Skip to content

Banglasahitya.net

বাঙালির গ্রন্থাগারে বাংলার সকল সাহিত্যপ্রেমীকে জানাই স্বাগত

"আসুন সবে মিলে আজ শুরু করি লেখা, যাতে আগামীর কাছে এক নতুন দাগ কেটে যাই আজকের বাংলা............."

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আমাদের মেইল করুন - [email protected] or, [email protected] অথবা সরাসরি আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » হাওড়ার শরৎকুঠি, একটি গবেষণামূলক আলোচনা || Soumen Chakraborty

হাওড়ার শরৎকুঠি, একটি গবেষণামূলক আলোচনা || Soumen Chakraborty

অডিও হিসাবে শুনুন

হাওড়ার শরৎকুঠি, একটি গবেষণামূলক আলোচনা

শান্ত নির্জন গ্রাম্য পরিবেশ, নিকটে বয়ে গেছে রূপনারায়ণ নদী। তার পাশেই মাথা তুলে আছে সুন্দর দক্ষিণমুখী দোতলা বাড়ি। টালির ছাউনি। ঘরের পশ্চিমে সন্ধ্যায় তাকালে সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। আর ঠিক ওইদিকে চেয়ার পেতে বসে লিখতেন আমাদের প্রিয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। স্থানটা হাওড়ার দেউলটির কাছে সামতাবেড় গ্রাম। বাংলা সাহিত্যের আকাশে উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যিনি তাঁর সীমিত কালখন্ড ও ভূমিখণ্ড’কে স্বচ্ছন্দে অতিক্রম করে এক অপার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন আবহমান কাল জুড়ে। বাঙালি পাঠক সমাজে যুগোত্তীর্ণ মর্যাদায় অভিষিক্ত তিনি। তাঁর কালজয়ী খ্যাতি দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাঠকদের মনকে ছুঁয়ে ভুবনজয়ী হয়েছে।

এসব দিক বিবেচনা করলে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাওড়ার বাড়ি নিঃসন্দেহে প্রকৃত অর্থেই জাতীয় শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের একটি। হাওড়ার দেউলটি স্টেশন সংলগ্ন সামতাবেড় গ্রামে প্রায় এক বিঘা জায়গার ওপর বাড়িটি অবস্থিত। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে শরৎচন্দ্র এসেছিলেন পার্শ্ববর্তী গোবিন্দপুর গ্রামে তাঁর দিদির বাড়িতে। দিদির নাম ছিল অনিলাদেবী। দিদি ওনার খুবই প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। উনি নিজের ছদ্মনামও রেখেছিলেন অনিলাদেবী। দিদির বাড়ির পরিবেশ ভালো লাগার কারণে উনি পরবর্তীতে মনস্থির করেন, ওখানেই পাকাপাকিভাবে বসবাস করার। সেইমতো তিনি সামতাবেড় গ্রামে বাড়ি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে ঝাড়গ্রামের স্থপতি ‘ইয়াকুবু’র তত্ত্বাবধানে প্রায় ১১,১৫১ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় শরৎকুঠি। সম্পুর্ণ বার্মিজ সৌষ্ঠবে নির্মিত এই বাড়িটি দেখতে অসাধারণ।যার উত্তর দিকে ছিল তাঁতী ও জেলেপাড়া, পশ্চিম দিকে রূপনারায়ণ ও ধান জমি, পূর্বে কাঁচা বড়ো বাঁধ এবং দক্ষিণে সামতা গ্রাম। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত প্রায় বারো বছর এই বাড়িতে কাটিয়েছিলেন। এই ঘরে বসেই শরৎচন্দ্র অভাগীর স্বর্গ, কমললতা, শেষপ্রশ্ন, পল্লীসমাজ, রামের সুমতি, পথের দাবী ও মহেশ-এর মতো গল্প-উপন্যাসগুলি লেখেন। যা কালজয়ী রচনা হিসেবে বাংলা সাহিত্যে চর্চিত হয়। শরৎচন্দ্র ও তার ভাই স্বামী বেদানন্দ ( প্রকৃত নাম প্রভাস)এখানে থাকতেন। বেদানন্দ বেলুড় মঠের সন্ন্যাসী ছিলেন। শরৎচন্দ্রের অন্য ভাইয়ের নাম ছিল প্রকাশ।

এবারে আসা যাক বাড়িটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে। বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন ভদ্রলোক নিয়োজিত এবং বাড়িটি সরকার দ্বারা অধিগৃহীত। বাড়িটিতে পা দিয়ে আমার একটি অনুভূতি হয়েছে, তা হলো- “Solitude is the audience chamber of God” মানুষের জন্য শরৎচন্দ্রের ভালোবাসার প্রতীক হলো তাঁর হোমিওপ্যাথি চর্চা। এই বাড়িতে থাকাকালীন তিনি হোমিওপ্যাথিক ওষুধের বাক্স নিয়ে রূপনারায়ণের তীরে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে দুলে বাগদীদের নিখরচায় চিকিৎসা করে বেড়াতেন। এখনও একটি ঘরে আলমারি ভর্তি হোমিওপ্যাথি ওষুধের শিশি বোতল লক্ষ্যনীয়। ওনার আর বেদানন্দের হাতে লাগানো অনেক গাছ ছিল বাড়ির চারপাশে। সামতাবেড়ের বাড়িতে অগ্নিযুগের বহু বিখ্যাত বিপ্লবী আসতেন এবং তাঁদের আন্দোলনের বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করতেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে পাওয়া ঈশ্বর মুর্তি ছাড়াও অনেক এমন জিনিস এখানে রয়েছে যা আমাদের মনে অনন্য অনুভূতি সৃষ্টি করে।

এই বাড়িতে থাকাকালীন শরৎচন্দ্র অসুস্থ হয়ে ১৯৩৭ সালের অক্টোবরে কলকাতায় ২৪ নম্বর অশ্বিনী দত্ত রোডের নিকটে একটি বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অসুস্থ হবার খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- “কল্যাণীয়েষু শরৎ—তোমার আরোগ্য লাভের প্রত্যাশায় বাংলাদেশ উৎকন্ঠিত হয়ে থাকবে। “

ওনার বাড়িতে ওনার রূপনারায়ণমুখী লেখার ঘরটি দেখলে এখনও মনে শিহরণ জাগে। ওনার চেয়ার, লাঠি, কলম, বিদেশি দেওয়াল ঘড়ি সবকিছু আজও সংরক্ষিত। সর্বোপরি বাড়িটির বার্মিজ সৌষ্ঠব নজর কাড়ে। আসলে তৎকালীন বর্মার রেঙ্গুনে ওনার প্রথম স্ত্রী শান্তিদেবী থাকতেন। কিন্তু ভয়ানক প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে শান্তিদেবী ও ওনার একমাত্র পুত্র মারা গিয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালের ২৬-এ জানুয়ারি রবিবার সকাল ১০ ঘটিকায় কথাশিল্পী চির বিদায় নেন। কলকাতার পার্ক হসপিটালে ড. বিধানচন্দ্র রায়, ড. কুমুদশঙ্কর রায় প্রমুখ মহান চিকিৎসকের চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সামতাবেড়ের বাড়ির পশ্চিম দিকে ওনার চিতাভস্মের সমাধি মন্দির করা আছে। সঙ্গে রয়েছে ওনার দ্বিতীয় স্ত্রী হিরন্ময়ী দেবী ও মধ্যম ভ্রাতা স্বামী বেদানন্দের সমাধি মন্দির। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যু পরবর্তীতে কবিগুরু লিখেছিলেন-

“যাহার অমরস্থান প্রেমের আসনে
ক্ষতি তার ক্ষতি নয় মৃত্যুর শাসনে
দেশের মাটির থেকে নিল যারে হরি
দেশের হৃদয় তারে রাখিয়াছে বরি।”

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সামতাবেড়ের বাড়ির বর্তমান সমস্যাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১) ১৯৭৮ সালের বন্যায় বাড়িটির বিশেষ ক্ষতি হয়েছিল। কিছুদিন আগে পর্যন্ত রূপনারায়ণের ভাঙনের ফলে নদী ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছিল। তবে বর্তমানে কিছুটা হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
২) স্থানীয় মানুষের মধ্যে অনেকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখার সঙ্গে ওয়াকিবহাল না হওয়ায়, তাদের মধ্যে বাড়িটির প্রতি সচেতনতাবোধের অভাব স্বাভাবিক। তবে বর্তমানে একটু হলেও সম্ভ্রম বোধ জাগছে বাড়িটির প্রতি।
৩) বাড়িটি হেরিটেজ রূপে ঘোষিত হলেও বাড়িটির সংস্কারে বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ যথার্থ হওয়া বাঞ্ছনীয়।
৪) এলাকার পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত না হলে শহরকেন্দ্রিক পর্যটকদের অসুবিধা হতে পারে।
৫) বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য মাত্র একজন বা দুজন নিযুক্ত। ওনার একার পক্ষে অত বড়ো বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ অসুবিধাজনক।

এইসব সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় প্রশাসন যথেষ্ট সচেতন। আসলে শরৎচন্দ্র তো বাঙালির ধ্যান, জ্ঞান প্রাণ ; কাজেই ওনার স্মৃতি মন্দির স্বরূপ এই বাড়িটির গুরুত্ব আমাদের কাছে অপরিসীম। ওনার কালজয়ী রচনা যুগ যুগান্তর ধরে মানুষের মননে দাগ কেটেছে, কাটছে ও কাটবে। সংবেদনশীল হৃদয়, ব্যাপক জীবনজিজ্ঞাসা, প্রখর পর্যবেক্ষণ শক্তি ও সংস্কারমুক্ত স্বাধীন চিন্তাধারা প্রভৃতির গুণে শরৎ সাহিত্য লাভ করেছে এক অনন্য সাধারণ বিশিষ্টতা। যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বাংলা সাহিত্যের গতিপ্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি তাকে সমৃদ্ধ করবে।

“সংসারে যারা শুধু দিলে
পেলে না কিছুই—
তাদের বেদনাই দিলে–
আমার মুখ খুলে। “

সূত্র:- বিএড চলাকালীন “সমাজ উন্নয়নে বহির্মুখী কর্মশালা”- রচনা সৌমেন চক্রবর্তী ও অন্যান্য ২০১৩

1 thought on “হাওড়ার শরৎকুঠি, একটি গবেষণামূলক আলোচনা || Soumen Chakraborty”

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=