মিতালির খোঁজে
জীবনে এমন কিছু কিছু ঘটনা ঘটে, যার কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া য়ায় না। ব্যাখ্যা খুঁজতে গেলে হয়রান হতে হয়। বললে হয়তো আপনারা কেউ বিশ্বাস করবেন না, তবুও বলি। কারণ বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।
এই বছরই ২রা মার্চ আমার পরিচয় হয় মিতালি রায়ের সঙ্গে। ওই দিন আমার জন্মদিন ছিল। অনেকেই আমাকে সেদিন শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছিল, তাদের মধ্যে মিতালি ছিল একজন।
আমার বন্ধুলিষ্টে তার নাম নেই দেখে, সেদিনই আমি তাকে বন্ধুত্বের রিকোয়েষ্ট পাঠাই। সঙ্গে সঙ্গে সে তা গ্রহণ করে।
তারপর দু’চারদিনের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পালা শেষ করে আমরা দ্রুত অন্তরঙ্গতার পথে এগিয়ে যাই। তার জন্য প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ছিল মিতালির।
কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের অন্তরঙ্গ আলোচনা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, আমরা নিয়মিত মেসেঞ্জারে আদি রসাত্মক আলোচনায় মেতে উঠি। এ ব্যাপারে আমার কোনও উৎসাহ ছিল না। প্রথমদিকে একটু দ্বিধা দ্বন্দও ছিল আমার মধ্যে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবু তারই প্রোরচনায় শেষপর্যন্ত অল্পদিনের মধ্যে আমার সে সংকোচ জড়তা ধীরে ধীরে কেটে যায়।
সাবলীলভাবেই সে আমার সঙ্গে আদি রসাত্মক আলোচনায় আলোচনায় মত্ত হয়ে উঠে। প্রতিদিন রাত বারটার পর, সে আসত। নানা রকম রগরগে আলোচনায়, রাত ফুরিয়ে কখন ভোর হয়ে যেত। তা টেরই পেতাম না। এই ভাবে মাসখানেকের বেশি সময় আমাদের মধ্যে রসাত্মক আলোচনা করে কেটে যায়।
রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষে এর মধ্যে আসানসোল থেকে এক সাহিত্য সন্মেলনে যাবার জন্য আমার আমন্ত্রণপত্র আসে। আমি সাধারণত হার্টের সমস্যা ও বার্ধক্যের কারণে কোথায়ও যেতে পারি না। গেলে পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তবুও এই সাহিত্য সন্মেলনে আমি যাব বলে ঠিক করলাম। তার একমাত্র কারণ, মিতালিও আসানসোল থাকে। ভাবি, সন্মেলন শেষ হলে তার সঙ্গে একবার দেখা করে আসব।
সেই মতো তাকে জানাই, ৯ই মে আমি আসানসোল যাচ্ছি। সে শুনে খুশি হয়ে জানাল, তাহলে আর শুধু মুখের কথায় রসাত্মক আলোচনা নয়।,বাস্তবে আমরা এবারে মিলিত হতে যাচ্ছি। আমি সংকোচে তার কোন জবার দিতে পারিনি।
৯ই মে কলকাতা থেকে ট্রেনে চড়ে গিয়ে হাজির হই আসানসোলের ওই সন্মেলনে। অনুষ্ঠানে আমার তেমন কোনও মনোযোগ ছিল না। বারবার মিতালির কথা মনে পড়ছিল। আর আমি ভাবছিলাম অনুষ্টান কখন শেষ হবে? একটা সময় অনুষ্ঠান শেষ হল। আমি অনুষ্ঠান হল থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। তারপর একটা ট্যাক্সি ধরে, ওর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ওর দেওয়া ঠিকানায় খোঁজ করে যখন পৌঁছালাম, তখন রাত দশটা বেজে গেছে। একবার ভাবলাম, এই সময় কোন মহিলার বাড়িতে যাওয়াটা কী ঠিক হবে? ঝোঁকের মাথায় একটা ট্যাক্সি ধরে এতটা পথ চলে এসেছি। আর তার দোর গোড়ায় এসেই আমার সে ঝোঁক কেটে গেছে। একবার ভাবলাম, এবার মানে মানে ফিরে যাওয়াই ভাল। কোনও কেলেঙ্কারির সঙ্গে না জড়িয়ে পড়ে। তাই ফিরেই যাব সিদ্ধান্ত নিলাম। আবার মন বলল, এসেই যখন পড়েছি, একবার বাইরে থেকে দেখা করেই না হয় চলে যাব, ঘরের ভিতর ঢুকব না।
তাই ভেবে ঠিকানা মিলিয়ে নিয়ে, দরজায় কড়া নাড়লাম। কোন সাড়া শব্দ নেই। ঠিকানা মিলিয়ে দেখলাম আবার, ঠিক আছে তো? ঠিকানা ঠিক আছে দেখে আবার কড়া নাড়লাম। কিছুক্ষণ পর এক বৃদ্ধ খকখক করে কাসতে কাসতে বেরিয়ে এসে বললেন, কাকে চান?
আমি মিতালির নাম বলতেই, তিনি যেন গভীর বিস্ময়ে আমার মুখের দিকে নিস্পলক তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। আমি অস্বস্থি বোধ করতে লাগলাম।
আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, মিতালি নেই?
– আপনি কোথা থেকে এসেছেন?
– কলকাতা থেকে, আপনি মিতালিকে একটু ডেকে দিন। বলুন, শংকর ব্রহ্ম এসেছেন।
– কাকে ডাকব?
– মিতালি।
– সে তো দু’মাস আগেই মারা গেছে,আপনি জানতেন না?
– কি করে মারা গেল?
– কুমারী মেয়ে, কাকে ভালবেসে পেটে তার বাচ্চা নিয়ে, তার কাছে প্রত্যাখাত হয়ে, লাইনে ঝাঁপ দিয়েছে।
এই কথাগুলি বলেই বৃদ্ধ লোকটি আমার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে খকখক করে কাসতে কাসতে আবার ঘরের ভিতর ঢুকে গেলেন।
তার কথা আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। তবুও তারপর আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কোনও মানে হয় না।
এরপর আমি কি করে যে সেখান থেকে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম, আমি জানি না। কিছু মনে নেই। একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। মনে হয়েছিল মিতালি যেন আমার সঙ্গে সঙ্গেই আছে।
পরদিন সকালে বাড়ি ফিরে এসে, খুব জ্বর ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল আমার। দু’দিন বিছানা ছেড়ে উঠতে পারিনি। গৃহ-চিকিৎসক তপন মজুমদারকে খবর দিয়ে বাড়িতে আনতে হয়েছিল। মনে হয়েছিল মিতালি যেন আমার সঙ্গেই আছে। হয়তো সে আমাকে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। গৃহ-চিকিৎসক তপন মজুমদারের তৎপরতায়, সে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেনি।
একটু সুস্থ হয়ে উঠে, বিছানায় বসে, মেসেঞ্জার খুলে আশ্চর্য হয়ে দেখি, মিতালির সঙ্গে আমার কথপোকথনগুলো সব রহস্যজনক ভাবে কর্পূরের মতো উবে গেছে। এমন কি বন্ধু লিষ্টেও দেখলাম তার নামটা আর নেই। এ কী করে সম্ভব? আমি ভেবে কোনও কুল-কিনারা পেলাম না। আজও আমি তাই নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি। আর ভেবে বিভ্রান্ত হই বারবার।
