বাবলির বিভ্রান্তি
বাবলির পাঁচ বছর বয়সের জন্মদিনে বাবা তাকে একটা বাররি-ডল পুতুল কিনে উপহার দিয়েছিল। এবার ২৫শে বৈশাখ তার ছয় বছর পূর্ণ হবে। নার্সারি থেকে ক্লাস ওয়ানে উঠেছে সে। বাররি-ডল পুতুলটাকে বাবলি খুব ভালবাসে। তাকে কাছে নিয়ে রাতে মায়ের পাশে ঘুমায়। মা সকালে সবার আগে ওঠেন। সেদিন সকালে উঠতে বাবলির একটু দেরি হয়ে যাওয়ায়, সে দেখে পুতুলটা বিছানার পাশে নেই। ঘটে এক আশ্চর্য কান্ড। পুলুলটা খাবার টেবিলে বসে তার দুধ রুটি খাচ্ছে। সে চোখ কচলে নিয়ে আবার টেবিলের দিকে তাকায়। হ্যাঁ সে ঠিকই দেখছে। পুতুলটা বিছানা থেকে নেমে গিয়ে খাবার টেবিলে বসে তারই দুধ রুটি খাচ্ছে।
বাবলি বিছানা থেকেই হাক ছাড়ে, কিরে তুই টেবিলে বসে কি করছিস?
বাররি-ডল কোনও উত্তর দেয় না। এক মনে খেতেই থাকে।
– কানে যাচ্ছে না আমার কথাট? বাবলি খিঁচিয়ে ওঠে।
এবার পুতুলটা মুখ তুলে তাকায়, বাবলিকে বলে, দেখছো না কি করছি?
– দেখছি তো। তুই আমার দুধ রুটি খাচ্ছিস কেন?
– তোমার হবে কেন? আমার খাবার আমি খাচ্ছি।
– তোর খাবার?
– হুম।
– তুই কোনদিন এসব খাস?
– খাই তো।
– মিথ্যে কথা। দাঁড়া মাকে ডাকি।
– ডাকো।
‘মা মা মা’ বলে বাবলি বিছানায় বসেই তিনবার চিৎকার করল। কিন্তু মা এলো না। মা এখন রান্না ঘরে ব্যস্ত আছে। তাই বোধহয় শুনতে পায়নি তার ডাক। রাগে বাবলির ইচ্ছে করছিল বাররি-ডলের রেশমি চুলগুলি ছিঁড়ে দিতে। তাই করতে সে এবার বিছানা থেকে নীচে নেমে এলো। এবার টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখল, ওখানে পুতুলটা বাবলির ফুলতোলা জামাটা গায়ে পরে বসে আছে। যে জামাটা বাবা তাকে পুজোর সময় কিনে দিয়েছিল।
– এই তুই আমার জামা পরেছিস কেন?
– তোমার জামা হবে কেন? এটা আমার জামা। বাবা গতবছর পুজোর সময় কিনে দিয়েছিল। শুনে বাবলির এবার হাসি পেয়ে গেল। বলল, তোর আবার বাবা কে রে?
তখনই দেওয়ালের বড় আযনাটায় বাবলির চোখ পড়তেই সে যা দেখল, তাতে চমকে উঠল। সে তো বাবলি নয়। সে নিজেই তো একটা বাররি-ডল। এটা কেমন করে হলো?
আজকাল পুতুলটা তাকে মাথার পাশে রেখে মায়ের পাশে শুয়ে বিছানায় ঘুমায়। ঘুমাবার আগে তাকে নিয়ে কিছুক্ষণ আদিখ্যেতা রকমের আদর করে। বাবলির যেটা অসহ্য লাগে। তবু সে কিছু বলতে পারে না। মা সব দেখে, জানে, বোঝে তবু সে কিছু বলে না দেখে, বাবলির মনে অভিমানের মেঘ জমে। সেই মেঘ মনে নিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে। এইভাবেই বাবলির দিন কাটছিল, বুকে দুর্বোধ্য এক কষ্ট নিয়ে।
এইভাবে কতদিন কেটেছে বাবলির মনে নেই। হঠাৎ ২৫শে বৈশাখের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখল, বাররি-ডল পুতুলটা তার মাথার কাছে অবহেলায় পড়ে আছে। আর বাবলি তার মায়ের পাশে থেকে, মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। এটা কি সত্যি নাকি স্বপ্ন সেটা সে বুঝতে পারল না। তাই সে নিজের হাতে চিমটি কেটে দেখল, সত্যি সত্যি তার ব্যথা লাগছে কিনা। হ্যাঁ ব্যথা লাগছে তো। তবে এটা স্বপ্ন নয় নিশ্চয়ই। ববলি তখন পুতুলটাকে বুকে টেনে নিয়ে, আদর করতে করতে বলল, খুব দুষ্টু হয়েছিস তুই।
– কেন?
– আমার জায়গাটা দখল করতে চাইছিলি।
– মোটেও না। ওটা তোমার মনের ভুল ধারণ। তুমি তোমার জায়গায়ই ছিলে, শুধু তোমার দৃষ্টিভঙ্গির ভুলের কারণে তোমার মনে এসব বিভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল।
– তাই?
-হুম।
বাবলি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, বাররি-ডলকে বুকে চেপে ধরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
