অপরাজিতা
অনেক সাধ , সাধনার পর অহনা ও সৌম্যর একটি কন্যা সন্তান হলো।
শাশুড়ি খুশি হয়ে বললেন, আমাদের বংশে মেয়ে নেই, ভালো হয়েছে ঘরে লক্ষ্মী এসেছে। বিয়ের পাঁচ বছর পর সন্তান; বাড়িতে আনন্দের মাতন।
অন্নপ্রাশনের সময় নামকরণ নিয়ে আলোচনা হলে শাশুড়ি প্রতিভা দেবী বলেন মেয়ের নাম লক্ষ্মী রাখলাম। অহনা বলে , আপনি লক্ষ্মী নামে ডাকুন আপত্তি নেই, কিন্তু মেয়ের সুন্দর অর্থপূর্ণ নাম রাখা হবে।
ওর নাম অপরাজিতা রাখা হবে।
সৌম্যও তাতে সায় দেয়।
এতে প্রতিভাদেবী মনোক্ষুন্ন। কেন লক্ষ্মী নামের অর্থ কি খারাপ? ঘরে ঘরে লক্ষ্মীদেবীর পূজা হয় ; ধন সমৃদ্ধির দেবী।
অহনা বলে, বেশ তো, আপনি লক্ষ্মী বলেই ডাকবেন।
ওটা ওর ডাকনাম হবে। কিন্তু সর্বজন পরিচিত নাম হবে অপরাজিতা চৌধুরী।
লক্ষ্মী নামটা বড্ড সেকেলে।
প্রতিভাদেবীর দেওয়া নাম গুরুত্ব না পাওয়ায় স্বামীর কাছে গিয়ে অভিমান প্রকাশ করেন।
স্বামী সমীরণ চৌধুরী বড় নামকরা ব্যারিস্টার।
তিনি সকলের সামনে কথা প্রসঙ্গে বললেন, দুটো নামই সুন্দর অর্থযুক্ত। তবে আজকের দিনে অপরাজিতা নামটার গুরুত্বটা বেশি। অপরাজিতা কখনো পরাজিত হবে না। যে কোনো কাজে সফলতা পাবে। নামভূমিকার তাৎপর্য আছে।
ইনফ্যাক্ট, “নাম আমাদের জীবনে একটা বড় ভূমিকা। ভেতরের ইচ্ছা বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। কোনো এক নবজাতকের জন্মের পর তার মা বাবা তাকে ঘিরে কত স্বপ্ন দেখে একটা নাম দেয়। যেন সেই নাম তার জীবনের , তার আদর্শের , তার স্বভাবের প্রতীক স্বরূপ।”
অহনা বললো, ঠিকই বলেছেন বাবা, নামের মধ্যেই আদর্শের দিক নির্দেশনা নিহিত থাকে।
সমীরণবাবু বললেন, শুধু তাই-ই নয়। নাম শুধু একটা শব্দ নয়। এর তাৎপর্য হচ্ছে , আমাদের পরিচয়, আত্ম সচেতনতা এবং মানবিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।নাম আমাদের ব্যক্তিত্বে এবং জীবনে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
প্রত্যেকের একটা নির্দিষ্ট নাম থাকে যা কৃতিত্ব রাখে আমাদের পরিচয়ের। প্রকৃতপক্ষে আমরা কে তার প্রকাশ করে।
নাম আমাদের বাবা মা, পরিবারের কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত একটা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যকে রেখাপাত করে।
সেইজন্যই জন্মের পরে নবজাতকের সুন্দর অর্থপূর্ণ নাম দেওয়া রীতি। আর সেই নামকরণের সাথ মিশে থাকে বাবা মায়ের স্বপ্ন ও আদর্শ।
নাম আত্মসচেতনতা বাড়ায় , সেইসঙ্গে আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস জন্মায় মনে।
সমীরণ বাবু বলেন, জীবনে ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে যেমন নাম সম্বন্ধে ধারণা হয়েছে তেমনি কর্ম জীবনেও দেখেছি সুস্থ যাপনের জন্য নাম একান্ত জরুরি।
এইযে যেমন আমি ইংল্যান্ডের নামকরা কলেজ থেকে পাস করেছি বলে আমার কদর আলাদা। সৌম্য আই আই টি খরগপুর থেকে পাসআউট তাই নামীদামী কর্পোরেট সংস্থার সিইও।
একটা অগ্ৰাধিকারের বিষয় কাজ করে।
অপরাজিতা বড় হবে, মনের মধ্যে স্বপ্ন থাকবে আমি হারবো না, সফলতা আমাকে পেতেই হবে।
অনেকের মতে, নাম জীবনের এক অদৃশ্য কান্ডারী।
কান্ডারী বিহীন তরি যেমন অকূল পাথারে তীর খুঁজে পায়না, তেমনি লক্ষ্য বিহীন জীবনও কন্টকাকীর্ণ পৃথিবীতে সাফল্যের সোপান সহজে খুঁজে পায়না।
মানুষের মনের মধ্যে লালিত স্বপ্নই তাকে তার লক্ষ্যের বন্দরে পৌঁছে দেয়। আর জীবনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকলে বিপথগামী, লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। জীবন সুন্দর হয়।
জীবনযাত্রার উন্নয়নের পাশাপাশি যে কোনো কাজ, প্রতিষ্ঠা, সবেতেই নাম-এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা থাকে।
স্বামীর কথায় প্রতিভাদেবীর অভিমান ভাঙলো। বৌমার রাখা নামেই সম্মতি দিলেন।
সুন্দরভাবে ধুমধাম করে অন্নপ্রাশন পর্বও সম্পন্ন হলো।
বংশে এই প্রথম কন্যা সন্তান, সকলে আদরে বড় হতে লাগলো।
