Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » তুমি এলে ফুল হয়ে || Hujaifa Muhammad

তুমি এলে ফুল হয়ে || Hujaifa Muhammad

একটা বয়সে আসার পর মানুষ অনেকটাই আবেগপ্রবণ এবং একই সাথে সহানুভূতিশীল হয়ে পরে। ভীষণ রাগী,কিংবা অতিশয় শক্ত মনের মানুষও এই সময়টা-তে এসে জ্বলন্ত মোমের মতো ভিতর ভিতর গলতে থাকে। দেখা যায় এমন একটা কান্ড ঘটলো,যা বরাবরই শরীরের রক্ত গরম করার মতো মারাত্মক এবং ক্ষুব্ধ হওয়ার মতো যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় রাগী মানুষটা বিন্দু পরিমাণ রাগান্বিত হলো না। শক্ত মানুষটা কিঞ্চিৎ অবহেলা করলো না।বরং আগুনের মতো রাগান্বিত আর পাহাড়ের মতো শক্ত হওয়ার বদলে__বয়ে চলা শান্ত নদীর স্রোতের মতো চোখ বেয়ে নোনা জলের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে।

হ্যা, বলছিলাম আমাদের মায়ের কথা। ছোট বেলা থেকে মা কে দেখে আসছিলাম এবং চিনে আসছিলাম ভিষণ রাগী মহিলা হিসেবে। আমাদের ঘরোয়া পরিবেশটা ছিলো মা কেন্দ্রীক।সংসারের ভাতের পাতিল থেকে আয়-ব্যয়ের হিসাবনিকাশ পর্যন্ত, সবকিছু মা দুই হাতে সামলাতেন। বাবা পরিবারের মূল কর্তা হলেও বাড়ীতে কর্তীর ইশারায় সবকিছু চলতো। সারাজীবন পান থেকে চুন খসলেই যে মায়ের রক্ত চক্ষু প্রত্যক্ষ করে এসেছি,সেই মা আজকাল কেমন যেন নমনীয় হয়ে পরেছেন। সামান্য বিড়ালের হারিয়ে যাওয়াতেও মা চোখের পানি ফেলেন।ওইযে যে বয়সটা-তে আসলে মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠে, মা হয়তো সেই বয়সটায় চলে এসেছেন!

আচ্ছা মায়ের বয়স এখন কতো হবে?

মায়ের বয়স হিসেব করতে গিয়ে মা’র দিকে চোখ পরলো। বারান্দায় দাঁড়িয়ে মা আমাদের চলে যাওয়া দেখছেন আর মুখে কাপড় দিয়ে কান্না করছেন। খেয়াল করলাম আমাদের বিতাড়িত হওয়া নিয়ে বাড়ীর অন্য কারো তেমন মাথা ব্যথা নেই। সবাই বেপারটা হয়তো সহজ ভাবেই নিয়েছে। ক্ষমার অযোগ্য অপরাধের যুতসই শাস্তি পেয়েছে। এটা নিয়ে সবারই যেন একরকম গা ছাড়া ভাব। কেউই আর আমাকে নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না।যেন বাড়ি থেকে আমাকে বের করে দেওয়ার সাথে সাথে মাথা থেকেও আমাকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। এখন আর আমি তাদের কেউ নই।তারাও কেউ আমার নয়। ভাবসাবে এমন একটা কিছুই বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছে। আমিও যেন কিঞ্চিৎ ঘাড়ত্যাড়া টাইপের কিংবা একটু বেশিই অভিমানী মানুষ।কাউকে না জানিয়ে হিন্দু বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছি,এই অপরাধবোধে নত না হয়ে তাদের দেওয়া অলিখিত ত্যাজ্যপুত্রের সার্টিফিকেট নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম।সদরদরজা পেরোনোর আগে পিছন ফিরে আরেকবার তাকালাম। আমার একসময়ের ভিষণ রাগী মা তখনও কাঁদছেন। আমি রুবির হাতটা শক্ত করে ধরে বললাম,চলো।

পথে রুবি আমাকে অনেক করে সান্ত্বনা দিলো।ধৈর্য ধারণ করতে বললো।মন খারাপ যেন না করি। সে বড় জ্ঞানী মানুষের মতো আমাকে বোঝ দিতে চাইলো যে__তারা সবাই এখন রেগে আছে।রাগের মাথায় অনেক কিছুই বলে ফেলে মানুষ। তোমাকে যা বলছে সবই রাগের মাথায়।কিছু দিন কাটলে দেখবে সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। আমাদেরকেও মেনে নিয়েছে। আমিও তার কথায় আশ্বাস দেই।মেনে নিবে এই কথার সাথে কথা মিলিয়ে বলি __হ্যা,কিছুদিন অপেক্ষা করো।কিন্তু মনে মনে আরো ভিষণ মুষড়ে পড়ি। চিন্তিত হয়ে আরো দৃঢ় ভাবে বুঝতে পারি যে__ঘরোয়া সালিশে বসে পরিবারের নেওয়া সিদ্ধান্তটা রাগের মাথায় ছিলোনা। তবুও মুখে মুখে স্বীকার করি ক’টাদিন যেতেই তারা মেনে নিবে।এই ক’টাদিন কাটানোর জন্য আমরা দয়াগঞ্জে এক রুমের একটা বাসা ভাড়া নিলাম।বাসা ভাড়া নেয়ার কথাটা যতটা সহজে বললাম বাস্তবে এতটা সহজ ছিলো না।অনেক খোঁজাখোঁজি করেও যখন থাকার কোন বন্দোবস্ত হলো না। ঠিক সেই মূহুর্তে রুবি ঝটপট একটা ব্যবস্থা করে ফেললো।কলেজ লাইফের ওর কোন এক বান্ধবীকে কল দিয়ে কিভাবে কিভাবে যেন তিনতলা একটা বাড়ীর নিচতলায় এক রুমের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিলো।বাড়িটা ভিষণ পুরাতন। দেয়ালের আস্তরা খসে খসে পরছে।দেখলেই ভয় হয়,কখন যেন পুরো বাড়িটাই ধসে পরে।

আমরা আধো আধো এই ভাঙা বাসায় সংসার পাতলাম।পাখির বাসার মতো সাজানো গুছানো সংসার। ছোট্ট একটা ঘর।তাও কেমন ফাঁকা ফাঁকা। ফার্নিচারের কোন সমারোহ নেই।প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র যা ছিলো তা-ই রুবি এমন করে গোছালো যে ঘরটা দেখলেই কোমল কোন রমনীর নিপুণ হাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। রুবির কাছে যা কিছু টাকা ছিলো তারও অর্ধেক ছিলো আমার কাছে। মায়ের আঁচলের বাহিরের পৃথিবীটা এতো কন্টকাকীর্ণ তা মায়ের আঁচল থেকে বের হওয়ার পর খুব তীব্র ভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।

আয়-ইনকামের যোগ্যতা আমার তেমন নাই বললেই চলে।আমি লেখালেখির মানুষ। খাতা আর কলমের বাহিরে আমার তেমন জানাশোনাও নেই।ভাগ্যটা কেমন সুদূর বিস্তৃত ছিলো, একটা খবরের কাগজের সাহিত্য পাতার দায়িত্ব পেয়ে গেলাম।বেতন আহামরি না হলেও টেনেটুনে মাস চলে যায়। আজকাল ভাবছি ওভারটাইমে কিছু একটা করা যায় কি না(!)। সারাদিন অফিস করার পর রুবিকে সময় যতটুকু দিতে পারি,তখন হয়তো তাও দিতে পারবো না। মেয়েটা হয়তো আমায় স্বার্থপর ভাববে,হয়তো ভাববে আমি নিজের জন্যই সারাটাদিন কাটিয়ে দেই,তাকে একটু সময়ও দেই না।অথচ তাকে কি করে বলবো যে পুরুষের ভালোবাসা হচ্ছে তার দায়িত্ববোধে,কর্তব্যপরায়ণতায়।এইযে এক্সটা কাজ করে বাড়তি কিছু উপার্জন করতে চাচ্ছি, এটা কি তার জন্য না!, আলাদা কিছু দিয়ে তাকে খুশি করার জন্য না! সে কি বুঝবে এই ভালোবাসার শিকড়?

কোথা থেকে তার উৎপত্তি,

কোথায় তার শিখর।

দয়াগঞ্জ আমাদের ভাড়াবাসার সামনে লম্বা একটা কোয়ার্টার। ভার্সিটি আর সংসারের কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে কোয়ার্টারে দুইটা টিউশন করে রুবি।তার মধ্যে একটা টিউশনি ছিলো হিন্দু ফ্যামিলিতে।সপ্তম শ্রেণীর মেয়ে।নাম পূজা। টিউশনির উপার্জনটা ওর নিজেরই খরচ হয়ে যায়।টানাপোড়েনের যাপিত জীবন আমাদের। একদিন হুট করে হিন্দু ঘরের টিউশনিটা চলে গেলো।এই কারনে যে রুবি নবমুসলিম। জন্মগত মুসলিম হলে সমস্যা ছিলো না।কিন্তু ধর্মত্যাগিনী পুড়োমুখোর কাছে তাদের সন্তান পড়াবেনা বলে জানিয়ে দিলো পূজার মা।

এই রকম ছোট খাটো অধঃপতনের ভিতর দিয়ে আমাদের দিনগুলো সানন্দে কেটে যাচ্ছিলো।

জীবন কত বৈচিত্রময়। রুবির সাথে আমার পরিচয় এখনো একবছরও হয়নি।এর ভিতরেই সে আমার স্ত্রীর অধিকার নিয়ে নিলো।অথচ একবছর আগে ঝুউম বর্ষার দিনে যখন রুবিকে প্রথম দেখেছিলাম ,তখন কি ভেবেছিলাম এই মেয়েটি-ই হবে আমার বিয়ে করা বউ!

আমার অনাগত বাচ্চার মা!

রুবির সাথে আমার প্রথম দেখা হয় মুষলধারে বৃষ্টির কোন এক রাত্রিতে।বাংলা একাডেমীতে একটা কাজ ছিলো।জরুরত সেরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মন্দির গেইটের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম।রাত তখন আনুমানিক ১০ টা হবে।ঢাকা শহরের জন্য এটা খুব বেশি রাত নয়।কিন্তু তুমুল বৃষ্টির কারণে গভীর রাত মনে হচ্ছে। চারিদিক নিরব,নিস্তব্ধ। মানুষজনের আনাগোনা নেই।এর মধ্যে দেখলাম একটা মেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছোটে আসছে। পিছন পিছন দ্রুত পা চালিয়ে আসছে কয়েকজন যুবক।মেয়েটা কাছাকাছি এসে অনেকটা চিৎকার করেই আমাকে ভাইয়া বলে ডাক দিলো।তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,মন্দির থেকে এরা আমার পিছু নিয়েছে।প্লিজ ভাইয়া একটু হেল্প করেন।আমার খুব ভয় করছে।

আমি এক দৃষ্টিতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছি আর রিনরিনে কন্ঠে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলা কথা গুলো শুনছি।মেয়েটা আহামরি সুন্দরী নয়,চাঁদ কিংবা পরীর সাথে তুলনা দেওয়া যাবেনা হয়তো। কিন্তু সাদামাটা ওই মেয়েটার যে রূপ সেদিন আমি দেখেছিলাম, মনে হয়েছে পৃথিবীর কবিরা নারী নিয়ে যত কাব্য রচনা করেছে,সব কাব্যের কেন্দ্রবিন্দু আমার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা।বৃষ্টির কারণে সমস্ত শরীরই তার ভিজে একাকার। পরনে কামিজ।মাথার চুল গুলো ভিজে চেহারায় লেপ্টে আছে।চেহারায় প্রসাধনীর কোন কারসাজি নেই।আমি মেয়েটার চোখের দিকে তাকালাম, স্বচ্ছ চোখের মাঝে জ্বলজ্বল করা কালো মনি,অমন কাজল কালো চোখ পৃথিবীর যে কোনো পুরুষের বুকের ভিতরে ছ্যাৎ করে উঠাতে বাধ্য। আর কিছু ভাবার আগেই বখাটে লোকগুলো আমাদের ঘিরে ধরলো।

সাত-আট জনের মাঝে বেঁটেখাটো একজন পৌঢ় বলে উঠলো,আবে কপাল দেকচোনি! একজন ধরতে আয়া দুইজনরে পাইলাম।অন্য একজনকে দেখলাম ছুঁ মেরে মেয়েটার ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে গিলো।আমাকে বলা হলো যা যা আছে তা তা দিয়া ফেলাও মামা।আমি হাসিহাসি মুখ করে খুবই আপন করে ডাকলাম মামা!সবকিছু তো দেওয়াই যায়, তবে চলেন না আমরা একটা ডিলের ভিতর দিয়ে সবকিছু দেওয়া নেওয়া করি।আমি সবকিছু দিয়ে দিবো তবে শর্ত হচ্ছে আপনি আমাদের; বিশেষত মেয়েটাকে কিছু করবেন না।কথা শেষ হওয়ার আগেই লম্বা কিন্তু পাটকাঠির মতো চিকন একটা লোক আমার তলপেটে দু’ঘা বসিয়ে দিলো।তারপর বলতে লাগলো,তোর তো সাহস কম না,তুই ভাইরে শর্ত দিতেছোত।এই বলে আরেক ঘা মারলো মাথায়।অজ্ঞান হওয়ার আগে তাকিয়ে দেখলাম মেয়েটার চোখে জল টলমল করছে।সে খুবই মর্মাহত চেহারায় আমার দিকে তাকিয়ে আছে।মার খাওয়া খুবই স্বাভাবিক বিষয়,কিন্তু কোন সুন্দরী মেয়ের সামনে মার খাওয়াটা অপমানজনক।আমি অপমানটুকু ঢাকতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলাম।ছিনতাইকারীদের মাঝে কে যেন বলে উঠলো ‘শালায় আবার হাসে’ বলেই আরেক ঘা বসিয়ে দিলো।

চোখ যখন মেললাম তখন সকাল।জানালা গলে সূর্যের আলো আমার চোখেমুখে এসে পরছে।আশপাশ চেয়ে বুঝলাম আমি হসপিটালে, সরকারি হসপিটাল। আমার মাথার কাছের চেয়ারটায় গতকাল রাতের মেয়েটা বসা।আমার জেগে উঠা দেখে সে প্রশ্ন করলো, এখন কেমন বোধ করছেন? আমি তার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়ে তাকে উল্টো প্রশ্ন করলাম ‘আপনার নাম কি?

সে মুচকি একটা হাসি দিয়ে ধীরে ধীরে বললো__রুবি রায়।

রুবি রায়ের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর। নদী ঘেষা গ্রাম আর গ্রামের হাওয়া বাতাস গায়ে লাগিয়েই রুবির বেড়ে উঠা।জাতে ব্রাহ্মণ।বাবা ছিলেন মন্দিরের পুরোহিত। নিতান্তই গরিবানা হালত পুরোহিত মশাইয়ের। তবুও স্বপ্ন দেখতেন একমাত্র মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষ বানাবেন। রুবিও ছিলো বাবার স্বপ্নে স্বাপ্নিক। কিন্তু পুরোহিত মশাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেখে যেতে পারেননি।হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইহকাল ত্যাগ করেন।পুরোহিত মশাইয়ের মৃত্যুর পর রুবিরা প্রায় পথেই নেমে গেলো।বাবা নেই। সহায়সম্পদ নেই। কারো সহানুভূতি নেই। মাথার উপর কারো ছায়া নেই। সবকিছু না থাকার এই পৃথিবীতে রুবির ছিলো কেবল তুখোড় মেধাশক্তি।যে মেধা দিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেলে গেলো। মধ্যবিত্তদের__পরিবারের পরে সবচে আপন হচ্ছে দুঃখ। পরিবার আর দুঃখের সমন্বয়েই জীবন কাটাতে হয়।ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেলেই যে মানুষের দুঃখ ঘুচে যায় বেপারটা তা না।বরং ঢাকায় আসার পরে অসংখ্য লোভাতুর চক্ষু থেকে পালিয়ে বাঁচতে হয়েছে রুবির। রুবি সবসময়ই চাইতো কোন আদর্শবান পুরুষের লোমশ বুকে তার যেন আশ্রয় হয়। ছায়াহীন হয়ে বড় হতে হতে ছায়ার মর্ম খুব ভালো ভাবেই বুঝেছে রুবি। কিন্তু কোন মুসলিম যুবক যে তার স্বপ্নের পুরুষ হয়ে উঠবে, এটা রুবিরও অপ্রত্যাশিত ছিলো।

হাসপাতালের পর থেকে আমি সবসময়ই চাইতাম আমাদের আর দেখা না হোক।কথা না হোক। যেন আমি ভিন্নধর্মাবলম্বীর এই মেয়েটার অনন্ত মায়ায় জড়িয়ে না পরি।কিন্তু নিয়তি নিদারুণ। আমি যতই তাকে উপেক্ষা করছিলাম,ভাগ্য আমাদের ততই একত্রে করে দিচ্ছিলো।এভাবে অনেকটা সময় পরে আমি রুবি কে সরাসরি বলে ফেলি,এটা সম্ভব নয় রুবি। ওর শীতল কণ্ঠে গম্ভীর উত্তর, কেন?আমি হিন্দু বলে? আচ্ছা যদি আমি আপনার জন্য আমার ধর্ম ত্যাগ করি!তবে তো আর অসম্ভব থাকলো না।

আমি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকি। আপন মনে ভাবি__ বিয়ে তো কোন না কোন এক মেয়েকে করতেই হবে,আচ্ছা এমন যদি হয় আমার বিয়ের মাধ্যমে একটা আঁধার মানবী আলোর দিশা পেয়েছে, তাহলে এই বিয়ে কি অন্য দশটা বিয়ে থেকে অসাধারণ নয়?অনন্য নয়?

জীবন খুবই বৈচিত্রময়। জীবনের গল্প। গল্পের রঙ।রঙের নদী। নদীর স্রোত।স্রোতের ঢেউ। ঢেউয়ের উত্থান পতন। জীবন সম্পৃক্ত সবকিছুই যেন অদ্ভুত। রহস্যময়।

একদিকে জীবন তলিয়ে যায় আলো থেকে আঁধারের গহ্বরে। অন্যদিকে আঁধার জীবনে উঠে আলোর ঊষা।

রুবির জীবনেও আলো আসলো। নিকোষ আঁধার কাটিয়ে উদিত হলো হেদায়েতের ঊষা। কাকরাইল মাস্তুরাতে আগত মহিলা মুসুল্লি ও ইমাম সাহেবকে সাক্ষী রেখে রুবির জবানে উচ্চারিত হলো___আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহিসসালাম) আল্লাহর রাসুল।

রুবি রায় পরিনত হলো রুবি রহমানে।

আজ এতদিন পর দয়াগঞ্জের ভাড়াবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে এইসব রোমন্থন করি। রুবি চা হাতে আমার পাশে দাঁড়ায়। চা ভর্তি একটা কাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে জিগ্যেস করে,কি ভাবছো?

আমি রুবির চোখের দিকে তাকাই।খোদা কি অসাধারণ মায়া ভরপুর চোখ দুটি সৃষ্টি করেছেন রুবির। ওই দুচোখের মায়ায় হারাতে হারাতে আমি আবৃত্তি করি___

জীবনের হাসি ব্যথা কান্নার ভীড়ে,
তুমি এলে ফুল হয়ে হৃদয়ের নীড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *