হাম্বির
চিতোর তখনো পাঠানের হস্তগত হয়নি। মেবারে তখনো ভীমরানার অটুট প্রতাপ। মহারানা লক্ষ্মণসিংহের সুশাসনে দেশ যখন শান্তিতে সুখে ধনে ধান্যে পরিপূর্ণ, সেই সময় একদিন যুবরাজ অরিসিংহ দলবল নিয়ে শিকারে গিয়েছিলেন। আন্ধোয়া বনের ধারে উজলা গ্রামে মেঠো রাস্তায় শিকারী দল রাজকুমারের সঙ্গে-সঙ্গে শিকারের পিছনে ছুটে চলেছিল— শিকার একটা ছুঁচালো-মুখ দাঁতালো বরাহ। বেলা দুপুরে মেঠো রাস্তায় অনেকখানি ধুলো উড়িয়ে অনেকদূর ছুটে গিয়ে রাজকুমারের শিকার রাস্তার একধারে জনার খেতের ভেতর ঝঁপিয়ে পড়ল— সেখানে ঘোড়া চলে না, তীর তো ছোটেই না।
খেতের মাঝে মাচার উপর দাঁড়িয়ে এক রাজপুতের মেয়ে এই তামাশা দেখছিল— পরনে তার পীলা ওড়নি, নীল আঙ্গিয়া। রাজকুমারের পায়ে ছিল সবুজ দোপট্টা! দুজনের চোখ দুজনের উপর পড়েছিল। শিকারের আশায় হতাশ হয়ে অরিসিংহ যখন বুনাস নদীর তীরে আমবাগানে ফিরে চলেছিলেন, খেতের ভিতর থেকে রাজপুতের মেয়ে সেই সময় বরাহটা মেরে শিকারীদের ভেট দিয়ে গেল।
রাজকুমার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ক্যায়সে মারা!’
বালিকা বল্লমের মতো সিধে একটা জনারের শিষ দেখিয়ে বললে— ‘ইসিসে ঘায়েল কিয়া।’ তার ধুলোমাখা কালো চুলগুলি সাপের ফনার মতো সুন্দর মুখের চারিদিকে বড় শোভা ধরেছিল। তার সুডোল হাতে পিতলের কাঁকন সূর্যের আলোয় সোনার মতো কেমন ঝকঝক করছিল। বুনাস নদীর তীরে আমবাগানের শীতল ছায়ায় সেই কথাই ভাবতে ভাবতে রাজকুমারের তন্দ্রা আসছিল।
সবুজ খেতের মাঝে মাটির ঢেলা ফেলে পাখি আর ছাগল তাড়াতে-তাড়াতে মেয়েটিও রাজকুমারের কথা ভাবছিল কিনা কে জানে; কিন্তু এক সময় তার হাত থেকে ঠিকরে একটা মাটির ঢেলা সেই আমবাগানের ধারে ঘোড়ার পায়ে এসে লাগল! হঠাৎ ঘোড়ার তড়বড় শব্দে চমকে উঠে রাজকুমার চেয়ে দেখলেন আমবাগানের ফাঁকে একটুখানি সবুজ খেত— তারই মাঝে সেই নীল-আঙ্গিয়া, পীলা-ওড়নি কৃষকনন্দিনী!
পশ্চিম বাতাসে অড়রের ক্ষেতে ঢেউ উঠেছে, একদল টিয়া পাখি ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলেছে, বেলা-শেষে দিনের আলো নিবু-নিবু, পাথরের মতো পরিষ্কার আকাশ, তার কালো মেঘের সরু রেখা— রাজকুমার শিকার শেষে বাড়ি চলেছেন। নদীর ধারে যেখানে গ্রামের পথ আর মাঠের রাস্তা এক হয়েছে সেখানেই আবার দুজনে দেখা হলো— বালিকা মাথায় দুধের কলসী নিয়ে মাঠ ভেঙে গ্রামে চলেছে— সঙ্গে দুটি চিকন কালো ছানা ভৈঁষ!
পরদিন উজলা গ্রামের সেই বালিকার ঘরে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে রাজকুমারের দূত এল! বালিকার পিতা চন্দাসো বংশের চৌহান রাজপুত কিছুতেই গেহলোট বংশে কন্যাদানে সম্মত নয়— রাজকুমার হতাশ হয়ে রাজ্যে ফিরলেন। এদিকে সেই বৃদ্ধ রাজপুতের ঘরে গৃহিণীর কাছে পাড়াপড়শীর দুয়ারে লাঞ্ছনা-গঞ্জনার সীমা-পরিসীমা রইল না। এমন কাজও করে? হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলতে আছে? যেমন বুদ্ধি, তেমনি চিরটা কাল চাষ হয়েই থাক।
বুড়ো কিন্তু সকলের কথায় একই জবাব দিত, ‘তোমরা যাই বল, আমি কিন্তু লছমীকে কখনোই রাজবাড়িতে পাঁচ সতীনের দাসী করে দিতে পারিনে; তার চেয়ে আমার মেয়ে গরিবের ঘরে গিন্নী হয়ে থাক সেও ভালো।’
কিন্তু বুড়োর প্রতিজ্ঞা বেশিদিন রইল না। চিতোর থেকে দূত এল, পদ্মিনী রানী লিখছেন: ‘আমি নিঃসন্তান, তোমার কন্যাকে ভিক্ষা চাই; আমার আশীর্বাদে চিতোরের রাজলক্ষ্মী তোমার বংশকে বরণ করুন।’
সতীর কথা ব্যর্থ হয় না। লছমীর সন্তান যে চিতোরের সিংহাসনে বসবে, সে বিষয়ে আর সন্দেহ রইল না। ধূমে-ধামে আলো জ্বালিয়ে, ঘোড়া সাজিয়ে বর-বেশে যুবরাজ এলেন যেন কোনো স্বপ্নের রাজ্য থেকে। রাজপুত্র এসে উজলাগ্রামে উদয় হলেন— আনন্দে, আলোয়, নাচে-গানে সমস্ত গ্রাম এক রাতের মতো উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সুখের বাসর আনন্দের মধ্যে কখন কাটল বোঝা গেল না।
এক বৎসর পরে যুবরাজ লছমীরানীকে আর এক-মাসের শিশু রাজপুত্র হাম্বিরকে উজলাগ্রামে রেখে পাঠানের সঙ্গে যুদ্ধে গেলেন। সে-যুদ্ধে যে গেল তাকে আর ফিরতে হল না। রানা গেলেন, রাজপুত্রেরা গেলেন, ভীমসিংহ গেলেন, রানী পদ্মিনী, রাজবধূ, রাজমাতা, সকলে গেলেন। চিতোর লক্ষ্মী অন্তর্ধান করলেন। রইলেন কেবল উজলাগ্রামে হাম্বিরকে নিয়ে রানী লছমী, আর কৈলাসের কেল্লায় মেবারের রানার বংশধর অজয়সিংহ।
একদিকে শোরোনাল বলে একখানি ছোটো গ্রাম, আর একদিকে আরাবল্লী পর্বত, মাঝে একটি ছোটো পাহাড়ের উপর কৈলোরের পুরাতন কেল্লা। এক সময়ে পাহাড়ী ভীলদের শাসনে রাখার জন্যে ওই কেল্লা প্রস্তুত হয়েছিল। তখন চিতোরের মহারানা বছরের মধ্যে প্রায় চারমাস এখানেই কাটাতেন। তখন কেল্লার শ্রী-ই ছিল এক। তারপর পাহাড়ী জাত যখন ক্রমে অধীন হয়ে শত্রুতা ছেড়ে বশত্যা মানলে তখন আর বড়ো একটা এখানে আসবার প্রয়োজন হত না। ক্বচিৎ দুই একজন রাজকুমার শিকারে এসে রাত্রিবাস করে যেতেন। কেল্লাও ক্রমে ভেঙে-চুরে বন-জঙ্গল আর কাঁটাগাছে পরিপূর্ণ হয়েছিল।
ঝড় বৃষ্টি বিদ্যুতের মাঝে চিতোরের রানা লক্ষ্মণসিংহের বংশধর রাজ্যহারা অজয়সিংহ স্ত্রী-পুত্র পরিবার নিয়ে একদিন এই কেল্লায় আশ্রয় নিলেন। সে দুঃখের রাত কী দুঃখে কেটেছিল কে বলবে! মাথার উপরে ফাটা ছাদ দিয়ে বৃষ্টির ধারা পড়ছে, ঘরের কোণে ইন্দুরের খুটখাট, বাদুড়ের ঝটাপট— রাজার ছেলে রাজার বৌ তারই মাঝে ভিজে ঘরে খড়ের বিছানায় ঘোড়ার কম্বল ঢাকা দিয়ে রাত কাটালেন। সকালে গ্রামবাসীরা রাজা দেখতে এসে দেখলে তাদের রাজার বসবার সিংহাসন, শোবার খাটিয়া নেই; রাজার রানী, রাজার ছেলে ঘোড়ার কম্বলে বসে আছেন। মেবারের রানা অজয়সিংহ আজ কোথায় সোনার সিংহাসনে রাজছত্র মাথায় দিয়ে বসবেন, রানীমা কোথায় দুই রাজকুমার অজিমসিংহ সুজনসিংহকে নিয়ে গজদন্তের পালঙ্কে আরাম করবেন, না তাঁদের এ দুর্দশা? গ্রামবাসীরা তখনই যত্ন করে কেল্লা পরিষ্কার করতে লাগল, ঘর সাজাতে লাগল, গ্রামের জোতদার গজদন্তের খাট সিংহাসন, কিংখাবের সুজনী, জরীর চাঁদোয়া, শ্বেত চামর, চন্দনের পাখা, রূপার প্রদীপ, সোনার বাটা শ্বেত পাথরের বাসন হাজির করলে। খেত থেকে চাষীর মেয়েরা তরি-তরকারি, ঘিয়ের মট্কি, দুধ দেবার গাই, ঘোড়ার ঘাস নিয়ে হাজির হল। দেখতে-দেখতে সাজ-সরঞ্জাম কেল্লার শ্রী ফিরে গেল। সন্ধ্যার সময় গ্রামবাসী তাদের রাজার মুখে, রানীর মুখে, দুই রাজ-পুত্রের মুখে হাসি দেখে বিদায় হল।
ভক্ত প্রজার প্রাণপণ সেবায় অজয়সিংহ সব দুঃখ ভুললেন, কেবল চিতোর যে এখনো পাঠানের হস্তগত এ দুঃখ তাঁর মন থেকে কিছুতে গেল না। তিনি প্রায়ই দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলতেন, ‘হায়! সূর্য এখনো রাহুগ্রস্ত, কবে এ গ্রহণ শেষ হবে তা কে জানে! সেই সুদিনের প্রতীক্ষা করে আমায় কতকাল থাকতে হবে কে বলতে পারে।’
দিন যেতে লাগল। কিন্তু যে সুদিনের প্রতীক্ষায় অজয়সিংহ রইলেন, সে সুদিন বুঝিবা আর এল না। পাঠানের হাত থেকে চিতোর উদ্ধার করতে অজয়সিংহ প্রাণ দিতে প্রস্তুত কিন্তু তাঁর লোকবল অর্থবল কোথায়? বড়ো আশা ছিল দুই রাজকুমার অজিমসিংহ সুজনসিংহ বড়ো হয়ে পিতৃরাজ্য উদ্ধারের চেষ্টা করবে— কিন্তু হায়, বিধাতা সে সাধেও বাদ সাধলেন। সেদিন বর্ষাকাল, মেঘের ঘটা আরাবল্লী পর্বতের শিখরে কাজলের মতো ছায়া ফেলেছে। গ্রামের উপর খেতের উপর দিয়ে আলো-আঁধারের খেলা চলেছে। দুই রাজকুমার শিকারে বেরিয়েছেন, রাজা-রানীতে মহলের ভিতর একলা আছেন।
সন্ধ্যা হল— রাজকুমারেরা ঘরে ফিরছেন না, রানীমা এক-একবার খোলা জানলায় ছেয়ে দেখছেন। দেখতে-দেখতে পশ্চিম মেঘের তীরে একটু-খানি সোনার ঢেউ খেলিয়ে সূর্যদেব অস্ত গেলেন। রাত্রির অন্ধকার মেঘের অন্ধকারে গাঢ়তর হয়ে এল। রানীমা রাজার সঙ্গে কথা বলছেন আর বারে-বারে জানালার পানে চেয়ে দেখছেন।
রাজা বললেন, ‘তোমায় আজ আনমনা দেখছি যে?’
‘কে জানে প্রাণটা কেমন করছে’, বলে রানীমা উঠে গেলেন। দাসী ঘরে এসে প্রদীপ দিয়ে গেল। টুপটাপ করে ক্রমে বড়ো-বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি নামল।
রানীমা মলিন মুখে ফিরে এসে বললেন, ‘এরা যে দুভায়ে সকাল থেকে শিকারে গেল, এখনো এল না কেন?’
রানা বলে উঠলেন, ‘সে কী? এখনো এরা ফেরেনি? এই ঝড়-বৃষ্টিতে দুজনে কোথায় রইল?’ বলতে-বলতে কেল্লার উঠানে লোকের কোলাহল শোনা গেল। তখন মেঘ কেটে গিয়ে চন্দ্রোদয় হচ্ছে; রাজা রানী দেখলেন জন কয়েক গ্রামবাসী কাকে যেন ধরা-ধরি করে নিয়ে আসছে। একজন দাসী তাড়াতাড়ি এসে খবর দিয়ে গেল, ‘রানীমা, দেখুন গিয়ে বড়োকুমার অজিম বাহাদুরের কী হয়েছে।’ বলতে-বলতে লোকজন ধরাধরি করে রাজকুমারকে নিয়ে উপস্থিত হল। রাজা রানী শুনলেন, পাহাড়ের উপর শিকার করতে গিয়ে মুঞ্জ বলে যে ভীল সর্দার, তার ছেলের সঙ্গে সুজন বাহাদুরের হরিণ নিয়ে ঝগড়া হয়, ক্রমে লড়াই বাধে। বড়োকুমার তাকে রক্ষা করতে গিয়ে মাথায় চোট পেয়েছেন।
রানা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আর সুজন সিং কোথায় গেলেন।’
লোকজনেরা মাথা চুলকে বললে, ‘আজ্ঞে তিনি ভালো আছেন, আমাদের তিনি পাঠিয়ে দিলেন। নিজে একটা চটিতে বিশ্রাম করছেন, এলেন বলে!’
পথের ধারে চটিতে বিশ্রাম করার মানে পাঁচ ইয়ারে মিলে সিদ্ধি টেনে আড্ডা দেওয়া। রানা বুঝলেন; বুঝেই বললেন, ‘বিপদের সময় বিশ্রাম না করলেই নয়!’
লোকজন সকলে বিদায় হল। রাজা রানী রাজবৈদ্য আর দু-একজন দাসী অচৈতন্য অজিমকে ঘিরে রইলেন। সমস্ত রাত্রে রাজকুমারের চেতনা হল না। রাজবৈদ্য ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘আঘাত সাংঘাতিক।’ ভোরের আলোর সঙ্গে সঙ্গে রাজকুমার একবার চোখ চাইলেন, একবার ‘মা’ বলে ডাকলেন; তারপর ভাঙা খাঁচা ছেড়ে পাখি যেমন উড়ে যায় তেমনি রাজকুমারের সেই সোনার দেহ ছেড়ে প্রাণ-পাখি চলে গেল। তারপর দিনের পর দিন কাটতে লাগল। অজয়সিংহ শোকে দুঃখে নিরাশায় দিন-দিন ম্রিয়মাণ হতে লাগলেন। আর সেই দুর্দান্ত মুঞ্জ ডাকাত দিন-দিন প্রবল হয়ে গ্রামবাসীদের উপর প্রজালোকের ঘরে বিষম উৎপাত আরম্ভ করলে। এমনকি দূরন্ত ডাকাত্ এসে একদিন কৈলোরের কেল্লা পর্যন্ত লুট করে গেল। ডাকাত অজয়সিংহের মুকুট কেড়ে নিয়ে তাঁর মাথায় তলোয়ারের চোট মেরে চলে গেল। বৃদ্ধ অজয়সিংহ, নেশাখোর সুজন বাহাদুর— প্রজালোককে কে রক্ষা করে? একদিকে পাঠানের উৎপাত আর একদিকে মুঞ্জ ডাকাতের নিষ্ঠুর অত্যাচার। ওদিকে আবার চারিদিকে খবর হল— রানা আর বেশিদিন বাঁচেন কিনা সন্দেহ। রাজ্যে হাহাকার পড়ে গেল। সকলেই বলতে লাগল এতদিনে বুঝি সূর্যবংশের গৌরব শেষ হয়। সুজন বাহাদুর যে রাজ্য চালাতে পারেন, এমন তো বোধ হয় না।
রাজ্যের যখন এই দুরবস্থা সেই সময় উজলাগ্রাম থেকে লছমীরানী হাম্বিরকে নিয়ে কৈলোরে উপস্থিত হলেন। রানার আত্মীয়-স্বজন দেশের সর্দার সামন্ত যে যেখানে ছিলেন উপস্থিত। রানা সকালে সভা করে বসেছেন, হাম্বির এসে প্রণাম করলেন। রানা আশীর্বাদ করে হাম্বিরকে কাছে বসালেন। হাম্বিরকে দেখে আজ তাঁর দাদা অরিসিংহকে মনে হল। সেই নাক সেই চোখ; দাদার মতো তেমনি সুন্দর বলিষ্ঠ শরীর, গলার স্বর তেমনি মধুর গম্ভীর। আজ অজয়সিংহের মনে পড়ল তাঁর দাদা অরিসিংহ পাঠানের সঙ্গে শেষ যুদ্ধে যাবার আগে তাঁর হাতে একখানি চামড়ার থলি আর একখানি চিঠি দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই চিঠিতে আমার শেষ ইচ্ছা রইল। আর এই থলিতে একখানি ছোরা রইল, হাম্বির বড়ো হলে এ দুটি তাকে দিও।’
রানা অজয় আজ তাঁর সমস্ত সামন্ত-সর্দারের সম্মুখে অরিসিংহের নিজের হাতের ছোরা আর মোহর-করা সেই চিঠি হাম্বিরের হাতে দিয়ে বললেন, ‘বৎস, পড়ে দেখো, তোমার পিতার শেষ ইচ্ছা কী।’ পত্রে লেখা ছিল—
শ্রীরাম জয়তি
শ্রীগণেশ প্রসাদ শ্রীকলিঙ্ক প্রসাদ
মহারাজ অধিরাজ শ্রী অরিসিংহ আদেশতু
অতঃপর অজয়সিংহজী ও মেবারের দশ সহস্র অধিকারের সামন্ত-সর্দার ও জনপদবর্গকে আমার আদেশ এই যে— ভবানী মাতার ইচ্ছায় পাঠান যুদ্ধ সংকট সমরে যদি আমার স্বর্গলাভ ঘটে, তবে দেশাচার মতো ভাইজী অজয়সিংহ একলিঙ্গজীর দেওয়ানী গ্রহণ করিয়া যথাবিহিত প্রজাপালন ও রাজ্যচালনা করিতে থাকিবেন ও আমার বিধবা পত্নী রানী লছমীও শিশুপুত্র হাম্বিরকে লইয়া যাহাতে সুখে স্বচ্ছন্দে উজালাগ্রামে বাস করিতে পারেন সেজন্য উজলাগ্রাম ও তাহার সংলগ্ন সমুদয় জমি-জমা রানীর নিজ নামে বন্দোবস্ত করিয়া দিবেন। আমি নিজ বুদ্ধি ও বিশ্বাসমতো দেওয়ানীর বন্দোবস্ত করিয়া গেলাম, কিন্তু ইতঃপর সিংহাসন লইয়া হাম্বির ও ভাইজীর সন্তানগণের মধ্যে বিবাদ ঘটিবার সম্ভাবনা, সে নিমিত্ত শেষ অনুরোধ এই যে, আমাদের সামন্ত-সর্দার-মন্ত্রীবর্গ এবং প্রজালোক যাহাকে উপযুক্ত বিবেচনায় দেওয়ানীতে বহাল করিবেন তিনিই রাজ্যাধিকারী বলিয়া সাব্যস্ত হইবেন। হাম্বির ও অন্যান্য কুমারের প্রতি আমার এই আদেশ যে তাঁহারা এই উত্তরাধিকার-সূত্র লইয়া বিবাদ না করেন। দেশের সংকট অবস্থা— এ সময়ে গৃহ-বিবাদ বাঞ্ছনীয় নয়। আমাদের মধ্যে যে কুসন্তান এই গৃহবিবাদে লিপ্ত হইবে, ভগবান একলিঙ্গের অভিশাপ যেন তাহাকে স্পর্শ করে। ইতি সংবৎ ১৩৩৩ চিতৈরগড়।
পত্র পাঠ শেষ হলে রানা সকলের দিকে চেয়ে বললেন, ‘এখন কী করা কর্তব্য! রাজ্যের সমস্ত সামন্ত-সর্দারই উপস্থিত আছেন; আমার ইচ্ছা, এই সভাতেই সিংহাসন সুজন বাহাদুরের কি হাম্বিরের এ বিষয়ের একটা মীমাংসা হোক। আমি বুঝেছি, আমি আর অধিক দিন নয়; অতএব আমি বেঁচে থাকতেই উপযুক্ত কোনো এক কুমারের হাতে দেওয়ানীর ভার দিতে চাই। এখন দুই কুমারের মধ্যে কে উপযুক্ত তোমরা সকলে স্থির করো।’
রাজসভায় তুমুল তর্ক উঠল। সেই সময় পেটমোটা, নেশায় ঢুলু-ঢুলু রক্তচক্ষু সুজনসিংহ সভায় প্রবেশ করলেন। সভায় দুইদল হল। একদল বললেন সুজন বাহাদুরেরই সিংহাসন পাওয়া উচিত, কেননা রাজ্য চালাতে বাহুবলের প্রয়োজন, এবং বাহুবলটা যে সুজন বাহাদুরের যথেষ্ট আছে সেটা সকলেই জানে। অন্যদল বলে উঠল, শুধু কি বাহুবলের কর্ম। রাজ্য চালাতে হলে ধৈর্য চাই, বুদ্ধি চাই, সুজন বাহাদুরের এ দুটোর একটাও নেই। সৈন্যই রাজার বল, রাজাকে যদি নিজেই লড়াই করতে হল তবে আমরা আছি কী করতে? আমরা তো বলি হাম্বিরকেই রাজা করা উচিত। অন্যদল বলে উঠল, বাপুহে, যে দিনকাল পড়েছে, তাতে মুকুট মাথায় দিয়ে সিংহাসনে বসে থাকলে আর চলছে না; এখন রীতিমতো লড়াই করতে হবে। আমরা এমন রাজা চাই, যে একাই একশো পাঠান ঠেকাতে পারে। দুইদলে প্রচণ্ড তর্ক, শেষে হাতাহাতি হবার যোগাড়।
অজয়সিংহ বললেন, ‘তোমরা স্থির হও, আমি যা বলি শোনো। তোমরা তো জানো ভীল-সর্দার মুঞ্জ সেদিন কেল্লা লুট করে গেছে, আমাদের সাধ্য হয়নি যে তাদের বাধা দিই। সেই রাত্রে ডাকাত এই কেল্লা থেকে চিতোরের রাজমুকুট নিয়ে পলায়ন করেছে; শুধু তাই নয়, আমি সংবাদ পেয়েছি সে নাকি আবার সেই রাজমুকুট মাথায় দিয়ে নিজেকে রাজস্থানের রাজা বলে প্রচার করছে। সূর্যবংশের এই ঘোর অপমানের একমাত্র প্রতিকার, সেই রাজমুকুট উদ্ধার করা। হাম্বির আর সুজন দুইজনেই এখন উপযুক্ত। দুইজনের মধ্যে যিনি সেই পাপাত্মার মুণ্ড সমেত মুকুট উদ্ধার করতে পারেন তিনিই রাজ্যের অধিকারী হউন। কৃতঘ্ন ভীল যে মাথায় মেবারের রাজমুকুট ধারণ করতে সাহসী হয়েছে, সে মাথা শীঘ্র আমি চাই, নচেৎ আমার জীবনে মরণেও শান্তি নেই। মেবারের দুই উপযুক্ত রাজকুমার বর্তমান থাকতে যদি সে মুকুট উদ্ধার না হয়, তবে জানলেম মেবারের সূর্যবংশ আজ নির্বংশ হয়েছে; রাজ্যে বীর নেই, রাজসিংহাসন ভীল আর পাঠানের পাওয়াই শ্রেয়। কেল্লার যত সৈন্য যত অস্ত্র আছে, দুই কুমার ইচ্ছামতো ব্যবহার করুন। আজ সভা ভঙ্গ করো।’ কোলাহলে রাজসভা ভঙ্গ হলো।
তার পরদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে-সঙ্গে নিজের বন্ধু-বান্ধব সৈন্য-সামন্ত নিয়ে সুজন বাহাদুর ডাকাত ধরতে চললেন। আজ তিনি ভারি ব্যস্ত। অন্যদিন বেলা এগারোটার পূর্বে সুজন বাহাদুরের ঘুম ছাড়ত না, আজ তিনি ভোর না হতেই প্রস্তুত। এত ব্যস্ত যে হাম্বিরকে সঙ্গে ডেকে নিয়ে যান তারও সময় হল না। কেল্লার জনপ্রাণী না উঠতে-উঠতে বড়োকুমার সুজনসিংহ দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। দু-একজন সামন্ত জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কই, ছোটো রাজকুমার গেলেন না।’
সুজনসিংহ হেসে বললেন, ‘তিনি একটু আরাম করছেন। চলো আমরা আগে যাই, তিনি আহারাদি করে পরে আসবেন এখন।’
অমনি একজন খোশামুদে রাজপারিষদ বলে উঠল, ‘চলুন আমরা আগে তো গিয়ে ডাকাতের বাসা ঘেরাও করি, পরে না হয় ছোটো কুমার এসে তার মুণ্ডটা কেটে নিয়ে যাবেন।’ অন্যজন বা বললে, ‘হুঁঃ, রানার বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে। একি যার তার কর্ম? বুকের পাটা চাই। ডাকাত বলে ডাকাত— মঞ্জু ডাকাত! নামে যার দেশশুদ্ধ থরহরি কম্প, তাকে ধরতে কিনা ছোটোকুমার! হাতি মারতে পতঙ্গ!’ ওর মধ্যে কোনো এক মন্ত্রীপুত্র বলে উঠল, ‘না হে না, রাজবুদ্ধির মধ্যে প্রবেশ করা কি তোমাদের কর্ম! কণ্টক দিয়ে কণ্টক উদ্ধার, বুঝলে কিনা।’
সুজনসিংহ হেসে বললেন, ‘না হে না, তোমরা জানো না, হাম্বিরের গায়ে বেশ শক্তি আছে। তবে কী জানো, ছেলেমানুষ, এখনো হাড় পাকেনি। আমি এবার লড়াই থেকে এসেই তাকে রীতিমতো কুস্তি শেখাবার বন্দোবস্ত করছি, দেখো না!’
এদিকে সকালে উঠে হাম্বির একখানা পুরোনো তলোয়ার আর একখানা ছোরা শান্-পাথরে ঘষে-ঘষে সাফ করছিলেন। ছোরাখানা পিতা অরিসিংহের, আর তলোয়ারখানা উজলাগ্রামের দাদামশায় হাম্বিরকে দিয়ে গিয়েছিলেন। আজ কতকাল পরে শান্ পেয়ে অস্তর দুখানা বর্ষার জল পেয়ে নদীর স্রোতের মতো ক্রমে খরধার হয়ে উঠল। হাম্বির বসে-বসে অস্তরে শান্ দিচ্ছেন, এমন সময় লছমীরানী সেখানে এসে বললেন, ‘এখানে বসে কী করছিস?’
হাম্বির বললেন, ‘জানো না মা? ডাকাত ধরতে যেতে হবে, তাই অস্তর দুখানায় শান্ দিচ্ছি।’
লছমীরানী বললেন, ‘হা কপাল! তুমি এখনো অস্তর শান্ দিচ্ছ, আর ওদিকে যে সুজন সিং সৈন্যসামন্ত নিয়ে ডাকাত ধরতে গেল। তোর চেয়ে তো সে কাজের লোক দেখি, লোকে কেবল তার মিছে দুর্নাম রটায় বুঝলেম।’
হাম্বির যেন মায়ের কথায় একটু আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘তাই তো মা, দাদা তো আমায় ডেকে নিয়ে গেলেন না? রাজত্বিটা দেখছি আমার কপালে নেই। যাই হোক, আমি ছাড়চিনে।’
এই কথা বলে হাম্বির দ্বিগুণ উৎসাহে তলোয়ার শান্ দিতে লাগলেন। রানীমা বললেন, ‘যা যা, বেলা হল— এখন কিছু খেয়ে আয়, আমি ততক্ষণ এ দুখানায় শান্ দিচ্ছি।’ হাম্বির উঠে গেলেন, লছমীরানী বসে-বসে অস্তরে শান্ দিতে লাগলেন। রাজপুতের মেয়ে বাটনা বাটা কুটনো কোটার চেয়ে অস্তরে শান্ দেওয়া ভালো বোঝেন। তাঁর হাতে পড়ে অস্তর দুখানা কিছুক্ষণের মধ্যেই চকচকে ঝকঝকে হয়ে উঠল। হাম্বির ফিরে এলে রানীমা তাঁর হাতে ছোরাখানা দিয়ে বললেন, ‘দেখ দেখি, এটায় যেন ফাট ধরেছে বোধ হয়। আঁকা-বাঁকা যেন কিসের দাগ দেখছি। এখানায় তো কোনো কাজই হবে না।
হাম্বির বললেন, ‘বলো কী মা, বাবার হাতের ছোরা কাজে লাগবে না কী? দাও দেখি একবার ভালো করে দেখি।’ হাম্বির ছোরাখানা নিয়ে এদিক-ওদিক ফিরিয়ে দেখলেন, কিছু বোঝা গেল না। মনে হলো যেন ছোরার ফলকটার একদিক থেকে আর একদিক জুড়ে একটা আঁকা-বাঁকা ফাট। ফাট কি রক্তের দাগ চেনা যায় না।
হাম্বির বললেন, ‘তাই তো, ‘এটা তো কিছু বোঝা গেল না; ভালো করে দেখতে হবে। মা তুমি অস্তর দুখানা আমার ঘরে রেখে দিও। আমি একবার মহারাজার সঙ্গে দেখা করে আসি, একটা ভালো ঘোড়া দেখে নিতে হবে।
অজয়সিংহ আজ আর সভায় যাননি। শরীর অসুস্থ, নিজের মহলে বিশ্রাম করছিলেন, হাম্বিরকে আসতে দেখে বললেন, ‘সে কী, তুমি যাওনি? সুজন তো অনেকক্ষণ রওনা হয়েছেন!’
হাম্বির বললেন, ‘আজ্ঞে, একটি ঘোড়া বেছে নিতে কিছু বিলম্ব হবে, আমি আজ সন্ধ্যাকালেই রওনা হব।’
অজয়সিংহ বললেন, ‘লোকজন তো সব বড়ো কুমারের সঙ্গে চলে গেছে, তুমি একা পথ চিনবে, কেমন করে?’
হাম্বির বললেন, ‘আজ্ঞে, একজন শিকারীর সঙ্গে বন্দোবস্ত করেছি, সে-ই আমাকে ডাকাতের আড্ডা দেখিয়ে দেবে। আমি মনে করেছিলুম, লোকজন নিয়েই যাব, কিন্তু পরে ভেবে দেখলুম, মুঞ্জ ভীল যে রকম দুর্দান্ত, তার সঙ্গে লোকজন নিয়ে পেরে ওঠা অসম্ভব। কৌশল কার্যসিদ্ধ করা চাই।’
অজয়সিংহ বললেন, ‘যা ভালো বোঝো তাই করো। আশীর্বাদ করি জয়ী হও।’ হাম্বির প্রণাম করে বিদায় হলেন।
হাম্বির নিজের ঘরে বিশ্রাম করছিলেন, লছমীরানী এসে বললেন, ‘কই তোর যাবার কী হল? তোর তো লড়ায়ে যাবার কোনো চেষ্টাই নেই দেখছি। ভয় পেলি নাকি? এই যে বললি, ঘোড়া ঠিক করতে যাচ্ছি, আর ঘরে বসে ঘুম দিচ্ছিস।’
হাম্বির একটুখানি হেসে বললেন, ‘বোসো মা, ডাকাত ধরতে যাওয়া কি সহজ ব্যাপার? একটু ভেবে নিতে দাও, ফন্দি আঁটতে দাও। একি বুনো শুয়োর, যে যাব আর জনাবের শিষে গেঁথে আনব।’
লছমীরানী বুঝলেন, হাম্বির মুখে তামাশা করছেন, কিন্তু মনে-মনে যেন কী একটা মতলব স্থির করে বসে আছেন। তিনি হাম্বিরের দিকে চেয়ে বললেন, ‘বটে, আমার সঙ্গে তামাশা হচ্ছে? একটা জনাবের শিষ দিয়ে বুনো শুয়োর গেঁথে আন, তবে বাহাদুর বুঝি। দেখা যাবে তোমার ঐ পুরোনো তলোয়ার আর দাগী ছোরায় কতদূর কী করো! এখন বল দেখি তোর মতলব কী?’ তারপর মায়েতে ছেলেতে সেই নির্জন ঘরে সারাদিন কত কী পরামর্শ হল। সন্ধ্যা হয়-হয়, রানী লছমী বললেন, ‘তুই তবে প্রস্তুত হ— আর বিলম্ব করলে রাত্রি হয়ে পড়বে।’
হাম্বির বললেন, ‘আর প্রস্তুত কী, এই যেমন আছি, তেমনিই যাব। দেখো তো মা আমার ঘোড়াটা এল কিনা।’
রানী উঠে গেলেন। হাম্বিরের ঘোড়া প্রস্তুত হয়ে এল। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘দেখা যাক মা, পুরোনো তলোয়ার, দাগী ছোরা আর এই বেতো ঘোড়াটা নিয়ে কতদূর কী করতে পারি।’
মা আশীর্বাদ করলেন, ‘জয়ী হও।’
হাম্বির সেকেলে তলোয়ার কোমরে গুঁজে সামান্য বেশে সেই বেতো ঘোড়ায় চড়ে বসলেন। সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ়তর হয়ে এল। সূর্য অস্ত গেলেন। হাম্বিরকে নিয়ে সেই বেতো ঘোড়া খটর্-খটর করে গ্রাম ছাড়িয়ে বনের পথে প্রবেশ করলে।
আরাবল্লী পর্বতের নিবিড় বনচ্ছায়ায় ঘোর অন্ধকার। দুহাত তফাতে লোক চেনা যায় না। হাম্বির তাঁর বেতো ঘোড়াটাকে একদিকে ছেড়ে দিয়ে কালো কম্বল মুড়ি দিয়ে নিঃশব্দে সেই বনের অন্ধকারে লুকিয়ে পড়লেন। ছায়ার সঙ্গে যেন একটা ছায়া মিলিয়ে গেল। যেমন শিকারের সন্ধানে বাঘ ফেরে, তেমনি সেই অন্ধকার বনে হাম্বির নিঃশব্দে অতি সন্তর্পণে গিরি-নদীর পারে-পারে, ঘনবনের ধারে-ধারে, পাহাড়ের গহ্বরে-গহ্বরে ডাকাতের সন্ধান করে চললেন। তৃষ্ণার সময় নদীর জল, ক্ষুধার সময় গাছের ফল, ঘুমের সময় পর্বতের গহ্বর, এমনি করে হাম্বিরের দিন কেটে চলল। যেসব মহাবনে মানুষের চলাচল নেই— দিবারাত্রি যেখানে কেবল সবুজ অন্ধকার আর বাঘ-ভালুকের গর্জনে পরিপূর্ণ, দিনের পর দিন হাম্বির সেই সব মহাবনের ভিতর ঘুরে বেড়াতে লাগলেন; বনের আর অন্ত নেই।
একদিন ঘোর অমাবস্যার রাত্রি— বনের ভিতর দিয়ে পথ দেখে চলা অসম্ভব, হাম্বির একটা প্রকাণ্ড শালগাছে চড়ে এদিক ওদিক চেয়ে দেখছেন আর মনে-মনে ভাবছেন, দূর কর ছাই, ডাকাতের সন্ধান কি পাওয়া যাবে না? আজ তো এই অন্ধকারে আর পথ চলা অসম্ভব। আজ রাত্রি দেখছি এই গাছেই কাটাতে হল। উঃ, বনের তলায় মশাগুলো ভনভন করে ডাকছে দেখো। আবার ঐ যে বাঘের গর্জন, ঘন ঘন শোনা যাচ্ছে। এত মশার ভনভনানি আর বাঘের গর্জন কোনো দিন তো শুনিনি। যাই হোক আজ রাত্রিতে আর মাটিতে পা দেওয়া নয়। এ বনটায় তত গাছপালা নেই কিন্তু জীবজন্তু দেখছি অনেক আছে। হাম্বির নিজেকে বেশ করে গাছের সঙ্গে বেঁধে নিদ্রা গেলেন।
অনেক রাত্রে হাম্বিরের ঘুম ভাঙল। হাম্বির দেখলেন আকাশের একদিকে রাঙা আলো দেখা দিয়েছে। সকাল হয়েছে ভেবে হাম্বির উঠে বসলেন; কিন্তু সকাল হল তো পাখি ডাকে না কেন? তবে ভ্রম হল নাকি? হাম্বির বেশ করে চারিদিকে দেখতে লাগলেন। সেই সময় যেন দুজন মানুষে সেই শালগাছের তলায় কথা কইছে শোনা গেল। লোক দুটোর কথা বোঝা গেল না কিন্তু দু-একবার মুঞ্জ ডাকাতের আর সুজন বাহাদুরের নাম বেশ স্পষ্ট শুনতে পেলেন।
হাম্বির আস্তে-আস্তে গাছের ডাল বেয়ে খানিকটা নেমে এসে কান পেতে শুনতে লাগলেন, দুই পাহাড়ীতে কথা হচ্ছে, ‘ওরে ভাই বদরী, তুই এখনো মঞ্জু-মঞ্জু বলিস, তাই তো সে চটে যায়।’
মঞ্জুকে মুঞ্জু বলব না তো কী? সে কি জানে না যে আমি তার চাচা হলেম?’
‘ওরে ভাই, সে কি এখনো চাচা-ফাচা মানে? যে দিন থেকে সে সেই রাজপুতগুলোকে আর রানার ছেলেকে লড়ায়ে হারিয়ে দিয়েছে, সেদিন থেকে তার মাথা বিগড়ে গেছে। সে এখন চায় আমরা তাকে রানা আর তার ছেলেকে কুমার বলি।’
‘রেখে দে তোর রানা, রেখে দে তোর কুমার। আমি তাদের চিরকাল বলব মুঞ্জ আর ভুঞ্জ।’
‘তবে ভাই রঞ্জু, আজ তুই লাচ দেখতে চলেছিস কেন? সর্দার আজ মেয়ের বিয়েতে মৌয়া খেয়ে নেশা করেছে— তোকে দেখলেই মাথা কাটতে আসবে।’
‘ওরে একি বলিদানের মোষ পেয়েছিস যে টক করে হাড়িকাঠে মাথা দেব? চল এখন নাতনির বিয়েতে একটু আমোদ করা যাক; বাজে কথায় কেবল রাত কাটালি।’
লোক দুটো হন-হন করে উত্তর-মুখো চলল। হাম্বির এতক্ষণে বুঝলেন, তিনি ডাকাতের আড্ডায় এসে পড়েছেন। দূর থেকে মাদল আর ঝাঁঝরের হুমহুম ঝুমঝুম আওয়াজ অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। মশালের আলো আকাশের একদিক রাঙা করে তুলেছে। হাম্বির তাড়াতাড়ি গাছ থেকে নেমে সেই লোক দুটোর সঙ্গ নিলেন।
কতদিন কেটে গেছে সুজন বাহাদুর ডাকাত ধরতে না পেরে কৈলোরের কেল্লায় ফিরে এসেছেন। হাম্বিরের কিন্তু কোনো খবর নেই। সকলেই বলছে, নিশ্চয় তিনি ডাকাতের হাতে কাটা পড়েছেন। এমন সময় একদিন মহারানার সভায় হাম্বিরের এক পত্র এল। হাম্বির উজলাগ্রাম থেকে লিখেছেন— তিনি উজলাগ্রামে মুঞ্জ বাহাদুরকে মেবারের রানা করে রাজসিংহাসন দিয়েছেন। নতুন রানা হাম্বিরকে কৈলোরের কেল্লা আর একশোখানা গ্রাম জায়গীর দিয়েছেন। অজয়সিংহ যদি সহজে কেল্লা ছেড়ে দেন তো ভালো, নচেৎ লড়াই নিশ্চয়। এবং মুঞ্জ বাহাদুর সশরীরে সগণে এসে কেল্লা দখল করবেন, এ বিষয়ে সন্দেহ নাস্তি।
শুনে সুজনসিংহ বলে উঠলেন, ‘দেখলে, ছোকরার কাণ্ডটা দেখলে একবার। সে কি মনে করেছে, দুমুঠো ডাকাতের দল নিয়ে মেবারের সিংহাসন দখল করবে? এত বড়ো তার স্পর্ধা।’
অজয়সিংহ বললেন, ‘হাম্বির কি এতদূর নিচ হবে? এ তো আমার বিশ্বাস হয় না। চিঠিটা কেমন কেমন শোনাচ্ছে না?’
রাজমন্ত্রী বললেন, ‘কথাটা যদিও বিশ্বাসযোগ্য নয়, কিন্তু বলাও যায় না। আমার মনে হয় প্রস্তুত হয়ে থাকাই ভালো। আজকালের ছেলে কখন কী করে বসে বলা যায় না।’
সুজনসিংহ বললেন, ‘তবে একবার মেবারের সমস্ত সামন্ত-সর্দারকে খবর পাঠানো হোক।’
অজয়সিংহ বললেন, তাতে কাজ নেই। এ কী পাঠান বাদশা আসছে, যে সামন্ত-সর্দারকে খবর পাঠাতে হবে? লোকে যে হাসবে! সকলকে সাবধানে থাকতে বলো। হঠাৎ কেল্লায় ডাকাতি না হয়। হাম্বিরকে লিখে দাও যেন এমন দুঃসাহসের কাজ না করে। আর একদল সৈন্য নিয়ে তুমি উজলাগ্রাম থেকে ডাকাতের দল তাড়িয়ে দাও গে; আর পারো তো হাম্বিরকে বেঁধে আনো।’
সুজনসিংহ ‘যে আজ্ঞে’ বলে উঠে গেলেন। কিন্তু তিনি মুঞ্জ ডাকাতের হাতে একবার পড়েছিলেন। সে যে কেমন সহজ ডাকাত, বেশ চিনেছেন। ঘরে গিয়ে রাজবৈদ্যকে দিয়ে মহারানাকে বলে পাঠালেন, শরীর তাঁর বড়ো অসুস্থ; কিছুদিন বিশ্রাম করতে পারলে ভালো হয়। ডাকাত ধরতে সেনাপতিকে পাঠালে চলে না?
অজয়সিংহ বললেন, ‘আচ্ছা তাই হবে।’
সেদিন রাত্রে অজয়সিংহ লছমীরানীর সঙ্গে দেখা করে হাম্বিরের পত্র দেখালেন। রানীমার অন্দর-মহলে সেনাপতির তলব হল। তারপর হাম্বিরের নামে চিঠি নিয়ে সেনাপতি বিদায় হলেন। তাঁর উপর হুকুম রইল— হাম্বিরের পরামর্শ মতো খুব সাবধানে কাজ করবে।
এদিকে উজলাগ্রামে শেয়ালরাজার মতো মুঞ্জ বাহাদুর রাজসিংহাসন আলো করে বিরাজ করছেন। ডাইনে বামে গম্ভীরমল আর চুয়োমল দুই নতুন মন্ত্রী কানে কলম গুঁজে বসে আছেন। আর রাজসভায় আছেন হাম্বির আর উজলাগ্রামের দু-এক পেট-মোটা জোতদার আর দু-চার কালো মুস্কো পাহাড়ী ভীল।
একজন গরিব প্রজা খাজনা দিতে পারেনি, রাজার লোক তাকে বেঁধে এনেছে। মুঞ্জরাজা হুকুম দিলেন, ‘ওর মাথা কাটো।’ অমনি হাম্বির কানে কানে বললেন, ‘এরকম করলে প্রজালোকে খাপ্পা হবে। ওকে কিছু বকশিস দিতে হুকুম হোক।’ অমনি দুই মোহর ইনাম হয়ে গেল, গরিব প্রজা দুই হাতে সেলাম ঠুকে বিদায় হল। মনে-মনে বললে, ‘রাজা তো হাম্বির, এটা তো ডাকাতের সর্দার, ওর কি দয়া-মায়া আছে?’
এমন সময়ে কৈলোরের কেল্লা থেকে সেনাপতি এসে মুঞ্জ বাহাদুরের সঙ্গে দেখা করলেন। কথা স্থির হল মহারানা কৈলোরের কেল্লা হাম্বিরকে দিয়ে স্ত্রী-পুত্র পরিবার, নিয়ে কাশীবাস করুন, তাঁর খরচ-পত্র রাজভাণ্ডার থেকে দেওয়া হোক, আর হাম্বির ভীল রাজার মন্ত্রী হয়ে রাজ্যশাসন করুন, সেজন্য তাঁকে সমস্ত খরচ-খরচা ও মাসিক ছ-হাজার তন্খা ও চিতোরের কেল্লা জায়গীর দেওয়াই স্থির।
গম্ভীরমল শর্ত আওড়ালেন, চুয়োমল একরারনামা লিখে হুজুরে পেশ করলেন, কিন্তু হুজুর তো পড়তে জানেন কত— কলম হাতে হাম্বিরের দিকে চাইলেন।
হাম্বির বললেন, ‘এ সব পাকা দলিলে কলমের সই দেওয়া ভালো নয়। আমি বলি মহারাজ এতে পাঞ্জা মোহর করে দিলেই ভালো হয়।
মুঞ্জবাহাদুর দুই হাতে কালি মেখে দলিলের দুই পিঠে হাতের ছাপ লাগালেন। সেনাপতি দলিল নিয়ে বিদায় হলেন। মুঞ্জবাহাদুর হাম্বিরের দিকে চেয়ে হাসতে-হাসতে বললেন, ‘এ তো বড়ো মজা। লড়াই নেই, হাঙ্গামা নেই, এক হাতের ছাপেই কাজ সাফ? দিল্লীর বাদশাকে এমনি একটা পাঞ্জা পাঠিয়ে চিতোরের কেল্লাটা দখল নিলে হয় না?’
হাম্বির বললেন, ‘আগে মেবার দখল করে নেওয়া যাক, তারপর দিল্লী পর্যন্ত ঠেলে যাওয়া যাবে। এখন একটু আমোদ-আহ্লাদের হুকুম হোক। রানার সেনাপতি আমাদের জাঁক-জমকটা দেখে যাক।’
মুঞ্জ রাজা বললেন, ‘বন্ধু, তুমি যেমন বোঝো কম, কিন্তু দেখো, মাদলের বাজনা আর মহুয়ার কলসীটা ভুলো না। এ দুটো না থাকলে আমোদ হবে না।’
হাম্বির ভারে-ভারে মহুয়ার কলসী দলে-দলে মাদলের ব্যবস্থা করলেন। উজলাগ্রামে ভীল-রাজার রাজপ্রাসাদে আমাদের ফোয়ারা খুলে গেল। সেনাপতি এলেন, গম্ভীরমল এলেন, চুয়োমল এলেন, হাম্বির এলেন, গ্রামের প্রজালোক পাড়া-প্রতিবাসী যে যেখানে ছিল সকলে এল। আর সেই সঙ্গে এল শাদা কাপড়ে ভদ্রলোক সেজে একদল রাজপুত সৈন্য।
রাত্রি প্রায় শেষ হয়েছে, গ্রামবাসীরা যে-যার ঘরে ফিরেছে; ভীলের দল মহুয়ার কলসী খালি করে যেখানে-সেখানে গড়াগড়ি যাচ্ছে, সেই সময় হাম্বির তাঁর বেতো ঘোড়ার পিঠে একটা রক্তমাখা চটের থলি চাপিয়ে উজলাগ্রাম থেকে বিদায় হলেন। সেনাপতির উপর ভীল-রাজার রাজপ্রাসাদ জ্বালিয়ে দেবার হুকুম রইল।
হাম্বির যেমন সন্ধ্যাবেলায় বেতো ঘোড়ায় চড়ে কৈলোরের কেল্লা থেকে বেরিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি সন্ধ্যাবেলা সেই বেতো ঘোড়ায় চড়ে কতদিন পরে রাজমুকুট সমেত মুঞ্জ ডাকাতের মুণ্ড নিয়ে ফিরে এলেন। কেল্লায় জয় জয়কার পড়ে গেল।
মহারানা সেই ভীলের কাঁচা রক্তে হাম্বিরের কপালে রাজটীকা লিখে দিয়ে বললেন, ‘রাজপুতের নিয়ম সিংহাসনে বসবার আগে টীকাজের ব্রত সাঙ্গ করতে হয়। আজ এই শত্রুর রক্তে তোমার এই ব্রত উদ্যাপন হল। আজ থেকে সিংহাসন তোমার, রাজমুকুট তোমার। কিন্তু মনে রেখো, মেবারের মুকুট উদ্ধার হল বটে, রাজ্য এখনো পাঠানের হস্তগত।’ তারপর মহারানা সুজনসিংহকে ডেকে পাঁচ হাতিয়ার আর এক ঘোড়া দিয়ে বললেন, ‘তুমি মেবার ছেড়ে দক্ষিণ দেশে যাও। সেখানে তোমার ক্ষমতা থাকে তো নতুন রাজত্ব করো গিয়ে। মনে ভেবো না যে তোমাকে আমি স্নেহ করি না, কিন্তু আমি বেশ বুঝছি, তোমার নির্বাসনে মেবারের মঙ্গল, তোমারও মঙ্গল। আর যদি ভগবানের ইচ্ছা হয়, তবে তোমার সন্তানেরা একদিন দক্ষিণ দেশে অখণ্ড রাজ্য বিস্তার করবে। যাও, মনে রেখো তুমি সূর্যবংশের সন্তান, তোমা হতে যেন সে বংশের কলঙ্ক না হয়। নিজের উপর নির্ভর করো, তবেই বড়ো হতে পারবে!’
