আমি অশ্বত্থামা ,দ্রোণপুত্র কৃপির স্নেহের সন্তান,
সপ্ত চিরঞ্জীবির এক চিরঞ্জীবি দৈববলে বলিয়ান।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আমিই যে শেষ সেনাপতি,
আসুরিক আচরণে আমার আজ এই অধোগতি।
পিতা আর মিত্র দুর্যোধন যবে হলেন যুদ্ধে হত,
প্রতিশোধ স্পৃহা হলো মনে প্রবল জাগ্ৰত।
জ্বালামুখী হতে নির্গত উষ্ণ তরলের ন্যায় মন,
ক্রুব্ধ আমি পান্ডব বংশের ধ্বংস করিলাম পণ।
ছদ্মবেশে এক রাতে গিয়ে পান্ডব শিবিরে,
ঘুমের মধ্যে বধিলাম দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রেরে।
ভেবেছিলাম পঞ্চপান্ডবে করেছি নিধন,
ভুল ভাঙ্গিল যখন সন্মূখে দেখিলাম পান্ডবগণ।
আচম্বিতে বিস্মিত হয়েও সেদিন করেছিলাম নিজেকে সম্বরণ।
ক্রোধিত পান্ডবগণ বলেন গোপনে কেন করিলে দ্রৌপদীর পুত্রনিধন !
পাষন্ডের মত বলেছি সেদিন পান্ডব বংশের ধ্বংস করেছি পণ।
বংশের বাতি দিতে তাইতো রাখি নাই একজন।
উত্তরার গর্ভ সংবাদ শুনে ভীমসেনের মুখে,
রোষের অনলে পুড়ে প্রতিহিংসা জাগে বুকে।
উন্মত্ত হয়ে গর্ভনষ্ট লাগি নিক্ষেপিলাম ব্রহ্মাস্ত্র ,
তাই দেখে পান্ডবগণ হলেন ভীষণ ত্রস্ত।
মোর পিতা আর সখাকে হত্যা করেছিল ছলিয়া,
শোকে তাই একাজ করেছি উন্মত্ত হইয়া।
কৃষ্ণ আসিয়া কহেন ব্রহ্মাস্ত্র ফিরায়ে লও,
ভ্রূণ হত্যা মহাপাপ নিস্তার নাহি পাও।
দুরাচারী কংস,রাবনও করে নাই এ কাজ,
দ্রোণ পুত্র হয়ে তুমি পিতার রাখিলে না লাজ।
এ মহাপাপ যে ক্ষমারও অযোগ্য,
ব্রহ্মাস্ত্র ফিরায়ে আনি কর ন্যায় কার্য।
ক্ষমা তো চাই নি সেদিন, হয়েছি দম্ভিত,
ক্রোধিত হয়ে কৃষ্ণ করেন দন্ডিত।
কপাল হতে চক্র দ্বারা তুলে নিলেন মোর মণি,
অভিশাপ দিলেন সর্বাঙ্গে ঘা লয়ে বাঁচিয়া থাকিবে তুমি।
পুঁচ রক্ত পড়িবে সদা ,লোকে কাছে নাহি যাবে,
জল যাচি নাহি পাবে আহার না জুটিবে।
সেই হতে আজও আমি ভ্রমিতেছি একা,
ঘৃণা ভরে লোকে দেখে নাহি স্বজনের দেখা।
ব্রহ্মাস্ত্র ফিরাইবার শিক্ষা দেন নাই পিতা,
ফিরাইতে ইচ্ছা হইলেও সেদিন পারি নাই তা।
অর্ধশিক্ষা ছিল মোর সেদিনের ভুল,
অর্ধশিক্ষা ভয়ঙ্কর অহংকারের মূল।
মরিব না অহংকার ছিল মোর মনে,
অমরত্ব দিলেন কৃষ্ণ আজ মরি প্রতিক্ষণে।
কঙ্কালসার দেহ মোর দুর্গন্ধে ভরা,
ন্যুব্জ হয়ে চলি আমি সারা দেহে জরা।
ব্রহ্মাস্ত্রে বিনাশ হয়েছিল উত্তরার গর্ভ সন্তান,
কৃষ্ণ তার পুণ্য বলে পুনঃ সঞ্চারীলেন প্রাণ।
পরবর্তিতে সে সন্তান আসিল ধরনীতে,
পরিক্ষীৎ নামে খ্যাত হলেন মহাভারতে।
শুনিয়া সে সংবাদ শান্তি হলো মনে,
বন্দিলাম মনে মনে শ্রীকৃষ্ণ চরণে।
