টুকুনের অসুখ – পনেরো
সুবল চলে যাবার পর গোটা ব্যাপারটা টুকুনের মাথায় কেমন একটা অদ্ভুত নেশা ধরিয়ে দিল। সে ভিতরে ভিতরে ভীষণ একটা অভাবের কথা ধরতে পারছে। সে সংসারে খুব একা—পৃথিবীতে যে মৃত্যু এবং গ্রহাণুতে চলে যাওয়া বাদে অন্য কিছু আছে তার জানা ছিল না। সে এটা যে কী দেখে ফেলল। ওর চোখ বুজে আসছে। সুবল আবার কখন আসবে—শুধু প্রতীক্ষা।
ওর চোখে এখন কিছুটা স্বপ্নের মতো ঘটনাটা ঝুলে আছে। এক আশ্চর্য মহিমাময় শরীর সুবলের। এবং শরীরের সর্বত্র এক কঠিন অবয়ব, কী শক্ত, অথচ ভারী কোমল, লাবণ্যে ভরা, লম্বা সুবল, যার শিশুর মতো সরল মুখ এখন আরও সুন্দর মনে হচ্ছে। সে একটা পুরুষের শরীর, এবং শরীরের সবটা একসঙ্গে এভাবে কখনও দেখতে পায়নি।
ওর কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বাবা এঘরে কিছুক্ষণ এসে বসে থেকে গেছেন। নানারকম প্রশ্ন করেছেন। বলেছেন, টুকুন তুমি আমাকে পিয়ানো বাজিয়ে শোনাবে না? ডাক্তারবাবু এসেছেন, তিনিও শুনতে চান।
টুকুন কেবল বলছিল, বাবা আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। সে ইচ্ছে করেই হাই তুলছে। বলছে, আমাকে তোমরা আর কষ্ট দিয়ো না।
রাতে গীতামাসি একটা কম আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। আলোটার রং কেমন তামাটে। এবং এই আলোটা না জ্বালালে, অন্যদিন টুকুনের ঘুম আসত না। আজ অন্যরকমের। সে গীতামাসিকে বলেছে—সবুজ আলোটা জ্বালিয়ে দেবে?
—সবুজ আলো জ্বাললে তুমি তো ঘুমোতে পারো না।
—তুমি দাও গীতামাসি। তামাটে রং আজ আমার ভালো লাগবে না।
টুকুন গীতামাসিকে আরও বলেছিল, এই দ্যাখো আমার বালিশের নীচে কিছু রজনিগন্ধা আছে। ওগুলো রুপোর ফুলদানিতে রেখে আমার মাথার কাছে রেখে যাও। আমার চারপাশে আরও কিছু রাখো, যাতে আমাকে আরও সুন্দর দেখায়। শেষপর্যন্ত ‘আমাকে সুন্দর দেখায়’ সে বলতে পারেনি। কেমন লজ্জা এসে গেছিল। তার এমন একটা অনুভূতি এতদিন কোথায় যে ছিল! ওর শির শির করছে শরীরটা। এবং চাদর দিয়ে গোটা শরীরটা ঢেকে রাখতে ইচ্ছা হচ্ছে। এটা যে কী হয়ে যাচ্ছে ভিতরে। ওর জল তেষ্টা পাচ্ছে। সে টিপয় থেকে হাতির দাঁতের মিনা—করা জলদানি তুলে জল খেল। তার হাত কাঁপছে। ঠোঁট কাঁপছে। ভিতরে কীসের যেন ঝড়। যেন কোথাও বাদলা দিনে সে বৃষ্টি—ভিজে এক বড় মাঠ পার হয়ে যাচ্ছে। ওর পায়ে সবুজ ঘাসের চিহ্ন। ওর চোখে—মুখে বৃষ্টির ছাট। পরনে সাদা সিল্ক লতাপাতা আঁকা নীল রংয়ের। পায়ে তেমনি আলতা। হাতের আঙুলগুলো লম্বা লম্বা, নখে নীল রংয়ের পালিশ। নখগুলো কিছুটা লম্বা, কিছুটা উজ্জ্বল, সে হাতের ওপর হাত রেখে নিজের সুন্দর হাত পা দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে যাচ্ছে। সে আর টুকুন থাকছে না। সে কল্যাণী হয়ে যাচ্ছে। সে কল্যাণী মজুমদার হয়ে যাচ্ছে। সে তার ভালো নামটা অথবা বড় হয়ে যে নামটা ব্যবহার করার কথা, কতদিন পরে মনে করতে পারছে।
টুকুন পাশ ফিরে শুল। সেই গ্রহাণুর ছোট্ট রাজপুত্রের কথা কিছুতেই মনে আসছে না। অথবা সেই মরুভূমির কথা। মরুভূমিতে যদি সেই মানুষটা এখনও তার উড়োজাহাজটা ঠিক করে উঠতে না পারে—তার খুব কষ্ট। তার বাড়ি—ঘর, যদি তার স্ত্রী থাকে—খুব একটা কষ্টের ব্যাপার—সে এখন কেবল এসব মনে করতে পারছে।
ওর আঙুলে রক্তের তাজা একটা ভাব জেগে যাচ্ছে। সে এই শরীরে মনোরম এক স্বপ্ন নিয়ে শুয়ে আছে।
সুবল আর তার কাছে এখন শুধু পাখিয়ালা নয়। সে একজন মানুষ। ওর শরীরে এক সুন্দর রাজপুত্রের বাস। সে টের পেয়েছে—এই শরীরে ঈশ্বর এমন কিছু দিয়েছেন যার সৌরভ মানুষকে বড় করে তোলে। মানুষ বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পায়। তার কাছে এই অর্থটার মানে জানা ছিল না। সুবল আজ তাকে কী যে করে দিয়ে গেল।
সুবল, সুবল এক মানুষ, লম্বা, কালো চুখ, চোখ লম্বা, নাক সামান্য চাপা। ওর ঘাড় শক্ত। পিঠ চওড়া। বুকের পাশে দুভাগ এবং দুই হাতের নীচে সামান্য বনরাজি নীলা। সে যখন স্নান করছিল—সেইসব কারুকাজ করা সুন্দর সুদৃশ্য এক শরীরে কীযে সব আকর্ষণের খাঁজ রেখে দিয়েছে।
তার বাবা একটা তাজা সিংহের ছবি একবার তুলেছিল ক্যামেরাতে। ছবিটা তার দেখতে খুব ভালো লাগত। সেই তাজা সিংহের সঙ্গে সুবলের শরীরের কোথায় যেন একটা মিল আছে।
টুকুনের চুল, জামা, পাজামা ভিজা। টুকুনকে কোথাও মেয়ে মনে হয় না। শুধু মুখে মেয়ের মতো নরম এক ছবি। যা খুব কষ্টের আর দুঃখের মনে হচ্ছিল।
কোথাও ঘণ্টা বাজছে। রাত এখন বারোটা। কোথাও রেলগাড়ির শব্দ। না, সে নিজের ভিতরেই এক রেলগাড়ি চালিয়ে দিয়েছে। গাড়িটা তাকে নিয়ে ছুটছে। গাড়িতে সে এবং সুবল। সাদা জ্যোৎস্নায় তার সুবলের হাত ধরে বেড়াতে ইচ্ছা হচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গে তার ইন্দ্রর কথা মনে হল। কাল ইন্দ্র এলে সে আর ঠিকমতো বুঝি কথা বলতে পারবে না।
গীতামাসি এসে বললেন, অনেক রাত হয়ে গেছে। তুমি শোও।
—তুমি শুয়ে পড়োগে?
—বড়বাবু কী বললেন?
বাবা বললেন, টুকুন এবার তুমি সত্যি ভালো হয়ে গেছ।
ওরা কেউ বেশিক্ষণ ছিল না। এমন একটা উত্তেজনার ভিতর বেশি সময় টুকুনকে বিরক্ত করা ঠিক না। বাড়ি থেকে চারপাশে সব মানুষের কাছে খবর পৌঁছে যাচ্ছে টুকুন ভালো হয়ে উঠছে। টুকুন কতকাল পরে পিয়ানো বাজিয়েছে। টুকুনের রক্তকণিকারা আবার উদ্যমশীল হচ্ছে।
এইভাবে এই সংসারে কোথাও কখন কীভাবে যে খরা লেগে যায়। সেটা কখনও মানুষের শরীরে, প্রকৃতির ভিতর এবং কলকারখানায় হতে পারে। সুরেশবাবু জানেন, চারপাশে যে এত ঘেরাও লকআউট এবং শ্রমিকেরা নিজেদের দাবি সম্পর্কে সচেতন—অথচ কাজ হচ্ছে না, উদ্যমশীল না হলে যা হয়ে থাকে, একটা জাতি মরে যাচ্ছে।
তিনি বেশিক্ষণ ছিলেন না। মা—মাসিরা কী যে কলরব করে গেছে! গীতামাসি বলেছে, ওর শরীর খারাপ করবে। টুকুন এত ভিড় সহ্য করতে পারবে না। আবার কেউ কেউ ভাবছে টুকুনের তো এমন নাকি আরও দুবার তিনবার হয়েছে। সুতরাং খুব একটা আশা করা ভালো না।
গীতামাসি বলল, টুকুন না ঘুমালে শরীর আবার খারাপ করবে।
—আমার ঘুম আসছে না গীতামাসি। সে দেখল পায়ের হাঁটুর ওপরে ওর ফ্রক উঠে গেছে। সে তাড়াতাড়ি শরীর ঢেকে দিতে গেল। এই হাঁটু এই বয়সে বের হয়ে থাকা কেমন সঙ্কোচের। সে বলল, আমি শাড়ি পরব গীতামাসি।
—কাল থেকে পরবে।
—না। আমি এখন পরব।
জিদ ঠিক আছে। গীতামাসি মনে মনে বিরক্ত হচ্ছিল। তবু কিছু বলার উপায় নেই। শাড়ি এলে টুকুন বলল, দরজা বন্ধ করে দিচ্ছি। তুমি যাও গীতামাসি। সে গীতামাসিকে যেন জোরজার করেই বের করে দিল। রেডিয়োটা খুলে দিল। ছায়াছবির গান হচ্ছে। সে প্রতিটি গানের সঙ্গে এখন গলা মেলাচ্ছে। সে ঘরেই আয়নার সামনে দাঁড়াল। তার কোনও কষ্ট হচ্ছে না হাঁটতে। সে যে কী করে শরীরে এমন শক্তি পাচ্ছে! এবং কখনও কখনও যেন মনে হয় সে একটা হালকা পাখির মতো এখন এই গানের সুরের সঙ্গে ভেসে বেড়াতে পারে।
সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখল। কতদিন পর সে আয়নার সামনে যেন দাঁড়াল। এতবড় আয়নায় সে কবে থেকে নিজের মুখ দেখতে ভুলে গেছিল। সহসা যেন মনে পড়ছে—মুখ না দেখলে, আয়নায় মুখ না দেখলে, কী করে বড় হয়ে যাচ্ছে বোঝা যাবে না।
সে দাঁড়িয়ে আয়নায় মুখ দেখল। ধীরে ধীরে সবুজ হালকা ফ্রকটা খুলে ফেলতে থাকল। শরীরে মাংস লাগতে চায় না। তবু সে বুকে হাত রাখল। ধীরে ধীরে হাত বুলাল। ওর কেন জানি কান্না পাচ্ছে। কেন জানি শরীরের ভিতর আশ্চর্য যে চেতনা নিয়ে বড় হবে স্বপ্ন দেখছে, সেখানে তার কিছু জন্ম নিচ্ছে না। যেন এখন থেকে সে প্রতিদিন এভাবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কেবল অপেক্ষা করা এবং স্মৃতি, কী যে স্মৃতি মানুষের—সুবল তার কাছে একটা প্রথম আদিম মানুষ, যে মানুষের আদিমতা নিয়ে সোজা সহজভাবে তাকিয়েছিল। এবং দৃশ্যটা ভাবতে কী যে ভালো লাগছে। সে যেন এমন একটা দৃশ্য ভেবে ভেবে সারারাত ভোর করে দেবে। হয়তো সকালে ফুল ফোটার মতো দেখবে, সে—ও শরীরের ভিতর ক্রমে ফুটে উঠছে। ওর ভীষণ ভালো লাগছে এভাবে ভাবতে!
এবং এসব ভাবনাই মেয়েকে এক সকালে সত্যি সত্যি বড় করে দিল। সে আয়নায় দাঁড়িয়ে এসব কী দেখছে। সে যে বড় হচ্ছে তার প্রমাণ শরীরে ভেসে উঠছে। কতকালের রাত জাগা, অথবা সুবল এলে ওকে নিয়ে পালিয়ে পালিয়ে এই হলঘরের মতো ঘরে অথবা দক্ষিণের বারান্দায় এবং কথা আছে সে যখন গান গাইবে, অথবা পিয়ানো বাজাবে, কিংবা রেডিয়োর গানের সঙ্গে গলা মেলাবে—তখন এই ঘরে কেউ থাকবে না। সে ওর খুশিমতো সুবলকে নিয়ে এক আশ্চর্য সুন্দর জগৎ তৈরি করেছে—যা সে কোনওদিন ভুলে যেতে পারবে না। ইন্দ্র আসে ঠিক, তবু ইন্দ্র এলে সে কেমন উদাসীন হয়ে যায়। কারণ ইন্দ্রের স্বভাবটা কিছুটা কেন জানি আজকাল মেয়েলি মনে হচ্ছে। বরং এই সুবল যার কিছুটা সন্ন্যাসী তরুণের মতো মুখ, সে খুব সৎ এবং সব সময় নিজের মতো করে ভাবে—যে ছোট্ট রাজপুত্রের গল্প শুনে হেসেছিল, বলেছিল—সে আর তার গ্রহাণুতে ফিরে যেতে পারবে না। পৃথিবীর গাছ পাখি ফুল ফল এমন সে আর পাবে কোথায়। কেউ এখানে এলে আর কোথাও যেতে চায় না। বড় মায়া আর ভালোবাসায় পৃথিবী মানুষকে আটকে রাখে। টুকুনের মনে হয়েছিল, সুবলই তার সেই ছোট্ট রাজপুত্র। তাকে বাদ দিয়ে কিছুতেই বাঁচতে পারে না। সুবল তার ছোট্ট গ্রহাণুতে আর ফিরে যেতে পারবে না।
