একটা হারিয়ে যাওয়া গল্প…
তিন বছরের ছোট্ট পুতুলের মতো মেয়ে প্রিয়া। সেই থেকে কেঁদেই চলেছে… রানি দিদির কাছে মেয়েকে রেখে রোজ ডিউটি তে যায় অনুসুয়া। একটানা পনেরো দিন কাজের পর তিনদিনের ছুটি। মায়ের পায়ের শব্দ শুনতেই, টলোমলো পায়ে ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় কোলে। রানি দি তাকে একপ্রকার জোর করে নিয়ে যায় পাশের ঘরে। মেয়ের কান্না দেখে মায়ের বুকটা ফেটে যায়..। বড্ড অসহায় লাগে, সে যে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে পারেনা তার সোনা কে। অনুসুয়া সব কিছু স্যানিটারি করে স্নান ঘরে গিয়ে সাওয়ারের নিচে ভিজতে থাকে।চোখের নোনা জল, সাবানের ফেনায় বাষ্পীভূত…! মনে না করতে চাইলেও মনে পড়ে রনিতের কথা, রনির হাসি আর যা কিছু…সব মিথ্যে মনে হয় আজকাল। অনেকদিনের বন্ধুত্ব পরিনতি পায় ভালোবাসায়। বিয়ের পর সন্তান, তারপর থেকেই বাড়তে থাকে অবহেলা, উপেক্ষা, আর অবিশ্বাস… যেহেতু নাইট ডিউটি করে রাত ভোর হলে সে বাড়ি ফিরে আসে … শেষমেশ আচমকা রনিতের বিশ্বাসঘাতকতা অনসুয়ার জীবনের মোর ঘুরে যায়…!
অন্ধকার থেকে মুক্তির পথ খুঁজে নিতেই, উত্তর পূর্ব অঞ্চলের মনিপুর রাজ্য থেকে..রনিতে হাত ধরেই কোলকাতা শহরে আসা। অচেনা শহরে সে একা হয়েও স্রোতের প্রতিকূলে ভাসতে পারার নামই যে জীবন…সময়ের সাথে শিখেছিল। যাকে অগাধ বিশ্বাস করতো, সেই রনিত কিনা.।আর ভাবতে চায়না ..সদা হাস্যমুখী অনুসুয়া, সে যে মা.. মেয়েকে উপযুক্ত পরিবেশে মানুষ করাই তার এখন প্রধান কর্তব্য।
স্নানের পর এক কাপ চা আর মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করছে… ওমনি দরজায় বেল। বাড়িওয়ালা এসে বলে গেল… শোন মেয়ে, “তুমি এবার ঘর দেখে নাও… আমি আর চিনা মেয়ে বাড়ি ভাড়া দেবো না”.. কি জ্বালায় পড়েছি। অনুসুয়া অবাক হয়! সে বা তার পূর্ব পুরুষ কোনদিন যে চিন দেশ দেখেনি! কি ভাবে সে চিনা হলো..? বাড়িওয়ালা তাকে তিনদিন সময় দিয়েছে। হাতে পায়ে ধরে সে আরো সাত দিন সময় নিলো। দিনের মধ্যে মাত্র কয়েক সেকেন্ড মেয়ের আদুরে গলা ও রানি দির সাথে কথা বলে আবার নেমে পড়ে নিখাদ লড়াইয়ের কাজে। এক অক্লান্ত যুদ্ধে মগ্ন তারা। কর্তব্য যখন নাম ধরে ডাক দেয়, সাড়া দেওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না তাদের। এখন সে প্রায় এক মাসের মতো বাড়ি যেতে পারবে না.. এরপর তাকে থাকতে হবে টানা ১৫ দিন কোয়ারেন্টাইনে… সহকর্মী মালতীর কাছে সে ডুকরে কেঁদে ওঠে… কি করবে ভেবে কুল পায় না… বেঁচে থাকার জন্য তার এই চাকরি যে ভীষণ দরকার… তার যদি করোনা হয়ে যায়, ওই এক রত্তির মেয়ের তবে কি হবে…? মালতী কি বলবে ভেবে পায় না… বললো ভাবিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
মালতী অসমে ফিরে যাবে আপনজনদের কাছে। কোলকাতা শহরের যে সমস্ত বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান আছে,সেখানে কর্মরত প্রায় তিনশতাধিক সেবিকা প্রায় সবাই ফিরে যাচ্ছে আপন আপন গৃহে। ভারতের উত্তর পূর্ব অঞ্চলের অসম, মনিপুরী, কামতাপুরী রাজবংশী, এরা সব জনজাতির মিশ্রনে দেহের গঠন খানিকটা মঙ্গোলিয় মতোন। এরা অদ্ভুত এক পরিচয়হীনতায়, ভুগছে। চলে যেতে চায় .. কিছুই চায় না, শুধু চায় নিজেদের মতো করে একটু বাঁচতে। এমন কর্তব্যপরায়ন, দায়িত্বশীল হওয়া স্বত্ত্বেও এরা পেলোনা জীবনের নিরাপত্তা আর প্রাপ্য সম্মান। করোনা প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে কাজের সময়, পর্যাপ্ত পিপিই অভাব, তার সঙ্গে সংক্রামণের আতঙ্ক। প্রায় বারো থেকে চোদ্দো ঘন্টা কিছু না খেয়ে, শৌচালয়ে না গিয়ে… অক্লান্ত যুদ্ধের পর ভাড়া ঘরে ফিরে আতঙ্কিত বাড়িওয়ালার কটাক্ষের স্বীকার হতে হয়। এ রোজকার ঘটনা। প্রতিবাদের জবাব আসে নীরব প্রস্থানের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু অনুসুয়ার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। মা বাবা নেই.. মেয়ে ছাড়া ত্রিভুবনে তার যে আপনার বলতে আর কেউ নেই। তাকে এই কোলকাতা শহরে দাঁতে দাঁত চিপে পড়ে থাকতে হবে, মেয়ের জন্য এই লড়াই তাকে একাই লড়তে হবে। “বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা”…।
অনুসুয়া সেই মেয়ে যে রোগশয্যায় রুগী কে আশ্বাস দেয়, বাঁচার স্বপ্ন দেখায়, লড়াই করে নিজের সাধ্যের অতীতে গিয়ে। সেই অনুসুয়াকে করোনা ছাড়লো না। কয়েক দিনের মধ্যেই তার জ্বর আর বমি… তাকে কোয়ারেন্টাইন রাখা হলো, রিপোর্ট পজেটিভ… অন্য ওয়ার্ডে পঠিয়ে দিলো ওরা… ধীরে ধীরে সে আরো দুর্বল,ভীষণ দুর্বল…আধো ঘুমের ঘোরে চোখ বন্ধ করে অনুসুয়া স্বপ্ন দেখলো….মনিপুরী গ্রাম সেনাপতি…পাহাড় আর জঙ্গল পেরিয়ে, ফুলের দেশে স্বর্গের নন্দনকাননে. ..মেয়ের হাত ধরে ছুটতে ছুটতে এক আলোর গোলোকে প্রবেশ করছে… তার বাবা মা তাকে দেখে হাসছে! তাকে ডাকছে! কিন্তু সেই জায়গাটা চিনতে পারলো না। ধীরে ধীরে দীপশিখা চিরতরে নিভে গেলে…অনুসুয়ার কি হলো কেউ জানতেও পারলো না, দু ফোটা অশ্রুও কেউ ফেললো না।
নীরবে একটা গল্প শেষ হয়ে গেল….।।
I salute all the nurses of the world….
