মিসেস তালুকদারের আংটি
মিঃ পাণিগ্রাহী নীচে নেমে গেলেন। আমরা আবার ঘরে ফিরে যে যার জায়গায় বসে পড়লুম। ভাদুড়িমশাইকে মনোজবাবু বললেন, “উঃ, আপনি ছিলেন বলে খুব বাঁচা বেঁচে গেছি, মশাই। নয়তো ঘরে ঢুকে সব একেবারে লণ্ডভণ্ড করে ছাড়ত।”
ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “তা করত ঠিকই, তবে কিছুই তো পেত না।”
“না-ই পাক,” মনোজবাবু বললেন, “আমার তো হয়রানির একশেষ হত। কথায় বলে, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা। বাপ রে বাপ, একেবারে ঘেমে গেছি, মশাই। যাই, আপনাদের বাথরুম থেকে ঘাড়ে-গর্দানে একটু জল ছিটিয়ে আসি।”
“না, আপনি এখন বাথরুমে যাবেন না।”
চেয়ে দেখলুম, ভাদুড়িমশাইয়ের মুখের হাসি কিছুমাত্র মিলিয়ে যায়নি। কিন্তু কথাটা তিনি যেভাবে বললেন, তাতে যে বেশ কিছুটা কাঠিন্য ছিল, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। ফলে একটু চমকে গিয়েছিলুম।
চমকে নিশ্চয় মনোজবাবুও গিয়েছিলেন। নইলে উঠতে গিয়েও ধপ করে তিনি ফের বসে পড়বেন কেন? বসে পড়ে বললেন, “কেন, যাব না কেন?”
“যাবেন, কিন্তু আমাদের পরে যাবেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আসলে আমাদের বয়েস তো আপনার চেয়ে বেশি। তাই এখানকার পুলিশ-সাহেব ওই যে হঠাৎ আমাদের ঘরে এসে ঢুকে পড়লেন, তাতে আপনার চেয়ে আমরা আরও বেশি ঘাবড়ে গিয়েছিলুম। ঘাড়ে-গর্দানে জল ছিটোনোটাও তাই আমাদেরই আগে দরকার। … আসুন, কিরণবাবু। তাড়াতাড়ি কাজ চুকিয়ে ফেলি।”
বুঝলুম, কিছু-একটা ব্যাপার হয়েছে। তাই কোনও প্রশ্ন না-করে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে গিয়ে বাথরুমের মধ্যে ঢুকে পড়লুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিন, আপনি আগে বেসিনের কাজ সারুন।” বলেই তিনি শাওয়ারের দিকে সরে গেলেন।
বাথরুমের দরজা খোলাই রয়েছে। কিন্তু শাওয়ারটা যে-দিকে, ঘরের ভিতর থেকে সে-দিকটা দেখা যায় না। একে তো ভাদুড়িমশাই ঢ্যাঙা মানুষ, তার উপর কলঘরের সিলিংটাও বেশ নিচু। বেসিনের কল খুলে, ভাদুড়িমশাইয়েরই কথামতো, চোখেমুখে জল ছিটোচ্ছিলুম। সেই অবস্থাতেই ঘাড় বাঁকিয়ে লক্ষ করলুম যে, শাওয়ারের নলের মুখে যে ঝাঁঝরি থাকে, প্যাঁচ ঘুরিয়ে সেটা তিনি খুলে আনছেন। নলের মধ্যে যে ন্যাকড়া গোঁজা, পরক্ষণে এটাও আমার নজরে পড়ল। শাওয়ারের কল আঁটা, তবু জবজবে-ভিজে ন্যাকড়াটাকে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে, খুব সন্তর্পণে বার করে আনলেন তিনি। নয়তো নলের মুখ থেকে যেটুকু জল গড়িয়ে পড়ল, তাতেই তিনি ভিজে যেতেন। জল ঝরে যাবার পরে ঝাঁঝরিটাকে আবার যথাস্থানে লাগিয়ে দিলেন তিনি, তাও দেখলুম।
নিচু গলায় বললুম, “কী ব্যাপার বলুন তো?”
ভিজে ন্যাকড়াটা দেখলুম আসলে একটা রুমাল। সেটা খুলে তার ভিতর থেকে কী-একটা জিনিস বার করে নিলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর সেটাকে পকেটে পুরে বললেন, “কিছু না। চলুন, বাথরুমটা এবারে মনোজবাবুকে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে।”
ঘরে ঢুকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী মনোজবাবু, আর কি আপনার বাথরুমে যাবার দরকার হবে?”
মনোজবাবু ঝিম মেরে বসে ছিলেন। মুখ তুলে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে একবার তাকিয়েই ফের মুখ নামিয়ে নিলেন তিনি। কী বুঝলেন, তিনিই জানেন। মৃদু গলায় বললেন, “না।”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে তা হলে একটু আরাম করে বসুন। আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব। আমার প্রথম প্রশ্ন, এই মূল্যবান বস্তুটি আপনি কোত্থেকে পেলেন?”
পকেট থেকে যে ‘মূল্যবান বস্তুটি’ বার করলেন ভাদুড়িমশাই, তাতে আমার চোখ ধাঁধিয়ে যাবার জোগাড়। সোনার আংটি, তাতে একটি নীলা বসানো।
সদানন্দবাবু বললেন, “উরে বাবা, এ তো দেখচি দারুণ ঝকমকে ব্যাপার।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “স্যাফায়ার। সাইজ দেখে মনে হচ্ছে, দাম নেহাত কম হবে না। সকলের কপালে নাকি সয় না। আমাদের মনোজবাবুর কপালে যে সয়নি, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। তা মনোজবাবু, এটি আপনি পেলেন কোথায়?”
মনোজবাবু কোনও উত্তর দিলেন না। গোঁজ হয়ে বসে রইলেন।
“ঠিক আছে, আপনি যখন বলবেন না, তখন আমিই সবটা বলি। ডাইনিং হলে যখন আপনারা খাচ্ছিলেন, ঝপ করে ঠিক সেই সময়েই তো আলো নিবে যায়, তা আমার ধারণা, অন্ধকারের মধ্যে তখনই কারও আঙুল থেকে এটি আপনি ছিনিয়ে নেন। কিন্তু আলো এখানে চলে গেলেও আবার দু’-পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসে তো, তাই আপনার ভয় হল যে, অত কম সময়ের মধ্যে এটাকে কোথাও লুকিয়ে ফেলা আপনার পক্ষে সম্ভব হবে না। ফলে আপনি কী করলেন? না মেন-সুইচটা অফ করে দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে উপরে চলে এলেন। এসে হাত-মুখ ধোবার অছিলায় ঢুকে পড়লেন আমাদের বাথরুমের মধ্যে। বাথরুম তখন অন্ধকার। তাই কিরণবাবু তাঁর টর্চটা আপনাকে দিতে চেয়েছিলেন। আপনি বললেন, দরকার হবে না। তা মশাই, শাওয়ারের ঝাঁঝরির প্যাঁচ খুলে, আংটিসুদ্ধু রুমালটাকে পাকিয়ে নিয়ে পাইপের মধ্যে ঢুকিয়ে, তারপর ফের ঝাঁঝরিটাকে যথাস্থানে লাগানো, এতসব কাজ কি অন্ধকারের মধ্যে করা যায় নাকি? অসম্ভব। অথচ সেই অসম্ভবও আপনার বেলায় সম্ভব হল। কী করে হল বলব? আপনার পকেটে নিশ্চয় খুব ছোট্ট একটা টর্চ রয়েছে। নিন, সেটা বার করুন তো। নিজে যদি বার করে না দেন, তো আমি আপনার পকেটে হাত ঢোকাতে বাধ্য হব, মশাই।” তার দরকার হল না। পকেট থেকে মনোজবাবু এক ব্যাটারির ছোট্ট একটা টর্চ বার করে বিছানার উপরে নামিয়ে রাখলেন।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, দ্যাট’স লাইক আ গুড বয়। তো কার আঙুল থেকে আংটিটা ছিনিয়ে নিয়েছেন, এইবারে সেটা বলুন দেখি। অবশ্য নামটা আপনি না-বললেও আমরা জানতে পারব ঠিকই। যাঁর আংটি, তিনি কি আর ম্যানেজারকে ইতিমধ্যেই জানাননি যে, অন্ধকারের মধ্যে ডাইনিং হলে তাঁর আংটি ছিনতাই হয়েছে?”
প্রায় অস্ফুট গলায় মনোজবাবু বললেন, “মিসেস তালুকদার।”
নামটা শুনবামাত্র সদানন্দবাবু বিষম খেয়েছিলেন। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে, টেবিল থেকে জলের জগটা তুলে নিয়ে সেইটে থেকেই ঢকঢক করে খানিকটা জল খেয়ে নিয়ে, একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, “উরিব্বাবা! আপনার তো দেকচি দারুণ সাহস!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “যেমন সাহস, তেমনি বুদ্ধি! তা মনোজবাবু, এখন আপনাকে নিয়ে কী করব বলুন?”
মনোজবাবুর মুখের রক্ত অনেক আগেই কেউ শুষে নিয়েছিল। এবারে একেবারে ভেঙে পড়লেন তিনি। ফ্যাসফেসে গলায় বললেন, “দোহাই আপনাদের! দয়া করে আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেবেন না!”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আরে ছিছি, তা-ই কখনও দেওয়া যায়? আপনার ওই দামি সিগারেট তো আমরা এই দু’দিনে গোটা আট-দশের কম খাইনি। গাঁটের পয়সা খর্চা করে চা আর কোল্ড ড্রিংকসও ইতিমধ্যে তা অন্তত দু-চার বার আপনি আমাদের খাইয়েছেন। এর কোনওটাই অবশ্য নোনতা খাবার নয়, কিন্তু তা না-ই হোক, এর পরেও যদি আপনাকে আমরা পুলিশের হাতে তুলে দিই তো সেটা কি ঘোর নিমকহারামির ব্যাপার হবে না? না, মশাই, ভয় নেই, নিশ্চিন্ত চিত্তে আপনি ঘরে চলে যান। কিন্তু একটা কথা মনে রাখুন। আর-কখনও ভুলেও এমন কাজ করবেন না। করলে কিন্তু বিপদে পড়বেন।”
মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন মনোজ সেন। ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যান, এবারে আপনি শাওয়ার খুলে চান করে আসুন।”
তার মিনিট পনেরো বাদে আমরা নীচে নামলুম। ডাইনিং হল-এ ঢুকে, খাওয়ার পাট চুকিয়ে ম্যানেজারের ঘরে গিয়ে দেখলুম, মিঃ মহাপাত্র সেখানে একাই বসে আছেন। বিষণ্ণ মুখ, একটুও হাসি নেই।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “মিঃ পাণিগ্রাহীকে যে দেখছি না?”
“পুলিশ-সাহেবের কথা বলছেন তো?” বেজার গলায় মিঃ মহাপাত্র বললেন, “দলবল নিয়ে এই মাত্তর মিনিট পাঁচেক আগে উনি চলে গেলেন। উঃ, যেন একটা ঝড় বয়ে গেল, মশাই!”
“চারতলা থেকে দুজনকে নাকি অ্যারেস্ট করেছেন?”
“চারতলার দুজন আর আপনাদের তিনতলার একজন। উঃ, হোটেলের সুনামের একেবারে বারোটা বেজে গেল!”
“আমাদের তলা থেকে আবার কাকে অ্যারেস্ট করা হল?”
“চার-নম্বর ঘরের মিঃ ভার্মাকে। তাঁর স্যুটকেসের মধ্যে নাকি এক প্যাকেট চরস পাওয়া গেছে! এদিকে আবার আর-এক কাণ্ড হয়েছে! মিসেস তালুকদারকে চেনেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “নাম শুনেছি।”
“একে তো জাঁদরেল মহিলা, তায় এখানকার ফুড ডিপার্টমেন্টের ইন্সপেক্টর! হঠাৎ-হঠাৎ হোটেলে এসে চেক করে যান যে, গেস্টদের আমরা সাব-স্ট্যান্ডার্ডের খাবার খাওয়াচ্ছি কি না। তা হবি তো হ, সেই তাঁরই হাত থেকে একটা আংটি আজ ছিনতাই হয়েছে! তাও আবার আমাদের এই হোটেলের মধ্যে!”
সব জেনেও না-জানার ভান করতে ভাদুড়িমশাই বেশ ভালই পারেন। এবারেও দেখলুম তাঁর অভিনয় একেবারে নিখুঁত হল। ঝুঁকে পড়ে বললেন, “সোনার আংটি?
“হ্যাঁ।”
“তাতে একটা ঝকঝকে নীল পাথর বসানো?”
“নীলা মশাই, নীলা! তা আপনি কী করে জানলেন?”
“তবে আর বলছি কী,” ভাদুড়িমশাই তাঁর পকেট থেকে আংটিটা বার করে একগাল হেসে সেটা মিঃ মহাপাত্রের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “দেখুন তো এইটে কি না।”
মিঃ মহাপাত্রের চোখ একেবারে গোল হয়ে গিয়েছিল। আংটিটা হাতে নিয়ে বললেন, “এটা আপনি কোথায় পেলেন?”
“তিনতলা থেকে খেতে নামছি, হঠাৎ দেখি, দোতলার ল্যান্ডিংয়ের এক কোণে ওটা পড়ে রয়েছে!”
“এটা ওখানে কী করে গেল?” মিঃ মহাপাত্র বললেন, “এ তো বড় আশ্চর্য ব্যাপার!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার ধারণা, ছিনতাইটা যে-ই করে থাক, দৌড়ে পালাবার সময় তার হাত থেকে ওটা পড়ে গিয়ে থাকবে! কিন্তু হোটেলে এতক্ষণ পুলিশ ছিল তো, তাই বোধহয় তার আর ওটা খোঁজ করার সাহস হয়নি। …যা-ই হোক, মিসেস তালুকদারকে ওটা দিয়ে দেবেন।”
মিঃ মহাপাত্র বললেন, “দেব কি মশাই, এক্ষনি তাঁকে ডেকে এটা দিয়ে দিচ্ছি। আপনাদের সামনেই দিয়ে দেব।”
“তার কোনও দরকার হবে না।”
“তা হলে অন্তত এই বাবদে একটা রসিদ নিয়ে যান।”
ভাদুড়িমশাইয়ের কাছ থেকে একটা নীলা-বসানো আংটি পেয়েছেন বলে মিঃ মহাপাত্র তক্ষুনি হোটেলের প্যাডে খসখস করে একটা রসিদ লিখে দিলেন। রসিদটা নিয়ে আমরা তিনতলায় উঠে এলুম।
ভাদুড়িমশাই তাঁর ঘরের দিকে পা বাড়াচ্ছিলেন। বললুম, “একটা কথা বলব?”
“বলুন।”
“মনোজবাবু যে শাওয়ারের মধ্যেই আংটিটা লুকিয়ে রেখেছেন, এটা আপনি বুঝলেন কী করে?”
“আপনারও বোঝা উচিত ছিল।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “জলের ওভারহেড ট্যাঙ্ক তো একটাই। তা হলে বেসিন দিয়ে জল পড়ছে, অথচ শাওয়ারে জল নেই, এ কখনও হয়?”
“ঠিক আছে। কিন্তু নিজের বাথরুমের বদলে আমাদের বাথরুমের শাওয়ারে ওটা উনি লুকোতে গেলেন কেন?”
“দ্য রিজন ইজ সিম্পল। উনি খবর পেয়েছিলেন যে, খানাতল্লাশি হবে। সেইসঙ্গে এটাও জানতেন আমি কে। ফলে উনি ধরেই নিয়েছিলেন যে, অন্য সব ঘর সার্চ করা হলেও আমাদের ঘর দুটো সার্চ করা হবে না। তা সত্যিই তো আমাদের ঘর সার্চ করা হল না।”
বললুম, “নাঃ, লোকটা বুদ্ধিমান তাতে সন্দেহ নেই!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু বড্ড লোভী! ভাল একটা চাকরি করছে, অর্থাভাব নেই, অথচ দেখুন লোভের ফাঁদে জড়িয়ে গিয়ে কীরকম অপদস্থ হল! …কিন্তু না, আর নয়, দ্য ওয়েদার ইজ লুকিয়ে আপ। একটু আগে ডাইনিং হল-এ কে যেন বলল, দুর্যোগ কেটে গেছে। কপাল নেহাত খারাপ না হলে কাল ভোরে সমুদ্রের ধারে বসে সূর্যোদয়টা হয়তো দেখতে পাব। যান, এবারে ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ুন।”
ইদানীং সব ব্যাপারেই দেখছি শেষ কথাটা বলেন সদানন্দবাবু। আজও বললেন। একগাল হেসে বললেন, “শুয়ে পড়লেই কি আর ঘুম আসবে! উঃ, আপনি দেখচি যেখানেই যান, সেখানেই একটা কাণ্ড বেধে যায়! এ তো খুব মুশকিলের কথা হল মশাই!”
