Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » সোনার কৌটো || Ashapurna Devi

সোনার কৌটো || Ashapurna Devi

খবরটা জবর বটে।

কানাকানি করবার মতই।

ফুলপুরের পাড়ায় পাড়ায় রটে গেল খবরটা বেশ একখানি বিস্ময়ের বাহন হয়ে।

চাটুয্যে বাড়ির শশীতারা শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছেন!

একজনের মুখ থেকে অনেক জনের কানে। আর কান থেকেই কানাকানি।

ব্যাপারটা কী?

হঠাৎ শ্বশুর বাড়ি?

শ্বশুর বাড়ি মানেটাই বা কী?

শশীতারার যে একটা শ্বশুর বাড়ি ছিল, তাই তো ভুলে গিয়েছিল লোকে। কম বয়সীরা তো জানেই না শশীতারার কোনো দিন বিয়ে হয়েছিল। নেহাৎ বুড়োরা ছাড়া ফুলপুরের সব্বাই এই একই মূর্তিতে দেখছে শশীতারাকে! বুড়িটুড়িরা বলে শশীতারার নাকি কাঁচা সোনার মতো রং ছিল, একতাল মেঘের মত চুল ছিল। তা’ চুলগুলো কবে যেন প্রয়াগে গিয়ে ত্রিবেণী সঙ্গমে বিসর্জন দিয়ে এসেছিলেন শশীতারা। আর রংটাকে বিসর্জন দিয়েছেন, আচার আমসত্ব, বড়ি আমসি, আর ডাহা ডাহা নির্জলা উপোসের বিচিত্র সঙ্গমে।

দীর্ঘকালাবধি যে মূর্তি সবাই দেখেছে, সে হচ্ছে ঠকঠকে চ্যাঙা গড়নের চেহারা। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, রোদে জ্বলা তামাটে রং, আর তীক্ষ্নধার একখানি মুখ। ওই ধারালো ভঙ্গীটা শুধু মুখের কাটুনিতেই নয়, মুখের ভাষাতেও।

চাটুয্যে বাড়ির বড়কর্তার বড় মেয়ে এই শশীতারাকে এখন আর দিদি ঠাকরুণ বলবার লোকও নেই, সবাই বলে শশীঠাকরুণ। ওতে সম্পর্কের হিসেব কসাটা বাঁচে। বয়স্করা কেউ কেউ সামনা সামনি কথা বলতে পিসিমা বলে, কিন্তু আড়ালে ওই শশীঠাকরুণ।

শশীঠাকরুণকে কেউ নাকি মটকা তসর গরদ ছাড়া সুতি থান পরতে দেখেনি। উদয়াস্ত ওই তাঁর সাজ। তা’ছাড়া গামছা আছে। রাত্রে যে ঘণ্টা কয়েক তিনি বিছানায় দেহ পাতেন, সে নাকি নিজেকে ওই গামছার আবরণেই মুড়ে।

বিধবা হলেই যে একেবারে সর্বহারা মূর্তিতে সংসারে চরে বেড়াতে হবে, এমন ব্যবস্থা এ যুগে আর নেই, কিন্তু শশীতারার বৈধব্যের আমলে ছিল। কারণ সেই আমলটা ছিল ষাট বছর আগে।

বিয়েটাও সেই একই সনে।

ন’বছর বয়সেই বিয়ে এবং বৈধব্য দুই সেরে শশীতারা তাঁর জন্মভিটেয় সেই যে শেকড় গেড়ে বসেছিলেন, তীর্থটীর্থ ব্যতীত আর কোথাও নড়েননি।

শশীতারার সেই বিয়ে এবং বৈধব্যের কালে তাঁর ঠাকুর্দা অঘোর চাটুয্যে বেঁচে ছিলেন, যাঁর প্রতাপে প্রজাবর্গ নাকি বাপের নাম ভুলে যেত। আর যাঁর দাপটে নাকি সেই বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল যাওয়ার প্রবাদটা সর্বদা উল্লেখ করা হতো।

প্রথম পৌত্রী শশীতারাকে ন’ বছরেই কায়দা করে ফেলেছিলেন অঘোর চাটুয্যে, যাতে মেয়েটা কোনো ক্রমেই না চৌদ্দপুরুষকে নরকস্থ করে বসে।

তা’ মেয়েটা উল্টো দিকে ক্ষমতা দেখালো।

বিয়ের বছর না ঘুরতেই বরটাকে স্বর্গে পাঠিয়ে দিলো। তখনো শশীতারা ফুলপুরেই খোসমেজাজে পাড়া বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে, ঠাকুমার কুলের আচার চুরি করে এনে বান্ধবীদের বিলোচ্ছে, সাঁতরে দীঘির এপার ওপার করছে। আর গিন্নীদের কাছে বকুনি খাচ্ছে, এতো দস্যি মেয়ে! পরের ঘরে গিয়ে কী হবে তোমার?

শশীতারা গাছে চড়ে কাঁচা আম ঠেঙাচ্ছিল, সেই সময় নাকি খবরটা এসেছিল। কিম্বদন্তী আছে—শশীতারার পিসী শশীতারাকে ঠেঙিয়ে গাছ থেকে পেড়ে আনতে অক্ষম হয়েছিলেন। পিসী তাকে নামিয়ে তার কপাল এবং নিজের কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে ঘাটে গিয়ে পড়ে যখন ভাইঝির বৈধব্যকৃত্য সম্পাদন করছিলেন, তখন নাকি শশীতারা পিসিকে বেশ জোর গলায় বলেছিল, বেশ হয়েছে, খুব হয়েছে, পরের ঘরে গিয়ে তোর কী দশা হবে রে—বলে খিঁচোতে এসো এবার? আর তো যেতে হবে না পরের ঘরে! লবডঙ্কা!

তা’ শশীতারার সেই শৈশবটা তো এখন ইতিহাসের কোঠায়। এ কিম্বদন্তীও তো শোনা যায়, শশীতারার উনত্রিশ বছরের বাবা অভয় চাটুয্যে জামাইয়ের মৃত্যু সংবাদে এতো বিচলিত হয়ে গিয়েছিল যে বলে বসেছিল, ও বিয়ে বিয়েই নয়, আমি তো সম্প্রদান পর্যন্ত করিনি। শশীর আবার বিয়ে দেব।

অঘোর চাটুয্যে বলেছিলেন, আর কটা দিন অপেক্ষা করো, আমি মরলে একেবারে দুটি পাত্র দেখো। একটি মেয়ের জন্যে। আর একটি গর্ভধারিণীর জন্যে। বিধবা বিয়েটা এই ফুলপুরে রেওয়াজ করিয়ে দিয়ে কীর্তিরাখা কাজ কোরো।

এসব অবশ্য সবই শোনা কথা, এখন যারা আছে, তারা শশীঠাকরুণকে ওই একই অবস্থায় দেখেছে। ঠাকুর্দার মতই প্রতাপ, ঠাকুর্দার মতোই দাপট। জ্ঞাতি গোত্রে পল্লবে বিরাট চাটুয্যে গোষ্ঠীর তিনিই গার্জেন।

শুধু তাই বা কেন, সমগ্র ফুলপুরেই গার্জেন তিনি।

সুখে দুঃখে, বিপদে, সম্পদে, রোগে শোকে, সবাই ছুটে আসে শশীঠাকরুণের কাছে। তিনিও ছুটে যান সবাইয়ের কাছে। ফেরার পথে একটা ডুব দেবার ওয়াস্তা বৈ তো নয়।

শশীতারা ফুলপুরের হৃদযন্ত্র।

এই শশীতারা কিনা হঠাৎ শ্বশুরবাড়ি যাবার বন্দোবস্ত করছেন।

যুগীগিন্নী ননীবালা কেঁদে এসে পড়লো, আমার নাতনীটা এই এখন তখন, আর এই সময় তুমি গাঁ ছেড়ে চলে যাচ্ছো ঠাকরুণ?

শশীতারা বললেন, আমি তো বাপু ডাক্তার বদ্যি নই। তোর নাতনীর যদি পরমায়ু ফুরিয়ে থাকে, স্বয়ং ভগবান মাথার শেওরে বসে থাকলেও রাখতে পারবে না, আর যদি পরমায়ু থাকে, যমের বাবা এসেও নিয়ে যেতে পারবে না। তবে রোগে ব্যাধিতে টাকাকড়ির দরকার, এটা রাখ।

আলগোছে ননীবালার হাতে তিনখানা দশটাকার নোট ফেলে দিলেন শশীতারা। ও প্রণাম করে চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল।

আবার ঘোষালদের সত্যচরণও চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল, শশীতারা সত্যচরণের নাতির বিয়ের সময়টাতেই চলে যাবেন বলে।

আপনিই আমার বলবুদ্ধি ভরসা পিসিমা, আর এই মোক্ষম সময় আপনি—

শশীতারা ওর নাতনীর আইবুড়ো ভাতের জন্যে একখানা ডুরে শাড়ি, আর আশীর্বাদী হিসেবে একজোড়া হালকা কান ফুল ধরে দিয়ে বললেন, মানুষ আবার কিসের বলবুদ্ধি ভরসা রে? ভগবানকে ধরে বসে থাক, নির্বিঘ্নে কন্যে দায়ে উদ্ধার হয়ে যাবি।

শোভার মা ছুটতে ছুটতে এলো এক বাটি তেল নিয়ে, মা গো, এই তেল পড়াটা করে দে’ যাও, কে জানে আপনির অবর্তমানে মেজ খোকাটার কখন পেট গুলোয়।

শশীতারা হেসে বললেন, তোরা এমন করছিস, আমি যেন চিরকালের জন্যে মরছি। তোর তেল পড়াটা হরিদাসীকে দিয়ে করিয়ে নে না। ওর অনেক ক্ষ্যামতা আছে। নানান তন্ত্র মন্ত্র শিখেছে। আমি তো শুধু ইষ্ট নাম স্মরণ করে ফুঁপাঁড়ি।

শোভার মা আকুল ভাবে বলে, আপনার থেকে কেউ নয় মা। হরিদাসী পিসিকে আমার মন লাগে না।

অগত্যাই তেলটা পড়ে দিতে হয় শশীতারাকে। বৃন্দাবনের ভাইপোটার জন্যেও একটা টোটকা দিয়ে গেলেন শশীতারা তার মাথা ঘুরুণীর ব্যামোর জন্যে। কি দিয়ে কি করতে হয় সেটা উচ্চারণ করলে না কি ফল পাওয়া যায় না, তাই নিজে হাতেই ওটা করে দেন শশীতারা।

চাটুয্যে গুষ্ঠির দায় অদায়, করণ কারণ, ঘর সংসারের ব্যবস্থা সুব্যবস্থা, সেও চলছে আজ পাঁচ সাত দিন ধরে।

গিন্নী গিন্নী ভাইপো বৌদের কচুকাটা করে শিক্ষা দিতে থাকেন শশীতারা, বামুন গেল ঘর তো লাঙল তুলে ধর, এটি করো না বাছারা! আমি যেমনটি করি, ঠিক তেমনটি করবে। মা সিদ্ধেশ্বরীর শনি মঙ্গলবারে ভোগটি যেন ঠিকমত পাঠানো হয়। এসে যেন শুনি না কিছু ত্রুটি হয়েছিল। আমার ছেলেদের পাত থেকে মাছের মুড়ো উড়ে গিয়ে যেন তোমাদের ছেলেদের পাতে গিয়ে না পড়ে, এই বলে দিচ্ছি। দই পাততে ভুলে বসো না, ছেলেপেলেগুলোর চিরেতার জল আর আদা ছোলা যেন ভুল না হয়। জায়ে জায়ে অজ্ঞান হয়ে গাল গল্প না করে সংসারের চারদিক তাকিয়ে দেখবে। আচার আমসত্বগুলো রোদে দেবে, খবরদার অনাচার কাপড়ে ভাঁড়ারে ঢুকবে না। তুলসীতলায় পিদিপ দিতে ভর সন্ধ্যেটি না উৎরে যায়। বিকেলবেলা থাকতেই শাঁখে ফুঁ দিয়ে যেন সন্ধ্যে জ্বালা সেরে চায়ের গেলাসটি নিয়ে বসো না।…

চলতে ফিরতে উঠতে বসতে উপদেশ—তোলা বিছানা মাদুরগুলো যেন ছাতা পড়িয়ে রেখো না, রোদ বেরোলেই টেনে বার করে দিও।.. বছরের মুগকড়াই কেনা আছে জালায় জালায়, এসে যেন দেখি না সব ঢন ঢনিয়ে রেখেছো।…চিঁড়েগুলো কুটিয়ে রেখে যেতে পারলাম না—একটু শুকনো খরা হলেই জগুরমাকে ডেকে কুটিয়ে নিও। তোমাদের নিজের নিজের শরীর স্বাস্থ্যগুলোও দেখো, রোগে পড়ে আমার ছেলেদের ভুগিও না। পরীর যে সম্বন্ধটা এসেছিল, তাদের সঙ্গে পত্রালাপটা যেন ঠিক মতো চলে। অঘ্রাণের আগে তো বিয়ে হচ্ছে না। মেয়েটাকে রোদে রোদে ঘুরতে দিও না, মেঘ ভাঙা রোদে রংটা কালো ঝুল না হয়ে যায়।

ভাইপোর ছেলের বৌ দুটোকেও অনেক উপদেশ পরামর্শ দেন।

কচির মা, তোমরা সেই রাত দুপুরে আর বেলা তিনটেয় ভাত খেওনা বাছা। আসলে কুড়ের রাজ তো সব, ছেলের কন্না করতেই বেলা পুইয়ে যায়। বুড়ি বিদেয় হলো, বালাই গেলো, বলে যেন কেষ্টধনের তেল মাখাটা বন্ধ করে দিও না।

এমনি অজস্র উপদেশ।

অজস্র বাক্যবাণ।

ছোট নাতবৌ একবার হেসে বলেছিল, এতো কথা বলছেন কেন ঠাকুমা? কতোদিনের জন্যে যাচ্ছেন শুনি? এ যে সেই সেকালের তীর্থ যাত্রার মতো। শুনেছি সেকালে নাকি তীর্থে যাবার সময় উইল করে তবে যেতো।

শশীতারাও ঠাট্টা তামাশার কম যান না, ভাইপো বৌদের কাছে তিনি দেবী চামুণ্ডা সদৃশ হলেও ভাইপোদের ছেলেদের বৌয়েদের কাছে হাস্যবদনী। বকেন ঝকেন, উপদেশ দেন ঠিকই, তবে হেসে মেতে।

এখনও হাসলেন, বললেন, তা তীর্থেই তো যাচ্ছিরে! মহাতীর্থ পতিতীর্থ!

নাতবৌ বললো, আহা, তবু যদি পতিকে একবারও চোখে দেখতেন। শুভ দৃষ্টিই তো হয়নি।

কথাটা সত্যি।

এ গল্প শশীতারা নিজেই নাত বৌদের কাছে করেছেন।

শুভদৃষ্টির সময় না একদম একটা ছেলেমানুষী জেদের বশে চোখটা খোলেননি, বুজে বসেছিলেন। সবাই মিলে যতো বলছে, চোখ তাকা, চোখ তাকা—শশীতারার ততোই একটা উটকো জেদ চেপে গেছে, তাকাব না। দেখি তোমরা আমায় কেমন জোর করে চোখ খোলাতে পারো।

ঠাকুর্দা অঘোর চাটুয্যের ধমকেও কাজ হলো না।

আর কী উপায়?

পাঁড়ি ঘোরানো অবস্থায় তো আর মেয়েকে চড় বসানো যায় না?

শশীতারা সেই কথার উল্লেখে হেসে উঠলেন, চোখে না দেখি তবু ভগবানের গড়া শরীর তো? না দেখে খেলেও কি আর সাপের বিষে মৃত্যু ঘটে না?

আহারে, ঠাকুমার কি তুলনার বাহার! সাপের বিষ!

তা তাই!

শশীতারা বলেন, সেই ছোবলের ঘায়েই আজন্ম ভুগছি। মনে হয় যেন বিধবা হয়েই জন্মেছিলাম।

আচ্ছা ঠাকুমা, আপনার বাবা নাকি আপনার আবার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন? আপনার ঠাকুর্দা মত দেননি।

শশীতারা ঠোঁট উল্টে বলেন, আর ঠাকুর্দা মত দিলেই আমি করতাম যে?

আহা আপনি তো তখন মোটে ন বছরের।

তা সে য বছরেরই, হিঁদুর মেয়ে তো? নাকি বেম্ম খিস্টান?

ওসব বুদ্ধি তখন হয়েছিল আপনার?

শোনো কথা! মানুষ বুঝি খানিকটা বুদ্ধিসুদ্ধি নিয়ে জন্মায় না?

তার মানে আপনি এই বুদ্ধি নিয়ে জন্মেছিলেন, আপনি হিঁদুর মেয়ে?

কি করেছিলাম না করেছিলাম জানি না বাবা! তবে বাবা তো দূর স্থান—বাবার বাবা চেষ্টা করলেও ওকাজ করতে পারতো না শশী বামনীকে দিয়ে। তারপর শশীতারা হেসে বলেছিলেন, পচা কথা ছাড় দিকি। ঠাকুমার কবে ন বছর বয়েস ছিল, তাই নিয়ে চিন্তা। সে কি আর এ জন্ম? আমার তো মনে হয় আর জন্ম।…গোলমাল করে আসল কথাটা চাপা দেওয়া হচ্ছে কেমন? ছেলের যত্ন করবি, শ্বশুরদেরও দেখবি। আমি দৃষ্টি না দিলেই ওরা পেট না ভরতেই উঠে পড়ে।

ঠাকুমা, আপনার মত আমরা কি ওঁদের পেটে এক ছটাকের জায়গায় এক সের মাল ঢোকাতে পারবো?

শশীতারা বলেন, শিখবি! এ নইলে আর মেয়েমানুষ কি! পুরুষ ছেলেরা তো কেবল খাওয়ার ফাঁকি দেওয়ার তালে থাকে।

শশীতারার নাতবৌয়েরা অবশ্য শশীতারার এই মতবাদ বিশ্বাস করে না, সংসারের কেউই করে কি না সন্দেহ, কারণ তার বিপরীতটাই বরং দেখে আসছে তারা। তবু এই বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করে না। শুধু মনে মনে হাসে।

শশীতারার যাওয়ার খবরে গ্রামসুদ্ধু লোকের একই প্রশ্ন, কতো দিনের জন্যে যাবেন? কবে আসবেন?

কারণ শশীতারা এই ফুলপুর গ্রামের এক দীর্ঘদিনের নায়িকা। ভগবানের শশীতারা বিহনে রাতের আকাশও যেমন নিষ্প্রভ, এই শশীতারা বিহনেও ফুলপুর গ্রাম তেমনি নিষ্প্রভ হয়ে যাবার সম্ভাবনা।

শশীতারা না থাকলে শেষরাত্রে সদর দরজা খুলে বেরিয়ে রাস্তায় হাততালির আওয়াজ করতে করতে পুকুরের জলে পড়বে কে?

গ্রামে টিউবকল হয়ে পর্যন্ত ভদ্রলোকদের অনেকেরই পুকুর ভীতি হয়ে গেছে। চাটুয্যে বাড়ির কেউই আর পুকুরে চান করে না, এক এই শশীতারা ব্যতীত। তবে শুধু ওই ভোরের বেলাটি। ওই আসল স্নানটি অবগাহন না হলে তৃপ্তি হয় না তাঁর। তাছাড়া যতবার চান করেন (সেটা অনেক বারই করেন) উঠোনের টিউব ওয়েলেই সারেন।

রাখাল ছোঁড়াটাকে ডেকে বলেন, এই, একটু খ্যাচার খ্যাচার করে দে দিকি, কি জানি পথে কি মাড়িয়ে মলাম!

পথে অহরহই বেরোনো চাই শশীতারার, আর যে কোনো সন্দেহে মাথাটা ভিজিয়ে নেওয়া চাই। কেচে কেচে মটকা তসর সব পয়লট্ট। আগে প্রত্যেকবারই পুকুরে পড়তেন, টিপকল হয়ে সেটা বন্ধ হয়েছে।

তা সে যাই হোক—শশীতারার মতো অতো ভোরে গিয়ে কেউ পড়ে না। হাততালি দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তখনও যদি কীট পতঙ্গ সাপ খোপরা পথে থেকে থাকে, শব্দ শুনে সরে যাবে।

অতএব বলা যায় শশীতারা ঘুমন্ত গ্রামটাকে সোনার কাঠি ছোঁয়ান।

শশীতারা না থাকলে স্নান সেরে আবছা ভোরে কে পাড়া চষে ফুল তুলে বেড়াবে? আর পাড়ার ফুলচোর ছোঁড়াগুলোকে শাসন করবে? এই কাকভোরে উঠে ফুল চুরি করতে বেরিয়েছিস হাভাতেরা? বলি মা বাপের কি একটু শাসন নেই? গাছে চড়ছিস? পড়ে হাত পা ভাঙবি? নেমে আয় বলছি।

ছেলেগুলো বলে, বা রে ঠাকুমা, তুমিও তো ফুল নিচ্ছো?

চুরিটা আর উচ্চারণ করতে সাহস করে না। আড়ালে বলে, নিজের বেলায় আঁটিসুটি পরের বেলায় দাঁতকপাটি।

সামনে বলার সাহস নেই।

শশীতারা জোরালো গলায় বলেন, আমি তোদের মতন ফুল নষ্ট করতে নিচ্ছি কেমন?

আমরা কি নষ্ট করছি?

তবে কী করছিস?

এই যদি কেউ পূজো টুজো করে। তুমি তো চাঁপা গাছে উঠতে পারো না, নেবে ঠাকুমা চাঁপা ফুল?

শশীতারা হাসি মেশা গলায় বলেন, তোরা যে দিতে চাইলি এতেই আমি সাতপুরুষে বর্তে গেলাম বাবা ধনেরা। তোদের ওই অ্যাড়াবাসি পেণ্টুল পরে তোলা ফুল নিয়ে আর সগগে যেতে চাই না বাবা! তারপর তেজালো গলায় বলেন, ভোরের বেলা এসে গাছে ছাইভস্ম হাত দিবি না বলে দিচ্ছি। ফের যদি দেখি তো দেখাবো মজা।

ছেলেগুলো পালায়।

অতঃপর শশীতারা কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম আওড়াতে বাকি ফুল তুলসী সংগ্রহ করে বাড়ি ফেরেন। শশীতারা না থাকলে এই সাড়াটি জাগাবে কে?

শশীতারা বলেন, ঠাকুরের নাম গান স্তব স্তোত্র উচ্চৈচস্বরে করতে হয়। ওতে ত্রিজগতের উপকার করা হয়। বৃক্ষলতা কীট পতঙ্গ জলস্থল আকাশ বাতাস ওদের তো নাম করার ক্ষমতা নেই, তবু শ্রবণে উদ্ধার হয়।

এইসব বলেন বটে, তবে একথা মনে করার হেতু নেই শশীতারা কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর।

এসব কথা শশীতারা লোক শিক্ষার্থে ব্যবহার করেন। জনগণের তো শিক্ষার দরকার?

তা শশীতারা ছাড়া কে এই সব দরকার বোঝে? কে বুঝবে?

তাছাড়া শশীতারা না থাকলে রোজ সকালে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সবাইয়ের তত্ত্বতল্লাশ নেবে কে?

সকালবেলা পূজো আহ্নিক সেরে চরণামৃতটুকু মাত্র গলায় ঢেলে শশীতারা ওই তত্ত্বতল্লাশে বেরোন। পথেই যাদের সঙ্গে দেখা হয়, প্রায় সকলেই চাষাভুষো সক্কাল বেলাই না বেরোলে নয় তাদের।

নচেৎ গ্রামের বা মফস্বলের লোক সাধারণতঃ একটু অলস আয়েসী হয়। শহরের মতো তারা ভোরে থেকেই ছুটোছুটি করে না। তারা ঘুম থেকে ওঠে বেলায়, দাঁতন করে একঘণ্টা। সকালে চায়ের অভ্যাসটি থাকলেও তাদের সেটা শহুরেদের মতো শুধু দুখানা বিস্কিট কি একটা টোস্ট দিয়ে সারা হয় না, তার সঙ্গে মুড়ি ফুলুরি, ছোলা মটর সেদ্ধ, এসব থাকেই প্রায়। কাজেই প্রাতরাশেও দেরী।

অতএব দোকানী দোকানের ঝাঁপ খোলে বেলা আটটা নটায়, গোয়ালা দশটার আগে দুধ দেয় না, বাসন মাজা ঝি আসে বেলা চড়চড়িয়ে।

প্রাইমারী স্কুলের ছেলেগুলোকে যেতে হয় বটে সক্কাল বেলা, প্রায়ই তারা ঘুম থেকে উঠে বাসিমুখ ধোয়া কি না ধোয়া করে বাসি রুটি পরোটা আর গুড় খেয়ে ছোটে। আর দুপুরের ক্লাসের ছেলেমেয়েগুলো প্রায়শঃ ফেনভাত খেয়ে রওনা দেয়। একান্নবর্তী পরিবার এখনো এরকম সব জায়গায় কিছু পাওয়া যায়, কাজেই বাড়ির দু’তিনটি বৌয়ের মধ্যে একজন বৌ হয়তো চান না করেই রান্না ঘরের বাইরে দাওয়ায় গর্ত কাটা উনুনে দুটো কাঠকুটো জ্বেলে ওই ভাতে ভাতটা চড়িয়ে দেয়। ইদানীং অনেক বাড়িতে ওই কাঠকুটোর জায়গাটা জনতা ষ্টোভ দখল করেছে, কিন্তু সেটা হিসেবী বাড়িতে নয়, বে—হিসেবী বাড়িতে। গাঁয়ে ঘরে কাঠকুটো অমনি অমনি মেলে, কেরোসিন অমনি মেলে না।

তবে যাদের বাড়িতে ডেলি প্যাসেঞ্জারীর ব্যাপার আছে তাদের বাড়ির পদ্ধতি আলাদা। যেমন ওই চাটুয্যে বাড়িতেই। শশীতারার উকিল ভাইপো অবশ্য সদরে বাসা ভাড়া করে আছে, কিন্তু বৌকে নিয়ে, নয়তো পুরনো চাকর দামোদরকে নিয়ে। ছুটির আগের দিন চলে আসে। আর কোটে তো ছুটিছাটা লেগেই আছে।

আর দুই ভাইপো এবং ভাইপোর ছেলেরা ডেলিপ্যাসেঞ্জারী করে। বড় ভাইপো কিছুদিন হলো অবসর নিয়েছে। নচেৎ সেও যেতো।

অতএব চাটুয্যে বাড়িতে ভোর থেকেই কর্মচক্রের ঘর্ঘর ধ্বনি শোনা যায়।

তবে ওই ডেলি প্যাসেঞ্জারীর প্রয়োজন না থাকলেও শশীতারা কি কাউকে স্বস্তি দিতেন? ছোট ভাইপোবৌ বলে, পাগল! কাজ না থাকলেও উনি অন্ধকার থাকতে লাগ ঝমাঝম লাগিয়ে দিতেন।

তা এতো কাজই আছে।

এই যে বেরোন শশীতারা, সে কি বাড়ির মোহড়া না মিটিয়ে? নিজে হাতে পায়ে কিছু এ সময় না করলেও মুখের জোরেই চাকাকে ঘুরিয়ে চালু করে দিয়ে তবে যান। ওরা কেউ আটটা, কেউ সাড়ে আটটার গাড়িতে বেরোয়, শশীতারা তার মধ্যেই টহল সেরে বাড়ি ফেরেন। এ সময় তো কারুর বাড়ির মধ্যে ঢোকেন না, বাইরে থেকেই ডাক দেন, কিরে সাধন, এখনও নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছিস না কি? বলি দোকানের ঝাঁপ তুলবি কি তিনপো’র বেলায়? ওতে লক্ষ্মী ছেড়ে যান সাধন! ভোরের বেলা কাচা কাপড়ে গিয়ে দোকানে ধুনো গঙ্গাজল দিবি, ঠাকুরের নাম স্মরণ করে ঝাঁপ খুলে বসবি। তবে না মা লক্ষ্মী ফিরে তাকাবেন। তা নয়—বেলা দুপুরে ঘুম থেকে উঠছে।

বকতে বকতে ততক্ষণে আর একটা বাড়িতে এসে পৌঁছে গেছেন। অনাথ, উঠেছো নাকি? ও অনাথ? উঠেছো? তবু ভালো, আমি ভাবছি তোমারও হয়তো ওই সাধন নগেন ভজুর মতন এখনও ঘুম ভাঙ্গেনি। মাস্টারী করে খাও, তোমার তো বাপু আয়েস করা চলবে না। চলা উচিত নয়। কথায় আছে আপনি আচরি ধর্ম শেখাও অপরে! নিজেই যদি দিষ্টান্ত না হবে তো ছাত্তররা শিখবে কোথা থেকে?

অনাথ মাষ্টার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে, পিসিমা, চান আহ্নিক হোয়ে গেছে এরই মধ্যে?

প্রশ্নটা বাহুল্য।

এই সময় ওটা হবে না শশীতারার এমন হয় না। তবু শশীতারাকে এ হেন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ—এই সব লোকেরা কথায় বৈচিত্র আনতে জানে না। একই কথা রোজ কয়।

শশীতারাও হয়তো একই কথা বলেন, কিন্তু একই ভাষায় নয়। শশীতারা আজ যদি বলেন, তোমার এক কথা অনাথ মাষ্টার! বেলা কি বসে আছে?

তাহলে কাল বলবেন, হ্যাঁ বাবা, লোক জাগরণের আগেই ও পাট চুকিয়ে ফেলা ভাল। সংসার জাগলেই বিঘ্ন।

অথচ নিজেই তিনি নির্বিঘ্নে বসে ভগবানের নাম করার বদলে সংসারকে জাগিয়ে বেড়ান। তা সে কথা বলার সাহস তো দূরস্থান, বলার কথা মনেই আসে না কারুর!

অনাথ মাষ্টার সম্ভ্রমে বলে, পিসিমার পুণ্যের শরীর।

অনাথ এদেশের ছেলে নয়, তবে আছে অনেক বছর, মাস্টারী করে মাথার চুল পাকিয়ে ফেলল। তাহলেও পিসিমাই বলে। নচেৎ অনাথ মাষ্টারের বয়সী অনেকেই ঠাকুমাও বলে, বাপ কাকা ‘পিসি’ বলে ডাকে।

শশীঠাকুরুণ নাড়ু বোসের উঠোনের ধারে দাঁড়ান, বৌ উঠেছিস নাকি?

বোসের বৌ ব্যস্তসমস্ত হয়ে বেরিয়ে আসে!

আলগোছে একটা প্রণাম করে বলে, ঠাকরুণ!

আহা থাক থাক, রোজ পেন্নাম কিসের লা?

নাড়ু বোসের বৌ বড় ভক্তিমতী, সে বলে, আপনাকে চারবেলা পেন্নাম করতে পেলেও মানুষ ধন্যি ঠাকরুণ!

দূর বাবা, যতো আলাত পালাত কথা! নাড়ু উঠেছে?

বৌ সভয়ে একবার শোবার ঘরের দিকে দৃষ্টিপাত করে মাথা নাড়ে।

জানি। ওই আয়েসেই ওর মাথাটা খেয়েছে। নচেৎ একবার চাকরী গেলে আর চাকরী হয় না মানুষের? সেই কোন জন্মে চাকরী খুইয়ে সংসারের হাড়ির হাল করে বসে আছে। ছেলেটা ইস্কুলে যায় নিয়ম করে?

নাড়ুর বৌ বলে, হ্যাঁ।

অনাথ মাষ্টারকে বলে শশীঠাকরুণ নাড়ুর ছেলেটাকে ফ্রী করে দিয়েছেন, আর ভাইপোদের বলে নিজের বাড়ির দু তিনটে ছোট ছোট ছেলেমেয়ের জন্যে নাড়ুকে প্রাইভেট টিউটার রাখিয়ে দিয়েছেন।

অবশ্য ভাইপোদের ওই আলসে কুড়ে নাড়ুটার ওপর তেমন ছেদ্দা ভক্তি ছিল না, কিন্তু পিসির কথার ওপর তো কথা চলে না?

শশী ঠাকরুণ বলেছিলেন, তোমরা যদি তোমাদের আপিস কাচারীতে ছোঁড়ার একটা কাজ কম্ম করে দিতে পারতে, তাহলে এ প্রস্তাব আমি করতাম না। পড়াবে যে কতো তা জানতে বাকি নেই আমার, খানিক আটকে রাখবে এই মাত্তর। তবে ও বুদ্ধিহীন বলে ওর বৌটা ছেলেটা ভেসে যাবে, এটা তো ন্যায্য নীতি নয় বাবা? মানুষের সমাজে যখন বাস করছো, তখন মানুষের পরিচয়টা তো রাখতে হবে। তোমরা যদি মাসে মাসে ওকে সাহায্য না করো, তাহলে ওকে ভিকিরিতে পরিণত করা হবে। ওকে একটা কাজ দিয়ে উভয় পক্ষের মান রাখো।

তা নাড়ু বোস ওর ওই শিক্ষকতা রূপ চাকরীটির মাইনে যাই হোক, জিনিসটাকে খুব দামী ভাবে। সসম্ভ্রমে এবং নিষ্ঠার সঙ্গেই কাজটা করে।

নাড়ুর বৌও কিছু কিছু রোজগার করে।

যেমন কেউ এক গামলা ডাল ভিজিয়ে খবর দিয়ে গেল, ও চরণের মা, চারটি বড়ি দিয়ে দেবে?

নাড়ুর বৌ ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। তারপরে সেই ডালের কাঁড়ি বেটে বড়ি নিয়ে আসে। তারা ‘তোমার চরণকে মিষ্টি কিনে দিও’ বলে টাকাটা আধুলিটা দেয়। তা এমন অফার প্রায়ই পায় নাড়ুর বৌ। এছাড়া আবার আমসত্বও করে দেয় মাঝে মাঝে।

শশীঠাকরুণ বলেন, ছোট লোকের মেয়েরাই প্রকৃত সুখী। তাদের কোনো কাজে মান অপমান নেই। লোকের বাসন মাজুক, ক্ষার কাচুক, গোয়ালে গোবর দিক, নিন্দে নেই। ভদ্দর লোকের মেয়েদেরই হাত পা বাঁধা, স্বামীর পয়সা থাকলো তো সুখ করো, না থাকলো তো হাড়ে দুব্বো গজাও। এই তোর হয়েছে সেই জ্বালা।

তা’ কার হাড়ে যে দুব্বো গজাচ্ছে, সেটা শশীঠাকরুণ কেমন এক দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পান। কারুর নজরে পড়ে না—ওঁর নজরে পড়ে যায়।

নাড়ুর বৌকে নির্দেশ দিয়ে যান শশীঠাকরুণ, দুপুরবেলা একটা বাটি হাতে যাস দিকিন, চরণের জন্য একটু দুধ আমসত্ত্ব মাখা ভাত দেব। ছেলেটা বড় ভালবাসে।

এটাও অবশ্য সাহায্যেরই আর এক রকম ফের। কোনোদিন চরণের নাম করে দুধ আমসত্ব, কোনোদিন চরণের মার নাম করে ওদের আমিষ ঘর থেকে একটু মাছের ল্যাজা, আর সেই ছুতোয় এক কাঁসি ভাত, কোনো দিন বা চরণের বাপের নাম করে মোচার ঘণ্ট, শাকের ঘণ্ট, যাতে ওদের কিছু খানিকটা সাশ্রয় হয়।

গ্রামে ওরকম অনুগত পরিবার শশীঠাকরুণের বেশ কিছু আছে।

ওদের ওখান থেকে শশীঠাকরুণ বিপিন কোবরেজের বাড়ির দরজায় আসেন। বিপিন কোবরেজ হয়তো তখন বাইরের দাওয়ায় বসে দাঁতন করছে।

শশীঠাকরুণ বলেন, আয়ুর্বেদও একটা বেদ বুঝলি রে বিপিন! শাস্ত্রজ্ঞ হয়ে সদরে দাঁতন করছিস? মা লক্ষ্মী ঢুকবেন কোন দরজা দিয়ে?

বিপিন নিমের কাঠি দাঁতে চেপেই বলে, মা লক্ষ্মী আর এবাড়ির চৌকাঠ মাড়াতে আসছেন না পিসি, ভয় নেই।

আসবেন আর কোথা থেকে, যতো সব লক্ষ্মীছাড়ার আচরণ। তা মা কেমন আছে?

ওই একরকম! কেমন আর থাকা থাকি!

বলি ও আবার কেমন কথা বিপিন?

শশীঠাকরুণ রেগে ওঠেন, গর্ভধারিণী মাকে হেলাফেলা করলে কোনো মাই দোর মাড়াবেন না বিপিন! বদ্যির বেটা হয়ে মায়ের ওই সামান্য আমাশাটা ভালো করতে পারছিস না?

রোগটা সামান্য নয় পিসি!

তোকে বলেছে। একটি টোটকায় এক্ষুনি তোর মাকে বিছানা থেকে ওঠাতে পারা যায় বিপিন! তবে তুই কোবরেজ ব্যাটা থাকতে তোর মা টোটকায় সারবে এটা দিষ্টান্ত খারাপ, তাই দিই না।

বিপিন বলে, তা দেবেন তো দিন না পিসি! তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।

ও, আপত্তি নেই! খুব যে বড়ো বড়ো কথা! বলি তোর আপত্তির ধার কে ধারছে রে? আপত্তি আমারই। তাতে তোর যেটুকু বাপসার আছে, ঘুচবে। ভাল দেখে ওষুধ দে।

বিপিন কোবরেজ তথাপি অনমনীয় গলায় বলে, এ বয়সে আর ভাল ওষুধ!

শশীঠাকরুণ জ্বলে যান, বলেন বয়েস তোরও একদিন হবে বিপিন! বয়েস দেখিয়ে অবহেলা করিসনে। তোর মা আমার থেকে বয়সে কম করে সাত আট মাসের ছোটো।

তা’ আপনার মতন তো আর স্বাস্থ্যটি বজায় রাখতে পারেননি?

শশীঠাকরুণ কিন্তু নিজের এই পারগতার উল্লেখে হৃষ্ট হন না। বরং রুষ্ট হয়ে বলেন, আমার কথা বাদ দে বিপিন! বড়ো মানুষের মেয়ে হয়ে জন্মেছি, চিরটাকাল ঘী দুধে আছি। তোর মার তাই? না না, মাকে অবহেলা করবি না, নরকেও ঠাঁই হবে না।

এইভাবেই প্রাতঃভ্রমণটা চালিয়ে যান শশীঠাকরুণ।

পুরুত ভট্টাচার্য থেকে দিনু গোয়ালা পর্যন্ত সব বাড়ির তত্ত্ব নেওয়া চাই।

তবে ওই চাষীভূষোদের প্রতিই যেন বেশী কৃপাময়ী শশীঠাকরুণ। পথে চলতে চলতে বলেন, মাখন তোলা ঘীটা দিয়ে এলি দিনু, দাম নিতে যাবার ফুরসৎ নেই? কী এমন নবাব সিরাজউদ্দৌলা হয়েছিল রে? যাবি, আজই যাবি।

আবার বলেন, হারাণ, এবার বিষ্টির গতিক কেমন মনে হচ্ছে? ধান ভাল উঠবে? …তোর চাক আজ ক’দিন বন্ধ কেন রে, পঞ্চু? কুমোরের চাক, কামারের হাপর, তাঁতির তাঁত, এসব বন্ধ দিতে নেই বুঝলি? আমার ঠাকুরর্দা বলতেন, ওতে ওদের উপোস লাগে! আর উপোস লাগলেই নিশ্বাস পড়ে। একবার করে ছুঁতেও হয়। আর কাজই লক্ষ্মী—বুঝলি পঞ্চু। তুই যতো খাটবি, মা লক্ষ্মী ততো সদয় হবেন। কাল বিস্যুদবার আছে। আমার দুখানা লক্ষ্মীর সরা দিয়ে আসিস দিকিন। এও সাহায্য। তবু যদি পঞ্চু ওতে একটু চাঙ্গা হয়। কাজকর্ম নেই বলেই না—

এতো কাণ্ড করেও কিন্তু শশীঠাকরুণ ভাইপো আর নাতিদের টাইমের ভাতের সময় এসে হাজির হন।

সকলের আপ্রাণ প্রার্থনাতেও রদ হয় না এটি।

প্রার্থনা এই জন্যে, পুরুষ ছেলেদের ফাঁকি দেওয়ার তাল জেনে ফেলা শশীতারা তাদের এক ছটাক মাপের পাকস্থলীর মধ্যে একসের মাল চালান দেবার জন্যে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেন তা রীতিমত কষ্টদায়ক।

কারণ প্রথমেই এসে বলে বসেন, রাত্তিরে যে আনাজ তরকারিগুলো কুটে মলাম বড় বৌমা, সে কি ভূত ভোজন করাতে? কই—এঁচড়ের ডালনা কই? মোচার ঘণ্ট কই? মাছই বা মোটে একখানা কেন? সকাল থেকে ওই সামান্য রান্নাও হয়ে ওঠেনি? তা না যদি হয়ে থাকে, দুখানা পুরের ভাজা করে দিতে পারতে। আসল মানুষদের খাওয়াতেই অবহেলা।

আসল মানুষরা এতে মরমে মরে গিয়ে হাঁ হা করে বলে, না—না, ওসব রান্না টান্না বোধহয় হয়ে গেছে। আমরাই বারণ করেছি।

কেন, বারণ করেছো কেন? বাহাদুরী দেখানো, না বৌদের কুলোবে না এই ভয়ে? সংসারে অভাব?

এ অপবাদে ছেলেরা ঘাড় হেঁট করে, বিবাহিত নাতিরা বলে, আচ্ছা ঠাকুমা, তুমি উকিল হলে না কেন? অপর পক্ষকে কোনঠাসা করতে তোমার তো দেখি জুড়ি নেই। এই সক্কাল বেলা এতো খাওয়া যায়?

বলি এতো দিনেও অভ্যেস হলো না? চিরকাল যখন এই কর্মই করতে হবে তো খাবি কবে তবে?

কেউ খায় না বাবা এতো।

খায় না, তেমনি তাদের চল্লিশের আগেই চালসে ধরে, পঞ্চাশে শিরদাঁড়ায় ঘুণ ধরে। খাওয়ার জোরেই বল শক্তি। খাবি না তো সারাটা দিন যুঝবি কিসের জোরে? বড় বৌমা, রাতের তৈরী ক্ষীর নেই? তাই দাওতো একটু। মাছ খানা শুধু কাঁটা বাছা করে ফেলে দিল। ওরা খেতে চায়না বলে তোমরাও ওদের গোড়ে গোড় দেবে? মাছ না খেলে চোখের জ্যোতি থাকে?

মেজ নাতিটা দুষ্টু হেসে বলে, তোমায় দেখে তো সেকথা বিশ্বাস করা যায় না ঠাকুমা! তোমার যা চোখের জ্যোতি, এখনো একশো বছর আমাদের পাহারা দিয়ে বেড়াতে পারবে।

শশীঠাকরুণ রাগ করেন না, বলেন, তা সেটা মন্দ কি? চোখ কান খুইয়ে হাত পা পড়ে দলা পাকিয়ে বসে থাকাই বুঝি ভাল?

কথা কথা!

অজস্র কথা।

শশী ঠাকরুণের কথার ভাঁড়ারে যেন অনবরত খই ভাজার খোলা চড়ানই আছে। সবাই ভাবে এতো জীবনী শক্তি কোথা থেকে সংগ্রহ করলেন শশীঠাকরুণ?

শশীঠাকরুণের কথায় কেউ রেগে ওঠে না, এই এক আশ্চর্য।

বৌদের কি কম হ্যানস্থা করে কথা বলেন? বুড়ো বুড়ো ছেলেদের কম শাসন করেন? কেউ চোপা করার কথা ভাবতেই পারে না।

শশীঠাকরুণ শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন। এ খবর তাই অনেকের কাছেই দুর্ভাবনার। ফুলপুরের পেরাণ পুতুলটি নে যাচ্ছো পিসি ঠাকরুণ! ফিরতে দেরী কোরোনি। যুগীবৌ বলে।

শশীতারা বলেন, কেন রে আমায় কি মরতে হবে না? ফুলপুরের পেরাণ বললে চলবে কেন?

না চললে কি করবো বলেন? যা হক কথা তাই বলছি। তুমি সেবার ছিক্ষেত্তর গেলে মাত্তর সাতটি দিনের জন্যে, তাতেই গেরাম সুদ্ধু লোক হেঁপিয়ে মরছিল। ফিরে এলে বাঁচা গেল।

শশীঠাকরুণ হাসেন। অতো ভক্তি তুচ্ছ একটা মানুষকে না করে ভগবানকে কর যুগী বৌ!

ওসব জানিনে বাবা! তুমিই আমাদের ভগবান। কবে আসবে বলে যাও।

এই রে বাবা, যাই আগে।

আরো অনেকেই কথাটা যাচাই করে নিতে চাইছে।

কবে আসবেন? কবে আসবেন? আপনি না থাকলে ফুলপুর অন্ধকার।

হয়তো যতটা ভাবে, বলে তার থেকে বেশী, সেটাই সৌজন্য। আর ভাবে না, তাও নর। সবাই বলে শশীঠাকরুণ আছেন না পর্বতের আড়ালে আছি। বলে, দেশসুদ্ধু লোকের উনি গার্জেন। উনি গত হলেই দেখবে সব বেচাল হয়ে উঠবে। ঝি বৌ ওনার ভয়ে ঢীট।

শশীঠাকরুণ বলেন, নাঃ আমাকে দেখছি মরে আবার পেত্নী হয়েই এই ফুলপুরেই এসে বাঁশ বনে টনে আশ্রয় নিতে হবে।

এই শশীঠাকরুণ শ্বশুরবাড়ি চললেন।

সাইকেল রিকশয়—স্টেশনে যেতে হবে।

মদন রিকশাওলা এসে বলে যায়, ঠিক সময় আসবো ঠাকরুণ। সেজবাবু বলে রেখেছে।

সেজ ভাইপো সঙ্গে যাবে।

সাইকেল রিকশ নিয়ে চলে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়িয়ে মদন প্রশ্ন করে, কবে ফিরছেন ঠাকরুণ?

শশীঠাকরুণ জানেন দিন সাতেকের বেশী থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। তবে এই সাতটা দিন মরে পিটে থাকতেই হবে। যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন, তাতে ওর কমে হবে না। তবে পষ্ট করে তারিখটা কাউকে বলেন না। যদি গিয়ে না টিকতে পারেন? যদি পরদিনই পালিয়ে আসতে হয়? তাই বলেন, মন হলেই চলে আসবো।

কিন্তু কেন যাচ্ছেন?

তার উত্তর দিয়েছেন, কেন, শ্বশুরবাড়িতে একবার যেতে নেই? ধরে নে তীর্থ দর্শনে যাচ্ছি।

যদিচ সারাজীবনে কেউ কোনদিন শশীতারার এই তীর্থ ভক্তির পরিচয় পায়নি।

তবে যাওয়ার আসল কারণটি জানে শশীতারার সেজ ভাইপো অজিত চাটুয্যে। সে উকিল বলেই জানে অথবা ঠিক বলতে গেলে সেই শশীতারাকে জানিয়েছে।

শশীতারার শ্বশুরবাড়ি বীরনগরে তাদের গুষ্ঠির আর কে কোথায় আছে জানা না থাকলেও—শশীতারার সৎ শাশুড়ী বুড়ি যে আকন্দরডাল মুড়ি দিয়ে এ যাবৎ ইহ সংসারে টিঁকে ছিল, ওটা অজিতই শশীতারাকে জানিয়েছিল এবং এও জানিয়েছিল জমি জমা যা আছে তা নেহাৎ কম নয়। এখন বীরনগর প্রায় টাউন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এখন ওখানের জমি বিঘের দামে কাঠা। বুড়ি তো এযাবৎ সব ভোগ করেছে, সে থাকতে উকি মারতে যাওয়াও অসম্ভব তা জানা ছিল। সম্প্রতি সেই বুড়ি গত হয়েছে, এখন অজিত চুপি চুপি প্ররোচনা পরামর্শ দিচ্ছে, এসময় গিয়ে পড়া দরকার। সৎ শাশুড়ীর ছেলে পিলে যাই থাকুক, শশীতারার তো অর্ধেক হিস্যা?

অতএব?

অতএব ভিটে বাড়ির ভাগ না হোক—বিশ বাইশ বিঘে জমিও অন্ততঃ শশীতারা আইনসঙ্গত ভাবেই পাবেন। যার অর্থ হচ্ছে, বেচলে এখনই বিশ বাইশ হাজার টাকা আর ফেলে রাখলে তো আরো বাড়বার আশা।

ভাইপোর মুখে খবরটা জেনে শশীঠাকরুণ মনে মনে পুলকিত হয়ে উঠলেও, মুখে গাম্ভীর্য রেখে সৎ শাশুড়ীর মরণ স্মরণ করে সবস্ত্রে ডুব দিয়ে এলেন।

পরদিন নোখ কেটে চান করে ভুজ্যিদান করলেন। আর কিছু করার নেই। মরেছেন তিনি মাস দুই আগে।

রেল গাড়িতে যেতে যেতে অজিত হিতকথা শেখাতে থাকে, জ্ঞাতি গুষ্ঠিই তো খাচ্ছে। তারা হঠাৎ তোমায় দেখে পাত্তা দিতে চাইবে বলে মনে হয় না। তুমি কিন্তু শক্ত থেকো পিসি!

শশীতারা বলেন, তুই থাম অজা, তোকে আর আমায় বুদ্ধি দিতে হবে না। নেহাৎ শ্বশুরবাড়ি বলে কথা, তাই তোকে সঙ্গে নিচ্ছি। তা’ছাড়া বিষয় সম্পত্তি নিয়ে ফেরেববাজি করতে হবে, নচেৎ শশীতারা বামনী তোর তক্কা রাখতো নাকি?

তবু অজিত ভুলে ভুলে আর একবার বললো, কেউ যদি খোসামোদ করে মন ভেজাতে আসে, তাহলে ভিজো না।

শশীতারা বললেন, তুই বলবি, তবে আমি ভিজবোনা? নচেৎ ভিজবো?

উকিলের প্যাঁচ নিয়ে অজিত বললো, কেউ তো তোমার যাওয়াটা সুচক্ষা দেখবে না? জ্ঞাতি ট্যাঁতিরা কিছু খেতে দিতে এলে খেও না। কি জানি কোন মতলবে—

শশীতারা বললেন, তুই কি এই মাত্র মায়ের পেট থেকে পড়লি নাকি অজা? কবে কোন জন্মে আমি কারুর কাছে খেয়েছি? বলে—কখনো কোনো বাড়িতে মা দুগগার ভোগের পেসাদই গ্রহণ করি না, মাথায় ঠেকাই, মুখে ঢোকাই না। আমায় এলো সাবধান করতে—খেও না! লোকের বাড়ি খেও না! হুঃ।

তদবধি ভাইপো মুখে তালা চাবি এঁটেছে।

শশীতারা যখন বীরনগরে পৌঁছলেন, তখন বেলা দুটো। বুঝে সুজে একাদশীর দিন বেরিয়েছেন, যাতে সেদিনটায় নিশ্চিন্দি।

সঙ্গে আছে নিজের মতো সামান্য কিছু বিছানা বাসন অবশ্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পত্র এবং কাপড় চাদর, আর অতি আবশ্যকীয় বস্তুটি বেশ মোটা অঙ্কে। অভয় চাটুয্যে মেয়ের নামে একটা বড় জমি লিখে গিয়েছিলেন, তার আদায় উসুল থেকে শশীতারার হাত খরচাটা হয়, তীর্থ ধর্ম হয়।

এও তো তীর্থেই এসেছেন।

অজিত ভাত খেয়ে এসেছে, সন্ধ্যের গাড়িতে ফিরে যাবে। স্টেশনে চা জল খাবার খেয়ে নেবে।

অজিত আগে এসে লুকিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে গিয়েছিল, তাই সাইকেল রিকশকে বাড়ি চেনাতে অসুবিধে হলো না।

শশীতারা নেমে পড়লেন, অজিত বললো, আমি আসছি। সেটেলমেণ্ট অফিসটা একবার ঘুরে আসি। তুমি কিছু ঘাবড়াবে না, নিজের ডাঁটে ঢুকবে।

শশীতারা বললেন, তোর বাকবিন্যেস দেখে মনে হচ্ছে অজা, তুই যেন একটা খুকীকে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছতে এসেছিস।

অজিত হেসে চলে গেল।

পিসির ওপর তার যথেষ্টই আস্থা, তবু বলা স্বভাব তা’ই বলছে।

শশীতারা তাকিয়ে দেখলেন, বাইরের অংশটা প্রায় পড়েই গেছে। ইট পাটকেল ঠেলে ঢুকতে হয়। ভিতরের উঠানের দরজাটা বন্ধ।

কিন্তু বেশীক্ষণ বন্ধ থাকলো না, সাইকেল রিকশর শব্দ শুনেই দুটো ছোট ছেলে মেয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এসে দেখেই ছুটে ভিতরে চলে গেল।

একটু পরেই গায়ে মাথায় কাপড় টেনে এক প্রৌঢ়া এসে দাঁড়ালেন।

চোখে অসীম কৌতূহল, অনন্ত জিজ্ঞাসা।

শশীতারা তাকিয়ে দেখে অনুমানে নির্ভর করে বলে উঠলেন, যিনি মারা গেলেন সম্প্রতি, তাঁর বেটার বৌ বোধ হয়?

প্রৌঢ়া মাথাটা উঁচু নীচু করে বললেন, আপনি? আপনাকে তো—

না কখনো দেখনি। দেখবে কোথা থেকে? সম্পর্ক রাখলে তো? আমি ওনার সতীন—পো বৌ।

মহিলাটির মুখখানি যদি এতে পাংশুবর্ণ হয়ে যায়, দোষ দেওয়া যায় না তাঁকে।

তাঁরও প্রায় ষাটের কাছে বয়েস, তবু এযাবৎকাল দজ্জাল শাশুড়ীর বৌ হয়েই কাটিয়ে আসতে হয়েছে। এতোদিনে যদি বা ভগবান মুখ তুলে চাইলেন, হঠাৎ একী দুর্গ্রহের আবির্ভাব?

ওনার সতীন—পো বৌ!

তার মানে একজন ভাগের ভাগীদার।

শাশুড়ী মরার খবর পেয়েই কামড়া কামড়ি করতে ছুটে এসেছেন। বলা নেই কওয়া নেই, একেবারে জিনিসপত্র নিয়ে বসবাস করতে এলেন। অথচ জন্মেও দেখা সাক্ষাৎ নেই।

বিনা বাক্যে পাথর মূর্তিতে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি, একটা যে প্রণাম করা উচিত, তাও ভুলে গিয়ে।

শশীতারা অবশ্য অবস্থাটা বোঝেন।

মনে মনে বেশ একটি দিব্য কৌতুক অনুভব করে বলেন, সম্পর্কে গুরুজন হই গো, পেন্নাম একটা করলে জাত যেতো না। যাক তা যেচে মান কেঁদে সোহাগ দরকার নেই আমার। এখন কর্তব্য কর্ম্মটুকু করো দিকি। রিকশওলাকে নিয়ে গিয়ে একটু পরিষ্কার দেখে জায়গা দেখিয়ে দাও, জিনিসটা নামিয়ে আসুক। ও তো আর দাঁড়িয়ে থাকতে আসেনি!

এও একটি বাক্যবাণ।

মহিলাটি দাঁড়িয়েই আছেন।

এতোক্ষণে তিনি একটি প্রণামের ভঙ্গী করে অস্ফুটে বলেন, আপনি ভেতরে যাবেন না?

শোনো কথা। যাবো না তো কি ধূলো পায়ে বিদেয় হবো? দেখতেই তো পাচ্ছো ধূলো পায়ে বিদেয় হতে আসিনি। বাক্স বিছানা নিয়ে এসেছি। ও আগে মালগুলো পার করে আসুক, ভাড়া মিটিয়ে বিদেয় করে তবে ঢুকছি। শাশুড়ী মলেন, তা’ একটা খবর পর্যন্ত দেওয়া নেই! বলি হলেও সৎ শাশুড়ী, খোদ শ্বশুরের পরিবার তো? মরলে হবিষ্যি করতে হয় না? ওমা, সম্পর্কটা স্বীকার পর্যন্ত করা নেই। পাছে দেশের লোক জেনে ফেলে, বুড়ির আরও একটা বৌ আছে। ভাগের ভাগীদার আছে।

মহিলাটি অসন্তুষ্ট স্বরে বলেন, তা আমার বলছেন কেন? আমি তো আপনাকে চোখেই দেখিনি। জানিও না—

দেখনি ঠিকই—শশীতারা তেমনি মনে মনে দিব্য কৌতুকের হাসি হেসে বলেন, তবে জানো না একথা হতেই পারে না। নাও যাও, লোকটা যে সঙের মতন দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ি তো দেখছি পেল্লায়, ঘরদোর ঢের, বাড়ি ভর্তি লোক আছে এমন তো মনে হচ্ছে না। জায়গায় অকুলোন হবে না।

শশীতারা আঁচল ঘুরিয়ে বাতাস খেতে খেতে বললেন, আর হলেও নাচার। এসেছি যখন যুগ যুগান্তর পরে, পত্রপাঠ বিদের হবো এ মনে কোরো না।

বাঃ তা কেন মনে করতে যাবো।

কেন যাবে? শোনো কথা! এই মাত্তর পৃথিবীতে পড়লে নাকি? ভাগের ভাগীদারকে দেখলে আর কার মনে হয়, ওকে আমার বুকের মধ্যে ভরি। আসলে আমি তোমার শত্রুই, বুঝলে গো?

মহিলাটি এবার পরিষ্কার গলায় বলেন, কেন শত্রুই বা হতে যাবেন কেন?

তা যা বলো না, হলে উত্তম। এখন বলো বাড়িতে আর আছে কে? যে রকম ভোঁ ভাঁ দেখছি, বেশী কেউ আছে বলে তো মনে হচ্ছে না। তা’ আমার দ্যাওর কোথায়? দেখি সেই বেআক্কলে মানুষটিকে।

প্রৌঢ়ার ভুরুটা কুঁচকে উঠলো, কোনো উত্তর না দিয়ে রিকশওয়ালার সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে ঢুকে গেলেন।

শশীতারা অধস্তনকে হুকুম করার ভঙ্গীতে ডেকে বলেন, মেজেটা একটু মুছে তবে নামিও।

প্রৌঢ়া চলে গেলে শশীতারা বাইরে থেকেই মুখ উঁচু করে দেখেন। দোতলার ছাতের কার্নিশটা যেন ঝুলে রয়েছে। সর্বনাশ! যে কোনো সময় তো হুড়মুড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। সেকালের বাড়ি, কার্নিশেই কতো ইট। ওই ভেঙে পড় পড় অবস্থার কারণও সামনেই দেদীপ্যমান। একটা পুষ্ট অশ্বত্থগাছ সতেজ বাহু মেলে দাঁড়িয়ে আছে সেই ফাটলের খাঁজে।

বাড়িতে কী কুচোকাঁচা কিছু নেই?

তাই বুড়ো বুড়ির ভয় নেই প্রাণে?

কিন্তু কচিকাঁচা নেই তা বলা যায় কী করে? প্রথমে তো দুটো ছোট ছেলে মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল। …ওই বুড়ির ছেলে মেয়ে বলে মনে হয় না। বোধহয় ওই গিন্নীর দ্যাওরপো হবে। ওর তো বয়স হয়েছে। এতোটুকু ছেলে মেয়ে হবার কথা নয়। তা—এই একটি গিন্নীকেই তো দেখছি। আর কেউ আছে না নেই?

রিকশাওলা ফিরে আসে।

তাকে পাওনার অতিরিক্ত বখশীস দিয়ে বিদেয় করেন শশীতারা।

প্রৌঢ়াও ফিরে এসেছিলেন আবার। শশীতারা বলেন, নাও এখন পথ দেখিয়ে নিয়ে যাও। একেই বলে অদৃষ্টের পরিহাস। কে কাকে পথ দেখায়। এ বাড়িতে আগে ঢুকেছিল কে?

মহিলাটি বলেন, হাত মুখ ধোবেন তো?

হবে! হবে! মুখ হাত ধুয়ে তো আর আজ জলখাবারের থালা নিয়ে বসবো না।

মহিলাটির মনে পড়লো, ও আজ একাদশী। সত্যি বলতে তিনি যেন একটু স্বস্তিই পেলেন। এক্ষুনি আদর আপ্যায়নের ব্যবস্থা নিয়ে বসতে হবে না!

শশীতারার তীক্ষ্ন সন্ধানী দৃষ্টির কাছে ব্যাপারটা ধরা না পড়ে পারে না। শশীতারা ভারী একটা মজা অনুভব করেন। মনে করেন, তা বাপু হঠাৎ এমন জুড়ে বসবার তাল করে উড়ে আসছি আমি। ভাল লাগবে কেন? মুখে বলেন, আমার খাবার জন্যে ভাববার কিছু নেই। সব আমার আছে।

মহিলাটি একটু বোধহয় চমকান। বলেন, কি আছে?

সবই আছে। এখানে কে আছে কেমন ধারা লোক তার কিছুই যখন জানি না, তখন নিজের ব্যবস্থা তো করে আসতে হবে। তা ছাড়া—শশীতারা ভিতরে কৌতুকের হাসি চেপে বলেন, তাছাড়া আমার ভাইপো বলে দিয়েছে, যেখানে সেখানে কেউ কিছু বললেই যেন খেয়ো টেয়ো না পিসি। সম্পর্ক তো ভালো নয়। কার মনে কি আছে!

মহিলাটির শুধু ভুরুই নয়, মুখ চোখ সবই কুঁচকে ওঠে।

তাঁর বোধকরি বুঝতে বাকী থাকে না, কেমন সাংঘাতিক একখানি চীজ এসে ঢুকলেন।

তবু তিনি বেজায় গলায় বলেন, আপনার ভাইপো খুব বুদ্ধিমান দেখছি।

তা বুদ্ধিমান বৈকি। উকিল তো! বলে মহিলাকে একেবারে দমিয়ে দিয়ে ভিতরে যান ওর পিছনে পিছনে। আর ঢুকে এসে যেন অবাকই হয়ে যান।

আশ্চর্য তো! মনে হচ্ছে বাড়িটা যেন কতো চেনা, কতোবার দেখেছেন। অথচ সেই তো কোন পূর্বজন্মে বিয়ে নামক ঠাট্টার নাটকটায় অষ্টমঙ্গলার আটদিন মাত্র। তা সে তো ঘোমটার মধ্যেই কেটেছে! তবু যেন কতো পরিচিত!

কী অদ্ভুত!

কী অদ্ভুত!

নিজেকে প্রায় জাতিস্মর মনে হচ্ছে শশীতারার।

তা পূর্বজন্ম ছাড়া আর কী? দেখবামাত্র মনে হচ্ছে আমি এখানের চিরকালের।

এতোকালের মধ্যে এরা বাড়ির কোনো পরিবর্তন সাধন করেনি। এও এক আশ্চর্য! ফুলপুরের চাটুয্যে বাড়ির ইমারতখানা এই শশীতারা কতো রং বদল করালো, কতো রূপ বদল করালো।

কতো জানলা ভেঙ্গে দরজা, কতো দরজা বুজিয়ে জানলা করা হয়েছে সেখানে। উঠানে ঘর উঠেছে দেয়াল ফেলে। রান্নাঘরের কতো ছিরি ফেরানো হয়েছে। আর বীরনগরের এই বাড়িখানা যেন যাদুঘরের তাকে বসে আছে অবিকল প্রাচীন চেহারা নিয়ে।

যেমন উঠোনের চারধার ঘিরে ঘর ছিল, তার একপাশের ঘরগুলো রান্নাঘর—ভাঁড়ার ঘর, খাবার ঘর ইত্যাদি, বাকি তিন পাশেরগুলো শোবার। সব আছে। কতো লোক ছিল তখন?

শশীতারার মনে হলো তিনি যেন দেখতে পেলেন, সমস্ত বাড়িটা মানুষে ঠাসা। তখন সে বাড়িটা বিয়ে বাড়ি ছিল, আর সেই জন্যেই অতো লোক ছিল, সেটা মনে পড়লো না শশীতারার।

শশীতারা যেন সেই মানুষগুলোর জন্যে হাহাকার অনুভব করলেন। কিন্তু এই সব যে শশীতারার মনে ছিল, সেটাই তো শশীতারা নিজে জানতেন না।

অথচ এখন দেখছেন, কী অবাক কাণ্ড, যা দেখেছিলাম অবিকল তাই রয়েছে। সেই—উঠোনের ওই পাশের একটু সরু প্যাসেজ দিয়ে বেরিয়ে গেলেই খিড়কি দরজা, সেই দালানের ওপরকার দরজাটার দু’পাশে আধা থামের মতো বাহার। দরজার পাল্লা দুখানা পিতলের গুলো মারা।

সব ঠিক আছে, শুধু সেই সাবেক কালের ঝকঝকে আঁটসাঁট চেহারাটা ঝুলে পড়েছে, দেওয়ালের বালি ঝরে পড়ে ইঁট বেরিয়ে গেছে। আর দেয়াল বেয়ে শ্যাওলার দরানি গড়াচ্ছে।

কিন্তু তবু সেই দরজা, সেই জানলা সেই সিঁড়ি, সেই ঘর দালান।

শশীতারার কোন স্মৃতির সিন্ধুকে জমা ছিল এরা? শশীতারা তো সম্পূর্ণ এক অজানা অচেনা জায়গায় আসছেন এমন মনোভাব নিয়েই এসেছিলেন। সত্যি বলতে, বাড়িটা সম্পর্কে কোনো ধারণাও ছিল না। মনের জগতে ছিল অনেকখানি জমি। যা নাকি এখন বিঘের দামে কাঠা। আর সেই অনেকখানির অর্ধেকটার মালিক হচ্ছেন শশীতারা দেবী।

এখানে এসে জমিটা কেমন ধূসর হয়ে গেল। বাড়িটাই প্রবল বেগে মনের মধ্যে ঢুকে পড়তে চাইছে।

এটা হলো বোধহয় স্টেশন থেকে গ্রামে ঢোকার পথটার অনেক বদল দেখে। ঢোকার সময় অজিতকে সেকথা বলেছেন, জানিস অজিত, মনে অবিশ্যি বেশী কিছু নেই, তবু মনে পড়ছে, সেই যে থাড়ক্লাশ ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ঘোমটায় মুখ ঢেকে গ্রামে ঢুকেছিলাম, তখন যেন চারিদিকে ঝোপ জঙ্গল, বুনো বুনো গন্ধ। কিন্তু এ তো দেখছি দিব্যি শহর বাজার! আবার ইষ্টিশনের ধারে বাইসকোপ।

অজিত বলেছিল, হাল চাল বদলে গেছে পিসি। এখন এখানকার ছেলেরাও চোঙা প্যাণ্ট পরে, দেয়ালে ধূয়ো লেখে। তোমার শ্বশুর বাড়ির দেশটা অনেক প্রগতিশীল হয়ে গেছে।

দেশটা প্রগতিশীল হয়ে গেছে দেখেই বোধহয় দেশের মধ্যে কার সেই প্রাণ ভোমরাটুকু একেবারে পুরণো চেহারাখানা নিয়ে বসে আছে এটা অপ্রত্যাশিত লাগলো। আর যা অপ্রত্যাশিত তাই তো আহ্লাদের।

শশীতারা ঊর্ধ্বমুখে তাকিয়ে দেখে বললেন, পঞ্চাশ ষাট বছরের মধ্যে বোধহয় বাড়িতে মিস্তিরি মজুর লাগেনি?

কথাটা ফট করে গায়ে লাগলো প্রৌঢ়া মহিলাটির।

তিনি বেজার গলায় বললেন, লাগাবার মতো আছে কে, যে লাগাবে?

শশীতারা অবশ্য ওর ওই বেজারে বিশেষ আনন্দ অনুভব করেন। বললেন, যারা ভোগ করছে তারা ছাড়া আর কে করতে আসবে? জমি জলা বাগান পুকুর বিষয় আশয় তো কম ছিল না আমাদের শ্বশুর ঠাকুরের!

এই—আমাদের শ্বশুর ঠাকুরের শব্দটি উচ্চারণ করায় রীতিমত পলিটিকস আছে। প্রৌঢ়া যাতে জ্বলে যান।

তা তিনি গেলেনও। ভাবলেন, তার মানে ইনি কোমর বেঁধেই এসেছেন। ইনিও যে সমান অংশীদার তা শোনালেন। একে উচ্ছেদ করতে না পারলে ওই আলসের অশ্বত্থের চারার মতই হবে।

মহিলা বেজার গলায় বললেন, সেই আশাতেই বোধহয় ছুটে এসেছেন শাশুড়ী যেতে না যেতে। তবে যে মানুষ চিরজন্ম ভুগে মলো, তার সঙ্গে যে—মানুষ কোনো কালে তাকিয়ে দেখলো না, তার তুলনা চলেনা।

ওমা, এ বৌটা তো দেখছি আচ্ছা কুঁদুলী। শশীতারা অবলীলায় বলেন, তা আমার অবিশ্যি কুকুরের কামড় হাঁটুর নীচে। তবে দ্যাওরের আমার পরিবার ভাগ্যি ভালো নয় মনে হচ্ছে। মানুষকে যে আদর আপ্যায়ন করতে হয়, সে জ্ঞানও নেই। তা কর্তাটি কোথায়? যা বলবার তাকেই বলবো ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করি না আমি। তবে শিক্ষা সহবত তোমার ভালো নয়, একথা একশোবার বলবো। মরুক গে, যার যা বুদ্ধি! ওই যে ছেলেমেয়ে দুটোকে দেখলাম, ওরা কে?

মহিলাটি দেওয়ালের দিকে মুখ করে ভারী গলায় বলেন, আমার নাতি নাত্নি।

ছেলের ঘরের?

না। অনিচ্ছুক কণ্ঠ ঘোষণা করে, মেয়ের ঘরের। জামাই নেই।

হায় কপাল। এই দ্যাখো, ফোঁকটে অন্যের সম্পত্তি নেবো খাবো বললেই কি আর ভগবান রাজী হন? অমনি অন্য ভার চাপান। তা মেয়ে কটি?

ওই একটিই। বলে মহিলাটি উঠানের তারে শুকোতে দেওয়া কাপড় চোপড়গুলি তুলতে নেমে যান।

শশীতারা বলেন, কপাল আর কি! এক তরকারি আলুনি! আর ছেলে কটি?

মহিলা যত বেজারই হোন—কথার উত্তরগুলো দিতে বাধ্য হন। ছেলে ষেটের দুটি।

ওমা! তবে তো তুমি রাজা গো! একটা ছেলে বিনেই তো সব শূন্য। ছেলেরা কই?

ছেলেরা এখানে থাকে না। কলকাতায় কাজ করে।

ও! তা মেয়ে?

মহিলাটি সংক্ষেপে বলেন, আছে ঘরে। এসেছেন যখন দেখতেই পাবেন।

শশীতারা গম্ভীর হন। বলেন, সেতো সত্যি! দেখতেই তো এসেছি। তবে জন্ম বিধবার সামনে মুখ দেখাতে লজ্জার কিছু ছিল না মেয়ের। আর সদ্য জ্যেঠিই হই যখন। দেখা সাক্ষাৎ নেই বলে তো আর সম্পর্কটা মুছে যায়নি। তা তোমার নাম কি?

মহিলাটি আরো বেজার গলায় বলেন, আমার আবার নাম!

তা মা বাপ তো দিয়েছিল একটা—

সে কবেকার কথা ভুলে গেছি।

তবে আর কি। ছোট বৌই ভাল। নাকি মেজ? কয় ভাই এরা? মানে সৎশাশুড়ীর ছেলে কটি?

ওই একজনই—

শশীতারা বলেন, হায় কপাল। তা তিনি কই?

ইস্কুলে পড়ায়, চারটেয় ফিরবে।

শশীতারা চোখ কপালে তুলে বলেন, ও কপাল! বুড়োকে এখনো ছেলে ঠেঙিয়ে খেতে হচ্ছে? কেন তোমাদের ছেলেরা টাকা পাঠায় না?

ছোট বৌ গম্ভীর ভাবে বলেন, একদণ্ডেই কি সব জেনে ফেলা ভালো দিদি?

শশীতারা এ অপমান গায়ে মাখেন না। অম্লান বদনে বলেন, তা অ, আ, ক, খ না চিনলে কি বই পড়া যায়? তোমাদের নাম পরিচয় আচার আচরণ কিছুই তো জানি না, সেগুলো জানবো, তবে তো আপন বলে বুঝবো। এই জানাটাই অ, আ, ক, খ। মনে থাকার মধ্যে মনে আছে, সেই বৌ বেলায় সৎশাশুড়ীর একটা সোন্দর ফুটফুটে ছেলে দেখেছিলাম, আমার বয়সী। তোমার কর্তা যে সেইটিই কি না তাও তা জানি না। নামও ভুলে গেছি। ছেলে তো ওই একটি শাশুড়ীর মেয়ে?

চার ননদ ছিল, সবই মরে হেজে গেছে।

পুণ্যির বংশ। তা আগের আর কেউ ছিল টিল?

আমার নিজের শাশুড়ীর আর ছিল না। আগের শাশুড়ীর শুধু একটি ছেলে—তা’ তিনিই তো।

তা আর আমায় বোঝাতে হবে না ছোট গিন্নী! আগের শাশুড়ীর সে ছেলের জাজ্জল্যমান সাক্ষী তো এই সামনেই। তা বাড়িতে টিপকল আছে না কুয়ো?

ছোট গিন্নী মাথা নেড়ে বললেন, কিছুই না। পুকুর ভরসা। কুয়ো ছিল পড়ে গেছে।

শশীতারা গালে হাত দেন। বলেন, ওমা আমি কোথা যাবো! একালে এমন গেঁয়ো ভূত হয়ে থাকে নাকি কেউ? তাও তো তোমাদের এখানটা দিব্যি শহর বাজার। বলি খাবার জল?

পাশের বাড়ির টিউবওয়েল থেকে আসে।

ছোট গিন্নীর মনে হচ্ছিল, বুড়ির কোনো কথার উত্তর দেবে না। কিন্তু এমন আশ্চর্য, না দিয়েও পারছে না। বুড়ি যেন মনিবের মতো প্রশ্ন করছে।

শশীতারা ওর মনের ভাব হাড়ে হাড়ে বুঝছেন, আর মনে মনে হাসছেন।

এখনই হয়েছে কি? যখন বিষয়ের অর্ধেক অংশ চাইবো, তখন কী করবে দেখা যাক।

ছোটলোকের মতন হালচাল!

কেন, দু’বিঘে জমি বেচে সব সামলে নেনা! বাড়িটা মেরামত কর, টিপকল বসা, নাইবার ঘর বানা। তা নয়, ধান চাল খাচ্ছেন আর বসে আছেন। ছেলেদের গুণেও বলিহারী! কলকাতায় গিয়ে বসে আছিস, দেখছিস না বুড়ো মা বাপ কোনদিন ছাত চাপা পড়ে মরে। তার ওপর আবার একটা বিধবা বোন। গুচ্ছের অপোগণ্ড ভাগনা ভাগনী? একটা কেউ পুকুরে ডুবে মরলে?

তা এতো সব আর বললেন না এখন। শুধু বললেন, তবে এইবেলা রোদে রোদে পুকুর থেকেই চানটা সেরে আসি।

ছোটগিন্নী আবারও কথা বলেই ফেলেন, এই অবহেলায় চান করবেন?

ওমা, চান করবো না তো কি রেলগাড়ির শরীরে থাকবো? তা কাছে পিঠে কোথায় একটা কালী মন্দির ছিল না?

আশ্চর্য, এটাও মনে পড়ে গেল শশীতারার। নতুন বর—কনেকে নিয়ে মন্দির ঘুরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল।

ছোটগিন্নী বলেন, কালী মন্দির নয়, সিংহবাহিনীর মন্দির।

তা হবে! আছে তো?

মন্দির আর কোথায় যাবে? চিরকালের জিনিস ছিল আছে।

বাঃ ছোটগিন্নীর কথা কী মিষ্টি! যেন ঢিল ছুঁড়ে মারছে। দ্যাওরের আমার ভাগ্যি ভালো।

শশীতারা গামছা নিয়ে পুকুরের উদ্দেশে যান।

অসুবিধে অনেক হবে।

তবু চেপে বসে থাকতে হবে।

ভাগের জমিটা দখল করে নিয়ে বেচবার খদ্দের জোগাড় করা, সময় লাগবে। সহজে কি দেবে?

রাজবালা ছটফট করছিলেন। রাজবালা শশীতারাকে চানের ঘাট দেখিয়ে দিয়েই ঘরে এসে ছোট নাতিকে ইস্কুলে পাঠালেন, যা ছুটে গিয়ে দাদুকে ডেকে আনগে। বলবি ফুলপুর থেকে তোমার বৌদি এসেছে।

মেয়ে ঘরে আছে বললেও, আসলে নেই।

মেয়ের ঘরে মন টেঁকে না, ও কেবল পাড়া বেড়িয়ে বেড়ায়।

ভবেশ বাঁড়ুয্যের দ্বিতীয় পক্ষের অবদান রমেশ সত্যিই একদা ফুটফুটে ছেলে ছিলো, কিন্তু এখন তাকে দেখলে মনে হবে যেন একটা আটফাটা হ্যারিকেনের চিমনি।

যেন ভিতরে যে প্রাণ শিখাটুকু জ্বলছে, তার আলোটা ধোঁয়ায় আড়ালে অদৃশ্য।

তামাটে রং, পাকসিটে গড়ন, ঝুলে পড়া মুখ, চুলগুলো সাদা ধবধবে।

খবরটা শুনে প্রথমটা অবিশ্বাস্য বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেলেন রমেশ মাষ্টার।

আমার বৌদি এসেছেন! কোথা থেকে?

ফুলপুর থেকে।

রমেশের হাত পা কেঁপে উঠলো। আর সন্দেহের কিছু নেই। ভাগীদার ভাগ নিতে এসেছেন। অথচ এই ভয়ে তিনি মা মরতে একটা খবরও দেননি। অবিশ্যি একবার ছোট্ট করে তুলেছিলেন কথাটা কর্তব্যবোধে, কিন্তু যে ছেলেরা দেশের এই জমিজমাকে জিনিস বলে মনেই করে না, সেই ছেলেরাই আপত্তি তুলে বললো, কোনো দরকার নেই। এলেই দেখবেন শুনবেন, বিষয়ের ভাগ চাইবেন। জীবনে তো কখনো দেখলাম না।

তা আমিও তো বলিনি। তোদের বিয়ে টিয়ের সময় বললে আসতেন কিনা কে জানে।

বাঃ শুনেছি তো তোমার বিয়ের সময় কে যেন নেমন্তন্ন করতে গিয়েছিল, ওনার বাবা না ঠাকুর্দা তাকে বাইরে থেকেই ভাগিয়ে দিয়েছিলো।

হ্যাঁ, ওই রকমই একটা ঘটেছিল বটে।

তবে আবার কী? ওসব কর্তব্যের আর দরকার নেই।

রাজবালাও বলেছিলেন, খাল কেটে কুমীর আনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বুদ্ধিহীনের কাজ।

অতএব বুদ্ধিমানই হয়ে বসে ছিলেন রমেশ মাষ্টার।

খবরটা শুনে কিছুক্ষণ নিথর হয়ে থেকেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন রমেশ মাষ্টার।

রাজবালা দরজাতেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।

রমেশ ইসারায় জিজ্ঞেস করলেন, কোথায়?

চান করে এসে লক্ষ্মীর ঘরে ঢুকেছেন।

এটাও প্রায় ইসারাতেই বললেন রাজবালা।

রমেশ এদিক ওদিক তাকিয়ে আস্তে বললেন, তা কি রকম দেখলে?

কি করে বোঝাবো?

না, মানে আগের মতই আছেন কি না?

আগে তো আমি দেখিনি।

তা বটে।

রমেশ নিজের ঘরের মধ্যে ঢুকে এসে জানলা দিয়ে বরাবর লক্ষ্মীর ঘরের দরজার দিকে চোরা চাহনি নিক্ষেপ করেন। আর মনে মনে চোটপাট করবার শক্তি—সংগ্রহ করতে চেষ্টা করেন।

রাজবালা কাছাকাছি বসে বলেন, আমার তো মনে হলো একখানি জাঁহাবাজ মেয়ে মানুষ!

তাই নাকি?

রমেশ মাষ্টারের মুখটা শুকিয়ে যায়। বলেন, কি করে বুঝলে?

কথাবার্তা ধরনধারণ দেখলাম তো সবই। যেন মনিব গিন্নী এসেছেন প্রজার বাড়ি, এমনি ভাব!

রমেশ বলে, কেন? কেন? তেমন ভাব হবার কারণ?

কারণ তুমিই বুঝো। আমি যা দেখলাম তাই বলছি।

কি বললেন টললেন?

অতো কথা বলবার এখন সময় নেই। তবে যা বললেন, তাতে মনে হলো আমাকে মশা মাছির মতন জ্ঞান করছেন।

রমেশ থতমত খেয়ে বলেন, তার মানে?

ওই তো বলছি—মানে, কারণ, সে সব তুমি বোঝ এবার।

বাঃ যত দোষ, নন্দ ঘোষ! আমি কি চোর দায়ে ধরা পড়েছি। আমি নেমতন্ন করে নিয়ে এসেছি?

কে এনেছে কে জানে। বিছানা বালিশ বাক্স বাসন গুছিয়ে এসে তো বসলেন।

রমেশ মাষ্টার হাতপাখা নিয়ে নাড়ছিলেন, সেটা হাত থেকে ফেলে দিয়ে ভীত গলায় বলেন, হঠাৎ কি ভেবে, তাই ভাবছি।

কি ভেবে সেটা আর বুঝতে পারছো না?

রাজবালা মুখ বাঁকান, মা গেছেন শুনে টনক নড়েছে। নাও এখন বিষয়ের চুল চেরো, সমান হিস্যের ভাগীদার তো!

রমেশ দুর্বল গলায় বলেন, বাঃ ওঁর তো ছেলেপুলে নেই।

নেই বলে যে ভাগ ছাড়বেন তা মনে হয় না।

রমেশ ভীতভাবে বলেন, বললেন না কি সে কথা?

বলবেন। আসল লোকের কাছে বলবেন। কেঁচো কেন্নোর সঙ্গে বলবেন না। বলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যান ছোটগিন্নি।

এবার তাঁর ছুটি।

এখন বুঝুক দ্যাওর ভাজে।

লক্ষ্মীর ঘর থেকে বেরিয়েই মুখোমুখি! কারণ রমেশ ততক্ষণে ছটফটিয়ে ওই দরজা পর্যন্তই গিয়ে পড়েছেন।

দুজনেই চমকে বললেন, কে?

রমেশ আস্তে একটা প্রণাম করে বললেন, আমি বড়বৌ!

শশীতারা আশীর্বাদ করে বললেন, ঠাকুরপো!

তারপরই প্রথম কথা বললেন, তোমার সেই রংটা কোথায় গেল ঠাকুরপো?

রমেশ চমকে বলেন, কোন রংটা?

শশীতারা হেসে উঠে বলেন, ওমা অমন চমকে উঠলে কেন? বলছি সেই যে বৌ হয়ে এসে দেখেছিলাম ছোট্ট ফুটফুটে চাঁদের মতো একটি ছেলে—সে তো শুনছি তুমিই। আর যখন ভাই নেই। তাই বলছি সেই রংটা কোথায় গেল?

এবার রমেশ হেসে ওঠেন। হা হা করে হাসি।

পাশের ঘর থেকে ছোট গিন্নীও চমকে ওঠেন।

এরকম হাসি রমেশ কতোকাল আগে হাসতেন।

হাসি থামিয়ে রমেশ বললেন, সেই ফুটফুটে ছেলেটাকে এখন খুঁজছো বড় বৌ? তাহলে আমিও বলি—সেই রূপকথার রাজকন্যের মতো রূপসী বৌটিকে কোথায় ফেলে রেখে এলে বড়বৌ? আমরা ছোটরা চুপি চুপি যার নাম দিয়েছিলাম পরীবৌ।

শশীতারা হঠাৎ কেমন অবসন্নতা বোধ করেন।

একাদশী বলেই কী? কিন্তু উপোস আবার কবে শশীতারাকে কাবু করতে পেরেছে?

শশীতারা তবু জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করেন, আহা! আর কিছু না?

রমেশ কেমন অন্যমনস্কের মতো খোলা দরজা দিয়ে উঠোনের মাঝখানটায় তাকিয়ে বলেন, সত্যিই বড়বৌ! সেদিন সকাল থেকে ওই উঠোনে আলপনা আঁকা হয়েছে, কনে বৌ এসে দাঁড়াবে। আমরা ছোট ছেলেরা কী দারুণ উত্তেজনা নিয়েই ঘুরছি, হঠাৎ এক সময় শাঁখ বেজে উঠলো। ছুটে চলে এলাম। আর দেখে সত্যি বলছি যেন হাঁ হয়ে গেলাম।

যেন সত্যিই রূপকথার গল্পের কুঁচবরণ কন্যে মেঘবরণ চুল! মাথায় শোলার মুকুট, তবু তাতেই কী শোভা! যেন মহারাণী!

বীরনগর হাই স্কুলের ঝুলে পড়া হেড পণ্ডিত রমেশ বাঁডুয্যে হঠাৎ যেন স্বপ্নাচ্ছন্নের গলায় বলেন, আর মাথা ছাড়া আগাগোড়াই তো সোনা দিয়ে মোড়া।…পরে তোমার কাছ ঘেসে আমি আর আমার ছোট বোন পুনি দুজনে চুপিচুপি গহণাগুলোর নাম জিগ্যেস করেছিলাম। মনে আছে তোমার?

শশীতারা হেসে ফেলে বলেন, তা অবিশ্যি মনে নেই, তবে ছেলেটাকে মনে পড়ছে। কাঁচের মতন চকচকে চোখ, পশমের মতন চুল।

রমেশ তেমনি স্বপ্নাচ্ছন্নের মত বলেন, আমার একটা নাম মনে আছে। একটাকে বলেছিলে বাজুবন্ধ। আর একটা বোধহয় সাতনরী।

পাশের ঘরের বন্ধ দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়ে রাজবালা মুখ কোঁচকায়, দ্যাওর ভাজে খুব যে রসের কথা হচ্ছে। গোড়াতেই অমন আদিখ্যেতা করতে বসলে আর তুমি শক্ত হতে পারবে? হঠাৎ বৌদিকে দেখে ভাব উথলে উঠলো দেখছি। পেটের মেয়েটা দুঃখী হয়ে এসে পড়ে আছে, তার সঙ্গে তো একবার ভাল মুখে কথা কইতে শুনি না। কেবল শাসন, কোথায় গিয়েছিলি? এতো এতো পাড়া বেড়াস কেন? তাসের আড্ডায় বসার দরকার কি? ভগবান যেমন কপাল করে দিয়েছে তেমনি থাকো—

এই সব!

আর এখন ভাজ দেখে মিষ্টি কথা ফুটছে! বাবাঃ উনি যে কী ঘুঘু তা আমি বুঝে নিয়েছি। মনে কোরো না মিষ্টি কথায় তুষ্ট করে ফেলবে ওঁকে। কানটা আবার চেপে ধরেন রাজবালা।

শুনতে পান রমেশ মাষ্টার বিহ্বল গলায় বলছেন, বৌ এসে দুধে আলতার পাথরে দাঁড়ালো। আমরা ছোটরা বলাবলি করে ঠিক করে নিলাম আমরা ওঁকে পরীবৌ বলে ডাকবো।…মানুষের কতোবারই জন্মান্তর ঘটে বড়বৌ। আজ কে বলবে তুমিই সেই মানুষ। সেই পরীবৌ!

রাজবালা জানলার গোড়ায় চলে আসেন, দেখেন বড় গিন্নী এসে দাওয়ার সিঁড়িতে বসলেন, তাঁর দ্যাওরও। টানা টানা বেশ কয়েকটা সিঁড়ি নেমে তবে উঠোনে নামতে হয়। শশীতারাও বিহ্বলের মতো দাওয়ায় সিঁড়িতে বসে পড়ে তাকিয়ে দেখেন সেই উঠোন। যেন আলপনার রেশগুলো খোঁজেন। খোঁজেন তার উপর বসানো দুধে আলতার পাথরটা।

যার উপরে টোপর পরা বরের পিছু পিছু এসে দাঁড়াবে এক রূপকথার রাজকন্যে।

যার গলায় সাতনরী হার, কপালে ঝাঁপটা, হাতে বাউটি বালা বাজুবন্ধ তাবিজ। আঙুলে আঙুলে আংটি বসানো রতনচুড়, পায়ে চরণ পদ্ম।

এইখানে এই উঠোনের ইতিহাসে সেই অলৌকিক লাবণ্যের টুকরোটুকু সংরক্ষিত। আর সংরক্ষিত আছে ওই ফাটা ভাঙা মানুষটার মধ্যে।


শশীতারা বহুদিনের ভুলে যাওয়া হারানো একটা সম্পত্তির সন্ধানে এসেছিলেন, সেটাই পেয়ে গেলেন নাকি?

তা নইলে শশীতারার মুখের চেহারায় অমন উজ্জ্বল গভীর প্রশান্তি কিসের?

শশীতারা রমেশ মাষ্টারের পেশীবহুল শীর্ণ মুখটার দিকে তাকিয়ে বলেন, সে জন্মের কথা এখন আর কেউ মনে রাখেনি, কি বল?

রমেশ মাষ্টার বললেন, নাঃ। সবাই জানে রমেশ মাষ্টারও এমনি আটফাটা। যেমন তার বাড়ির ছিরি তেমনি তার নিজের ছিরি।

শশীতারার মনে হলো, রমেশ যেন শশীতারার বলবার কথাটাই বলে নিলো।

শশীতারা অন্যমনস্ক গলায় বলেন, সত্যি, বাড়িখানারও আমাদেরই মতন অবস্থা হয়েছে। বলে চুপ করে যান।

কথার জাহাজ শশীতারার এই মৌনতা বিস্ময়কর। আর শশীতারা নিজেই নিজের মনোভাবে বিস্মিত হন।

বাড়িখানার এই অবস্থার জন্যে তিনি যেন বেশ একটু বেদনা অনুভব করছেন, আর যেন অপরাধ বোধও।

কিন্তু কেন?

তাঁর কিসের অপরাধ?

তাঁর কেন বেদনাবোধ?

শশীতারা এ বাড়ীর কে?

ওই আটফাটা চেহারা ইস্কুল মাষ্টারটার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ‘আমাদের’ বললেন কী করে?


তাসের আসর থেকে হাতের তাস ফেলে উঠে এলো অন্ন।

পিছন দরজা দিয়ে আস্তে ঢুকে মার সন্ধানে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখলো মা চৌকিতে শুয়ে আছে চুপ করে। কাছে গিয়ে বললো, মা কী ব্যাপার? কি ঘটনা শুনছি?

রাজবালা পাশ ফিরে বললেন, ভালই ব্যাপার, ভালই ঘটনা। এ বাড়ির বড় গিন্নী। এক রাজা গেলেন আর এক রাজা এলেন! দাসী বাঁদী দাসী বাঁদীই রয়ে গেল।

অন্ন মুখ বাঁকিয়ে বললো, ইল্লি! অমনি তিনি এসে রাজা হবেন? তাঁর কি রাইট শুনি?

রাইট তো সমান সমান।

তা বেশ—মামলা মোকদ্দমা করে আদায় করতে পারেন তখন বোঝা যাবে। তা তুমি এখন শুয়ে?

রাজবালা এই আসন্ন সন্ধ্যায় বিছানায় পড়ে থাকারূপ গর্হিত কর্ম করেও অনুতপ্ত না হয়ে বলেন, মাথায় বাড়ি পড়লেই মানুষ শুয়ে পড়ে। মামলা মোকদ্দমার আর ফাঁক নেই অনি! তোর বাপ একেবারে এক মিনিটেই বড় বৌয়ের পাদপদ্মে ফুল চন্দন দিয়ে বসে আছেন।

তার মানে?

তার মানে সেই কোন জন্মের পুরনো কাহিনী, একজনের বয়েস যখন সাত আর অন্য জনের নয় কি আট। তখনকার গল্পে মসগুল একেবারে।

তাতে কি?

কি তা বুঝবি ক্রমশঃ। ও লোক আর মামলার দিকে গেছে! অথচ তিনি উকিল ভাইপো সঙ্গে করে এসেছেন।

উকিল!

তবে আর বলছি কি। দেখলেই বুঝবে কি বস্তু।

আমার দায় পড়ছে দেখতে যেতে।

তোমার পড়েনি, তোমার বাপের পড়েছে। তিনবার খবর নিয়ে যাওয়া হয়েছে অন্ন ফিরেছে কিনা।

তা তিনি কি থাকবেন নাকি?

থাকবেন বলেই তো এসেছেন। একেবারে বাক্স বিছানা নিয়ে।

অন্নর ভারী বিরক্তি লাগে।

এ কী গেরো রে বাবা।

একে তো আজন্ম পাহাড়ে মেয়ে মানুষ ঠাকুমার জ্বালায় মাথা তোলবার উপায় ছিল না বেচারী মার। আবার হঠাৎ একী উৎপাত!

অন্ন বলে, ওসব মতলব ফলবে না। এই বেলা উৎখাত করে বিদেয় করো।

তুই পারিস কর। তোদের বাপ যদি ওঁর দলে হয়ে বসেন?

ধ্যেৎ! কী যে বাজে কথা বল। তাই কখনো হয়? যতোই হোক বাবার চিরকাল একটু চক্ষুলজ্জা বেশী জানো তো? তা দাদা ছোড়দাকে খবর দিলে হয় না?

দেখা যাক। রাজবালা বিরক্ত গলায় বলেন, তাঁরাই বা আমায় কী ছাতা দিয়ে মাথা রক্ষে করছেন। এখানের জমি জমাকে তো তাঁরা জিনিস বলে গণ্যই করেন না।

অন্ন বিজ্ঞের গলায় বলে বসে, ঠাকুমার দুর্বুদ্ধিতে। যে বলতো, এক ছটাক জমিও বেচা চলবে না। না বেচলে আর ওই ইষ্টিশানের ধারের গরু চরার মাঠটার কী মূল্য বলো। এইবার ঠাকুমা গেছে, আর ভয়টা কাকে? বেচলে—

ভয় এনাকে।

রাজবালা বলেন, ইনি যদি এখন ভাগ ভেন্নর ধুয়ো তোলেন, বলেন বেচাকেনা চলবে না? তার মানে আমার জীবদ্দশা শেষ।

তোর বাপের থেকে বোধহয় দু বছরের বড়ো। অবিশ্যি দেখলে তা বোঝায় না। তাঁকেই ছোট দেখায়, এঁকেই বুড়ো! বড়লোকের মেয়ে, যত্ন আত্মির শরীর।

তা এখন তাহলে এই গরীব শ্বশুর বাড়িতে আসা কেন বাবা? অন্ন বেজার মুখে বলে, গরীবের অন্নে ভাগ বসাতে?

তা বললে কী হবে? উকিল ভাইপো বোধহয় বুঝিয়েছে হকের ধন মদনমোহন।

অন্নর ছেলে মেয়ে দুটো খিদে পেয়েছে, খিদে পেয়েছে করে ঘুরছিলো। সেই সময় রমেশ মাষ্টার ঢুকলেন হাতে এক হাঁড়ি ছানার জিলিপি নিয়ে।

উৎসাহিত গলায় বললেন, তোদের বড় দিদিমা আনালেন তোদের জন্যে। খা।

রাজবালা উঠে বসলেন। বললেন, এসেই হাত করার ফন্দীটি বার করেছেন ভাল। খা ভাই খা, বড় মানুষ বড়দিদিমার দয়ার দান বড় বড় মিষ্টি খা। গরীব দিদিমার কাছে তো বোঁদে রসমুণ্ডির ওপর ওঠে না।

রমেশ মাষ্টার বললেন, ছোট ছেলেপুলের সামনে মনের বিষ ওগরাচ্ছো কেন? দেখইনা মানুষটা কেমন?

অন্ন মা’র হয়ে বলে, কেমন, তা তো ওঁর আসার ব্যবস্থা দেখেই বোঝা গেছে বাবা! একটা চিঠিতে জানান না দিয়ে একেবারে থাকবো বলে চলে আসা—

রমেশ অপ্রতিভ ভাবে বলেন, হয়তো হঠাৎ মন হয়েছে।

এতোকালে মন হলো না, এখন যেই ঠাকুমা মারা গেলেন অমনি মন হলো।

অন্নর যুক্তি অকাট্য।

তবু রমেশের যেন মনে হয়, বাড়িতে একটা মানুষের মত মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে। যেন রমেশ তার কাছে একটা আশ্রয় পাবে। এই বুড়ো বয়েস পর্যন্ত মায়ের আওতায় থেকে অভ্যস্ত রমেশ মাষ্টার কি মাথা তুলে মুক্তির নিশ্বাস না ফেলে আর একটা আওতার আশ্বাস পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসতে চায়।

আপন স্ত্রী পুত্রের কাছে যে নির্ভরতা, সে জিনিস রমেশ কখনো পাননি। শাশুড়ীর তাঁবে পিষে থাকা স্ত্রী চিরদিনই আড়ালে ফুঁসেছে আর রমেশের ভীরুতাকে দায়ী করেছে।

বুড়ো মা আর কার না থাকে?

তা বলে বুড়ো ছেলে তাঁর খোকা হয়ে থাকবে?

অন্ন বললো, তা তিনি কই?

রমেশ বললেন, এই তো আমার সঙ্গে সিংহবাহিনীর মন্দিরে গেলেন। সন্ধ্যে আরতি দেখবেন বলে বসে রইলেন। আমাকে বললেন মিষ্টিটা কিনে নিয়ে ছেলেপুলেদের দিতে। আমি বললাম দশ টাকার মিষ্টি খাবে কে? শুনলেন না। তবু আমি বলেছি, বেশ আজ পাঁচ টাকার নিয়ে যাই, কাল পাঁচ টাকার নিয়ে যাবো।

টাকা ছড়াচ্ছেন!

রাজবালা বলেন, জলে জল বাঁধাবেন।

রমেশ মাষ্টার বিষণ্ণ হন।

প্রথম থেকেই রাজবালা অমন শক্রপক্ষের মত না করলেও পারতো। সত্যি, তাঁরও তো অধিকার আছে। তিনিও তো এবাড়ির বৌ। এতোদিন কিছু নেননি বলে, একবারও কিছু নেবেন না, এমন প্রত্যাশাই বা কেন?

ওনাকে তা’হলে আবার আনতে যেতে হবে। অন্ন বলে।

রমেশ মাষ্টার গম্ভীর গলায় বলেন, ওনাকে না বলে জ্যেঠিমাকে বল অন্ন! সেটাই সভ্যতা। নিজের আচরণ নিজেকেই ছোট করে, বড় করে!…আনতে যেতে উনি বারণ করছিলেন, বললেন, একবার যে রাস্তা দিয়ে এসেছি, সে রাস্তা ভুলবো না, তোমার আর কষ্ট করে আসতে হবে না! তা আমি তো সেই কথা মেনে নিশ্চিন্তি হয়ে বসে থাকতে পারি না। যাবো, আরতির ঘণ্টা বাজাতে শুনলেই যাবো।

ফেরার সময় গল্প করতে করতে আসেন শশীতারা।

আশ্চর্য দেখো ভাই, কখনো আসিনি, বসিনি, তবু মনে হলো যেন কতো কতোবারই ওই চাতালে বসে আরতি দেখেছি। মায়ের মুখও যেন চেনা! আসলে শিশুকালের স্মৃতি পাথরে কেটে বসে। সেই বৌ বেলায় জোড়ে এনে বসিয়ে দিয়েছিলেন, আরতির ঘণ্টা কাঁসর বাজছিল। মনের মধ্যে এখনই যেন সেই ঘণ্টা কাঁসরই বাজছিল।

রমেশ অভিভূত হচ্ছিলেন।

এই ধরনের কথা বড় একটা শুনতে পান না তিনি। বাড়িতে মেয়ে বৌয়ের কথা টথা অন্য ধরণের। কেমন ভোঁতা ভোঁতা সাদা মাঠা।

কিন্তু শশীঠাকরুণের কথায় ভঙ্গীটাও কি হঠাৎ এই বীরনগরে এসে বদলে যাচ্ছে না? তিনিই বা কবে এমন স্বপ্নাচ্ছন্ন গলায় কথা বলেন? তাঁর ভাষাতো মারকাটারি।

একেই বলে আপন জন!

রমেশ মাষ্টার বলেন, এই এতোকাল তুমিই বা কোথায় ছিলে, আর আমিই বা কোথায় ছিলাম। অথচ দেখো, যেই এসে দাঁড়ালে, মনে হলো চিরকালের আপনার লোক।

শশীতারা সকৌতুকে বলেন, সে তুমি ভাল মানুষ বলে। নচেৎ অন্য লোক হলে পত্র পাঠ বিদেয় করে দিতো।

বিদেয় করে দিতো?

দিতো না? ভাগের ভাগীদারকে কোন বুদ্ধিমান আবার আসন পেতে বসায়?

হেসে ওঠেন দু’জনেই।

খোলা গলায়।

পথচলতি দু’একজন তাকিয়ে দেখে। রমেশ মাষ্টার তাদের একজনকে ডেকে বলেন, ওহে রজনী শোনো সুখবর। এই আমার বড়ভাজ এসেছেন। বাড়ির বড়গিন্নী। আমার যে দাদা সেই অল্প বয়সে—

হ্যাঁ জানি, আপনার একজন বৈমাত্র দাদা ছিলেন শুনেছি।

সেই আর কি! ফুলপুরের চাটুয্যেদের মেয়ে। জানো তো? যাঁদের মস্ত নাম ডাক। তা সেখানেই থেকেছেন বরাবর। এখন একবার দেখাশুনা করতে এলেন।

রজনী হেঁট হয়ে প্রণাম করে বললো, তা বেশ বেশ! থাকবেন তো আজ্ঞে।

শশীঠাকরুণ বলেন, দেখি, তোমরা থাকতে দেবে কিনা। বীরনগরের বীর পুরুষদের কি ব্যবস্থা!

সে কি ঠাকুমা। আপনার শ্বশুরের ভিটে। আমরা থাকতে দেবার কে?

রজনী বলে, আচ্ছা মাষ্টার কাকা, কাল যাবো একবার আপনাদের বৌমাকে নিয়ে।

হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয় নিশ্চয়।

পথে এমন অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়।

অনেকেই কৌতূহলাক্রান্ত।

কৌতূহলাক্রান্ত আরো এই জন্যে—

বিনা নোটিশে হঠাৎ এসে পড়া এই বড় গিন্নির সঙ্গে দ্যাওরের এমন সম্প্রীতি হলো কখন? রাস্তায় হাসি গল্প করতে করতে যাবার মতন?

তাহলে মাষ্টারই কি বলে কয়ে আনিয়েছেন? মা বিহনে গিন্নী হতে? পরিবার তো অকর্মার ঢেঁকি। না আছে ব্যবস্থা, না আছে ছিরিছাঁদ।

তাই সম্ভব।

নিজেই চুপি চুপি গিয়ে নিয়ে এসেছেন।

ওদিকে মায়ে ঝিয়ে ছটফট করছে। আরতি থেমে গেছে কখন তার ঠিক নেই। এখনো ফেরবার নামটি নেই কেন? ওই চালাক মেয়েমানুষটি, যার ভাইপো উকিল, ভুলিয়ে ভালিয়ে ঠাকুর বাড়ীতে বসে কিছুতে সই করিয়ে নিচ্ছে না তো?

হঠাৎ সিংহবাহিনী দেখবার জন্যেই বা এতো উতলা কেন? হয়তো সেই ভাইপোটা সেখানে বসে ছিল কাগজ পত্র নিয়ে।

হে ভগবান! হঠাৎ এ কি বিপদ!

ভালমানুষ লোকটাকে ঠকিয়ে মকিয়ে কি লিখিয়ে নেবে কে জানে।

অনেক ভাবনা, আর মায়ে ঝিয়ে অনেক মন্তব্যের পর এক সময় দেখা গেল ঢুকলেন দুজনে।

অন্ন চট করে সরে গেল।

কিন্তু শশীঠাকরুণের চোখকে ফাঁকি দেবে তুচ্ছ ওই অন্নপূর্ণা?

শশীঠাকরুণ নিজস্ব ভঙ্গিতে ডাক দিলেন, জ্যেঠিকে দেখেই সরে গেলে কেন গো মেয়ে? নামও ত জানি না ছাই। দাও দিকি, পা ধোবার একটু জল দাও। একদিনের অতিথি তো নই, থাকতে এসেছি যখন, সামনে না বেরোলে চলবে?

অগত্যাই অন্ন একঘটি জল এনে পায়ের কাছে বসিয়ে দিয়ে একটা প্রণাম করে।

শশীঠাকরুণ ‘থাক থাক রাজার মা হও’ বলে আশীর্বাদ করে ঘটিটা নিয়ে পা ধুতে ধুতে বলেন, যাই বলো ঠাকুরপো, তোমার পরিবার ভাগ্যি তেঁতুল গোলা। নিজেরও শিক্ষা সহবতের অভাব, মেয়েকেও শেখাতে পারেনি। এমন একটু শিক্ষা হয়নি ভাই যে, মেয়েকে বলবে, জ্যেঠির পাটা ধুইয়ে দে। আমার নিজের জন্যে বলছি না মা! মনে কিছু করো না, তোমাদের উচিত শিক্ষার জন্যেই বলছি। তা নাম কি মা?

অন্ন নতমুখে বলে, অন্নপূর্ণা।

আহা এমন রাজরাজেশ্বরী চেহারা, এমন নাম, ভাগ্যি দ্যাখো! ভগবানের কি খেলা! মেয়ে তোমার মতনই হয়েছে মনে হয় কি বল ঠাকুরপো। ছেলেরা কেমন? মায়ের মতন না তোমার মতন?

রমেশ বলেন, ওই মিলিয়ে মিশিয়ে।

শশীঠাকরুণ এবার আসল কথায় আসেন। বলেন, তা মা অন্ন, জ্যেঠি হই, একটা সৎ উপদেশ দিতে পারি, সে অধিকার আছে। রাগ করিস নে। এই বয়স, এই রূপ, আর এমন অভাগা ভাগ্য, বেশী পাড়া বেড়িয়ে বেড়ানো ভাল নয়।

মেয়ের তথ্য শশীঠাকরুণ তখনই জেনে বুঝে গেছেন।

বিধবার পোড়ামুখ দেখাবার ভয়ে ঘরে লুকিয়ে নেই সে, পাড়ায় গিয়েছে সে তাস খেলতে।

শশীতারার এই কঠোর বাণীতে অন্ন তো ছিটকে উঠতে পারতো। অন্ন তো ভেবেই রেখেছিল গ্রাহ্য করবে না। গোড়া থেকেই অবহেলা করবে। কিছু বলতে এলে শুনিয়ে দেবে।

কিন্তু হঠাৎ যেন মূক হয়ে গেল সে।

শশীঠাকরুণের ব্যক্তিত্বের প্রভাব?

রমেশ মাষ্টার মেয়েকে চুপ করে থাকতে দেখে হঠাৎ সাহসে উদ্দীপ্ত হয়ে বলেন, তাই বল তো বড়বৌ! আমিও তো সেই কথা বলি। যাক এবার তুমি এসেছো, আমি নিশ্চিন্ত। এখন থেকে তুমিই দেখবে শুনবে, শাসন করবে, চালাবে। নিশ্বাস ফেলেন রমেশ মাষ্টার।

যেন একটা ক্লান্ত মাঝি তার হাতের হালটা আর এক মাঝির হাতে তুলে দিয়ে নিশ্বাস ফেললো।

শশীঠাকরুণের হাসিটা বড় সুন্দর।

ফুলপুরের সবাই বলে, কে বলবে বয়েস হয়েছে। আড়াল থেকে শুনলে মনে হবে ঝি বৌ হাসছে। প্রাণ খোলা হাসি।

শশীঠাকরুণ সেই হাসিটি হেসে বলেন, বাঃ চমৎকার! তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে ঠাকুরপো, আমি যেন মৌরুসী পাট্টা করে এখানে এসে বসেছি। আসার আগে তো সেখানের গ্রামসুদ্ধু ঝুড়তে লাগলো, কেন যাচ্ছো? কবে আসবে?

রমেশ মাষ্টার কৃতার্থমন্যের গলায় বলেন, দয়া করে যখন একবার পায়ের ধুলো দিয়েছো, সহজে ছাড়ছিনে। তারা তো অনেক কাল ভোগ করেছে বাবা!

যেন শশীঠাকরুণ একটা সম্পত্তি।

রাজবালা জ্বলতে থাকেন, কিন্তু কিছুতেই ফট করে অসভ্যের মতো কিছু একটা বলে উঠতে পারেন না।

শুধু আড়ালে গিয়ে মেয়ের কাছে গজরান, তোর বাপের ভঙ্গিমা দেখছিস? কিরকম আদেখলে হ্যাঙলার মতন করছে। যেন বর্তে গেছে। জানি না বাবা গুণ তুক জানেন কিনা উনি। ওই ঠাকুর মন্দিরে নিয়ে গিয়ে এতোক্ষণ দেরী করায় আমার রীতিমত সন্দেহ হচ্ছে।

তা রাজবালার সন্দেহকে উড়িয়েও দেওয়া যায় না।

রমেশ মাষ্টার নামের মানুষটাকে কে যেন হঠাৎ বশীকরণ মন্ত্রেই অভিভূত করে ফেলেছে।

রমেশ মাষ্টারের আর সেই রুক্ষ শুকনো মেজাজ নেই। রমেশ মাষ্টার ইস্কুল থেকে ফিরে বিছানায় শুয়ে কড়িকাঠ দেখার পরিবর্তে সারা সন্ধ্যে দস্তুর মতো হাসি গল্প করেন।

আবার এমনি মজা, এই আড্ডায় আস্তে আস্তে দু’চারজন লোকও জুটছে।

তারা বলে, সত্যি, বাঁড়ুয্যে বাড়ির বড়গিন্নী একখানা মানুষের মতন মানুষ বটে।

কিন্তু তাদের গিন্নীরা সে কথা বলে না। গিন্নীরা সকলেই প্রায় রাজবালার দুদলে।

কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে মানুষটাকে যেন গ্রাস করে নিয়েছে। না হয় বয়েস হয়েছে, তবু আছে কিছু মোহিনী মায়া। নচেৎ অতো বশ হয় লোকটা?

অথচ মতলব বোঝা যাচ্ছে না।

কী যে করতে চায় কে জানে।

ভাগ ভেন্নর কথা তো মুখেও আনছে না।

কেবল পাড়ার খবর নেওয়া, দেশের খবর নেওয়া। আর চাষীবাসীদের দুঃখ ধান্ধার বার্তা শোনা।

রাজবালা তো আড়ালই পায় না যে, স্বামীকে গঞ্জনা দেবে।

সকাল থেকেই ‘বড়বৌ বড়বৌ’।

বড়বৌ, আজ কি রাঁধছো, বড়বৌ, আজ লক্ষ্মীকান্তর মন্দিরে যাবে তো বল, সকাল সকাল ইস্কুল থেকে চলে আসবো।…বড়বৌ, নাতি দুটোকে একটু শাসন কোরো, লেখা পড়ায় মোটে মন নেই।

আর বড়বৌ বলেন, কী রাঁধবো? তুমি কী খাবে তাই বল? নিরামিষ ঘরের তরকারি তুমি ভালোবাসো এতো আমার হাতের ভাগ্যি গো! তবু শ্বশুরের বংশের একজনকেও হাতের রান্না খাওয়াতে পেলাম দু’দিন।

আবার বলেন, আজ আর মন্দিরে যাবো না ভাই, পূর্ণিমের দিন বরং সকালের দিকে উপোস করে যাবো। তোমার ছুটি পড়ছে।

আবার বলেন, নাতিদের শাসন করতে আছে? তাহলে ঠ্যাঙা নিয়ে তেড়ে আসবে না? হবে হবে, মাষ্টার দাদামশাইয়ের নাতি কি আর মুখ্যু হবে? ভয় নেই, সৎ আছে।

কেমন সাবলীল কথা।

রাজবালা শোনে আর রাগে তার গা জ্বলে যায়।

শশীঠাকরুণ যখন পূজোয় বসেন, সেইটুকুই অবকাশ, তা সে সময়টা তো রমেশ মাষ্টার নিজের নাওয়া টাওয়া, ইস্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই থাকেন। আর খাওয়ার সময় শশীঠাকরুণ এসে সামনে বসেন এবং সোহাগের বন্যা বইয়ে ‘আরো খাও! ওকি খাওয়া হলো? ওই খাওয়ায় কি শরীর টেকে?’ এই সব করতে থাকেন।

তা আজ ওই পূজোর অবকাশটায় গিয়ে স্বামীকে চেপে ধরে রাজবালা, বলি তোমার হলোটা কী? মানুষটা কী তোমায় গুণ তুক করলো?

রমেশ মাষ্টার ওই কুটিল মুখটার দিকে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলেন, করেছে! হলো?

দেখো, ওসব অগ্রাহ্যর কথা চলবে না। সব সময় কিসের তোমাদের এতো পরামর্শ তাই আমি জানতে চাই, কেবল ফুসফুস গুজ গুজ। আমায় দেখলেই চুপ হয়ে যাওয়া, এর মানে?

রমেশ মাষ্টার কৌটোতে নস্যি ভরতে ভরতে বলেন, মানে এই—তোমার কানে একটা কথা উঠলে পাড়াসুদ্ধ লোক জেনে যাবে।

তা লোককে না জানিয়ে কী করা হচ্ছে সেটাই জানতে চাই।

হলে দেখতে পাবে।

আমি কিন্তু পাড়ায় পাড়ায় রটিয়ে আসবো ওই উনি এসে গুণ তুক করে চুপি চুপি তোমার কাছ থেকে বিষয় সম্পত্তি সব লিখিয়ে নিচ্ছেন।

রটিয়ে এসো। বলে রমেশ গট গটিয়ে রান্নাঘরের দাওয়ায় এসে আসনে বসে বলেন, ভাতটা দেবে? না ঝগড়া করবে?

আশ্চর্য, রমেশ মাষ্টারের বসার ভঙ্গীও যেন বদলে গেছে। মেয়ে এসে ঘাড়ে পড়া পর্যন্ত তো তুঁষ হয়ে গিয়েছিল। নইলে নয় ছাড়া কথাই বলতো না। তাও ক্লান্ত ভাবে। এখন যেন টগবগ করে।

আর ওই পরামর্শ।

কান পেতেও বোঝা যায় না। কী যে বলাবলি করে?

তা ছাড়া দুজনে এক সঙ্গে পথে বেরোনোও তো আছে। ঠাকুর দেবতাটা ছুতো, ওই হাসি গল্প পরামর্শই আসল। যেন দুটো বয়েস কালের দ্যাওর ভাজ। তা বয়েস কালের হলে তো অন্য মানে খুঁজে পাওয়া যেতো। এটা কী?

রাজবালার সন্দেহটা একেবারে অমূলক বলা যায় না।

জীবনের সমস্ত বয়েস পার করে আসা এই দুটো বুড়োবুড়ি দিব্যি এক ছেলেমানুষী খেলায় মেতেছে। সেই তামাদি হয়ে যাওয়া কালে প্রায় সমবয়সী দুটো বালক বালিকা বড়দের চোখ ছাড়িয়ে ছাতের কোণে ইঁটের খেলাঘর পেতে কাঁঠাল পাতার লুচি ভেজে খেয়ে যে আহ্লাদ অনুভব করতে পারতো, এখন যেন সেই আহ্লাদটাই অনুভব করছে ওরা। যেন কোথাও একটা খেলাঘরই পেতেছে এই সব বড়দের চোখ এড়িয়ে।

তাই সব পরামর্শ চুপিচাপি।

বৌ মেয়ে এলেই অন্য কথা।

অন্ন এদিক ওদিক কান পেতে বাবার গলা সদ্য শুনতে পেলো, ‘নগদ তো দেবে, কিন্তু অতোগুলো টাকা নিয়ে তুমি একা আসবে?’

কিন্তু যেই অন্ন ঘরে ঢুকলো, অন্নর বাবা বলে উঠলো, তাহলে ওই কথাই থাকলো বড়বৌ! সামনের অমাবস্যায় তুমি মা সিংহবাহিনীর ভোগ চড়াবে। কি ভোগ দিতে চাও? ময়দা না খিচুড়ী ভোগ?

শশীঠাকরুণ বলেন, নামটা করছো কেন বাপু, চালে ডালে বলতে হয়।

আবার অন্ন সরে গেলেই শশীতারা গলা নামিয়ে বলেন, তখন যেন কাক পক্ষীতেও জানতে না পারে। ভাঙচি দেওয়ার লোকের অভাব নেই দেশে। আসল কাজটা হয়ে যাক আগে, তারপর ঢাক পিটিও। পিটোতে তো হবেই। ছাত পিটান মানেই ঢাক পিটোনো।

আসল কাজটা আর কিছুই নয়, বিঘে দশেক জমি বেচা। স্টেশনের ধারে যে গরু চরার মাঠটা রয়েছে ওটা যে রমেশদের, তা এতদিন অনেকেই জানত না। কিন্তু শশীঠাকরুণ যে কেমন করে এই কদিনেই সব জেনে ফেলেছেন কে জানে?

জেনে ফেলেই ধরে বসলেন।

আর শশীঠাকরুণের ধরা এবং কাঁকড়া বিছের ধরায় তো বিশেষ প্রভেদ নেই। ধরেছেন যখন, না করে ছাড়বেন না।

চব্বিশ বিঘে জমি তোমাদের, আর তোমাদের এই হাড়ির হাল?

শশীঠাকরুণ বলেছেন, এ হাল ঘোচাতে হবে। মা লক্ষ্মীকে পুঁতে রেখে কোনো লাভ নেই, খেলাতে হয় তাঁকে। হাটে বাজারে নিয়ে গিয়ে খেলাতে হয়।

রমেশ মাষ্টারের বুকে এতো বল ছিল না যে, ওই রকম দুরূহ একটা কাজে হাত দেবেন। রমেশ মাষ্টার ওই চব্বিশ বিঘে জমিই বুকে নিয়েই মরতেন, ওর খানিকটা বেচে দিয়ে হাড়ির হাল ঘোচানো যায়, তা ভাবতেই পারতেন না।

রাজবালা?

তাঁর কোনো বুদ্ধির বালাই—ই নেই।

স্বামীকে সুপরামর্শ দিয়ে, সাহস দিয়ে, দশের একজন হবার যোগ্যতা অর্জন করবার শক্তি এনে দেবেন এমন মহিলা নন তিনি! সব কিছুতেই তার সন্দেহ। রমেশ কিছু করতে গেলেই রাজবালা বলেন, ডুববে! এইবার ডুববে তুমি!

কিন্তু শশীঠাকরুণের প্রাবল্য রমেশ মাষ্টারকে সাহস এনে দেয়, শক্তি এনে দেয়।

লুকিয়ে লুকিয়ে খদ্দের ঠিক করে ফেলেন রমেশ।

শশীতারা বলেছেন, আমার তো কিছু ভাগ ছিল ভাই, তা সেইটাই ধর বেচছি। আপোসে ভাগ করে নিয়ে এমন করা যায়। ফুলপুরে যতো ভাগ ভেন্নর পরামর্শদাতা তো ছিলাম এই আমি। বিনা মামলায় কাজ মেটাতাম। আমি তোমায় লেখাপড়া করে দেবো—আমার আর কোনো দাবি দাওয়া রইল না। এই দশ বিঘা জমির মূল্য বাবদ দশহাজার টাকা আমার শ্বশুরের ভিটে সংস্কারের কাজে লাগানো হবে। আর এইজন্যই আসা আমার এতোদিন পরে।

রমেশ মাষ্টার বলেছিলেন, কিন্তু বড়বৌ, তোমার সবটা দিয়ে বাড়ি সারাবে, তুমি কি এখানে বাস করতে আসবে?

শশীতারা হেসে বলেছেন, তা কী বলা যায়? বলে মানুষের মন না মতি। তা বাস করতে চাইলে তুমি থাকতে দেবে না?

কী বলছো বড়বৌ! তুমি এসেছো, যেন মাথার ওপর ছাতা পেয়েছি। যেন পর্বতের আড়াল পেয়েছি।

কিন্তু তোমার বৌ রেগে রেগে মরছে।

ওর কথা বাদ দাও। ওই স্বভাব ওর। মায়ের কাছে একটু বেশীক্ষণ বসলে রেগে মরতো। বলতো, চিরটা কাল খোকা হয়েই থাকলে! সংসারে যেন কাজের কথা নেই।

তা কাজের কথায় মধ্যে তো ছেলেদের আচরণের নিন্দে, আর বৌদের গালাগালি দেওয়া। ও আমার ভাল লাগে না। এই যে তোমার সঙ্গে গল্প করি, কতো আলাত পালাত গল্প, তবু যেন প্রাণে শান্তি আসে।

তবে পৃথিবী কি চায় কারো প্রাণে শান্তি আসুক? চায় না! পৃথিবী সেই শান্তিটা ভঙ্গ করবার জন্যে তোড়জোড় করে।

কিন্তু আপাতত ঝুনো শশীতারা আর পাগলা রমেশ মাষ্টার একই জগতে আছেন। নিজেদের গড়া একটা স্বপ্নের জগতে।

শশীতারা বলেন, বাড়ির চেহারাটা ঠায় ঠিকই থাক বুঝলে ঠাকুরপো, বদলে কাজ নেই। কর্তারা যেমন গড়েছেন, তেমনি থাকুক। শুধু বালির চাপড়া খসিয়ে ভাল করে বালি কাজ ধরাও। জানলা দরজাগুলো অবিশ্যি বদল টদল করতে হবে, কাঠ একেবারে খেয়ে গেছে। আচ্ছা বাড়ির রংটা কেমন হবে?

রমেশ বলেন, সে কথার আমি কি জানি? তোমার যা পছন্দ।

না না, সেটা ঠিক নয়। বৌ মেয়ের সঙ্গে একবার পরামর্শ করে রায় দাও।

ওরা আবার পরামর্শ দেবে। হুঁঃ!

তা হোক। আমার ভাইপোদেরও আমি বলি, তোরা কোনো কাজে হ্যাঁ বলে বসবার আগে, একবার পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিস বাপু! শেষকালে বৌ যেন না বলতে পারে আমায় একবার জানালোও না।

রমেশের কাছে শশীঠাকরুণের এই ভাইপোদের গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। রমেশের সঙ্গে রমেশের মা ব্যতীত আর কোন মেয়েমানুষ কখনো এমন কাছে বসে গল্প করেনি।

তা মায়ের গল্পের মধ্যে তো অন্য কোন জগৎ ছিল না, মায়ের জগৎ রমেশেরই জানা জগৎ। হাড় হদ্দ জেনে যাওয়া পচা জগৎ। শশীতারা রমেশের সামনে অন্য এক জগতের দরজা খুলে ধরেন। রমেশ মন দিয়ে শোনেন আর বুদ্ধি দিয়ে বোঝেন, সেখানে সেই বড় মানুষদের ঘরে শশীতারার কতো প্রতিপত্তি! শুধু ভাইপোদের ঘরেই নয়, সারা ফুলপুর গ্রামটাতেই কতো প্রতিপত্তি শশীতারার বুঝতে পারেন রমেশ মাষ্টার।

সেই মানুষ এইখানে এইভাবে পড়ে আছেন।

রমেশ মাষ্টার বিগলিত হবেন না? রমেশ মাষ্টার কৃতকৃতার্থ হবেন না?

শুধুই কি পড়ে থাকা?

রমেশের হিতের জন্যেই পড়ে থাকা।

রমেশের এমন শুভানুধ্যায়িণী আর কে আছে?

জমি বেচা হচ্ছে, এ খবর চাপা থাকে না। যতোই চুপিচুপি হোক প্রকাশ হয়েই পড়ে।

রাজবালা বোঝেন বানের জল ঘরের উঠোনে এসে গেছে। রাজবালা বোঝেন আগুন ঘরের মটকায় লেগেছে। সর্বনাশের আর বাকি নেই কিছু।

রাজবালা আর থাকতে পারেন না, অন্নকে দিয়ে ছেলেদের চিঠি লেখান। তা এসে যায়, বড় ছেলে এসেও যায়। ব্যাপারটা তো যা তা নয়।

তখন রমেশও নেই শশীতারাও নেই, ওঁরা গেছেন কেষ্টনগরে। বীরনগর বাদকুল্লার লোকের তো কোটকাছারী করতে ওই কেষ্টনগর ছাড়া গতি নেই।

বড় ছেলে জীবেশ গুম হয়ে বসে থেকে বলে, তোমার স্থির বিশ্বাস ওই সব তুকটুক করেছে?

তা ছাড়া? তা নইলে এইসব ঘটনা সম্ভব? যে জমি তোদের ঠাকুর্দার বাপের আমল থেকে পড়ে আছে, কেউ একদিনের জন্যে তাতে নোখ ডোবাবার কথা ভাবেনি, সেই জমি উনি এলেন আর বেচলেন? আমিও তো বরাবর শুনেছি, ওটা গোচারণ ভূমি। ওটা কর্তারা পুণ্যির জমি বলে ছেড়ে রেখেছিলেন। সেকালে এসব করত। জলাশয় করে দেওয়া, গোচারণের মাঠ ছেড়ে রেখে দেওয়া। তা বাপ—ঠাকুর্দার স্বর্গবাসের সেই টিকিটখানি তুমি বংশধর হয়ে ছিঁড়ে ফেলছ?

জীবেশ অবশ্য মায়ের এ যুক্তি মানে না।

জমিটা বেচা হচ্ছে এটা মন্দ নয়। এ সুমতি যে হয়েছে এতোদিনে রমেশ মাষ্টারের এটা ভাল।

কিন্তু জমি বেচা টাকাটা অন্য একজন এসে নিয়ে যাবে, এটা তো সহ্যের বস্তু নয়!

জীবেশ বলল, আচ্ছা আসুন ফিরে দেখছি, আমি। একটা অশিক্ষিত বুড়ি মেয়েমানুষ তাকে এতো ভয়!

আহা বেচারী জীবেশ!

মানুষ যে না বুঝে কতো প্রতিজ্ঞাই করে বসে।

জীবেশ তো জিভ শানিয়ে বসেছিল।

কিন্তু হলোটা কী?

হলো এই, ষ্টেশনের পথ থেকে সাইকেল রিকশয় আসতে আসতেই জীবেশের আসার খবরটা পাওয়া হয়ে গেল। রিক্সওলাই দিল। বললো, এই তো তিনটের গাড়িতে বড়দাদা বাবু এলো কলকাতা থেকে।

অতএব শশীঠাকরুণ বাড়িতে পা দিয়েই ডাক পাড়লেন, কই গো নবাবের জামাই, দেখি একবার মূর্তিখানা। এতোদিন এসেছি ছেলেদের দেখে চক্ষু সার্থক তো হয়নি। বলি শনিবারে একবার বাড়ি আসতে হয় না?

রমেশ মাষ্টারের এখন পৃষ্টবল রয়েছে তাই তিনি বলে ওঠেন, বাড়িকে বাড়ি ভাবলে তো।

শশীঠাকরুণ সর্বদাই ন্যায়ের পক্ষে, তাই তৎক্ষণাৎ বলে ওঠেন, তা দোষও দিতে পারিনে বাপু ছেলেদের। বাড়ির যা ছিরিছাঁদ আর যা অসুবিধে, এতে কি আর আসতে মন যায়? কলকাতার সুখ সুবিধে আরাম আয়েস রপ্ত হয়ে গেছে। এরপর আসে কিনা দেখো। আকর্ষণ হতেই হবে।

কার পর? জীবেশ জানে না সে কথা।

জীবেশ যা কিছু বলবে বলে ভেবে রেখেছিল, সবই কেমন গুবলেট হয়ে গেল। এই অভিজাত চেহারার দীর্ঘাঙ্গী মহিলাটির দিকে তাকিয়ে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল।

শশীঠাকরুণ কোর্ট কাছারি করতে গিয়েছিলেন। তাই পরণে পাট ভাঙা গরদের থান, গায়ে গরদের চাদর জড়ানো, কাটাছাঁটা মুখের রেখায় একটি দৃপ্ত এবং বিশ্বনস্যাৎ ভাব।

এই মুখের সামনে চট করে কিছু বলা যায় না। যা করা যায় শুধু তাই করলো সে। হেঁট হয়ে একটা প্রণাম করে গুজ গুজ করে বললো, সময় টময় হয় না।

শশীঠাকরুণ বললেন, তা অবিশ্যি। গরমেণ্টের ঘরে মোটা মাইনের চাকরী করছো, বৌ ছেলে আছে, সময়ের অভাব। তবে এটুকু না বলে পারছি না বাবা, মানুষ হওয়ার মূল্যটা কী, যদি না দেশে ঘরে দেশের একজন হয়ে বংশ পরিচয় দিতে পারলে! সেখানে তুমি যতই রাজার হালে থাকো, তোমার জ্ঞাতি গোত্তর তো দেখতে যাচ্ছে না? আর শহর বাজারে রাজার ওপর বাদশা আছে। তোমার মতন রাজা গড়াগড়ি যাচ্ছে। অথচ দেশে গাঁয়ে তুমি বনগাঁয় শেয়াল রাজা। তা ছাড়া বাপ ঠাকুর্দার ভিটেখানা যে হুড়মুড়িয়ে তোমার বাপের মাথার ওপর এসে পড়ছে, ওটাও তো দেখবে?

একসঙ্গে এতোগুলি কথা বলে শশীঠাকরুণ দ্বিতীয় হাঁক পাড়েন, অন্ন, ঘর থেকে একটা বাসন আন, খাবারটা ধর। দাদাকে দে, ছেলেপুলেকে দে। কেষ্টনগরের সরপুরিয়া। অবিশ্যি এখন আর সে রামও নেই সে অযোধ্যাও নেই। শুধু নামটুকু আছে। তা ওই নামটুকু খা।

একখানা রিকশয় দ্যাওর ভাজের ঠাসাঠাসি করে আসা দেখে রাজবালার সর্বাঙ্গ জ্বলছিল, আরো জ্বলে গেল ছেলের চুপ করে থাকা দেখে। অথচ এই একটু আগেও বলছিল, বাবা তাঁর ভক্তি সৌজন্য নিয়ে থাকুন, আমি কটাকট শুনিয়ে দেব। সোজা বলবো, জমি বেচতে গেলেন আপনি কোন অধিকারে? আগে ভাগের মামলা করে বিষয় নিজের করে নিন, তারপরে যা হয় হবে। বাবাকে ভাল মানুষ পেয়েছেন, কিন্তু আমরা ভাল মানুষ নই।

তা হতভাগা ছেলে এতো কথার একটা বললো না। দিব্যি সরপুরিয়া খেতে বসলো? ওই সর্বনেশে মেয়ে মানুষের চোখের দৃষ্টিতেই তুক আছে।

রাজবালার আর সহ্য হয় না। রাজবালা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলেন, কইরে জীবু, কী যেন বলবি বলছিলি?

জীবেশ অপ্রতিভ ভাবে বলে, হবে হবে। আজই তো চলে যাচ্ছি না।

কবে আর হবে? আজ না হোক, তুমি তো কাল সকালেই লম্বা দেবে বাবা! যা বলবার জন্যে কলকাতা থেকে ধাওয়া করে এলে—

জীবেশ বোঝে, সত্যিই তার কর্তব্য কর্মে ত্রুটি হয়ে যাচ্ছে। অতএব বাপের দিকে তাকিয়ে বলে বসে, হ্যাঁ বলবার জন্যেই যখন আসতে হয়েছে, বলতেই হবে বাবা! কথাটা হচ্ছে—শুনলাম নাকি ষ্টেশনের ধারে জমি বেচা হচ্ছে।

হচ্ছে কী, হয়ে গেছে তো! এই তো, সেই সব করে কর্ম্মেই তো কেষ্টনগর থেকে এলাম। বললেন শশীতারা অগ্রাহ্য ভরে।

ওঃ। কিন্তু বাবাকেই বলি, আমাদের সঙ্গে একবার পরামর্শ করবারও দরকার বিবেচনা করলে না?

রমেশ সভয়ে একবার ছেলের ও একবার শশীতারার মুখের দিকে তাকান।

শশীতারার আর অবস্থাটা বুঝতে বাকি থাকে না। শশীতারা হাল ধরেন। বেশ মাজা চড়া গলায় বলেন, পরামর্শর উপযুক্ত বেটা হলে অবিশ্যিই করতো। তবে কি না তা যখন নয়, তখন আর তোমার মুখে কথাটা শোভা পেলো না বাবা! যে ছেলে বছরে একদিন মা বাপকে দেখতে আসবার সময় পায় না, তার যে আবার বিষয় আশয় নিয়ে পরামর্শ করবার সময় হবে, বাপ তা জানবে কেমন করে, তা হল? আর জমি যা বেচা হয়েছে, তা আমার। বোধহয় এটুকু জানো, আমি এবাড়ির বৌ। আমার অবিশ্যিই দাবি দাওয়া কিছু আছে? চব্বিশ বিঘে জমির ভাগ অবিশ্যিই আমার প্রাপ্য হতে পারে। পারে কি না? সেইটুকুই আমার ইচ্ছে, মত করেছি। ইচ্ছে হয় ক্ষ্যামতায় কুলোয়—নালিশ ঠুকে দাও গে বাপ জ্যেঠির নামে।

সমস্ত পরিবেশটার ওপর এই হাতুড়িটি বসিয়ে আর সমস্ত আলোচনার ওপর যবনিকা পাত করে দিয়ে চান করতে পুকুরে চলে যান শশীতারা।

রাজবালা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েন, জীবেশও উঠে পাশের ঘরে চলে যায়, অন্ন আর দুখানা সরপুরিয়া নিয়ে চুপিচুপি ছেলেদের ডাকতে যায়। শূন্য দালানটায় বসে থাকেন রমেশ। কিন্তু আশ্চর্য রমেশের কোন ভয় করছে না। আগে হলে তো ছেলেকে দেখেই ভয় করত।

কদিন পরে শশীঠাকরুণের উকিল ভাইপোকে দেখা গেল বীরনগরের বাঁড়ুয্যেদের দালানে।

জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে উঠোনের ওপাশে, সদরে বেরোবার একধারে টিউবওয়েল বসানোর কাজ চলছে, মিস্ত্রীদের কণ্ঠে একটা উদ্দাম অবোধ্য শব্দ যেন গানের মতো তালে তালে ধ্বনিত হচ্ছে।

সেই দিকে তাকিয়ে মুখ কালো করে ভাইপো বলল, এইটাই যদি তোমার মনের মতলব ছিল পিসি, তো আমায় অমন নাচালে কেন?

শশীতারা তাচ্ছিল্যের গলায় বললেন, নাচাতে আমি যাইনি অজা, তুই নিজেই নেচেছিলি। তুই তোড়জোড় করলি, তাই ভাবলাম, দেখি তো বলছে যখন তবে যাই একবার। দাবি দাওয়া তো আছে একটা, উড়িয়ে দিতে পারবে না। এই যে চারকাল ধরে মাসে দুটো একাদশী করে মরছি, ন্যাড়াহাত নাড়া দিয়ে বেড়াচ্ছি, সমাজে যমের অরুচি হয়ে বসে আছি, এ কিসের জন্যে? ওই সম্পর্কটুকুর জন্যেই তো? তা সেই ভেবেই আসা। এসে দেখছি শ্বশুরের ভিটেখানা যেন ক্ষয়কাশের রুগীর মতন মরণের দিন গুনছে বসে বসে, তার মুখে এক ফোঁটা ওষুধ পড়েনি কখনো। তা চোখে দেখে তো আর মুমূর্ষু রুগীটাকে ফেলে রেখে চলে যাওয়া যায় না? ডাক্তার বদ্যি ডেকে এনে দুফোঁটা ওষুধ দিতে হয়। তবু তো গাঁটের কড়ি খরচা করে নয়। সেই যে বলে না, তোর ধন তোকে খাওলাম শ্বশুরের জমি বেচেই শ্বশুরের বাড়ী মেরামত!

অজিত প্রায় ক্ষেপে উঠে বলে, চুণ বালির পাহাড় এসে পড়েছে তো দেখে এলাম, টিউবওয়েলও বসছে দেখতে পাচ্ছি, জমির দরুণ দশ বারো হাজার টাকা তাহলে এদের ভাঙাবাড়ির গহ্বরেই ঢালছ।

শশীতারা এবার গম্ভীর হন। গম্ভীর গম্ভীর গলায় বলেন, এদের বাড়ি বলছিস কেন রে অজা? আমার শ্বশুরের ভিটে নয়? ভাঙা বাড়িটা এদের, আর ডাঙা জমিটা আমার, এমন হিসেব তো ন্যায্য নয়।

অজিত গুম হয়ে গিয়ে বলে, ঠিক আছে, তোমার জিনিস তুমি বুঝবে। তবে ইনিই বা ভিটে বাড়িকে এমন মুমূর্ষু করে তুলেছেন কেন? বাপের জমি বেচেই বাপের ভিটে সারাতে পারেননি?

শশীতারা অবহেলায় বলেন, পারবে কোথা থেকে? এতোদিন যে কুইন ভিক্টোরিয়ার আমল ছিলো। তাঁর ইচ্ছেয় কর্ম। ও বেচারী নোখ ডোবাতে পেরেছে এযাবৎ? তিনি বোধহয় ভেবেছিলেন, জমিগুলো সঙ্গে নিয়ে সগগে যেতে পারবেন। আর এ হতভাগার দেখছো তো? ছেলেদুটো স্বার্থপর, মেয়েটা গলায় পড়া। স্বাস্থ্য শরীরও ভাল নয়। যা করবার আমাকেই করতে হবে।

তবে আর বলবার কি আছে? দাদা বলে দিয়েছিল পরীর বিয়ের কথাটা এগোচ্ছে, তুমি না গেলে তো পাকাপাকি কিছু হতে পারে না। যাবে তো? না কি?

শশীঠাকরুণ ঈষৎ চঞ্চল ভাবে বলেন, আহা যাবো না বলেছি। তবে এদিকে মস্ত একটা দায়িত্বের কাজ ফেঁদে বসে আছি, একটু না সামলে তো যেতে পারিনে। তোর বাপ কাকা মা খুড়ি, সবাই রয়েছিস, ক’ পাকা কথা। পিসি কি চিরকালের?

অজি চলে গেল।

রাজবালা কপালে করাঘাত করে পাড়ায় বলতে বেরোলো, ভাইপো নিতে এসেছিল, সাধ্য সাধনা করলো, ইনি গেলেন না। দ্যাওরের সর্বস্ব খেয়ে তবে যাবেন।

জমি বেচার কথা সকলেই জেনে গেছে, আর রমেশ মাষ্টারের নির্বুদ্ধিতাকে ছি ছি করছে। এই বয়সে মেয়েমানুষের মোহিনী মায়ায় পড়লো! কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে আজ্ঞাবাহী চাকরের মতো ওঠ বোস করাচ্ছে তোমায় ওই সর্বনেশে মেয়েমানুষটি! স্ত্রী পুত্র পরিবার কারুর কথায় কান নেই, ওনার চরণে পুষ্প অর্ঘ? ছ্যা ছ্যা!

তা ওদের কথা একেবারে মিথ্যেও নয়। সত্যিই কারো কথার কান নেই রমেশের। শশীতারা সে কানে মন্তর ঝেড়ে চলেছেন, টিপকল বসিয়েছো বলেই যে কুয়োটা ফেলে দিতে হবে, সেটা কোনো কাজের কথা নয়। ওটাও সংস্কার করিয়ে ফেলতে হবে। তা ছাড়া কলের জলও আনতে হবে ভবিষ্যতে। রাস্তায় যখন এসেছে।…ও তোমার এই টানেই ইলেকট্রিক লাইটটা এনে ফেলা! ভালো ঠাকুরপো! টাকায় না কুলোয় আমি আছি।…এই বাড়ি যখন আগাগোড়া রং হবে, আর সেবাড়ি লাইটের আলোয় ভাসবে, কেমন শোভাটি হবে ভাব? আমি তো চোখ বুঝলেই দেখতে পাই।…

রমেশও বুঝি ক্রমশঃ এই স্বপ্নলোকের বাসিন্দা হয়ে পড়েছেন। তিনিও বলেন, তুমি হুকুম করে চলো, আমি সব করে তুলবো। কী বলবো বড়বৌ, তোমার সাহসে আমার যেন শরীরে মনে একশো হাতীর বল এসেছে। জানলা দরজার যে পাল্লাগুলো খেয়ে গেছে, তার মাপ দিয়ে অর্ডার দিয়ে এলাম। বলেছি, নাঃ ওই কেটে কুটে তালি দিয়ে আবার দাঁড় করিয়ে দেওয়া নয়, একেবারে নতুনই হোক।…আবার বলেন, বিলিতি মাটির ব্যবস্থা হয়ে গেল বড়বৌ। ব্ল্যাকে ছাড়া তো এ অঞ্চলে ওসব জিনিস মেলা শক্ত, তবু আমায় একজন ন্যায্য দামে সাপ্লাই করবে বলেছে। আমারই ছাত্তর ছিল এক সময়ে। বড় ভালো ছেলে।

তারপর দুজনে মিলে বসে নতুন নতুন পরিকল্পনায় বিভোর থাকেন।

উঠোনটার খোয়া খাপরা ভাঙাচোরা সব উপড়ে ফেলে নতুন বিলিতি মাটির মেঝে করতে হবে। লাল টুকটুকে। তার ধারে সবুজ বর্ডার। আর ঠিক মাঝখানটায় যেখানে বিয়ে টিয়ের ‘বৌ’ ছত্র আলপনা আঁকা হয়, ছাঁদনাতলা বানানো হয়, সেখানে বিরাট করে শিঙ্খলতা প্যাটার্নের আলপনার মতো ছবি আঁকানো হবে। ভবিষ্যতে আর আলপনার জন্যে ভাবতে হবে না—বলেন শশীঠাকরুণ নতুন বৌ এসে দাঁড়াবে একেবারে পাকা আলপনার ওপর।

রান্নাঘরের দেওয়ালে দুটো দেওয়াল—আলমারী করাতে হবে বুঝলে ঠাকুরপো, রাঁধুনীকে তাহলে চোদ্দবার ভাঁড়ারের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে না। আট দশ দিনের মতো জিনিস নিয়ে গিয়ে রেখে দিলেই হবে। ফুলপুরের এই রকমটা করিয়ে দিয়েছিলাম সেবার। বৌরা দু’বেলা ধন্যবাদ দেয়।

রমেশ মৃদু হেসে গলা নামিয়ে বলে, এখানে সেটি পাবে না। শত সুবিধে পেলেও ধন্যবাদ দেবে না।

তা জানি! শশীঠাকরুণও মুখ টিপে হাসেন, ওর হয়েছে বুড়ো বয়সে ধেড়ে রোগ।

হ্যাঁ বোঝেন বৈকি শশীঠাকরুণ, রাজবালার চিরকালের অন্যমনস্ক, সংসারের ব্যাপারে উদাসীন, অলস চিত্ত স্বামীর হঠাৎ কর্মোৎসাহ দেখে রাজবালা সুখী হওয়া তো দূরে থাক, জ্বলে মরছে, তা বুঝতে বাকি নেই শশীঠাকরুণের। তবে ওসব তিনি গ্রাহ্য করেন না। তাঁর মতে কুকুরের কামড় হাঁটুর নীচে।

তিনি বলেন, যখন দেয়ালে হাত টিপে আলো জ্বালাতে পাবে তোমার বৌ, আর ঘেরা নাইবার ঘরে কল টিপে জল বার করতে পাবে, তখন মনে মনে শশীবামনীকে পেন্নাম করবে।…তুমি লেখা লিখিটার তোড়জোড় করো।

মিস্ত্রী খাটানোর নেশা, একটি বড় নেশা। মানুষ বিশেষে মদের নেশার মতই তীব্র। শশীঠাকরুণ চিরদিন এই নেশার বশ! ফুলপুরে শুধু চাটুয্যে বাড়িতেই নয়, যাদের যখন বাড়িতে মিস্ত্রী লাগে, শশীঠাকরুণ দাঁড়িয়ে তত্ত্বাবধান করেন। তারাও বাঁচে, বলে, দিদি ঠাকরুণ এসে দাঁড়িয়েছেন। পিসিমা এসে দাঁড়িয়েছেন। যাক নিশ্চিন্ত। আর ব্যাটারা এক মিনিট ফাঁকি দিতে পারবে না।

সময়ের ফাঁকি এবং কাজের উৎকর্ষে ফাঁকি, কোনোটাই শশীঠাকরুণের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না।

সেই চির অভ্যস্ত কাজের নেশায় আর এক নতুন মাদকতার যোগ হয়েছে।

এইটাতে শশীঠাকরুণ যেন ‘আমার’ শব্দটায় স্বাদ পাচ্ছেন। এ স্বাদ তো কই ফুলপুরের চাটুয্যেদের কাজে কখনো পাননি শশীঠাকরুণ?

এই জন্যেই বুঝি বলে, মেয়ে সন্তান পরভূমির মাটিতে গড়া। তারা জন্মপর।

তা নইলে বাহাত্তর বছর বয়স পর্যন্ত ফুলপুরের চাটুয্যে বাড়িতে সাম্রাজ্ঞীর আসনে বসে কাটিয়ে এসেও আজ বীরনগরের ভবেশ বাঁড়ুয্যের ভাঙা ভিটেয় এসে শশীঠাকরুণ ‘আমার’ শব্দটার স্বাদ উপলব্ধি করছেন? আর সেই উপলব্ধির মধ্যে একটা উত্তেজনাময় মাদকতার স্বাদ পাচ্ছেন।

কথাটা শুনে ফুলপুরের সবাই গালে হাত দিল।

পরীর বিয়ের দিনস্থির হলে, তবে নাকি দিন চার পাঁচের জন্য আসতে পারবেন শশীঠাকরুণ।

মানুষ বদলে টদলে যায় ঠিকই, আঙুল ফুলে কলাগাছ হলে বদলায়, অভাবে স্বভাব নষ্ট হলে বদলায়, কিন্তু শশীঠাকরুণের মতন মানুষের এ হেন শোচনীয় পরিবর্তন?

এ যে অভাবিত, অসম্ভব!

তা ছাড়া কিসে বদলালেন তিনি? অভাবও ঘটেনি, হঠাৎ কিছু ঐশ্বর্যও জোটেনি। তবে?

ওই তবেটার উত্তরটা কারুর বুদ্ধিতে আসছে না।

তবে লোকে দেখলো পরীর বিয়েতে শশীঠাকরুণ সত্যিই প্রায় নেমন্তন্নীর মতো এলেন।

সকলের অভিমানবাণী, অভিযোগবাণী, ও হৈ চৈ এর উত্তরে হাসলেন, দুটো রঙ্গ কথা বললেন, কনের গহনা কাপড় কি কি হয়েছে তা এক নজর দেখলেন, ভাইপোর কাছে বসে দেনা পাওনার বিবরণটা শুনলেন, এই পর্যন্ত। অবিশ্যি কাজের সময় খাওয়াদাওয়ার তদবির, গ্রামের সবাই এসেছে কিনা তাঁর খোঁজ খবর নেওয়া, সবই করলেন, তবু যেন কেমন ছাড়া ছাড়া ভাসা ভাসা। যেন শেকড় থেকে শক্ত হয়ে বসে নয়।

যখন যুগী বৌ কেঁদে পড়ে বললো, তুমি যে চেরকালের মতন গাঁ ছাড়বে তা তো বলে গেলে না? আমার যে এতোদিন কী হাড়ির হাল, তা আর তোমায় কী বলবো? তখন এমন আশ্বাস দিলেন না, ওরে চিরকালের জন্য নয়, আবার আসবো আমি।

যখন নাড়ুবোসের বাড়িতে গিয়ে উকি মারলেন, তখন আর বোধহয় তেমন করে মনে পড়লো না শশীঠাকরুণের এদের দাঁড় করিয়ে রাখা আমারই দায়িত্ব!

শশীঠাকরুণ শুধু অপ্রতিভ মুখে এক মুঠো করে টাকা ধরে দিলেন ওদের হাতে। আর শ্বশুরের ভিটেটায় সংস্কারে হাত দিয়ে বসে কী পরিমাণ আটকে গেছেন সেটাই বোঝাতে চেষ্টা করলেন। শশীঠাকরুণের মুখে কৈফিয়ৎ দেওয়া! এটাও নতুন ঘটনা।

শশীঠাকরুণের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে ফুলপুরের মনোজগতে অনেক ঢেউয়ের ওঠা পড়া হয়েছে।

অধিকাংশটা এই—এখনকার বৌ ঝিরা আর তেমন নয়, গুরুজনের মান মর্যেদা রাখে না, নির্ঘাৎই তলে তলে অনেকদিন থেকেই অতিষ্ঠ হচ্ছিলেন শশীঠাকরুণ, তবে মানী মানুষ, লোক হাসিয়ে ঝগড়াঝাঁটি না করে একটা ছুতো দেখিয়ে চলে গেলেন।

আরো একটা দলের অভিমত—স্বর্গত অঘোর চাটুয্যে তো হাঘরের ঘরে নাতনীকে দেননি? সমৃদ্ধ ঘরেই দিয়েছিলেন, নাতনীর ভাগ্যে ভোগ নেই তিনি কি করবেন? তা এতোদিনে বোধ হয় শশীঠাকরুণের চেতনা হয়েছে, তাঁরও কিছু সেখানে ভাগ আছে বিষয় আশয়ে, তাই দেখতে গেছেন কী আছে না আছে!

শেষের দলের কথা ক্রমশঃই ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল শশীঠাকরুণের ফিরে না আসায়, শুধু দেখতেই যদি গেছেন, তো আর ফিরে আসবেন না?

অতএব?

অতএব ওই আগের দলের হিসেবই বলবৎ।

মনের ঘেন্নায় দেশ ছেড়েছেন শশীঠাকরুণ।

নির্ঘাৎ ভাইপো বৌরা এখন গিন্নী হতে চায়।

নাতবৌরা পোঁছে না, অগ্রাহ্য করে।

তার সাক্ষী শশীঠাকরুণ যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাটুয্যে বাড়ির ব্যবহার।

আর কি গাঁ সুদ্ধ সবাই আমাদের আপন জায়গা, আমাদের আশ্রয় স্থল, ভেবে যখন তখন এতে বসতে সাহস পাচ্ছে?

এসে বসলে তেমন আদর আপ্যায়ন পাচ্ছে?

একদিন নন্দ ছুতোরের মা এসে বসে দুটো পান চেয়েছিল, পেতে দেরী হয়েছিল। সেই অপরাধে শশীঠাকরুণ ভাইপো বৌদের চোখের জল বার করে ছেড়েছিলেন। অতিথি যে নারায়ণ তুল্য সে কথা যাতে আর না ভুল হয়, তার জন্যেই অমন দাওয়াই।

সেই বাড়িতে এখন এসে দাঁড়ালে কেউ তাকিয়ে দেখে না।

সকলেরই আশা ছিল, পরীর বিয়ে উপলক্ষে এসে যাবেন পিসিমা, আবার নিজ সিংহাসনে বসে রাজদণ্ড হাতে নেবেন। কিন্তু এ কি সংবাদ? মাত্র চারদিনের জন্যে আসছেন তিনি, সেখানে নাকি তার জরুরী দরকার, থাকবার জো নেই।

সংবাদে সবাই বিস্মিত হলো। এ কিরে বাবা? জন্ম গেল ছেলে খেয়ে আজ বলছে, ডান? এখন তোমার সেই অদেখা অজানা পচা শ্বশুরবাড়ির দেশে এমন টান হলো যে ফুলপুরের মাটিকে ভুলেই গেলে? ভুলে গেলে সেখানের মানুষদের? যারা তোমার মুখোপেক্ষী ছিল, যারা তোমার স্নেহাশ্রিত ছিল?

এতো পরিবর্তন শশীঠাকরুণেরও কি সম্ভব?

তা নিজের পরিবর্তনে নিজেও মনে মনে অদ্ভুত একটা বিস্ময় অনুভব করছেন শশীতারা। হয়তো বিস্ময়টা ঈষৎ বিষণ্ণও।

যে সংসারটা নিয়ে এতোবড়ো জীবনটা কাটিয়ে এলেন শশীঠাকরুণ, যে সংসারের একটা ভাঙা পাথরবাটিও শশীঠাকরুণ বাঘিনীর মতো আগলেছেন, যার পান থেকে চূণ খসলেও রসাতল করেছেন, সে সংসারটা সম্পর্কে আর কোনো মূল্যবোধের সাড়া পাচ্ছেন না কেন?

কই একবারও তো মনে হচ্ছে না, ইস আমার হাতে গড়া সংসারটা এরা কী যা তা করেই চালাচ্ছে! কী নষ্ট হচ্ছে, কী অপচয় হচ্ছে!

অথচ চোখে যে পড়ছে না তা নয়। চির অভ্যস্ত তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে এক নজরেই ধরা পড়েছে কোথায় কী বিশৃঙ্খলা, কোথায় কী অপচয়, কোথায় কী অবহেলা।

বাড়িতে বিয়ে এসে গেছে, বাড়ির বাইরে একটা কলিও ফেরানো হয়েছে, কিন্তু ভাঁড়ার ঘরের কড়িবরগায় ঝুল ঝুলছে, রান্নাঘরের তাক ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আছে।

গলি থেকে বালিশ বিছানাগুলো নামানো হয়েছে। কিন্তু তাদের গায়ে ওয়াড় পরানো হয়নি। অনাবৃত বালিশগুলোই ব্যবহার হচ্ছে তেলতেলে মাথায়।

শশীঠাকরুণ কি ভাবতে পারতেন এটা হতে দেওয়া যায়?

বিয়ে বাড়ির এখানে সেখানে একটা থালায়, একটা রেকাবিতে, একটা বাটিতে, কতকগুলো করে মিষ্টি পড়ে রয়েছে। পিঁপড়ে ধরছে।

এক একবার ডাক দিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, এটা কী?

কিন্তু ভেতর থেকে তেমন প্রেরণা পাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে, মরুকগে, ওরা তো এই রকম করেই সংসার করবে। আমি আর দু’দিনের জন্যে এসে বলে মন্দ হই কেন? চিরদিনের ফুলপুর যেন এই ক’মাসেই ঝাপসা হয়ে গেছে শশীঠাকরুণের কাছে।

এ পরিবর্তন অনুভব করছে বৈকি শশীতারা। তীক্ষ্ন অনুভূতিসম্পন্ন মন তাঁর। আর ভাবছেন, নতুন বিয়ে হয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে ঘুরে এলে কি এই রকমই হয় মেয়েগুলোর? বোধহয় হয়।

বিয়ে হয়ে অষ্টমঙ্গলার ক’দিন ঘুরে আসার পরেই ভাইঝিগুলোর ভাবান্তর চোখে পড়তো শশীঠাকরুণের। যেন আড়ো আড়ো ছাড়ো ছাড়ো ভাব, যেন যেটা করতে বলবে শুধু সেটাই করবে। যেন শেকড় নেই কোথাও। দেখে রেগে জ্বলে গিয়েছেন শশীঠাকরুণ।

আজ নিজেকে নিজেই কৌতুক করছেন, কি, তোরও কি ওই ছুঁড়িগুলোর মতন দশা হলো নাকি? তুইও তো এই আজীবনের জায়গায় আর তেমন শেকড় খুঁজে পাচ্ছিস না।

শশীঠাকরুণের চিত্ত যেন উৎকর্ণ হয়ে আছে বৈঠকখানা বাড়ী থেকে একটা খবর আসার অপেক্ষায়।

মেয়ের বিয়েতে শশীঠাকরুণকে আনতে যাবার সময় বড় ভাইপো সৌজন্য করে রমেশ মাষ্টারকেও নেমন্তন্নর চিঠি দিয়ে বলে এসেছিল, আপনিও দয়া করে পায়ের ধুলো দেবেন। চিরকালের কুটুম্ব ঘর, কিন্তু আসা যাওয়া তো নেই, তাই এযাবৎ আসতেও ভরসা পাইনি। এখন যখন পিসীমা দরজা খুলে দিয়েছেন—

সেই সৌজন্যের বাণীটুকুর সূত্রধরে শশীঠাকরুণ সদরের খোলা দরজাটার দিকে তাকিয়ে আছেন, লোকটা এলো কি না। এসে পড়লে আদর আপ্যায়নের ঘাটতিতে আহত হয়ে ফিরে না যায়। চেনেনা তো কেউ। হয়তো বসতে বলবে না, হয়তো ডেকে কথা কইবে না।

তাই ছোটমোট ছেলেপুলেকে বারবার বাইরে পাঠাচ্ছেন। দেখ তো বীরনগর থেকে কেউ এসেছে কিনা?

কানে যে কারুর যাচ্ছে না তাও নয়।

নাতবৌরা শুনতে পেয়ে নিজেরা হাসাহাসি করছে। শ্বশুর বাড়ির লোকের জন্যে ঠাকুমার মন ছটফট করছে, না জানি তোমাদের ঠাকুর্দা থাকলে কি হতো।

ভাইপোবৌরা আতঙ্কে আতঙ্কে ছিলেন, আবার এসে সিংহাসনের দাবি করে কিনা। অথচ ওঁর এই নির্লিপ্ত নিরাসক্ত ভাব দেখে বিরক্ত না হয়েও ছাড়ছে না।

উনি আবার আমাদের জিজ্ঞেস করে কাজ করছেন! যেন কুটুম এসেছেন। মরণকালে জ্বরচ্ছেদ। আবার সতাতো দ্যাওরের জন্যে হামলাচ্ছেন। এতো লোকজন এসেছে, কারুর দিকেই যেন লক্ষ্য নেই। বীরনগরের কেউ এসেছে কিনা তাই নিয়েই অস্থির।

সত্যি, কারই বা ভাল লাগে এমন অকৃতজ্ঞতা?

ভাইপোদেরও ভালো লাগছে না।

চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে পিসীমার মন পড়ে আছে সেই বীরনগরের মজুর মিস্ত্রীর ওপর। এর থেকে অকৃতজ্ঞতা আর কি হতে পারে?

এখানটা হয়তো শশীঠাকরুণ তাঁর তীব্র অনুভূতি দিয়েও বুঝতে পারছেন না। শশীঠাকরুণ মনে করছেন, জন্মে আসে না এমন কুটুম যদি তোদের মেয়ের বিয়েতে এসে আদর অভ্যর্থনা না পায়, তবে তো তোদেরই লজ্জা। শশীতারা সেই লজ্জাটার ভয়েই—

ইত্যবসরে যে আরও একটা খবর কানাঘুষোয় এই ফুলপুরে এসে পৌঁছেছে, সেটা জানা নেই শশীতারার। এমনিতে কখনো কোনো খবরই আসতো না, কিন্তু কথাতেই আছে, আগুন আর কলঙ্কের কথা বাতাসের আগে ছোটে।

যদিও কথাটা হাস্যকর রকমের অবিশ্বাস্য, কিন্তু ভাব ভঙ্গিটাও যে রীতিমত বিরক্তিকর। বাধ্য হয়েই বিশ্বাস করতে হচ্ছে। বীরনগরের রমেশ মাষ্টার বিয়ে বাড়িতে নেমন্তন্নে এলো কিনা, এটার জন্যে যদি শশীঠাকরুণ নব অনুরাগিনী রাধার মতো উতলা হন, তাহলে তাঁর বাহাত্তর বছর বয়স হতে চললো বলেই কি ছেড়ে দেবে লোকে?

আর বীরনগরেও যখন ওই নিয়ে কানাঘুষো চলছে। সতাতো জা নাকি ওঁদের হাসিগল্প মস্করা মাখামাখি দেখে গলায় দড়ি দেবে কি বিষ খাবে তাই চিন্তা করছে।

তা প্রমাণ হাতে হাতেই মিললো।

বীরনগরের রমেশ মাষ্টার এসেছেন নেমন্তন্নে, ওই শুনে যে ভাবে ছুটলেন শশীঠাকরুণ তা দেখবার মতো।

একথা কেউই ভেবে দেখলো না, আজন্ম একদুয়োরি শশীঠাকরুণ এই মরণ কালেও আর একটা খোলা দরজার বাতাসে একটা অনাস্বাদিত মুক্তির স্বাদ পেয়েছেন, তাই তাঁর আচরণে এমন চাঞ্চল্য।

কেউ ভেবে দেখছে, না ইহজীবনে শশীঠাকরুণের নিজস্ব কোন জগৎ ছিল না, ছিল না একান্ত ভাবে নিজের কোন আপনজন, হঠাৎ সেইটা পেয়ে গেছেন শশীঠাকরুণ। মেয়েদের জীবন দুটো পরিবারের ওপর ভর দিয়ে গড়ে ওঠে, শশীঠাকরুণ ইহজীবনে সেই গড়নটা পাননি। অথচ প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে তার জন্যে ছিল চির পিপাসা, যার খবর শশীঠাকরুণ নিজেও কোনদিন টের পাননি।

ওরা জানে না, অজিত যখন বীরনগরে গিয়েছিল, শশীতারা রমেশ মাষ্টারকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, তোমায় তো ভাই একবার গণেশ ময়রার দোকানে যেতে হচ্ছে। কুটুম এসেছে যখন। তোমাদের দেশের সেরা সেরা মিষ্টি টিষ্টি নিয়ে আসবে, বুঝলে? চট করে। বলেছিলেন, আমি বললে ভাল দেখাবে না, তুমি নিজে একবার বল ভাল করে, ওকে আজকের রাত্তিরটা থেকে যেতে।

অজিত অবিশ্যি থাকেনি, কিন্তু বলেছিলেন রমেশ মাষ্টার।

এখনো সেই মনোভঙ্গীই কাজ করছে।

শুধু এরা সেটা বুঝতে পারে না।

জগতের সবাই যদি সবাইকে বুঝতে পারত, অন্ততঃ বুঝতে চাইত, তাহলে তো পৃথিবীতে সমস্যা বলে কিছু থাকতই না। সংসারটা স্বর্গ তুল্য হতো।

কিন্তু কেউ কাউকে বুঝতে চেষ্টা করে না, হয়ত বা বুঝতে রাজীই হয় না। বরং অদ্ভুত অসম্ভব অবিশ্বাস্য কথাও বিশ্বাস করবে, তবু তলিয়ে বুঝতে চাইবে না আর কি হতে পারে।

অন্য কিছু হতে পারে কিনা।

অতএব শশীঠাকরুণের চিরভক্ত ফুলপুর যখন দেখল শশীঠাকরুণ ভাইপোদের অনুরোধ ঠেলে আর দুটো দিনও থেকে না গিয়ে সেখানে জরুরি দরকারের ছুতো দেখিয়ে এই ক’দিনের চেনা লোকটার সঙ্গে বোঁ বোঁ করে ছুট মারলেন, একটা রিকশয় গায়ে গা দিয়ে বসে, তখন ছি ছিক্কার করে উঠল।

এতোদিনের সমস্ত ছেদ্দা ভক্তি ভালবাসা সমীহ সব জলাঞ্জলি দিয়ে বলতে লাগল, এই জন্যেই বলে, পুড়বে মেয়ে উড়বে ছাই, তবে মেয়ের গুণ গাই। তা নইলে শশীঠাকরুণ কিনা চারকাল পার করে এসে এখন সতাতো দ্যাওরের সঙ্গে—ছি ছি! দুর্গা দুর্গা! সন্ধ্যেবেলায় আস্তাকুড় মাড়ানো আর কাকে বলে?

শশীঠাকরুণের কানে অবশ্য এসব পৌঁছয় না।

পৌঁছলেই কি তিনি কেয়ার করতেন নাকি?

ট্রেন ছাড়ো ছাড়ো সময় ষ্টেশনে এসে পৌঁছন হয়েছে, হাঁপাতে হাঁপাতে ওঠা। রেলগাড়িটা ছেড়ে দিতেই শশীঠাকরুণ একটা পরম স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন, যেন খুব কৌশলে একটা জেলখানা থেকে পালিয়ে এসেছেন।

আলো আলো মুখে বললেন, আমি চলে আসার পর আর মিস্ত্রীর কাজ হয়েছিল নাকি?

রমেশ মাষ্টার বললেন, পাগল, কে দেখবে?

কেন বাপু, তুমি বুড়ো মদ্দ একটু দেখতে পারো না?

আমার দায়!

শশীতারা জানলা থেকে এসে পড়া রোদ থেকে মুখটা বাঁচিয়ে সরে এসে বলেন, হুঁ যত দায় আমার! ইলেকট্রিক কোম্পানীর চিঠির উত্তর এসেছে?

গাড়িটার কোথায় একটা ধাক্কা লাগে, শব্দ ওঠে, উত্তরটা শোনা যায় না। কিন্তু না যাক, শশীতারার মুখে সেই না—আসা বিদ্যুতের আলোর দীপ্তি।

হয়ত শশীতারা সম্পর্কে অপবাদটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনও নয়, এই বয়সে প্রেমেই পড়ে গেছেন শশীতারা। যে জীবনটার স্বাদ তাঁর জানা ছিল না, অথচ তার সাধটা কোন গভীর অলক্ষ্যে একটি সোনার কৌটায় লুকনো ছিল, হঠাৎ পেয়ে গিয়ে সেই জীবনটারই প্রেমে পড়ে গেছেন তিনি!

ওরা চারজনে তাস খেলছিল।

সুখেন, ননী, রাজেন আর জগাই।

স্থান কাল পাত্র, স্রেফ সোনায় সোহাগার মতই। সমস্ত পরিবেশটা দেখলেই মনে হবে, ঠিক! এদের এইখানেই মানায়। এদের এখানে ছাড়া কোথায় মানায় না।

স্থানটা করণপুর রেলওয়ে স্টেশনের ধারের একটা চা—বিস্কুটের চালা।

চালার সামনে দুটো নড়বড়ে কালো কালো বেঞ্চি পড়ে আছে বাঁকাচোরা হয়ে, সামনের বাঁশের খুঁটি দুটোর গায়ে খানিকটা করে নারকেল দড়ি বাঁধা। ওই দড়ি দুটোর বাঁধনের গিঁঠের যে আগাদুটো ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে, একটু আগেও তার মুখে আগুন জ্বলছিল। এখন শেষ ট্রেন চলে গেছে, এখন আগুন নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দোকানটা ননীর।

এবং ননীই ওদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ।

এরা ননীর দোকানের কর্মচারী অবশ্য নয়, তবে সকালে যখন পর পর দু তিন খানা ট্রেন আসে, ননীর দোকানে খদ্দের ধরে না, তখন খদ্দেররা এদের কাউকে না কাউকে দেখতে পায়। ননীকে সাহায্য করতে আসে এরা। নইলে ওদের তিনজনেরই ওই রেলেরই খাঁজে খোঁজে কোথাও একটু চাকরী আছে। সে চাকরীর ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে এরা ননীর দোকানে ডিউটি দিয়ে যায়।

পয়সাকড়ির সম্পর্ক নেই, এক গেলাস চা আর দুখানা লেড়ো বিস্কুট, মাত্তর এই, তবু তার বিনিময়েই এরা এসে পড়ে, জোরে জোরে পাখা নেড়ে উনুন ধরিয়ে দেয়। ডেকচিতে ফুটন্ত জলের মধ্যে ন্যাকড়ার পুঁটুলিতে গুঁড়ো চা বেঁধে ছেড়ে দেয়, তার মধ্যেই দুধ চিনি ঢেলে দিয়ে হাতায় নেড়ে নেড়ে কাঁচের গ্লাসে গ্লাসে সাপ্লাই করে। চোখে—কানে দেখতে পায় না, হিমসিম খেয়ে যায়।

ননী শুধু বিস্কুট দেয়, আর পয়সার লেনদেনের হিসেব করে। ফাঁকে ফাঁকে চালার কোণের দিকে কোথায় যেন একটা মাটির কলসী আছে তার মধ্যে ফেলে ফেলে আসে।

ননীর মা বলত, ‘ঘটই হচ্ছে মা লক্ষ্মীর আধার। সকল দেবতারই ঘটেই অধিষ্ঠান, খদ্দেরের পয়সাকড়ি ঘটের মধ্যে থুবি ননী! রাত হলে তখন ঘরে এনে বাক্সয় তুলবি।’

মা—র কথাটা শুনেছে ননী।

তাতে সুবিধেও।

বাক্সর ডালা তোলা, ডালা নামানো, সময়—সাপেক্ষ।

বিকেলের দিকেও ট্রেন আসে।

পাঁচটা পঞ্চান্ন, সাতটা চল্লিশ, আর ন’টা বত্রিশে। এটাই শেষ।

তবে বিকেলের দিকে এত হিমসিম ভাব হয় না। তখন খদ্দেরও কম থাকে, আর কাজও খানিক এগোনো থাকে। সকালের হৈ চৈ মিটলেই ননী ওই ডেকচিতে এক ডেকচি চা তৈরি করে উনুনে গুঁড়োকয়লা দিয়ে বসিয়ে রাখে, সেটাই সাপ্লাই দেয়। দুধটা মিশিয়ে রাখে না কালো হয়ে যাবার ভয়ে, সেটা শুধু পরে মিশোয়।

বিকেলে ননী মাঝখানে পাতা ওই বেঞ্চিতে একটু বসতে পায়, মাঝে মাঝে বিড়ি টানতে টানতে কোন পরিচিত খদ্দেরের সঙ্গে সুখ—দুঃখের কথাও কইতে পায়।

অনেকেই বলে ননীকে, ‘তোমার এই দোকানে যদি সকালের দিকে অন্তত আলুর চপ আর পেঁয়াজি রাখো ননী, পড়তে পাবে না। দেখবে ওই তেলেভাজার দৌলতেই তোমার টালিঘরখানি কোঠাঘর হয়ে যাবে—’

ননী এসব সুপরামর্শ কানে নেয় না।

বলে, ‘না দাদা, যা আছে তাই ভালো। চা চিনি আর গুঁড়ো দুধ, এসব তো মজুতই থাকে, বিস্কুটও মজুত রাখি টিন বোঝাই করে, আর ওই বিড়ি। ব্যস হয়ে গেল! ওই সব গরম মাল যোগান দিতে গেলেই ভেস্তে যাবো! হাতছাড়া আম হয়ে সুখ নেই।’

তারপর হয়তো তেমন পরিচিত জন কেউ হলেই উদাস উদাস গলায় বলে, ‘আর অধিকে দরকারই বা কী দাদা? কার জন্যে কী!’

বছর কয়েক হল ননীর বৌটা মারা গেছে রেল হাসপাতালে, মেটার্নিটি ওয়ার্ডে। জ্বলজ্যান্ত বৌটা গেল আর মরে গেল। তদবধি ননীর কণ্ঠে এই বৈরাগ্যের সুর।

তবু হিতৈষীরা বলে, ‘কেন ননী, তোমার যখন পুষ্যি রয়েছে ঘরে, নিজের দুটো মা—মরা গুঁড়োও রয়েছে, তখন সবই প্রয়োজন।

ননী সংক্ষেপে বলে, ‘সব শালা বেইমানের ঝাড়। কারুর জন্যে করার মন নেই দাদা! খেতে পরতে দেওয়াটা ডিউটি, সেটা দিয়ে যাচ্ছি ব্যস।’

অবিশ্যি ননীর ‘পুষ্যি’দের মধ্যে যার মুখটা বেশী সে এমন কথা শুনলে বলে, ‘ওই গরবেই গেল মামা। দিচ্ছে অবিশ্যি যোগান, তবে কেমন ভাত কেমন কাপড় সেটাই হচ্ছে কথা।’

ওই মুখটাকে ননী একটু ভয় করে, আর কিছু না। তবে কেউ যদি ননীকে সহযোগিতা না করে, ননীই বা কার? কারো নয়।

ননী ওই চা—বিস্কুট সাপ্লাই করেই যা পায় তাতেই সন্তুষ্ট, আর সন্তুষ্ট তার বন্ধু—বান্ধবদের সুব্যবহারে। সুখেন, রাজেন, জগাই এরা তার কে? কেউ না। বাংলা মুলুক ছেড়ে যখন, কে জানে কার জুতোর ঠোক্কর খেতে খেতে, ছিটকে এসে বেহারের এই রেল স্টেশনের ধারে এসে পড়েছিল, তখন না জানত হিন্দী, না চিনত একটা লোককে।

ঢের লোকই হিন্দী জানে না, তবু হিঁয়াসে হুঁয়াসে করে চালিয়ে নিতে পারে, ননী পারত না। সেই দুরবস্থার সময় কোথা না কোথা থেকে এই তিনটে স্বজাতির সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল। তারা হিন্দীতে চৌকস, আবার বাংলা কথা বলে প্রাণ কান জুড়িয়ে দেয়।

ননী তাদের আঁকড়ে ধরেছিল।

সেই বন্ধন এখনো অটুট আছে।

ননী ছাড়েনি, ওরাও বেইমানি করেনি। যেটা করেছিল ননীর নিজের সহোদর ভাই ফণী।

নিজে একটু দাঁড়িয়ে পড়ে গ্রামে গিয়ে অগাবগা ভাইটাকে নিয়ে এসেছিল ননী, তার সঙ্গে ভাত রাঁধতে বিধবা দিদি পদ্মকে।

পদ্মকে আনার অন্য উদ্দেশ্যও ছিল।

ঘরে একটা মেয়েছেলে না থাকলে, বিয়ের কথা কে তুলবে? নিজে নিজে দুম করে একটা বিয়ে করে বসলে, তাতে কখনো বিয়ে বিয়ে স্বাদ আসে? আর সত্যি বলতে, ভাল ঘর থেকে তেমন সম্বন্ধও আসে না। শুধু একটা চায়ের দোকানদার? সন্দেহের চোখে তাকায়।

এ বাবা বিধবা দিদি আছে সংসারে, ছোট ভাই আছে যাকে বলে একটা গেরস্থ! লোকে মেয়ে দিতে এগিয়ে আসবে।

তা অবিশ্যি ক্যালকুলেশনে ভুল হয়নি ননীর, ভাল ঘরের মেয়ের সঙ্গেই বিয়ে হয়েছিল তার। আর তারা ওই দিদি পদ্মকে দেখেই আশ্বস্ত হয়ে বিয়ে দিতে এগিয়ে এসেছে। কনক ওই দিদিরই দূর সম্পর্কের ভাসুরঝি না দেওরঝি।

গুণের তুলনা ছিল না কনকের।

ননীর ভাগ্যে সইল না। বাচ্ছা দুটো ছেলেমেয়ে রেখে হুট করে মরে গেল। দিদি অনেক বলেছিল, ‘এই বয়সে কে আবার বৌয়ের জন্যে সন্নিসী হয়? আর একটা বে কর।’

ননী দুই হাত তুলে দুটো কান মলেছে।

না, আর নয়।

বড় দাগা বেজেছে প্রাণে।

ননী দিদিকে জ্ঞানের কথাও শুনিয়েছে—’কপালে সুখ থাকলে ওই বৌই টিঁকে থাকত! যাবেই বা কেন? সুখ কপালে নেই বলেই—

আবার বিয়ে করলে সে বৌও যে মরবে না তার গ্যারাণ্টি আছে? তাছাড়া সে তোমায় কাকী বলে মানতো, দ্বিতীয় পক্ষ এসে যদি ধিঙ্গী অবতার হয়, যদি তোমায় না মানে?’

পদ্ম বলেছে, ‘সেটা তোমার হাতে। তুমি পুরুষ ছেলে যদি পরিবারকে ঢীট করতে না পারো, তাহলে তোমাকেই ধিক।’

ননী উদাস গলায় বলেছে, ‘একটা অপর বাড়ির মেয়েকে ডেকেডুকে নিয়ে এসে তাকে ঢীট করতে বসবার আমার দরকার কি? ইচ্ছেও নেই, শক্তিও নেই।’

দিদি শেষ চেষ্টা হিসেবে বলেছে, ‘আমি কি চিরকাল তোমার মা—মরা ছেলে—মেয়ের কন্না করব?’

ননী আরো উদাসভাবে বলেছে, ‘করতে বেজার ধরলে কোর না। অনাথ আশ্রমে চালান করে দেব দুটোকে।’

‘বাপ থাকতে ওদের অনাথ বলবি?’

‘বলতে কী? তোমরাই তো বল মা মরলে বাপ তালুই। তা সেই সম্পর্কই বলব।’

দিদি বলেছে, ‘তোকে বিয়ের কথা বলতে আসা আমার ঝকমারি।’

‘আর ততোধিক ঝকমারি বৌ মরলে আবার বৌ আনা।’ ননী বলেছে, ‘বেদে পুরাণে শুনেছ কখনো সৎমা এসে কন্না করেছে?’

‘শুনব না কেন, ঢের শুনেছি—’

তর্কের খাতিরে জোর দিয়েছে পদ্ম।

ননী বলেছে, ‘তোমার কপাল ভাল। তাই তেমন দেবীদর্শন হয়েছে। আমার সঙ্গে তো পরিচয় ধ্রুবর বাপ রাজা উত্তানপাদের দ্বিতীয় পক্ষ সুরুচি রাণীর, পরিচয় মহারাণী কৈকেয়ীর, আর রূপকথার সুয়োরাণীদের। ওনাদের তো দূরে থেকে নমস্কার! হ্যাঁ তোমার কষ্ট, তা তোমার আয়েসের কপাল হলে ফণী রাস্কেলটা এমনটা করত না। আজ তার বিয়ে দিয়েই তো ঘরে বৌ এনে আয়েস করতে পারতে।’

তা ফণীকে রাস্কেল বলা যায়।

সবে যখন ননীর দোকানটি জাঁকিয়ে উঠেছে, এবং ফণীও জোয়ান হয়ে উঠেছে, ননী স্বপ্ন দেখছে ফণী তার ডানহাত হয়ে উঠবে এইবার, হঠাৎ একদিন ফণী হাওয়া। আর তার সঙ্গে হাওয়া ননীর বাক্সের টাকা, আর নতুন বৌয়ের গহনা ক’টা।

বেশী না হোক, তবু ছিল কিছু।

হারটা, বালাটা, কানফুলটা।

পদ্ম তার জ্ঞাতি দেওরকে মোচড় দিয়ে বাগিয়েছিল। তার এক কুচিও রেখে যায়নি।

ননী বাঘের মত গর্জন করে বলেছিল, ‘ওই হতভাগাকে আমি জেলে দিয়ে ছাড়ব। যাচ্ছি থানায় ডায়েরী করতে—’

নতুন বৌ হাত ধরে মিনতি করে বলেছিল, ‘দোহাই তোমার, ঘরের কেলেঙ্কারি প্রকাশ করে লোকের কাছে মুখ হাসিও না।’

এবার ননী কেঁদে ফেলেছিল, ‘তোমার সর্বস্ব নিয়ে গেল, আমার কী ক্ষ্যামতা আছে যে আবার গড়িয়ে দেব?’

‘থাক আমার গয়নার দরকার নেই!’ বৌ নরম চোখ দুটি তুলে বলেছিল, ‘মেয়েমানুষের স্বামীই সর্বস্ব, গয়না কাপড় নয়। তুমি আমায় শহরের দোকান থেকে কেমিকাল সোনার গয়না কিনে দিও।’

‘সোনা হারিয়ে কেমিকেল পরবে কনক?’

কনক অম্লানবদনে বলে, ‘তাতে কি? ও বরং চোরে নেবে না, অথচ পরতে বাহার! আমাদের বর্ধমানে কত কত বড়মানুষের বৌরাও পরে। দু’খানা সোনার সঙ্গে পাঁচখানা কেমিকেল সোনা।’ কেউ কিছু বলতে যায়?’

ননী মৃদু হেসেছিল, ‘বড়লোকের বৌকে কেউ কিছু বলতে যাবে না। কিন্তু ননী দাসের বৌকে বলবে।’

‘বলুক, গায়ে ফোসকা পড়বে না।’

বাইরের চোরে নিলে শুধু লোকসান, লজ্জা অপমান নেই, ঘরের চোরে নেওয়ায় লোকসানের সঙ্গে সেটাও থাকে। সেই জ্বালায় জ্বলে ননী প্রতিজ্ঞা করল, ‘ও ফিরে আসুক, আমি যদি আবার ওকে বাড়ি ঢুকতে দিই তোমরা আমার নামে কুকুর পুষো।’

তা ননীর নামে কুকুর পোষা আর হল না কারুর ভাগ্যে। ফণী আর এল না। ননী আরও একটা প্রতিজ্ঞা করেছিল, সেটা মনে মনে। সেটা হচ্ছে, ‘বৌকে আবার ওই সব গয়না আমি গড়িয়ে দেবই দেব। যতদিনে পারি।’ কিন্তু সে প্রতিজ্ঞাও পালন হল না। যতদিনে পেরে উঠতে পারত ননী, ততগুলো দিন তো দিল না বৌ।

তবে আর ননী কোন উৎসাহে চায়ের দোকানে আলুরচপ আমদানী করে লাল হয়ে ওঠার প্রেরণা পাবে?

তার থেকে সারাদিনের ঝামেলা মিটিয়ে রাত্তিরবেলা এই ভাঙা চৌকির উপর ছেঁড়া মাদুর বিছিয়ে বসে ময়লা তাসের জোড়া ভেজে ভেজে টেয়েনটিনাইন খেলা ঢের ভাল।

ইস্টিশনের ওদিকে চারদিকে আলোর ছড়াছড়ি, কিন্তু ননীর দোকানে সেই আদি ও অকৃত্রিম হ্যারিকেন লণ্ঠন। চালার বাতায় একটা বাঁকানো শিক গুঁজে রেখেছে ননী, তাতে ওই লণ্ঠনটা ঝুলিয়ে দেয়, আর বলে, ‘কেন’ বিজলীবাতির থেকে আলোটা কী কম হচ্ছে বল? চিমনীর কাঁচটা কেমন সাফ রাখি!’

তা হয়তো রাখে সাফ, তবু দোদুল্যমান আলোর নীচে বসে যারা খেলে, তাদের অভ্যাস হয়ে গেছে বলেই পারে, নতুন কেউ এলে পারত না।

তুলসী তো এলেই বলে, ‘ইলেকট্রিক না আনতে পার, একটা হ্যাজাক কিনতে পার না ননীদা? দোকানটা এমন ভুতুড়ে দেখায় না।’

একমাত্র ননীকেই তুলসী ‘দাদা’ বলে আর সবাইকে স্রেফ নাম ধরে ডাকে।

ননী বলে, ‘এক তুইই ভূতুড়ে বলিস, আর তো কেউ বলে না?’

‘বলে না, তারা সবাই ভূতুড়ে বলে।’

তুলসী যে কোন অধিকারে যাকে যা ইচ্ছে বলে ভগবানই জানে, অথচ বলে দিব্যি পার পায়। অথচ তুলসীর বদনামের শেষ নেই। তুলসী পিছন ফিরলেই সমালোচনা শুরু হয়ে যায়, আর আসছে দেখলেই লোকে গলা নামিয়ে বলে, ‘ওই যে আসছেন। ঢলানি, বাচাল!’ আরো যা বলে, সেটা অনুচ্চারিত থাকে, তবু বুঝতে অসুবিধে হয় না কারুর!

তবু ওই রেলওয়ে কলোনির মধ্যে যতগুলো বাঙালী বাড়ি আছে সব বাড়িতেই তুলসীর গতিবিধি আছে, এবং মজা এই সমাদরও আছে। গেলেই মহিলারা তাকে ‘বোস বোস’ করে চা খাওয়ান, পান জর্দা খাওয়ান এবং এ বাড়ি ও বাড়ির গল্প ফাঁদেন।

তুলসীর কাছে অনেক খবর।

তুলসীর আদি ইতিহাস কি তা কেউ জানে না, ওকে প্রথম যখন এই করণপুরে দেখা যায় তখন ওর বছর দশেক বয়েস।

পরনে একটা বোতামবিহীন সস্তা ছিটের খাটো ফ্রক, মাথায় একমাখা ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, ধুলি ধূসরিত হাত—পা।

তবু স্বাস্থ্যটি একেবারে টাইট।

কচিডাবের মতো চাঁচাছোলা মুখ, থোড়ের মত হাত—পা, রং না ফর্সা না ময়লা। যত্নে থাকলে হয়তো ফরসার দিকেই পাল্লা ঝুঁকত? তবু স্বাস্থ্যটি আছে। জিগ্যেস করলে কিছু বলতে চাইত না তুলসী, তবু যাদের খোঁচানো অভ্যেস, তাদের খোঁচানির ফলে এইটুকু জানা গেছে, কোন বাবুরা ফাই—ফরমাশ খাটাবার জন্যে তাকে গ্রামের বাড়ি থেকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল, এবং খরচ—পত্তর করে নিয়ে এসেছিল বলেই সেটা উসুল করবার চেষ্টার ত্রুটি করেনি। তার সঙ্গে বকুনিটা ছিল ফাউ।

নিরুপায় মেয়েটা খেটেছে, বকুনি খেয়েছে, গ্রামের কথা ভেবে ভেবে কেঁদেছে, গ্রামের সেই কাকা—কাকী যারা তুলসীকে এদের হাতে তুলে দিয়েছিল, মনে মনে তাদের শাপশাপান্ত করেছে, এবং শেষ পর্যন্ত এদের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্যে তাদের যত পেরেছে জ্বালাতন করতে ধরেছে।

বোঝা গিয়েছে নিরুপায় হলেও অসহায় নয় তুলসী নামের মেয়েটা। সহায় তার ওই বুদ্ধিটি।…একদিন ইচ্ছে করে হাত থেকে ফেলে গিন্নীর সদ্য—কেনা একটা দামী টী—সেট ভেঙে যখন তুলসী ঘাড় বাঁকিয়ে বলেছিল, ‘মারছেন কেন? অসাবধানে হাত থেকে পড়ে যায় না মানুষের? আপনারও যেতে পারত?’—তখনই সেইখানেই মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছিল।

‘বেরো, বেরো আমার বাড়ি থেকে’ বলে তাড়িয়ে দিয়েছিল গিন্নী। বলেছিল ‘পয়লা নম্বরের বিচ্ছু তুমি, ইচ্ছে করে ভেঙেছ।’

তবু ভাবেনি হয়তো মেয়েটা সত্যিই সেই অন্ধকারে হাওয়া হয়ে যাবে।

বিদেশ বিভুঁইয়ে যাবে কোথায়?

কিন্তু হারিয়ে যাবার ইচ্ছে থাকলে কি হারিয়ে যাবার জায়গার অভাব হয়? লাইনের এপারে আর ওপারে দু’দিকে কলোনি ইস্ট—ওয়েস্ট। সেখানে এঞ্জিনের ধোঁয়ায় মলিন বিবর্ণ ইঁটের পরে ইঁট গাঁথা জুতোর দোকানের জুতোর বাক্সর মত যে কোয়ার্টারের সারি, তার মধ্যে কোন একটা খোঁজে কোন একটা মানুষকীট যদি গুঁজে গিয়ে ঢুকে থাকে, কে তাকে খুঁজে বার করবে?

তাছাড়া খোঁজায় তো অসুবিধাও আছে।

যতই মেয়েটার পাজীমো বদমাইসি বিচ্ছুমির কাহিনী ফলাও করে বল, মেয়েটার বয়েস শুনলেই লোকের সহানুভূতির ঢল তার দিকেই নামে।

মুখের ওপরই বলে, ‘গাঁ—ঘরের মেয়ে আপনার জন ছেড়ে এসেছে, মন টেঁকেনি আর কী। হয়তো দেশে ফিরে যাবার চেষ্টাতেই পালিয়েছে।’

মুখের রেখায় যেটা বলে, সেটা হচ্ছে, নিষ্ঠুরের মতন অত্যাচার করেছ, তা নইলে ওইটুকু মেয়ে সাহস করে পালায়? মরীয়া হয়েই পালিয়েছে।…লোকে ভাংচি দিয়ে ভাঙিয়ে নিয়েছে তাই বা কি করে বলা যায়? তোমাদের সঙ্গে ছাড়া একা তো যেতে দিতে না কোথাও।’

এসব কথা লোকে একদিনে জানেনি, দিনে দিনে কথায় কথায় জেনেছে। কেউ যখন জিগ্যেস করেছে, ‘পালাবার জন্যে জ্বালাতন করেছিস? তুই তো খুব সাংঘাতিক মেয়ে!’ তুলসী হেসে হেসে বলেছে, ‘হ্যাঁ দেশে কাকী বলত ‘ধানিলঙ্কা।’

সেই ধানিলঙ্কা তুলসী দশবছর বয়েস থেকেই পুরো স্বাধীন। নিজেই নিজের মালিক। লোকের বাড়ি চাকরী করেছে নিজে মাইনে ঠিক করে, কাজ ঠিক করে। একটুকরো কাজ বেশী করবে না। বরং অন্যের বাড়িতে গিয়ে অমনি কাজ করে দিয়ে আসবে, তবু নিজের মনিব—বাড়ি এতটুকু বেশী নয়।

অতএব এই ঘর—জ্বালানে পর—ভোলানের এক জায়গায় বেশী দিন আশ্রয় জোটেনি। কিন্তু তুলসী হেসে হেসে বলেছে, ‘ভালই তো! বেশ নিত্যি নিত্যি নতুন নতুন গিন্নী—কর্তা দেখছি, নতুন নতুন দাদাবাবু—দিদিমণি দেখছি।’

সে সব অবিশ্যি তামাদি কালের কথা। সেই দশবছরের মেয়েটা এখন কোন না আটাশ—তিরিশের হয়ে উঠেছে। গড়ন আরো টাইট, মুখ তেমনি ডাবের মত চাঁচাছোলা, শুধু চুল তেল—জবজবে, হাত—পা মাখন—বুলানো।

তুলসী আর লোকের বাড়ি কাজ করে বেড়ায় না, রেল হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে আয়ার কাজ করে। নিজের চেষ্টায় শিখেছে তুলসী; নিজের চেষ্টায় কাজ জুটিয়েছে।

তুলসীর কাজের গুণে, একটা বেলাও বসে থাকতে পায় না তুলসী। যাদের আয়া রাখবার ক্ষমতা নেই, তারাও লোভে পড়ে পাঁচটা ছ’টা দিন তুলসীর হাতের সেবা খেয়ে নেয়।

এখন তুলসীর এই করণপুরে রীতিমত প্রতিষ্ঠা।

‘তুলসীর বিয়ে হল না’, ‘ঘর সংসার হল না’, একথা কেউ কোনদিন ভাবেনি। তুলসী যেন ধাপে ধাপে সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলায় উঠে গেছে, সেটার জন্যেই তুলসী মহিমান্বিতা।

কেউ বলতে পারবে না কেউ কোনদিন তুলসীর সাহায্যের জন্যে একটি আঙুল নেড়েছে। চাকরী থেকে বরখাস্ত করে দেবার ইতিহাসই ঘরে ঘরে।

তবে রেল কোয়ার্টাসের বাসিন্দারা চিরস্থায়ী নয়। কেউ বদলি হয়ে যায়, কেউ রিটায়ার হয়ে যায়, নতুন যারা আসে তারা তুলসীকে এই মূর্তিতেই দেখে। ওর আদি ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামায় না।

অতটুকু বয়েস থেকে নিজে নিজের জীবনের মালিক হওয়ার মধ্যে দুঃখ যদিও বা কিছু থাকে, সুখটা অনেক বেশী। তুলসী সেই সুখের স্বাদ পেয়ে গেছে বলেই হয়তো আর মাথার ওপর ছাতার অভাব অনুভব করেনি।

ছাতা মানেই তো শাসনকর্তা।

ছাতা মানেই মাথা। মালিক।

দরকারটা কি? আহার আছে, আশ্রয় আছে, প্রতিষ্ঠা প্রতিপত্তি আছে, আর কি চাই?

বিয়ে করলে, সংসার হলে, এমন সচ্ছন্দ বিচরণের সুখ পেতো তুলসী?

একটা শাসনের মুঠো থেকে পিছলে বেরিয়ে এসে যে জীবনটাকে সে নিজে গড়ে নিয়েছে, সেটাকে এমন তারিয়ে তারিয়ে ভোগ করবার সুখটা পেতো? লোকে তার চলন—বলন ধরন—ধারন ঠাঁট—ঠমকের সমালোচনা করে, আর কিছু বলুক দিকি গলা তুলে? তা বলতে হয় না। ওটুকু লোক—নিন্দে তুলসী গায়ে মাখে না, পায়ের তলায় মাড়ায়।

লোক—নিন্দের ভয় থাকলে আর তুলসী রাত দশটায় এই চায়ের দোকানের তাসের আড্ডায় এসে হাজির হত না।

অনেক ভোল পাল্টাতে পাল্টাতে তুলসী এখন বাবুদের বাড়ির বৌ—ঝিদের ভোল ধরেছে। তুলসীর গায়ে কাট—ছাঁটের রঙিন ব্লাউজ, তার সঙ্গে শৌখিন ধাঁচে পরা হালকা ছাপা ছিটের শাড়ি, পায়ে চটি। হাতে চুড়ি ফুড়ির পাট নেই, একগাছা করে সরু বালা। আগে হাত—ভর্তি কাঁচের চুড়ি পরত, আয়ার কাজের অসুবিধে হয় বলেও সব ছেড়েছে। তুলসীর মাথার চুল টান করে খোঁপা বাঁধা, তেল—চকচকে, তবু কপালের ওপরকার চুলগুলো ঠিক ঝুরো হয়ে উড়ছে। যেমন সেই ছোটবেলায় রুক্ষুমাথায় উড়ত। যা দেখে লোকের তার ওপর কেমন যেন একটা মায়া এসে যেত, দুষ্টু জেনেও।

রাস্তার ওপর কোথা থেকে যেন কিছু আলো এসে পড়েছে, তুলসীকে দূর থেকেই দেখা গেল। যারা তাসে নিমগ্ন, তাদের হয়তো দেখতে পাবার কথা নয়, কিন্তু ঠিক সেই সময়েই সুখেন অন্যের তাস দেবার অবসরে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলছিল, ‘রাত কত হল? বেশী দেরী হলে বাড়িতে গ্যাজগ্যাজানি শুনতে হবে।’

বাড়ি বলতে সুখেনের অকালবুড়ো বাপ আর হাড়—জ্বালানো পিসি। কিন্তু সুখেনই বেশী ব্যস্ত হয়।

কথাটা বলেই সুখেন গলা নামিয়ে বলে, ‘ঢঙিনী আসছেন!’

সবাই চকিত হয়ে তাকাল।

রাজেন নীচু গলায় বলল, ‘আজ আর নাইট ডিউটি নেই বুঝি?’

‘নেই বোধহয়।’

‘খেলাটা মাটি করতে এলো’, বলল জগু, এবং ননীও একটা বিরক্তি—সূচক আঃ করল। অথচ আশ্চর্য, সকলেরই মনের মধ্যে যেন একটা ভাল লাগা ভাল লাগা ভাব খেলে গেল।

মন জিনিসটা এমনি অদ্ভুতই বটে!

ভাল লাগা আর ভাল না লাগাটা একাধারে এসে বসে!

তবু ওরা না দেখার ভান করল।

নিজের তালে তাস কুড়োতে লাগল।

তুলসী সামনে পাতা বেঞ্চি দুটোর পাশ কাটিয়ে দোকানে উঠে এসে মাজা ঘষা গলায় বলে উঠল, ‘সেই টোয়েনটিনাইনই চালাচ্ছিস তো? না, তোরা আর সাবালক হলি না কোন কালে।’

সুখেনের সঙ্গেই লাগে বেশী। সুখেন বলে, ‘তা তোর কী নির্দেশ? জুয়ো খেলতে হবে?’

‘ও ছাড়া আবার কেউ খেলে নাকি?’

‘ওসব বাবু ভদ্দরলোকদের খেলা—’ রাজেন বলে, ‘আমাদের জুয়োর বাজি ধরবার পয়সা কোথায়?

‘ও থেকেই পয়সা আসে, তুলসী চৌকিটার একধারে বসে পড়ে বলে, ‘চা সব ফুরিয়ে ফেলেছিস? কি গো ননীদা?’

‘তা, তুই আসছিস আমি জানতাম?’

‘জানা উচিত ছিল।’

‘হাত গুণতে তো জানি না।’

‘তাও জানতে হয়।’

তুলসী হাত বাড়িয়ে বলে, ‘কার পকেটে সিগ্রেট আছে একটা ছাড় দিকিন!’ প্যাণ্ট—শার্টই এখন জাতীয় পোশাক, অতএব সুখেন, রাজেন, জগাই তিনজনেই প্যাণ্টের পকেটে হাত পুরে একটা করে বিড়ি বার করে এগিয়ে ধরল। ননীর পরনে ধুতি গেঞ্জি, ওর পকেট নেই।

‘বিড়ি?’

নাক কোঁচকালো তুলসী, ‘মানুষের মতন হবার যদি কোন বাসনা থাকে তোদের! যা শিখেছিস তাই।’

তুলসী নিজের হাতে ঝুলানো ব্যাগ থেকে একটা সিগারেটের প্যাকেট বার করে তা থেকে তিনটে সিগারেট বার করে তিন জনের দিকে এগিয়ে ধরে বলে, ‘নে খা! ভাল জিনিস কাকে বলে দেখ।’

সাগ্রহে লুফে নিয়েও ওরা ঠোকা দেওয়া গলায় বলে উঠল, ‘তুই এখন পয়সাওলা মানুষ। ভাল জিনিস কাকে বলে দেখাবি বৈকি।’

তুলসী ততক্ষণে নিজে একটা ধরিয়ে টান দিয়ে প্যাকেটটা ননীর দিকে ঠেলে দিয়ে বলে, ‘ননীদা চলবে?’

ননী নেয় না, গম্ভীর গলায় বলে, ‘ভাল জিনিস গরীবের পেটে সয় না। যার খাবার সে খাক। মেয়েছেলের ধোঁয়া খাওয়া আমার দু চক্ষের বিষ।’

তুলসী স্বচ্ছন্দে সেই বিষাক্ত দৃশ্যটা ননীর সামনে দৃশ্যমান করে আরামের ধোঁয়া ছড়িয়ে বলে, ‘তুমি তাহলে এখনো আমায় মেয়েছেলে বলে মনে রেখেছ ননীদা? আমি নিজে ভুলে গেছি।’

‘সেটা খুব বাহাদুরী নয়।’

বলে ননী নিজে একটা বিড়ি ধরায় তাক থেকে পেড়ে এনে!

‘বিড়ির গন্ধে আমার মাথা ধরে।’ তুলসী বলে।

সুখেন বলে, ‘এখন তা ধরবে বৈকি। এখন যে দামী মাথা। একদা আধখানা পোড়া বিড়ির জন্য ঘুর ঘুর করেছিস। সে সব দিন তোর মনে না থাকলেও আমরা ভুলিনি রে তুলসী!’

কথাটা মিথ্যা নয়।

তুলসীর বাল্য—কৈশোরের প্রধান সঙ্গীই ছিল এই ছেলে তিনটে। আরও একজন ছিল—ফণী। একদিন তুলসী ফণীর হাত কামড়ে রক্ত বার করে দিয়ে ফণীর সম্পর্ক ত্যাগ করেছিল।

সুখেন রাজেন জগাই ক্ষেপে গিয়ে বলেছিল, ‘বল তো কী করতে এসেছিল, শালাকে খতম করে দিই।’

তুলসী গম্ভীরভাবে বলেছিল, ‘আমার ব্যাপার নিয়ে কারুর মাথা ঘামাতে হবে না। যা করতে এসেছিল তা তোরাও যে—কোন টাইমে করে বসতে পারিস। তোদের জাতকে বিশ্বাস আছে?’

নিতান্ত কৈশোরকালের দুর্মতিতে ওই মুখ্যু লক্ষ্মীছাড়া, বলতে গেলে ‘রাস্তার ছেলে’ তিনটে মাথার ওপর দায়হীন পাড়াবেড়ানী মেয়েটার সঙ্গে একটু অধিক ঘনিষ্ঠতার আশায় যে ঘুর ঘুর করেনি তা নয়, তবে সুবিধে হয় নি। তুলসীকে ভয়ও করে এসেছে বরাবর।

তুলসীকে ধোঁয়ার নেশা ধরিয়েছে ওরাই। সুখেনটাই বেশী সাহসী ছিল, সে—ই ওকে ডেকে ডেকে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছে, ‘খেয়ে দ্যাখ না, দেখবি কী মজা!’

কিন্তু তার বদলে সুখেন যদি নিজে কিছু মজার প্রত্যাশা করেছে, ঠাস করে তার গালে এক চড় বসিয়ে পোড়া বিড়িটা তার মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে চলে এসেছে তুলসী।

অতঃপর আবার সুখেনের খোসামোদের পালা, মা—কালীর দিব্যি গালা।

তুলসী চড়া গলায় বলেছে, ‘মনে থাকে যেন। যতক্ষণ বন্ধু আছিস ঠিক আছি, ‘শত্রু’ হতে আসিস তো খুন করে ফেলব।’

ননী অবিশ্যি ওভাবে ওদের দলে ঘুরে বেড়ায়নি কখনো, বয়েসে ক’বছরের বড় বলেও বটে, আর সংসারের ধান্দাতেও বটে। দোকান দিয়েছে তো আজ নয়, কোন ছোটবেলাতে।

তখন তুলসী তার দোকানে কাজ করে দিয়েছে ঢের।

ঘর—জ্বালানী পর—ভোলানী তুলসী সেই বোতাম—খোলা পিঠ—হাঁ হাঁ—করা ফ্রক পরেই এসে এসে উদয় হয়েছে। উনানে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, চায়ের গেলাস ধুয়ে দিয়েছে।

ফণীও তার সঙ্গে সঙ্গে লেগে কাজ করেছে তখন। …ক্রমে ক্রমে কখন বড় হয়ে শাড়ি ধরেছে, কেউ লক্ষ্য করেনি তুলসী বড় হয়েছে।

একদিন ননীই বারণ করল।

বলল, ‘কাল থেকে তুই আর আসিস না তুলসী!’

তুলসী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কী বুঝল কে জানে, সংক্ষেপে বলল, ‘আচ্ছা।’

‘রাগ দুঃখু করিস না।’

এটা যদি না বলত ননী, তুলসী হয়তো নিঃশব্দেই বিদায় নিত, কিন্তু এই পিঠে—হাত—বুলানো কথায় ক্ষেপে গেল। তবে চেঁচাল না কড়া গলায় বলল, ‘সে ভয় করতে হবে না ননীদা, চাকরী থেকে বরখাস্ত হওয়া আমার এই নতুন নয়।’

‘চাকরী! আমার এখানে তুই চাকরী করতিস? আমি তোকে কোন দিন মাইনে দিয়েছি?’

‘বিনি মাইনেতেই তো দূর হ বের হ, মাইনে দিলে আরও কী করতে কে জানে।’

‘তোর ভালর জন্যেই বলেছি—’

‘তা জানি।’

বলে তুলসী চলে গেছে।

তারপর আবার ননী নিজে গিয়ে যেচে ডেকে এনেছে ওর বিয়ের সময়।

‘দিদি একা, বিয়ের কাজ কে তোলে?’

ননী বলেছিল, ‘তুই আমার ছোট বোনের মতন, দিদিতে তোতে কাজ ঠেলতে হবে।’

অনুরোধ রেখেছিল তুলসী।

গতরও তো অসীম।

সেই সময় বোধহয় ওই ফণী—ঘটিত ঘটনাটা ঘটেছিল। কিছুদিন পরে ফণী পালাল।

তারপর তো গঙ্গায় কত জল গড়াল।

তুলসী লোকের বাড়ির ছেলে—ধরুনীর চাকরী ছেড়ে হাসপাতালে আয়ার কাজে ট্রেনিং নিতে গেল। তাতে পাশ করে চাকরী ধরল, নিজে আলাদা বাসা করল, দামীলোক হয়ে গেল তুলসী।

এদিকে ননীর ভাই পালালো, বৌ মলো, এবং দোকানের জন্যে কোন মাথা না খাটিয়েও আয় বাড়তে লাগল।

বাড়বেই!

যে যেখানে যে ব্যবসাই খুলে বসুক, তার আয়বৃদ্ধি হবেই। কারণটা জনসংখ্যা বৃদ্ধি। প্রত্যেকটি জায়গাতেই চাহিদার ভীড়, এই ভীড়ের চাপেই ফাটা—চটা কাঁচের গ্লাসের চা আর তার লেড়ো বিস্কুটের অনুপানও পড়তে পায় না!

শুধু আয়—বৃদ্ধির প্রশ্ন নেই চাকুরে লোকদের। তাদের মাসে বছরে হিসেব করে অঙ্ক কষে মাইনে বাড়ে। সুখেন রাজেন জগাই তিনজনেই এই রেল ইষ্টিশানের ধারে কাছে এটা ওটা একটা কাজ যোগাড় করে নিয়েছে, সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে যৎসামান্য মজুরী।

যার মার্জিত নাম মাইনে।

ওদের পক্ষে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখাও পাগলামি। অথচ একদা ওরা প্রত্যেকেই সে স্বপ্ন দেখেছে। আর হাসির কথা এই, লজ্জার কথাও, প্রত্যেকেই সে স্বপ্ন দেখেছে একটি মূর্তিকে কেন্দ্র করে।

যে মূর্তিটা এক অদ্ভুত রহস্যময়ীর।

যার চোখে প্রশ্রয়, বাহুতে প্রতিরোধ, ভঙ্গীতে আমন্ত্রণ, কণ্ঠে বিষবাণ।

হয়তো এমন রহস্যময়ী বলেই এমন আকর্ষণীয়া। আর প্রত্যেকেরই কেমন মনের মধ্যে একটা আশ্বাস ছিল, তার কাছে বুঝি দুর্লভ নয়।

তাই তাকে ঘিরে ঘিরে স্বপ্নের জাল রচনা।

এটা একদার।

এখন আর সে স্বপ্নের মোহ নেই।

এখন ওরা জেনে গেছে মূর্তিটা তাদের নাগালের বাইরের বস্তু।

‘তখন যদি এই সামান্য চাকরীটুকুও জুটত,—আলাদা আলাদা করে ভেবেছে সুখেন, রাজেন, জগাই, হয়তো ও হাতছাড়া হয়ে যেত না। এখন সে দূর আকাশের তারা।

তবে আর কী করা?

যে যেমন পারে বিয়ে—থা করে ঘর—সংসার করা, এই তো? তা এমনি কপাল ওদের, যেমন—তেমনও পাচ্ছে না। রাস্তায় রাস্তায় আড্ডা দিয়ে বেড়ানো এই বখাটে ছেলে ক’টাকে যে সবাই চেনে এখানকার! দেখে জামাই করবার ইচ্ছে কারো জাগে নি।

ওদের মতই হতভাগা লক্ষ্মীছাড়া মেয়ে দু’একটা হ্যাংলার মত ওদের পিছু নিয়েছিল, পাত্তা না পেয়ে খসে পড়েছে। পুরুষ নিজে হ্যাংলামী করতে পারে, কিন্তু হ্যাংলা মেয়ে তাদের অসহ্য।

অথচ বিয়ের বাসনাটা একেবারে বিসর্জনও দেয়নি কেউ, মনের মধ্যে আশা, ভবিষ্যতে কিছু একটা হবে। যেন সেই অদৃশ্য ভবিষ্যৎ তাদের জন্যে কী একটা উপহার হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ দিয়ে দেবে একদিন। আবাল্য একসঙ্গে একই পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই ছেলে তিনটের মানসিকতাও যেন একই। ননী ওদের সঙ্গে তাস খেলে, ননী ওদের হিতৈষী বন্ধু, কিন্তু মনের সঙ্গী নয়।

ননীর কাছে কোনদিন বলে বসতে পারবে না সুখেন, ‘শালার বিয়ে ফিয়ে একটা না হলে আর চলছে না। কোন দিন হয়তো স্বভাব খারাপ করে বসব।’

না, ননীর কাছে বলতে পারে না, অথচ জগাইয়ের কাছে অনায়াসে বলতে পারে, বলতে পারে রাজেনের কাছে।

সুখেনেরই চাঞ্চল্যটা বেশী, কাজেই ইচ্ছেটাও বেশী। কিন্তু হলে কি হবে? ইচ্ছের গাছে ফুল ফুটছে না। তাই ওদের আর ‘জীবন’ বলে কিছু নেই, আছে ‘দিনরাত্রি।’

অতএব ওদের সেই দিনরাত্রিটাই কাটছে। জীবন অদৃশ্য। সেটাও যে কেটে যাচ্ছে টের পাচ্ছে না।

তবু রাজেন আর জগাই সুখেনের মত নয়। ওদের বোধহয় চাঞ্চল্যটা কম। ওরা শুধু আশা করে মাইনেটা আর একটু বাড়লে তবে কিছু একটা করবে। বিয়ে, অথবা ‘স্বভাব খারাপ’।

সুখেনের তবু একটা পিসি আছে ভাত রেঁধে দিতে, একটা বাপ আছে, ‘কিরে তোর আজ এতো দেরী হলো যে?’ বলে মুখ বাড়িয়ে দাঁড়াতে। ওদের তো বলতে গেলে কেউই নেই।

রাজেন ছেলেবেলায় তার জ্যাঠতুতো বোন—ভগ্নিপতির বাড়িতে থাকত। সম্পর্কটা শুনলেই বোঝা শক্ত নয়, স্রেফ ‘গলায় পড়া’র পোস্টেই থাকত। কোন একদিন কোন বচসা অথবা অবজ্ঞার নির্লজ্জ প্রকাশে সে আশ্রয় থেকে খসে পড়েছে রাজেন। আর জগাই? এই কিছুকাল আগেও তার একটা দূর—সম্পর্কের বুড়ো মামা ছিল, রেল কোম্পানীর কোন চাকুরে রিটায়ার করে এখানেই থেকে গিয়েছিল। জগাই তার পোষ্য ছিল। প্রথম জীবনে সে জগাইকে রেঁধে খাওয়াত, শেষজীবনে জগাই তাকে। তারপর তো মরেই গেল বুড়ো। তার দরুন ঘরটাতেই রয়ে গেছে জগাই, তারই অকিঞ্চিৎকর জিনিসপত্রকে পরম পদার্থ ভেবে।

জগাইয়ের এই বাসাটাতেই রাজেন শোয়, আর যেখানে যেমন পারে খেয়ে নেয়। সস্তার হোটেলও যে একেবারে নেই তা নয়।

তবু আশ্চর্য, এই করণপুর রেলস্টেশনের ধারে—কাছেই রয়ে গেছে এরা। ভাগ্য—অন্বেষণে এদিকে সেদিকে চলে যায়নি। অথচ সেই যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। এ রকম বন্ধনহীনেরাই তো ভবঘুরে হয়ে যায়, বৈরাগী হয়ে যায়, বাউণ্ডুলে হয়ে বেড়ায়।

কিসের বন্ধনে যে এই খুঁটিটাতে বাঁধা পড়ে আছে তিনটে ছেলে, বলা বড় শক্ত। ননীর তবু এখানে আটকে থাকার পিছনে একটা যুক্তি আছে, তার দোকান! তার সংসার! বিধবা দিদি, মা—মরা ছেলেমেয়ে, এটা সোজা বন্ধন নয়।

এরা বেকুব। এরা বোধহীন।

বাইরে ছিটকে বেরিয়ে পড়লে এই বৃহৎ বিশ্বে তারা হয়তো ছড়িয়ে পড়ে নিজেরাও বৃহৎ হতে পারত, কিন্তু সে বুদ্ধি মাথায় আসেনি ওদের। ওরা জানে এই করণপুর রেলস্টেশনের আশপাশটাই পৃথিবী, আর এই ননীর দোকানের তাসের আড্ডাটাই তাদের সুখকেন্দ্র।

ওর বেশী সুখের প্রত্যাশা ওদের কাছে ধূসর হয়ে গেছে।

শুধু যেদিন ওই মগডালের ফুলটা হঠাৎ এই ভাঙা চৌকির ওপরে পাতা ছেঁড়া মাদুরটার ওপর আপনা থেকেই এসে টপ করে পড়ে, সেদিন যেন সেই ধূসরতার ওপর একটা আলো—আলো আভা ঝলসে ওঠে।

অথচ চলে গেলে কেউ ছেড়ে কথা কয় না, সবাই সমালোচনায় তৎপর হয়ে ওঠে। সেটা কী আশাভঙ্গে?

না, হীনমন্যতায়?

আচ্ছা ওকে নিজেদের থেকে অত উঁচুই বা মনে হয় কেন এদের? পরিচয়ের মধ্যে তো রেল হাসপাতালের আয়া। প্রয়োজনের সময় হাতে—পায়ে ধরে ডাকলেও ভদ্রলোকেরা তো ওকে নীচু ভেবে ঘেন্না করে। ও বাড়িতে এলে যদি এক পেয়ালা চা দেয় তো দেখে—শুনে ফাটা গেলাসে, যেটা ফেলে দিলে চলবে। তুলসী যদি মাদুরে—বসে তো, তুলসী চলে গেলে গিন্নীরা সেটা কেচে ফেলেন।

তবু রাজেন, সুখেন আর জগাই তুলসীর থেকে নিজেদের নীচু ভেবে জ্বালা পায়। সেই জ্বালাতেই পুরনো দিনের কথা মনে পড়িয়ে দিয়ে ঠোকা দিয়ে বলে, ‘তুই ভুলে যেতে পারিস সে—সব কথা, আমরা ভুলিনি।’

আর ‘তুই’ বলে কথা বলতে সমীহ আসে বলেই, জোর করে বলে সেটা। তুলসী ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতেই বলে, ‘তা’ ভুলবি কী করে! গোয়ালের গরুর মতন এক খোঁটাতেই বাঁধা রইলি চিরজীবন!’

সুখেন বলে, ‘তুই বা কোন আকাশে উড়লি?’

‘মেয়েমানুষের কথা বাদ দে। ডানা—ভাঙা পাখি। তোদের চেষ্টা থাকলে মানুষ গৎরে যেতে পারতিস।’

‘এখনো কিছু খারাপ নেই’—বলল রাজেন।

‘পাঁকের ব্যাঙও ভাবে এমন কিছু খারাপ নেই, বেশ আছি। যাক গে, সুখেন তোর বিয়ে না?’

সুখেন গম্ভীরভাবে বলে, ‘হুঁ।’

‘কবে?’

‘যবে হবে তুই অন্তত একপাত নেমন্তন্ন পাবি। কিছু না হোক পাইস হোটেলেও নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দেব।’

তুলসী দুহাত উল্টে বলে, ‘কি জানি বাবা! তোর পিসি তো বলছিল—’

‘পিসি অমন অনেক দিবাস্বপ্ন দেখে।’

ননী বলে, ‘এই, এ দানটা খেলা হবে, না তাস ভেস্তে গেছে?’

‘না না, ভেস্তাবে কেন?

তাস কুড়িয়ে নেয় সুখেন, রাজেন আর জগাই।

আর ওর মধ্যেই তুলসী ফস করে ননীর কোলের সামনের তাসের গোছাটা টেনে তুলে নিয়ে অম্লান বদনে বলে, ‘আমি দু দান খেলে দিচ্ছি ননীদা, তুমি খেয়ে এসো।’

‘তুই তো এই নাবালকের খেলা খেলিস না।’

‘খেলি একটু। বালকের দলে যখন এসেই পড়েছি। যাও খাওগে। দিদি ফায়ার, হচ্ছে তো বসে বসে।’

‘ফায়ার হতে এখনও ঢের দেরী। এই তো সবে কলির সন্ধ্যে।’

‘তবে তোমার তাস ধরো।’

‘না না, তুই খেল না, আমি একটু দেখি।’

খানিকক্ষণ খেলা চলে, মাঝে মাঝেই উৎসাহবাণী শোনা যায়, এবং বাকি তিন জনের মুখ দেখে মনে হয় এর আগে ওরা শুকনো খড় চিবোচ্ছিল, এতোক্ষণে জিভে রস এলো।

‘তা হলে তোরা বে—থা কেউ করছিস না?’

পিঠ কুড়োতে কুড়োতে বলে ওঠে তুলসী।

‘কাকে বলছিস?’

‘সবাইকেই।’

সুখেন সব সময় প্রধান বক্তা, সুখেন বলে ওঠে, ‘আপনি খেতে ঠাঁই পায় না শঙ্করাকে ডাকে। হুঁ। বিয়ে! তা হঠাৎ আমাদের ভাবনায় মাথা ঘামাচ্ছিস যে?’

‘পুরনো কালের বন্ধু, তাই আর কি। নে খেল। আগে কে ডেকেছে?’

বিয়ে শব্দটাই মুখরোচক।

কথাটা প্রত্যেকের মনেই একটু না একটু প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

তাই খানিকটা খেলতে খেলতে রাজেন হাসির মত স্বরে যেন আপনমনে বলছে এই ভাবে বলে ওঠে, ‘তুলসী কি আজ কাল আয়াগিরির সঙ্গে সঙ্গে ঘটকালিগিরিও ধরেছিস?’

‘ধরলে খারাপ কী?’

‘না খারাপ কিছু না। তা সন্ধানে পাত্রী আছে নাকি?’

‘আছে।’

‘কোথায়? কোথায়?’

‘বলে লাভ? তোরা তো আর বে করছিস না!’

‘করতে কী আর অসাধ রে তুলসী!’ বোকা জগাই চট করে বলে বসে, ‘একটা বৌ বিহনে তো জগৎ শূন্য। কিন্তু আমাদের মতন হতভাগাকে মেয়ে দিচ্ছে কে?’

‘তা’ ইহ পৃথিবীতে যেমন রাজার জন্যে রাণী আছে, তেমনি কানার জন্যে কানী আছে। তোদের উপযুক্ত পাত্রীই হত।…এই দেখো, কথায় কথায় ভুল চাল দিয়ে বসলাম। …কই ননীদা, খেতে গেলে না?’

ননী গম্ভীরভাবে বলে, ‘আমি থাকায় তোর কোন অসুবিধে হচ্ছে?’

‘আমার? আমার আবার কী অসুবিধে হবে! এইটুকুর মধ্যেই পদ্মদি বার তিনেক দরজার আড়াল থেকে উঁকি মেরে গেছে।’

‘তার কারণ অন্য।’

‘তাই বুঝি? পদ্মদির এখনো বেশ এনার্জি আছে বলতে হবে।’

বেশ জোর জোর গলাতেই বলে তুলসী।

বাইরের জগতে কাজ করে করে তুলসী অনেক কথা শিখেছে।

নিজের ব্যাপারেও প্রয়োগ করতে ছাড়ে না সে—সব। এখন আর খেটেখুটে এসে বলে না ‘দুব্বল লাগছে,’ বলে ‘ভারী, টায়ার্ড লাগছে।’ ‘এতে আমার ঝোঁক নেই’ না বলে, ‘ওতে আমার কোনো ইণ্টারেস্ট নেই।’ ‘সারারাত্তির’ না বলে তুলসী বলে ‘হোল নাইট।’ সারাদিনকে ‘হোল ডে।’ হয়তো ওই ডে নাইট ডিউটি দিতে দিতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

‘তুলসী, তোর রাত হয়ে যাচ্ছে না?’

ননী বলে।

ননীর দিদি যে এই মেয়েটাকে দু’চক্ষের বিষ দেখে, এবং এরকম রাত—দুপুরে হঠাৎ হঠাৎ এসে ক’টা দস্যি ছোঁড়ার তাসের আড্ডায় বসে পড়ে তাস খেলে আর সিগারেট খায়, এতে দিদি রাগের চোটে জলে পড়ে কী আগুনে পড়ে, এটা ননীর জানা। তাই হয়ত ননী বাঁধ দিতে চেষ্টা করে।

কিন্তু ওটুকু তো সমুদ্রে বালির বাঁধ।

ননীর এই ভয়ে তুলসী বরং যেন মজা পায়। তুলসী বেশ জোরালো গলায় বলে, ‘হুঁঃ। ভুতের আবার জন্মদিন! তুলসীর আবার রাত!…এই করণপুরের যত ভূত টুত রাক্ষস খোক্কস, সবাই আমার চেনা ননীদা। রাত্তিরে ফিরতে হলে বাড়ি ফেরার সময় ওদের সঙ্গেই গল্প করতে করতে যাই।’

সুখেন ব্যঙ্গের গলায় বলে ওঠে, ‘তোর যাবার পথে ওরা ওৎ পেতে বসে থাকে বুঝি?’

‘তা তো থাকতেই পারে। হাঁউ মাঁউ খাঁউ মনিষ্যির গন্ধ পাঁউ।’

‘আজ তোর নাইট ডিউটি নেই?’

‘আছে। রাত বারোটার পর থেকে। অপারেশন হবে—’

‘তা’ তুই তো আর নার্স নয়?

তুলসী মুখে—চোখে একটি অহঙ্কারের বিদ্যুৎ ঝলসে বলে, ‘ডাক্তারবাবুরা পাশকরা নার্সদের থেকে আমার ওপর বেশী বিশ্বাস রাখে।’

‘তা’ রাখবে বৈ কি!’

রাজেনও বিদ্রূপে গলা শানাতে ছাড়ে না, ‘ইয়াং ডাক্তাররা বোধহয়?’

‘ইয়াং! তুই আর হাসাসনে রাজেন—’

হাসাতে বারণ করেও লহরে লহরে হেসে ওঠে তুলসী, ‘যত পাপে পাপী বুঝি ‘ইয়াংরা’? বরং ওরাই সভ্য। আসল পাজী হচ্ছে বুড়ো বজ্জাতরা।’

‘হু! সেটা তা হলে জানা হয়ে গেছে?’ সুখেন হাতের তাস অসময়ে ফেলে দিয়ে বলে ওঠে, ‘নাইট ডিউটি তাহলে শুধু রুগীর ঘরেই দিতে হয় না।’

‘ছোটলোকের মতন কথা বলিসনে সুখেন! এক এক সময় তোর কথা শুনলে ইচ্ছে হয় খুন করে ফাঁসি যাই। হাতের তাস ফেললি যে?’

‘আর ভাল লাগছে না—’

‘লাগবে, আর একটু ধোঁয়া খা। এই সেরেছে, সিগ্রেট তো ফর্সা!…দে তোদের ওই বিড়ির একটা দে?’

ননী নড়ে চড়ে বসে বলে, ‘তোর তো বিড়ির গন্ধে মাথা ধরে।’

‘ধরে তো। তবে সুখেন পাজীটার কথা শুনে আগেই ধরে উঠেছে চড়াৎ করে। এখন বিষে বিষক্ষয় হোক।’

চার চারটে পুরুষের সঙ্গে বসে বসে অবলীলায় বিড়ি টানতে থাকে তুলসী! ওর ভাব দেখে মনে হয়, ও—ও বুঝি সুখেন—রাজেনদেরই একজন।

‘খেলাটা তা’হলে আর হচ্ছে না?’ ননী ছড়ানো তাসগুলো কুড়োতে কুড়োতে বলে, ‘তখনই জানি।’

‘কখন?’

‘যখন শনির উদয় হয়েছে।’

‘শনির উদয় তো আর তোমাদের জীবনে আজ হয়নি ননীদা! চিরকালই আছে।’

‘তা, তুই এসে বসলেই জমাটি খেলাটা নষ্ট হয়ে যায় কিনা?’

‘সেটা আমার দোষ নয়। আমার যেদিন ছুটিছাটা থাকে, পুরনো বন্ধুদের জন্যে মনটা একটু টানে। তাই চলে আসি। এদিকে তোমরা মনে গেঁথেই রেখেছ তুলসী একটা মেয়েমানুষ।’

‘যা সত্যি, তা আর গেঁথে রাখার কী আছে রে তুলসী? ভগবানের নিয়ম উল্টে দিবি?’

‘ভগবানের নিয়ম?’

তুলসী উদাস গলায় বলে, ‘তা হবে। ভগবান লোকটা যে কেমন, কী তার নিয়ম, জীবনে তো দেখতে পাইনি। চিরজীবন শুধু ভূত—প্রেত দত্যি—দানোই দেখেছি।’

বলে উঠে দাঁড়ায় তুলসী।

আর ঠিক এই সময়ই পদ্মর ভারী ভারী গলার স্বর শোনা যায়, ‘খাওয়া—দাওয়া কি আজ আর হবে না ননী?’

তুলসীর মুখে একটু বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে যায়। তুলসী গলা তুলে বলে, ‘এতক্ষণে কোনকালে তাসটাস উঠে যেতো পদ্মদি, এই আমিই এসে পড়ে দেরী করিয়ে দিলাম। এবার যাচ্ছি।’

পদ্ম বোধকরি মনে মনে বলে, ‘যাও! আমি বাঁচি।’ তবে মুখে তো অন্য কথা বলতেই হবে। তুলসীকে আর আগের মত কটুকথা বলা চলে না। তুলসীর এখন একটা পোজিশন হয়েছে। তাই সৌজন্যের গলা করে বলে ওঠে পদ্ম, ‘ওমা সে কী! এক্ষুনি যাচ্ছিস বা কেন? পুরনো ইয়ারবন্ধুর সঙ্গে একটু খেলাধুলো করতে এসেছিস—’

‘সেই সঙ্গে তোমার পায়ের ধুলোও একটু নিতে এসেছিলাম পদ্মদি!’

বলে তুলসী এগিয়ে যায়।

পদ্মর শুচিবাইয়ের কথা সর্বজনবিদিত, তাই তুলসীর মুখে—চোখে কৌতুকের ছটা।

‘থাক থাক। আর আমার পায়ের ধুলো নিতে হবে না,’ বলে পদ্ম টপ করে মাঝখানের দরজাটাই বন্ধ করে দেয়। যেটার আড়াল থেকে চোদ্দবার উঁকি মারছিল।

দরজাটা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে তুলসী হি হি করে হেসে ওঠে।

আর ওই হাসিটা শুনে মনেই হয় না তুলসী আটাশ বছরে গিয়ে পৌঁছেছে।

তুলসীর যখন আট বছর বয়েস, তখন ওই রকম হাসত তুলসী তার কাকীমার মাকে ছুঁয়ে দেবার ভয় দেখিয়ে।

সে—ও এক শুচিবাই বুড়ি ছিল।

জামাই—বাড়িতে থাকতো বুড়ি, আর জামাইয়ের চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করতো গাল দিয়ে ভূত ভাগিয়ে। কারণ একা তুলসীই নয়, কাকার ছেলে বৃন্দাবনও তুলসীর সঙ্গে থাকতো। ইচ্ছে করে আঁস্তাকুঁড়ে নেমে বুড়িকে ছুঁতে যাওয়া তাদের একটি প্রিয় খেলা ছিল।

যদিও কাকী তুলসীকেই বলতো, ‘নাটের গুরু।’ বলতো, ‘বেন্দা কক্ষণো এতো পাজী হয়ে উঠতো না, যদি ওই হারামজাদী মা—বাপ খেয়ে আমার সংসারে এসে না ঢুকতো।’

কিন্তু তুলসী কী দুঃসাহসী! তুলসী তার সেই অসহায় অবস্থাতেও অনায়াসে বলে উঠতো, ‘ইস! ওনার সংসার! এটা যেন আমাদের বাড়ি নয়? বাড়ি কাকার, বেন্দার, আমার, আর পুঁটুর। তুমি তো অন্যবাড়ির মেয়ে।’

কে যে চিরকাল তুলসীকে এতো দুঃসাহসের যোগান দিয়ে আসছে।

কাকীমা গলাধাক্কা দিয়ে বার করে দিতে আসতো, আর তুলসী হি হি করে হেসে হেসে বলতো, ‘ও দিদিমা, দেখো তোমার মেয়ে আমায় ছুঁতে আসছে। এক্ষুনি তোমার রান্নাঘরে ঢুকবে—আমি আঁস্তাকুড় মাড়িয়েছি।

শাপ—শাপান্ত?

গালি—গালাজ?

সে সবে কিছু এসে যেত না তুলসীর। শেষ পর্যন্ত তুলসীকে ওরা চালান করে দিলো গ্রামের ঘোষালগিন্নীর মেয়ে—জামায়ের সঙ্গে। জামাই এই করণপুরের রেলবাবু ছিল।

তারপরের ইতিহাস তো সকলেরই জানা।

চালান করে দেবার আগে একদিন তার কাকা কাকীর চোখের আড়ালে তুলসীকে পিঠে হাত বুলিয়ে বলেছিল,—’এতে তোর ভালই হবে মা! এখানে তো অশেষ বিশেষ কষ্টের মধ্যেই আছিস! খাওয়া পরার কষ্ট—’

তুলসী কেমন একটা দুরন্ত অভিমানে নীরব হয়ে গিয়েছিল। যদিও ঘোষাল—গিন্নীর মেয়ে তাকে প্রলুব্ধ করতে স্বর্গের ছবি এঁকে ধরেছিল তার সামনে। এমন কি তদ্দণ্ডেই একটা সস্তা ছিটের ফ্রক কিনে এনে তুলসীর হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘এইটা পরে পরশু রেলগাড়িতে চাপবি। এরকম আরো অনেক জামা দেবো।’

সেই ফ্রকটাই পিঠের বোতাম হারিয়ে শেষ অবধি তুলসীর গায়ে থেকেছে।

তুলসীর মধ্যেকার যেমন একটা বোবা অভিমান তাকে মূক করে রেখেছিল, তেমনি আবার একটা অজানা জগৎ সম্পর্কে ধীরে ধীরে কৌতূহলীও করে তুলেছিল। রেলগাড়ি…অনেক অনেক দূরের দেশ…রেল কোয়ার্টারের বাড়ি যার ছাত থেকে রেলগাড়ি যাওয়া দেখতে পাওয়া যায়, এঞ্জিনের বাঁশী শোনা যায়, সে সব কোন জগতের? আর এঞ্জিনের বাঁশী?

ওই বাঁশীর ডাকটা কোন দূর থেকে যেন কানে আসছিল। তাই তুলসী চলে এসেছিল।

না এলে কাকীর কী সাধ্য ছিল তুলসী নামের মেয়েটাকে ঘোষালগিন্নীর মেয়ের হাতে সঁপে দেবার। আট বছর বয়স হলে কি হবে, তুলসী তখন অবলীলায় সাঁতরে দীঘির এপার ওপর হতে পারতো, অনায়াসে উঁচু গাছের মগডালে চড়ে বসতে পারতো, দুপাঁচ মাইল হেঁটে অন্য গাঁয়ে পৌঁছে যেতে পারতো।

ইচ্ছে করে ধরা না দিলে তুলসীকে ধরে খাঁচায় পোরার সাধ্য ছিল না ওদের। তুলসী অভিমানেই হোক, আর অন্য এক জগতের পিপাসাতেই হোক, স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছিল।

করণপুরে আসার পর ঘোষালগিন্নীর মেয়ে যখন তার বাপের বাড়ির চিঠি এলে ডেকে ডেকে বলতো, অ তুলসী এই দ্যাখ কেষ্টপুরের চিঠি এসেছে—আমার ভাজ লিখেছে তোর কাকা—কাকী ভাল আছে, পুঁটু বিন্দাবন ভাল আছে, তোকে বলতে বলেছে।’

তুলসী অম্লানবদনে ঘর ছেড়ে চলে যেতে যেতে বলতো, ‘শুনে আমার কী সগগো লাভ হবে?’

‘সর্বনেশে মেয়ে!’

বলতো ঘোষালগিন্নীর জামাই, ‘জেনে—শুনে বাপের বাড়ি থেকে একটি বিচ্ছু ধরে নিয়ে এলে পুষতে?’

তুলসী আড়াল থেকে শুনে ভেংচি কাটতো।

তুলসীর এই বুকের পাটাটা কী দিয়ে তৈরী করেছিল তার সৃষ্টিকর্তা কে জানে! লোহা! পাথর? ইস্পাত?

তুলসীর ওই হাসিটা যেন বাইরের অন্ধকারটাকে খান খান করে কাটে।

ননী বলে, ‘দিদিকে ক্ষেপিয়ে তোর কী সুখ হয় বলতো তুলসী?

তুলসী আরো হেসে বলে, ‘কী জানি। শুধু দিদিকে কেন, যাকে পাই তাকেই। ক্ষেপানোতেই আমার সুখ।’

খেলা ভেঙে গিয়েছিল, সবাই রাস্তায় নেমে পড়েছে।

সুখেন বলে উঠল, ‘অন্ধকারে অত তড়বড়িয়ে হাঁটিসনে তুলসী, একটু আস্তে পা চালা। আমি তোর সঙ্গে যাচ্ছি, পৌঁছে দেব বাড়ি অবধি।’

সুখেনদের বাসা তুলসীর বাড়ির রাস্তায়, আর খানিকটা এগিয়ে গেলেই দিতে পারে পৌঁছে। রাজেন জগাই চলে উল্টোমুখো রাস্তায়।

‘পৌঁছে দিবি?’

তুলসী দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, ‘দিলে তিনজনে মিলে দিবি—’

‘তিনজনে! ওদের বাসা কোথায় আর তোর বাসা কোথায়!’

‘তবে থাক। একাই যাচ্ছি, কাউকে পৌঁছতে আসতে হবে না।’

‘কেন? হঠাৎ রাগের কারণটা কী?’

‘রাগ? মোটেই না।’

তুলসী অনুচ্চ একটু হেসে বলে, ‘অবিশ্বাস।’

‘অবিশ্বাস!’

‘তবে আবার কী! তোদের জাতটাই অবিশ্বাসী। পৌঁছতে এসে হয়তো হাত ধরে নিয়ে যেতে চাইবি।’

‘কবে এ রকমটা হয়েছে রে তুলসী?’

‘হবার সুযোগ দিলেই হতো। হয়নি তাই। এই রাজেন জগাই, এদিকে আয় চটপট।’

‘ওদিকে কেন?’

‘আমায় পৌঁছে দিবি।’

‘সুখেন যে বললে দেবে—’

‘একা ওর সঙ্গে যেতে ভয় কাটছে না। দলে ভারী থাকলে সাহস আসে।’

যদিও রাত হয়েছে, যদিও এখন আর অতটা হাঁটার ইচ্ছে নেই, তবু এ আহ্বান প্রত্যাখ্যান করাও শক্ত।

ওরা দুজনে এমুখো ফিরে আসে।

‘ঠিক আছে, তোরাই যা।’

বলে সুখেন হন হন করে এগিয়ে যায়।

রাজেন অবাক হয়ে বলে, ‘এইটুকুর মধ্যে হঠাৎ কী হল রে তুলসী?’

‘কিছু না, একটু ক্ষ্যাপালাম।…যারা ক্ষ্যাপালেই ক্ষ্যাপে তাদের দেখতে বেশ মজা লাগে আমার।’

কিন্তু যারা নিজেরাই ক্ষেপে বসে আছে?

তাদের দেখলে? এমন রাতবিরেতে?

না, তাদের দেখলে মজা লাগে না তুলসীর। তাদের দেখলে ওর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়।

রাজেন আর জগাই তুলসীকে তার কাঠের গেট ঠেলে বাসার উঠোনে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে গেল। একখানা ঘর হলেও বাসাটি ভাল যোগাড় করেছে তুলসী। তবে কতটুকুই বা থাকতে পায় বাসায়? দিনের পর দিন, অথবা রাতের পর রাত ওই দরজাটায় তো তালাই ঝোলে। তুলসী ডিউটিতে থাকে।

তবু এটা তার নিজস্ব আস্তানা।

এখানে এসে সে নিশ্বাস ফেলে বাঁচতে পায়। এবং যত সংক্ষেপেই হোক, নিজের হাতের রান্নাটা খেয়ে নিতে পারে।

অন্য আয়ারা চায় খাওয়া সমেত কাজ। তার জন্যে মাইনেটা সামান্য কম হয় বটে কিন্তু পুষিয়ে যায় বেশী। তুলসী সেটা চায় না। ওরা বলে, ‘তুলসী কম খায় কিনা, তাই পুরো মাইনেটা হাতে নেয়।’

রাজেন বলতে বলতে আসছিল, ‘তোকে কি আবার এখন রাঁধতে হবে?’

‘কেন? কোন যমের জন্যে?’

তুলসী হেসে রাস্তা সচকিত করেছে, ‘সকালের ভাতে জল ঢেলে রেখেছি, গাছে লেবুপাতা আছে।’

‘শুধু ওই দিয়ে খাবি?’

‘তা নইলে কি পোলাও—কালিয়া রাঁধতে বসবো নিজের জন্যে?’

বোকা জগাই বলেছে, ‘তাহলে আর এতো খেটে মরিস কেন তুলসী? খাওয়ার জন্যেই তো টাকা।’

তুলসী তখন গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলেছে, ‘না। খাবার জন্যেই টাকা নয়। মানুষের মতন করে থাকার জন্যে।’

তারপর এসে ঢুকেছে।

দরজায় একটা কুকুর শুয়েছিল তাকে হেই হেই করে তাড়িয়ে দিয়ে গেছে রাজেন। কিন্তু আরো একটা ওই জীব যে তুলসীর দাওয়ার ওপর উঠে বসেছিল, সেটা তো দেখে যায়নি তারা।

দেখতে পায়নি।

তুলসী যখন ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাস্তা সচকিত করে আসছিল, তখন সে দাওয়ার খুঁটির আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

ওরা চলে যেতেই সামনে এসে দাঁড়ালো।

অন্ধকারে হলেও অবয়বটা চিনতে ভুল হয় না।

তুলসী তীক্ষ্নকণ্ঠে বলে ওঠে, ‘একী? এর মানে?’

অন্ধকার মূর্তির কণ্ঠ থেকে একটি মৃদু সাবধানী স্বর বার হয়, ‘চুপ! আস্তে! খবর নিলাম আজ তোমার নাইট ডিউটি নেই—।’

‘তাই আপনি! ছি ছি! মান অপমান বলে কি কিছু নেই আপনাদের,…ঠিক আছে, ওরা এখনো বেশীদূর যায়নি, ডাকছি ওদের।’

তুলসী দাওয়া থেকে নামতে যায়। পিছন থেকে কেউ হাতটা টেনে ধরে, সেই চাপাকণ্ঠ গর্জনের মত বলে ওঠে, ‘কী? তোমার ওই বডিগার্ডদের? ওই লোফার ছোটলোক পাজীগুলোকে? ওদের তোমার এত পছন্দ?’

তুলসীর হাতটা একজনের বজ্রমুষ্ঠীর মধ্যে। তুলসী টানাটানি করে না। আশ্চর্য শান্ত ভাবে বলে, ‘সত্যিই তাই ডাক্তার বাবু! আমি নিজেও তাই কিনা! ছোটলোক পাজী। তাই ওদের কাছে নির্ভয়ে আর শান্তিতে থাকি, ভদ্দরলোক দেখলেই আমার গা গুলোয়।’

‘বটে! খুব যে কথা! আমি তোর চাকরি খেয়ে দিতে পারি জানিস!’

‘জানি বৈকি ডাক্তারবাবু! মাথাটাই খেয়ে দেবার ক্ষ্যামতা রাখেন, আর চাকরীটা পারবেন না? তবে তাতে আর আপনার কী গৌরব বাড়বে?’

অন্ধকার প্রেতমূর্তি হঠাৎ নরম হয়ে গিয়ে কথা বলে, ‘তা, একটু বসতেও তো দিবি? এতোটা পথ কষ্ট করে এলাম।’

‘কষ্টটা তো আপনার ইচ্ছে করে করা, কী করবো বলুন?’

গলার স্বর খাদে নামে, ‘আচ্ছা তুলসী, তোরই বা এতো ডাঁট কেন? নে, ঘর খোল বসি একটু।’

‘না।’

‘না? অমনি না?’ রাগচাপা একটা হিংস্র গলার স্বরে লোভের কাকুতি যেন এই বৈশাখ রাত্রির উদার নির্মল বাতাস, ওই তারা ঝিকমিক আকাশ, সব কিছুকে ক্লেদাক্ত করে তোলে…’তোকে তো বাবা বলেছি, তোকেই হেড আয়া করে দেব, ওই বুড়ি হাবড়িরা সব তোর আণ্ডারে থাকবে। বুঝলি তো?’

‘হুঁ বুঝলাম। শুধু তার বদলে আমাকে আপনার আণ্ডারে থাকতে হবে, কেমন? এই তো?’

চাপারাগের গলা আরো গর্জন করে ওঠে, ‘তাতে তুই সগগে যাবি, বুঝলি?’

‘বুঝলাম বৈকি ডাক্তারবাবু! তবে সবাইয়ের আবার সগগো সয় না।’

‘তা সইবে কেন? ওই নরকের পোকাগুলোর সঙ্গে আড্ডা ইয়ার্কি সয়। রুচিকেও বাহবা দিই তোর তুলসী। ঘরের দরজাটা একটু খোল বাবা!

একটু না বসে আর থাকতে পাচ্ছি না। ঘর খোল, আলোটা জ্বাল। মানুষের সঙ্গে কথা কইছি না পেত্নির সঙ্গে কথা কইছি বুঝতে পারি।’

তুলসী হঠাৎ হি হি করে হেসে ওঠে। হাসে বেশ গলা ছেড়ে, ‘ডাক্তারবাবু ঠিকই ধরেছেন। পেত্নীই। সরে পড়ুন, নচেৎ—’

‘তা অত গলা ছেড়ে হাসছিস কেন?’…সেই চাপাগলার খোসামোদ। ‘মতলবটা কী তোর? তুই কি আমায় লোকের সামনে অপদস্থ করতে চাস? প্রাণে বাপু মায়া মমতা নেই তোর! মানসম্মান খুইয়ে তোর কাছে দুদণ্ড বসতে এলাম, আর তুই—ওকী, ওখানে কী হাতড়াচ্ছিস? চাবি পড়ে গেল?’

‘না, না। চাবি—তালা ঠিক আছে,’ তুলসী খুব অনায়াসে বলে, ‘হাতের কাছে থানইট জড়ো করা আছে আমার, কুকুর টুকুর মারতে, দেখেননি সেদিন? দেখেছেন বৈকি। সেই একখানা হাতে তুলে মজুত রাখছি পাছে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ওঠে—’

‘এই কি হচ্ছে? সত্যি সত্যি আমায় থানইট ছুঁড়ে মারবি নাকি?’

ভয়ার্ত প্রৌঢ়ের শিথিল কণ্ঠের উচ্চারণ যেন মাটিতে গড়িয়ে পড়ে যায়, ‘ইট নামা বলছি।’

তুলসী স্থিরগলায় বলে, ‘ভয় পাচ্ছেন কেন ডাক্তারবাবু, আপনাকে মারতে যাবো কেন? কুকুর মারবার জন্যে জড়ো করে রেখেছি। কুকুর দেখলে মারবো।’

‘বটে!’

অন্ধকারে সত্যিই যেন একটা শ্বাপদের নিশ্বাস শোনা যায়। ‘আচ্ছা, আমিও দেখছি। এই করণপুরে তুই কেমন করে ‘করে খাস’ আমি দেখবো। ছোটলোক কোথাকার!’

দাওয়া থেকে নামতে দেখা যায় ছায়ামূর্তিটাকে।

আর সেই হিংস্র শ্বাপদের নিশ্বাসটা মানুষের ভাষায় কথা বলতে বলতে চলে যায়, ‘অহঙ্কার দেখাতে এসেছে! নষ্ট মেয়েমানুষ! গা দিয়ে এখনো বিড়ির গন্ধ বেরোচ্ছে!…সাধে কি আর বলে—’

কী বলে তা আর শোনা যায় না!

‘এই নিয়ে চার দিন হলো।’

হাতের ইঁট খানা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বসে পড়ে তুলসী।

রাগের মাথায় তুলসীকে বাসায় পৌঁছে দেবার ভারটা রাজেন জগাইয়ের ওপর ছেড়ে দিয়ে হনহনিয়ে নিজের বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে আরো রাগে জ্বলছে সুখেন।

এখন রাগটা কার ওপর তা জানে না।

তুলসীর ওপরই কী?

এমন হাড়—জ্বালানো কথা বলে তুলসী! কিন্তু অন্যায় বলে কী? একা তুলসীর সঙ্গে এতখানি পথ যেতে যেতে তুলসীকে একটু ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করতো না সুখেনের? করতো, করেছিল একদিন। অনেকদিন আগের সেই কথাটা নিয়ে খোঁটা দিল তুলসী।

আচ্ছা এতো কিসের অহঙ্কার?

সুখেনের মাথায় আগুন জ্বলছে।

পশ্চাত্তাপের আগুন।

তখন সুখেন ভাবতে চেষ্টা করে, এখনো ও ‘ভালো’ আছে নাকি? হুঁঃ হাসপাতাল বলে জায়গা! আর যত বুড়ো ভামের আড্ডা। ওখানে থেকে তুই ধোওয়া তুলসীপাতাটি আছিস এই বিশ্বাস করবো আমি? রাজেন জগাইয়ের সামনে আমায় ওই ভাবে অপদস্থ করলি তুই! আচ্ছা!

আজ আর বাপও জেগে নেই, পিসিও জেগে থাকতে পারেনি। সুখেন দেখলো দেয়ালের ধারে লোহার ঢাকা চাপা দেওয়া খাবার রয়েছে তার। লোহার ঢাকাটা একবার তুললো, দেখলো একটা কলাইকরা থালার পাশে খানিকটা কিসের যেন তরকারি, আর এক গোছা রুটি। আর কিছু না। এক চিলতে আচার পর্যন্ত নয়।

অপ্রবৃত্তি এলো, ঢাকাটা আবার যথাস্থানে রেখে দিলো!

সামান্য একটু শব্দ।

তবু পিসির সতর্ক কান। বলে ওঠে, ‘সুখেন এলি নাকি? এতো রাত পর্যন্ত কোথায় থাকিস?’

সুখেনের গা জ্বলে যায়।

সুখেন বলে, ‘যমের বাড়ি।’

ওই কালো শুঁটকো দাঁতফোকলা আর কটুভাষিণী বুড়িটি না থাকলে যে সুখেনের কী দশা হতো, সে কথা ভাবে না সুখেন, বাড়ি ঢুকেই ওই মূর্তিটি আর তার কর্কশ কণ্ঠের সম্ভাষণ, সর্বাঙ্গে যেন বিষ ছড়ায়।

রেলের কুলিগুলোরও ঘরে একটা বৌ আছে।

দাঁতে দাঁত পিষে এই কথাটা উচ্চারণ করে সুখেন। সুখেনের ধারণা ওই বাপটি আর পিসিটি মিলে ষড়যন্ত্র করে তার কিছু হতে দিল না। কেন, সুখেনের মত চাকরীতে যারা আছে, তারা বিয়ে টিয়ে করে ঘর—সংসার করছে না?

আচ্ছা! আমিও এবার দেখাচ্ছি, অস্ফুট ঘোষণায় বিদ্রোহী হয় সুখেন, ‘স্বভাব খারাপ করে ছাড়ছি।’ যেন ভয়ানক একটা বাহাদুরী করবে।

এটা অবশ্য হাসিরই কথা যে, ওই তুচ্ছ কাজটা করবার জন্যে সুখেনকে এমন তাল ঠুকে ঘোষণা করতে হয়! হাসির কথা, এ যাবৎ পেরে ওঠেনি ওটা! এই রেলস্টেশনের ধারে—কাছে কুলি মজুর বাবু ভদ্রলোক মাস্টার বেকার যেটা অবলীলায় করে ফেলে।

সুখেনের যেন কোথায় একটা অলক্ষ্য ভয়, একটা অদৃশ্য বন্ধন। স্বভাব—চরিত্র খারাপ করে বসলে কার কাছে যেন জবাবদিহি করতে হবে সুখেনকে। দোষণীয় কিছু করে বসলে সেখানে যেন মুখ দেখাতে পারবে না সুখেন।

কেন কে জানে ছোট থেকে সুখেনের কেমন যেন একটা বিশ্বাস ছিল, তুলসী সুখেনের সম্পত্তি। তুলসী ননীর দোকানে বিনি পয়সায় খেটেই আসুক, আর রেল কলোনীর কোয়ার্টারে কোয়ার্টারে চাকরীই করে বেড়াক, অথবা জগু রাজেনের সঙ্গে হি হি করে আড্ডাই দিক, আসল দাবি সুখেনের। সময়কালে সুখেন তার সেই দাবির হাতটি প্রসারিত করে, নিয়ে নেবে ওকে। শুধু সুখেনের বড় হওয়ার ওয়াস্তা, শুধু একটা চাকরী পাওয়ার ওয়াস্তা।

কিন্তু সুখেনের পোড়া কপালে সুখেন বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুলসীও বড় হয়ে গেল, আরো অনেক বড়। তুলসী যে কেমন করে ওই ট্রেনিংটায় ভর্তি হবার চিন্তা মাথায় আনলো, কেমন করেই বা অতো তাড়াতাড়ি ট্রেনিং সেরে চাকরী বাগিয়ে ফেলল! সুখেন দেখলো কোন ফাঁকে তুলসী তার হাতের বাইরে চলে গেছে।

কিন্তু এ অনুভূতি কি একা সুখেনেরই?

রাজেন আর জগাই?

তাদের নয়?

তারাও তো নিয়ত সঙ্গী ছিল সুখেনের। আর সকলেরই একটা আহ্লাদের জিনিস ছিল ওই তুলসী। গেরস্তবাড়ি কাজ করেও তুলসী দিব্যি সময় বার করে ফেলে খেলতে আসতো। একটা খেলা ছিল ওদের রেলগাড়ির খালি কামরায় গদিতে উঠে বসে পা দোলানো, আপার বার্থে চড়ে পড়া, মুখে আঙুল পুরে এঞ্জিনের সিটির অনুকরণে সিটি মেরে অচল গাড়িখানাকে সচলের ভূমিকায় রূপ দেওয়া।

আর একটা খেলা, ফাঁকা গাড়ির এদিকের দরজা থেকে উঠে, ও দরজা দিয়ে নামা।

তখন নেহাৎ বাচ্চা নয় কেউই, তবু ওদের তেমন নয়—তুলসীকেই বেমানান লাগতো এই সব খেলায়। চারটেতেই প্রায় সমবয়সী, বরং হয়তো তুলসীই বয়সে কিছু ছোট, কিন্তু মেয়ের বাড় আর ছেলের বাড়? মেয়ের বাড়কে গ্রামে ঘরে কলাগাছের বাড়ের সঙ্গে তুলনা করে।

স্বাস্থ্যবতী তুলসীর সর্বাঙ্গে যেন সেই বাড়ন্ত কলাগাছের লাবণ্য। ওর ওই টান টান করে পরা খাটো ফ্রক’ আঁটা স্বাস্থ্যসমৃদ্ধ শরীরটার দিকে লুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেছে সবাই! অবশ্য যারা ওই দৃষ্টিতেই তাকায়।

যাদের বাড়িতে বাড়িতে কাজ করতো তারা, তাকাতো ঈর্ষার দৃষ্টিতে। কী খেয়ে মেয়েটার অমন স্বাস্থ্য, অমন গতর! আমাদের ঘরে তো এতো যত্নে—আদরেও ছেলেমেয়েগুলো পাঁকাটি।

খেলার সময় তুলসী প্রায় প্রায়ই পক্ষ বদলাতো। কখনো সুখেনের কখনো জগুর কখনো রাজেনের পক্ষ হয়ে অনায়াসেই বলতো, ‘আয় ভাই আমরা আলাদা খেলি, ওদের সঙ্গে আড়ি।’

অতএব প্রত্যেকের পক্ষেই সুখস্বপ্ন দেখার বাধা ছিল না, ছিল না অধিকার বোধের অনুভূতিতে ডুবে যাওয়ার বাধা।

অবিশ্যি তুলসী হাসপাতালে চাকরী পেয়ে চলে যাবার পর প্রত্যেকেরই মনোভঙ্গ, তবু তুলসী যে তাদের ভোলেনি এটা ঠিক। এইটা দেখে খুশী। হঠাৎ হঠাৎ তুলসীর ওদের তাসের আড্ডায় চলে আসা দেখে বোঝা যায় টানটা যায়নি তুলসীর।

আর এখনো পর্যন্ত তো বিয়ে না করেই ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তাই তুলসীকে দেখলেই যেন সেই মুড়িয়ে যাওয়া আশাতরুতে হঠাৎ একটা নতুন পাতার শিহরণ জাগে। হয়তো বিয়ে—টিয়ে করে সংসারী হয়ে পড়তে পারলে এ মোহ কেটে যেত। তখন সহসা রাস্তায় দেখা হলে শুধু একটু সৌজন্যের হাসি হেসে বলতো, ‘কী তুলসী, কী খবর?’

হঠাৎ একটা সম্ভাবনায় যেন গায়ে আগুনের হাওয়া বহে গেল সুখেনের। জগু আর রাজেনটা পৌঁছে দিতে গিয়ে এখনো হয়তো ওর সেই দাওয়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছে। লোক ভয় তো নেই তুলসীর।

সুখেন হতভাগা মান দেখাতে গিয়ে—

সুখেন নিজের গালে ঠাস করে একটা চড় মারলো।

পিসি কোণ থেকে বললো, ‘মশা মারতে গালে চড় খাচ্ছিস সুখেন? কই মশা তো নেই তেমন? হ্যাঁ, মশা ছিল তোদের চাঁপতায়। ঘরের মানুষকে বাইরে টেনে নিয়ে যেত। তা দেশভুঁই আর দেখলি কবে? সেই যে রেলের চাকরী নিয়ে চলে এলো তোর বাবা আর তো ও—মুখো হল না। তোর মা—’

অসহ্য! অসহ্য!

সুখেন হঠাৎ ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে রাস্তায় পড়ে হন হন করে হাঁটতে শুরু করে।

রাজেন আর জগু ফেরার সময় বোধকরি ভয় কাটাতেই খোলা গলায় গল্প করতে করতে ফিরছিল।

ভূতের ভয় নয়, চোর—টোরের ভয়।

অথচ ভাল করে ভেবে দেখলে ও ভয় পাওয়ায় হেসেই উঠতে পারতো।

কী নেবে তাদের কাছ থেকে চোর?

একটা কানাকড়িও তো সঙ্গে নেই।

পরনের প্যাণ্ট শার্টটা ছাড়া কিছু বলতে কিছু না।

তবু ভয়।

ভয় জিনিসটা সহজাত। ভয়ের জন্যেই ভয়।

অথচ ওই তুলসী নামের মেয়েটার প্রাণে ভয় নেই। সেই কথাটাই বলতে বলতে আসে ওরা!

‘বুকের পাটাটা বটে। একা মেয়েছেলে, একটা আলাদা বাসা করে থাকে।’

‘আমি একবার বলেছিলাম হাসপাতালের আর কোন মেয়েছেলের সঙ্গে ভাব করে দুজনে একসঙ্গে থাকতে পারিস। তারও সুবিধে, তোরও সুবিধে—’ তা উত্তর দিয়েছিল—’তার সুবিধে হতে পারে, আমার সুবিধে ঘোড়ার ডিম, একত্রে থাকলেই একত্রে খাওয়া দাওয়া। আমি যা খাই—দাই তাতে তার পোষাবে না, তাই নিয়ে মনোমালিন্য হবে। তাছাড়া কার মনে কী আছে, কী কেলেঙ্কারি করে বসবে না বসবে, দরকার কী বাবা সুখে থাকতে ভূতের কিল খাবার?’

কিন্তু তুলসীকে ওরা যত নির্ভয় ভাবে, সত্যই কি আর এখন নির্ভয় আছে তুলসী? যুদ্ধ করতে করতে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে না কি?

রেল কলোনির এধারে নতুন কোয়ার্টারের সারি তৈরী হচ্ছে। সেই জুতোর দোকানের র‍্যাকে সাজানো জুতোর বাক্সর মত বোদা বোদা বাড়ির সারি। এত আছে তবু কুলোচ্ছে না, কুলোচ্ছে না।

পৃথিবীর বুকে যেখানে যত কুমারী ভূমি অনাহত অক্ষত হয়ে পড়ে থেকেছে এ—যাবৎ—কাল, সর্বত্র ঘা পড়েছে কোদাল—কুড়ুলের। গভীর গহ্বর কেটে কেটে ভিত খোঁড়া হচ্ছে। প্রাসাদ উঠছে আকাশ ফুঁড়ে, ছাদে উঠে নিচে তাকালে মাথা ঘোরে এমন অট্টালিকার মধ্যেও ঢুকে পড়ছে মানুষ। আবার এই জুতোর বাক্স, দেশলাই বাক্স, তাসের ঘরেও এসে নিচ্ছে আশ্রয়।

আশ্রয়টা চাই।

আর সেটা যতই বাড়িয়ে চলা হোক কুলোচ্ছে না। মানুষ নামক কীটটা মুহূর্তে বিস্তার করে চলেছে বংশ, রক্তবীজ হার মানছে, অতএব ইঁটের পর ইঁট সাজানোর বিরাম নেই।

সকালবেলা হাসপাতালে যাবার পথে কেন কে জানে এই দিকটা দিয়ে যাবার ইচ্ছে হল তুলসীর। যেখানে এই নতুন ব্লকগুলো তৈরী হচ্ছে।

তুলসীর মনটা কেমন যেন উদাস উদাস লাগছে। আবার গুচ্ছির মানুষ এসে ঢুকবে দেশটায়, রাস্তাঘাট দোকান—পশার কিলবিলিয়ে ছেয়ে যাবে নতুন পুরোনোর ভীড়ে।

তুলসী দেশটার কত পরিবর্তন দেখলো!

কতো ফাঁকা ছিল চারিদিক, কতো গাছগাছালি।

ওই নতুনগুলো যেখানে উঠছে, সেখানে বিরাট বিরাট ক’টা গাছ ছিল। তাতে ফলও ছিল না ফুলও ছিল না—শুধু ছায়া। তবু তার আকর্ষণেই চলে আসতো ওরা।

সুখেনই আগে—ভাগে টেনে আনত ওকে। বলতো, এই তুলসী, গাছে উঠতে যাবি?

হ্যাঁ, এইটাই তাদের স্পেশাল খেলা ছিল। গাছের ডালে উঠে পা দোলানো। তুলসীর অবশ্য ইস্কুলের বালাই ছিল না, কিন্তু ওদের তা ছিল। রেল কোম্পানীর বদান্যতার ফল বিনি মাইনের ইস্কুল। কিন্তু ক’দিন বা নিয়ম করে ইস্কুলে পড়তে যেতো ওই লক্ষ্মীছাড়া ছেলে তিনটে?

কিন্তু তিনটের মধ্যে এতো মিলের কারণ কি?

কারণটা হয়তো—প্রধান একটা জায়গায় একটা বিশেষ মিল ছিল বলে। তিনটেরই মা ছিল না। আর হয়তো ওই মিলের টানেই তুলসী নামের মেয়েটাও ওদের সঙ্গে জুটতে আসতো।

তুলসী ওই ইঁটের স্তূপ আর ভারার বাঁশগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা নিশ্বাস ফেললো। কোথাও আর ফাঁকা জায়গা বলে কিছু থাকবে না।

আবার হঠাৎ মনে মনে হেসে উঠলো, থাকবে। শুধু মনের মধ্যেটায় থাকবে ফাঁকা। আর সেটা বেড়েই চলবে। বাইরে যত দম আটকে আসবে, ‘ফাঁকাটা’ আর কোথাও জায়গা না পেয়ে মানুষের মনের মধ্যে ঢুকে পড়বে।

আচ্ছা, আজ আমি এদিক দিয়েই বা এলাম কেন? এটা তো ঘুর পথ, এটায় তো হাঁটতে হচ্ছে বেশী।

অসমাপ্ত ব্লকের পাশ কাটিয়ে চির—পুরানো বাড়ি গুলোর ধারের রাস্তায় পড়তেই কোনো একটা খুপরির সামনের দরজা থেকে একজন ডেকে উঠলো, ‘কী তুলসী? আজ এতো বেলায় যে?’

তুলসীকে অন্যমনস্কতা ত্যাগ করতে হলো। এগিয়ে গিয়ে হাস্যবদনে বলতে হলো, ‘এই একটু দেরি হয়ে গেছে বৌদি!’

‘এই শোনো, তোমার সঙ্গে একটা দরকারী কথা ছিল—’

‘বলুন।’

তারপর হঠাৎ চোখে—মুখে কৌতুক ফুটিয়ে গলা নামিয়ে বলে তুলসী ‘কী? আমাদের ওখানে ভর্তি হতে যাবেন নাকি?’

‘মরণ তোমার!’ বৌদি ঝলসে হেসে ওঠেন, ‘আবার মরতে যাবো আমি?’

‘মরতে কেন গো! বাঁচতে যাবেন।’

‘থাম বাপু! এই শোনো, আমার ননদ এসেছে শ্বশুরবাড়ি থেকে, আজকালের মধ্যেই বোধহয় চালান দিতে হবে তাকে। তোমাকে যেন পাই সে সময়।’

‘এই সেরেছে! ডেটটা কী?’

‘সেই তো মুশকিল। একটু গোলমেলে আছে—’

‘তা হলে?’

‘ওসব জানি না বাবা! তোমাকে চাই। আমি ননদকে খুব আশ্বাস দিয়ে রেখেছি—বিশেষ করে রাত্তিরের জন্যে। সবাইয়ের নামেই তো বদনাম শুনি, ঘুমিয়ে পড়ে, পেসেণ্ট ডেকে সাড়া পায় না, নয় তো ঘুম ভাঙালে খিঁচোয়—’ গলা নামিয়ে বলে, ‘বাঙালীও তো তেমন নেই আর?’

‘আমার নামে বদনাম শোনেন না?’

‘তোমার নামে? ও বাবা! তোমার নামে তো জয় জয়কার।’

‘তাহলে তো তরেই গেলাম। আচ্ছা বৌদি যাই! দেখি আপনার ননদের দিনে—’

চলে যায় হনহনিয়ে।

প্রশংসায় মন প্রসন্ন হবারই কথা।

অথচ তুলসীর মনটা যেন বেজার হয়ে গেল। এই একটি মাত্র পরিচয় তুলসীর এই করণপুরে। ভাল আয়া!

প্রসূতিকে যত্ন করে, রাতে ঘুমিয়ে পড়ে না, মেজাজ ভাল, কথার গুণে চাঙ্গা করে তোলে পেসেণ্টকে।

না, আর কোনো পরিচয় নেই তুলসীর।

হাসপাতালে মুখোমুখি না হয়ে উপায় নেই। ঘাড়ে গর্দানে ডাক্তার ঘোষ। ঘাড়টা আরো গুঁজে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে প্যাসেজ পার হয়ে চলে যান। মাথার মাঝখানটা টাক, ঘাড়ে গুচ্ছির চুল। তাতে কাঁচার থেকে পাকার ভাগই বেশী।

গম গম করে হাসপাতাল কাঁপিয়ে রোগী দেখে বেড়ান উনি, সবাই যমের মত ভয় করে। বলে ‘বাঘ ডাক্তার।’

তুলসী ওঁর ওই তাড়াতাড়ি ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে চলে যাওয়া দেখে মনে মনে হাসে। যমেরও যম আছে।

আশ্চর্য! মানুষ কী আজব জীব!

আর দিনের মানুষটার সঙ্গে রাতের মানুষটার কত তফাত!

রাজেন আর জগু গুম হয়ে বসেছিল।

সামনে সুখেন।

তলে তলে এই চালাচ্ছে তুলসী!

এটা যেন ওদের আশঙ্কার জগতে ছিল না। তুলসী বাচাল, তুলসী বেহায়া, তুলসী আড্ডা দেবার সময় মেয়ে—পুরুষে ভেদ করে না, তুলসী সাজে, তুলসী বিড়ি—সিগারেট খায়, তবু কোনখানে যেন অপরিসীম একটি বিশ্বাস ছিল তুলসীর উপর এই ছেলে তিনটের। সেই বিশ্বাসটির উপরই ওদের ভালবাসা ন্যস্ত ছিল।

কিন্তু সুখেন কাল রাত্রে যা দেখে এসেছে তার ওপর তো আর কথা চলে না। যাকে বলে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ, তাই শুনিয়েছে সুখেন ওদের।

খোলাখুলিই স্বীকার করে যে ঈর্ষার জ্বালাতেই ছুটে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। স্থিরনিশ্চয় করেছিল গিয়ে দেখবে রাজেন জগাই তখনো তুলসীর ওখানে আড্ডা মারছে, কিন্তু দূর থেকে দেখলো দাওয়া অন্ধকার।

পাপমনের চিন্তাও ব্যক্ত করেছে সুখেন তার আশৈশবের বন্ধুদের কাছে। জ্বালায় ছটফটিয়ে ভেবেছিল, ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢোকেনি তো ও দুটো?

আচ্ছা দেখে নেবে সুখেন। বন্ধুদের এই বেইমানীর শোধ নেবে।

কিন্তু আর একটু এগোতেই মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঝিম মেরে গিয়েছিল সুখেনের।

ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে যে লোকটা তুলসীর বেড়ার দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে অন্ধকারে মিশে গেল, সে রাজেনও নয়, জগুও নয়।

সুখেন তাকে চেনে।

সুখেন দেখলো অন্ধকারে দাওয়ার ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছে তুলসী।

তার মানে দাঁড়িয়ে থেকে বিদায় দেওয়া হয়েছে।

ওরা গর্জন করে বলে উঠেছিল, ‘তুই কিছু বললি না? হাতে হাতে ধরে ফেললি যখন?’

যেন সুখেন তুলসীর গার্জেন। সুখেন কিন্তু সে কথা বলেনি।

সুখেন তখন একটু থেমেছিল।

সুখেন একটা গোপন কথা তার আশৈশবের বন্ধুদেরও বলতে পারেনি। বলতে পারেনি তুলসীকে ওই ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কেন কে জানে সুখেনের দু’চোখে হুশ করে জল এসে গিয়েছিল। সুখেন হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে সটান উল্টোমুখ ধরে ফিরে এসেছিল।

সুখেন ওই গোপন কথাটা চাপা দিয়ে বলেছিল, ‘পিরবিত্তি হল না। তদ্দণ্ডেই ওকে ডেকে কথা কইতে পিরবিত্তি হল না।’

তারপর বসে আছে গুম হয়ে তিনজনে।

যেন যে ব্যাঙ্কটায় ওদের তিনজনেরই টাকা জমা ছিল, সেই ব্যাঙ্কটা ফেল হয়ে যাবার খবর এসেছে ওদের কাছে।

লেভেল ক্রশিংয়ের ওধারে যে একটা ইঁটের ঢিবি মতন আদি অন্তকাল পড়ে আছে, তার উপর বসে ছিল ওরা। যেন কথাবার্তা, সব ফুরিয়ে গেছে।

তাই নিঃশব্দে শুধু একটার পর একটা বিড়ি টেনে চলেছিল।

কিন্তু কে জানতো এমন অসময়ে এবং অনুপযুক্ত জায়গায় হঠাৎ স্বয়ং অভিযুক্ত আসামীই এসে হাজির হবে।

পরস্পরে তাকাতাকি করলো।

দিব্যি তো মটমট করে আসা হচ্ছে।

লজ্জার বালাই মাত্র নেই।

থাকবে কেন? বড় গাছে নৌকো বেঁধেছেন যে!

এই নতুন বেঁধেছে, কি কতকাল বেঁধেছে, কে জানে। কিন্তু এদিকেই বা আসছে কেন?

‘কেউ কথা কসনে।’

বলে ওরা ঊর্ধ্বমুখে ধোঁয়া ছাড়তে থাকে।

‘তোরা এখানে? আর আমি তোদের খুঁজে খুঁজে—’

তুলসী ওদের ঠেলে দিয়ে একপাশে বসে পড়ে বলে, ‘রাজরাস্তা থেকে কোণে এসে বসে তিন শেয়ালে কী যুক্তি হচ্ছে?’

ওরা কেউ কোনো কথা বললো না। যা করছিল তাই করতে লাগলো। ব্যাপারটা অভিনব।

সুখেনের না হয় অভিমানের কারণ আছে, কাল রাত্রেই সেটা দেখিয়ে চলে গিয়েছিল গটগটিয়ে। আর দুটোর হঠাৎ কী হল? রাত দুপুর পর্যন্ত তো দেখা হয়েছে। গাল—গল্প করতে করতে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। সুখেনের অপমানে ওদের অপমান, এমন চিহ্ন তো প্রকাশ পায়নি।

তুলসী দু হাতের তালু উল্টে বলে, যা বাব্বা! একটার মুখে—ও কথা নেই যে! মুখ দেখে মনে হচ্ছে বৈরাগী হয়ে যাবি। তিন জনেই এক পথের পথিক হচ্ছিস তাহলে? কাপড়চোপড় গেরুয়ায় ছুপিয়ে—টুপিয়ে নিয়েছিস নাকি? হরে—কেষ্ট কাপড়ই বা কোথা? সবই তো পেণ্টুল। নাঃ। গোড়াতেই মৌনীবাবা! ছাড় দিকি, একটা বিড়ি ছাড়।’

আর চুপ করে থাকতে পারে না রাজেন।

বলে ওঠে, ‘কেন? ওসব ছোটলোকের জিনিসে তোর দরকার? তোর তো ওর গন্ধে মাথা ধরে।’

‘ধরতো! তা কী আর করা যাবে। ফুরিয়ে গেছে। নেই।’

অগত্যাই দেশলাইটা আর প্রার্থিত বস্তুটা এগিয়ে দিয়ে রাজেন বাঁকা গলায় বলে, ‘রাজরাণীর আবার অন্নের অভাব? এখন তো বড় গাছে নৌকো বেঁধেছিস, অভাব কিসের? ফুরোবার আগেই যোগান হবে।’

তুলসী ভুরু কুঁচকে ওদের বিদ্বেষ—বিষাক্ত মুখ তিনটে দেখে বলে, ‘কিসে নৌকো বেঁধেছি?’

‘কিসে বেঁধেছিস নিজেই ভাল জানিস। মনে করেছিলি ডুবে ডুবে জল খেলে শিবের বাবাও টের পায় না। তা হয় নারে! ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।’

তুলসী অনায়াসে ধোঁয়া উড়িয়ে বলে, ‘ধর্মের কল কোথায় নড়ে ধর্মই জানে, এখন আপাতত তোদের মাথায় কোনোখানে পোকা নড়েছে। কী যে আবোল—তাবোল বকছিস। এলাম তোদের কাছে একটা বিপদে পড়ে পরামর্শ করতে—’

‘বিপদ! ওঃ!’ সুখেন সন্দেহ—বিকৃত মুখে ভারী গলায় বলে, ‘তা বিপদটা কী শুনতে পাই না?’

‘শোনাবার জন্যেই তো এসেছি, তা তোরা দেখছি কেবল ব্যাঁকা কথাই কইছিস। ব্যাপারটা কী?’

‘ব্যাপার কিছু না। গরীব হতভাগাদের কথায় কান দেওয়ার দরকার নেই।’

‘এই সুখেনটা শুধু হতভাগাই নয়, ইল্লুতে ছোটলোক।’

তুলসী তীব্র গলায় বলে, ‘কী একটু বলেছি, তাতেই নুনের নৌকো ডুবে গেছে। বলি জগৎ—সংসারে যে বাঘ ভাল্লুক জন্তু—জানোয়ারই বেশী এটা তো মিথ্যে নয়? কে কখন জানোয়ার হয়ে ওঠে বলাও শক্ত। কাল রাত্তিরে তোরা দু’জনে আমায় পৌঁছে দিয়ে যেমনি পিছু ফিরেছিস, তেমনি দেখি সামনে এক কুকুর!’

‘কুকুর!’

জগাই বলে, ‘সে তো আমরা তাড়িয়ে দিয়ে এলাম।’

‘কাকে তাড়িয়ে দিয়ে এলি?’

‘কেন, সেই বীরভদ্দর কেলে কুকুরটাকে।’

‘ও, সেইটা? সেটা আর কী এমন? সে তো কুকুরের মতন দেখতে কুকুর—’

তুলসী হাতের বিড়িটা শেষ না হতেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সাপিনীর মত হিস হিস করে বলে, ‘মানুষের চামড়া ঢাকা কুকুরটাকে তো তাড়িয়ে দিয়ে আসিসনি? আঃ, আর একটু যদি এগিয়ে আসতিস! বেড়ার দোর থেকে ছেড়ে না দিয়ে দাওয়ায় তুলে দিতিস। দেখতে পেতিস মানুষের চামড়া মোড়া কুকুর আরো কত ভয়ঙ্কর!’

সুখেন ক্রুদ্ধ গলায় বলে, ‘লোকটা কে?’

‘বলে আর কী হবে—’

তুলসীর গলায় ঔদাসীন্য, ‘সমাজের মাথা একজন কেষ্টবিষ্টু বেক্তি, এই আর কী?’

‘নাম বল তুলসী! সেই ‘মাথা’র মাথাটা দু’চির করে দিয়ে আসি।’

‘তাতে কেলেঙ্কারী বাড়বে বৈ কমবে না সুখেন!’

তুলসী গভীর গলায় বলে, ‘একটা ছোটলোক আয়ার ইজ্জতের থেকে ওসব মাথার দাম হাজার গুণ বেশী।’

‘তার মানে লোকটাকে তুই বাঁচাতে চাস?’

‘তা মিথ্যে বলবো না সুখেন, ওর মতন বিচক্ষণ ডাক্তার তো আর এ তল্লাটে নেই—’

‘ডাক্তার!’

‘এইরে বলে মলাম! যাক ওই পর্যন্তই। শুধু এই কথাই বলছি, ওর মাথাটা দুফাঁক হয়ে গেলে, রুগীগুলোর কপাল বেবাক ফাঁকা হয়ে যাবে।’

‘এই সব পাজী লোক একটা বিদ্যে শিখেছে বলে তাদের ইহ—পৃথিবীতে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে?’

‘তা এই তো এ জগতের নিয়ম রে জগাই! কত কেষ্ট—বিষ্টুর ফর্সা জামার নীচে কত কাদা। তবু তারা পৃথিবীর কাজে লাগছে বলে সমাজ—সংসারে মাথার মণি।’

রাজেন এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এখন ক্ষুব্ধ গলায় বলে ওঠে, ‘আর আমরা যারা পৃথিবীর কোন কাজে লাগি না, তারা সমাজ সংসারের জুতোর সুখতলা। এই তো?’

‘যা বলেছিস! কিন্তু তুই না বললেও সেই কুকুরটা যে কে আমি ধরতে পারছি, ওই বুড়ো বজ্জাতটা এর আগে অনেক কীর্তি করেছে। ওকে শেষ করলে একটা পুণ্যের কাজ হবে।’

তুলসী হতাশ গলায় বলে, ‘তোদের মাথায় শুধু ওই শেষ করাই ঘুরছে। ওতে আমি ভরসা পাবো না। ছারপোকার বংশ যত মারো ততই বাড়ে। একটা কুকুর মেরে আর কতটুকু আসান হবে? আমি তোদের কাছে অন্য কথা বলতে এসেছিলাম!’

বলতে এসেছিলাম!

তাই তো। তারা তো সেটা তেমন ভাবেনি। ভেবেছে এমনি এসে বসেছে।

‘কি বলতে এসেছিলি?’

তিনজনে একযোগে একই কথা বলে ওঠে।

তুলসী কাঁধের আঁচলটা টেনে বেশ চোস্ত হয়ে বসে।

কারুর মুখের দিকে না তাকিয়ে, সামনের রেলের ওই গুমটি ঘরের দিকে তাকিয়ে আস্তে বলে ‘বলছিলাম, বেড়ালের মুখ থেকে মাছ আগলাতে আগলাতে জীবন মহানিশা হয়ে গেল! অথচ বেড়াল—কুকুর নিধন করে এ সমিস্যের সমাধান হয় না বুঝলি? একমাত্তর সমাধান, মাছটাকে যেখানে সেখানে ফেলে না রেখে শিকেয় তুলে রাখা। তাই ঠিক করেছি নিজেকে আর এমন বেওয়ারিশ ফেলে না রেখে একটা ওয়ারিশানের হাতে তুলে দেব। যুদ্ধ করে করে আক্লান্ত হয়ে গেছি।’

তুলসী আঁচল তুলে ঘাড়ের ঘাম মোছে।

সুখেন, রাজেন, জগাই পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়।

তুলসীর কথায় এ যে এক অদ্ভুত নতুন সুর!

এই অদ্ভুত কথাটার যথার্থ মানে কী?

তাহলে কি তুলসী তলে তলে কিছু ব্যবস্থা করে ফেলেছে?

কিন্তু তুলসী যে বড় ‘আক্লান্ত’।

তুলসীর মুখটা দেখে মায়া আসছে। চিরদিনের সেই তেজে—মটমটে তুলসী যেন উদাস বিষণ্ণ!

কে কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না বলেই বোধহয় তিনজনেই উসখুস করে, অথচ কিছুই বলতে পারে না।

তুলসী আবার বলে, ‘পোড়ারমুখো ভগবান, মেয়েজাতটাকে এমন অসহায় করেও গড়েছিল! দেহখানাকে সন্দেশ মণ্ডার মতন লোভের বস্তু করে রেখে দিয়েছে। এ শাস্তিটা ভগবান দিল কেন মেয়েমানুষকে তাই বল? এ পাপ না থাকলে মেয়ে পুরুষ সমান হয়েও পৃথিবীতে চলতে পারতো। তা হবে কেন? বিধাতা পুরুষ যে নিজে পুরুষ, তাই মেয়েজাতটার সুখ—দুঃখ বোঝেনি। মরুকগে—যা করেছে তার তো আর চারা নেই! মেয়েমানুষ জাতটাকে চিরটাকাল ফাঁসির আসামী হয়েই থাকতে হবে। যাক ওসব কথা—আসল কথাটাই বলি স্পষ্ট করে—ভেবে দেখলাম একটা বিয়ে করে ফেলাই হচ্ছে সমিস্যে সমাধানের উপায়।’

‘বিয়ে! মানে তোর?’

জগাই বলে ফেলে বোকার মত।

‘তোরও হতে পারে—’

তুলসী হেসে ওঠে, ‘বিয়ে করতে হলে তোদের মধ্যেই একজনকে করা ভাল। এই বয়সে আর একটা অচেনা অজানা নতুন লোকের সঙ্গে ভাব ভালবাসা জমানো পোষাবে না। তোদের সঙ্গে চিরকালের ভালবাসা! এখন বল কে রাজী আছিস?’

কে রাজী আছে!

তিন তিনটে সা—জোয়ান ছেলে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে।

এ আবার কেমন ধরনের প্রস্তাব।

তুলসীর যেন সবটাই অদ্ভুত!

তবু সুখেনই তাড়াতাড়ি প্রস্তাবটাকে হাতে তুলে নেয়। বলে ওঠে, ‘রাজী না থাকার কথা উঠছে কোথা থেকে?’

ইস!

সুখেনটা কী চালু! ফটকরে উত্তরটা দিয়ে বসলো!

রাজেন আর জগাই জিভ কামড়ায়।

এ কথাটা তো আমিও বলতে পারতাম!

তবে রাজেন পিঠোপিঠিই বলে, ‘সত্যি, রাজী হওয়া না হওয়ার কথাই নেই তুলসী, তুই যাকে পছন্দ করবি—’

”হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই কথাই তো ঠিক—’জগাইও নিজের কথাটা বলে নেয়, ‘তুলসীর যখন এতোদিনে বিয়ের ইচ্ছে, মানে বিয়ের মত হয়েছে—’

তুলসী গম্ভীর মুখে বলে,—ইচ্ছেও নয়, পছন্দও নয়, মত হওয়া—হয়িও নয়, স্রেফ দায়ে পড়ে তোদের কাছে এসে পড়েছি। বলতে পারিস, তোদের শরণ নিচ্ছি। নিজের ভার আর নিজে বইতে পারছি না। একজনের বিয়ে করা বৌ হয়ে গেলে পাঁচজনে আর মানুষটাকে পাবলিকের সম্পত্তি ভাবতে সাহস করবে না।’

তিনজনেই একসঙ্গে কিছু কথা বলে ওঠে।

ঠিক বোঝা যায় না, তাদের ব্যাকুলতা বোঝা যায়।

অকস্মাৎ এই প্রস্তাবের আঘাতে ওরা প্রায় বিমূঢ়।

আশ্চর্য! তুলসী যদি বললোই তো এই ভাবে বললো!

সুখেন মনে মনে কপালে করাঘাত করে।

তুলসী কি জানেনা সেই শৈশবকাল থেকে সুখেন তুলসী বলে মরে যায়? জানে না তুলসীকে সে কী চক্ষে দেখে? অথচ একটি বার একা সুখেনকে ডেকে বলতে পারলো না, ‘সুখেন, ভাবছি এবার বিয়েটা করে ফেলি।’ বাকি কথা সুখেনই বলতো।

ওর ইচ্ছেটুকু প্রকাশের পর আর কিছু করতে হত না তুলসীকে। …সুখেনও তো ঠিক করে ফেলেছিল, এবার একটা বিয়েই করে ফেলবে। সে বিয়ের কনে যদি তুলসী হয়, তার থেকে সুখের আর কী আছে।

কিন্তু তুলসী কিনা রাজরাস্তার মাঝখানে একসঙ্গে তিন তিনটে লোককে বলে বসলো, ‘আমায় কেউ বিয়ে করবি?’

ছি ছি, এতো বুদ্ধি ধয়ে তুলসী, আর এই বুদ্ধির পরিচয় দিল!

সুখেন গাঢ়স্বরে বললো, ‘তুই তো জানিস তুলসী, তোকে আমি চিরকাল কী চক্ষে দেখি—’

‘আহা সে তো জানিই।’

তুলসী অনায়াসেই বলে, ‘তোদের তিন জনকেই জানি। আমার কোন ‘সারপর’ নেই। তোদের মধ্যে যার সুবিধে হবে, যার অবস্থায় কুলোবে, তার সঙ্গেই বিয়েয় বসে যেতে রাজী। কিন্তু এই দণ্ডে জবাব চাইছি না, দুটো দিন সময় দিলাম, ভেবে—চিন্তে দেখ ঘরে গিয়ে। নিজের নিজের মনকে জিজ্ঞেস কর। আমার আর কী! এতো এতো দিনই যদি পারলাম আর ক’টা দিন চালিয়ে দেব। বুড়ো বদমাইসটা এখন দু’চারটে দিন বোধহয়—’ তুলসী উঠে দাঁড়ায়।

হাত বাড়িয়ে বলে, ‘দে আর একটা দে। চলি।…ভেবে—চিন্তে উত্তর দিবি আমায়। সুখেনের তো মস্ত একটা অসুবিধে, ওই পিসি! সে কি আর একটা সরকারী হাসপাতালের আয়াকে বৌ করে ঘরে তুলতে রাজী হবে?’

‘পিসিকে আমি থোড়াই কেয়ার করি।’

বীরবিক্রমে গর্জন—করে সুখেন, ‘আমার যে মেয়েকে ইচ্ছে তাকেই বিয়ে করবো।’

‘বাপও তো আছে তোর।’

‘বাবার কথাও বাদ দে। সাতেও নেই পাঁচেও নেই, দুটো বাড়াভাত পেলেই হলো।’

রাজেন মনে মনে নিশপিশ করে।

সব কথাগুলো সুখেনটাই বলে নিচ্ছে।

আচ্ছা দুটো দিন তো সময় দিয়েছে, তার মধ্যে রাজেনের নিজের যা বলার বলবে।

সুখেন যতই বলুক, ওর ওই পিসি বুড়ি ফ্যাচাং তুলবেই। সে দিক থেকে আমার বাবা বেপরোয়া।

আর জগাই মনে মনে হিসেব করতে থাকে, তিনজনের মধ্যে চাকরীটা কার সবচেয়ে ভালো, মাইনেটা কার আর দুজনের থেকে বেশী…জগাই তোদের মতন কথায় অতো চৌকস না হতে পারে, তাস খেলতে হেরে মরতে পারে, কিন্তু চাকরীটা তারই ভালো, মাইনেটা তারই বেশী।…তা ছাড়া তুলসীর নিজের আয়ও তো কম নয়। সংসার সুখেই চলবে।

ভাবে জগাই, যা বলবার পরে বলবো।

তুলসী বিড়িটা ধরিয়ে নিয়ে একটা টানের পর হাতে রেখে বলে, ‘তাহলে ওই কথাই রইল। ভাব বসে বসে। তিন শেয়ালের যুক্তির শেষে কী হয় দেখি।’ তুলসী চলে যায়।

আর ওরা তিনজন নিজেদের বিষয়ে কথাটি না কয়ে বলে ওঠে, ‘আচ্ছা ওই ডাক্তার শালা কে বল দেখি? কোন শয়তানটা?’

ননীর দোকানে লোহার শিকে হারিকেন লণ্ঠন ঝুলছিল, চৌকিতে মাদুর পাতা ছিল, এবং ননী একা বসে তাসটা ভাঁজছিল।

আশ্চর্য! পরপর দুটো দিন চলে গেছে, আজ তিনদিন, ননীর দোকান নিঃঝুম। ননীর দোকানে তাসের আড্ডা নেই। তিনটে ছেলের একটাও এই তিনদিনে এল না, এর মানে কী?

অথচ ননী দোকান থেকে নড়তে পারছে না। সকালবেলা হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে ননী।

একফোঁটা ছেলেটাকেই ডেকে ডেকে একটু সাহায্য চেয়েছে।

এ রকম কখনো হয় না।

এদিকে দিদিও তো জবাব দিয়েছে।

তিনজনের একসঙ্গে অসুখ করবে, এটাও তো সম্ভব কথা নয়।

ননী ভাবতে থাকে সেই শেষ দিন কী ঘটেছিল। খেলার সময় তুলসী এসে পড়ে খেলাটা ভেস্তে গিয়েছিল বটে, কিন্তু এরকম তো হয়ই। তুলসী মুখপুড়ী এসে উদয় হলেই খেলার জমাটিটা ভেঙে যায়।

এসেই হয় কারুর হাত থেকে খপ করে হাততাসটা টেনে নিয়ে ‘সরে বোস, আমি একটু খেলি’, বলে খেলতে বসে যায়, এক জনকে বেকার বসে থাকতে হয়, নয়তো গাল—গল্প করে বিড়ি—সিগারেট উড়িয়ে খেলার বাঁধুনীটা নষ্ট করে দেয়।

সেদিনও তাই করেছিল, তার বেশী কিছু নয়। ননী তো কাউকেই কিছু বলেনি।

ভারি চিন্তায় পড়ে যায় ননী।

ওই বাচাল মেয়েটা যেন মায়াবিনী জাদুকরী! তিনটে ছোঁড়াই ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে আছে চিরটা কাল। বিয়ে—থা ঘরকন্না পর্যন্ত করছে না। এক একটা বিয়ে করে ফেললেই বৌ ওই জাদুমন্তর ফর্সা করে দিতো। ননী এবার ওদের জোর করবে। ননীকে ওরা বড়ভাইয়ের মতই ভাবে, ননীর একটা দায়িত্ব আছে।

ননী তাস নিয়ে পেসেন্স খেলে চলে।

হঠাৎ ননীর সামনে একটা ছায়া পড়লো।

চমকে তাকালো ননী।

ছায়ামূর্তি বলে উঠলো, ‘কী ননীদা, আজ এমন দুরবস্থা যে তোমার? এক্ষুনি রাজ্যপাট গুটিয়ে গেছে?’

ননী গম্ভীর ভাবে বলে, ‘আয় বোস। রাজ্যপাট আজ তিনদিন বন্ধ।’

‘তাই নাকি? কেন?’

‘কেন সেটা তো তোকেই জিজ্ঞেস করবো ভাবছি।’

‘আমি কী বলবো? কেন? ওরা আর আসছে না?’

‘না?’

‘তার মানে তাসের আড্ডা বন্ধ?’

‘হুঁ।’

‘না আর হুঁ! তোমার আজ কী হল?’

‘কী আর হবে। ভাল লাগছে না—বসে আছি। ওদের সঙ্গে দেখা—টেখা হয়েছে এর মধ্যে?’

তুলসী একটু কেঁপে ওঠে।

ডাহা মিছেকথাটা বলবে কী করে?

কী করে বলবে, রোজই দেখা হয়েছে, হচ্ছে। সকালে সন্ধ্যেয়। আমি চেয়েছিলাম ওদের মধ্যে কোনো একটাকে বিয়ে করে একটু নিশ্চিন্ত হয়ে বসি, আর সত্যি বলতে কি, মনে ঠিকই করা ছিল। সুখেনটাই ঝাঁপিয়ে পড়বে। ওটাই চিরকাল যেন আমার গার্জেনের পোস্ট নিয়ে আছে। যেন আমার ওপর ওর কিসের এক দাবি দাওয়া। কিন্তু এখন দেখছি তিনটেতেই আমার জন্যে—

ননী বললো, ‘ভাবছিস কী? ওদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিনা জিজ্ঞেস করলাম, শুনে যেন দারুণ চিন্তায় পড়ে গেলি। অসুখ বিসুখ হয়নি তো কারুর?’

‘অসুখ—বিসুখ শত্রুর হোক। ভাবছি এই তো কখন যেন দেখা হলো—’

‘তুই যেন কী চাপছিস মনে হচ্ছে তুলসী!’

তুলসী চৌকীর একটা কোণে বসে পড়ে তাসগুলো টেনে নিয়ে ভাঁজতে ভাঁজতে বলে, ‘তোমার চোখে কিছু এড়ানোর জো নেই। তা হলে খুলেই বলি। একটা সিগ্রেট ধরাবো ননীদা?’

ননী বেজার গলায় বলে, ‘কেন, দু’দণ্ড আর ওই ধোঁয়া না গিললে চলে না? এমন ছোটলোকের মতন অভ্যেসটা কী করে করে ফেললি?’

‘ছোটলোকের মত?’

তুলসী হেসে ওঠে, ‘কী বল গো ননীদা? ভালো ভালো ভদ্দরলোকের মেয়েছেলেরা খাচ্ছে না?’ বলে, ‘ওটাই হলো মডার্ন ফ্যাশান। আমাদের বড় সার্জেনের শালী এসেছিলেন, তিনি নাকি কোন মস্ত অফিসারের বৌ, হাসপাতাল দেখতে এসেছিলেন, তার মধ্যে বোধ হয় এক প্যাকেট সিগ্রেট ধ্বংসালেন।’

‘বেশ করলেন। অফিসারের পরিবারের যা শোভা পায়, তা দীন—দুঃখীদের পায় না তুলসী! ওরা যেটাই করুক, সেটা হচ্ছে ফ্যাশান, আর গরীবগুরবোরা করলেই ছোটলোকমি।’

‘বাবা বাবা! সামান্য নিয়েও এতো লেকচার ঝাড়তে পারো তুমি ননীদা! তাহলে আর কী হবে, বিনি মৌতাতেই বলি—নানান জ্বালায় জ্বলে ঠিক করে ফেলেছি, আর এমন বেওয়ারিশ হয়ে থাকব না। একটা ওয়ারিশান জোগাড় করে ফেলে একটু নিশ্বাস ফেলে ঘুমিয়ে বাঁচি।

ননী তীক্ষ্ন গলায় বলে, ‘অত’ কায়দা করে বলার কী আছে? এতোদিনে তাহলে বিয়ের মন হয়েছে? তা নানান জ্বালাটা কী?’

তুলসী ননীর দিকে একবার চোখ তুলে তাকায়। তারপর মাথা নীচু করে ছেঁড়া মাদুরের ভাঙা কাঠি ভেঙে নিয়ে টুকরো করতে করতে বলে, ‘সে আর তোমায় কী বলব ননীদা! দাদা বলি, গুরুজন বলে মনে করি। পৃথিবীতে জন্তু—জানোয়ারের উপদ্রব তো কম নয়।’

‘হুঁ, তা বিয়েটা কি ঠিক হয়ে গেছে। পাত্তর কোথাকার? সরকারী হাসপাতালের দাইকে বিয়ে করতে রাজী তো?’

তুলসীর চোখের তারায় ফস করে যেন আগুন জ্বলে ওঠে।

তুলসী আত্মস্থ গলায় ঠোঁটের কোণে একটু বাঁকা হাসি হেসে বলে, ‘রাজী কি গো? শুনে অবধি পায়ে পড়ছে।’

‘পায়ে পড়ছে!’

ননীও ব্যঙ্গের গলায় বলে, ‘এমন একটা হতভাগাকে জোটালি কোথা থেকে?’

তুলসী হেসে উঠে ছুরিকাটা গলায় বলে, ‘একটা কী গো ননীদা, একসঙ্গে তিনটে জুটেছে। তিনটেই ওই শুনে অবধি আমার বাড়ির মাটি নিয়েছে। তা আমি ওদের বলছি, হ্যাঁরে আমি কী দ্রৌপদী হব?’

‘হুঁ’।

ননী হঠাৎ তুলসীর হাতের কাছ থেকে তাস কটা সরিয়ে প্যাকেটে পুরে ফেলতে ফেলতে গম্ভীর গলায় বলে, ‘তা হতে বাধাই বা কী? তিনটেকেই যখন নাচিয়েছিস—’

তুলসীও গম্ভীর হয়ে বলে, ‘আমি মোটেই কাউকে নাচাতে যাইনি ননীদা, শুধু বলেছিলাম, এ ভাবে আর রাক্ষসের ভয়ে কাঁটা হয়ে রাতে না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পেরে উঠছি না। সেই এতটুকুন বয়েস থেকে যুদ্ধ করে যেন ফুরিয়ে যাচ্ছি। তাই তোদের শরণ নিচ্ছি, যে পারিস আমায় একটু আশ্রয় দে। কী করে জানবো তিনজনেই দরজা খুলে বসেছিল!’

‘ওঃ!’

ননী তুলসীর মুখের দিকে তাকায়!

অহঙ্কারে ধরাকে সরা দেখছেন বোধহয় শ্রীমতী তুলসী মঞ্জরী। ওই হ্যাংলা হতভাগা তিনটে হামড়ে গিয়ে পড়ে মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে আর কী!

কিন্তু তাই কি?

তুলসীর মুখে দর্প—অহঙ্কারের উগ্রতা কোথায়?

যেন বেশ বিপন্ন বিপন্ন মুখ।

যেন সত্যিই বেচারী কিংকর্তব্যবিমূঢ়!

দেখল, তা বলে ননী নরম হল না।

ননী বেশ বিদ্রূপের গলায় বলে, ‘ওঃ তাহলে একেবারে রাজকন্যার স্বয়ংবর—সভা বসে গেছে বল? তা’ ভাবনার কী আছে? যে দরজাটা সবচেয়ে বড় সেটাতেই ঢুকে পড়। তারপর শুম্ভ নিশুম্ভর পালা চলুক।

তুলসী উঠে দাঁড়ায়। আহত গলায় বলে, ‘তুমি আমায় চিরকাল ঠাট্টা—ব্যঙ্গই করলে ননীদা, আমার দুঃখু জ্বালাটা কখনো দেখলে না। ছোটবেলায় যখন এর দোরে ওর দোরে ঘুরে বেড়িয়েছি, তখন যদি একটু দয়া—ঘেন্না করে আশ্রয় দিতে, তাহলে হয়তো আজ সরকারি হাসপাতালে দাই হতে হত না’।

‘আমি?’

ননী আকাশ থেকে পড়ে বলে, ‘আমি তোকে কী সুবাদে আশ্রয় দিতাম?’

‘সুবাদ কি শুধু সম্বন্ধ দিয়েই হয় ননীদা? তুমি একটা মানুষ, আর আমিও একটা মানুষ—এই সুবাদে!’

‘এই সুবাদে?’

ননী প্রায় খিঁচিয়ে ওঠে, ‘আহা! তুলসী, তুই যেন এইমাত্তর সগগো থেকে খসে পড়লি, নরলোকের কিছু জানিস না। মানুষের ওপর ‘মানুষে’র ব্যবহার করাটি যত সহজ মেয়েমানুষের ওপর তা নয়, বুঝলি?’

‘বুঝলাম।’ বলে একটু হাসে তুলসী, ‘এই যে একটু সুখ—দুঃখের কথা কইছি, তাতেই বুক ছমছম করছে, এক্ষুনি দরজার আড়ালে পদ্মদির ছায়া পড়বে।’

পদ্মদি!

ননী উদাস গলায় বলে, ‘দিদি নেই।’

‘নেই! নেই মানে?’

‘মানে চলে গেছে?’

‘কোথায় গেছে?’

ননী হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে তিক্ত গলায় বলে, ‘শ্বশুরবাড়ি।

‘ও বাবা! বল কি? পদ্মদির আবার যাবার মতন একটা শ্বশুরবাড়ি ছিল নাকি ননীদা?’

‘ছিল না! গজালো। ভাসুর না অসুর কে যে ছিল, সে বুঝি মরেছে, তাই ইনি তার সদ্যবিধবা পরিবারের সঙ্গে মামলা লড়ে বিষয়ের ভাগ আদায় করতে গেলেন।’

তুলসী ননীর ওই তিক্ত মুখের দিকে তাকায়।

তুলসী অবাক হয়ে বলে, ‘এ—সব কখন হল? এই তো সেদিনও—’

‘হয়েছে কাল। খবর পাওয়া মাত্তর দড়ি—ছেঁড়া হয়ে চলে গেল। দুটো বাচ্ছা যে ওর মুখোপেক্ষী হয়ে পড়ে আছে তাও ভাবল না একবার। বলল কি জানিস? জীব দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি। পিসি বিহনে কি আর ওদের খাওয়া আটকে থাকবে? মেয়েমানুষ জাতটা ভারী লুভিষ্টে, বুঝলি তুলসী! কী ছাইয়ের বিষয় সম্পত্তি আছে ভগবান জানে, তবু লোভে পড়ে লড়ালড়ি করতে ছুটল। এখানে তোর অভাবটা কী ছিল? খেতে পাচ্ছিলি না? পরতে পাচ্ছিলি না? গিন্নিত্বর অভাব ছিল? রাতদিন তো ভাইটা আর ভাইপো—ভাইঝি দুটোর মাথা হাতে কাটত। তবু ওই বললাম তো, মেয়েমানুষ জাতটা লোভেই মরে—’

তুলসী তীক্ষ্ন গলায় বলে, ‘জাতটাকে তো ভালই চিনে ফেলেছ দেখছি ননীদা! তবে কনক বৌদিও মেয়েমানুষ জাতেরই ছিল।’

ননী চমকে উঠল যেন।

ননী বোধহয় এ কথাটার জন্যে প্রস্তুত ছিল না।

ননী গুম হয়ে গেল।

তারপর নিশ্বাস ফেলে আস্তে বলল, ‘এক—আধজন দেবী অংশে জন্মায় তুলসী!’

‘তা বটে!’

তুলসী মনে মনে বলে, সময়কালে মরতে পারলেই দেবী হওয়া যায়। যার মরণ নেই তার দেবী হওয়ার উপায় নেই।

যাক, তুলসী তো আর দেবী অংশে জন্মায় নি। তুলসী কীটপতঙ্গের সামিল। তুলসী অতএব ওই সব বড় বড় কথা ছেড়ে ফট করে একটা কীটস্য কীটের মত কথা বলে। বলে, ‘সরকারী হাসপাতালের দাইয়ের হাতে খেলে তোমার না হয় জাত যেতে পারে, শিশু দুটোর কী সে ভয় আছে?’

ননী হঠাৎ প্রায় ধমকে উঠে বলে, ‘জাত যাওয়ার কথা বলেছি তোকে আমি? একবার একটা কথা বলে ফেলেছি বলে খালি খালি সেই খোঁটা দেওয়া হচ্ছে। জাত যাবে! বলেছি আমি জাত যাবে?’

কোনদিন কারুর ধমকেই ভয় খায় না তুলসী।

তাই বেশ সতেজেই বলে, ‘বলনি তা সত্যি! তবে এ কথাও বলনি, তুলসী ওদের পিসি চলে গেছে, দুটো ভাত সেদ্ধ করে দিয়ে যাস।’

‘দিদি সবে কাল গেছে।’

‘কাল গেছে, তারপর তিন চারটে বেলাও গেছে।’

‘তোর বড্ড সময় তাই তাকে বলতে যাবো!’

‘সময় আছে কি নেই সেকথা আমি বুঝতাম।’

‘বেশ বাবা ঠিক আছে। এই গলায় বস্তর দিয়ে বলছি—তুলসী—মঞ্জরী, তুমি এসে দুটি রান্না করে দিয়ে যেও। তবে এও বলব তুলসী, এটা চালালে লোকনিন্দে হতে ছাড়বে না।’

‘উঃ ননীদা!’

তুলসী কপালে হাত থাবড়ে বলে, ‘চিরটাকাল ওই ভাবনাতেই মলে ননীদা! যাকগে তুমি না হয় আমায় কিছু মাইনেই ধরে দিও তার বদলে। তাতে তো আর দোষ নেই? ঝি—চাকরানীর হাতে খেতে তো আর নিন্দে নেই, আর কে না খাচ্ছে এখন?’

তুলসী দোকান থেকে নামে।

ননী একটু এগিয়ে আসে।

বলে, ‘আচ্ছা তুলসী, এত কটু কথা শিখলি কোথায় বল তো? এই করণপুর শহরে বোধহয় তোর মতন মুখরা আর দুর্বাক্য বলিয়ে মেয়ে দুটো নেই।’

তুলসী চলে যাচ্ছিল, ফিরে দাঁড়ায়।

তুলসীর মুখে ওই ঝুলন্ত লণ্ঠনের আলোটা যেন একটা আলোছায়ার নক্সা কাটে।

তুলসী একটু গভীর রহস্যময় হাসি হেসে বলে, ‘কোথা থেকে এত কটুকথা শিখলাম তাই জিগ্যেস করছ ননীদা? যদি বলি ভাগ্যের কাছে।’

‘ভাগ্যের কাছে মানে?’

‘মানে বুঝিয়ে বলতে বসি, এত সময় আর এখন নেই ননীদা, আজ আবার ডিউটি। তবে এইটুকুই বলে যাই, এই মুখই আমার অস্তর! এরই জোরেই এযাবৎ শত্রু তাড়িয়ে আসছি। তুলসীর এই মুখটা না থাকলে আজ তুলসীর অস্তিত্ব বলে কিছু থাকত না, কোথায় তলিয়ে যেত। যাকগে ওসব কথা, বলি ভোরের বেলা রাঁধব তেমন রসদ আছে ভাঁড়ারে? নাকি এসে দেখব ভাঁড়ার ঢনঢন।’

‘জানি না! দেখিনি।’

‘ওঃ জানো না, দেখোনি! তা আজ বাপ—বেটা—বেটিতে কী খাওয়া হয়েছিল? হরিমটর?’

‘আজ হোটেলে খেয়ে এসেছি সবাই মিলে।’

‘বাঃ চমৎকার! এই তো চাই। ঠিক আছে, আসছি।’

তুলসী এবার দ্রুতপায়ে এগিয়ে যায়।

কিন্তু ননী যে কেন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে সেইদিকে তাকিয়ে?

তুলসীই বা মোড়ে বাঁক নেবার সময় ঘুরে তাকিয়ে দেখে কেন?

তুলসী এখন ননীকে আলোর আড়ালে দেখতে পায়। ননীর কপালে আলোছায়ার নক্সা নেই, ননীর সবটাই অন্ধকার, শুধু মাথার পিছনে একটা আলোর আভাস।

সামান্য রেখায়।

ওই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা ননীকে যেন কেমন বেচারী বেচারী দেখতে লাগে। যেন খোলা মাঠের মাঝখানে একলা একটা গাছ দাঁড়িয়ে আছে।

পথের মাঝখানে পিছু ধরল একজন। তাড়াতাড়ি হেঁটে কাছাকাছি পৌঁছে আস্তে ডাকল, ‘তুলসী!’

তুলসী চমকালো না, কারণ ওই সঙ্গ নেওয়াটা তুলসীর চোখ এড়ায়নি।

তুলসী গম্ভীরভাবে বলে, ‘রাস্তায় সঙ্গে সঙ্গে যাওয়া ভাল দেখায় না জগাই!’ জগাইও গম্ভীর হতে জানে।

বলে, ‘তা বাড়িতেও তো যেতে দিস না তুলসী!’

‘তা রাত—বিয়েতে বাড়িতেই বা যেতে দেব কেন?’

‘আমায় তুই অবিশ্বাস করিস তুলসী?’

জগাইয়ের গলায় আহত অভিমান।

তুলসী চলতে চলতে বলে, ‘অবিশ্বাসের কথা হচ্ছে না, লোকনিন্দের কথা হচ্ছে।’

‘দুদিন বাদে তো তোর সঙ্গে আমার বিয়েই হবে।’

‘একেবারে হবেই ধরে নিয়েছিস?’

জগাই কাতরভাবে বলে, ‘ধরে নেব না? তুই আমায় সে আশ্বাস দিসনি? বলিসনি, তা তোকে বিয়ে করা বরং ভালো। একটু বোকা—সোকা ভালো—মানুষ আছিস, আমাকে এঁটে উঠতে পারবি না—বলিসনি?’

তুলসী হেসে ফেলে বলে, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছিলাম বটে। তুই যে সেটা একেবারে বেদবাক্য বলে ধরে নিবি তা বাবা বুঝতে পারিনি।’

‘বুঝতে পারিসনি? তা পারবি কেন? কোনোদিনই তো জগাই হতভাগার দিকে ভাল করে তাকিয়েও দেখিসনি। অথচ আমি চিরকাল তোকে—’

তুলসী হতাশভাবে বলে, ‘আমার কী অবস্থা হয়েছে জানিস জগাই, তেষ্টা পেয়ে একঘটি জল চাইলাম, ভগবান ডুবিয়ে মারতে এক—পুকুর জল দিল। মনে করেছিলাম ছেলেবেলা থেকে চেনা জানা, আড্ডা—ইয়ার্কি দিই, এই পর্যন্ত। সত্যি কি আর তোদের কারুর এই হাসপাতালের দাইটাকে বৌ করে ঘরে নিয়ে যাবার হিম্মত হবে? প্রথমটা যদিও বা আগ্রহ দেখাস, শেষটা সাত পাঁচ ভেবে পিছিয়ে যাবি। তা আমার সে হিসেব তো ভুলই হয়েছে দেখছি… কে? কে ওখানে?…ওঃ রাজেন? এই দেখ জগাই, আমার আর এক খদ্দের।…রাজেন, তোদের বলেছিলাম মন স্থির করতে দুটো দিন সময় নে, এখন দেখছি উল্টো হচ্ছে। আমারই এখন মনঃস্থির করতে সময়ের দরকার।’

রাজেন ক্ষুব্ধ গলায় বলে, ‘তা জানি, এখন ভাবছিস, একটা বড়গাছে নৌকো বাঁধলেই হত।’

‘বড়গাছে মানে? কী বলতে চাস তুই?’ তুলসী পলকে ফিরে দাঁড়ায়।

রাজেন বলে, ‘বলতে কিছুই চাই না তুলসী! আক্ষেপের মাথায় কথার কথা বলেছি। তবে এই যদি তোর মনে ছিল, তবে সেদিন অকারণ একটা সুখের ছবি দেখালি কেন? এখন গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নিচ্ছিস? আমি ইত্যবসরে জগাকে নোটিস দিয়েছি ঘর খুঁজে নিগে যা।’

‘নোটিস দিয়ে দিয়েছিস?’

তুলসী রুক্ষ গলায় বলে, ‘নোটিস দেওয়ার কী ছিল?’

‘বাঃ আমার বাসায় তো মোটে দেড়খানা ঘর। ওর চালচুলো নেই বলে একসঙ্গে থাকি। এরপর কী করে চলবে?’

‘কেন, ওই আধখানা ঘরেই থাকত ও।’

তুলসী ঘাড় ফিরিয়ে বলে, ‘কী রে জগাই, পারতিস না?’

কেউ সাড়া দেয় না।

কখন নিঃশব্দে চলে গেছে সে।

তুলসী ক্ষুব্ধ গলায় বলে, ‘চিরকালের বন্ধুকে বিতাড়িত করে বৌ এনে প্রতিষ্ঠে করবি রাজেন? ভেবে লজ্জা হল না?’

রাজেন অম্লান মুখে বলে, ‘কিছু না। ভাইবন্ধু আত্মকুটুম্বু সব্বাইকে বিতাড়িত করে বৌকে প্রতিষ্ঠে করা যায়। তাতে লজ্জার কিছু নেই, জগৎ সংসার তাই করছে। বৌয়ের তুল্য বস্তু পৃথিবীতে আর আছে নাকি তুলসী?’

‘উচ্ছন্ন যাও তুমি!’

বলে তুলসী হনহনিয়ে পা চালায়।

কিন্তু রাজেন কি আর হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে?

রাজেনও এগিয়ে গিয়ে ধরে।

বলে, ‘খুব তো মহত্ত্ব দেখাচ্ছিস! বলি ওর চোখের সামনে তোকে নিয়ে সংসার করব, এটা ও ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখবে, সেটাই বুঝি খুব আহ্লাদের হবে জগাইয়ের? যা বলেছি ‘ভালর জন্যেই বলেছি রে তুলসী!’

তুলসী ক্লান্ত একটা নিশ্বাস ফেলে।

তুলসী অনেকটা পথ জোরে জোরে এসেছে। আর ননীর দোকান থেকে তার নিজের বাসা তো কম দূর নয়। হাসপাতালের কোয়ার্টারগুলোর কাছাকাছিই বাসা নিয়েছিল ও। শুধু মাঝখানে একটা মাঠের ব্যবধান।

নিশ্বাসটা ফেলে তুলসী বলে, ‘তুই আমায় নিয়ে সুখে সংসার করছিস এ কথাটা কী পাকা হয়ে গেছে?’

‘পাকা কাঁচা তোর হাতে’, রাজেন তীব্র উত্তর দেয়, ‘তবে আমাকে না করলে রইল ওই হাবা জগাই। সুখেনকে তুমি পাচ্ছ না। সুখেনের পিসি বলেছে খ্যাংরা নিয়ে বৌ বরণ করতে আসবে।’

তুলসী বলে, ‘সুখেন বলেছে, ওসব ভয় দেখানোকে ও কেয়ার করে না।’

‘এখন তাই বলছে, কার্যক্ষেত্রে দেখিস, পিসি ঠিকই থাকবে আর দুবেলা খ্যাংরা মেরে তবে কথা কইবে। আমার বাবা নাঙ্গার নেই বাটপাড়ের ভয়। কেউ কোথাও নেই।’

‘তেমনি বৌ যত্ন করতেও কেউ নেই।’

রাজেন পরিতৃপ্তির হাসি হেসে বলে, ‘কেউ—য়ের দরকার কী? আমিই করব, দেখিয়ে দেব যত্ন কাকে বলে! আমি সেই কবে থেকে—বলতে গেলে জ্ঞানাবধিই—’

‘রাজেন একটু চুপ কর। আমার মাথাটা যেন ঝিম ঝিম করছে।’

অগত্যাই চুপ করে যেতে হয় রাজেনকে।

তুলসীর মাথা ঝিম ঝিম?

সে তো সোজা কথা নয়।

কে জানে এক একজন কোন লগ্নে জন্মায় তাদের অকারণ সবাই সমীহ করে, ভয় করে।

ভিখিরীর ঘরের মেয়েও রাজেন্দ্রাণীর ভূমিকা নেয়।

‘যাচ্ছিস তো চল আমার সঙ্গে,’ তুলসী বলে, ‘দেখিগে আবার কোন শয়তান এসে বাড়ি পাহারা দিচ্ছে কি না।’

অনুমান ভুল নয় তুলসীর। বেড়ার দরজা থেকেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে দাওয়ার ওপর একটা দীর্ঘাকৃতি কালো ছায়া।

‘রাজেন, চলে যাসনে।’

তুলসী হুকুমের স্বরেই বলে, ‘এখন যাসনে। ওই ইঁটখানা দে।’

কিন্তু ছায়ামূর্তি ততক্ষণে বলে ওঠে, ‘এই, এই, আমি আমি।’

‘তুই! তুই এত রাত্তিরে যে?’

‘কেন আর? তোর কাছে পাকা কথা নিতে।’

তুলসী সেই দাওয়ার সিঁড়ির ওপরই বসে পড়ে বলে, ‘তোরা কী চাস বলত? ‘আমি দ্রৌপদী হই?’

আটটার সময় গিয়ে পৌঁছনোর কথা, প্রায় রোজই সাড়ে আটটা বেজে যাবেই।

নার্স মনোরমা মণ্ডল ভুরু কুঁচকে বলে, ‘এভাবে প্রতিদিন দেরী করলে তো চলবে না তুলসী! কী হচ্ছে আজকাল? ঘুম কী তোমার এত বেড়েছে?’

তুলসী দ্রুত ভঙ্গীতে ওষুধের জলে হাত ধুতে ধুতে বলে, ‘ঘুম বাড়তে যাবে কেন? ঘুম শত্রুর বাড়ুক। আপনাকে তো বলেই ছিলাম একটা পার্ট টাইমের চাকরী নিয়েছি।’

মনোরমা মণ্ডল বড় গলায় বলে, ‘তোমার পার্ট টাইমের কাজ বজায় রেখে ডিউটি দিতে এলে তো আর ওপরওয়ালারা শুনবে না।’

তুলসী হেসে বলে, ‘আমার ওপরওলা তো আপনি। আপনি শুনলেই হল।’

ডাক্তার ঘোষের একদার অনুগৃহীতা, এবং এখন পরিত্যক্তা নার্স মনোরমা মণ্ডল স্বভাবতই তুলসীর উপর দারুণ ক্ষিপ্ত।

ঘটনাটা ঘটুক বা না ঘটুক, মেয়েমানুষ এসব দুর্ঘটনার আঘ্রাণ পায়। মনোরমা মণ্ডলও পেয়েছে। এবং পেয়ে অবধিই ছুতোয় নাতার তুলসীর ব্যাপার কমপ্লেন করছে।

আজও করল।

গম্ভীর গলায় বলল, ‘ওসব পার্ট টাইম ফাট টাইম দেখাতে চাও তো বড় মিসকে বলগে। তবে তোমার এবার এখানের চাকরীটি যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’ তুলসী দাঁড়িয়ে ওঠে।

অগ্রাহ্যের সুরে বলে, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে।’

‘তোমারও তাই মনে হচ্ছে?’

নার্স মনোরমা মণ্ডল ভুরু কুঁচকে কপালে নানা কাটা দাগ বসিয়ে বলেন, ‘তোমার নিজেরও তাই মনে হচ্ছে?’

‘হচ্ছে বৈকি!’

তুলসী মৃদু হেসে বলে, ‘আপনি যখন চাকরীটা নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছেন!’

‘তার মানে, বলতে চাও আমি তোমার চাকরী খেয়ে দেব?’

তুলসী মৃদু হেসে বলে, ‘তা দিতে পারেন। আশ্চর্য কী?’

‘হুঁ।’

মনোরমা মণ্ডল আগুনের মত ফেটে পড়ে বলে ওঠে, ‘যা শুনতে পাচ্ছি, তা তাহলে ঠিকই? তা নইলে এত দুঃসাহস হয়? আচ্ছা চাকরী যখন পারি তখন খাবো।…তোমার এই গাফিলতি এবং তোমার স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে যা শুনেছি ‘সব রিপোর্ট করে দিচ্ছি।’

তুলসী খুব অমায়িক গলায় বলে, ‘ওটাও রিপোর্ট করা যায় মণ্ডলদি? ওমা তা তো জানতাম না। তা হলে আরও চারটি নাম আপনার লিস্টিতে পুরে দেব, লিখে নেবেন।’

‘ও! তুমি আমার সঙ্গে মস্করা করতে এসেছ?’

মনোরমা মণ্ডল পা ঠুকে বলে, ‘আজই তোমার ডিসমিস করিয়ে দিচ্ছি দেখো।’

তুলসী করিডোর পার হয়ে যেতে যেতে বলে, ‘আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না মণ্ডলদি, আপনার খাটুনি আমি বাঁচিয়ে রেখেছি। চাকরী ছেড়ে দেওয়ার নোটিস দিয়েছি।’

‘নোটিস দিয়েছ? ওঃ। কার কাছে শুনি? ডাক্তার ঘোষের কাছে বোধ হয়?’

‘আ ছিছি, এ কী বলছেন মণ্ডলদি? আমাদের মতন তুচ্ছ মানুষের কি ওনাদের কাছে যাওয়া সাজে। আপনাদের সে সাহস আছে। আমি বড় নার্স দিদিমণিকে বলে দিয়েছি।’

মনোরমা মণ্ডল এই নির্ভয় মূর্তির দিকে তাকিয়ে রাগে থরথর করতে করতে বলে, ‘বড় নার্সকে! ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া, তা শুনে তিনি বোধহয় তোমায় সন্দেশ খাওয়ালেন!’

তুলসী হেসে উঠে বলে, ‘খাওয়াননি, বরং খেতে চাইলেন।’ বললেন, ‘দেখো তুলসী, বিয়েতে আমাদের যেন বাদ দিও না, নেমন্তন্ন চাই।’

‘বিয়ে!’

মিস মনোরমা মণ্ডল স্খলিত স্বরে বলে, ‘ওঃ বিয়ে! তাই এত অহঙ্কার। পাত্রটি কে শুনতে পাই না?’

তুলসী এবার ওর অভ্যাসসিদ্ধ হাসিতে গড়িয়ে পড়ে, ‘সে আর শোনাব কি মণ্ডলদি! নিজেই জানি না। একগণ্ডা বর দুবেলা হেঁটে হেঁটে পায়ের জুতো ক্ষইয়ে ফেলছে। কোনটার গলায় যে মালা দেব শেষ অবধি, তাই জানি না।’

তুলসী এখন তার সেই রেল কোয়ার্টারের বৌদির ‘ননদে’র সেবার ভারপ্রাপ্তা। তুলসী ঘরে ঢুকতেই সে বলে ওঠে, ‘আমার বৌদির মুখে তোমার কত প্রশংসা শুনেছিলাম তুলসী, আর আমার বেলাতেই তুমি এই করলে!’

তুলসী ওর বিছানা ঝেড়ে দিতে দিতে হেসে বলে, ‘আপনাকে তুলে না দিয়ে তো যাচ্ছি না দিদি!’

‘তা তো দিচ্ছ। ভেবেছিলাম বাড়ি ফিরে তোমায় স্পেশাল করে রাখব কিছুদিন, তা হল কই!’

তুলসী হাতজোড় করে বলে, ‘ওই অপরাধটি রয়ে গেল দিদি, আর হবে না। তবু এই এখান থেকে আপনাকে তুলে দিয়ে তবে যাব।’

‘বর কেমন হচ্ছে রে তুলসী?’

‘সে কী আর আপনার কাছে বলা যায় দিদি! তবে নাকি এ জগতে একটা কথা আছে, রাজার জন্যে রাণী আর কানার জন্যে কানী। সেটাই আর কী।’

‘তা তোমার তো তিনকুলে কেউ নেই, বিয়েটা কে দেবে?’

তুলসী ওর চুল আঁচড়ে দিতে দিতে বলে, ‘বন্ধুবান্ধবরা দিয়ে দেবে।’

ননী চৌকিটার উপর বসে ছিল চুপচাপ।

তুলসী হাসপাতাল—ফেরত এসে দাঁড়াল, বলে উঠল, ‘একী গো ননীদা, এই ভাবে বসে আছ? ছেলেদের নতুন জামা—প্যাণ্ট দুটো কেনা হয়েছে?’

ননী আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে।

তুলসী মাথায় হাত দিয়ে বলে, ‘তা সেটা কবে হবে?’

‘তাড়াতাড়ির কী আছে?’ ননী গম্ভীর ভাবে বলে, ‘ওরা তো আর বরযাত্রী যাচ্ছে না?’

‘আহা তা নাই বা গেল। তা বলে নতুন জামা—জুতো হবে না?’

‘কেন, ওদের কী খুব সুখের দিন পড়েছে?’

তুলসী কড়া গলায় বলে, ‘দেখো ননীদা, তুমি আমায় রাগিও না বলছি। কেন, কী দুঃখের দিনই বা হচ্ছে? তবু তো দুবেলা নিয়ম করে দুটো খেতে পাবে, পাতা বিছানাটা পাবে, হাতের কাছে জামা জুতোটা পাবে।’

‘হুঁ!’

ননী একটু ব্যঙ্গহাসি হেসে বলে, ‘আর তার সঙ্গে একটি সৎমা পাবে।’

‘ঠিক কথাই বলেছ ননীদা!’ দৃঢ়স্বরে বলে তুলসী, ‘সৎ’ মা—ই পাবে।’

‘তা, তুই এখনো আমায় ননীদা ননীদা করে মরছিস যে?’

তুলসী হেসে ফেলে বলে, ‘অভ্যেস বলে কথা। আজকের অভ্যেস তো নয়!’

‘আমি এখনো ভেবে পাচ্ছি না তুলসী, তুই এসব কী করলি! ছোঁড়াগুলোর কাছে আর মুখ দেখাতে পারছি না—’

তুলসী হি হি করে হাসে।

‘তা পারবে কী করে? চিরকেলে মুখচোরা তো! কেন, আমি তো বেশ পারছি!’

‘বেশ পারছিস?’

‘বাঃ, না পারলে চলবে? আমার আর তিনকুলে কে আছে? ওরা ছাড়া কাজকর্ম করবে কে? তোমার আত্মজন বলতেও ওরা, আমার বন্ধুজন বলতেও ওরা।’

‘তবে তুই যা, বিদেয় হ এখান থেকে। এখনো এখানে ঘুর ঘুর করছিস কেন? অনেক চুনকালি তো লাগালাম মুখে, আরো বাড়িয়ে দিয়ে তোর কী চতুর্বর্গ লাভ হবে শুনি?’

‘তা হবে হয়তো কিছু। কিন্তু আমার তো এক্ষুনি চলে গেলে চলবে না! তোমার এই হাড়ির হাল সংসারে, বৌ এসে দাঁড়াবে কোথায়? সেটা তো ব্যবস্থা করে যেতে হবে। সেটা কিছু আর বেটাছেলের কাজ নয়।’

‘তোকে আর অত গিন্নেপনা করতে হবে না, এখান থেকে বিদেয় হ বলছি।’

‘আচ্ছা।’

তুলসী একটি তীক্ষ্ন ভ্রূভঙ্গী করে বলে, ‘আজ পর্যন্ত বলে নাও। আর দুদিন পর থেকে দেখব কেমন বিদেয় হ বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতে পার।’

চলে যায় মুখ টিপে হেসে।

ননী অবাক হয়ে তাকিয়ে ভাবে, কী করে এমন সহজ স্বচ্ছন্দ হতে পারে তুলসী!

তা ননীর মত সরল সাবধানী আর সভ্যলোকের পক্ষে অবাক হবারই কথা। অনেকদিন হয়ে গেল তবু সেদিনের সেই কথাগুলো যেন এখনো পরিপাক করে উঠতে পারছে না। অথচ তুলসী অবলীলায় এসে বলে উঠেছিল, ‘দেখো ননীদা, দুঃখে—ধান্দায় পড়ে একটা বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, তা বলে তিনটে বিয়ে করতে চাইনি’।

ননী হাঁ হয়ে গিয়ে বলেছিল, ‘তার মানে?’

‘মানে তিনটে ছোঁড়াই আমায় বিয়ে করবার জন্যে ক্ষেপে উঠেছে। এখন তুমি কি চাও আমি দ্রোপদী হই?’

ননী খিঁচিয়ে উঠেছিল, ‘তা তুমি যেমন কুলকাঠের আঙরাতে বাতাস দিতে গিয়েছিলে?’

‘বাঃ, আমি কি জানি ছাই! ভেবেছিলাম কেউই হয়তো গা করবে না। এতটুকু বয়েস থেকে ঝি খাটতে দেখেছে, আর এখন হাসপাতালের আয়াগিরি করতে দেখেছে। তাছাড়া পাড়া মজিয়ে আড্ডা দিয়ে বেড়াই, বিড়ি—সিগ্রেট ওড়াই, কার রুচি হবে এ মেয়েকে বিয়ে করতে! ওমা! এ একেবারে উল্টো উৎপত্তি! এখন দেখছি যদি জোর করে একটার গলায় মালা দিয়ে বসি, বাকী দুটো তার জন্মের শোধ শত্রু হয়ে যাবে। এখন ওদেরও এ বিপদ থেকে রক্ষে করতে হবে, আমাকেও ওই তিনটে বরের হাত থেকে বাঁচাতে হবে।’

‘তা’ আমি কী করব? আমার কী করার আছে?’ রেগে মেগে বলেছিল ননী।

আর তুলসী দিব্যি সহজ ভাবে, যেন কথাটা মোটেই লজ্জার কথা নয়, এইভাবে বলে উঠেছিল, ‘করলে তোমারই ‘করার’ আছে। তুমি যদি আমায় বিয়ে করে ফেলো, সব ল্যাঠা চুকে যায়।’

ননী অবিশ্যি একথা শুনে বাচাল বেহায়াটাকে মারতে উঠেছিল। কিন্তু কে পারবে ওর সঙ্গে। ওর হি হি তো বন্ধ হয় না। বলে কিনা কথা আদায় না করে যাবই না।

আজ রাজেনের বাসায় বিশেষ ঘটাপটা।

উঠোনে ইঁট সাজিয়ে উনুন পাতা হয়েছে তার মাথায় ছোট শামিয়ানা। সরু দালানের এক কোণে বড় বারকোশে কিছু কিছু কুটনো কোটা, ওদিকে দু তিনটে হাঁড়িতে দই—মিষ্টি।

সুখেন একরাশ কাঠচাঁপা ফুল একটা মাদুরের ওপর ফেলে হাতে ছুঁচ ফুটিয়ে ফুটিয়ে দুগাছা মালা গাঁথছে, রাজেনের হাতে পিটুলিগোলা। তেল দিয়ে একটা পঁ#ড়িতে মোটা মোটা দাগায় আলপনা দিচ্ছে রাজেন।

আর জগাই বসে বসে চারটি মাটির খুরি গেলাস ধুচ্ছে।

কারুর মুখে কোন কথা নেই, মেঘাচ্ছন্ন মুখ।

হঠাৎ একসময় সুখেন বলে ওঠে, ‘ধেৎতেরি নিকুচি করেছে! লক্ষ্মীছাড়ি যেন আমাদের নিয়ে বাঁদরনাচ নাচাচ্ছে। ওনার বাসরের মালা গাঁথছে বসে বসে শালা সুখেন!’

রাজেন বলে, ‘আর আমি তার পীড়ি ঘোরাবার পীড়ি আলপনা দিচ্ছি।’

‘শখের প্রাণ গড়ের মাঠ!’

জগাই ওপাশ থেকে বলে ওঠে, ‘সব হওয়া চাই। বলা হয় কিনা তোরা বেটাছেলে, জীবনে পাঁচ—দশবারও বিয়ে করতে পারবি, ভেবে দেখ তুলসী হতচ্ছাড়ির তো এই জম্মের মধ্যে কম্ম—তা এসব সাধ একটু আধটু হবে না? কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে—’

রাজেন বলে, ‘এই পীড়ি আলপনা সেরে আমায় এখন একটা রাঁধুনীঠাকুর ধরে আনতে হবে।’

‘আর আমি এই মালা সেরে যাব বাসরের বিছানার ব্যবস্থা করতে!’

‘ওদিকে তো আবার ননীদার ওখানেও অনেক কাজ। বরযাত্রীদের নিয়ে গুছিয়ে গাছিয়ে আসা—’

‘বরযাত্রী আবার এত পাচ্ছিস কোথায় তুই?’

‘জানি না, কোথা থেকে না কোথা থেকে দু পাঁচটা জুটিয়েছে।’

হঠাৎ জগাই জেগে ওঠে, ‘আমাদের তো বিয়েতে একটা প্রেজেনটেশান দেওয়া উচিত ছিল।’

সুখেন কড়া গলায় বলে, ‘উচিত ছিল, দিয়েছি। নিজের মান সম্ভ্রমটাই প্রেজেণ্ট দিচ্ছি।’

‘আহা তা বললে কী হবে! একখানা কাপড় টাপড়—’

সুখেন তেমনি ভাবেই বলে, ‘তোর পরামর্শর পিত্যেশে বসে নেই জগা! লাল চেলি কিনে রেখেছি একখানা।’

‘অ্যাঁ, তোর ওকাজ হয়ে গেছে?’

জগাই কাতর গলায় বলে, ‘রাজেন, চল তোতে আমাতে দোকানে যাই!’

রাজেন আলপনাটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বলে, ‘আমি ওসব কাপড়—টাপড়ের মধ্যে নেই, একখানা কানপুরী ছিটের বিছানার চাদর এনে রেখেছি।’

‘ওঃ! সবাইয়ের সব হয়ে গেছে, তা আমায় একবার বলবি তো? ঠিক আছে, আমি একাই যাচ্ছি। তখন যেন আবার জগা জগা রব না ওঠে।’

দরজার কাছে সহসা একটি চাঁচাছোলা কণ্ঠস্বর ঝলসে ওঠে—’সে তো উঠবেই। জগা ভিন্ন ওঁচা কাজগুলো করবে কে? এই যে পীড়ি চিত্তির হয়ে গেছে? বাঃ! আর বলছিলি কিনা পারব না। পারব না কথার কোন মানে নেই, বুঝলি?…কুটনোটা আমি একবার দেখে যাব। ক’জন খাবে বুঝি। টোপর এনেছিস?’

সুখেন মালা দুটো ঠেলে ফেলে রেখে বলে ওঠে, ‘যা যা হুকুম হয়েছিল তার কিছু বেতিক্রম হয় নি।’

‘তা হবে কেন?’ বুঝে সুঝে ঠিক লোকদেরই কাজের ভার দিয়েছি। রান্নার মশলাপাতি সব এসে গেছে?’

‘এসেছে।’

‘তোদের ফর্সা জামাকাপড় মজুত আছে তো?’

‘আমাদের আবার কী দরকার? রাজেন ভারী গলায় বলে।

তুলসী উচ্চকিত গলায় বলে, ‘তার মানে? তোদের দরকার নেই? ননীদার বিয়ের বরযাত্রী হবি না সেজে—গুজে? হ্যাঁ ভাল কথা, গাড়িটার ব্যবস্থা ঠিক আছে তো? আমার দু তিনটে বান্ধবী আসবে, দেখিস যেন তারা আবার অব্যবস্থা দেখে না হাসে। অবিশ্যি বলেছি আমি তাদের—’ভারী তো বিয়ে! তার দুপায়ে আলতা।’ আচ্ছা আর দেখ—’

তুলসী গাঢ়স্বরে বলে, ছেলেমেয়ে দুটোকে একটু সকাল সকাল করে ডেকে এনে খাইয়ে নিয়ে যেতে হবে। সে ভারটা জগাই তুই নে ভাই!’

সুখেন মালায় পাতা চাপা দিয়ে বলে ওঠে, ‘খুব বাঁদরনাচটা নাচালি বটে!’

তুলসী ঘরের মধ্যে ঢুকে আসে।

তুলসী ওদের কাছাকাছি বসে পড়ে আহত গলায় বলে, ‘ওকথা কেন বলছিস রে? যা করছি অনেক ভেবে—চিন্তেই করেছি।…দেখলাম তোরা তিনজনেই আমায় প্রাণ সমর্পণ করে বসে আছিস। সবাই তুল্য—মূল্য। কেউ কম যায় না। তখন ভেবে দেখ সত্যি তো আর তিনজনের গলাতেই মালা দিতে পারি না।…একজনকেই দিতে হবে। বাকি দুজনের ওপর তখন দারুণ অবিচার হবে কিনা?’

ওরা অবশ্য কথা বলে না।

গোঁজ হয়ে বসে থাকে।

তুলসী তেমনি নরম গলায় আস্তে আস্তে বলে, ‘আর সত্যি বলতে, ননীদার দুঃখুটাও চোখে সহ্য হচ্ছিল না রে! একা দাঁড়িয়ে ছিল যেন বাজ—পড়া তালগাছ। পদ্মদির ব্যবহারে বড় দুঃখু পেয়েছে। মেয়েমানুষ জাতটার ওপরেই ঘেন্না ধরিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া ওই বাচ্চাদুটোর কথাও চিন্তা কর।’

সুখেন বলে, ‘করা হয়েছে চিন্তা।’

‘সেই তো, তোরা বুঝমান বলেই এত সাহস! তা আমাকেই কি সোজা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে নাকি?’

তুলসী হাসে—’ননীদার পরিবারের ‘ধোঁয়া’ খাওয়া চলবে না। হাসপাতালে কাজ করা চলবে না। রাস্তায় টো টো করা চলবে না। এইসব সত্যবদ্ধ করিয়ে নিয়ে তবে কেতাত্থ করে বিয়েতে রাজী হয়েছেন বাবু। আর তোদের সঙ্গে যে কড়ার হয়েছে মনে আছে তো? যেমন তাসের আসর চলত চলবে। যেমন আড্ডা গল্প চলত চলবে।…যেমন ননীদার সাহায্য করা হত চলবে।…আর তখন বৌদি সেজে লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রুঘ্ন তিনটেকে একে একে ধরে ধরে হিল্লে করে বিদেয় করে দেওয়া হবে, কথাটি কওয়া চলবে না। মনে আছে তো? ঠিক? এসব নইলে তো আমার সুখ হবে না। তোদের কাছেই আমার জীবনের সুখ—শান্তি ভিক্ষে করছি।

সোনার কৌটো (Sonar Kouto) – আশাপূর্ণা দেবী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *