টুকুনের অসুখ – বাইশ
এভাবেই এখানে প্রতিদিন সূর্য ডোবে। ও—পাশের বনের ভিতর মনে হয়, সূর্য হারিয়ে যায়। কখনও হলুদ রঙ নিয়ে, কখনও বেগুনি অথবা নীল নীলিমাতে আগুন ছড়িয়ে সূর্য রোজ ও—পাশের জঙ্গলে হারিয়ে যায়। বনের পাখিরা ডাকে। নদীতে বড় বড় গাছের ছায়া ধীরে ধীরে নেমে আসে এবং এভাবে পৃথিবী ক্রমে অন্ধকার হয়ে ওঠে।
সুবল লোকজনের বিদায় করে নিজের আশ্রমের মতো ঘরের বারান্দায় বসে থাকে। সে দেখতে পায় পাখিরা উড়ে যাচ্ছে। গাছের ছায়া লম্বা হয়ে যাচ্ছে, নদীর জলে অন্ধকার নেমে আসছে। এ সময় মনে হয় কেউ আসবে, ঠিক পালিয়ে চলে আসবে, সে তাকে বেশিদিন না দেখে থাকতে পারে না। এমন একটা আশ্চর্য ফুলের উপত্যকা আর কোথাও নেই সে জানে। আর তখনই মনে হয় দূরে ছায়াছবির মতো ভেসে উঠেছে টুকুনদিদিমণি। এমন ফুলের উপত্যকা পেয়ে টুকুনদিদিমণি প্রায় যেন ভেসে ভেসে চলে আসছে। সে চোখ মুছে ফের উঠে দাঁড়াল। না, সে অলীক কিছু দেখছে না, ওর ভিতরটা কী যে করছে! টুকুন, হালকা বাদামি রঙের প্রায় ফুলের গাছগুলো মাড়িয়ে ছুটে আসছে। সঙ্গে কেউ আছে, বয়সি মানুষ, তিনিও যুবকের মতো হেঁটে আসছেন। সুবল বুঝতে পারছে না, টুকুনের সঙ্গে কে আসছে! তার বারান্দা ফুলের ডালপালায় ঢাকা। ওর ভিতর থেকেই চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা হচ্ছে, টুকুনদিদিমণি, আমি এখানে।
এখন হেমন্তের সময়। হেমন্তে ফুলের চাষ তেমন জমে না। মানুষজন যারা আছে, খেটে খেটে হয়রান, পাম্পে জল তুলে আনছে, নদী থেকে জল এনে অসময়ে সে যা চাষাবাদ করছে ফুলের, না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। দূরে দূরে সব সাদা কোঠাবাড়ি, ছবির মতো উজ্জ্বল এক ছোট্ট ছিমছাম শহর যেন। পাকা রাস্তা চলে গেছে উপত্যকার ভিতর দিয়ে। নানা জায়গায় সব জলের ফোয়ারা এবং অসময়ে সব ফুলেরা ফুটে আছে। শীতে সে মাইলের পর মাইল গোলাপের চাষ করে থাকে, কে কত বড় গোলাপ ফোটাতে পারে—সুবলের কাছে কে কত বড় মানুষ তার দ্বারা প্রমাণ হবে। আমি এক মানুষ, আমার আছে এক বড় অহঙ্কার, ফুলের মতো ফুল দ্যাখো কী করে চাষাবাদ করে গড়ে তুলেছি। সুবলের মনে হল তখন, টুকুনের কেউ এসেছে সঙ্গে। ওরা, চাঁপা ফুলের যেসব সারি সারি গাছ আছে তার নীচে দিয়ে হাঁটছে। মেহেদি পাতার গাছ চারপাশে সবুজ হয়ে থাকে বলে কীযে সুন্দর লাগে সুবল যখন হেঁটে যায়। লম্বা গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি, ঢোলা সাদা রঙের পাজামা আর ঘাসের চটি, সুবলকে তখন কেমন বনের দেবতা টেবতা মনে হয়!
সুবল কাঞ্চন গাছের নীচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দুটো একটা কাঞ্চন ফুল এখনও ফুটছে। সাদা পাঁপড়ি বুড়োমানুষটার সমাধিতে পড়ছে। আর চারপাশে কী সবুজ ঘাস, ঘাসে এখন সব সাদা ফুল, সব ফুলগুলোই যেন বলছে, আমরা বুড়োমানুষটার হয়ে পৃথিবীতে বেঁচে আছি, বেঁচে থাকব। ফুলগুলো দেখলে সুবলের এমনই মনে হয়। সে আর সেখান থেকে বেরতে পারে না।
সুবল কাঞ্চনের ডাল মুখের ওপর থেকে সরিয়ে ফেলতেই দেখল, ও আর কেউ নয়, টুকুনের বাবা। সে প্রথমেই অবাক, তারপর কেমন অস্বস্তি, তারপর মনে হল বামন হয়ে চাঁদ ধরতে যাওয়ার শামিল, বোধ হয় এক্ষুনি তিনি তাকে তাড়া করবেন, অথবা যেমন তিনি মানুষের সূর্য বগলদাবা করে পালাচ্ছিলেন, এখানে তিনি তেমন কিছু করে ফেলবেন। দূরে নদীর পাড়ে তার দামি গাড়িটা। ডিমের মতো ঘাসের ওপর ভেসে আছে গাড়িটা। সূর্যাস্ত, বনের ছায়া, নদীর জল, সব মিলে সাদা রঙের গাড়িটাকে অতিকায় রাজহাঁসের ডিম ছাড়া ভাবতে পারছে না সুবল। টুকুনের বাবাকে দেখে সে সত্যি ঘাবড়ে গেছে। সে আর পালাতে পর্যন্ত পারল না। ফুলের উপত্যকায় সে একজন বনবাসী মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকল।
অথচ তিনি কাছে এসে বললেন, বাওবাব গাছ এনেছি হে।
সুবল ভেবে পেল না এমন কথা কেন! বলল, বাওবাব গাছ!
—কেন টুকুন যে বলল, তোমার এমন সুন্দর ফুলের উপত্যকাতে একটা বাওবাব গাছ না থাকলে মানাচ্ছে না।
সুবল কেমন সহজ হয়ে গেল। ওর আর টুকুনের বাবাকে ভয় থাকল না। সে ভেবেছিল, আবার কী ঘটেছে, টুকুনকে নিয়ে কী অশান্তি দেখা দিয়েছে সংসারে যে, টুকুনের বাবা এখানে পর্যন্ত ছুটে এসেছেন! সে তো আর যায় না। টুকুনের মা ওর যাওয়া পছন্দ করেন না, এ—নিয়ে বড় অশান্তি গেছে, সে টুকুনকে যেহেতু টুকুনদিদিমণি ডাকে, সেজন্য তার কোনও অশান্তি ভালো লাগে না। সে দেখল তখন টুকুনও কেমন সহজ হয়ে গেছে। পেছনে দাঁড়িয়ে হাসছে। হাসতে হাসতে বলছে, তুমি আমাকে বলতে না, একটা বাওবাব গাছ পেলে এই উপত্যকাতে লাগিয়ে দিতে।
—কিন্তু সে তো রূপকথার গাছ। ছোট্ট রাজপুত্রের দেশে পাওয়া যায়।
টুকুনের বাবা বললেন, ছোট্ট রাজপুত্রের দেশে যা পাওয়া যায়, এখানে তা থাকবে না সে কী করে হয়?
সুবল বলল, আজ্ঞে তা ঠিক। আমার খুব ইচ্ছা—পেলে লাগাই। তবে রূপকথার গাছ তো, পাওয়া যায় না। যা কিছু ভালো, এই ফুলগাছ, লতাপাতা সব এনে লাগাতে ইচ্ছা হয়। তবে গল্পের গাছ তো পাওয়া যায় না। টুকুনদিদিমণি জানে সব। ওটা একটা অন্য গ্রহের গল্প।
—এসো। বলে তিনি সুবলের আশ্রমের মতো ঘরটার দিকে হাঁটতে থাকলেন। হাঁটতে হাঁটতেই বললেন, সব গ্রহের গল্পই আমরা বানিয়েছি। ছোট্ট রাজপুত্রের গ্রহটাতে একজনের মতো থাকার জায়গা আছে।
—তা আছে।
—ওর একটা ভেড়ার বাচ্চা আছে।
—তাও আছে।
—ওর গ্রহের সমুদ্র শুকিয়ে যাবে ভয়ে পাতায় ঢেকে রাখে।
—তা রাখে। আসলে আমরা চাই যে গ্রহেই মানুষ থাকুক, ঈশ্বর তার থাকা খাওয়ার নিরাপত্তা রাখবেন। রাজপুত্রেরও তা ছিল।
সুবল ভেবে পাচ্ছে না এমন সুন্দর সুন্দর কথা টুকুনের বাবা কী করে বলছেন! সে তো জানে টুকুনের বাবার খুব অসুখ। স্ট্রাইক, লক—আউট, ক্লোজার নানারকমের হাঙ্গামায় মানুষটা হৃদরোগে ভুগছেন। অথচ এখানে একেবারে অন্য মানুষ। যদিও এই মানুষটা তার সঙ্গে কোনও খারাপ ব্যবহার করেননি। টুকুনের জন্য ভীষণ মমতা তাঁর। টুকুন যা ভালোবাসে, তিনিও তা ভালোবাসেন। টুকুনের জন্য সুবল যখন ফুল নিয়ে যেত, দেয়াল টপকে, টুকুনের ঘরে পালিয়ে ফুল দিয়ে আসত, তখন সে জানত না ধরা পড়লে খুব সহজভাবে তিনি বলবেন, বড় বাড়িতে এভাবে আসতে নেই। সদর দিয়ে আসবে। টুকুনের তো সময় থাকে না। রোববারে আসবে। বিকেলে সে তোমার সঙ্গে গল্প করতে পারবে। রোববারের বিকেলে টুকুনের কোনও কাজ থাকে না।
টুকুনের বাবা বললেন, এসে খুব ভালো লাগছে। এমন একটা ফুলের উপত্যকা কোথাও থাকতে পারে জানা ছিল না। আমি তো বেশ হেঁটে যাচ্ছি, হাত তুলে তিনি বললেন, ডাক্তারদের কথা আর শুনছি না। বেশ আছি হে। তা তুমি কেমন লাভ টাব কর!
—লাভ!
—এই ফুল বেচে। টুকুন বলল, তোমার নাকি লাখ টাকার ফুল বিক্রি হয় মাসে! তারও বেশি। এত টাকার ফুল বিক্রি করে খুব লাভ হওয়ার কথা।
—লাভ টাব বলে তো কিছু নেই।
—তবে কী আছে?
—যা আছে তাকে আরও বাড়ানো।
—সেটা কার জন্য?
—যারা কাজ করে, যারা এখানে থাকে খায়…..
—তবে তুমি কে?
—আমিও কাজ করি।
—কিন্তু বুড়ো মানুষটা তোমাকে দানপত্র করেছে না?
—তা করেছে।
—তবে তুমি মালিক। তোমার এখানে লেবার আনরেস্ট নেই শুনেছি!
সুবল বুঝতে পারল বিষয়ী মানুষ, তিনি বিষয়—আশয় ছাড়া বোঝেন না। সে তাঁকে বলল, বসুন।
তিনি এমন বড় উপত্যকার বিচিত্র বর্ণের সব ফুল এবং মানুষেরা এখনও কেউ কেউ কাজ করছে দেখে কেমন অবাক। —এরা বুঝি ওভার—টাইম খাটছে।
সুবল বলল, না। কাজ বোধ হয় শেষ করে উঠতে পারেনি।
—তোমার ফুলের গাড়ি কখন যায়?
—ভোর রাতে।
—কতজন লোক এখানে কাজ করে?
—তা অনেক হবে। তার হিসাবটা……
—তুমি কী হে। কোনো হিসেবপত্র রাখো না।
—না, মানে কী জানেন সবাই কাজ করে না তো। সবাই….।
—ওরা কোথায় থাকে?
তিনি আবার বললেন, এ—পাশের ছোট্ট একটা ছিমছাম শহরের মতো চোখে পড়ল। ওখানে কারা থাকে?
—এরা থাকে।
—এসব তুমি ওদের করে দিয়েছে।
—আমি করিনি। ওরা নিজেরাই করে নিয়েছে।
—তা হলে তোমার এখানে সত্যি গোলমাল হয় না।
সুবল হেসে বলল, কীসের গোলমাল?
—এই বোনাস নিয়ে, ইনক্রিমেন্ট নিয়ে।
সুবল ভেবে অবাক হয়ে যায়, এসব কথা সে শোনেনি। যখন সবই ওদের, ওরা যৌথভাবে খেটে এমন একটা উপত্যকা বানিয়ে ফেলেছে, কেন যে ওরা গোলমাল করবে, বুঝতে পারে না।
টুকুনের বাবা বললেন, সুবল তোমাকে আর চেনা যায় না। টুকুন তোর মনে আছে আমরা ট্রেনে আসছিলাম, তখন বিহার পূর্ণিয়া অঞ্চলে কী খরা। নীল রঙের বেতের চেয়ারে বসে তিনি কথা বলছিলেন। একটা নীল রঙের লণ্ঠন কেউ জ্বেলে দিয়ে গেছে। তিনি ফের বললেন তোমার পাখিটার কথা খুব মনে হয়।
সে অনেকদিন আগের কথা। ওরা তিনজনই মনে করতে পারে—কোথায় কবে এক প্রচণ্ড খরায় সব জ্বলে যাচ্ছিল, একদল তৃষ্ণার্ত লোক ট্রেন আটকে জল লুট করেছিল, এবং সুবল সেও এসেছিল জল খেতে। জল খেতে এসে অবাক, এক মেয়ে কী সুন্দর, মোমের পুতুলের মতো বাংকে শুয়ে আছে, উঠতে পারে না, কথা বলতে পারে না, কেবল চেয়ে থাকে, আর কী সুন্দর মুখ তার, দেখতে দেখতে সুবল অবাক হয়ে যায়। জল পান করতে হবে, অথবা সে তার তেষ্টার কথা ভুলে, কেমন ভেবে পায় না, কোথাও এমন সুন্দর মোমের মতো নরম চোখ অথবা কুঁচফলের মতো নাক থাকতে পারে। সে মেয়েটিকে তার জেবের পাখির খেলা দেখিয়েছিল। সুবল, এক আশ্চর্য বালক, জাদুকরের শামিল তখন। টুকুনের বাবা দেখেছিলেন, টুকুন সুবলকে বাংকের নীচে লুকিয়ে রেখেছে, পুলিশ এলে বলছে না নেই, এ—কামরায় কেউ আসেননি। যে মেয়ের মরে যাবার কথা যার কঠিন অসুখ যে ক্রমে স্থবির হয়ে যাচ্ছে তার এমন স্বাভাবিক কথাবার্তা শুনে তিনি চোখ বড় করে ফেলেছিলেন। অথচ টুকুনের মা—র কী যে স্বভাব, কোথাকার এক নচ্ছার ছেলে উঠে এসেছে, তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি, চাল নেই, চুলো নেই, হয়তো মন্ত্র—টন্ত্রও জানে, মেয়েটাকে বশ করার তালে আছে, প্রায় জোরজার করে ব্যান্ডেলে গাড়ি এলে তিনি সুবলকে নামিয়ে দিয়েছিলেন।
অথচ সুবল মনে করতে পারে, এক হাসপাতালে আবার দেখা টুকুনের সঙ্গে। সে তার পাখিটাকে নিয়ে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সে ডাব কেটে বিক্রি করত। সে ভেবেছিল, তখন শহরে এটাই সবচেয়ে ভালো কাজ। সে প্রায় নিজের মতো করে একটা জলছত্রও দিয়েছিল। আরও অনেক কাজ, এবং কাজের ভিতরই সে ফের হাসপাতালের জানালায় আবিষ্কার করেছিল টুকুনদিদিমণিকে। সে তখন প্রাণপণ, সেই জানালায় দাঁড়িয়ে পৃথিবীর নানারকম আশ্চর্য গল্প, রূপকথার গল্প, জাদুকরের দেশে মুণ্ডমালার গল্প বলে টুকুনদিদিমণিকে সাহস দিত। বেঁচে থাকতে বলত। কারণ সে বিশ্বাস করতে পারত না, পৃথিবীতে সুন্দর মেয়েরা কখনও মরে যায়।
সুবলের এমন প্রাণপণ খেলা দেখে টুকুনেরও ভারী ছুটতে ইচ্ছা হত। টুকুন এই যে এখন বসে আছে, সুবল বসে রয়েছে সামনে, বাবা পাশে, বাবা সন্দেশ দুধ খাচ্ছেন, সুবল চা খাচ্ছে, সে চা ডিম ভাজা খাচ্ছে, এরই ভিতর যেন এক আশ্চর্য সৌরভ সে পায় সুবলের শরীরে, সুবলের কথা মনে হলেই সেই সব পুরনো দিনের কথা মনে হয়—এবং সুবলই পৃথিবীতে একমাত্র বাওবাব গাছ খুঁজে আনতে পারে—তার বিশ্বাস হয়। সে ভাবতে থাকে, সুবল না থাকলে, সে বুঝতে পারত না, ছোট্ট রাজপুত্রের কোনও গ্রহাণু থাকতে পারে, আর সেখানে আগ্নেয়গিরির মুখ ঢেকে রাখার জন্য বাওবাব গাছের পাতা লাগে।
তারপর আরও কীসব দিন গেছে টুকুনের। সুবল একবার এল ফুল নিয়ে। সব দামি গোলাপ, তখন সুবলকে চেনা যেত না। সে পালিয়ে আসত, আর কী রোমাঞ্চ, সে এলেই মনে হত শরীরের যাবতীয় অসুখ কেমন সেরে গেছে! টুকুন তখন নাচতে পারত, সে জোরে পিয়ানোতে নানা বর্ণের স্বর তুলতে পারত। যেন কবিতার মতো এক ঘ্রাণ আছে সুবলের চোখে মুখে, সুবল এলেই শরীরের সব কষ্ট এক মায়াবী সৌরভে মুছে যেত। ঘরের সাদা অথবা হলুদ রঙের দেয়ালে টুকুন মাঝে মাঝে তখন বনের দেবী হয়ে যেত।
এবং এভাবে এক শাহেন—সাহ মানুষ, সব অহঙ্কার মুছে আজ এখানে চলে এসেছেন। সুবলের ভারী ভালো লাগছে। তিনি বললেন, তোমার বুড়ো মানুষটা কোথায় থাকত?
—এ ঘরেই।
—তোমাকে খুব ভালোবাসতেন তিনি?
টুকুন বলল, বাবাকে দেখাবে না! অর্থাৎ টুকুন বাবাকে সেই বুড়ো মানুষটার সমাধি দেখাতে চায়। কতদিন টুকুন পালিয়ে এসে সবুজ ঘাসে কাঞ্চনের ছায়ায় চুপচাপ বসে রয়েছে। কতদিন পালিয়ে এসে বেশ রাত করে ফিরেছে। টুকুনের মা শেষ দিকে নানাদিক ভেবে ওর বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরিবারের মান—সম্মানের কথা ভেবে, তা ছাড়া টুকুনের এটা পাগলামি ছাড়া কী, কোথাকার এক ফুলয়ালা, যার চাল নেই, চুলো নেই, শহরে এখন ফুল বিক্রি করে খায়, তেমন এক মানুষের সঙ্গে টুকুনের এসব ঘটনা বড় পীড়াদায়ক। তিনি টুকুনকে আর বের হতে দিতেন না।
আর বিকেলে কী মনে হয়েছিল টুকুনের বাবার, হঠাৎ এসব হতেই বুঝি ভিতরে একটা গোলমাল দেখা দেয়। যা এতদিন সত্য জেনেছেন, সব মনে হয় অহমিকার কথা। সেই ফুলওয়ালার কাছে যেতে মনে হয়, টুকুন নিশিদিন যায়, গল্প করতে ভালোবাসে। —বাবা, সুবল তো তোমার মতো ভাবে না, সে তো তোমার যম দুঃখ পায় না। এখানে তো মানুষেরা মানুষের মতো কাজ করছে। নদী থেকে জল আনছে। লতাপাতা থেকে সার বানাচ্ছে। চারপাশে নানারকম পাম্প সেট, যখন যেখানে জল দরকার চলে যাচ্ছে। কারও নালিশ নেই, কারও তেমন ব্যক্তিগত উচ্চাশা নেই, বেশ তো ওরা। সারা উপত্যকাময় কীসব সুন্দর সুন্দর ফুল ফুটে আছে।
এবং এভাবেই তিনি মেয়েকে নিয়ে এসেছেন এখানে। স্ত্রী জানেন না। মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। যেন দেখতে চান, যথার্থই পৃথিবীতে কোনও ফুলের উপত্যকা গড়ে উঠতে পারে কী না। তিনি বললেন, চলো, কাঞ্চন গাছগুলোর নীচে গিয়ে বসি।
সুবল বুঝতে পারল, তিনি সেই বুড়ো মানুষটার সমাধির পাশে বসে থাকতে চান। সুবল যেতে যেতে বলল, বুড়ো মানুষটার একমাত্র অহঙ্কার ছিল, কেউ ওর মতো ফুলের চাষ জানে না। ফুলের দালাল ঠকিয়ে ফুল নিয়ে যেত, কিছু মনে করতেন না। কেবল বললেই হত, মিঞাসাব আপনার ফুলের মতো ফুল আর কার আছে। তিনি তার পরিশ্রমের পয়সা পেতেন না। একটু থেমে বলল, ফুলের দালালি করতে এসে এখানে থেকে গেলাম। কেমন বুড়োমানুষটার জন্য মায়া হল। এর কাজ করতে কষ্ট হলে কাজ করে দিতাম। বন থেকে পাতা এনে দিতাম। পাতা পুড়িয়ে তিনি জমির সার বানাতেন! তাঁর কাছে আশ্চর্য সব খবর জেনে নিলাম। তার ফুলের চাষ এত কেন ভালো, বনের কোন গাছ, কী পাতা কোন সময়ে পোড়ালে কোন ফুলের উপকারে আসে, পৃথিবীতে কেউ বোধ হয় ওঁর চেয়ে তা ভালো জানতেন না। তখন বুড়ো মানুষটার আমি বাদে আর কেউ ছিল না।
বাবা বললেন, সুবল তোমার অহঙ্কার হয় না? শহর থেকে কত মানুষজন এই ফুলের উপত্যকা দেখতে আসছে—এতবড় এক ফুলের উপত্যকা তুমি গড়ে তুলেছ এখানে। সব মানুষের জন্য রেখেছ সমান দায়িত্ব, বড় শহরে সকালে যায় সারি সারি ফুলের গাড়ি, তোমার মনে হয় না রাজার মতো বেঁচে আছ?
সে বলল, আজ্ঞে না। আমার তখন বুড়ো মানুষটার কথা মনে হয়।
—কী বলেন তিনি?
ওরা সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে বসে রয়েছে। টুকুন এখন নানা বর্ণের ফুলের ভিতর ঘুরে ফিরে কেমন মজা পেয়ে গেছে, সামান্য জ্যোৎস্নায় ছুটতে পর্যন্ত ইচ্ছা করছে। তখন সুবল বলছে বুড়োমানুষটার কথা। সে বলল, তিনি বলতেন, আল্লা খুব সরল। তিনি চান পৃথিবীতে সরল এবং ভালোমানুষরা সুখে থাকুক। তারপরই সুবল কেমন চুপ হয়ে যায়। একটু পরে থেমে থেমে সুবল বলল, তিনি বলতেন, সব লতাপাতার ভিতর, ফুলফলের ভিতর এবং সব গ্রহ—নক্ষত্র, অথবা এই যে সৌরলোক, যা কিছু আছে চারপাশে, সবার ভিতর তিনি আছেন। কোনো উপাস্য নেই তিনি ভিন্ন। তিনি রাজার রাজা। তিনি সবচেয়ে প্রাজ্ঞ। যা কিছু আছে আকাশে আর যা আছে পৃথিবীতে—সব তাঁর। তিনি জানেন সবকিছু। সৃষ্টি—স্থিতি—প্রলয় তাঁর অন্তর্লোকের রহস্য। তিনি জানেন একমাত্র কী আছে সামনে আর কী আছে পেছনে। তাঁর আসন আকাশ আর পৃথিবীর ওপরে বিস্তৃত। আর এ—দুয়ের তিনি নিশিদিন রক্ষাকারী। তার জন্য তিনি ক্লান্ত বোধ করেন না।
সুবল কী দেখল এবার। সে দেখল টুকুন ঘাসের ভিতর কাঞ্চন ফুলের পাঁপড়ি সংগ্রহ করছে। কী সুন্দরভাবে উবু হয়ে বসেছে। কী মায়ায় ভরা মুখ! সে কিছুতেই বেশি আশা করতে পারে না। সে বলল বুড়োমানুষটার কথা মনে হলে নিজেকে কিছুই ভাবতে ভালো লাগে না। এমন কথা শুনলে আপনার বিশ্বাস হবে কিনা জানি না।
টুকুনের ভারী আশ্চর্য লাগে সেই সুবল, ফুটপাতে সে ঘুরে বেড়াত, যার কোনও ঠিকানা ছিল না, নিজের বলতে কিছু ছিল না, কী করে সেই মানুষ এমন সুন্দর একটা ফুলের উপত্যকা যা মাইলব্যাপী কী তারও বেশি হবে কতদূর গেছে সে ঠিক জানে না, কীভাবে গড়ে তুলেছে!
সুবল ফের বলল, তিনি প্রায়ই মুসার কথা বলতেন। বলতেন বারোটি প্রস্রবণের কথা। লোকদের জন্য তিনি জল চাইলেন। মরুভূমিতে কোথায় জল! অথচ দৈববাণী, মুসা তার লাঠি দিয়ে বারোটা পাথরে বাড়ি মারলেন। জল উপছে ঠান্ডা জলের প্রস্রবণ। মুসা বললেন, জল পান করো মনুষ্যগণ। আল্লাহ যে জীবিকা দিয়েছেন তা থেকে খাও আর পান করো। অন্যায়কারী হয়ে দেশে অপবিত্র আচরণ কোরো না।
সামান্য জ্যোৎস্নায় টুকুন বুঝতে পারল, বাবার মুখ কেমন শুকনো দেখাচ্ছে। আসলে কী সুবল বাবাকে অন্যায়কারী ভাবছে। অন্যায়কারী ভেবে গল্পটা বলছে! বাবাও কী ভেবে ফেলেছেন তিনি অন্যায়কারী। সংসারের জন্য তিনি অনেক অন্যায় কাজ করে ফেলেছেন। রাতে এজন্য তিনি ঘুমোতে পারেন না। মনে হয় কেউ তাঁকে গলা টিপে মারতে আসছে।
তারপরই বাবার মুখ ফের কেমন সরল সহজ হয়ে যায়। তিনি বলতে থাকেন, তোমার এখন শুধু দেখছি একটি বাওবাব গাছ হলেই হয়ে যায়।
সুবল কেমন বোকার মতো বলে ফেলল, হয়ে যায়।
টুকুন হাসবে কী কাঁদবে বুঝতে পারছে না। কারণ সুবল বাবার কথা ঠিক ধরতে পারছে না।
আর এভাবেই জীবনের কোনও সুসময়ে কিছু ভালো কাজ করে ফেলতে ইচ্ছা হয়। টুকুন সুবলকে ভীষণ ভালোবাসে। টুকুনের জন্য পৃথিবীর সব দামি অথবা মহার্ঘ যুবকেরা অপেক্ষা করছে। অথচ টুকুন সেই শৈশব থেকে এই পাখিয়ালার প্রেমে পাগল। মানুষের স্বভাবে কীযে থাকে! বাড়ির সবাই যখন ভেবেছে সাময়িক খেয়াল, তখন বাবা বুঝতে পারেন, টুকুন এমন একজন সৎমানুষকেই সারাজীবন ধরে চেয়েছে। সে এর চেয়ে বেশি কিছু চাইতে পারে না। তিনি তো দেখছেন যেসব যুবকেরা টুকুনের পাশে ঘোরাফেরা করে, এই যেমন ইন্দ্র, সে টুকুনকে না পেলে রুমপাকে বিয়ে করবে। ওতে ওর আসে যায় না। কিন্তু এই ফুলের উপত্যকাতে এসে বুঝতে পেরেছেন, সুবল পৃথিবীর চারপাশে নিরন্তর খুঁজে যাবে একটি বাওবাব গাছ, না পেলে সে একা হেঁটে যাবে। কারণ ওর চোখমুখ দেখলেই বোঝা যায়, গল্পের গাছটা ওর খুব দরকার। গল্পের গাছটা এই উপত্যকাতে না লাগাতে পারলে ওর ভারী দুঃখ থেকে যাবে। সারাদিন পরিশ্রমের পর মানুষের এমন একটি গাছের ছায়ার দরকার। আজীবন তিনিও তা চেয়েছেন। সঠিক গাছের ছায়া পেলে হয়তো তিনি এমন অন্যায়কারী হয়ে যেতেন না।
এবং এভাবেই টুকুন এখন প্রায় সব ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে, সুবলের পাশে হাঁটতে পারলে পৃথিবীতে সে আর কিছু চায় না এবং ভেবে ফেলেছে, সেই ছোট্ট রাজপুত্রের গ্রহাণুর মতো এটা সুবলের গ্রহাণু। এখানে মানুষের কোনও কষ্ট নেই, এখানে মানুষেরা খেটে খায়, পরিশ্রমের বিনিময়ে বাঁচে। সুবলকে খুব বড় মনে হয় তখন। আর রাগ হলে ভাবে ভীষণ অহঙ্কারী।
বাবা বললেন, বুঝলে হে সুবল, দেখেশুনে মনে হল, খুবই দরকার বাওবাব গাছের।
সুবল বোকার মতো যেই বললে, খুবই দরকার, তখন টুকুন ফিস ফিস করে বলল, এই কী যা—তা বলছ।
তিনি গাড়ির কাছে গিয়ে বললেন, বাড়িতে আছে। বড় হচ্ছে। যখন সময় হবে নিয়ে আসবে। বুঝতে পারছি, গাছটা না হলে তোমার এমন সুন্দর ফুলের উপত্যকা সত্যি শ্রী—হীন হয়ে থাকবে। মনে হয় তোমার এই উপত্যকাতে বাওবাব গাছ লাগিয়ে দিতে পারলেই আমার ঘুম আসবে। আমি ভালো হয়ে যাব।
