বানভাসি
গজলডোবা বাঁধের লকগেট সব আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে। হুহু করে ঢুকছে উত্তাল জলরাশি। দীনদরিদ্র মানুষগুলো প্রচন্ড ভয়ে নিজেদের বসতবাড়ি সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। মুহূর্তে ভেসে যাচ্ছে গবাদিপশু, গৃহের যাবতীয়। বুকজলে দাঁড়িয়ে মানুষের হাহারব।
সদ্য স্বামীহারা সিরিণ শিশুপুত্র কোলে অসহায়। সে কোনরকমে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বেড়িয়ে আসে।
অনেকটা পথ পেরিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে একটা স্কুল ঘরে ওঠে। সেখানে লোকের মুখে শোনে টিভিতে দেখাচ্ছে আশেপাশের গ্ৰামেও জল ঢুকেছে।
সিরিণ শিক্ষিত, ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ। আফগানিস্তানের মেয়ে। বাংলাদেশের ছেলে ফিরোজ কর্মসূত্রে আফগানিস্তানে গেলে, সেখানে তাদের পরিচয়। তারপর বিয়ে করে স্বামীর সঙ্গে রংপুরে চলে আসা।
ফিরোজও ইঞ্জিনিয়ার, বিদেশি কোম্পানিতে কাজ করত। সুখেই কাটছিলো দিন। কিন্তু ছ’মাস আগে অজানা জ্বরে ফিরোজ মারা যায়।
সিরিণ এখানকার কিছুই চেনেনা। সে ভাবে, এ অবস্থায় কতদিন থাকা যাবে। আত্মীয়স্বজন কেউ এখানে নেই। এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকবে কিভাবে! এদিকে কোলের শিশু খাওয়ার না পেয়ে নেতিয়ে পড়েছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ত্রাণসামগ্রী দিলে একটু খাওয়ার জোটে।
শিবিরে একদিন ডাক্তার আশিষ বড়ুয়া আসেন পরিদর্শনে। তিনি জানান, এই বন্যা ম্যান মেড। গজলডোবা ব্যারেজের ছাড়া জলে সৃষ্টি। অবিরাম বৃষ্টিতে তিস্তার জল বেড়ে বাঁধ ভাঙার উপক্রম। তাই জরুরি ভিত্তিতে লকগেট হাল্কা খুলতে হয়েছে। বাঁধ ভাঙলে বাঁচার উপায় থাকতোনা।
সিরিণ শিক্ষিত ; ভাবে এস্থান বন্যা কবলিত। আফগানিস্তানে ফিরে যাওয়াই ভালো। সেখানে তার সব চেনা। একটা চাকরি ঠিক জুটে যাবে।
ডাক্তার আশিষ কাছে এসে ছেলের গায়ে হাত দিয়েই বলে সর্বনাশ! ছেলে যে নেতিয়ে গেছে। এক্ষুনি ওকে গরম দুধ খাওয়ানো প্রয়োজন। তিনি নিজেই ফোন করে দুধের ব্যবস্থা করেন।
সিরিণ বন্যা বিষয়ে কিছু বললে এবং নিজ দেশ আফগানিস্তানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ডাক্তার আশিষ বলেন, চলুন আমার সঙ্গে তিস্তা ভ্যালি কর্পোরেশনের ইনচার্জ এরশাদ হালিমের কাছে। তাঁর কথাতেই আমি এখানে এসেছি, তিনি যদি আপনার কোনো সাহায্যে লাগে।
সিরিণ তাঁর সঙ্গে এলো হালিম সাহেবের বাড়ি। কথাবার্তার সময় বাঁধের জল এভাবে ছেড়ে বন্যা সৃষ্টিতে গরিবদের দুর্দশার কথা জানিয়ে বলে, বর্ষায় অতিবৃষ্টিতে যদি লকগেট খুলে জল ছাড়া হয় তাহলে গরিব মানুষগুলো নিঃস্ব যেমন হচ্ছে তেমনি শরণার্থী শিবিরে অপুষ্টি, দুষিত পরিবেশের কারণে নানান ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এই নিদারুণ পরিস্থিতির কী কোনো সুরাহা নেই? হালিম সাহেব বললেন সে বিষয়ে আলোচনা চলছে।
সিরিণ বলে আমি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ। বিয়ের পর এদেশে চলে আসায় চাকরি করার সুযোগ হয়নি। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি যদি ব্যারেজের বিপরীত দিকের গ্ৰামগুলোর মানুষদের অন্যত্র পুর্নবাসনের ব্যাবস্থা করে, তারপর ডিনামাইট দিয়ে গুঁড়িয়ে শূন্য বিস্তৃর্ণ প্রান্তরে লকগেটের জল ছাড়া হয় তাহলে মনে হয় বন্যায় মানুষের এমন ভয়ঙ্কর পরিস্তিতি হবেনা। সিরিণের কথা শুনে অফিসার বললেন, আপনি সুন্দর আইডিয়া দিলেন। অবশ্যই এ নিয়ে আমি আলোচনা করবো। তারপর সিরিণকে নিজের বাড়িতে রেখে ভিসা করিয়ে দিয়ে, আফগানিস্তানে ফিরবার ব্যবস্থা করে দিলেন।
