Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » ভালবাসার নিউরন (neuron) স্রোত || Robbin Pramanick

ভালবাসার নিউরন (neuron) স্রোত || Robbin Pramanick

আজ রাত পেরোলে -ই মহালয়া। বিছানায় শুয়ে শচীন্দ্রনাথ এপাশ ওপাশ করতে থাকেন । কিছুতেই ঘুম আসছে না ।কিছুদিন হল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ভাল করে হাঁটতে পারছেন না । ডাক্তার দেখিয়েছেন। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা দিয়েছেন ডাক্তার বাবু । এখনও রিপোর্ট সব হাতে পাননি । মন ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। রিটায়ারমেন্টের পরে দশ বছর কেটে গেছে । কখনো এমনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েননি। কাল মহালয়া । কত কথা তাঁর মনে পড়ছে ,বিছানায় শুয়ে ,শুয়ে । ছোট বেলার কথা … তাঁর মস্তিষ্কে স্মৃতিগুলো যেন উথালি পাথালি করছে । দেখতে পেলেন কিশোর বয়সে এবং যৌবনের প্রারম্ভে মহালয়া উপলক্ষে , সকলে মিলে পিকনিক, খাওয়া দাওয়া হত ।কখনও বাড়ির ছাদে এবং বড় হয়ে ক্লাবে চলত । তারপর শোনা হত রেডিও- তে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের চন্ডিপাট – মাতৃপুজার আহ্বান ধ্বনিত হত আপামর বাঙালির হৃদয়ে । সমস্ত মানুষ জেগে উঠত সেই প্রভাতে ।

চাকরি শুরুর প্রথম দিকে ,পুজোর সময় বাড়ি ফেরার আয়োজন শুরু হয়ে যেত দুমাস আগে থেকে । পুজোর আগের দিন , সারা রাত জেগে ট্রেন থেকে নামতেন বর্ধমান স্টেশনে । সেখানে ট্রেন বদল করে হাওড়া স্টেশন। কোন পরিশ্রমই স্পর্শ করত না । নিশাচরের মত , সারারাত জেগে ,বাড়ি ফেরার এক অদম্য আকর্ষণে সব কষ্ট ভুলিয়ে দিত ।

কিশোর বেলার অনুভূতি যেন সেদিনের কথা , বারে বারে ফিরে আসছে । দেখতে পেলেন বুবুনকে। সে যেন লাজুক চোখে দেখছে । কতদিন তার অপেক্ষায় কেটে গেছে দিন রাত্রি । শুধু দুজোড়া চোখ একে অপরকে দেখার জন্য কেটে গেছে কত সময় ! তিনি যেন দেখতে পাচ্ছেন – এইতো বুবুন এগিয়ে আসছে ওঁর দিকে । শাড়ি পরা , দুবেণি ঝুলিয়ে বই খাতা নিয়ে চলেছে স্কুলে । কোনদিন কথা বলার সাহস হয়ে ওঠেনি । অদম্য কৌতুহল আর দেখবার আকর্ষণে সময় পেরিয়ে যেত । শচীন্দ্রনাথের মনে হল , আজ বুবুন কখনও কি ভাবে, সেই সময়ের কথা ! কখনো কি চেনা পথে যেতে যেতে মনে হয় একটি কিশোরের প্রতিক্ষার কথা ! তিনি দেখতে পেলেন, এইতো বুবুন এগিয়ে আসছে । এখনও সুন্দরী আছে, এখনও চোখে কৌতুহল আছে, এখনও সেই চোখে আবেদন আছে ।

শচীন্দ্রনাথ দেখতে পেলেন- তাঁর বিছানার কাছে এগিয়ে এসেছেন তাঁর শাশুড়ি মা । তিনি স্মিত হাস্যে চেয়ে আছেন ওঁর দিকে । শচীন্দ্রনাথ হেসে বললেন – কেমন আছেন এখন ? এতোদিন কোথায় ছিলেন?তিনি কিছু বললেন, বলতে বলতে কোথায় চলে গেলেন। তিনি ভাবলেন এত রাত্রে – কোথায় গেলেন তিনি ! তাঁর মনে পড়ল , তিনি তো দুবছর আগে কালীপুজোর রাত্রে চলে গেছেন, ইহলোক ত্যাগ করেছেন। তবে এখন কোথা থেকে এলেন , কোথায় চলে গেলেন? কিছুই বুঝতে পারছেন না। তিনি তো সত্যিই এসেছিলেন। চুপ করে ভাবছেন। কত সময় কেটে গেল- তারপর দেখলেন একটা মানুষ ওঁর ঘরে ঢুকে পড়েছেন । তাকে চেনেন না । লোকটি বলল – আপনার চা খাওয়ার কাপটা আমাকে দিনতো। শচীন্দ্রনাথ তার নাম জানতে চাইলেন, তুমি কে ,কী তোমার নাম লোকটি কিছু বললনা । একটু পরে আবার বলল – আপনার কাপটি দিন । ঐ রাস্তার কুকুর গুলোর গায়ে ছুড়ে মারব। শচীন্দ্রনাথ ঠিক মত বুঝতে পারলেন না । কেন কুকুরের গায়ে কাপ মারতে চাইছে । শচীন্দ্রনাথ উঠে ব্যালকনির দেওয়ালে ভর করে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন – তুমি এখন যাও । তিনি গোঙাচ্ছেন , নিজের কানে শুনতে পাচ্ছেন তাঁর গোঙানির আওয়াজ। কিন্তু তাঁর আওয়াজ ঠিক মত বেরোচ্ছে না । কেউ কোথাও নেই। হঠাৎই স্ত্রীকে দেখে ডাকলেন। কিন্তু স্ত্রী বললেন – এখন রাত একটা বেজে গেছে । আমি এখন ঘুমোতে যাব , বলে অন্য একটা ঘরে ঢুকে গেলেন । শচীন্দ্রনাথ চিৎকার করে বলে উঠলেন- আমি এখন যাব না । তোমরা ফিরে যাও । কিন্তু তাঁর কোন কথা বেরোচ্ছে না । কেউ শুনতে পাচ্ছে না কেন ?

কিছুক্ষণ পরে সেই লোকটা কোথায় চলে গেছে , আর দেখতে পেলেন না । মনে মনে ভাবলেন এরা হঠাৎই এল বা কোথা থেকে আর চলে গেল কোথায় । আবার গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন । আবার দেখতে পেলেন মুখের কাছে সেজদার মুখটা । সেজদা তো অনেকটাই বয়সে বড় । সেজদাকে দেখে মনে হল বয়স অনেকটা কমে গেছে । অনেকটা সুস্থ ও সবল লাগছে । সেজদা হাসি হাসি মুখে বলল – তুই এখনও ঘুমোসনি? কত রাত হল , শুয়ে পড় এবার। ভোর হলে মহালয়া শুনতে হবে তো । চারিদিকে তখন পটকা ফুটছে, মাইক চলছে, রাত জেগে খাওয়া দাওয়া চলছে । বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে বেজে উঠবে আর একটু পরেই । দেখিসনি, আমাদের বিলের পাশে কেমন কাশ ফুল ফুটে আছে ! হওয়াতে সব কোমর দুলিয়ে নাচছে,এক সঙ্গে সব মাথা নুয়ে পড়ছে । শচীন্দ্রনাথ বললেন – তোমাকে তো অনেকদিন হল দেখতে পাইনি । তোমার শরীর ভাল আছে তো । একটু পরেই সেজদা কোথায় যেন মিলিয়ে গেল । শচীন্দ্রনাথ চোখ বুজে ভাবতে লাগলেন। হঠাৎ মনে পড়ে গেল- সেজদা তো আর নেই। গত বছরই তো আমাদের ছেড়ে চলে গেছে । শচীন্দ্রনাথ স্ত্রীকে উচ্চ স্বরে ডাকতে লাগলেন। কোন সাড়া পাওয়া গেল না । কেউ কি ঘরে নেই? কোথাও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, মাইক বাজছে ,ওখানে আছে? রাত ভোর হয়ে এল । মনে মনে কোন হিসাব মিলাতে পারছেন না। উঠে বসলেন । তারপর ধীরে ধীরে বাথরুমে গেলেন । বাথরুমের আলো জ্বালাতেই নিজের মুখ আয়নায় দেখে চমকে উঠলেন। তাঁর শরীরে পরিপূর্ণ বার্ধক্য দেখা যাচ্ছে । মুখের চামড়া ,গলার ত্বক কুৎসিত দেখতে লাগছে । সব ঝুলে পড়েছে । নিজেকে দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। তারপর আলো সব নিভে গেল । বেরিয়ে এসে ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকলেন । এক গ্লাস জল ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে দিলেন।

কিছুক্ষণ পরেই আবার দেখলেন ওঁর বন্ধু সুকান্তকে ।সুকান্ত ওঁর প্রথম জীবনের সহকর্মী । সুকান্তকে দেখে খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন । বললেন- কত যুগ হল তোকে দেখিনি । কিন্তু তুই এতোদিন কোথায় ছিলি? সুকান্ত কী যে বলছে বুঝতে পারলেন না । সুকান্তকে দুচোখ ভরে দেখছেন। কী সুন্দর দেখতে লাগছে ওকে।দুজনে একসঙ্গে কত কাজ করেছেন! একবার দুই বন্ধু মিলে কোম্পানির অনেক টাকা লাভ করিয়ে দিয়েছিলেন । একটা ইনোভেশন করে উৎপাদনের ফুয়েল খরচ কমিয়ে লাভ করতে সক্ষম হয় ওঁদের উদ্যোগ। কোম্পানি দুজনকে পুরস্কৃত করেছিল।
কিন্তু এখনই তো সুকান্ত ছিল ! এখন কোথায় হারিয়ে গেল । পর্দার ছবির মত সব যেন সরে সরে যাচ্ছে । সব কিছুই ছবির মত । হঠাৎ কী মনে হল মাকে দেখে বললেন- আমাকে একটা বালিশ দাও , মা । তিনি শুনতে পেলেন কি না বোঝা গেল না । পাশের বাড়ির একজন পরিচিত মানুষ কোথা থেকে একটা বালিশ নিয়ে এলেন । বালিশটা দেখে মনে হল, মলিন এবং ধূসর। বালিশটা দড়ি দিয়ে বাঁধা । শচীন্দ্রনাথ পরিচিত মানুষটিকে বললেন – এই বালিশ আমাকে কেন দিচ্ছেন?এইটি তো দেখে মনে হচ্ছে শ্মশানের পরিত্যক্ত বালিশ। এ বালিশে আমার কোন প্রয়োজন নেই । আপনি দয়া করে নিয়ে যান ।

এবার উনি উঠে বসলেন। কেবল ভাবছেন, এতো সময় ধরে এতো মানুষের সঙ্গে দেখা হল , তারা সব কোথায় হারিয়ে গেল !
ততক্ষণে মাইকে বেজে উঠেছে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে – আশ্বিনের শারদ প্রাতে … জেগে উঠেছে আলোর মঞ্জিল …..
মহালয়া শুরু হয়ে গেছে , তিনি কান পেতে রইলন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *