Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আমাদের মেইল করুন - banglasahitya10@gmail.com or, contact@banglasahitya.net অথবা সরাসরি আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » অশ্বত্থামা হত ইতি || Shibram Chakraborty

অশ্বত্থামা হত ইতি || Shibram Chakraborty

অডিও হিসাবে শুনুন

অশ্বত্থামা হত ইতি

পাশের বাড়ি বেরিবেরি হওয়ার পর থেকেই মন খারাপ যাচ্ছিল। পাশের বাড়ির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক যে ছিল, তা নয়, সম্পর্ক হবার আশঙ্কাও ছিল না, কিন্তু বেরিবেরির সঙ্গে সম্পর্ক হতে কতক্ষণ? যে বেপরোয়া ব্যারাম কোন দেশ থেকে এসে এতদূর পর্যন্ত এগুতে পেরেছে, তার পক্ষে আর একটু কষ্ট স্বীকার করা এমন কী কঠিন!

কদিন থেকে শরীরটাও খারাপ বোধ করতে লাগলাম। মনের মধ্যে স্বগতোক্তি শুরু হয়ে গেল—‘ভালো করছ না হে, অশ্বিনী! সময় থাকতে ডাক্তার-টাক্তার দেখাও।’

মনের পরামর্শ মানতে হল। ডাক্তারের কাছেই গেলাম। বিখ্যাত গজেন ডাক্তারের কাছে। আমাদের পাড়ায় ডাক্তার এবং টাক্তার বলতে একমাত্র তাঁকেই বোঝায়।

তিনি নানারকমে পরীক্ষা করলেন, পালসের বিট গুনলেন, ব্লাড প্রেশার নিলেন, স্টেথোস্কোপ বসালেন, অবশেষে নিছক আঙুলের সাহায্যে বুকের নানাস্থান বাজাতে শুরু করে দিলেন। বাজনা শেষ হলে বললেন, ‘আর কিছু না, আপনার হার্ট ডায়ালেট করেছে।’

‘বলেন কী গজেনবাবু?’—আমার পিলে পর্যন্ত চমকে যায়।

তিনি দারুণ গম্ভীর হয়ে গেলেন—‘কখনো বেরিবেরি হয়েছিল কি?’

‘হুঁ। হয়েছিল। পাশের বাড়িতে।’ ভয়ে ভয়ে বলতে হল। ডাক্তারের কাছে ব্যারাম লুকিয়ে লাভ নেই!

‘ঠিকই ধরেছি। বেরিবেরির আফটার-এফেক্টই এই।’

‘তা হলে কী হবে?’ আমি অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়লাম—‘তা হলে কি আমি আর বঁাচব না?’

‘একটু শক্ত বটে। সঙ্গিন কেস। এরকম অবস্থায় যেকোনো মুহূর্তে হার্ট ফেল করা সম্ভব।’

‘অ্যাঁ! বলেন, কী গজেনবাবু! না, আপনার কোনো কথা শুনব না। আমাকে বঁাচাতেই হবে আপনাকে।’—করুণ কন্ঠে বলি, ‘তা যে করেই পারেন আমি না বেঁচে থাকলে আমাকে দেখবে কে? আমাকে দেখবার আর কেউ থাকবে না যে! কেউ আমার নেই।’

পাঁচ টাকা ভিজিট দিয়ে ফেললাম। ‘আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখা যাক’—গজেন ডাক্তার বললেন, ‘একটা ভিজিটালিসের মিক্সচার দিচ্ছি আপনাকে। নিয়মিত খাবেন, সারলে ওতেই সারবে।’

আমি আর পাঁচ টাকা ওঁর হাতে গুঁজে দিলাম—‘তবে তাই কয়েক বোতল বানিয়ে দিন আমায়, আমি হরদম খাব।’

‘না, হরদম নয়। দিনে তিন বার। আর, কোথাও চেঞ্জে যান। চলে যান—পশ্চিম-টশ্চিম। গেলে ভালো হয়। সেখানে গিয়ে আর কিছু নয়, একদম কমপ্লিট রেস্ট।’

প্রাণের জন্য মরিয়া হতে বেশি দেরি লাগে না মানুষের। বললাম, ‘আচ্ছা, তাই যাচ্ছি না-হয়। ডালটনগঞ্জে মামার বাড়ি, সেখানেই যাব।’

‘কমপ্লিট রেস্ট, বুঝেছেন তো? হাঁটাচলা, কি ঘোরাফেরা, কি দৌড়ঝাঁপ, কি কোনো পরিশ্রমের কাজ—একদম না! করেছেন কি মরেছেন—যাকে বলে হার্ট ফেল—দেখতে-শুনতে দেবে না—সঙ্গে সঙ্গে খতম। বুঝেছেন তো অশ্বিনীবাবু?’

অশ্বিনীবাবু হাড়ে হাড়ে বুঝেছেন, ডাক্তার দেখাবার আগে বুঝেছেন এবং পরে বুঝেছেন— যেদিনই পাশের বাড়িতে বেরিবেরির সূত্রপাত হয়েছে, সেদিনই তিনি জেনেছেন তাঁর জীবনসংশয়। তবু গজেনবাবুকে আশ্বস্ত করি, ‘নিশ্চয়! পরিশ্রম না করার জন্যই যা পরিশ্রম, তাই করব। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। এখন থেকে অলস হবার জন্যই আমার নিরলস চেষ্টা থাকবে।’ এই বলে আমি, ওরফে অশ্বিনীবাবু, বিদায় নিলাম।

মামারা থাকেন ডালটনগঞ্জে। সেখানে তাঁদের খেতখামার। মোটা বেতনের সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে জমিটমি কিনে চাষবাস নিয়ে পড়েছেন। বেকারসমস্যা সমাধানের মতলব ছোটোবেলা থেকেই মামাদের মনে ছিল, কিন্তু চাকরির জন্য তা করতে পারছিলেন না। চাকরি করলে আর মানুষ বেকার থাকে কী করে? সমস্যাই নেই তো সমাধান করবেন কীসের? অনেক দিন মনোকষ্টে থেকে অবশেষে তাঁরা চাকরিই ছাড়লেন।

তারপরেই এই চাষবাস। কলকাতার বাজারে তাঁদের তরকারি চালান আসে। সরকারি-গর্বে অনেককে গর্বিত দেখেছি, কিন্তু তরকারির গর্ব কেবল আমার মামাদের! একচেটে ব্যাবসা, অনেক দিন থেকেই শোনা ছিল, দেখার বাসনাও ছিল; এবার এই রোগের অপূর্ব সুযোগে ডালটনগঞ্জে গেলাম, মামার বাড়িও যাওয়া হল, চেঞ্জেও যাওয়া হল এবং চাই কী, তাঁদের তরকারির সাম্রাজ্য চোখেও দেখতে পারি, চেখেও দেখতে পারি হয়তো-বা।

মামারা আমাকে দেখে খুশি হয়ে ওঠেন। ‘বেশ বেশ, এসেছ যখন, তখন থাকো কিছুদিন।’ বড়োমামা বলেন।

‘থাকবই তো!’ পায়ের ধুলো নিতে নিতে বলি—‘চেঞ্জের জন্যই তো এলাম!’

মেজোমামা বলেন, ‘এসেছ, ভালোই করেছ, এতদিনে পটলের একটা ব্যবস্থা হল।’

ছোটোমামা সায় দেন, ‘হ্যাঁ, একটা দুর্ভাবনাই ছিল, যাক, তা ভালোই হয়েছে।’

তিন মামাই যুগপৎ ঘাড় নাড়তে থাকেন।

বুঝলাম, মামাতো ভাইদের কারও গুরুভার আমায় বহন করতে হবে। হয়তো তাদের পড়াশোনার দায়িত্ব নিতে হতে পারে। তা বেশ তো, ছেলেপড়ানো এমন কিছু শক্ত কাজ নয় যে, হার্ট ফেল হয়ে যাবে। গুরুতর পরিশ্রম কিছু না করলেই হল; টিউশনির যেগুলো শ্রমসাধ্য অংশ—পড়া নেওয়া, ভুল করলে শোধরাবার চেষ্টা করা, কিছুতেই ভুল না শোধরালে শেষে পাখাপেটা করা এবং মাস ফুরোলে প্রাণপণে বেতন বাগানো, এখন থেকেই এগুলো বাদ দিতে সতর্ক থাকলাম। হ্যাঁ, সাবধানই থাকব, রীতিমতোই, যাতে কান মলবার কষ্টস্বীকারটুকুও না করতে হয়, বরঞ্চ প্রশ্রয়ই দেব পটলকে—যদি পড়াশোনায় ফাঁকি দিতে থাকে, কিংবা কাঠফাটা রোদ—চেগে উঠলেই ওর যদি ডাণ্ডাগুলি খেলার প্রবৃত্তি জেগে ওঠে, ভেগে পড়তে চায়, আমার উৎসাহই থাকবে ওর তরফে। ভ্রাতৃপ্রীতি আমার যতই থাক, প্রাণের চেয়ে পটল কিছু আমার আপনার নয়, তা মামাতো পটলই কী, আর মাসতুতো পটলই কী!

মামাতো ভাইদের সঙ্গে মোলাকাত হতে দেরি হল না। তিনটে ডানপিটে বাচ্চা—মাথাপিছু একটি করে—গুনে দেখলাম।—এর মধ্যে কোনটি পটল, বাজিয়ে দেখতে হয়। আলাপ শুরু করা গেল—‘তোমার নাম কী খোকা?’

‘রাম ঠনাঠন।’

‘অ্যাঁ! সেআবার কী?’ পরিচয়ের সূত্রপাতেই পিলে চমকে যায় আমার।

দ্বিতীয় জনের অযাচিত জবাব আসে—‘হামার নাম ভটরিদাস হো!’

আমার তো দম আটকাবার জোগাড়!—বাঙালির ছেলের এসব আবার কী নাম! এমন বিদঘুটে—এরকম বদনাম কেন বাঙালির?

বড়োমামা পরিষ্কার করে দেন—‘যে দেশে থাকতে হবে, সেই দেশের দস্তুর মানতে হবে না? তা নইলে বড়ো হয়ে এরা এখানকার দশজনের সাথে মিলেমিশে খাবে কীসে, মানিয়ে চলবেই-বা কী করে?’

মেজোমামা বলেন—‘এসব বাবা, ডালটনি নাম। যে-দেশের যা দস্তুর!’

ছোটোমামা বলেন—‘এখানকার সবাই বাঙালিকে বড়ো ভয় করে। আমরা ব্যাবসা করতে এসেছি যুদ্ধ করতে আসিনি তো! তাই এদের পক্ষে ভয়ংকর বাঙালি নাম সব বাদ দিয়ে এদেশি সাদাসিদে নাম রাখা।’

তৃতীয়টিকে প্রশ্ন করতে আমার ভয় করে—‘তুমিই তবে পটল?’

ছেলেটির দিক থেকে একটা ঝটকা আসে—‘অহঃ! হামার নাম গিধৌড়বা!’

হার্ট ফেলের একটা বিষম ধাক্কা ভয়ানকভাবে কেটে যায়। পকেট থেকে বের করে চট করে এক দাগ ভিজিটালিস খেয়ে নিই—‘পটল তবে কার নাম?’

তিন জনেই ঘাড় নাড়ে—‘জানহি না তো!’

‘তুমহারা নাম কেয়া জি?’ জিগেস করে ওদের একজন!

‘আমার নাম? আমার নাম?’ আমতা আমতা করে বলি, ‘আমার নাম শিব্রাম ঠনাঠন!’

যস্মিন দেশে যদাচারঃ। ডালটনগঞ্জের ডালভাঙা কায়দায় আমার নামটার একটা হিন্দি সংস্করণ বার করতে হয়।

ভটরিদাস এগিয়ে এসে আমার হাতের শিশিটি হস্তগত করে—‘সিরপ হ্যায় কেয়া?’

তিনটি বোতল ওদের তিন জনের হাতে দিই—মেজোমামা একটি লেবেলের উপর দৃকপাত করে বলেন, ‘সিরপ নেহি। ভিজটলিস হ্যায়? খাও মত—তাকক উপর রাখ দেও।’

ভটরিদাস রাম ঠনাঠনকে বুঝিয়ে দেয়—‘সমঝা কুছ? ইসসে হি ডিজ লনঠন বনতি। এহি দবাই সে।’

বড়োমামা বলেন, ‘শিবু, সেই কাল বিকেলে গাড়িতে উঠেছ, খিদে পেয়েছে নিশ্চয়? কিছু খেয়েটেয়ে নাও আগে।’

ত্র্যম্বক ওঝার ডাক পড়ল। ছোটোমামা আমার বিস্মিত দৃষ্টির জবাব দেন—‘তোমার দাদামশায়ের সঙ্গে মামিরা সব তীর্থে গেছেন কিনা, তাই দিন কত-র জন্য এই মহারাজকে কাজ চালানোর মতন রাখা হয়েছে।’

তেইশটা চাপাটি আর কুছ তরকারি নিয়ে মহারাজের আবির্ভাব হয়। তিনটি চাপাটি বা চপেটাঘাত সহ্য করতেই প্রাণ যায় যায়, তারপর কিছুতেই আর টানতে পারি না। মামারা হাসতে থাকেন। অগত্যা লজ্জায় পড়ে আর আড়াইটা কোনোরকমে গলাধঃকরণ করি। টেনেটুনে পাঠাই গলার তলায়, ঠেলেঠুলে।

মামা ভয়ানক হাসেন—‘তোমার যে দেখি পাখির খোরাক হে!’

আমি বলি, ‘খেতে পারতাম। কিন্তু পরিশ্রম করা আমার ডাক্তারের নিষেধ কিনা।’

আঁচিয়ে এসে লক্ষ করি, আমার ভুক্তাবশেষ সেই সাড়ে সতেরোটা চাপাটি ফ্রম রাম ঠনাঠন টু গিধৌড় চক্ষের পলকে নি:শেষ করে এনেছে। এই দৃশ্য দেখাও কম শ্রমসাধ্য নয়, তৎক্ষণাৎ আর এক দাগ ভিজিটালিস খেতে হয়।

বড়োমামা বলেন, ‘চলো একটু বেরিয়ে আসা যাক। নতুন দেশে এসেছ, জায়গাটা দেখবে না?’ বলে আমাকে টেনে নিয়ে চলতে থাকেন।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেরুতে হয়। ডাক্তারের মতে বিশ্রাম দরকার—একেবারে কমপ্লিট রেস্ট। কিন্তু মামারা রেস্ট কাকে বলে, জানেন না, আলস্য ওঁদের দু-চক্ষের বিষ—নিজেরা অলস তো থাকবেনই না, অন্য কাউকে থাকতেও দেবেন না।

সারা ডালটনগঞ্জটা ঘুরলাম, অনেক দ্রষ্টব্য জায়গা দেখা গেল, যা দেখবার কোনো প্রয়োজনই আমার ছিল না কোনোদিন। পুরো সাড়ে তিন ঘণ্টায় পাক্কা এগারো মাইল ঘোরা হল। প্রতি-পদক্ষেপেই মনে হয়, এই বুঝি হার্ট ফেল করল। কিন্তু কোনোরকমে আত্মসংবরণ করে ফেলি। কী করে যে করি, আমি নিজেই বুঝতে পারি না।

বাড়ি ফিরে এবার বিয়াল্লিশটা চাপাটির সম্মুখীন হতে হয়। পাখির খোরাক বলে আমাকেই সব থেকে কম দেওয়া হয়েছে। পরে খাব জানিয়ে এক ফাঁকে ওগুলো ছাদে ফেলে দিয়ে আসি, একটু পরে গিয়ে দেখি, তার চিহ্নমাত্রও নেই। পাখির খোরাক তাহলে সত্যিই!

খাবার পর শোবার আয়োজন করছি, বড়োমামা বলেন, ‘আমাদের খেতখামার দেখবে চলো।’

ছোটোমামা বলেন, ‘দিবানিদ্রা খারাপ। ভারি খারাপ! ওতে শরীর ভেঙে পড়ে।’

আমি বলি, ‘আজ আর না, কাল দেখব।’

‘তবে চলো, দেহাতে গিয়ে আখের রস খাওয়া যাক, আখের খেত দেখেছ কখনো?’

আখের রসের লালসা ছিল, জিজ্ঞাসা করলুম, ‘খুব বেশি দূরে নয় তো?’

‘আরে, দূর কীসের? কাছেই তো—দু-কদম মোটে।’

ক-দমে কদম হয় জানিনে, পাক্কা চোদ্দো মাইল হাঁটা হল, চোখে কদম ফুল দেখছি! তবু শুনি—‘এই কাছেই। এসে পড়লাম বলে।’

প্রাণের আশা ছেড়েই দিয়েছি, মামার পাল্লায় পড়লে প্রাণ প্রায়ই থাকে না—রামায়ণ-মহাভারতে তার প্রমাণ আছে।

আরও দু-মাইল পরে দেহাত। আখের রস খেয়ে দেহ কাত করলাম। আমার অবস্থা দেখে মামাদের করুণা হল বোধ হয়, দেহাতি রাস্তা ধরে এক্কা যাচ্ছিল একটা, সেটাকে ভাড়া করে ফেললেন।

এক্কায় কখনো চড়িনি; কিন্তু চাপবার পর মনে হল, এর চেয়ে হেঁটে ফেরাই ছিল ভালো। এক্কার এমনি দাপট যে, প্রতি মুহূর্তেই আমি আকাশে উদ্ধৃত হতে লাগলাম। এ যাত্রায় এতক্ষণ টিকে থাকলেও এর ধাক্কায় এবার গেলাম নির্ঘাত, সজ্ঞানে এক্কাপ্রাপ্তির আর দেরি নেই—টের পেলাম বেশ।

বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে গেল—এক্কায় যতক্ষণ এসেছি, তার দুই-তৃতীয়াংশ সময় আকাশে-আকাশেই ছিলাম, একথা বলতে পারি; কিন্তু সেই আকাশের ধাক্কাতেই সারা গায়ে দারুণ ব্যথা! হাড়পাঁজরা যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে ঝরঝরে হয়ে গেছে বোধ হতে লাগল। তেত্রিশটা চাপাটির মধ্যে সওয়া তিনখানা আত্মসাৎ করে শুয়ে পড়লাম। কোথায় রামলীলা হচ্ছিল, মামারা দেখতে গেলেন। আমায় সঙ্গে যেতে সাধলেন, বার বার অভয় দিলেন যে এক কদমের বেশি হবে না, আমি কিন্তু ঘুমের ভান করে পড়ে থাকলাম। ডালটনি ভাষায় এক কদম মানে যে একুশ মাইল, তা আমি ভালোরকমই বুঝেছি।

আলাদা বিছানা ছিল না, একটিমাত্র বড়ো বিছানা পাতা, তাতেই ছেলেদের সঙ্গে শুতে হল। খানিকক্ষণেই বুঝতে পারলাম যে হ্যাঁ, সৌরজগতেই বাস করছি বটে—আমার আশেপাশে তিনটি ছেলে যেন তিনটি গ্রহ! তাদের কক্ষ পরিবর্তনের কামাই নেই। এই যেখানে একজনের মাথা দেখি, একটু পরেই দেখি, সেখানে তার পা; খানিক বাদে মাথা বা পা-র কোনোটাই দেখতে পাই না। তার পরেই অকস্মাৎ তার কোনো একটার সঙ্গে আমার দারুণ সংঘর্ষ লাগে। চটকা ভেঙে যায়, আহত স্থানের শুশ্রূষা করতে থাকি কিন্তু ওদের কারুর নিদ্রার বিন্দুমাত্রও ব্যত্যয় ঘটে না। ঘুমের ঘোরে যেন বেঁা বেঁা করে ঘুরছে ওরা—আমিও যদি ওদের সঙ্গে ঘুরতে পারতাম, তা হলে বোধ হয় তাল বজায় থাকত, ঠোকাঠুকি বঁাধার সম্ভাবনাও কমত কিছুটা। কিন্তু মুশকিল এই ঘুরতে গেলে আমার ঘুমানো হয় না, আর ঘুমিয়ে পড়লে ঘোরার কথা একদম ভুলে যাই।

ছেলেগুলোর দেখছি পা দিয়েও বক্সিং করার বেশ অভ্যেস আছে এবং সব সময়ে ‘নট-টু-হিট বিলো-দি-বেল্ট’-এর নিয়ম মেনে চলে বলেও মনে হয় না। নাক এবং দাঁত খুব সতর্কভাবে রক্ষা করছি—ওদের ধাক্কায় কখন যে দেহচ্যুত হয়, কেবলই এই ভয়। ঘুমানোর দফা তো রফা!

ভাবছি, আর ‘চৌকিদারি’তে কাজ নেই, মাটিতে নেমে সটান ‘জমিদার’ হয়ে পড়ি। প্রাণ হাতে নিয়ে এমন করে ঘুমানো যায় না। পোষায় না আমার। এদিকে দুটো তো বাজে। নীচে নেমে শোবার উদ্যোগে আছি, এমন সময়ে নেপথ্যে মামাদের শোরগোল শোনা গেল—রামলীলা দেখে আড়াইটা বাজিয়ে ফিরছেন এখন। অগত্যা মাটি থেকে পুনরায় প্রোমোশন নিতে হল বিছানায়।

মামারা আমাকে ঘুম থেকে জাগালেন, অর্থাৎ তাঁদের ধারণা যে, জাগালেন। তারপর ঝাড়া দু-ঘণ্টা রামলীলার গল্প চলল। হনুমানের লম্ফঝম্প তিন মামাকেই ভারি খুশি করেছে—সে-সমস্তই আমাকে শুনতে হল। ঘুমে চোখের পাতা জড়িয়ে আসছিল, কেবল হুঁ, হাঁ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ এক মামা প্রশ্ন করে বসলেন—‘হনুমানের বাবা কে জান তো শিব্রাম?’

ঘুমের ঝোঁকে ইতিহাসটা ঠিক মনে আসছিল না। হনুমান প্লুরাল হলে মামাদের নাম করে দিতাম, সিঙ্গুলার অবস্থায় কার নাম করি? সংকোচের সঙ্গে বললাম ‘জাম্বুবান নয়তো?’

বড়োমামা বললেন, ‘পাগল!’

মেজোমামা বললেন, ‘যা আমরা নিশ্বাস টানছি, তাই।’

‘ওঃ! এতক্ষণে বুঝেছি!’—হঠাৎ আমার বুদ্ধি খুলে যায়, বলে ফেলি চট করে, ‘ও! যত সব রোগের জীবাণু!’

বড়োমামা আবার বলেন, ‘পাগলা!’

‘উহুঁহুঁ!’—মেজোমামাও আমায় দমিয়ে দেন, বলেন, ‘না ওসব নয়। জীবাণুটিবানু না।’

‘জীবাণুটিবানুও না? তা হলে কী তবে? আমার তো ধারণা ছিল ওইসব প্রাণীরাই আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসে যাতায়াত করে।’—আমি দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলি।

ছোটোমামা বলেন, ‘পবনদেব।’

সাক্ষাৎ পবনদেবকে নিশ্বাসে টানছি এই কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়েছি, কিংবা হয়তো ঘুমাইনি। বড়োমামা আমাকে টেনে তুললেন—‘ওঠো, ওঠো; চারটে বেজে গেছে, ভোর হয়ে এল। মুখ-হাত ধুয়ে নাও, চলো বেরিয়ে পড়ি। আমরা সকলেই প্রাতভ্রমণ করি রোজ। তুমিও বেড়াবে আমাদের সঙ্গে।’

মেজোমামা বললেন, ‘বিশেষ করে চেঞ্জে এসেছ যখন! হাওয়া বদলাতেই এসেছ তো?’

ছোটোমামাও সায় দেন—‘ডালটনগঞ্জের হাওয়াই হল আসল! হাওয়া খেতে এসে হাওয়াই যদি না খেলে, তবে আর খেলে কী?’

চোখে-মুখে জলের ছিটে দিয়ে মামাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। সাড়ে সাত মাইল হাঁটবার পর বড়োমামা দু-ধারে যতদূর যায়, বাহু বিস্তার করলেন—‘এই সব—সবই আমাদের জমি।’

—‘যতদূর চোখ যায়, জমি!’ কেবল জমিই চোখে পড়ে। মেজোমামা বলেন, ‘এবার যা আলু ফলেছিল, তা যদি দেখতে! পটলও খুব হবে এবার।’

ছোটোমামা ঘাড় নাড়েন—‘আমরা সব নিজেরাই করি তো! জনমজুরের সাহায্য নিই না। স্বাবলম্বনের মতো আর কী আছে? গতবারে আমরা তিন ভায়ে তুলে কুলিয়ে উঠতে পারলাম না, প্রায় আড়াই লক্ষ পটল এঁচোড়েই পেকে গেল। বিলকুল বরবাদ। পাকা পটল তো চালান যায় না, কে কিনবে?’

বড়োমামা দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়েন—‘তবুও তো প্রত্যেকে দশ লাখ করে তুলেছিলাম।’

মেজোমামা আশ্বাস দেন—‘যাক, এবার আর নষ্ট যাবার ভয় নেই, ভাগনেটা এসে পড়েছে, বাড়তির ভাগটা ওই তুলতে পারবে।’

ছোটোমামা বলেন, ‘কিন্তু এবার পটল ফলেছেও দেড়া।’

‘তা ও পারবে। জোয়ান ছেলে—উঠে-পড়ে লাগলে ও আমাদের ডবল তুলতে পারে। পারবে না?’ বড়োমামা আমার পিঠ চাপড়ান।

পৃষ্ঠপোষকতার ধাক্কা সামলে ক্ষীণস্বরে বলি, ‘পটলের সিজনটা কবে?’

‘আর কী, দিন সাতেক পরেই পটল তোলার পালা শুরু হবে’ ছোটোমামার কাছে ভরসা পাই।

চোদ্দো মাইল হেঁটে টলতে টলতে বাড়ি ফিরি। ফিরেই ভিজিটালিসের অন্বেষণে গিয়ে দেখি, তিন বোতলই ফাঁক। গিধৌড়কে জিজ্ঞাসা করি—‘ক্যা হুয়া।’

গিধৌড় জবাব দেয়—‘উ দোনো খা ডালা।’

ভটরিদাস প্রতিবাদ করে—‘নেহি জি, উ ভি খায়া! আপকো ভিজটালিস উ ভি খাইস।’

কেবল খাইস নয়, আমাকেও খেয়েছে। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ি, এই দারুণ পরিশ্রমের পর এখন কী করে হার্ট ফেলের হাত থেকে বঁাচি? আত্মরক্ষা করি আপনার?

গজেন ডাক্তারকে চিঠি লিখতে বসলাম—কাল এসে অবধি আদ্যোপান্ত সব ইতিহাস সবিশেষ দিয়ে অবশেষে জানাই—

ভিজিটালিস নেই, ভালোই হয়েছে, আমার আর বঁাচবার সাধও নেই। বঁাচতে গেলে আমায় পটল তুলতে হবে। এক-আধটা নয়, সাড়ে তিন লাখ পটল—তার বেশিও হতে পারে। তুলতে হবে আমাকে। পত্রপাঠ এমন একটা ওষুধ চট করে পাঠাবেন, যাতে এই পটল তোলার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাই এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার হার্ট ফেল করে। এ পর্যন্ত যা দারুণ খাটুনি গেছে, তাতেও যখন এই ডায়ালেটেড হার্ট আমার ফেল করেনি, তখন ওর ভরসা আমি ছেড়েই দিয়েছি। ওর ওপর নির্ভর করে বসে থাকা যায় না। সাড়ে তিন লাখ পটল তোলা আমার সাধ্য নয়, তার চেয়ে আমি একবার একটিমাত্র পটল তুলতে চাই—পটলের সিজন আসার ঢের আগেই। যখন মরবারও আশা নেই, বঁাচবারও ভরসা নাস্তি—তখন এ জীবন রেখে লাভ? ইতি মরণাপন্ন (কিংবা জীবনাপন্ন) বিনীত—ইত্যাদি।

এক সপ্তাহ গেল, দু-সপ্তাহ কেটে গেল, তবু ডাক্তারের কোনো জবাব নেই, ওষুধ পাঠাবার নাম নেই। কাল সকাল থেকে পটল-পর্ব শুরু হবে ভেবে এখন থেকেই আমার হৃৎকম্প আরম্ভ হয়েছে। এঁচে রেখেছি মামারা রাত্রে রামলীলা দেখতে গেলেই সেই সুযোগে কলকাতার গাড়িতে সটকান দেব।

কলকাতায় ফিরেই গজেন ডাক্তারের কাছে ছুটি। গিয়ে দেখি কম্পাউণ্ডার দু-জন গালে হাত দিয়ে বসে আছে, রোগীপত্তর কিচ্ছু নেই! জিজ্ঞাসা করলাম—‘গজেনবাবু আসেননি আজ? কোথায় তিনি?’

দু-তিন বার প্রশ্নের পর অঙ্গুলিনির্দেশে জবাব পাই।

‘ও! এই বাড়ির তেতলায় গেছেন! রোগী দেখতে বুঝি?’

উত্তর আসে—‘না, রোগী দেখতে নয়, আরও উপরে।’

‘আরও উপরে? আরও উপরে কীরকম? বাড়ির ছাদে নাকি?’— আমি অবাক হয়ে যাই। ‘ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন বুঝি?’

‘আজ্ঞে না, তারও উপরে।’

‘ছাদেরও উপরে? তবে কি এরোপ্লেনের সাহায্যে তিনি আকাশেই উড়ছেন এখন?’ ডাক্তার মানুষের এ আবার কী ব্যারাম! বিস্ময়ের আতিশয্যে প্রায় ব্যাকুল হয়ে উঠি; এমন সময়ে ছোটো কম্পাউণ্ডারটি গুরুগম্ভীরভাবে, অথচ সংক্ষেপে জানান—‘তিনি মারা গেছেন।’

‘মারা গেছেন! সেকীরকম!!!’—দশ দিনের মধ্যে তৃতীয়বার আমার পিলে চমকায়। হার্ট-ফেল, ফেল হয়।

বুড়ো কম্পাউণ্ডারটি বলেন—‘কী আর বলব মশায়! এক চিঠি—এক সর্বনেশে চিঠি—ডালটনগঞ্জ থেকে—অশ্বিনীর না ভরণীর—কার এল যেন—তাই পড়তে পড়তে ডাক্তারবাবুর চোখ উলটে গেল। বার তিনেক শুধু বললেন, ‘‘কী সর্বনাশ! কী সর্বনাশ!!’’…তার পরে আর কিছুই বললেন না। তাঁর হার্ট ফেল হল।’

নিজের পাড়ায় যতটা অপরিচিত থাকা যায়! এইজন্যেই গজেন ডাক্তারের কাছে আমি অশ্বিনীরূপ ধারণ করেছিলাম। আজ সেই ছদ্মনামের মুখোশ আর খুললাম না, নিজের কোনো পরিচয় না দিয়েই বাড়ি ফিরলাম। একবার ভাবলাম, বলি যে, সেই সংকট মুহূর্তে ডাক্তারবাবুকে এক ডোজ ভিজিটালিস দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু এখন আর বলে কী লাভ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *