Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » অসহায়ের চুপকথা || Roma Gupta

অসহায়ের চুপকথা || Roma Gupta

কুয়াশাচ্ছন্ন হাঁড় কাঁপানো শীতের সকালে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। একজন পঁচাত্তরোর্ধ বয়স্কাবৃদ্ধা যুবুথুবু ভাবে হেঁটে আসছেন আমারই দিকে। এসেই প্রশ্ন ‘ মা শহরে যাবো, এখান থেকে বাস পাবো তো’। আমি বললাম ‘হ্যাঁ’। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম উনি খুব দুর্বল। নির্দিষ্ট সময়ে বাস আসলে কনডাক্টর উনাকে উঠতে সাহায্য করে বললেন – মাসে একবার কোথায় যে যায়?

আমিও সেই বাসেরই যাত্রী। কনডাক্টরের কথা শুনে মনে কৌতূহল হলো, এমন যুবুথুবু বয়স্কাবৃদ্ধা একা একা কোথায় যান প্রতি মাসে একবার!
বাড়ির কোনো লোকজন সাথে নেই ; – একা রাস্তায় ছাড়ে কী করে!
নাকি ওনার কেউ নেই! তাহলে শহরে কোথায় যান?

সিট পাইনি আমি। ওনার সিটের পাশে দাঁড়িয়ে ওনার বিষয়ে ভাবতে ভাবতে চলেছি।
কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধার পাশের সিট ফাঁকা হলে বসলাম ওনার পাশে।
জিজ্ঞাসা করলাম – এমন শীতে এই বয়সে একা একা শহরে যাচ্ছেন? আজকেই ফিরবেন বুঝি?
বৃদ্ধা – কাঁপা গলায় বললেন,’হ্যাঁ মা একটু যেতে হচ্ছে।’
বললাম, আমিও শহরে যাচ্ছি, আপনি নামবেন কোথায়?
বাড়ির লোক এই বয়সে একা ছাড়লো আপনাকে? কার কাছে যাচ্ছেন?

বৃদ্ধা বললেন, আমার সাতকুলে কেউ নেই গো মা। একটা নাতি আছে , সে বোবা, কথা কইতে পারে না। তবে শুনতে পায়। ইশারায় কথা বলে – আমি বুঝতে পারি।

বললাম, নাতি কোথায় থাকে ? তাকে বাড়িতে রেখে এসেছেন? বয়স কত তার?
বৃদ্ধা – বয়স তেরো হয়েছে। শহরে ‘বকুলতলা বোবা- কালা ইস্কুলে’ থাকে।
আপনার নাতির বাবা – মা কোথায়?
বৃদ্ধা – ঐযে বললাম, আমার কেউ নেই, এক নাতি ছাড়া। তার জন্যই তো আমার কষ্ট করে আসা।
যতদিন বেঁচে আছি একটু চোখের দেখা দেখতে যাই।
আমি ছাড়া তার তো কেউ নেই।
— কেন , আপনার ছেলে – বৌমা?

বৃদ্ধা – কি বলবো মা, ছেলে আমার হঠাৎ দু’দিনের জ্বরে মারা গেলো।শোকে আমি কাতর।
নাতির বয়স তখন দুবছর। তখনো বুঝতে পারিনি সে বোবা। আলতো , আধো আধো কথা শুনে তাকে আদর করে আমিই আঁকড়ে ধরে রেখেছি,- আমার ছেলে কানাইয়ের সন্তান। তাকে তো বড় করতে হবে।
কিন্তু দিন গেলে দেখি, সে কথা বলতে পারেনা, কানে শুনতে পারে বুঝতে পারি। কারণ, কোনো শব্দ শুনলে আচমকা চমকে উঠে ইশারায় বোঝাবার চেষ্টা করতো।
কিন্তু আমার বৌমা সহ্য করতে পারতো না।তুচ্ছ করতো, অবহেলার চোখে দেখতো। ঠিকমত খাবার দিতো না।
যা করতাম আমিই করতাম।
কোলে করে নিয়ে রোজ সকালে গ্ৰামের মোড়লের বাড়ি গিয়ে ধান ঝাড়ার কাজ করতাম। এভাবেই কোনোরকমে সংসার চালাতাম।
এদিকে আমার বৌমা রান্নাবান্না , ঘর সংসারের কাজ না করে পাড়াময় ঘুরে বেড়াতো।
তারপর একদিন কোন্ ছেলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করে নিলো।
আমি আর কি করি! নাতিকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করতাম। ঘরে এসে দু-টো ভাত ফুটিয়ে দুজনে খেতাম।
মোড়ল গিন্নি পরে আমার কষ্ট দেখে দুপুরে দুমুঠো খেতে দিতো।
নাতিকে দেখে ওদের মায়া হলো। নাতি যাতে কিছু পড়াশোনা শেখে, সাবলম্বী হয় তাই মোড়ল দয়া করে ওই বোবা-কালা ইস্কুলে ভর্তি করে দেয়।
আমি এখন একাই থাকি। কি করবো! ভগবান আমাকে এমনি সুখের কপাল দিয়েছে। অশ্রুসজল নয়ন, ঠোঁট কাঁপছে।

গায়ে হাত বুলিয়ে আমি বললাম, বকুলতলা ওই ইস্কুলের পাশে আমার বাপের বাড়ি, সেখানেই আমি যাচ্ছি।
আপনি তো প্রতি মাসে নাতিকে দেখতে আসেন! কি করেন সেখানে গিয়ে।
বৃদ্ধা – নাতির সঙ্গে কথা বলি আর বড়-দিদিমণির হাতে টাকা দিয়ে আসি যাতে আমার নাতিটাকে ঠিকমতো দেখে- ভালো খাবার দেয়।
— কত টাকা দিতে হয়?
বৃদ্ধা – আমি আর কত দিতে পারি। আমি গরিব। এখন আর কাজও করতে পারি না। ভিক্ষা করে খাই।যা পয়সা পাই, তাই জমিয়ে একহাজার টাকা এনে দিই।
আমার অবস্থা দিদিমণি জানে, তাই এটাই খুশি মনে নেয়।
নাতিও অনেক কিছু শিখেছে, হাতের কাজ ভালো পারে।
‘এসে গেছে বকুলতলা, বুড়িমা নামুন এবার’।
কন্ডাক্টরের কথায় সম্বিত এলো। আমাকেও নামতে হবে।
বৃদ্ধার হাত ধরে ধীরে ধীরে বাস থেকে নামালাম।
শীতের হিমেল হাওয়ায় বৃদ্ধার হাত কাঁপছে। লাঠি হাতে ধীরে ধীরে হাঁটছেন। গায়ে জীর্ণ মলিন পাতলা চাদর দেখে আমার গায়ের চাদরটা খুলে জড়িয়ে দিলাম ওনার গায়।
বৃদ্ধা ইতস্তত হয়ে বললেন ‘মা তোমার চাদর দিলে, তোমার যে ঠান্ডা লাগবে!’
বললাম, আমার গায়ে সোয়েটার আছে। আপনার নাতি বড় হয়ে ওঠা পর্যন্ত আপনার সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকা খুব প্রয়োজন।
মৃদু হাসলেন, আর ইশারায় উপরের দিকে আঙুল তুলে ভগবানের ইচ্ছা বোঝালেন।

আমারও খুব মায়া হলো, সঙ্গে গেলাম ইস্কুলে।তখন সাড়ে বারোটা বাজে। দু’টোর আগে দেখা করা যাবেনা। বৃদ্ধাকে ততক্ষণ ওয়েটিং রুমে বসে থাকতে হবে।
বললাম – এতক্ষণ বসে থাকতে হয় নাকি? আসার সঙ্গে সঙ্গে দেখা করতে দেয় না? এ তো অনেকটা সময় আপনাকে বসে থাকতে হবে। ফিরতে তো অনেক দেরি হয়ে যাবে!
বৃদ্ধা – সে নিয়ম তো নেই। দুটো বাজলে তবে দেখা করা নিয়ম।
প্রতিবার আমি এসে এভাবেই বসে থাকি।
দুটো বাজলে বড় দিদিমণির সঙ্গে শুভ আসে। নাতির শুভ নাম রেখেছে বড় দিদিমণি।
আমি বললাম, তাহলে চলুন আমরা সঙ্গে আমার বাপের বাড়ি। একটু বিশ্রাম নিয়ে দুটোর সময় এখানে চলে আসবো। বৃদ্ধা কিছুতেই রাজি হলেন না।

অগত্যা আমি চলে এলাম বাপের বাড়ি। এসে মা’কে সব বললাম। মা’র চোখে জল এলো। বললেন, মাগো কোন দিন রাস্তায় পড়ে মরবে এই বৃদ্ধা – কেউ জানতেও পারবে না ওর পরিচয়! বেওয়ারিশ লাশ হয়ে হয়তোবা পঁচবে মর্গে।

ভাই আমার বিদেশে থাকে। বাবা -মা একাই থাকেন বাড়িতে।
বাবা আসলে সব শুনে বললেন, আমাদের বাড়ির গ্যারেজটাতো ফাঁকাই পড়ে আছে – সেখানে ওনাকে থাকার কথা বলনা।
যদি থাকে ভালোই হয়, ইচ্ছামত নাতিকে দেখতে যেতে পারবেন। ভিক্ষা করতে হবেনা, একটা পেট আমিই চালিয়ে নেবো। আর মাসে একহাজার টাকা ইস্কুলে দেওয়া যাবে।
বাবার আশ্বাস পেয়ে আমি আনন্দে ছুটতে ছুটতে সেই ইস্কুলে গেলাম।তখন দু’টো বেজেছে। দেখছি বৃদ্ধা নাতিকে জড়িয়ে ধরে গায় হাত বুলিয়ে কত আদর করে কথা বলছে। একটা কেক-এর প্যাকেট হাতে দিয়েছে। নাতি হাসছে আর ইশারায় ঠাকুমার কথার উত্তর দিচ্ছে। বড় দিদিমণিও হাসছেন।

সাক্ষাৎ শেষে বৃদ্ধা যখন ফিরছেন বিকেলের বাস ধরতে, তখন আমি অনেক বুঝিয়ে বাপের বাড়ি নিয়ে এলাম।
প্রথমে বৃদ্ধা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না থাকতে।
বাবা আড়ালে আমায় ডেকে নিয়ে বললেন,বুঝলি শিমু বৃদ্ধা অভাবে ভিক্ষাবৃত্তি করে। যথেষ্ঠ ভদ্র বাড়ির মনে হচ্ছে। তাই সংকোচ করছে।তুই যেভাবেই হোক এখানে রাখতে ব্যাবস্থা কর।
আমি বললাম, মাসিমা আপনার বয়স হয়েছে। অতদূর থেকে কিভাবে এর পরে নাতিকে দেখতে আসবেন। পথে মরে পড়ে থাকলে কেউ তো জানতেই পারবে না। এখানে থাকলে আপনি যেদিন খুশি নাতিকে দেখতে যেতে পারবেন।
বাবা বললেন, আপনি এখানে নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনার ঐ বাড়ি আমি আপনার নাতির নামে করে দেওয়ার ব্যবস্থা করবো, যাতে ভবিষ্যতে ও সেখানে থাকতে পারে।
অনেক বোঝানোর পর শেষে থাকতে রাজি হলেন। আমরাও স্বস্তিবোধ করলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *