ভূতের সাথে রাত্রি যাপন
একটা গ্রাম ছিল, নাম পাতালপুর। গ্রামের একপাশে একটা পুরোনো বাড়ি, যেটা কেউ কিনতে চায় না, কারণ সবাই বলে রাতে সেখানে ভূত থাকে। ভূতটা নাকি খুব রাগী, যে-কোনো লোক ঢুকলেই গলা টিপে মেরে ফেলে।
একদিন গ্রামের তিন বন্ধু—রতন, বটুক আর কালু—বাজি লাগাল।
রতন বলল, “আমি রাতে ওই বাড়িতে গিয়ে একটা রাত কাটাব।”
বটুক হাসতে হাসতে বলল, “তুই গেলি গেলি, কিন্তু ফিরবি কী করে? ভূত তোকে খেয়ে ফেলবে!”
কালু বলল, “ঠিক আছে, যদি ফিরিস, তাহলে আমরা দুজনে তোকে এক মাস মুরগির ঝোল খাওয়াব। হারলে তুই আমাদের খাওয়াবি।”
রতন রাজি। সন্ধ্যাবেলা একটা লণ্ঠন আর একটা বালিশ-কম্বল নিয়ে বাড়িটায় ঢুকে পড়ল। বাড়িটা ভিতরে অন্ধকার, মাকড়সার জালে ভর্তি। রতন একটা ঘরে গিয়ে বসল, লণ্ঠন জ্বালাল আর চুপচাপ বসে রইল।
রাত বারোটা বাজতেই শুরু হল।
প্রথমে শব্দ—ঝুনঝুন ঝুনঝুন… যেন কারো শেকল বাঁধা। তারপর একটা লম্বা, শুকনো গলা ডাকল,
“কে আয়া রে…?”
রতন ভয়ে একটু কেঁপে উঠল, কিন্তু মনে সাহস এনে বলল,
“আমি রতন। তুমি কে?”
একটা সাদা ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। লম্বা চেহারা, চোখ দুটো জ্বলছে, মুখে দাড়ি-গোঁফ নেই, মাথায় চুলও নেই। ভূতটা বলল,
“এত রাতে আমার বাড়িতে? এখানে কেউ আসে না। তুই ভয় পাসনি?”
রতন বলল, “ভয় তো পাই, কিন্তু বাজি আছে। আর আমার পেটে খিদে। তোমার কাছে কিছু খাবার আছে?”
ভূতটা অবাক। এই প্রথম কেউ ওকে খাবার চাইল। সে একটু হকচকিয়ে গিয়ে বলল,
“খাবার? এই বাড়িতে তো কেউ আসে না শতাব্দীর পর শতাব্দী! তবে… আমার একটা পুরোনো বাক্স আছে, দেখি কিছু আছে কি না।”
ভূতটা একটা বড় লোহার বাক্স খুলল। ভিতরে শুকনো মুড়ি, বাতাসা আর একটা পুরোনো মিষ্টির ডিব্বা। সে লজ্জা পেয়ে বলল,
“আর কিছু নেই। তবে এই মুড়ি-বাতাসা খেতে পারিস।”
রতন হাসতে হাসতে বলল, “চলবে! তুমিও খাও। একা একা খেতে ভালো লাগে না।”
ভূতটা আরো অবাক। সে হাত বাড়িয়ে এক মুঠো মুড়ি তুলে মুখে দিল। কিন্তু মুখে দেওয়ার সাথে সাথে তার মুখটা বেঁকে গেল।
“আহা! লবণ নেই! একশো বছর ধরে লবণ খাইনি, ভুলে গেছি লবণ কেমন!”
রতন হো হো করে হেসে উঠল। বলল, “তোমার নাম কী গো ভূতদাদু?”
ভূতটা লজ্জা পেয়ে বলল, “আমার নাম ছিল হরিহর। সবাই বলত হরি। কিন্তু এখন আর কেউ নাম ধরে ডাকে না।”
রতন বলল, “আচ্ছা হরিদা, তোমার কি খুব রাগ হয়? লোকে বলে তুমি নাকি গলা টিপে মারো?”
হরিহর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“রাগ তো হয়! একা একা এত বছর… কেউ আসে না, কেউ কথা বলে না। তাই যখন কেউ আসে, ভয় দেখাই। কিন্তু মারিনি কাউকে। শুধু ভয় দেখিয়ে তাড়াই।”
রতন বলল, “তাহলে আজ থেকে আর ভয় দেখাবে না। আমি প্রতি শনিবার আসব। মুড়ি-লবণ-বাতাসা নিয়ে আসব। তুমি গল্প করবে, আমি শুনব।”
হরিহরের চোখে যেন জল চিকচিক করে উঠল (ভূতেরও চোখে জল আসে কি না কে জানে!)। সে বলল,
“সত্যি আসবি?”
রতন বলল, “একশোবার!”
সারা রাত দুজনে মুড়ি খেল, বাতাসা খেল, পুরোনো গল্প করল। হরিহর বলল সে নাকি এককালে গ্রামের সেরা লুডো খেলোয়াড় ছিল। রতন বলল, “তাহলে পরের শনিবার লুডো নিয়ে আসছি।”
সকাল হতেই রতন বেরিয়ে এল। বটুক আর কালু দূর থেকে দেখছিল। রতনকে জ্যান্ত দেখে দুজনের মুখ শুকিয়ে গেল।
রতন হেসে বলল, “এই, মুরগির ঝোলের ব্যবস্থা কর। আর শনিবার থেকে আমি ভূতের সঙ্গে লুডো খেলব। তোরাও আসতে পারিস। ও খুব ভালো মানুষ… মানে ভূত।”
এরপর থেকে পাতালপুরের ভূত আর ভয় দেখায় না। বরং শনিবার রাতে বাড়ির জানলায় একটা লণ্ঠন জ্বলে, আর ভিতর থেকে আসে হাসির শব্দ আর লুডোর গুটি নড়ার আওয়াজ।
গ্রামের লোকে এখন বলে,
“ভূতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারলে ভূতও হাসে।”
