Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

বাকী পড়েছিল নমাসের বাড়ীভাড়া,
উপায় ছিল না পথে নেমে আসা ছাড়া।

এটুকু লিখতে গিয়েই চোখদুটো জ্বালা করে উঠলো।
বারবার চোখে জল এসে পড়ছে রাহুলের। কবিতা লিখতে বসে আজ কত কথাই না মনে পড়ছে তার, কত জ্বালা যন্ত্রণার ইতিহাস ভেসে উঠছে মনের পর্দায়। এইসব কিছুই তার নিজের চোখে দেখা। মায়ের অবর্ণনীয় কষ্ট আর যন্ত্রণার প্রত্যক্ষদর্শী রাহুল।
সেই জ্বালাময়ী অতীতের প্রতিটা মুহূর্ত মনে আছে তার, কিছুই ভোলেনি। সবকিছুর অর্থ তখন বোঝেনি,যখন বুঝেছে রক্তক্ষরণ হয়েছে বুকের ভেতর। অবিরাম সে ক্ষরণ, ক্রমাগত জ্বালা বাড়িয়েই দিয়েছে কেবল।
বহুকষ্ট সয়েও মা তাকে সব আঁচ থেকে বাঁচিয়ে আঁচলের আড়ালেই রেখেছিল।
ছমাসের বাড়ীভাড়া বাকী পড়েছিল আগেই,তার পর আরো তিনটে মাস পেরিয়ে গেলেও কোন সুরাহা হয়নি।
ছটা মাস কোনরকমে এদিক ওদিক এটা সেটা করে রোজগারের চেষ্টা করেছিল যদিও, তবুও দরকারটা যে ছিল আরো বেশি। টেনেটুনে হলেও চলে যাচ্ছিল কোনমতে, কিন্তু বাড়ীভাড়ার টাকাটার ব্যবস্থা না হলেই নয়। বাড়ীওয়ালার তাগাদায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল। বাড়ীওয়ালারই বা দোষ কী! সেও তো দুটো রোজগারের আশায় বাড়ী ভাড়া দেয়,সময় মতো না পেলে….
আজ সে রেয়াৎ করবেনা ন মাসে ন হাজার টাকা বলে কথা! হয় টাকা দাও নয় উঠে যাও , এই তার শেষ কথা!
রাহুলের বাপ বেশী রোজগারের ধান্দায় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল তখনই, ভিনরাজ্যে কাজ করা আরো অনেকের মতো।

মানুষটার ফেরার আশায় উন্মুখ হয়ে থাকত রত্না,শেষ পর্যন্ত মানুষটা আর ফিরলো না। খবর এল সেখানে হাটে মাল বওয়ার কাজে লেগেছিল, মাল তোলার সময় পা পিছলে পড়ে যায় আর এক বস্তা মাল তার উপর পড়ে গেলে ঘাড় ভেঙে যায়। হাসপাতালে যাওয়ার আগেই সব শেষ!
মাথায় বাজ পড়েছিল খবরটা শুনে। সহায় সম্বল বলতে কিছু নেই, ভালবাসা করে পালিয়ে এসে ঘর বেঁধেছিল, ছোট জাতের ছেলে বলে বাপের ঘরের সঙ্গে সম্পর্ক ঘুচেছে তখনই।
গরীব মানুষের বেশীদিন শোক করে বসে থাকলে চলে না । রত্নারও চললো না
সাত বছরের ছেলেটাকে নিয়ে পথেই দাঁড়াতে হলো শেষ মেশ।
ঘরের জিনিসপত্র বাড়ীওয়ালা রেখে দিয়েছিল, হয়তো ভেবেছিল টাকা দিতে না পারলে জিনিস গুলো তো রয়েছেই! তাতে অবশ্য রত্নার সুবিধাই হলো একরকম।
ছেলের হাত ধরে কাজের খোঁজে গেরস্ত বাড়ীর দোরে দোরে ঘুরতে লাগলো। ছেলে সমেত রাখতেই চাইলোনা কেউ।
ফুটপাতের একপাশে ছেলেটাকে নিয়ে থাকছিল রত্না, ভেবেছিল অন্য কোন উপায় না হওয়া পর্যন্ত…
একজনের কথায় রাজমিস্ত্রির সঙ্গে কামিন খাটার কাজ করতেও গিয়েছিল রত্না , দু দিনেই যা অভিজ্ঞতা হলো! ইটগুলো মাথায় নিয়ে বইতে গিয়ে বারবার দাঁড়িয়ে পড়ছিল। সেটা দেখে রাজমিস্ত্রিটা কাছে এসে বলে -‘বহুত কষ্ট লাগছে না! এই কাজ তুর জন্যে লয়’ বলতে বলতেই রত্নার পিঠের উপর হাত বোলাতে থাকে, অসহ্য লাগছে রত্নার সরীসৃপের মতো হাতটাকে সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে, জন্তুটা পিঠের নরম অংশে চাপ দিতে দিতে ফিসফিস করে বলে ‘আরে শুন, ই কাজট তুর জন্যে লয়। চল চল উদিকে চল তুখে দেখে আমার জিভে জল আসছে মাইরি,’ বলেই খ্যাক খ্যাক করে হাসতে হাসতে ওকে হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে চায়। দারুণ এক শঙ্কায় কেঁপে ওঠে সে, এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে পালায়।
হাতে থাকা শেষ সম্বলটুকু দিয়েই কটাদিন কোনমতে কাটলো, পরের দিনগুলোর কথা ভাবতেও পারে না সে । ভিক্ষে করবে নাকি! ছিঃ ছিঃ একী ভাবছে রত্না!
বেশি ভাবতেও হলোনা, নজরে পড়েইগেল একসময়। যত অভাবের মধ্যেই থাকুক না কেন একটা সহায় সম্বল হীন আটাশ বছরের মেয়ের যৌবনের প্রতি লালসা বাড়তেই থাকল। এদিকে হাতের মুঠোয় একটা টাকাও যখন আর রইলো না , মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিল রত্না ।তারমতোই ফুটপাতে থাকা আশেপাশের মানুষগুলো কাঠকুটো জ্বেলে ভাত রান্না করছিল আর তার ছেলেটা ভাতের গন্ধ পেয়ে খাবার জন্য বায়না করছিল বারবার। চোখ ফেটে জল আসছিল।
পাশে বসে ফুকফুক করে বিড়ি টানছিল বুড়িটা, বলে ‘আহ মাগীর ঢঙ কত! শরীলে যৈবন আছে, ইদিক উদিকে কত লাগর ঘুইরছ্যে তবুও পোলাটার প্যাট দুখ্যাছে ভাতের লেইগ্যে!
বলি পোড়া প্যাটের জন্যি কত কিছুই না কইরত্যে হয়! হাঁ দেখ উদিকে দামড়া গুলান তুখে চোখে চাইটছ্যে, একটাকে পাঠাই দিব নাকি?’ কথাটা শুনে হাঁ হয়ে গেছিল রত্না, লজ্জায় মাথা নীচু করে বসে রইল। ওরা একডাবু মাড়ভাত দিয়েছিল খেতে। হামলে পড়ে খাবার শেষ করে আরো খাবারের আশায় থালা চাটতে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে অস্ফূটে বলেছিল তোর জন্য আমি সবকিছুই করতে পারি।
..সেই সন্ধ্যাতেই ফুটপাতের আলো আঁধারির আবছা আড়ালে আঁচল খসিয়ে লজ্জায় ঘেন্নায় মিশে যেতে যেতে উপুর্যপরি পীড়ন সহ্য করে ছেলেটার জন্য ভাতের যোগাড় করলো রত্না।
সব লজ্জা ধুয়ে মুছে গেল ভাত ফোটার গন্ধে, চোখের জল বাষ্প হয়ে ক্রমশঃ মিশে যেতে থাকলো গরম ভাতের ধোঁয়ার সঙ্গে। দুদিন উপোসী থাকা রত্নাও গোগ্রাসে গিলতে লাগলো ভাত আর ভাতের লজ্জা।

…ছেলেটার শরীরটাও আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে।
রত্নার যৌবনে পালের বাতাস লেগে তরতর করে দিন এগোতে লাগল। এখন বাজারে ওর হেব্বি ডিমাণ্ড । ইতিমধ্যে ফুটপাত থেকে উঠে এসে লাইনের পাড়াতেই একটা ঘর নিয়েছে।খদ্দের পাঠিয়ে কমিশন নেওয়া ছেলেগুলো ভারি বাধ্য তার। রত্না রাহুলকে হোষ্টেলে রেখে পড়াচ্ছে। ক্লাস টেনে পড়া ছেলেটার চোখেও এখন অনেক স্বপ্ন। সেদিনের কথা তখন না বুঝলেও আজ সব বোঝে সে।
স্কুলে স্বরচিত কবিতা প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছে।
চোখের জল আর বুকে জ্বালা নিয়ে রাত জেগে কবিতা লিখতে থাকে ছেলেটা,কবিতাটা শেষ করতে হবে আজকের মধ্যেই।
শেষ পর্যায়ে এসে থমকে গেছে রাহুল, সেদিনের বুভুক্ষু রাহুল,খিদের জ্বালায় কাঁদতে থাকা সাত বছরের রাহুলের মুখ ভাসছে চোখের সামনে। আবছা অন্ধকারে পিষে যেতে যেতে মায়ের সেই অস্ফূট আর্তনাদের কথা, টাকা কটা হাত পেতে নিয়ে পেট আঁচলে করে চাল কিনে সাত তাড়াতাড়ি কাঠ কুটো জ্বেলে ভাতের যোগাড়!
জ্বলন্ত আগুনের মতো সেই দিন গুলির কথা ভাবতে ভাবতেই শেষ লাইন দুটো লিখল–

উপোসী ছেলের মুখে দিতে ভাত জল
দুমুঠো চালের ভারে ছিঁড়েছে আঁচল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *