Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

হাম্বির এখন শুধু হাম্বির নয়— ভগবান একলিঙ্গের দেওয়ান মহারানা হাম্বির। নামটা শুনতে যতখানি, হাম্বিরের রাজত্ব কিন্তু ততখানি ছিল না। থাকবার মধ্যে কৈলোরের কেল্লা, আশে-পাশে খানকতক গ্রাম আর দুই হাজার মাত্র রাজপুত সেপাই! মেবারের মহারানা এখন ঠিক যেন একজন তালুকদার। এদিকে দিল্লীর বাদশা মহম্মদ খিলজীর হয়ে মালদেব তখন চিতোরে বসে সমস্ত মেবার শাসন করছিলেন। চিতোর থেকে প্রায় বিশ ক্রোশ দূরে কৈলোরের কেল্লা। কোনো কোনো দিন আকাশ পরিষ্কার থাকলে কৈলোর থেকে পাহাড়ের উপর চিতোরের কেল্লা ঠিক যেন একখানি জাহাজের মতো আকাশ-সমুদ্রে ভেসে রয়েছে দেখা যেত।
হাম্বির লছমী মায়ের সঙ্গে কেল্লার ছাদে উঠে, লোক যেমন ঠাকুর দর্শন করে তেমনি— চিতোর দর্শন করতেন। সেই সময় সূর্যের আলোয় সকালবেলায় সোনার আকাশ-পটে রাজপ্রাসাদের পাথরের দেওয়াল, দেবমন্দিরের সোনার চুড়ো নিয়ে পাহাড়ের উপরে চিতোরের কেল্লা ধীরে ধীরে ফুটে উঠত। হাম্বির বলতেন, ‘ওই দেখো মা, আমার জাহাজ দেখা দিয়েছে!’
রানীমা বলতেন, ‘জাহাজ তো তৈরি আছে। তুই যদি ঘুম দিতে থাকিস তবে জাহাজ বেদখল হয়।’
হাম্বির বলতেন, ‘এ জাহাজ মারে কার সাধ্য।’
হাম্বির যে ঘুম দিচ্ছিলেন না একথা লছমীরানী অতি অল্পদিনেই জানতে পারলেন। সেদিন দেওয়ালির পুজো। সন্ধ্যাবেলা হাম্বির এসে মাকে বললেন, ‘মা, দেওয়ালির আলো দেখবে তো ছাদে এসো।’
রানীমা হেসে বললেন, ‘আচ্ছা তুই এত বড়ো হলি তবু মায়ের সঙ্গে তামাশা করা রোগটা তোর এখনো গেল না? এই মাঠের মধ্যে দেওয়ালির আলো কোথায় পেলি? এ কি তোর চিতোর— যে ঘরে-ঘরে লোকে আলো দেবে?’
‘দেখবে এসো না মা’ বলে হাম্বির লছমীরানীকে নিয়ে কেল্লার ছাদে উঠলেন। কার্তিক মাসের অমাবস্যা— কিন্তু আকাশ ছেয়ে তারা ফুটে ছিল; যেন দেবতারা ফুল ছড়িয়ে গেছেন! রানীমা অবাক হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে আছেন। হাম্বির হেসে বললেন, ‘মা, কী চমৎকার বাহার দেখেছ! কিন্তু এ দেওয়ালি তো দেবতাদের— তোমারও নয়, আমারও নয়। এখন একবার কৈলোরের দেওয়ালি— আমার দেওয়ালিরই আলোটা কেমন হয়েছে এদিকে দেখো দেখি।’
রানীমা চেয়ে-চেয়ে দেখলেন— কৈলোরের কেল্লার চারিদিকে পাহাড়ে-পাহাড়ে আলো জ্বলছে। গ্রামের পথে মাঠে-ঘাটে দিকে-দিকে লক্ষ-লক্ষ প্রদীপ, যেন তারার মালা, আরোর জাল। লছমীরানী অবাক হয়ে হাম্বিরের মুখের দিকে চেয়ে বললেন ‘এই জনমানবহীন কৈলোরে এত আলো, এত লোক কোথা থেকে এল?’
হাম্বির বললেন, ‘ওই যে পাহাড়ের দিকে দেখছ ওই আলো সব ভীলেরা জ্বালিয়েছে। আর যে গ্রামের দিকে দেখছ এসব গ্রামবাসীদের দেওয়া।’ রানীমা বললেন, ‘এত প্রদীপ, এত তেল, তুই এসব বুঝি চিতোর থেকে আমদানি করলি?’
হাম্বির বললেন, ‘শুধু চিতোর থেকে নয়, সমস্ত মেবার থেকে প্রদীপ আর তেল, প্রদীপ গড়বার কুমোর, তেল যোগাবার তেলিও আমদানি করেছি। ওই দেখো, কুমোর-পাড়ায় মশাল জ্বলছে; যাত্রা শুরু হল। ওই শোনো তামুলি-পাড়ায় ঢোল বাজছে; এখনি সঙ বার হবে। ওই যে মহাজন পট্টিতে নহবৎ বাজল, তোপখানায় বোমা ফাটল। দেখছ মা, হাম্বিরতালাও ঘিরে ব্রাহ্মণের মেয়েরা কেমন প্রদীপ দিয়েছেন।’
লছমীরানী বলে উঠলেন, ‘কী আশ্চর্য; এ যে নগর বসিয়ে ফেলেছিস দেখি! আমি বলি বুঝি তুই বসে-বসে কেবল ঘুম দিস। ভিতরে-ভিতরে তোর এত বুদ্ধি!’
হাম্বির বললেন, ‘তা যাই হোক মা, এখন আমার এই নগরের একটি ভালো নাম তোমায় বেছে দিতে হবে। লক্ষ্মীপুর কেমন নাম?’
রানীমা বললেন, ‘আরে না না, ও যে বাঙালি রকম শোনাচ্ছে। আমি একটা ভালো নাম সন্ধান করছি। শুধু নাম নয়, তার সঙ্গে একটি লক্ষ্মী বউ। তুই আর দিন কতক সবুর কর।’
দুজনে যখন এই কথা হচ্ছে সেই সময় চিতোর থেকে মালদেবের দূত আর একজন ব্রাহ্মণ হাম্বিরের বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে কৈলোরে উপস্থিত হল। ব্রাহ্মণ এসে মালদেবের চিঠি আর একটি রুপোর পাতে মোড়া নারকেল এনে লছমীরানীর সম্মুখে ধরে দিলেন। রানী চিঠিখানি খুলে পড়তে লাগলেন, লেখা রয়েছে— ‘আমার কন্যা রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। তাকে আপনার চরণে দাসী করে আমার কুলকে পবিত্র করুন। আমি পাঠানের আশ্রয়ে আছি বটে, কিন্তু ধর্ম ছাড়িনি।’
রানী হাম্বিরের দিকে চেয়ে বললেন, ‘ দেখ দেখি, মালদেব চিতোর থেকে কেমন সুন্দর নারকেলটি পাঠিয়েছেন। এটা আজ দেওয়ালির পুজোর কাজে লাগবে।’
হাম্বির বললেন, ‘বেশ ফলটি, কিন্তু মা, এটার উপর প্রথম থেকেই আমার লোভ পড়েছে। এটা আর দেবতাদের দিয়ে কাজ নেই, এটা আমাকেই দাও।’
রানী হেসে বললেন, ‘তা বেশ তোমাকেই দেওয়া গেল— রাজাও একরকম দেবতা তো। কিন্তু শুধু ফল নিলে তো চলবে না, সঙ্গে-সঙ্গে এই চিঠিখানি আর এখানি যে লিখেছে তার মেয়েটিকেও তোমায় নিতে হচ্ছে। যাও, এই ব্রাহ্মণকে নিয়ে এই চিঠির একটা ভালো করে জবাব লিখে নিয়ে এসো; আমি ততক্ষণ পুজো সেরে আসি।’ রানী পুজোয় গেলেন। হাম্বির ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ব্যাপারখানা কী বলো দেখি?’ ব্রাহ্মণ বললেন, ‘মহারানা, সভায় চলুন, সমস্ত খুলে বলব।’
বিয়ের সমস্ত ঠিকঠাক করে মালদেবের দূত চিতোরে ফিরে গেল।
এদিকে কৈলোরে বরযাত্রার উদ্‌যোগ চলতে লাগল। যত বুড়ো বুড়ো রাজপুত সর্দার লছমীরানীকে ধরে বসলেন— ‘মালদেব হাজার হোক শত্রুপক্ষ তো বটে। মহারানাকে সেখানে বিনা পাহারায় পাঠানো কোনো মতেই উচিত নয়।’ রানীর হুকুমে পাঁচশো রাজপুত সেপাই বরযাত্রীর সঙ্গে যাবার জন্যে প্রস্তুত হল। হাম্বির মাকে প্রণাম করে বিদায় হলেন। লছমীরানী আশীর্বাদ করলেন, ‘বৎস, মালদেবের কন্যার সঙ্গে মেবারের রাজলক্ষ্মীও তোমায় বরণ করুন।’ কৈলোর থেকে চিতোর অনেক দূর, কিন্তু হাম্বিরের ঘোড়া যেন উড়ে চলল!
বরযাত্রীরা যখন চিতোরের সম্মুখে উপস্থিত হলেন তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়েছে। পশ্চিমের আলোয় আকাশ ছেয়ে গেছে। ঠিক যেন দেবদূতেরা মহারানার মাথায় ছাতা ধরেছেন।
কিন্তু মালদেব— যাঁর কন্যা আজ মেবারের অধীশ্বরী রাজরাজেশ্বরী হতে চলেছেন, তিনি কোথায়? কেল্লার দরজার একটিমাত্র প্রহরী মহারানাকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে দুয়ার ছেড়ে পাশে দাঁড়াল। মঙ্গল-শাঁখ নেই, কন্যাযাত্রীর আনন্দ নেই, যেন কোনো নির্জন পুরীতে হাম্বির প্রবেশ করলেন।
বুড়ো মন্ত্রী এসে হাম্বিরের কানের কাছে বললেন, ‘মহারানা, যেন কেমন কেমন ঠেকছে! মালদেবের লক্ষণ ভালো নয়। আমার মতে কেল্লার মধ্যে প্রবেশ করা উচিত হয় না।’
হাম্বির বললেন, ‘নিজের কেল্লায় নিজে প্রবেশ করব, তার আবার ভয়টা কী? চলে এসো— ’
সেই সময় ফটকের এক কোণ থেকে মালদেব এসে বললেন, ‘মহারানা, আমারও সেই আশা ছিল, আপনি নিজের ঘরে আসছেন তার জন্যে আবার অভ্যর্থনাই বা কী, বাজনা-বাদ্যিই বা কেন?
মন্ত্রী বললেন, ‘মালদেব, তুমি কি জানো না রাজপুতদের নিয়ম আছে বিবাহের রাত্রে ফুলের কেল্লা দখল করে তবে কন্যা-কর্তার বাড়িতে বর প্রবেশ করেন? তোমার কন্যার সখীরা সে আয়োজন করেননি কেন?’
মালদেব বললেন, ‘মন্ত্রী, আপনি কন্যার পিতা বটে, কিন্তু বাড়ি আমার কোথা? এটা যে মহারানার নিজেরই কেল্লা। নিজের ঘরে নিজে মহারানা এসে প্রবেশ করছেন, সেখানে আমার কন্যার সখীরা এসে তাঁকে বাধা দিতে সাহস পাবে কেন?’
মন্ত্রী একটু হেসে বললেন, ‘দেখছি বাদশাহের মজলিসে আনাগোনা করে আপনার কুসংস্কার অনেকটা দূর হয়েছে। এখন চলুন, বিবাহকার্য সুসম্পন্ন করুন! লছমীরানীর হুকুম, আজ রাত্রেই বরকন্যা নিয়ে আমরা কৈলোরে ফিরে যাব।’
হাম্বিরের পিতা পিতামহ যে রাজসভায় বসে রাজত্ব করতেন, সেই ঘরে হাম্বিরকে নিয়ে মালদেব যখন উপস্থিত হলেন, তখন হাম্বিরের বুকের ভিতরটা কেমন যে করে উঠল তা বলা যায় না। তাঁর মনে হল যেন সেই প্রকাণ্ড ঘরের একধারে চিতোরের শূন্য রাজসিংহাসন ঘিরে ছায়ার মতো সব বীরপুরুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন একদৃষ্টিতে তাঁর দিকে চেয়ে। তাঁদের গায়ে সোনার সাঁজোয়া, হাতে খোলা তলোয়ার, মুখে কারু কথা নেই; হাম্বিরের সঙ্গে যত রাজপুত এসেছিল সবাইকার চোখ সেই সিংহাসনের দিকে। প্রকাণ্ড ঘরের আবছায়া অন্ধকারে চিতোরের শূন্য সিংহাসনের উপরে সোনার রাজচ্ছত্র আলো পেয়ে একবার ঝলমল করছে, আবার যেন অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। হাম্বিরের সঙ্গে পাঁচশো রাজপুত সেই সিংহাসনকে নমস্কার করে উঠে দাঁড়ালেন, অমনি সেই অন্ধকার ঘর যেন আলো করে কমলকুমারী সখীদের সঙ্গে এসে হাম্বিরের গলায় পদ্মফুলের মালা দিলেন! চিতোরের রাজলক্ষ্মী এতদিন অনাথা বিধবার মতো শূন্য রাজপুরে যেন একা ছিলেন, আজ যেন কতদিন পরে চিতোরের রাজকুমারী এসে তাকে হাতে ধরে বরণ করে নিলেন।
কতদিন পরে চিতোরের কেল্লায় আর একবার মঙ্গলশাঁখ বেজে উঠল। চিতোরের গড় বড়ো-বড়ো তালা-বন্ধ ঘর নিয়ে এতদিন শূন্য পড়ে ছিল, আজ সেই শাঁখের শব্দে পাঁচশো রাজপুতের তলোয়ারের ঝনঝনায় আর একবার যেন লোকে লোকারণ্য বোধ হতে লাগল, যেন তার আগেকার স্ত্রী আবার ফিরে এল।
সেইদিন থেকে দুই বৎসর না যেতে সত্যি-সত্যিই হাম্বির এসে চিতোরের কেল্লা দখল করে নিলেন। দিল্লীর নবাব মহম্মদ খিলজীর কাছে এ খবর পৌঁছতে গেল মালদেবের ছেলে বনবীর। তার আশা ছিল মালদেবের পরে সে-ই চিতোরে বসে রাজত্ব করবে। তাই সে মহম্মদ খিলজীর সঙ্গে পাঠান ফৌজ নিয়ে চিতোরের দিকে আসতে লাগল।
শিঙ্গোলীতে পাঠান বাদশা ফৌজ নিয়ে তাম্বু গেড়েছেন। লছমীরানীর সঙ্গে কমলকুমারী আর এক বছরের রাজকুমার ক্ষেতসিংহকে আর একবার কৈলোরের কেল্লায় পাঠিয়ে দিয়ে হাম্বির যুদ্ধে গেলেন।
বাঘ যেমন হরিণের পালের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তেমনি রাজপুত সৈন্য পাঠান ফৌজের উপর গিয়ে পড়ল। সেবারে মহম্মদ খিলজীকে আর দিল্লীর মুখে ফিরে যেতে হল না। হাম্বির তাঁর দুই পায়ে শিকল দিয়ে চিতোরের কেল্লায় এনে তাঁকে বন্ধ করলেন। বনবীরেরও সেই দশা। কমলকুমারীর ভাই বলে সে-যাত্রা হাম্বির তাঁকে প্রাণে না মেরে বন্দী করে কৈলোরে নিয়ে উপস্থিত হলেন।
হাম্বির থাকেন কৈলোরে, আর চিতোরে কড়া পাহারার মধ্যে থাকেন দিল্লীর বাদশা মহম্মদ খিলজী। এক মাস, দু-মাস, তিনমাস যায়, হাম্বির আর চিতোরে যাবার নাম-গন্ধ করেন না। একদিন লছমীরানী তঁকে ডেকে বললেন, ‘তুই কি পাঠান বাদশাকে চিতোর ছেড়ে দিলি নাকি? সেখানে তোর রাজসিংহাসন, সেই চিতোর ছেড়ে কৈলোরে এসে বসে থাকা তো আর সাজে না। তোর রাজা হয়ে রাজসিংহাসনে বসবার ইচ্ছে নেই কি?’
হাম্বির বললেন, ‘মা চিতোরের সিংহাসনে বসতে হলে কী চাই তা জানো? শুধু মুঞ্জ ডাকাতের হাত থেকে চিতোরের রাজমুকুট কিংবা পাঠান ফৌজের কাছ থেকে চিতোর গড়টা কেড়ে নিলে বাপ্পারাওর সিংহাসনে বসা যায় না। ভবানী মায়ের হাতের খাঁড়াখানি যতদিন না সন্ধান করে পাওয়া যায় ততদিন তো রাজা হওয়া যাবে না। আগে সেই খাঁড়াখানির পুজো দিয়ে তবে রাজসিংহাসনে বসা চাই। সে খাঁড়া যে এখন কোথায়, তা কেউ জানে না। কেউ বলে পাঠানেরা লুটে নিয়ে গেছে, কেউ বলে রানী পদ্মিনীর সঙ্গে সে খাঁড়া চিতার আগুনে ছাই হয়ে গেছে।
লছমীরানী বললেন, ‘আমি এ দুটো কথার একটাও বিশ্বাস করিনে। লোকে যাই বলুক, আমার বিশ্বাস ভবানীর খাঁড়া এখনো চিতোরেই আছে; কেবল চিতোরে এমন কেউ কাজের লোক নেই যে সেই খাঁড়াখানি যত্ন করে সন্ধান করে। লোকেরই বা দোষ দিই কেন? চিতোরের যে রাজা তাঁরই যখন কোনো চেষ্টা দেখা যাচ্ছে না, তখন সামান্য লোকের এত কী গরজ যে খাঁড়াখানা সন্ধান করে তাদের রাজার হাতে তুলে দেয়!’ সেই দিন হাম্বির মায়ের পায়ে হাত দিয়ে শপথ করলেন, ‘ভবানীর খাঁড়া উদ্ধার করে তবে অন্য কাজ!’
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, আকাশে মেঘ করে একটু-একটু বৃষ্টি পড়ছে; হাম্বির ও কমলকুমারী দুজনে লুকিয়ে চিতোরের কেল্লায় এসেছেন। গ্রামবাসী চাষা-চাষীর সাজে কমলকুমারী পথ দেখিয়ে যাচ্ছেন আর হাম্বির তাঁর সঙ্গে গায়ে একখানা মোটা কম্বল জড়িয়ে মস্ত পাগড়িতে মুখের আধখানা ঢেকে গুটি-গুটি চলেছেন বরাবর যেদিকে শ্মশান সেই দিকে। আকাশ দিয়ে কালো-কালো মেঘ হু-হু করে পুব থেকে পশ্চিমে ছুটে চলেছে। ঝড়ের তাড়ায় বড়ো-বড়ো গাছের ডালগুলো মচমচ করে শব্দ করছে। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার, কেউ কোথাও নেই, বাতাস এমন ঠাণ্ডা যে গায়ে লাগলে গা কাঁটা দিয়ে ওঠে। এই অমাবস্যার রাত্রে ঝড়ে জলে ঘোর অন্ধকারে কমলকুমারী হাম্বিরকে নিয়ে মহাশ্মশানের ভিতর এসে উপস্থিত হলেন। চোখে কিছু দেখা যায় না, কেবল একদিক থেকে ঝরঝর করে একটা শব্দ আসছে— যেন অন্ধকারের ভিতরে একটা ঝরনা পড়ছে।
যেদিক থেকে জলের শব্দ আসছিল, সেইদিক দেখিয়ে কমলারানী হাম্বিরকে বললেন, ‘ও ঝরনার ধারে পাহাড়ের গায়ে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ, তারই পাশ দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ পাতালের দিকে নেমে গেছে; সেই সুড়ঙ্গের ভিতরে পদ্মিনীরানী চিতার আগুনে পুড়ে মরেছিলেন। ওই সুড়ঙ্গের শেষে একটা গুহায় কারুণী দেবীর মন্দির! শুনেছি সেইখানে একটা অজগর সাপ পাহারা দিচ্ছে, আর ঠিক তার মাথার উপরে ভবানীর খাঁড়া ঝুলছে। আমি অনেকবার সেই সুড়ঙ্গ পর্যন্ত গেছি কিন্তু ভিতরে যেতে সাহস হয়নি!’
হাম্বির বললেন, ‘তুমি সুড়ঙ্গ পর্যন্ত আমার সঙ্গে চলো; সেই বটগাছের তলায় তোমাকে রেখে আমি ভেতরে যাব।’
শ্মশানের একধার দিয়ে একটা আঁকা-বাঁকা সুঁড়ি-পথ অন্ধকারের দিকে নেমে গেছে! দুজনে সেই পথে পায়ে-পায়ে চললেন; কতদূর চলে সামনে একটা জলের নালা— আর রাস্তা নেই! পাথর কেটে ঝরনার জল কুলকুল করে ছুটে চলেছে। নালার জল এক হাঁটু, কিন্তু বরফের মতো ঠাণ্ডা— পা রাখা যায় না।
হাম্বির কমলারানীকে দুই হাতে তুলে ধরে সেই জলের উপর দিয়ে হেঁটে সেই বটগাছের দিকে চলেছেন। শুনতে পাচ্ছেন, দূরে যেন পাহাড়ের ভিতর থেকে ঝনঝন করে একটা শব্দ আসছে! কারা যেন লোহার কপাট ধরে নাড়া দিচ্ছে। বটগাছের একটা শিকড় ধরে হাম্বির ডাঙায় উঠলেন। সেখানটা এমন নিস্তব্ধ, এমন অন্ধকার যে মনে হয়, পৃথিবী ছেড়ে কোথাও এসেছি!
সেই বটতলায় কমলারানীকে বসিয়ে রেখে হাম্বির অন্ধকারে দুহাত বাড়িয়ে সুড়ঙ্গের ভিতর নেমে চললেন। দুদিকে পাহাড়ের দেয়াল বেয়ে জল পড়ছে! একটু আলো নেই, একটু শব্দ নেই, সামনে কিছু দেখা যাচ্ছে না, পিছনে কিছু সাড়া দিচ্ছে না! নীল অন্ধকারের ভিতর দিয়ে হাম্বির একা চলেছেন। একবার তাঁর পায়ে ঠেকে কী একটা গড়গড় করে, গড়িয়ে গেল। হাম্বির সেটা হাতে তুলে দেখলেন একটা মড়ার মাথা! কখনো তাঁর পায়ের চাপনে একখানা শুকনো মড়ার হাড় মড়মড় করে গুঁড়িয়ে গেল। কখনো পাহাড়ের ফাটল বেয়ে একটা গাছের শিকড় নেমেছে, সেটা তাঁর হাতে ঠেকছে মনে হল যেন সাপের গায়ে হাত পড়েছে; কখনো তিনি দূরে থেকে যেন ফোঁস-ফোঁস আওয়াজ শুনতে পাচ্ছেন; কখনো মনে হচ্ছে কারা যেন ফিসফিস করে কথা বলছে; এক-এক জায়গায় আলেয়া একবার দপ করে জ্বলেই নিবে যাচ্ছে; কোথাও মনে হচ্ছে পাথরের দেয়াল কত দূরে যেন সরে গেছে; আবার এক-এক জায়গায় দেয়াল যেন চেপে পড়তে চাচ্ছে। এক জায়গায় শুনলেন মাথার উপর থেকে কাদের যেন কান্নার শব্দ আসছে; পা যেন তাঁর ছাইগাদায় বসে যেতে লাগল; মাথার উপর হাম্বির চেয়ে দেখলেন অনেক দূরে নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে— চারিদিকে তার গোল পাথরের দেয়াল, কোনো দিকে আর যাবার পথ নেই! সেই অন্ধকূপের ভিতর হাম্বির চারিদিকে হাতড়ে বেড়াতে লাগলেন। নিচে পথ নেই, উপরে পথ নেই, আশেপাশে পাথরের দেওয়াল, তারি মাঝে স্তূপাকার ছাই, চলতে গেলে পা বসে যায়।
কতক্ষণ হাম্বির সেইখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, এমন সময় পাথরের দেয়ালের উপর থেকে শুনলেন শাঁখ ঘণ্টার শব্দ আসছে! দেখতে-দেখতে হাম্বিরের চোখের সামনে খানিকটা পাথরের দেয়াল দুফাঁক হয়ে সরে গেল; সেই ফাঁক দিয়ে হাম্বির দেখলেন, গেরুয়া কাপড় রুদ্রাক্ষের মালা পরা পাঁচজন ভৈরবী আগুনের উপরে একখানা প্রকাণ্ড লোহার কড়া ঘিরে বসে রয়েছেন। অনেকদূরে কারুণী দেবীর সোনার মূর্তি আগুনের আলোয় ঝকঝক করছে। হাম্বির নির্ভয়ে কারুণীর মন্দিরে যেখানে ভৈরবীরা বসে রয়েছেন, সেখানে উপস্থিত হলেন। হাম্বিরকে দেখে ভৈরবীরা বিকট চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘কেরে তুই! কী চাস?’
হাম্বির নির্ভয়ে বললেন, ‘আমি এসেছি যা আমার তাই চাইতে। মা ভবানী বাপ্পাকে যে খাঁড়া দিয়েছিলেন, সে খাঁড়া এইখানে আছে, আমি তাই চাই! তারই জন্যে আমার মা আমাকে পাঠিয়েছেন— আমি চিতোরের রানা হাম্বির!’
ভৈরবীরা হাম্বিরের কথার উত্তর না দিয়ে আগুনের উপর সেই লোহার কড়াখানার দিকে দেখিয়ে দিলেন। হাম্বির ছুটে গিয়ে যেমন সেই কড়াখানার ভিতর হাত দিয়েছেন অমনি কোথায় সে আগুন, কোথায় সে কড়া, কোথায় বা সে ভৈরবীর দল! হাম্বির দেখলেন ভবানীর খাঁড়া হাতে তিনি কমলারানীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন; আর অজগর সাপের মতো খানিকটা ধোঁয়া সেই সুড়ঙ্গের মুখ থেকে বেরিয়ে চলেছে আস্তে-আস্তে। হাম্বির ভবানীর খাঁড়া হাতে যেদিন চিতোরের রাজসিংহাসনে উঠে বসলেন, যেদিন সমস্ত রাজস্থানে জয়-জয়কার পড়ল। দিল্লীর বাদশা মহম্মদ খিলজী সেদিন পঞ্চাশ লাখ মোহর হাম্বিরকে নজর দিয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন এ জীবনে আর চিতোরমুখো হবেন না; তবে তিনি ছাড়া পেলেন।
কমলকুমারী হাম্বিরকে ভবানীর খাঁড়াখানির সন্ধান দিয়েছিলেন বলে হাম্বির তাঁর কথায় বনবীরকে ছেড়ে দিলেন আর কৈলোরের কেল্লার নাম রাখলেন— কমলমীর।
লছমীরানী হাম্বিরকে সিংহাসনে বসিয়ে উজলাগ্রামে তাঁর বাপের বাড়ি চলে গেলেন তাঁর সেই ছেলেবেলার ঘরে নদীর পারে খেতের ধারে।

Pages: 1 2 3 4 5 6 7 8 9

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *