ভালোবাসা হাসতে হাসতে
ঢাকার ব্যস্ত মিরপুর রোডে একটা ছোট্ট কফি শপ ছিল, নাম “চায়ের আড্ডা”। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় সাধারণ চায়ের দোকান, কিন্তু ভিতরে ঢুকলে বোঝা যায় এখানে চা-কফির চেয়ে গল্প বেশি বিক্রি হয়। সেই দোকানের কাউন্টারে বসে থাকত রিফাত, বয়স আটাশ, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, আর মুখে একটা চিরকালীন হাসি যেন আটকে গেছে। তার কাজ ছিল কাস্টমারদের অদ্ভুত অদ্ভুত অর্ডার শুনে হাসা আর সেই হাসি লুকিয়ে কফি বানানো।
এক বৃষ্টির বিকেলে দোকানে ঢুকল আরোহী। ছাতা হাতে, ভেজা চুলে পানি ঝরছে, আর মুখে এমন একটা ভ্রূকুটি যে দেখে মনে হয় পৃথিবীটা তার ওপরেই রাগ করেছে। সে কাউন্টারে এসে বলল,
“এক কাপ কফি। কিন্তু চিনি দেবেন না। দুধ দেবেন না। ক্রিম দেবেন না। আইসও না। শুধু কফি। কালো। তেতো। যেন আমার জীবনের মতো।”
রিফাত চোখ বড় বড় করে তাকাল। তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,
“ম্যাডাম, আপনার জীবন যদি এত তেতো হয়, তাহলে একটু চিনি মিশিয়ে দিই? ফ্রি। প্রেমের গ্যারান্টি দিচ্ছি।”
আরোহী চোখ পিটপিট করে তাকাল। তারপর হঠাৎ হেসে ফেলল। এমন হাসি যে দোকানের সবাই ঘুরে তাকাল। সে বলল,
“প্রেম? আপনি কি পাগল? আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে কাল ছেড়ে চলে গেছে। বলেছে, ‘তুই এত সিরিয়াস যে আমার মনে হয় আমি একটা লাইব্রেরির সাথে ডেট করছি’।”
রিফাত কফি বানাতে বানাতে বলল,
“তাহলে তো ভালোই হয়েছে। লাইব্রেরি হলে অন্তত শান্তি পেত। এখন আপনি ফ্রি। চলুন, আমি আপনাকে নতুন একটা জীবন দিই। নাম দিচ্ছি ‘কফি উইথ রিফাত’। প্রতিদিন এক কাপ ফ্রি কফি, আর বিনিময়ে আপনাকে একটা জোকস শুনতে হবে।”
আরোহী হাসতে হাসতে বলল, “ঠিক আছে। কিন্তু জোকস যদি বাজে হয়, আমি আপনার দোকানে এসে রিভিউ দেব—‘এখানে কফি ভালো, কিন্তু মালিক পাগল’।”
প্রথম দিন রিফাত জোকস বলল:
“জানেন, প্রেম কী? প্রেম হলো এমন একটা জিনিস, যেটা শুরু হয় ফেসবুকে লাইক দিয়ে, আর শেষ হয় ব্রেকআপের পর প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ করে।”
আরোহী হেসে গড়াগড়ি। এভাবে শুরু হলো তাদের দেখা।
প্রতিদিন বিকেলে আরোহী আসত। কখনো বৃষ্টিতে ভিজে, কখনো রাগ করে, কখনো শুধু হাসির জন্য। রিফাত তাকে নতুন নতুন কফি বানিয়ে খাওয়াত। একদিন বানাল “হাসির কফি”—যেটাতে একটা ছোট্ট কাগজের চিরকুট ছিল, লেখা: “তুমি হাসলে আমার দোকানের বিদ্যুৎ বিল কমে যায়।”
আরোহী সেটা পড়ে এমন হাসল যে কফি উল্টে গেল তার হাতে। সে বলল,
“তুমি এত চিপ কেন রিফাত? আমাকে প্রপোজ করতে চাও নাকি এভাবে?”
রিফাত লজ্জায় লাল হয়ে গেল। বলল,
“আরে না না… মানে… হ্যাঁ… মানে… চাই। কিন্তু ভয়ে বলতে পারছি না। তুমি তো এত স্মার্ট, আমি তো শুধু একটা কফির দোকানের মালিক।”
আরোহী চোখ টিপে বলল, “তুমি জানো না, আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কী? যে মানুষ আমাকে হাসাতে পারে। আর তুমি প্রতিদিন সেটা করো। তাই… হ্যাঁ। আমিও চাই।”
তারপর শুরু হলো তাদের প্রেম। কিন্তু সেটা কোনো সিরিয়াস প্রেম ছিল না। সেটা ছিল এমন প্রেম, যেখানে ঝগড়া হলে দুজনে একসাথে বসে নিজেদের মিম বানাত। যেখানে ব্রেকআপের হুমকি দিলে রিফাত বলত, “ঠিক আছে, ব্রেকআপ করি। কিন্তু কফি তুমি আর ফ্রি পাবে না।”
একবার আরোহীর জন্মদিনে রিফাত পুরো দোকান সাজাল। কিন্তু কেক আনতে ভুলে গেছে। তাই সে একটা বড় কফির মগে ক্রিম দিয়ে লিখল “হ্যাপি বার্থডে” আর মোমবাতির বদলে একটা চামচ জ্বালাল। আরোহী হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলল। বলল,
“তুমি পুরো পাগল। কিন্তু আমার পাগল।”
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তারা বিয়ে করল। বিয়ের দিন রিফাতের বউভাতে কেকের বদলে সবাইকে কফি পরিবেশন করা হলো। কারণ রিফাত বলেছিল, “আমার প্রেম তো কফি দিয়েই শুরু হয়েছিল।”
আজও “চায়ের আড্ডা” আছে। কাউন্টারে বসে রিফাত আর আরোহী। কাস্টমাররা এলে তারা একসাথে জোকস বলে। আর যখন কেউ বলে, “ভাইয়া, আপনারা এত হাসেন কেন?” রিফাত চোখ টিপে বলে,
“কারণ আমরা জানি, প্রেম যদি হাসি না আনে, তাহলে সেটা প্রেমই না। সেটা শুধু টাইমপাস।”
আর আরোহী হেসে বলে, “আর আমাদেরটা? সেটা চিরকালের টাইমপাস।”
তারপর দুজনে একসাথে হাসে। এমন হাসি, যেটা শুনলে মনে হয়, পৃথিবীটা আসলে খুব সুন্দর। শুধু একটু কফি আর হাসি লাগে।
