Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » মাছ ধরতে ঘোড়ামারা || Sankar Brahma

মাছ ধরতে ঘোড়ামারা || Sankar Brahma

সেদিন মাণিকের সঙ্গে আমি ঘোড়মারা দ্বীপে মাছ ধরতে গেছি। জায়গাটা কোথায় আমি জানি না। আমার অচেনা জায়গা হলেও, মাণিকের চেনা। সে আমকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। মাণিক ভাল মাছ শিকারী। মাছ ধরার নানা কায়দা কানুন তার আয়ত্বে। আমি এসেছি তার সহযোগী হিসাবে। মাছ ধরতে নয়। আমি মাছ ধরতে পারি না। মাণিকের হাতে হাতে সব জোগাড় যন্ত্র করে দিই। মাছের চার মাটি মিশিয়ে মেখে দিই। হুইলের সূতো টান টান করে ধরার জন্য, সূতোর মাথা ধরে দূরে ছুটে যাই। টান টান করে সূতোর মাথা ধরে সূতোয় টান দিয়ে, পরীক্ষা করে দেখি, বড় মাছ ধরা পড়লে, সূতো ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে পারবে কিনা?
মাছ ধরতে ধরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
একটাও মাছ ধরা পড়ল না। আমরা ব্যর্থ মনোরথে, মাছ ধরার সরাঞ্জাম গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরব ভাবছি, এমন সময় একটা বড় মাছ বশড়ি গিলে ছুট দিল। হুইলের সূতো ফুরিয়ে গিয়ে ছিপ ছিটকে পড়ল জলে। মাণিকও জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে চেপে ধরল ছিপ। মাছের সঙ্গে ঘন্টাখানেক যুদ্ধ করার পর, মাছ শ্রান্ত হয়ে যদ্ধে পরাজয় মেনে নিল। ছিল তুলে মাণিক দেখল, মাছ কোথায়, এ তো একটা ঘোড়ার কাটা মুন্ড। মাণিক সাহসী ছেলে। তার মনে ভয় ডর বলে কিছু নেই। মাণিক সেটা থেকে বড়শি খুলে নিয়ে সেটাকে জলে ছুঁড়ে ফেলে দিল। কাটা মুন্ডটা আবার জল থেকে গড়াতে গড়াতে উপরে উঠে এলো। তা দেখে, এবার আমি ভয় পেয়ে গেলাম।
মাণিক ভয় পেল কিনা জানি না। মাণিক সরাঞ্জাম সব গুছিয়ে নিয়ে বলল, চল। আমার বুকের ভিতর ভয়কে সঙ্গী করে বাড়ি ফিরতে লাগলাম।
একটা বাঁশ বনের ভিতর যেতে হয়। এ ছাড়া আর পথ নেই। দু’পাশেই ঘন বাঁশবন। বাতাশে গাছের গাঁটগুলি মট মট করে আওয়াজ তুলে ভয় দেখাতে লাগল। পিছনে তাকিয়ে দেখি ঘেড়ার কাটা মুন্ডটা গড়াতে গড়াতে আমাদের পিছন পিছন আসছে। আমরা যত দ্রুত হাঁটি, মুন্ডটা যেন সম দূরত্ব বজায় রেখে, সেই ভাবেই গড়াতে গড়াতে আমাদের পিছন পিছন আসতে থাকে। ভাবি, এবার কি করব আমি?
বাঁশবাগানটা বেশ বড়। পথ শেষ হতে চাইছে না। পথের পাশেই দেখি একটা কামারের দোকান। হাপড়ে আগুনের তাপ তুলে লোহার দাঁ,বঁটি, হাতা,খুন্তি তৈরি করছে। দোকানের দিকে তাকিয়ে দেখি পাঁচুদা। মানে পঞ্চানন মন্ডল। লোকটাকে আমি চিনি। কয়েকবার আমি তার দোকানে হাতা,খুন্তি, বঁটি বানাতে গেছি। কাজের হাত দারুণ নিপুণ।বাঁশদ্রোণী বাজারে তার দোকান আছে। তার দোকানে বেশ ভিড় হয়।
সে একমনে একটা লোহার পাত হাপড়ের আগুনে পুড়িয়ে টকটকে লাল করে, কিছু একটা বানাবার জন্য হাঁতুড়ি দিয়ে পিটছে।
সে আমায় দেখতে পায়নি। আমি চিৎকার করে ডাকলাম, পাঁচুদা।
সে চোখ তুলে, আমায় দেখতে পেয়ে, হাত দিয়ে ইশারায় কাছে ডাকল।
মাণিক তা দেখে বলল, তবে তুই যা।
আমি বাড়ি যাই। বেশ রাত হয়ে গেছে।
আমি বললাম, আচ্ছা।
মাণিক চলে গেল। আমি পাঁচুদার দোকানের দিকে হাঁটা দিলাম। কাটা মুন্ডটা তখন মাণিকের পিছু না নিয়ে, গড়াতে গড়াতে আমার দিকেই আসতে লাগল। আমি তা দেখে, ভয়ে দৌড়ে পঞ্চুদার দোকানে ঢুকে পড়লাম। পিছনে তাকিয়ে কাটা মুন্ডটাকে আর দেখতে পেলাম না।

দোকানে ঢুকতেই পাঁচুদা হাতের কাজ বন্ধ রেখে বলল, বসো একটু তামাক সাজি। তামাক মানে গাঁজা। পাঁচুদা গাঁজাখোর। বাজারের সবাই জানে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আগে বাথকর্ম সেরে স্নান করে নেয়। দোকান খোলার আগে এক ছিলিম গাঁজা সেজে নিয়ে, তাতে দু’টান দিয়ে, ধোঁয়াটা গিলে ফেলে। তারপর ছিলিমের আগুন হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে টিপে টিপে নিভিয়ে রেখে, দোকান খুলে, একটা ধূপকাঠি ধরিয়ে, দোকানে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের মহাদেবের ছবির পায়ের কাছে তিনবার ঘুরাবার সময়, মুখে ভোমবোলে বলে তিনবার আওয়াজ তোলে। তারপর সেই ধূপকাঠিটা হাপরের সামনে মাটিতে পুঁতে রেখে কাজ শুরু করে। কিছুক্ষণ কাজ করার পর, নেভানো ছিলিমটা আবার ধরিয়ে নিয়ে দু’টো টান দিয়ে, আগের মতো ভাবে নিভিয়ে রাখে। আবার হাতের কাজে মন দেয়।

পাঁচুদার গাঁজা টেপা দেখতে দেখতে হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল, আরে পাঁচুদা তো তিন মাস আগে রাস্তা পার হতে গিয়ে লড়ির চাকার নীচে চাপা পড়ে মারা গেছে তিনমাস আগে। এই লোকটা তা হলে কে?

আমার মুখ দিয়ে অস্ফূটে বেরিয়ে গেল, পাঁচুদা তুমি তো মারা গেছো তিন মাস আগে।
পাঁচুদা ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে বাঁ হাতের চেটোতে রাখা গাজা টিপতে টিপতে চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে রহস্যময়ভাবে হেসে বলল, হুম।

  • তবে তুমি এখানে এলে কি করে?
  • তুমি যেভাবে এসেছো।
  • মানে?
  • মানে মরে গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে এসেছো।
  • আমি?
  • তাছাড়া আর কে?
  • ধুর, আমি তো বেঁচে আছি।
    ঘোড়ার কাটা মুন্ডটা তখন কোথা থেকে এসে দোকানে ঢুকে বলল, তুমি মরে গিয়ে আমার উপর চড়ে এসেছো।
    তুমি তো ঘোড়ার কাটা মুন্ড। আমার বলার ইচ্ছে হল। কিন্তু মুখ দিয়ে কোন কথা বের হল না, যেন আমায় বোবায় ধরেছে।
  • তুমি মড়া, তুমি মড়া বলে পাঁচুদা আর ঘোড়ার কাটা মুন্ডটা লাফাতে লাগল আমায় ঘিরে চারপাশে। ভয়ে আমি চোখ বুঁজে ফেললাম। চোখ খুলে দেখি, আরে আমি তো বেঁচে আছি। বিছানায় শুয়ে এতক্ষণ দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম। আমার এখন বাঁচার আনন্দে, বিছানায উঠে ধেই ধেই করে নাচতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করলেই তো আর সব কিছু করা যায না। আমার মতো বাইশ বছরের একটা ছেলে, বিছানার উপর উঠে আনন্দে ধেই ধেই করে নাচছে। ভাবতে নিজেরই ভীষণ হাসি পেয়ে গেল। তাই আর নাচা হল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *