অন্য রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালির কাছে বিশেষ একটি নাম। বাংলা সাহিত্যের তিনি একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং তাঁর বিশাল সাহিত্য কীর্তির জন্য তিনি বহু বাঙালির ধমনীতে আজও বহমান। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, সঙ্গীতকার, চিত্রশিল্পী, নাট্যকার, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক। এক কথায় বহুমুখী প্রতিভার সম্বন্বয় ঘটেছিল তাঁর বর্ণময় দীর্ঘ কর্মজীবনে। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। তাঁর একক সাধনায় বাংলা কবিতা প্রাদেশিকতার সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা ছোটগল্পের নির্মাতা। বাংলা উপন্যাসের কাঠামোয় ও সত্তায় তিনিই প্রথম দিয়েছেন আধুনিকতার স্পর্শ। বাংলা নাট্যভুবনে তাঁর সৃষ্টিধর্মী প্রয়াস ও পরিবেশনগত অবদান বিপুল ও ঐতিহাসিক। আধুনিক বর্ণনামূলক নাটকের আদি স্রষ্টা তিনি। সর্বকালের অন্যতম সেরা গীতিকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া বাঙালির চলে না। আনন্দে বিষাদে, সুখে দুঃখে, বাঙালির যেকোনো অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া চলে না। চিত্রকলা, ভ্রমণসাহিত্য, চিঠিপত্র, ভাষাবিষয়ক প্রবন্ধ, ব্যক্তিগত রচনা—সর্বত্রই রবীন্দ্রনাথের ভুবনবিজয়ী হাতের স্পর্শ আমাদের বিস্ময়াভিভূত করে রাখে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সংগীত বাঙালির চিরকালীন সম্পদ, বাঙালির আত্মমুক্তির অফুরন্ত উৎস। শিল্পস্রষ্ঠা এই রবীন্দ্রনাথের পাশে রয়েছেন অন্য রবীন্দ্রনাথ। অন্য এই রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পাওয়ার প্রয়াস মাত্র এই নিবন্ধ।
অন্য আর এক রবীন্দ্রনাথ হলেন চিকিৎসক রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকে খুব পছন্দ করতেন। শুধু পছন্দ নয় হোমিওপ্যাথির উপর ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস ও ভালবাসা। এককথায় বলতে গেলে বলতে হয় তিনি ছিলেন হোমিওপ্যাথিতে আসক্ত। তার প্রিয়তমা স্ত্রী মৃণালিনী দেবী যখন মারাত্মক অসুস্থ ছিলেন তখন তিনি তাকে হোমিও চিকিৎসা প্রদান করেছেন। শুধুই তাই নয় তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর দিন পর্যন্তও তিনি ভরসা রেখেছিলেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার উপর। তিনি বিশ্বাস করতেন হোমিও চিকিৎসায় তাঁর স্ত্রী সুস্থ হয়ে উঠবেন। হোমিওপ্যাথির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ কবিরাজি এবং বায়োকেমিক চিকিৎসায়ও পারদর্শী ছিলেন। আয়ুর্বেদে রবীন্দ্রনাথের আস্থা যেমন ছিল, তেমনি রুচিও ছিল; অল্প স্বল্প চর্চাও করতেন। চরক সংহিতা পড়েছিলেন; ক্ষিতিমোহন সেন ও শিবনাথ শাস্ত্রীর সঙ্গে আয়ুর্বেদ নিয়ে আলোচনা করতেন। তবে যেভাবে হোমিওপ্যাথি ও বায়োকেমিক চিকিৎসা করতেন ঠিক সেভাবে আয়ুর্বেদ মতে চিকিৎসা করেন নি।
অন্য রবীন্দ্রনাথের আর একটি অনালোচিত দিক হলো তাঁর ফুল ও উদ্ভিদপ্রেম। প্রকৃতিপ্রেমী রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ফুল ও গাছপালার এক মধুর অন্তর্নিহিত সম্পর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথের বৃক্ষপ্রীতি ছিল ছেলেবেলা থেকেই। ‘…দক্ষিণের বারান্দার এক কোণে আতার বিচি পুঁতিয়া রোজ জল দিতাম’ (ঘর ও বাহির, জীবনস্মৃতি, পৃঃ ১৯) ও ‘পড়ার ঘরের এক কোণে নকল পাহাড় তৈরি করে তার মাঝে ফুলগাছের চারা পোঁতা’ (জীবনস্মৃতি, পৃঃ ২০) কর্মকাণ্ডদু’টির মধ্যে ছোটবেলা থেকে তাঁর উদ্ভিদপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। বিভিন্ন গন্ধ ও রঙের ফুল রবীন্দ্রনাথের পছন্দ ছিল। দেশে বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমনের সময় অনেক অপরিচিত গাছ নিয়ে আসতেন শান্তিনিকেতন আশ্রমে। গ্রীষ্মের জুঁই, শেফালি, মালতী বা মাধবী অথবা হলুদ রঙের সোনাঝুরি, বাসন্তী যেমন তিনি পছন্দ করতেন তেমনি রক্তকরবী, অশোক, পলাশ, শিমূল ছিল তাঁর অতি প্রিয় ফুল। নীল দিগন্তের পটভূমিতে এই সব ফুলের অপূর্ব দৃশ্য তাঁর গানে প্রকাশিত হয়েছে — ‘নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগল।’ নীল রঙের ফুলে ছিল রবীন্দ্রনাথের বিশেষ আকর্ষণ। তাঁর জন্য উইলিয়াম পিয়ারসন আর্জেন্টিনা থেকে নীলমণিলতা এনে কোণার্ক বাড়ির সামনে রোপণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ‘বনবাণী’ কাব্যে ‘নীলমণিলতা’ নামে এক কবিতা লেখেন ও ভূমিকায় লিখেছেন — ‘নীল রঙে আমার গভীর আনন্দ তাই এই যুগের বাণী আমার যাতায়াতের পথে প্রতিদিন আমাকে ডাক দিয়ে বারে বারে স্তব্ধ করেছে…।’ মংপুতে গৌরীদেবীর বাড়িতে ক্যামেলিয়ার প্রথম দর্শনেই অভিভূত হন এবং উজ্জ্বল ঘন সবুজ রঙের পাতা, গোলাপের মতো দেখতে এই ফুলটিকে নিয়ে ‘পুনশ্চ’ কাব্যে একটি কবিতাও লেখেন। একইভাবে আর এক বিদেশি ফুল রডড্রেনড্রন স্থান পায় তাঁর ‘শেষের কবিতা’য়। অনেক দেশি-বিদেশি ফুলের নামকরণ তিনি নিজের মতো করে করেন। যেমন নীলমণিলতা, তারাঝরা, হিমঝুরি, ফুলঝুরি, সোনাঝুরি, মধুমঞ্জরী, মধুমালতী, বাগানবিলাস, রামধূনচাঁপা, বাসন্তী ইত্যাদি।
আর এক রবীন্দ্রনাথ হলেন সমাজচিন্তক রবীন্দ্রনাথ। ১৮৯১ সালে রবীন্দ্রনাথ পিতার নির্দেশে বাংলাদেশের শিলাইদহ-সাজাদপুর-পতিসর অঞ্চলে গিয়েছিলেন পারিবারিক জমিদারি দেখাশুনা করতে। সেখানে তিনি এক নাগাড়ে প্রায় দশ বৎসর ছিলেন। শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরে জমিদারি তত্ত্বাবধান সূত্রে বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে—পরিশ্রমজীবী কৃষকের সঙ্গে গড়ে ওঠে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ লক্ষ করেছেন—দিন-রাত পরিশ্রম করলেও বাংলার কৃষকের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ নেই, নেই জীবন উন্নত করার কোনো আকাঙ্ক্ষা। তিনি লক্ষ্য করেছেন কীভাবে গ্রামের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জীবন স্থানীয় মহাজনদের ঋণের বোঝায় দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তিনি দেখেছেন সেখানকার পতিত জমি, একফসলি জমি, অনুর্বর জমি। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়া নেই কোথাও। সবই চলছে গতানুগতিকভাবে। তাই গরিব প্রজাদের কথা ভেবে তিনি নজর দিয়েছিলেন গ্রাম বাংলার কৃষি উন্নয়নে। এর ফলে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সামাজিক জীবনে শুধু একজন প্রজাবান্ধব জমিদার ও সমাজচিন্তক হিসেবে যে সুপরিচিত ছিলেন তা নয় বরং আধুনিক কৃষির একজন রূপকার হিসেবেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয়।
মহাজন, জমিদারদের কবল থেকে কৃষকদের বাঁচাতে স্বল্প সুদে ক্ষুদ্রঋণের কথা ভেবেছিলেন তিনি। এ ভাবনা থেকেই স্বল্প সুদে গরিব কৃষকের মধ্যে ঋণ বিতরণের জন্য ১৮৯৪ সালে শিলাইদহে এবং ১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। কৃষি ব্যাংককে কেন্দ্র করে শিলাইদহ ও পতিসরে তিনি গড়ে তুলেন পল্লী সমাজ সংগঠন এবং প্রচলন করেন সমবায়ভিত্তিক যৌথ কৃষি খামার। কৃষি ব্যাঙ্কের পাশাপাশি তিনি স্থাপন করেছিলেন নৈশ বিদ্যালয়। নৈশ বিদ্যালয়ে কৃষক পরিবারের সব সদস্যের প্রয়োজনীয় পাঠ প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হলো। শিলাইদহ নৈশ বিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীও শিক্ষকতা করেছেন। সমবায়ের মাধ্যমে চাষ, জল সেচ কৌশল, জমিতে সার ব্যবহার—এসব বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজে কৃষকদের ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সমবায় প্রথার মাধ্যমে চাষ করার জন্য তিনি কৃষকসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতেন। শিলাইদহের মতো পতিসরেও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেন রবীন্দ্রনাথ। নৈশ বিদ্যালয়ে কৃষকদের চাষ ও জল সেচের নানা কৌশল শেখানো হতো। শিলাইদহ ও পতিসরের নৈশ বিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট দিনে কৃষক-বধূরা হাতে-কলমে কাজ শিখতে আসতেন। হস্তশিল্পের নানা বিষয় তাঁদের শেখানো হতো। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার সহযাত্রী হিসেবে রথীন্দ্রনাথও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন, উন্নত কৃষিজ্ঞান না থাকলে বাংলার কৃষি ও কৃষকদের জীবন উন্নত করা যাবে না। এই উপলব্ধি থেকেই আজ থেকে শতাধিক বছর আগে ১৯০৩ সালে রবীন্দ্রনাথ পুত্র রথীন্দ্রনাথকে আমেরিকা পাঠান। রথীন্দ্রনাথ উন্নত কৃষিজ্ঞান আহরণ করে দেশে এসে শান্তিনিকেতনে তাঁর যথাযথ প্রয়োগের প্রয়াস গ্রহণ করেন। কনিষ্ঠ জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কেও উন্নত কৃষিজ্ঞান অধ্যয়নের জন্য রবীন্দ্রনাথ ইংল্যান্ড পাঠান।
অন্য রবীন্দ্রনাথের আর একটি দিক হলো তিনি ছিলেন একজন যথার্থ শিক্ষা দার্শনিক। শিক্ষাকে রবীন্দ্রনাথ দেখেছেন প্রযুক্তি হিসেবে। তোতাপাখিধর্মী শিক্ষাকে তিনি বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি প্রথমবারের মতো পিতার সঙ্গে হিমালয় ভ্রমণে গিয়ে যে আনন্দ ও বিষ্ময়ে বিশ্বপ্রকৃতির দিকে তাকিয়েছিলেন সে বিষয়ে তিনি তাঁর ‘বাল্যস্মৃতি’তে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। এর ফলেই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, বাহিরের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি এবং প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ ও নিরবচ্ছিন্ন সান্নিধ্য শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য অত্যাবশ্যক। তিনি এমন এক শিক্ষাপ্রণালী উদ্ভাবন করতে চাইলেন যা শিশুর প্রয়োজনীয় বিষয়াদির প্রতি যথোচিত মনোবিবেশ দেওয়া ছাড়াও স্বদেশের ঐতিহ্য ও ইতিহাস থেকে উদ্ভুত হবে এবং প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ ও নিরবচ্ছিন্ন সান্নিধ্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে। তিনি সুপারিশ করেছেন মুক্ত প্রকৃতির সান্নিধ্যে আনন্দদায়ক শিক্ষার কথা। শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর চিত্তে মনুষ্যত্ববোধ ও বিশ্বাত্মচেতনা জাগ্রত করাই রবীন্দ্র শিক্ষাদর্শনের মূল কথা। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সমন্বয়বাদী শিক্ষা দার্শনিক। শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি প্রাচ্য-পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছেন। শিক্ষা লাভ করে শিক্ষার্থী যাতে মানব সম্পদে রূপান্তরিত হতে পারে, সেদিকে রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও মননশীলতার বিকাশের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তিনি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার কথা চিন্তা করেছিলেন যেখানে একজন শিক্ষার্থী আনন্দের সাথে তার কল্পণাশক্তির প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারবে। যে শিক্ষার সাথে কোনো আনন্দ নেই, সেই শিক্ষায় কেউ মননশীল, সৃষ্টিশীল মানুষ হতে পারে না। আর সৃষ্টিশীলতা ব্যতীত শিক্ষার কোনো মূল্যও নেই। শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে শিশুকে শেখাতে হয় কী করে দেশ, দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশকে আপন করে নেবে; কী করে দেশের মহৎ অর্জনগুলোকে ভালোবাসতে ও সম্মান করতে শিখবে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ধনী-দরিদ্র সকল মানুষকে কী করে ভালোবাসতে, শ্রদ্ধা করতে, সম্মান করতে শিখবে। এই শিক্ষাই সর্বাগ্ৰে জরুরী। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে শিক্ষা হয়ে উঠেছে পণ্য। শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পূর্ণ হয় বটে; কিন্তু সরস্বতী পালিয়ে যান। সরস্বতী যাতে পালিয়ে যান সে জন্য আমরা এখন গ্রহণ করেছি যাবতীয় উদ্যোগ। শিক্ষার লক্ষ্য এখন আর জ্ঞানার্জন বা জ্ঞান সৃষ্টি নয়, নম্বর ও সার্টিফিকেট প্রাপ্তিই সেখানে মুখ্য বিবেচ্য। এই প্রবণতার বিরুদ্ধে স্বকীয় শিক্ষাদর্শন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে হাজির হন ত্রাতার ভূমিকায়। তাঁর শিক্ষাদর্শন আমাদের দেখাতে পারে মুক্তির পথ।
এই বহু বর্ণিল প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথের আর একটি দিক হলো তিনি ছিলেন একজন পরিবেশসচেতন দার্শনিক। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য তিনি গান লিখেছেন, রচনা করেছেন অনেক কবিতা-ছড়া-গান-নাটক-ছোটগল্প। ‘বৃক্ষরোপণ’ শব্দের স্রষ্টা তিনি। প্রতি শ্রাবণে উৎসব করে শান্তিনিকেতনের চারদিকে গাছ লাগাতেন তিনি। বৃক্ষরোপণ উৎসবের জন্য রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন অসামান্য এই গান : ‘মরুবিজয়ের কেতন উড়াও শূন্যে হে প্রবল প্রাণ।/ধূলিরে ধন্য করো করুণার পুণ্যে হে কোমল প্রাণ।/মৌনী মাটির মর্মের গান কবে উঠিবে ধ্বনিয়া মর্মর তব রবে,/মাধুরী ভরিবে ফুলে ফলে পল্লবে হে মোহন প্রাণ/পথিকবন্ধু, ছায়ার আসন পাতি এসো শ্যামসুন্দর।/এসো বাতাসের অধীরে খেলার সাথি, মাতাও নীলাম্বর।/উষায় জাগাও শাখায় গানের আশা, সন্ধ্যায় আনো বিরামগভীর ভাষা,/রচি দাও রাতে সুপ্ত গীতের বাসা হে উদার প্রাণ’। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য এখন আমরা বৃক্ষরোপণের কথা বলি, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের কথা বলি—অথচ পরিবেশবিজ্ঞানী রবীন্দ্রনাথ সে কথা বলে গেছেন সোয়া শ বছরেরও অধিককাল আগে।
অন্য রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করতে হলে তাঁর প্রগতিশীল সমাজচেতনা ও সদর্থক রাজনীতিভাবনার ওপরও আলোকপাত করা প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন প্রগতিশীল সমাজচেতন মানুষ ও বিশ্ব মানব মুক্তির সর্বজনীন দার্শনিক। তাই আমরা লক্ষ্য করি, ব্যুয়র যুদ্ধ, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড থেকে আরম্ভ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যপর্যায় পর্যন্ত, যখনই বিশ্ব মানব সমাজের কোনো অংশ অত্যাচারী শাসকের হিংস্র আগ্রাসনের শিকার, যখনই পৃথিবীর কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে শান্তি বিঘ্নিত, বিশ্ব-মানবিকতার অপ্রতিম প্রতিনিধি নিয়তজাগ্ৰত রবীন্দ্রনাথ তখনই প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক থেকে সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদের মানবতাবিধ্বংসী অভিযান রবীন্দ্রচিত্তে সৃষ্টি করে প্রবল অভিঘাত, মানববিদ্বেষী মতাদর্শ, আগ্রাসনবাদ ও শান্তিহন্তারক শক্তির বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন প্রতিবাদে উচ্চকণ্ঠ। ফ্যাসিবাদ-সমরবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী ভিন্ন এই রবীন্দ্রনাথ বাঙালির কাছে সেভাবে পরিচিত নন।
সাহিত্য ও সংগীতের পাশাপাশি ভিন্ন এই রবীন্দ্রনাথও আমাদের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছেন। আমাদের যাপিত জীবনের প্রতি স্তরেই তিনি রয়েছেন। তাঁর এই ভিন্নসত্তাকে জানতে হলে তাঁর সৃষ্টিকর্মকে নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাহলেই হয়ত পূর্ণ রবীন্দ্রনাথকে আমাদের জানা সহজ হবে।
