রাগ করে নিষেধ করেন। বাংলাদেশ অনেক দূরের দেশ, মেয়েকে সেখানে পাঠাতে চান না। তার বড় বোন ইতিমধ্যে একজন ইরানি ছেলের সাথে বিয়ে করেছে, তাই বাবা আরও রাগী। মেহেরি তার বাবার আদরের কন্যা। আবার তার পিছনে ইব্রাহিম নামের এক ছেলে, যে তাকে পছন্দ করে। সে আমাকে বলল, “তোমার বাবা-মা কী বলবে? তুমি তাদের ছেড়ে কীভাবে আসবে? আমাদের এখানে মেয়েরা সাধারণত ছেলেরা মেয়ের বাড়িতে থাকে।” সে অনেক যুক্তি দিল, বাস্তবিকতা বোঝাল। আমি বললাম, আমার এক ভাই আর এক বোন, কিন্তু সে শুনল না।তখন সে বলল তুমি তোমার বাবা মাকে কিভাবে ছেড়ে আসবে।তাদেরকে কে দেখবে?? ইত্যাদি ইত্যাদি।
একদিন হঠাৎ তার মেসেজ: “তোমাকে হার্ট করতে চাই না, কিন্তু আমি অন্য ছেলেকে বিয়ে করার চিন্তা করছি। ফেসবুক থেকে চলে যাচ্ছি।” কিন্তু তার আগে, ২০১৩ সালে আমরা অনলাইনে বিয়ে করে ফেলেছিলাম। আকাশ বাতাস সাক্ষী রেখে, মুসলিম রীতিতে কবুল বলেছিলাম তিনবার, সেও বলেছে তিনবার। যেন সিনেমার মতো।আমি যেন পাগল হওয়ার বাকী ছিল।তার প্রতি এতই দূর্বল হয়ে গেছিলাম দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়ে ছিলাম। কারণ তার সবশেষ মেসেজ টা ভাল ছিল না। কিন্তু শেষ মেসেজটা ছিল “ডিভোর্স, ডিভোর্স, ডিভোর্স”—তিনবার। মুসলিম রীতিতে বিচ্ছেদ। সে চলে গেল আমার জীবন থেকে, যেন এক ঝড় এসে সব উড়িয়ে নিয়ে গেল। এই যে সে চলে গেলে আমাকে ছেড়ে সে আর মেহেরি হয়ে দেখা দিল না।সে অন্য মানুষের রুপ ধরে মেসেজ করত আর বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইতো।আমিও বুঝে ফেলতাম।তবুও তাকে সরাসরি কিছু বলি নাই।এভাবেই আরও কয়েক বছর কেটে গেল।কতভাবেই বেনামে আমার ফেসবুকের সাথে জড়িয়ে আছে সে।তবে সে তার নিজের ফেসবুক এ্যাকাউন্টটি ডিএকটিভ করে রাখে।সে ভাল থাকুক।তবে তাকে ছাড়া আমি ভাল নেই।প্রতিনিয়ত তার স্মৃতি আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়।এই যন্ত্রণা সইতে না পেরে আমি মালশিয়াতে ২০১৩সালের দিকে চলে যাই।বছর খানেক সেখানে থাকার পর আবার বাংলাদেশ এসে চটজলদি বিয়ে করে ফেলি।কারণ একা থাকা আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল।নিজে নিশেষ হয়ে যাচ্ছিলাম।তবে তার স্মৃতি আমি কখনোই ভুলতে পারবো না।এখনো তাকে ছুয়ে দেখার বাসনা হৃদয়ে রয়েগেছে।
আজও সেই স্মৃতি আমার সাথে। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি,ইমেইলে খুঁজি। কিন্তু আর কোনো মেসেজ আসে না। ভালোবাসা যেন একটা স্বপ্ন ছিল, যা জেগে উঠলে অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু সেই স্মৃতি আমাকে শিখিয়েছে, জীবনের পথে অনেক মোড় আছে, আর প্রতিটা মোড়ে নতুন গল্প শুরু হয়।
