টুকুনের অসুখ – নয়
সুবল সকাল সকাল উঠেই ফুটপাথের কলে স্নান করে নিয়েছে। সে একটা ঘর এখনও পাচ্ছে না। সে যা আয় করছে, বাবুরা ওর ভাজা—ভুজি কিনে যা দেয়, তাতে ওর দু বেলা ছাতু খেয়ে বেশ চলে যাচ্ছে। আর পয়সা বাঁচে না যা দিয়ে সে একটা ঘর, খুপরি ঘর ভাড়া নিতে পারে। এখানে সে দু—একজন লোকের সঙ্গে ইতিমধ্যেই পরিচয় করে ফেলেছে, যেমন অজিত সাহা লোকটি তাকে অন্য ব্যবসা করতে বলছে—এই যেমন মটর কিনে সেদ্ধ করে রং মিশিয়ে মটরশুঁটির মতো বাজারে বিক্রি করা। সিনেমার শো ভাঙলে সে অনায়াসে এই সব বিক্রি করতে পারে।
সুবল বলেছিল, রং মেশাতে হবে কেন?
—রং না মেশালে শুকনো মটর মনে হবে, সবুজ মনে হবে না।
—রং তো লোকে খায় না!
—খায় না, খেতেও নেই। ওতে অক্সাইড থাকে, পেটে ঘা করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট।
—ওতে মানুষের ক্ষতি হয় অজিতদা।
—মানুষের ক্ষতি হলে তোর কী? তোর ক্ষতি না হলেই হল।
—তা হলে এটা তো ভালো না। মানুষের ক্ষতি হলে কিছু আমার ভালো লাগে না। তুমি অন্য ব্যবসার কথা বলো।
—তবে যা করছিস তাই কর। ফুটপাথে শুকিয়ে মর।
—আমি তো একা মানুষ, আমার তো চলে যাচ্ছে।
—তোর অসুখে—বিসুখে কোথায় থাকবি?
—গাছের নীচে।
—শালা তবে খরার দেশ থেকে চলে এলি কেন?
—ওখানে বর্ষা নামলে চলে যাব। এ—শহরে আমি থাকব না অজিতদা।
—কেন, ভালো লাগে না? তোকে একদিন সিনেমায় নিয়ে যাব। দেখবি তখন তোর এই শহরটার উপর মায়া পড়ে যাবে।
—তাই বুঝি?
—তবে আবার কী!
—আমার পাখিটা এখানে থাকতে চাইছে না।
—রাখ তোর পাখি। কোথাকার কী একটা রেখেছিস, ছেড়ে দে চলে যাক। সঙ্গে শুধু উটকো ঝামেলা রেখেছিস।
—ছেড়ে দিলে চলে গেলে মন্দ হত না। কিন্তু যায় না। আমাকে নিয়ে যাবে বলছে।
—শালা তোর পাখি তবে কথাও বলে!
—বলে তোমরা ঠিক বুঝতে পারো না। বলে সুবল হেসেছিল। তবু সুবল এই অজিত সাহার উপর রাগ করে না। বরং দু—একদিন কিছু কামাতে না পারলে অথবা পয়সা কম পড়লে সে তার কাছ থেকে ধার নেয়। দু—একদিন অজিত সাহা ওর বস্তিতে খুপরি ঘরে ডেকে দুটো ভালো—মন্দ খাইয়েছে। সুবল অনেকদিন ভাত খায়নি। সে টুকুনদিদিমণিকে বিকেলে দেখতে যায়। একদিন টুকুনদিদিমণির নার্স দেখে কেমন বিরক্ত হয়ে দশটা পয়সা ছুঁড়ে দিয়েছিল, যেন ভিক্ষে চাইছে সুবল, সুবল হেসে বলল, না মা—জননী, আমি ভিখারি নই। টুকুনদিদিমণি আমি ভিখারি! টুকুনদিদিমণি আমাকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। আমার কেমন এই টুকুনদিদিমণির জন্য মায়া পড়ে গেছে।
সুবলের আর যাবার জায়গা কোথাও নেই, তবে ওর প্রতি আকর্ষণ কমে যাবে। কারণ এখন সুবল ওর কাছে জাদুকরের মতো। স্রেফ অলৌকিক জাদুকর। আসে যায়, কখনও হারিয়ে যায়। আবার আসে। প্রত্যাশা ওকে বড় এবং ভালো করে তুলবে। বলে ডাক্তারবাবু অন্যমনস্কভাবে কেবল হাতে তুড়ি মারছিলেন।
সুরেশবাবু বাইরে গিয়ে বলেছিলেন, কেমন বিস্ময়ের ব্যাপার লাগছে সব।
সুরেশবাবুর স্ত্রী বলেছিল, টুকুনের জীবনে স্বাভাবিকতা তবে আসবে ডাক্তারবাবু?
—সব এখন সেই পাখিয়ালার ওপর নির্ভর করছে।
পাখিয়ালার নাম শুনেই টুকুনের মা কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল। তাই বলে একটা রাস্তার ছেলে! অন্য কেউ হলে হয় না! কত সুন্দর সুপুরুষ সব তরুণ রয়েছে তাদের চারপাশে। টুকুনের মা আর কোনও কথা বলতে পারল না। ছেলেটা তন্ত্র—মন্ত্র জানে। কোথাকার ছেলে, খরা অঞ্চল থেকে উঠে এসে কী করে যে টুকুনকে ট্রেনে নিজের মতো করে ফেলল!
অথবা সেই সব দৃশ্য। টুকুনের মা এখনও যেন মনে করতে পারছে—টুকুন জেগে দেখেছিল, সুবল দরজা খুলতে পারছে না। টুকুন বাবাকে দেখেছিল দরজা লক করে দিতে। সুতরাং সুবল দরজা খুলতে পারছিল না। টুকুন সুবলকে কিছু বলার জন্য উঠে বসতেই জানালায় দেখতে পেল একজন পুলিশ ওদের কামরার দিকে ছুটে আসছে। প্ল্যাটফরমে হইচই। মানুষের ছুটোছুটি এবং কান্না। যারা জল চুরি করে খেয়েছিল অথবা লুট করেছিল, তাদের এখন ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। টুকুন ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই ডেকেছিল, সুবল সুবল, দরজা খুলবে না। দরজা খুললে ওরা ঢুকে পড়বে ঘরে।
সুবল বলেছিল, আমাকে ওরা ধরে নিয়ে যাবে?
—তাড়াতাড়ি এদিকে এসো সুবল, বলে সে ব্যাংকের নীচে সুবলকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তারপর লম্বা চাদর দিয়ে পর্দার মতো একটা আড়াল সৃষ্টি করে সুবলকে অদৃশ্য করে দিয়েছিল।
সুবল ট্রেনে তখন সব পোঁটলাগুলো শিয়রের দিকে রেখে দিয়েছিল। বাংকের ওপর টুকুন চুপচাপ শুয়ে। চাদরটা দিয়ে বাংকের নীচটা ঢেকে দিয়েছে। ওর ভিতর একটা ছেলে শুয়ে আছে পালিয়ে, কেউ টের পাচ্ছে না। টুকুনের মা—ও জানত না। টুকুন পরে সব বলেছিল।—জানো মা, আমি দরজা পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলাম।
সে—সব কথা তখন টুকুনের মা বিশ্বাস করতে পারেনি। কারণ সে তো কিছু দ্যাখেনি। পাশের বাংকে সে ঘুমাচ্ছিল। ফার্স্ট ক্লাস কামরা, রিজার্ভ।
জেবের ভিতর ছিল তখন পাখিটা। সুবল একটু আলগা হয়ে শুয়ে ছিল নীচে। পাছে পাখিটা চাপা পড়ে মরে না যায়। পাখিটা তখন জড়পদার্থের মতো, যেন শীতে ভয়ানক কষ্ট পাচ্ছে, অথবা পাখিটার ঘুম পাচ্ছিল বোধহয়—খুব জড়সড়ো হয়ে জেবের একটা দিকে বসে আছে। তারপর মনে হয়েছিল সুবলের, ঘুম এসে গেলে পাখিটা জেবের ভিতর চেপটে যেতে পারে, সেজন্য সে শিয়রে রেখে বেশ নিশ্চিন্তে ঘুম যাবার চেষ্টা করেছিল। পাখিটা শিয়রে জড়সড়ো হয়ে বসে আছে। নড়ছে না। যেন পাখিটারও ভয়, পুলিশ পাখিটাকে ধরে নিয়ে যাবে। তুমি এদের দলে, সুতরাং নিস্তার নেই।
টুকুন রগণ এবং দুর্বল। টুকুন কোনোরকমে উঠে বসেছিল এবং চাদরটা ঠিক মেঝের সঙ্গে মিলে আছে কিনা দেখার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছিল। টুকুন ক্ষীণকায়, লম্বা। সিল্কের দামি ফ্রক গায়ে ঢল ঢল করছিল। শুধু সামান্য মুখে সতেজ সুন্দর চোখ কালো জলের মতো গভীর মনে হচ্ছিল। দরজায় তখন ঠক ঠক শব্দ। টুকুন কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। মা এবং বাবা শেষরাতে ঠান্ডা বাতাসটুকু পেয়ে অঘোরে ঘুমুচ্ছেন। সুতরাং টুকুন নিজে ধীরে ধীরে উঠে গিয়েছিল এবং দরজা খুলে দিয়েছিল—লম্বা একটা পুলিশের মুখ গোটা দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
টুকুন খুব আস্তে আস্তে বলল, আমাদের কামরায় কেউ জল খেতে আসেনি।
—কেউ ভিতরে পালিয়ে নেই তো?
—না না, কেউ নেই। কেউ আসেনি। ট্রেন ওরা থামিয়ে দিলেই আমরা দরজা লক করে দিয়েছিলাম।
