Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » নাক কান কাটা বর || Sankar Brahma

নাক কান কাটা বর || Sankar Brahma

লা লি দুই বোন। ওরা কমলবাবুর জমজ সন্তান। দু’জনের জন্মের সময়ের ব্যবধান মাত্র তেরো মিনিট। বড় জনের নাম লা। ছোট জনের লি। নামটা কমলবাবু রেখেছিলেন। মা অনিমাদেবীর ইচ্ছে ছিল তাদের নাম লক্ষ্মী সরস্বতী রাখার। কমলবাবু রাজি হননি। অনিমাদেবীকে বলেছিলেন, এগুলি সব আদ্দিকালের নাম। তাছাড়া মানুষের দেব-দেবীর নাম রাখা আমি পছন্দ করেন না। স্কুলেও তাই তাদের নাম রাখা হল লা লি। তাই তাদের ভাল নাম আর ডাক নাম লা লি-ই রয়ে গেল।

দু’জনে দেখতে খুবই সুন্দরী। তাদের দেখতে একই রকম লাগে। একদম তফাৎ বোঝা যায় না। মা বাবারই মাঝে মাঝে ভুল হয়ে যায়। প্রতিবেশিদের তো হবেই।
তারা দু’জনেই একসঙ্গে বড় হয়ে উঠতে থাকে। দেখা যায়, দূ’জনে শুধু একই রকম দেখতেই, তা নয়, দু’জনের আচরণের মধ্যেও বেশ মিল আছে। লা-র যখন খিদে পায়, লি-রও খিদে পায়। একই সময় দু’জনের বাথরুম পায়। দু’চার মিনিটের তফাৎ হতে পারে। দু’জনকে চেনার জন্য ওদের মা বাবা দুজনকে দু’রঙের ফ্রক কিনে দিত। লা-কে লাল রঙের ফ্রক কিনে দিলে, লি-র জন্য কেনা হত নীল রঙের ফ্রক। অন্যেরা যতই ভুল করুক, লা লি-র নিজেদের মধ্যে কিন্তু কোনও ভুল হত না। অন্যরা ভুল করে, লা-কে লি বলে কেউ ডাকলে, তারা খুব মজা পেত। মনে মনে খিল খিল করে হাসি পেলেও, তারা তা গোপন করে লা বলত, হ্যাঁ দিদা বলুন।
– তোর মা কোথায় রে?
মা তখন বাবার সাথে কথা বলছিল।
লা ফাজলামি করে বলল, বাবার সঙ্গে প্রেম করছে।
শুনেই মহিলা, ছি ছি করে উঠলেন। কি কথার শ্রী হয়েছে তোর।
– তবে আমাকে কথাশ্রী উপাধি দাও দিদা ।
মহিলা রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলন।
ভাবলেন, রমলা মেয়েদের ঠিক মতোন শিক্ষা-দীক্ষা দিচ্ছে না। কালে কালে মেয়ে দু’টি কি হবে কে জানে? একদিন কমলবাবুকে রাস্তায় দেখতে পেয়ে তিনি এই নিয়ে বেশ সুন্দরভাবে গুছিয়ে অভিযোগ করেছিলেন তার কাছে। তিনি শুনে বিরক্ত হয়েছিলেন। অনিমাদেবীকে এসে বলেছিলেন। মা বাবা প্রেম করছে কথাটা শুনে অমিমাদেবী খুব হেসেছিলেন।
কমলবাবু তা দেখে অবাক হয়ে বলেছিলেন, শুনে তুমি হাসছো?
– হাসব না তো, কি করব? তোমার সঙ্গে প্রেম করছি শুনে রাগ করব?
অনিমার মুখে এ’কথা শুনে, কমলবাবুও হেসে ফেলেছিলেন।

লা লি ওরা দু’জনেই খানপুর গার্লস স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে। আর একদিন ক্লাসের মক টেষ্টে লি-কে দিদিমণি প্রশ্ন করলেন,’এ প্লাস বি, হোল স্কোয়ার মাইনাস দু এ বি’ কি হয়? তুমি বলতো লা। লি চুপ করে রইল। তার জানা ছিল না।
স্কুল থেকে কমলবাবুর কাছে রিপোর্ট গেল, লা মোটেই পড়াশুনা করছে না, ক্লাসের মক টেষ্ট পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এই জন্য মার কাছে লা-কে অযথা বকা খেতে হয়েছিল। চুপ করে থেকেই লা মার তিরস্কার হজম করে ছিল। কারণ মাকে সত্যি কথাটা বললে মা কিছুতেই তা বিশ্বাস করত না। বরং মিথ্যে কথা বলার জন্য তাকে আরও বকা খেতে হত। তাই সে মুখ বুঁজে চুপ করেছিল।
দুই বোনের মধ্যে খুব ভাব ছিল। এইজন্য এক বোনের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপলেও তারা বিব্রত হয়ে, এ ব্যাপারে কেউ কাউকে দায়ী করে তারা কোনও অভিযোগ করত না। বরং তারা মনে মনে এর জন্য বেশ মজা উপভোগ করত। আরও অনেকে তাদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করেছে একই রকম ভুল করে। কে লা, কে লি চিনতে না পেরে, উদুর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে তা চাপিয়ে দিয়েছে। তা’তে ওরা মন খারাপের চেয়ে মজাই বেশি পেয়েছে।
এইভাবে তাদের সতেরো বছর কেটে গেল। সব ব্যাপারে দু’জনের মিল থাকলেও, মেধার ব্যাপারে তাদের বেশ অমিল দেখা গেল। লা ছিল পড়াশুনায় ছিল ভাল। লি-র পড়াশুনা ভাল লাগত না। সে নাচ-গান, ছবি আঁকা নিয়ে থাকত। দু’জনেরই উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা এসে গেল। পরীক্ষার আগে তারা দু’জনেই রীতিমতো ভাল করে পড়া-শুনা করল। ফল বেরোলে দেখা গেল। লা ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছে। আর লি পেয়েছে থার্ড ডিভিশন।
মেয়েদের কলেজে ভর্তি করাবার সামর্থ কমলবাবুর নেই। তিনি একটা কাপড়ের দোকানে খাতা লেখেন। মাসে মাত্র তিনহাজার টাকা পান। তা’তে ডাল-ভাত খেয়ে কোনও মতে বাঁচ যায়। মেয়েদের কলেজে পড়ানো যায় না। তাই মেয়েদের জন্য তিনি পাত্র দেখা শুরু করলেন। দোকানের মালিক অজিতবাবুকে বললেন।
– আপনার যদি জানা-শোনা কোনও ভাল পাত্র থাকে তবে আমাকে বলবেন, আমার মেয়ে দু’টির বিয়ে দেবার জন্য তাদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করব।
– আচ্ছা খোঁজ নিয়ে জানাব। আপনার মেয়েরা কি পাশ?
– দু’জনেই উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ।
– বয়স কত?
– আঠেরো।
– দু’জনেরই?
– হ্যাঁ।
– ওরা কি যমজ নাকি?
– হুম।
– তাই নাকি? আগে শুনিনি তো?
– আপনি আগে কখনও জানতে চাননি, তাই বলিনি।
– আচ্ছা। ভাল ছেলের খোঁজ পেলে, জানাব।

এদিকে দু’বোনের মনেই বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে। বসন্ত আবেশ গড়ে উঠেছে তাদের হৃদয়ে। এই বয়সের মেয়েরা সাধারণত বিয়ে করতে রাজি হয় না। লা লি আগ্রহের সঙ্গে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। তবে, দু’জনের মনেই একটা খটকা আছে। বিয়ের পর তাদের বরেরা তাদেরকে আলাদা ভাবে চিনবে কি করে, কে লা, কিংবা কে লি? লি-র প্রশ্ন শুনে লা বলল, আমাদের দূ’জনের যদি দুই যমজ ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়, ওরা দু’জনে যদি দেখতে আমাদের মতো একই রকম হয়, তাহলে, কে কোনজন, আমরা আলাদা করে চিনব কি করে?
শুনে লি বলল, আমার বরকে চেনার জন্য আমি ওর নাক কেটে রাখব। তার কথা শুনে হি হি করে হেসে উঠে লা বলল, তবে আমি আমার বরের কান কেটে রাখব। একথা শুনে, ওরা দু’জনে হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ল। এই সময় অনিমাদেবী এসে ঘরে ঢুকলেন। ওদের উচ্ছলভাবে হাসতে দেখে দুই মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কিরে তোরা এত হাসছিস কেন?
লি বলল, জান মা, লা বলছে, একটা ঘোড়া যদি ডিম পারে, তবে তার বাচ্চাটা নাকি গাধা হবে। সত্যি মা?
– ধুৎ! তোরা দিন দিন যত বড় হচ্ছিস, তত যেন ফাজিল হচ্ছিস। এই কথা বলে, অনিমাদেবী মুখে বিরক্তির ভাব নিয়ে ওই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। তা দেখে হাসির জোয়ার যেন বাঁধ ভেঙে দুই বোনকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। ওরা আরও জোরে জোরে হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে ঢলে পড়তে লাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *