ছাতা
তাড়াহুড়ো করে বাজার করতে গিয়ে আজ টক দইটা নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। গরমে, ভাতের পরে দই’টা হলে আমার একদমই চলে না। বাধ্য হয়েই একটা ছাতা নিয়ে বেড়ালাম গলির মুখের দোকানটা থেকে দই আনতে। কয়েকদিন যাবৎ প্রচন্ড গরম পরেছে। বলছে কলকাতাতে নাকি এই রকম গরম গত ৫০ বছরে পরেনি।
“শুকু’দা, একটা হাফ কিলো টক দই এর প্যাকেট দাও তো” বলে, ছাতাটা ফোল্ড করে, পকেট থেকে টাকাটা বের করতে করতে বললাম, “এইটুকু আসতেই যেন তালুটা ফেটে গেলো।”
আর অন্য পাঁচটা পাড়ার মুদিখানা দোকানের মতোই এটাও একটা ছোটখাটো দোকান। মোটামুটি সবরকম জিনিস এখানে পাওয়া যায়। একটা পাখা চালিয়ে দোকানের সামনে খসখস না হলেও ওর মতোই একটা কাপড় টাঙিয়ে রেখেছে শুকুদা। গায়ে জড়িয়ে রাখা গামছাটা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে শুকুদা বলল; “এই রকম গরম আমি আমার বাপের জম্মে দেখিনি রে। আমাকে একটা ফোন করতে পারতিস তো, বাড়ি যাওয়ার সময় দিয়ে যেতাম”। এই বলে শুকু দা যখন আমাকে দই টা দিতে যাবে, তখন একজন মানুষ এসে উপস্থিত হলো। উসকো – খুসকো কাঁচাপাকা চুল, মুখে অনেকগুলো বলিরেখা স্পষ্ট, চোখ দুটো ভীষণ স্পষ্ট, পরনের লুঙ্গিটা প্রায় হাঁটু পর্যন্ত তোলা, গায়ের উপরে একটা শতছিদ্র বললেও কম বলা হয় এইরকম একটা গেঞ্জি, চামড়ার নীচে একটু চেষ্টা করলে হাড় গুলো গোনা যায়, পায়ে দুটো আলাদা সাইজের সুতো বাঁধা পাতলা হাওয়াই চটি। ছোট্ট একটা কাঁচের শিশি এগিয়ে দিয়ে বলল, “বাবু, ২০ টাকার তেল আর একটা ৫ টাকার নুনের প্যাকেট দিবা গো?” কলকাতার ছোট পাড়ার দোকানে এখনো খোলা তেল পাওয়া যায়। এই বলে লোকটি তার বাঁ হাত দিয়ে মুখটা একটু পুঁছে নেওয়ার চেষ্টা করলো। ডান হাত দিয়ে তার ঘাড়ের একপাশে বসে থাকা ছেলেটাকে সে যত্ন করে ধরে রেখেছে।
এই প্রচণ্ড গরমে ছেলেটার মুখটা একদম শুকিয়ে গেছে। হাত দুটো সরু সরু, কোমরে দড়ি বাঁধা একটা হাফ প্যান্ট, মাথার চুলে কোনোদিন তেল পরেছে বলে মনে হয় না, গায়ে যথেষ্ট ঘামাচি। মুখটা পুঁচতে পুঁচতে যখন সেই লোকটা শুকু দার দোকানের সামনে রাখা সিমেন্টের স্ল্যাব টাতে শিশিটা রাখছিলো, তখন সেই বাচ্চাটার চোখ পড়ল, ওই স্ল্যাব এ রাখা লজেন্স এর বয়েম গুলোর দিকে।
আর পাঁচটা বাচ্চার মতো ওই লজেন্সগুলো দেখে ওর চোখটাও চকচক করে উঠলো। ছেলের কপালের ঘামটা punchiye দিয়ে সেই হাতটা, নিজের লুঙ্গিতে পুছতে পুছতে বলল “লজেন্স লিবি?”। বাবার কথায়, ছেলেটা তার মাথাটা দুবার উপর – নীচে করে, খাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলো।
খুচরো টাকা ক’টা নিয়ে ছাতাটা খুলে দোকান থেকে বেড়াবো এমন সময় লোকটা শুকু দা কে বলল; “তেলটা একটু কম করে দাও গো বাবু, আর ছেলেটাকে দুটো লজেন্স দাও।”
তার এই কথাটা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। লোকটা নেবে কুড়ি টাকার তেল, বাচ্চাটাকে দুটো লজেন্স কিনে দেবে বলে, তাদের ওইটুকু প্রয়োজন থেকেও আবার ছাত কাট করবে! এই কাঠ ফাটা রোদ এ যখন লোকে বাইরে বেরোতে ভয় পাচ্ছে, তখন এই মানুষটা বেঁচে থাকার এই সামান্য তাগিদের জন্য, কিভাবে ওই বাচ্চাটাকে নিয়ে বেরিয়েছে, ভেবে মনে মনে একটু কষ্ট পেলাম
সেই মানুষটির চেহারা এবং মুখ দেখে সহজেই অনুমান করা যায় জীবন যুদ্ধে বেঁচে থাকার জোয়াল তাকে কিভাবে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকাতেই, ওর হাসিমাখা, মায়া ভরা চোখটার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো; শান্ত, অথচ উদ্দীপনাময় ভালবাসায় ভরা চোখ। আমাকে একবার দেখে নিয়েই, তার চোখ দুটো আবার গিয়ে পড়ল ওই বয়েমগুলোর দিকে। শুকুদা যখন বোয়েমটা খুলে দুটো লজেন্স বের করছে, ও তখন একটা লোলুপ, হালকা হাঁসি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আমি শুকু দা কে বললাম, “তুমি ওকে পাঁচটা লজেন্স দাও”। এই বলে আমি যেই টাকাটা দিতে যাবো, লোকটি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, “না গো বাপু; এমনটি করো নিগো। এই দুডো তেই হবে গো।”
“আমি তো আপনাকে কিছু দিচ্ছি না”। “না গো বাবু, ও ঠিক লয়”, এটা বলে সে একটা হাত আমার দিকে বাড়াতে গিয়েও থেমে গেলো। “আমার এই একটাই ব্যাটা বাবু, এমনি খুব ঠাণ্ডা। দেখবা বাবু আমার ছেলে কত্ত সুন্দর নামতা বলতে পারে।”
“বাবুরে একবার ঐ তিনের ঘরের নামতাটা শুইনে দেতো বাবা”।
ছেলেটা দুটো হাতে দুটো লজেন্স পেয়ে, বাবার কথা মত মনের আনন্দে, আধো আধো বুলিতে বলতে শুরু করলো “তিন এক্কে তিন, তিন দুগনে ছয়..” । ছেলে একদিকে যত নামতার গতি বাড়াচ্ছে, বাবার বুকের ছাতিটাও যেনো ততই বেড়ে যাচ্ছে। ওটা শেষ হতে না হতেই, ভদ্রলোক বলে উঠলেন “দ্যাখলা বাবু আমার ছেলে কেমন গড়গড় করে বইল্লে দিলো।” “চারের ঘরের নামতা টা বাবু রে শুনা দিখি”। আবারও বাবার কথা মত ছেলেটা বলতে শুরু করল।
বাচ্চাটা র নামতা বলা শেষ হতে, আমি এবার, লোকটার হাত ধরে বললাম “এবার আর না করবেন না, আমি তো আর আপনাকে দিচ্ছি না, আমি তো ও’কে দিচ্ছি।” এই বলে আমি ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, “খুব ভালো ছেলে, ভালো করে পড়াশোনা করো” এবার আমি শুকু দা’র থেকে আরো কটা লজেন্স নিয়ে ছেলেটার দুটো হাত দিলাম আর বাকি ক’টা ওই লোকটির হাতে প্রায় জোর করেই দিলাম। কোথায় থাকেন জিজ্ঞাসা করতে, লোকটা যখন হাত তুলে দেখাতে যাচ্ছে, শুকুদা বলে উঠলো, “ঐ দাস বাবুদের বাড়িটা ভেঙে ফ্ল্যাট করছে না, ওখানেই কাজ করে।”
এইসব সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা চিরকাল সমাজের এক কোনায় পরে থেকেছে, অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হয়েছে। দু বেলা, দু মুঠো অন্ন জোগাড় করাই এদের একমাত্র লক্ষ্য। আমাদের মত মানুষদের থেকে চিরকাল একটা দূরত্ব বজায় রয়ে গেছে। দোকান থেকে নিয়ে আসার পর, মুড়িয়ে ফেলে দেওয়া কাগজের ঠোঙ্গার মতো, এইসব মানুষগুলোকে আমরা ফেলে রাখি একটা কোনায় কিন্তু এদের মত মানুষের মধ্যেও একটা সুন্দর বাবা বেঁচে থাকতে পারে, একটা আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ থাকতে পারে।
ছাতাটা খুলতে যাবো, তখন লোকটা বলে উঠলো, “একটু আশীব্বাদ কোরো গো বাবু, ব্যাট্যা যেনো আমার অনেক বড়ো হয়গো”। ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, “জানি না গো, আমার আশীর্বাদ ওকে কতো টা মানুষ করতে পারবে, কিন্তু ভগবানের কাছে প্রার্থনা করব এইরকম তোমার মত একটা ছাতা যেনো সবসময় ওর মাথার উপরে থাকে, তাতেই সব হয়ে যাবে।” এই বলে আমার ছাতাটা না খুলেই, মন ভরা একটা আনন্দ আর ভালোলাগা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
