ভালো থেকো
চারুলতার বিয়ে হলো তমালের সঙ্গে ! সম্বন্ধটা এনেছিল, চারু র দাদা।
অষ্টমঙ্গলায় বাপের বাড়িতে এসে, বৌদির কাছে চারু জানতে পারলো, লন্ডনে চলে গেছে অরণ্য।
চারুর স্বামী তমাল ভালো ছেলে।
বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান ,শান্ত, ধীর স্থির.. চেহারায় পান্ডিত্যে কোনো দিকে তমালের ত্রুটি নেই।
বিয়ের পরের দু’ বছর ইউনিভার্সিটি কোর্স কমপ্লিট করতে লেগে গেলো চারুলতার।
এই দু’ বছরে পড়াশোনার জন্য যতটুকু সাপোর্ট এবং সাহচর্য দরকার ছিল, তার থেকে অনেক বেশিই পেয়েছে তমালের কাছ থেকে।
সম্পর্ক আর ক্যারিয়ার, এই দুটো একসঙ্গে নিয়ে চলতে পারেনি অরণ্য। সময় চেয়েছিল তাই। আগে ক্যারিয়ার, পরে সম্পর্ক, এটাই ছিল অরণ্যে সিদ্ধান্ত।
চারুলতার সম্মানে লেগেছিল । অরণ্য তাকে গুরুত্ব না দিয়ে, নিজের ভবিষ্যৎ সিকিওর করতে মনোযোগী হয়েছিল।
তাই, এর পরেই, বাবা মায়ের পছন্দকে মেনে নিয়েছিল সে।
চারুলতা আর তমালের বিয়ের আজ সাত বছর পূর্ণ হলো।এখন চাকরি করে চারুলতা। ছেলের বয়স সাত মাস।
চারুলতার অফিসে সবাই বলে, তমালের মতন স্বামী নাকি প্রত্যেক মেয়ের জীবনের স্বপ্ন থাকে, এমন শান্ত স্বভাব এবং স্ত্রী কে এতটা প্রায়োরিটি আজকাল আর কোন পুরুষ না কী দেয় না।
সকলের সঙ্গে এই ব্যাপারটাই একমত চারুলতা। তমাল কে ভালোবাসে চারুলতা। কিন্তু একটাই যন্ত্রণা, হাজার চেষ্টা করেও এক সেকেন্ডের জন্য ভুলতে পারেনি অরণ্যকে। ঈশ্বর জানে, চারু প্রতিদিন প্রাণপণ চেষ্টা করেছে অরণ্য কে মন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে , কিন্তু পারেনি এক বিন্দু।
সাত বছরের অ্যানিভার্সারি উপলক্ষে আজ বাড়িতে ছোটখাটো পার্টি আছে, ব্যবস্থাপনায় তমাল নিজেই। অফিস ছুটি নিয়েছে তমাল।
চারুলতা কে অফিসে আসতেই হবে। তবে অন্যান্য দিনের থেকে,আজ অনেক আগেই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েছে চারু।
গড়িয়াহাট থেকে দুটো শার্ট একটা পারফিউম, ছেলের কিছু টুকটাক জিনিস কিনে নিয়ে, ফুটপাতের উপর দিয়ে হাঁটছে, ঠিক সেই সময়… এতোটুকু চিনতে ভুল হলো না চারুলতার।
চেহারার কোন পরিবর্তন নেই, কানের দুপাশের চিকচিকে সাদা চুলের রেখা ছাড়া। চারুলতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য। অরণ্যের ঠোঁটে পরিচিত আন্তরিক হাসি; হাসতে পারছে না চারুলতা। মুখোমুখি বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর, প্রথম কথা বলল অরণ্য, বলল,
- একই রকম আছো। ভালো আছো। দেখে ভালো লাগলো।
চারুলতার ঘড়ি কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেলো। প্রায় আট বছর পর দেখা হল অরণ্য র সঙ্গে। মাত্র কয়েক সেকেন্ড, তারপরেই চারুলতার খেয়াল হলো, ঘড়ি থেমে থাকে না ।আশেপাশের সবকিছু খুব দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
এবার অল্প হেসে চারুলতা বলল, - তুমি বুড়ো হয়ে গেছো কানের পাশে সাদা চুল উঁকি দিচ্ছে।
কথা বলার সময় চারুলতা বুঝতে পারলো, তার অবস্থান একই আছে।
তীব্র রাগ আর জেদ নিয়ে ,অরণ্য র সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছিল সে । ভেবেছিল বেরিয়ে এসেছে সম্পর্ক থেকে। এই মুহূর্তে অনুভব করল , কোন সম্পর্ক থেকেই মানসিকভাবে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা যায় না। সেও পারেনি।
অরণ্য জানালো, মাত্র এক সপ্তাহের জন্য এসেছে সে। আবার ফিরে যাবে লন্ডনে। টুকটাক কথা হওয়ার পরেই, কাছাকাছি যে কফি শপ ছিল, সেখানেই বসলো দুজনে।
অরণ্য – তুমি ভালো আছো এটা বলে দিতে হয় না। তোমাকে দেখে বোঝা যায় ।আগের থেকে অনেক বেশি পরিণত, আর অনেক বেশি সুন্দর। কনগ্রাচুলেশন্স। ভালো লাগছে তোমাকে দেখে।
চারুলতা – থ্যাঙ্ক ইউ, কিন্তু তুমি বিয়ে করোনি শুনলাম। কেন ?
অরণ্য – ইচ্ছে করে নি !
চারুলতা – আমি তোমাকে জানিয়ে ছিলাম আমার বিয়ের খবর। এতটুকু আপত্তি করোনি। বরং শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলে, সে টা কেন ?
অরণ্য – আমি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কনফিউজড ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কী করবো। সে কারণেই সময় চেয়েছিলাম তোমার কাছে। কিন্তু তোমার কাছে সময় নেই, বুঝতে পেরেছিলাম।
চারুলতা – আমার ছেলে আছে সাত মাসের । তমাল খুব ভালো। প্রতি মুহূর্তে শুধু আমাকে ভালো রাখার কথাই ভাবে।
অরণ্য – আমি জানি।
চারুলতা – তুমি কী করে জানলে ?
অরণ্য – আই চেক ইয়োর ফেসবুক এভরি ডে, তোমার সব ছবি আমি দেখি। তোমার ছেলে খুব মিষ্টি ।তমাল হ্যান্ডসাম, দেখি, কিন্তু রিয়াকশন দিতে ভয় পাই।
চারুলতা – আমাকে অন্য কারোর সঙ্গে দেখতে তোমার খারাপ লাগে না ?
অরণ্য – তুমি বিয়ে করেছো স্বেচ্ছায়। তাই তোমাকে অন্য কারোর সঙ্গে দেখতে আমি বাধ্য। কিন্তু আমার আর তোমার মধ্যে যে অনুভূতি ছিল, যে ফিলিংস ছিল সেটা জীবনে একবারই হয়। এখন তুমি তমালের সঙ্গে ভালো আছো, আমি জানি। কিন্তু আমরাও ভালো ছিলাম। আমাদের সেই ভালোলাগা এতোটুকু কমেনি। সেই অনুভূততেই আমি আছি এখনও। তোমার মনের এক কোনে, তোমার আগের ভালো লাগা, ঠিক একইরকম আদরে আছে, তুমি জানো না। তুমি জিজ্ঞেস করলে, তোমাকে তমালের সঙ্গে দেখে আমার খারাপ লাগে কিনা, আসলে আমি তমাল কে দেখতে পাই না। শুধু তোমাকে দেখতে পাই। তুমি ভালো আছো তোমার মতো। আমিও ভালো আছি আমার মতো।
চলে গেল অরণ্য।
নিজের গাড়ি অবধি পৌঁছোতেই প্রায় এক ঘন্টা লেগে গেল চারুলতার।
বাড়ি ফিরে ছেলেকে কোলে নিয়ে বসলো চারুলতা।ঘর ভর্তি আত্মীয় স্বজন…আনন্দ উল্লাস… তমাল খুব খুশি..খুশী চারুলতাও, তার মতো।
