Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » মিসেস তালুকদারের আংটি || Nirendranath Chakravarty » Page 2

মিসেস তালুকদারের আংটি || Nirendranath Chakravarty

আজ বেস্পতিবার। গতকাল, ভোরবেলার বদলে, সকাল আটটা নাগাদ পুরীতে এসে পৌঁছেছি। রথযাত্রা উপলক্ষে এখানে যে কী মারাত্মক ভিড় হয়, সে তো সবাই জানেন। এবারেও হয়েছিল। উলটো-রথ অব্দি তার জের চলেছে। শুনলুম হোটেল, হলিডে হোম, ধর্মশালা আর ভাড়াবাড়ি, কোত্থাও নাকি তিলধারণের জায়গা ছিল না। তবে আমরা রথের ধাক্কা কেটে যাবার পরে এসেছি। হোটেলে জায়গা পেতে তাই বিশেষ অসুবিধে হয়নি।

ল্যান্ডস এন্ড হোটেলটা খুব খারাপও নয়। চক্রতীর্থের একেবারে পুবদিকের সীমানা ঘেঁষে বছর খানেক আগে এই নতুন হোটেলটা তৈরি হয়েছে। চারতলা হোটেল, তবে ঘরের সংখ্যা বেশি নয়, মাত্র বারো। একতলায় থাকার ব্যবস্থা নেই, সেখানে স্রেফ রিসেপশান, লাউঞ্জ, কিচেন আর ডাইনিং হল। উপরের তিনটি তলার প্রতিটিতে চারটি করে বেডরুম, আর প্রতিটি বেডরুমে টুইন বেডের ব্যবস্থা। দলে আমরা তিনজন, একটা বড়ঘরের সঙ্গে তাই একটা সিঙ্গল-বেডের ঘর পেলে ভাল হত। কিন্তু তার ব্যবস্থা না-থাকায় পাশাপাশি দুটো বড় ঘরই আমাদের নিতে হয়েছে। একটায় ভাদুড়িমশাই আছেন, অন্যটায় আমি আর সদানন্দবাবু। আমরা ঘর পেয়েছি তিনতলায়। সার্ভিস ভাল, টেলিফোন তুলে রুম সার্ভিসকে খবর দেবার পরে আর তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতে হয় না, চা কফি যা-ই চাই না কেন, মিনিট দশেকের মধ্যেই সেটা এসে যায়। তবে সে-সব নয়, সব তলার সব ঘর থেকেই যে সমুদ্র দেখা যায়, এই হোটেলের এটাই দেখছি মস্ত সুবিধে।

পাছে তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে মেয়ে-ডাকাতরা তাঁর বাড়িতে এসে হানা দেয়, এই ভয়ে যে-মানুষটি পুরী আসতে চাইছিলেন না, এখানে এসে দেখছি তিনিই সবচেয়ে বেশি খুশি। খুব ছেলেবেলায় ভদ্রলোক একবার দেওঘরে গিয়েছিলেন। তারপর নেহাতই মাস কয়েক আগে আমাদের সঙ্গে একবার গিরিডি যান। মাঝখানে তিনি আর কলকাতার বাইরে পা বাড়াননি। জীবনে এটা তাঁর তৃতীয় আউটিং। সমুদ্রও তিনি এই প্রথম দেখলেন। দেখে বিস্ময়ের যে ধাক্কা লাগে, তাতে তাঁর ভুরু দুটি তাদের নিজস্ব জায়গাজমি ছেড়ে ইঞ্চি-দেড়েক উপরে উঠে গিয়েছিল। খানিক বাদে তারা আবার যথাস্থানে নেমে আসবার পরে তিনি যে মন্তব্য করেন, সেটা একেবারে বাঁধিয়ে রাখার মতো। “ও মশাই, এ তো দেখছি দশ-দশটা গঙ্গার চেয়েও বড় ব্যাপার!”

মেয়ে-ডাকাতের ব্যাপারটা অবশ্য এখনও তিনি ভুলতে পারেননি। হয়তো ভুলে যেতেন, যদি না হাওড়া থেকে আসবার সময় ট্রেনের মধ্যে একটা মজার কাণ্ড ঘটত। সেটার কথা এখানে না-বললেই নয়। যে কিউবিকূলে আমরা জায়গা পেয়েছিলুম, তাতে মোটমাট চারটে বার্থের মধ্যে দুটো লোয়ার আর একটা আপার বার্থ ছিল আমাদের নামে। রিজার্ভেশন চার্টে বাদবাকি আপার বার্থটার পাশে দেখলুম মিসেস বি. তালুকদার বলে এক ভদ্রমহিলার নাম লেখা রয়েছে। ঠিক করেছিলুম যে, সদানন্দবাবু আর ভাদুড়িমশাইকে নীচের বার্থ দুটো ছেড়ে দিয়ে আমি আপার বার্থটা নিয়ে নেব। কিন্তু সদানন্দবাবু তাতে রাজি হলেন না। বললেন, “সে কী মশাই, একজন লেডিকে কেন কষ্ট করে উপরে উঠতে হবে? তাও কি হয় নাকি? তার চেয়ে বরং আমার লোয়ার বার্থটা ওঁকে ছেড়ে দিয়ে ওঁর আপার বার্থটা আমি নিয়ে নিচ্ছি।” যে কথা, সেই কাজ। লাইনে যেন কোথায় কী গণ্ডগোল ছিল, তাই জগন্নাথ এক্সপ্রেস সেদিন হাওড়া থেকে ছেড়েছিল বেশ দেরি করে। কোলাঘাট পেরিয়ে আসতে-আসতেই ন’টা। সদানন্দবাবু তারপরে আর সময় নষ্ট করেননি, উপরের বার্থে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।

মিসেস বি. তালুকদার জগন্নাথ এক্সপ্রেসে উঠলেন খড়গপুর থেকে। জাঁদরেল মহিলা। লোয়ার বার্থটা তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে দেখে কোথায় ধন্যবাদ জানাবেন, তা নয়, উঠেই মহা হম্বিতম্বি লাগিয়ে দিলেন। কী, না তাঁর বার্থ যে অন্য লোকে দখল করে নিয়েছে, এটা তিনি কিছুতেই সহ্য করবেন না। যত তাঁকে বোঝাবার চেষ্টা করা হয় যে, তাঁর সুবিধার জন্যই এটা করা হয়েছে, তত তিনি চেঁচাতে থাকেন। তাঁর সাফ কথা, রেল কোম্পানি থেকে যে বার্থটা তাঁকে দেওয়া হয়েছে, সেটাই তাঁর চাই। এক্ষুনি যদি না ওই ‘বুড্‌ঢা আদমি’ আপার বার্থ থেকে নেমে আসে তো তিনি চেন টানবেন, পুলিশ ডাকবেন, চাই কী যদি দরকার হয়, তো…

দরকার হলে আরও কী-কী করবেন, তা আর তাঁকে বলতে হয়নি, পুলিশ ডাকা হতে পারে, স্রেফ এইটুকু শুনেই দেখলুম সদানন্দবাবুর চোয়াল ঝুলে পড়েছে, বিছানা-বালিশ গুটিয়ে নিয়ে তড়াক করে তিনি আপার বার্থ থেকে নেমে এলেন।

ভাদুড়িমশাই মৃদু-মৃদু হাসছিলেন। সদানন্দবাবু নীচে নামতে জিজ্ঞেস করলেন, “পরোপকারের শখ মিটল?”

সদানন্দবাবু কিছু বললেন না। তাঁর মুখে কথা ফুটল একেবারে সকালবেলায় পুরী স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নেমে। বাইরে বেরুবার গেটের দিকে এগোতে এগোতে আমাকে বললেন, “কলকাতায় ফিরে আমার ওয়াইফকে আবার কাল রাত্তিরের কতাটা বলবেন না যেন। বড্ড ভয় পেয়ে গেসলুম মশাই।”

বললুম “পাবারই কথা। যা মেজাজ!”

“ধুর মশাই, আমি কি কাওয়ার্ড যে, কারও মেজাজ দেখে ভয় পাব?”

“তা হলে কী দেখে ভয় পেলেন?”

“দেখে নয়, শুনে। গলাটা শুনলেন না?”

“কেন, গলায় আবার কী হল?”

“গলার আওয়াজ একেবারে পুরুষদের মতন মোটা।” সদানন্দবাবু বললেন, “আমার তো মশাই পিলে চমকে গেসল।”

আজ সকালে দ্বিতীয়বার তাঁর পিলে চমকে যায়। সে-কথায় একটু বাদে আসছি, তার আগে আর দু-একটা কথা বলে নিই

সব জায়গারই একটা টুরিস্ট-সিজন থাকে। ক্রিসমাসের ছুটিতে বড়-একটা কেউ দার্জিলিংয়ে বেড়াতে যায় না, যেমন গ্রীষ্মের ছুটিতে কেউ বেড়াতে যায় না রাজস্থানে। পুরীতে আগে টুরিস্ট আসত পুজো, বড়দিন আর নয়তো গরমের সময়। এখন কিন্তু বলতে গেলে প্রায় সব সময়েই এখানে টুরিস্টের ভিড় চোখে পড়ে, এক ওই বর্ষাকালের কয়েকটা মাস ছাড়া। ওটা এখানকার ‘সি’ নয়। তখন যাঁরা পুরীতে আসেন, তাঁরা স্রেফ রথযাত্রা দেখে পুণ্য সঞ্চয় করতে আসেন, বেড়াতে আসেন না। আসলে বর্ষাকালটা হচ্ছে ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকার সময়, বেড়াবার পক্ষে এই রকমের বিচ্ছিরি ঋতু দুটি নেই। বিশেষ করে পাহাড়ে আর সমুদ্রের ধারে।

অথচ সেই বর্ষাকালেই আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি। রথযাত্রার সময়টা পার করে দিয়ে এসেছি বলে ভিড়ভাট্টার ধকল সামলাতে হচ্ছে না ঠিকই, আর তা ছাড়া হোটেলে যেহেতু গেস্টের সংখ্যা এখন কম, তাই এখানকার ম্যানেজার মিঃ বিজয় মহাপাত্রও যে আমাদের খাইয়ে-দাইয়ে তুষ্ট করবার ব্যাপারে কোনও ত্রুটি রাখছেন না, সেটাও স্বীকার করব। কারণে-অকারণে তিনি হেসে হেসে আমাদের সঙ্গে কথাও বলছেন খুব। মনে তবু শান্তি নেই। কী করেই বা থাকবে! সারাক্ষণ বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। কখনও ঝিরঝির করে, কখনও মোটা ফোঁটায়। এদিকে সমুদ্রটাও যেন মুখভর্তি ফেনা নিয়ে এক-দঙ্গল বুনো ঘোড়ার মতন দাপাদাপি করছে সারাক্ষণ। এমন উঁচু-উঁচু সব ব্রেকার আসছে আর পাড়ের কাছে এসে এমন উলটো-পালটা সেগুলো ভেঙে পড়ছে যে, সে আর কহতব্য নয়। কাল সকালে যখন এই হোটেলে এসে চেক-ইন করি, প্রাথমিক কথাবার্তার পর মিঃ মহাপাত্র তখনই আমাদের বলেছিলেন যে, সমুদ্রস্নানের ঝুঁকি আপাতত না-নেওয়াই ভাল। কথাটা না-বললেও চলত; এক পলক দেখেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলুম যে, ওর মধ্যে যদি নামি তো হাড়গোড় আস্ত রেখে উঠে আসতে পারা যাবে না।

সদানন্দবাবুর মুখে যে-কথাটা আমাকে নিত্য শুনতে হয়, তিনতলায় উঠে এসে এ-ক্ষেত্রেও অত্যন্ত বেজার মুখে সেই একই কথা তিনি বললেন। “এ তো খুব মুশকিল হল মশাই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন, মুশকিলটা কীসের?”

“না, মানে ভাবছিলুম যে, কয়েকটা দিন সমুদ্দূরে চান করতে নেমে খুব সাঁতার কাটা যাবে। তা সে-গুড়ে তো বালি!”

হাসি চেপে বললুম, “চালাকি করবেন না তো। সাঁতার কাটতেন না ঘোড়ার ডিম করতেন!”

“বিশ্বাস হচ্চে না?” সদানন্দবাবু বললেন, “সাঁতার কাটব বলে কলকাতা থেকে রওনা হবার আগের দিন পঁচাত্তর টাকা দিয়ে চাঁদনি থেকে একটা স্কাই-ব্লু রঙের সুইমিং কস্টিউম পর্যন্ত কিনে এনিচি। সুটকেস খুলে সেটা যদি দেখিয়ে দিই, তা হলে বিশ্বাস হবে?”

বললুম, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, বাথরুমে ঢুকে ওই সুইমিং কস্টিউম পরে চান করে নেবেন। তারপর কাঁধের উপরে একখানা তোয়ালে ফেলে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেই হল, আমি তো ক্যামেরা নিয়ে এসেছি, টকাস করে একখানা ছবি তুলে দেব অখন।”

সদানন্দবাবুর ওই মুশকিলের কথাটা অবশ্য মিথ্যে নয়। না-পারছি সমুদ্রে নামতে, না-পারছি একটু ঘুরে বেড়াতে। পুরী আমার অনেক কালের চেনা জায়গা। ছেলেবেলা থেকে কতবার যে এখানে এসেছি, তার হিসেব করা শক্ত। এই বুড়ো বয়সেও যখনই বাইরে যাবার সুযোগ ঘটে, প্ৰথমেই মনে পড়ে পুরীর কথা। এবারে ভেবেছিলুম, ছেলেবেলায় পুরীতে এসে এই চক্রতীর্থের যে-সব বাড়িতে নানা সময়ে থেকেছি, সেগুলো একবার দেখে আসব। কিন্তু তা-ই বা হচ্ছে কোথায়। যা বৃষ্টি পড়ছে সারাক্ষণ, হোটেল থেকে বেরুনোই যাচ্ছে না।

অথচ সদানন্দবাবু দেখছি কিছুমাত্র দমে যাননি। বাইরে যাওয়া যাচ্ছে না বলে যে তাঁর মর্নিং ওয়াক আটকে আছে, তাও নয়। কাল হোটেলে ঢুকবার খানিক বাদে ঘণ্টাখানেকের জন্য তিনি উধাও হয়ে যান। দশটার সময় নীচে নেমেছিলেন, সওয়া এগারোটা নাগাদ উপরে এসে আমাকে বললেন, “খুব তো বই-টই লেখেন শুনি, কত গজে এক মাইল হয় জানেন?”

হেসে বললুম, “এ তো যে-কোনও বাচ্চা ছেলেও জানে। সতেরো শো ষাট গজে।”

“ভেরি গুড। তা সতেরো শো ষাট গজ মানে হচ্চে পাঁচ হাজার দু’শো আশি ফুট।”

“তাই?”

“হ্যাঁ। আর এই হোটেলের একতলার কভার্ড বারান্দাটা হচ্চে আশি ফুট লম্বা। ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করে অন্তত সেই কথাই শুনিচি।”

“তাতে কী হল?”

“তাও বুঝতে পারচেন না?” এক গাল হেসে সদানন্দবাবু বললেন, “ওই কভার্ড বারান্দায় আমি মোট দুশো বার এদিক-ওদিক হাঁটলুম। তাতে আমার তিন মাইলেরও বেশি মর্নিং ওয়াক হয়ে গেল।”

ভদ্রলোক যে তাতে বিশেষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, এমনও মনে হল না। সকাল থেকে রাত অব্দি কতবার যে কাল একতলা-চারতলা করেছেন, তার হিসেব নেই। এমন কী, ঘরে তো একটা ফোন রয়েছে, বিকেলে চা খাবার সময় সেটা তুলে যে রুম-সার্ভিসকে চা পাঠাতে বলব, তাও ভদ্রলোক বলতে দিলেন না। বললেন, “দাঁড়ান দাঁড়ান, আমরা যে দুধ-চিনি ছাড়া হালকা চা খাই, তা হয়তো ওরা বুজতেই পারবে না। তার চেয়ে বরং নীচে গিয়ে পরিষ্কার করে সব বুজিয়ে বলে আসি।” বলে আর দেরি করলেন না, ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নীচে নেমে গেলেন।

এতবার উপর-নীচ করার ফলে সদানন্দবাবুর সঙ্গে ইতিমধ্যে আলাপও হয়ে গেছে অনেকের। আমি আর ভাদুড়িমশাই তো বলতে গেলে তিনতলাতেই নোঙর ফেলে বসে আছি। স্রেফ দুপুরের আর রাত্তিরের খাওয়ার সময় একবার করে একতলায় নামি, তা ছাড়া আর আমাদের ঘর থেকে আমরা নড়িই না। আমাদের আলাপ হয়েছে মাত্র তিনতলার বাকি দুটি ঘরে যাঁরা আছেন, তাঁদের সঙ্গে। ভাদুড়িমশাইয়ের পাশের ঘরে আছেন মনোজ সেন। বছর পঁয়ত্রিশ বয়স। ছিপছিপে লম্বা শরীর। টুরিস্ট নন, কমার্শিয়াল ট্রাভলার। হরেকরকম ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্স তৈরি করে, কলকাতার এমন কী-একটা কোম্পানির সেলস ডিপার্টমেন্টে চাকরি করেন, কাজের সূত্রে বছরে বার কয়েক ওড়িশায় আসতে হয়, এবারে পুরীতে এসে আটকে গেছেন। হাসিখুশি গোপ্পে মানুষ। মাঝে-মাঝেই আমাদের ঘরে এসে আড্ডা দিয়ে যান। মনোজবাবুর পাশের ঘরে আছেন হরিপ্রসাদ ভার্মা। মধ্যবয়সী গোলগাল ভদ্রলোক। রথযাত্রার সময় পুরীতে এসেছিলেন। ইচ্ছা ছিল আরও কিছুদিন এখানে কাটিয়ে যাবেন। কিন্তু এখন ফিরতে পারলে বেঁচে যান। প্রাথমিক আলাপ-পরিচয়ের পরে ‘অ্যায়সা ওয়েদার কভি না দেখা’ ছাড়া অন্য কোনও কথা অন্তত এখনও পর্যন্ত এঁকে বলতে শুনিনি। ইনি সারাক্ষণই হাসেন বটে, কিন্তু কথা বলেন খুবই কম।

বাস, এখানে আসা ইস্তক আর-কারও সঙ্গে আমাদের আলাপ-পরিচয় হয়নি। ডাইনিং হলে যখন খেতে যাই, তখন অনেককে দেখি বটে, কিন্তু তাঁদের কে যে কী করেন কিংবা কে কোন তলায় থাকেন, সে-সব কিচ্ছু জানি না। সদানন্দবাবু কিন্তু সকলের সঙ্গেই দিব্যি জমিয়ে নিয়েছেন। কারা চারতলায় থাকে আর কারা দোতলায়, কে ছাত্র, কে ব্যবসায়ী, কে চাকরি-বাকরি করেন, আর কে তাঁর মতন রিটায়ার্ড ম্যান, সবই তাঁর নখদর্পণে। বৃষ্টি-বাদলার ঠেলায় যে হোটেল ছেড়ে কোথাও যাওয়া যাচ্ছে না, তা নিয়ে অন্তত সদানন্দবাবুর কোনও আক্ষেপ নেই। মনে হয়, তিনি বেশ ফূর্তিতেই আছেন।

অন্তত আজ সকাল পর্যন্ত ছিলেন। ঠিক ছিল, সকাল সাড়ে আটটায় আমরা ব্রেকফাস্ট খাব। বেড-টি খেয়ে সদানন্দবাবু তাই সাতটার সময় একতলায় নেমে যান। তখন বলে যান যে, আটটা পর্যন্ত মর্নিং ওয়াক করে কিচেনে ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিয়ে তিনি তিনতলায় ফিরে আসবেন। অথচ ফিরে এলেন তার আধ ঘণ্টা আগে, সাড়ে সাতটায়। এসেই, জানলার সামনে রাখা আর্ম-চেয়ারটার উপরে ধপ করে বসে পড়লেন।

বললুম, “কী ব্যাপার? এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলেন যে? মর্নিং ওয়াক হল না?”

“হবার জো আচে?” ঢোক গিলে সদানন্দবাবু বললেন, “দুশো পাক হাঁটবার কথা। অথচ একশো পাকও হেঁটিচি কি হাঁটিনি, এমন সময় একটা সাইকেল-রিকশো থেকে নেমে গটগট করে কাকে এই হোটেলে এসে ঢুকতে দেকলুম জানেন?”

“কাকে ঢুকতে দেখলেন?”

“ওরে বাবা, আমার তো মশাই দেখবামাত্র পিলে চমকে গেল!”

“দূর ছাই, কাকে দেখলেন?”

“মিসেস বি. তালুকদার।” ফ্যাকাশে মুখে সদানন্দবাবু বললেন, “এ তো খুব মুশকিল হল মশাই!”

Pages: 1 2 3 4 5

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *