Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » এমন দিনে তারে বলা যায় || Tapas Jana

এমন দিনে তারে বলা যায় || Tapas Jana

আজ দুপুর থেকেই আকাশের মুখটা ভার হয়ে আছে। কয়েকদিন ধরেই বেশ গুমোট গরম, মেঘ হচ্ছে কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই। ঘেমে – নেয়ে সবাই ক্লান্ত। তবে আজ মনে হচ্ছে বৃষ্টিটা হবে।

বিকেল হতে হতে মেঘটা আরো গভীর হলো আর সন্ধ্যে হতে না হতেই হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি। বৃষ্টি শুরু হতে, ঘরের ভ্যাপসা ভাবটা কাটানোর জন্য, জানালা গুলো খুলে দিল শ্রীময়ী। ঘরের ভিতর ঠান্ডা একটা হালকা বাতাস ঢুকতে শুরু করল, মাটির সোদা গন্ধ ভেসে আসতে লাগল। চারিদিকটা বেশ কালো হয়ে আছে, মনে হচ্ছে বৃষ্টিটা ভালো মতোই হবে। হঠাৎ শ্রীময়ীর মনে হলো, ‘একটু বৃষ্টিতে ভিজলে কেমন হয় কিন্তু চুল ভেজাবো এই সন্ধ্যে বেলায় ?’
‘ধ্যুৎ, ভিজুক চুল একদিন, বড় জোর একটু জ্বরই তো হবে, হোক গে। বিকাশ একটু বকাবকি হয়তো করবে, একদিন না হয় একটু বকা খেয়েই নেবো।’ এইসব ভেবে ছাদে যাওয়ার জন্য দরজাটা খুলতেই দেখে বিকাশ দাঁড়িয়ে।
” তুমি? এত তাড়াতাড়ি? “
” মেঘ দেখে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পড়লাম অফিস থেকে। “
বিকাশ জুতো জোড়া কোনো মতে খুলে, ব্যাগটা সোফার ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, শ্রীময়ীর হাতটা টেনে বলল “চলো”
“কোথায় যাবো?”
“আরে চলো না।”
এইবলে একপ্রকার টানতে টানতে শ্রীময়ীকে নিয়ে, দুজনে ছাদে এসে দাঁড়ায়।

বৃষ্টি টা বেশ জোরেই পড়ছে এখন, সঙ্গে ঠান্ডা – ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। কয়েকদিন গুমোটের পরে আজকের এই বৃষ্টি অনেকটা স্বস্তির আমেজ এনে দিয়েছে। রাস্তায় ছোট ছোট ছেলেরা খেলার ছলে ভিজছে আর তারস্বরে চাচাচ্ছে, কিছু লোক আবার রাস্তার মুখের চপের দোকান এর সামনের দিকে ঝুলে থাকা ত্রিপলের নীচে এসে দাঁড়িয়েছে। ছাদ লাগোয়া, রাস্তার ধারের গাছটা থেকে ভেসে আসছে, কদম ফুলের সুন্দর একটা হালকা গন্ধ। দুজনেই হাত আকাশের দিকে তুলে এই বৃষ্টিকে স্বাগত জানাতে লাগলো। পুরো ছাদটা এদিক ওদিক ঘুরে, দুজনে পাশাপাশি এসে দাঁড়ালো ছাদের একটা কোণায়। বিকাশ কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো শ্রীময়ীর দিকে। শ্রীময়ী দেখেও, যেনো না দেখার ভান করলো। ছাদের এই কোণাটা বিকাশের খুব পছন্দের। এখান থেকে শহরের অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। আজ বৃষ্টির মধ্যে সূর্যাস্ত দেখা না গেলেও, এখান থেকে পড়ন্ত বিকালের সূর্য্য দেখতে চমৎকার লাগে। বিকাশের মনে পরে গেলো বিয়ের পরের সেই দিনগুলোর কথা। তখন অফিস থেকে ফিরে তারা এসে দাঁড়াতো ছাদের এই কোণায়। এক কাপ চায়ের সাথে ভাগ করে নিত ছোট ছোট ভালোবাসার কথা, ফেলে আসা জীবনের কথা, নতুন সংসারের খুঁটি নাটির কথা ।

ঘন কালো মেঘের মধ্যে থেকে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো নেমে আসছে শ্রীময়ীর মাথার ওপর। কানের পাশ থেকে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে, চুলগুলো ভিজে গিয়ে মাথার সাথে মিশে যাচ্ছে, বন্ধ চোখের ওপর থেকে গড়িয়ে পরা জল, স্মিত একটা হাসি মাখা ঠোঁটের উপর দিয়ে চুয়ে চুয়ে পরছে। হঠাৎ শ্রীময়ীর হাতটা আস্তে করে চেপে ধরে বিকাশ। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে এবার হেঁসে ফেলে শ্রীময়ী।
” জানো, আজ একটা টেলিপ্যাথি হয়ে গেলো”
” কি রকম ?”
” বৃষ্টি টা দেখে ভিজতে খুব ইচ্ছা করছিল। ভয় একটু হচ্ছিল তুমি বকবে ভেবে কিন্তু পরে ভাবলাম তা একটু বকা না হয় একদিন খেয়েই নেবো তোমার থেকে। এই ভেবে যেই আমি ছাদে আসতে যাবো, অমনি তুমি চলে এলে; আর তারপর … ” একটু মুচকি হাসি হেসে বিকাশ বলল
” চলো, অনেকক্ষণ ভেজা হয়েছে , এবার নীচে যাওয়া যাক ।”
দুজনে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে। বৃষ্টি এখনও পড়ছে কিন্তু গতিটা আগের থেকে একটু কম। শ্রীময়ী দুকাপ লিকার চা আর সাথে কিছু পাপড় ভেজে নিয়ে এসে বাইরের বারান্দায় এসে বসলো।
প্রথমবার চা এ চুমুক দিয়ে বিকাশ বলল ” আজ অনেকদিন পরে ভিজলাম বলো, দারুণ লাগলো। “
” সত্যি , ছেলেটা থাকলে আজকে ওকে নিয়েই ভিজতাম, বৃষ্টিতে ভেজা ওর ভীষণ পছন্দের। “
” ওর টিকিট টা কাটতে হবে আজকে, পুজোর আগে না হলে পাওয়া খুব মুশকিল।” ইত্যাদি একথা সেকথা বলতে বলতে বিকাশ রেডিও টা অন করতেই বেজে ওঠে ” ভালোবেসে সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে …”
গানটা শুনতে শুনতে শ্রীময়ীর দিকে অদ্ভুত একটা চাহনি মেলে তাকায় বিকাশ আর সেই চাহনির মানে সহজেই বুঝে যায় শ্রীময়ী।
” কি ব্যাপার বলত, ইকোনমিস্ট আজ এত রোমান্টিক? কারোর প্রেমে টেমে পড়লে নাকি কলেজে? ” বলে হো হো করে হাসতে থাকে শ্রীময়ী।

একটু আরমোড়া ভেঙে ” না গো ম্যাডাম, সে আর পরা হলো কই বলো। ইউনিভার্সিটির কয়েকটা বছর বাদ দিলে, রামকৃষ্ণ মিশনের হোস্টেলে কে আর প্রপোজ করতে আসবে বলো। ভাগ্যক্রমে তোমাকে বাবা – মা খুঁজে পেলো তাই, না হলে তো বোধ হয় বিয়েটাই আর হতো না”, বলে হাসতে থাকে বিকাশ।
” আচ্ছা, তোমাকে কেউ বা তুমি কাওকে …? ” চায়ে চুমুক দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করে বিকাশ।
” না, না, আমার সেইরকম কিছু ছিল না”
” ‘সে রকম’ ছিল না তো, কিরকম ছিল একটু শুনি।”
” ধ্যাৎ, বাজে কথা বলো না তো। উঠি আমার অনেক কাজ আছে।”
শ্রীময়ী উঠতে যাবে, হাতটা ধরে টেনে বসায় বিকাশ।

শ্রীময়ী আর বিকাশের বিয়ে হয়েছে প্রায় কুড়ি বছর। শ্রীময়ী কলকাতার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতো, ছেড়ে দিয়েছে প্রায় বছর পাঁচেক হলো। এতদিনে কোনোদিন বিকাশ এই প্রশ্নটা করেনি শ্রীময়ীকে। কিন্তু হঠাৎ আজ কেনো? প্রায় কুড়ি বছরের সুখের সংসার তাদের। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা যথেষ্ট গভীর। ‘কিছু ছিল না ‘ সে তো বললো কিন্তু কথাটা বলে কেমন যেন একটু খটকা লাগলো নিজের মধ্যেই। কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজেকে একটু গুটিয়ে নিল শ্রীময়ী।

মনে পরে গেলো সুবিমল এর কথা। একই সাথে তারা ক্লাস ইলেভেন এ ভর্তি হয়েছিল মলয় বাবুর কোচিং এ অ্যাকাউন্টেন্সি শিখতে। তারপর সেখান থেকে গোয়েঙ্কা কলেজ তারপর ইউনিভার্সিটি। সুবিমল খুব ভালো ছেলে ছিল, ভীষণ নম্র স্বভাবের, মিতভাষী । প্রথম দিকটা পড়াশোনা একদমই করতো না কিন্তু শ্রীময়ীই ওকে বলা যেতে পারে তৈরি করে দিয়েছিল। ইউনিভার্সিটির পরে ও চলে যায় বিদেশে ম্যানেজমেন্ট করতে আর শ্রীময়ী চলে আসে বর্ধমানে। প্রথম দিকে কিছু চিঠি লেখালিখি হতো বটে কিন্তু সেটা বেশীদিন চলেনি। শ্রীময়ী দুটো/তিনটে চিঠি লিখেছিল কিন্তু আর উত্তর না পাওয়ায়, অভিমানে সেও বন্ধ করে দেয়। অনেকগুলো বছর পরে আবার ফেসবুকে যোগাযোগ হয় দুজনে। তারপর ফোনে দু একবার কথা হয়েছে কিন্তু তা খুবই সামান্য। খুব সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারত সুবিমল। পরীক্ষার আগে যখন জয়েন্ট স্টাডি করতে করতে মাথাটা ভারী হয়ে আসতো তখন ঐ বাঁশির সুর একটা আলাদা শান্তি এনে দিত, মনটা কে হালকা করে দিত। কথা কম বলতো বলে, আমরা বন্ধুরা অনেক খ্যাপাতাম ওকে। এতটাই মুখচোরা ছিল যে লুকিয়ে লুকিয়ে, আড়চোখে আমাকে দেখত কিন্তু মুখে কখনই কোন কথা বলতো না। একদিন মনে মনে স্থির করলাম যে ওতো মুখ ফুটে বলবে না তার থেকে বরং আজকে আমিই ওকে প্রপোজ করবো। রেজাল্ট বেরনোর পর, আমি একদিন ওকে ডাকলাম আউটরাম ঘাটে, বাঁশি শুনবো বলে। যখন আমি কথাটা পারতে যাবো ঠিক তক্ষুনি ওর ফোনটা বেজে ওঠে, ওর মায়ের ফোন। হন্তদন্ত হয়ে চলে যায় ও। ওর বাবার একটা হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল ঐদিন। তার কিছুদিন পরেই শ্রীময়ী চলে যায় বর্ধমান। আর যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি। যেদিন আমাদের লাস্ট দেখা হয়েছিল সেদিনকার বিকাল টাও ছিল একইরকম।

” আর এক কাপ চা হবে নাকি ? “
কোনো উত্তর করে না শ্রীময়ী।
” এই শুনছো “, বলে একটু ঝাঁকায় বিকাশ।
শ্রীময়ী সেই ঝাঁকুনিতে হুড়মুড়িয়ে তার ফেলে আসা কলেজ জীবন থেকে বাস্তবে এসে দাঁড়ায়। ” কী? কী বলেছিলে? “
” এক কাপ চা হবে ? “
” হ্যাঁ – হ্যাঁ, আমি করে আনছি”, বলে শ্রীময়ী উঠতে যাবে; এমন সময় বিকাশ শ্রীময়ীর হাত দুটো চেপে ধরে।
” কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে? “
” কোথায় যাবো? এখানেই তো বসে আছি। কী সব বলো না ! “
একটু মুচকি হেসে বিকাশ বলে, ” একটু সাহস করে বলেই দাওনা, হারাবার তো কিছু নেই, তাহলে ভয় কী।” এই বলে বিকাশ চা করতে ওঠে আর ঠিক তখনই FM এ বেজে ওঠে ” এমন দিনে তারে বলা যায়/ এমনই ঘন ঘোর বরিষায়…”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *