Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আমাদের মেইল করুন - banglasahitya10@gmail.com or, contact@banglasahitya.net অথবা সরাসরি আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » অভিযোগ || Mallik Kumar Saha

অভিযোগ || Mallik Kumar Saha

অভিযোগ

বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টির কাছে আমরা চির কৃতজ্ঞ। পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে যিনি নানান বস্তুতে বিভোর করে রেখেছেন, আবার তেমনি এই ইন্দ্রিয়ের অভাবে বিশ্বচরাচর স্বাদহীন হয়ে রয়েছে। এমনও দেখা গেছে যাদের কোন কিছুর অভাব নেই তারা কৃত্রিম অভাবের ভান করে অন্যের প্রতি অভিযোগ তুলেছে। আর যারা সত্যিকারেই অভাবের তারণায় ভুক্তভোগী তাদেরই কোন অভিযোগ নেই।

এই সংসারে অভিযোগ নেই এমন লোকের সংখ্যা মুষ্টিমেয়। বড়দেরকে প্রায়ই বলতে শোনা যায় —
আজকালকার ছেলেমেয়েদের দিয়ে কোন কাজের আশা নেই। চালচলন, পোষাক আষাক সবকিছুই যেন এক বিশ্রীরূপের আকার নিয়েছে। এই নতুন প্রজন্মের উপর ভরসা করা যেন একেবারে বৃথা।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে— নতুন প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে স্বাবলম্বী করার দায়িত্ব কাদের? দশরথের প্রতিজ্ঞার জন্য রামকে যেমন বনবাস যাপন করতে হয়েছিল, ঠিক তেমনই এযুগেও অনেক রামকে পিতৃসত্য পালন করতে গিয়ে অসহনীয় কষ্টের মুখে পড়তে হয়েছে। এবার কিন্তু অভিযোগটি প্রৌঢ় প্রজন্মের দিকে চলে গেল। যাদের চোখ-কান-নাক খোলা, তারা কিন্তু কিছুতেই এটা অস্বীকার করতে পারবেন না।

বর্ষণমুখর দিনে গ্রামের অনেক ছোট ছেলেদের দেখেছি ছাতার অভাবে মাথার উপর ফেনগাছের বড় বড় পাতা টানিয়ে স্কুলে যেতে। অভাবের থেকে তাদের হাসিমাখা মুখগুলোতে আনন্দের ঝলক ছিল বেশী। সেই চৈত্র মাসের উত্তপ্ত বালির উপর খালি পায়ে হেঁটে কয়েক মাইল পার হয়ে স্কুলে পড়তে যাওয়ার আনন্দও ছিল অপরিসীম। আজকের মতো রকমারি চটিজুতা কেনার ক্ষমতা খুব কম অভিভাবকেরই ছিল। পাছে গরম বালির উপর হাটতে হাটতে পা পুড়ে যায় তার জন্যে একগুচ্ছ সবুজ পাতায় ভরা একখানি গাছের ডাল সঙ্গে নিতে হতো। মাঝে মাঝে সেই সবুজ পাতা মাটির উপর রেখে তার উপর দাঁড়িয়ে পায়ের তলাদ্বয় ঠান্ডা হয়ে যাবার পর আবার স্কুলের পথে যেতে হতো। আর যাদের মাথার উপর ছাতার অভাব নেই ও পায়ে পরিধাণের চটিজুতার অভাব নেই, তাদের মুখে অভিযোগেরও শেষ নেই।আসলে তফাৎটুকু গিয়ে দাঁড়ায় সহনশীলতার মাপকাঠিতে ।

ঠিক এমনই এক পরিবারের কথা না বলেই পারছি না। গ্রামের শেষ সীমানায় তাদের বাড়ী। ঘন জনবসতীতে পূর্ণ এই গ্রাম। আধুনিক যুগের পরিভাষায় একটি উন্নত পরিবার বললেও ভুল বলা হবে না। একদিকে যেমন তাদের শিক্ষা; অন্যদিকে রয়েছে তাদের রূপ ও গুণের চর্চা। অভাবের তারণা তাদের নেই বললেই চলে। ক্রমেই প্রতিটি ছেলেমেয়ে পূর্ণাঙ্গ যৌবনে পা দিয়েছে। আমাদের বাঙালী সমাজে অভিভাবকের কাছে ছেলের বিয়ে থেকে মেয়ের বিয়ের তৎপরতা অধিক বলে মনে হয়। মেয়ের বিয়ে দিতে পারলেই যেন গঙ্গাস্নান হলো। যেই ভাবনা সেই কাজ। উপযুক্তা উপর্যুপরি তিন কন্যার বিয়ের জন্য যারপরনাই তৎপরতার সঙ্গে উপযুক্ত ছেলের খোঁজখবর চলতে লাগল। সেইসঙ্গে চারিদিক থেকে প্রচুর খবর আসতে লাগল। কিন্তু সুশিক্ষিতা, রূপবতী ও গুণবতী কন্যাত্রয়ের জন্য যোগ্য পাত্রের অভাব ঘটল। যারা এতদিন অতি উৎসাহের সঙ্গে সম্বন্ধ এনে দিয়েছিল , ধীরে ধীরে সেই সমস্ত পাড়াপরসী ও নিকটাত্মীয় পিছু হটতে লাগল। ফলে ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ারের চাহিদায় সবকটি কন্যা বিগত যৌবনা হয়ে আজও ঘরে রয়ে গেল। একদিন যাদের রূপের কোন তুলনা ছিল না, আজ সেই রূপ লাবণ্যের ছটা আকর্ষণ করতে পারে এমন কোন পাত্রের খোঁজ মিলল না। লোকের মুখে মেয়েদের কিছু কথা কানে ভেসে আসে :

“সেই সময় বাবা-মা ও দাদারা যদি আন্তরিক চেষ্টার অবহেলা না করত, তবে হয়তো আমরা তিন বোন পার পেয়ে যেতাম।”

কন্যাত্রয়ের অভিযোগ কতটুকু যুক্তিসংগত তা বুঝতে না পারলেও, এই কথাটুকু সকলেই স্বীকার করবেন যে অত্যধিক উচ্চাভিলাসের দরুণ সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে যথেষ্ট অবহেলা ছিল। আপস করতে সকলের প্রাণে একরকম শক্তি থাকে না। আজ তুমি নিজ শক্তিতে বলীয়ান বটে, তাই বলে সময়ের কালচক্রে তোমার চারিধারে দ্বিতীয় কেউ অপার শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তোমাকে কটাক্ষ করবে না, এই কথা বলতে পারা যে বড় কঠিন।

“যাদের যোগ্যতা যত কম তাদের অভিযোগও তত বেশী।” ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানুষগুলোর এই এক বড় সমস্যা। বাহ্যিক আড়ম্বরপূর্ণ বিলাসীতায় নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েও মনের গোপন চাহিদা গুলো পরিপূর্ণ না হওয়ায় অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। অবকাশ মুহূর্তে নিজের কৃত্রিম উপাদান গুলো বিচার না করে অন্যের সঙ্গে অযথা কলহে লিপ্ত হয়ে নিজেকে বড় বলে প্রতিষ্ঠিত করার ভুল তাদের স্বভাবসিদ্ধ। পারিবারিক জীবনে মহিলামহলে এই অভিযোগের ছোড়াছুড়ি এতটাই বেশী যে নিতান্ত অভাবের তারনায় বড় হয়েও শ্বশুরবাড়ীতে গিন্নীগিরি করার মিথ্যা আস্ফালন যেন সিংহচর্মে আচ্ছাদিত শৃগাল বলেই মনে হয়। এই শ্রেণীর মাকালফল প্রায়শঃ অনুজ নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে ‘সম্মান’ ভিক্ষা করে থাকে। এক মুহূর্তের জন্যও তাদের হৃদয়ে রেখাপাত করে না যে ‘সম্মান’ ভিক্ষালব্ধ বস্তুসামগ্রী নয়। সম্মান অর্জিত হয় সুনিপুণ কর্মদক্ষতার বলে। যে কর্ম দেশ ও দশের হিতে সর্বদাই অগ্রগণ্য। আমাদের সর্বদাই স্মরণ রাখতে হবে যে ভিক্ষালব্ধ অন্নে পেটের ক্ষিধে মিটে বটে, কিন্তু কেও সম্মান করে না। মিথ্যা অভিযোগ মনের ভিতরকার ঈর্ষা দাবানলের মতো সমস্ত ধমনীতে বয়ে চলে, কিন্তু মনের শাস্তি এনে দেয় না। তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলে নিজের অস্তিত্ব নাশ করে মাত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *