ভবঘুরে
আধময়লা জামা গায়ে, হাতে একটা পুঁটলি আর লাঠি নিয়ে লোকটা ধীরে ধীরে আমার পাশে এসে বসলো। তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে।
বগুলা স্টেশনে বসে আছি ট্রেনের অপেক্ষায়।
লোকটার গা থেকে বেরোনো একটা ভোটকা গন্ধে গা’টা গুলিয়ে ওঠায় একটু দূরে সরে বসলাম।
কিছুক্ষণ পর আমার কলেজের বন্ধু শান্তনু এলো, সেও ট্রেন ধরবে। দুজনে গল্প করছি নানান বিষয়ে।
লোকটা পুঁটলি থেকে মুড়ি খাচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। দেখে বিরক্তই লাগলো।
এরই মধ্যে তাঁর মোবাইল ফোন বেজে উঠলো।
ফোন অন করে লোকটা পরিস্কার ইংরেজিতে বলছে,’ Yes, I am Mr.Basu speaking from India.’
অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। একি এই ভবঘুরে চেহারার লোকটা ইংরেজিতে কথা বলছে তাও আবার বিদেশের কারো সঙ্গে!
ফোনালাপে বুঝলাম, লোকটা উচ্চশিক্ষিত বটে।
কিন্তু এমন বেশে কেন সে? জীবনে চাকরি-বাকরি কিছুই কি করেনি! এমন জীর্ণশীর্ণ চেহারা, গালভর্তি দাঁড়ি।দেখে মনে হয় যেন পাগল।
ইতিমধ্যে শান্তনুর ট্রেন চলে আসায় সে চলে গেল।
আমি লক্ষ্য করে যাচ্ছি লোকটার চালচলন।
একটু পরেই আমার ট্রেন এলো।
উঠে পরলাম ট্রেনে।দেখি লোকটাও উঠেছে। আমার পাশেই এসে বললো। আমি কৌতুহলবশত বললাম -‘Excuse me, where do you live?’
ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,’ Are you Bengalee?’ আমি Yes বলে মাথা নাড়লাম।
ভদ্রলোক বললেন, আমি বাঙালি। কোলকাতায় ছোটোবেলা কেটেছে। বাংলায় কথা বলতে পছন্দ করি।
আমি বললাম, আজ্ঞে না; মানে আপনি ইংরেজিতে কথা বলছিলেন কিনা” ঐ যে ফোনে, তা-ই ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করা।
ভদ্রলোক – সে তো আমার এক আমেরিকান বন্ধু, একটা সময় আমেরিকায় একসঙ্গে কাজ করেছি। এখনো যোগাযোগ আছে, মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। ও বাংলা জানেনা।
বললাম, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো যদি কিছু না মনে করেন।বলছি আপনি তো উচ্চশিক্ষিত এবং বিদেশেও কাজ করেছেন বলছেন, তাহলে আপনার এমন বেশভূষা কেন? না মানে আপনাকে দেখে আমার কেন জানিনা ভবঘুরে বলে মনে হয়েছিল। আপনার সঙ্গে আপনার বিষয়ে জানার আগ্ৰহ বলতে পারেন – যদিও অনধিকার চর্চা।
ভদ্রলোক – আমি তো ভবঘুরেই। চালচুলোহীন, যখন যেখানে পারি ঘুরে বেড়াই, যেখানে খুশি শুয়ে রাত কাটাই, লোকের দয়ায় বাঁচি।
কীরকম! যদি আপত্তি না থাকে।
কোম্পানির কাজে বিদেশে থাকতে হয় পাঁচ বছর। এদিকে মেয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। চাকরি ছেড়ে চলে আসি ইন্ডিয়ায় বৌকে সঙ্গ দেবো বলে। শোকাবহ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই জানতে পারি আমার স্ত্রী পরকীয়ায় লিপ্ত। তারপর যা হয়! আমায় ছেড়ে তাঁর সঙ্গে সংসার পাতে।
আমিও শান্তিতে ডিভোর্স দিয়ে দিই।
তারপর থেকে যেখানে মন চায় ঘুরে বেড়াই।
বললাম, চলে যাচ্ছেন না কেন আবার বিদেশে?
বললেন চাকরি ছেড়ে এসেছি, চলে যেতে তো ইচ্ছে করে, কিন্তু পয়সার দরকার অনেক।
একটা কোম্পানিতে কাজে যোগ দিয়েছিলাম, কিন্তু মন বসাতে পারলাম না। এই ভালো আছি। আগে পিছে কেউ নেই – গোবিন্দ ভরসা।
বললাম আপনি এতো ভালো ইংরেজি জানেন, টিউশন করলে তো অনেক স্টুডেন্ট পেতেন। ওদের সঙ্গে থেকে আপনারও ভালো লাগতো।
উনি বললেন, বুঝলেন আমার মাতৃভাষা বাংলা। বাংলার মতো সমৃদ্ধ ভাষা সারা বিশ্বজুড়ে খুঁজে পাবেন না। বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই বলে নিজের মাতৃভাষাকে একদম ভুলে যাওয়া ঠিক নয়।
আমি কয়েকটা অনাথ ছেলেমেয়ে পড়াই, যারা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ধুলোমলিন হয়ে জীবন কাটায়।
এক একদিন এক একটা স্টেশনে নিয়ম করে পড়াই, কাছাকাছি স্টেশনগুলোতে। অনেক মানুষ এগিয়ে এসে সাহায্য করে। যে যেমন দেয়, হাত পেতে নিই। বাচ্চাদের পোশাক, বইপত্র কিনে দিই। চলে যায় এভাবে মানুষের দয়ায়।
এরই মধ্যে তাঁর নামবার স্টেশন চলে এলো। নেমে গিয়ে যাত্রীদের ভীড়ে কোথায় হারিয়ে গেল। নিমেষে উধাও যেন চোখের সামনে থেকে!
আসতে আসতে ভাবলাম, কোন্ স্টেশনে কবে পাড়ায় জানা হলো না, তাহলে আমিও কিছু সাহায্য করতে পারতাম।
এমন কত রত্ন ঘুরছে এই সমাজে যাঁদের খালি চোখে বাহ্যিক রূপ দেখে তাচ্ছিল্য করি।
মনে মনে ঠিক করলাম -অবশ্যই খোঁজ নেবো কোথায় উনি পড়ায়।
এমন লোকের সেবার কাজে সামান্য সাহায্য করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো।
