Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » বারুদের আগুন, কারাগারের অন্ধকার, আর এক অসমাপ্ত প্রেম || Bidhayak Das Purkayastha

বারুদের আগুন, কারাগারের অন্ধকার, আর এক অসমাপ্ত প্রেম || Bidhayak Das Purkayastha

১১ আগস্ট ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শুধু একটি তারিখ নয়। এই দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক কিশোরের হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করার কিংবদন্তি—ক্ষুদিরাম বসু। তাঁর ফাঁসির দড়ি কেবল একটি তরুণ জীবনকে থামিয়ে দেয়নি; তা বাংলার বিপ্লবী চেতনায় এমন এক অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল, যার তরঙ্গ বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। মুজফ্ফরপুরের বোমা বিস্ফোরণ, মানিকতলার মুরারিপুকুর বাগানবাড়ি, একের পর এক গ্রেপ্তার, আলিপুরের আদালত, চিত্তরঞ্জন দাশের ঐতিহাসিক সওয়াল, অরবিন্দ ঘোষের খালাস এবং বহু বিপ্লবীর কালাপানির যাত্রা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল ঔপনিবেশিক ভারতের অন্যতম আলোড়ন সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক বিচার।


আলিপুর বোমা মামলা ছিল শুধু একটি ফৌজদারি মামলা নয়। এটি ছিল সাম্রাজ্য ও নবজাগ্রত জাতীয়তাবাদের মুখোমুখি সংঘর্ষ। আদালতে হাজির হয়েছিলেন ৪৯ জন অভিযুক্ত; ২০৬ জন সাক্ষীকে পরীক্ষা ও জেরা করা হয়; বিপুল নথি ও হাজার হাজার প্রদর্শনযোগ্য বস্তু আদালতে উপস্থাপিত হয়। মামলাটিকে পরবর্তী সময়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক landmark pre-independence trial হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


কিন্তু এই মহাকাব্যের শুরু আদালতে নয়। শুরু হয়েছিল বাংলার রাজনৈতিক আকাশে।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বাংলার সমাজ ও রাজনীতিকে আমূল বদলে দিল। স্বদেশি, বয়কট, জাতীয় শিক্ষা ও আত্মশক্তির আন্দোলনের পাশাপাশি গড়ে উঠতে লাগল গোপন বিপ্লবী সংগঠন। অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তরের মতো সংগঠনগুলির একাংশ মনে করেছিল, কেবল আবেদন-নিবেদন বা সাংবিধানিক প্রতিবাদে স্বাধীনতা আসবে না; প্রয়োজন প্রত্যক্ষ প্রতিরোধ।


এই সময়েই অরবিন্দ ঘোষ বাংলার রাজনৈতিক জীবনে প্রত্যক্ষভাবে প্রবেশ করেন। ইংল্যান্ডে শিক্ষিত এবং বরোদায় দীর্ঘদিন কর্মরত অরবিন্দের মধ্যে পাশ্চাত্য রাজনৈতিক চিন্তা ও ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার এক অস্বাভাবিক সমন্বয় তৈরি হয়েছিল। তাঁর লেখনী তরুণদের মধ্যে স্বাধীনতার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলছিল। তাঁর ছোট ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষও বিপ্লবী সংগঠনের কাজে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।
তারপর এল মুজফ্ফরপুর।


কিংসফোর্ড—ডগলাস কিংসফোর্ড—বাংলার জাতীয়তাবাদী মহলে ইতিমধ্যেই কঠোর ও দমনমূলক বিচারক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। সুশীল সেনের উপর তাঁর বেত্রাঘাতের ঘটনা তরুণ বিপ্লবীদের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে প্রতিশোধের পরিকল্পনা হয়। তাঁকে মুজফ্ফরপুরে বদলি করা হলেও বিপ্লবীরা তাঁর পিছু ছাড়েনি।
দুই তরুণ—ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী—দায়িত্ব পেলেন।


১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল মুজফ্ফরপুরে অন্ধকারের মধ্যে একটি গাড়িকে কিংসফোর্ডের গাড়ি মনে করে বোমা নিক্ষেপ করা হল। কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস—গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। নিহত হলেন প্রিঙ্গল কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা। সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক নথিতেও মুজফ্ফরপুরের এই ঘটনাকেই আলিপুর মামলার সূত্রপাতকারী প্রধান ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু তার অভিঘাত ব্যর্থ হয়নি।


প্রফুল্ল চাকী আত্মবিসর্জন করলেন। ক্ষুদিরাম ধরা পড়লেন। তাঁর বিচার, তাঁর হাসি, তাঁর ফাঁসি—সব মিলিয়ে তিনি পরিণত হলেন এক জাতীয় প্রতীকে।


আর ব্রিটিশ সরকার বুঝে গেল—এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পিছনে রয়েছে একটি সংগঠিত বিপ্লবী নেটওয়ার্ক।
তদন্তের সূত্র পৌঁছে গেল কলকাতার মানিকতলার মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে।


বাইরে থেকে বাড়িটি ছিল সাধারণ। সেখানে শরীরচর্চা, যোগব্যায়াম, গীতা পাঠ, আলোচনা—সবই চলত। কিন্তু তার আড়ালে তৈরি হচ্ছিল বিপ্লবীদের গোপন কেন্দ্র। বোমা তৈরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল সেখানে। হেমচন্দ্র কানুনগো ও উল্লাসকর দত্তের মতো তরুণেরা বিস্ফোরক তৈরির রসায়ন নিয়ে কাজ করছিলেন। বারীন্দ্রকুমার ছিলেন সংগঠনের অন্যতম প্রধান মুখ।


মুজফ্ফরপুর বিস্ফোরণের পর বিপদের গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। অরবিন্দ সতর্ক করেছিলেন, পুলিশ মুরারিপুকুরে হানা দিতে পারে। কিন্তু সবকিছু সরিয়ে ফেলার মতো সময় আর ছিল না।


১৯০৮ সালের মে মাসে পুলিশ অভিযান চালাল।
বারীন্দ্রকুমার ঘোষসহ বহু বিপ্লবী গ্রেপ্তার হলেন। অল্প পরেই অরবিন্দও গ্রেপ্তার হলেন। শুরু হল সেই বিচার, যা ইতিহাসে আলিপুর বোমা মামলা নামে অমর হয়ে থাকবে।


বিচারের আনুষ্ঠানিক Sessions trial শুরু হয় ১৯০৮ সালের ১৯ অক্টোবর, বিচারপতি চার্লস পোর্টেন বিচক্রফটের আদালতে। শেষ পর্যন্ত ২০৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা হয় এবং ১৯০৯ সালের ৬ মে রায় ঘোষিত হয়।


এই মামলার একটি অদ্ভুত ঐতিহাসিক পরিহাস ছিল বিচারক ও প্রধান অভিযুক্তের সম্পর্ক।
বিচক্রফট এবং অরবিন্দ একই সময়ে কেমব্রিজে পড়াশোনা করেছিলেন। একসময় তাঁরা ছিলেন সহপাঠী; এখন একজন বিচারকের আসনে, অন্যজন তাঁর আদালতে অভিযুক্ত। একই শিক্ষাঙ্গনের স্মৃতি পেরিয়ে তাঁদের অবস্থান দাঁড়িয়েছিল আইন ও অভিযুক্তের দুই প্রান্তে।
আদালতের পরিবেশ ছিল কঠোর। অভিযুক্তদের নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হত; পুলিশ মোতায়েন থাকত সর্বক্ষণ। সরকারি কৌঁসুলি আর্ল্ডলি নর্টনও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মামলা পরিচালনা করছিলেন। মামলাটি ছিল ব্রিটিশ সরকারের কাছে শুধু একটি অপরাধের বিচার নয়—বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের এক পরীক্ষা।


কিন্তু এই নাটকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রদের একজন ছিলেন নারেন গোস্বামী।
তিনি অভিযুক্তদের মধ্যেই ছিলেন। পরে তিনি সরকারি সাক্ষী বা approver হয়ে ওঠেন। তাঁর সাক্ষ্য প্রসিকিউশনের পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারত। বিপ্লবীরা বুঝেছিল, তাঁর সাক্ষ্য আদালতে পৌঁছলে বহু মানুষের বিরুদ্ধে বিপজ্জনক প্রমাণ তৈরি হতে পারে।
তারপর আলিপুর জেলের ভিতরেই ঘটল আরেকটি বিস্ফোরণ।


কানাইলাল দত্ত ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু নারেন গোস্বামীকে হত্যা করেন। কানাইলাল ধরা পড়লেন, বিচার হল এবং ফাঁসিতে ঝুললেন। সত্যেন্দ্রনাথও একই পরিণতি বরণ করলেন। আলিপুর মামলার বিচারপর্বেই কানাইলালের এই হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে এবং ১৯০৮ সালের ৩১ আগস্ট আলিপুর জেলেই নারেন গোস্বামী নিহত হন।


এই ঘটনায় প্রসিকিউশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ভেঙে পড়ে।
আর আদালতের বাইরে এক তরুণ আইনজীবী তখন নিজের জীবনের অন্যতম বৃহৎ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি চিত্তরঞ্জন দাশ।


অরবিন্দের পক্ষে তাঁর সওয়াল ভারতীয় আইন-ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। তাঁর যুক্তির মূল কথা ছিল—অরবিন্দ জাতীয়তাবাদী চিন্তার প্রবক্তা হতে পারেন, স্বাধীনতার কথা বলতে পারেন, রাজনৈতিক আন্দোলনের দার্শনিক হতে পারেন; কিন্তু নির্দিষ্ট সহিংস অপরাধে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের প্রমাণ কোথায়?


এই পার্থক্যটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষ বিপ্লবের আদর্শের প্রবক্তা হতে পারেন; কিন্তু আদর্শের সঙ্গে নির্দিষ্ট অপরাধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকে এক করে দেখা যায় না।
দীর্ঘ বিচার শেষে সেই যুক্তিই কার্যত জয়ী হল।


১৯০৯ সালের ৬ মে অরবিন্দ ঘোষ খালাস পেলেন। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও উল্লাসকর দত্তকে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়; পরে আপিলে সেই সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে রূপান্তরিত করা হয়। আরও বহু বিপ্লবীকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড বা দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হয়; কয়েকজন খালাসও পান। বিচার-নথির সমকালীন বিবরণে এই সাজাগুলির বিস্তারিত তালিকাও পাওয়া যায়।


অরবিন্দ মুক্ত হলেন।
কিন্তু আলিপুর জেল থেকে যে মানুষটি বেরিয়ে এলেন, তিনি আগের অরবিন্দ ছিলেন না।
এক বছর ধরে কারাবাস তাঁর অন্তর্জগৎকে আমূল বদলে দিয়েছিল। জেলের নিঃসঙ্গতার মধ্যে তিনি যে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কথা পরে বলেছেন, তা তাঁর জীবনদর্শনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯০৯ সালের ৩০ মে উত্তরপাড়ার ভাষণে তিনি প্রথম প্রকাশ্যে তাঁর কারাজীবনের সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি কারাগারের দেওয়াল, গাছ, বন্দি—সবকিছুর মধ্যে ঈশ্বরীয় উপস্থিতি অনুভব করার কথা বলেছিলেন।


এই রূপান্তর কোনও হঠাৎ রাজনৈতিক পলায়ন ছিল না। মুক্তির পরও তিনি কিছুদিন জাতীয়তাবাদী লেখালেখি চালিয়ে যান; তাঁর Karmayogin-এর মাধ্যমে জাতীয়তাবাদ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও আত্মশক্তিকে নতুন দার্শনিক পরিসরে স্থাপন করার চেষ্টা করেন। পরে ১৯১০ সালে তিনি পন্ডিচেরিতে চলে যান এবং তাঁর জীবন ক্রমশ আধ্যাত্মিক সাধনার বৃহত্তর পথে প্রবাহিত হয়।
কিন্তু আলিপুর মামলার আরেক অভিযুক্ত তখন ইতিহাসের আরও নির্মম অধ্যায়ে প্রবেশ করেছেন।

উল্লাসকর দত্ত।

উল্লাসকর ছিলেন বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী। রসায়নে তাঁর আগ্রহ, বিস্ফোরক তৈরির দক্ষতা এবং বিপ্লবী কাজে তাঁর সাহস তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল। ব্রিটিশ সরকারের নথিতে তাঁকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক তৈরির বিশেষজ্ঞ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল; আলিপুর মামলায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, পরে সেই সাজা যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে পরিবর্তিত হয়। কথিত আছে, মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরও তাঁর মুখে আতঙ্কের ছায়া পড়েনি। বরং তিনি গান গেয়েছিলেন—
“সার্থক জনম আমার, জন্মেছি এই দেশে।”

এই দৃশ্যের সত্যতা নিয়ে মৌখিক স্মৃতিতে নানা বর্ণনা থাকলেও, উল্লাসকরের কারাজীবন ও তাঁর অদম্য মানসিকতার যে ছবি তাঁর নিজের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়, তা এই কিংবদন্তির অন্তর্নিহিত সত্যকে আরও গভীর করে। তিনি ছিলেন হাস্যরসিক, প্রাণবন্ত এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মানসিক দৃঢ়তা হারাননি।

তারপর এল কালাপানি।
সেলুলার জেল।


যেখানে শাস্তি শুধু শরীরকে ভাঙার জন্য ছিল না—মানুষের মনকেও চূর্ণ করে দেওয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য। কঠোর শ্রম, তেলকল টানা, অসুস্থতার মধ্যেও কাজের নির্দেশ, নিঃসঙ্গতা এবং অমানবিক আচরণ ধীরে ধীরে উল্লাসকরের শরীর ও স্নায়ুতন্ত্রকে বিপর্যস্ত করে দেয়।


একসময় তাঁর মানসিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। জ্বর, নির্যাতন, খিঁচুনি, বিভ্রম—সব মিলিয়ে তাঁর অবস্থা এতটাই সংকটজনক হয় যে তাঁকে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য মাদ্রাজের মানসিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তাঁর কারাজীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই মানসিক বিপর্যয়ের সম্পর্ক তাঁর নিজের স্মৃতিকথাতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।


কিন্তু অন্ধকারের মধ্যেও একটি মুখ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
লীলা।
বিপিনচন্দ্র পালের কন্যা লীলা পাল।

উল্লাসকর ও লীলার সম্পর্ক ছিল তাঁদের যৌবনের এক গভীর প্রেমকাহিনি। দুজনের মধ্যে চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয়েছিল, ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ইতিহাস তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের উপর নির্মমভাবে আঘাত করেছিল। উল্লাসকর গ্রেপ্তার হলেন, বিচ্ছিন্ন হলেন, কালাপানিতে চলে গেলেন। দীর্ঘ বন্দিজীবনে যোগাযোগের পথ প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল।

লীলা অপেক্ষা করেছিলেন।

কিন্তু খবর ছিল না।

চিঠি পৌঁছত না।

উল্লাসকর বেঁচে আছেন কি না—সেটিও অনিশ্চিত।

একসময় দীর্ঘ নীরবতা তাঁকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছিল যে উল্লাসকর হয়তো আর জীবিত নেই। পরে তাঁর জীবন অন্য পথে এগিয়ে যায় এবং তিনি বিবাহ করেন। উল্লাসকর যখন বহু বছর পর মুক্তি পেলেন, তখন তাঁর সামনে অপেক্ষা করছিল আরেকটি নির্মম বাস্তবতা। সমকালীন ও পরবর্তী বিবরণে এই বিচ্ছেদের পেছনে কারাগারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও ভুল বোঝাবুঝির কথা উঠে এসেছে।

১৯২০ সালে উল্লাসকর মুক্তি পেলেন।

বাইরের পৃথিবী বদলে গেছে। মানুষ বদলে গেছে। আন্দোলনের ভাষাও বদলে গেছে।

কিন্তু তাঁর ভিতরের আগুন তখনও নিভে যায়নি।

তিনি জানতে চাইলেন অরবিন্দের কথা। অরবিন্দ তখন পন্ডিচেরিতে। সক্রিয় রাজনীতির পুরনো পথে তিনি আর ফিরছেন না। উল্লাসকর সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মধ্যে এখনও সশস্ত্র বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা জ্বলছিল। এমনকি তিনি কলকাতা থেকে দীর্ঘ পথ সাইকেলে পন্ডিচেরি যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন অরবিন্দকে আবার আন্দোলনে ফিরিয়ে আনার আশায়। প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

কিন্তু উল্লাসকর থামেননি।

তিনি আবার জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে আবারও কারাবরণ করেন। তাঁর জীবন যেন স্বাধীনতার সঙ্গে এক দীর্ঘ অসমাপ্ত কথোপকথন।

এই সময়েই তিনি তাঁর কারাজীবনের স্মৃতি লিখতে শুরু করেন। তাঁর স্মৃতিকথা—দ্বীপান্তরের কথা’ বা Twelve Years of Prison Life—শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা নয়; ঔপনিবেশিক কারাগারে বিপ্লবীদের জীবন ও নির্যাতনের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

আর তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় অসমাপ্ত অধ্যায় তখনও অপেক্ষা করছে।

লীলা।

বহু বছর পর তিনি জানতে পারলেন, লীলা বিধবা। শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ। পক্ষাঘাত তাঁকে প্রায় অচল করে দিয়েছে। জীবন তাঁকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে যৌবনের প্রেমের সমস্ত স্বপ্ন কেবল স্মৃতি।

উল্লাসকর আবার তাঁকে খুঁজলেন।

এইবার আর কোনও বিপ্লবী অভিযান নয়।

কোনও বোমা নয়।

কোনও গোপন সংগঠন নয়।

শুধু একজন মানুষের আরেকজন মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া।

তাঁদের পুনর্মিলনের কাহিনি আজও অবিশ্বাস্য শোনায়। দীর্ঘ বিচ্ছেদ, ভুল বোঝাবুঝি, হারিয়ে যাওয়া চিঠি, বিবাহ, বিধবা হওয়া—সব পেরিয়ে তাঁরা আবার একে অপরের জীবনে ফিরে এলেন। শেষ পর্যন্ত উল্লাসকর লীলাকে নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং তাঁদের বিবাহ হয়। পরবর্তী জীবনে তাঁরা অসমের  শিলচরে বসবাস করেন; সেখানে উল্লাসকর অসুস্থ লীলার দেখাশোনা করেন।

এই প্রেমের গল্পের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অংশটি এখানেই নয়।

স্বাধীনতা এল।

কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে এল দেশভাগ।

উল্লাসকরের কাছে এই স্বাধীনতা ছিল এক গভীর দ্বন্দ্বের মুহূর্ত। যে অখণ্ড দেশের জন্য তিনি যৌবন, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা এবং প্রায় সমগ্র জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন, সেই দেশই ভাগ হয়ে গেল। তাঁর পূর্বপুরুষের ভূমি নতুন রাষ্ট্রসীমার ওপারে চলে গেল। যে মানুষ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, স্বাধীনতার পরে তিনিই নিজের জন্মভূমিতে পরবাসী হয়ে গেলেন।

ইতিহাস কখনও কখনও এমন নির্মম পরিহাস লিখে।

শেষ পর্যন্ত উল্লাসকর ও লীলাকে উদ্বাস্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যে নতুন আশ্রয় খুঁজতে হয়। শিলচরে তাঁরা বসতি স্থাপন করেন। দারিদ্র্য ছিল সঙ্গী; কিন্তু লীলার প্রতি উল্লাসকরের দায়বদ্ধতা শেষ হয়নি। তিনি তাঁর অসুস্থ স্ত্রীকে যতদিন পেরেছেন ততদিন আগলে রেখেছেন।

১৯৬২ সালে লীলা চলে গেলেন।

এবার উল্লাসকরের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হল, তার কোনও রাজনৈতিক ভাষা ছিল না।

এ ছিল নিছক ব্যক্তিগত শোক।

যে মানুষ কালাপানির নির্যাতন সহ্য করেছিলেন, মৃত্যুদণ্ডের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, কারাগারে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েও ফিরে এসেছিলেন, আবার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন—তিনি প্রিয়তমার মৃত্যু মেনে নিতে পারলেন না।

প্রচলিত স্মৃতিতে আছে, তিনি ঘরের দরজা খোলা রাখতেন।

ভাবতেন, লীলা ফিরে আসবেন।

খাবারের একটি অংশ তাঁর জন্য তুলে রাখতেন।

এই দৃশ্যটি যদি সত্যিই তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলির প্রতিচ্ছবি হয়, তবে তা কোনও রোম্যান্টিক উপকথার চেয়েও গভীর। কারণ এখানে প্রেম আর আবেগ নয়—প্রেম হয়ে গেছে অস্তিত্বের অভ্যাস।

একদিন বারুদের বিস্ফোরণে যে যুবক সাম্রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে সেই মানুষটি অপেক্ষা করতেন এমন একজনের জন্য, যিনি আর কখনও দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেন না।

১৯৬৫ সালে উল্লাসকর দত্তের মৃত্যু হয়।

প্রায় বিস্মৃত অবস্থায়।

একসময় যাঁকে ব্রিটিশ সরকার বিপজ্জনক বিপ্লবী বলে চিহ্নিত করেছিল, স্বাধীন ভারতের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর জীবন হয়ে দাঁড়িয়েছিল দারিদ্র্য, স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা ও অপেক্ষার এক দীর্ঘ উপাখ্যান।

তবু তাঁর জীবনকে পরাজয়ের গল্প বলা যায় না।

কারণ তিনি হেরে গিয়েছিলেন কেবল ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতার কাছে; নিজের আদর্শের কাছে নয়।

ক্ষুদিরামের হাসি থেকে আলিপুরের আদালত, মুরারিপুকুরের গোপন আস্তানা থেকে চিত্তরঞ্জন দাশের সওয়াল, অরবিন্দের কারাগার থেকে আধ্যাত্মিক উত্তরণ, কানাইলালের আত্মবলিদান থেকে উল্লাসকরের কালাপানি—সব মিলিয়ে এই ইতিহাস আমাদের সামনে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরে।

স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তান্তর নয়।

তার পেছনে থাকে অগণিত ব্যক্তিগত জীবন।

কেউ ফাঁসির দড়িতে ঝোলে।

কেউ কারাগারে পাগল হয়ে যায়।

কেউ সারাজীবন প্রিয় মানুষকে হারিয়ে বেঁচে থাকে।

কেউ নিজের জন্মভূমি হারায় স্বাধীনতার দিনেই।

কেউ ইতিহাসের পাতায় নাম পায়।

আর কেউ—উল্লাসকর দত্তের মতো—প্রায় বিস্মৃত হয়ে যায়।

কিন্তু বিস্মৃতি ইতিহাসের শেষ কথা নয়।

উল্লাসকর দত্তকে শুধু ‘বোমা বিশেষজ্ঞ’ বলে মনে রাখা তাঁর প্রতি অবিচার। তিনি ছিলেন এক বিপ্লবী, এক রসায়নপ্রতিভা, এক কারাবন্দি, এক লেখক, এক অদম্য দেশপ্রেমিক এবং এক অসাধারণ প্রেমিক। তাঁর জীবনে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা এবং একজন মানুষের প্রতি ভালোবাসা পরস্পরের বিরোধী ছিল না; বরং একই হৃদয়ের দুই ভিন্ন প্রকাশ ছিল।

একদিকে ছিল স্বাধীনতার জন্য মৃত্যুকে বরণ করার প্রস্তুতি।

অন্যদিকে ছিল মৃত্যুর পরেও ফিরে আসবে—এই বিশ্বাসে একটি দরজা খোলা রেখে অপেক্ষা করা।

এই কারণেই উল্লাসকর দত্তের জীবন নিছক বিপ্লবের কাহিনি নয়।

এ এক মানুষের ভিতরে একই সঙ্গে জ্বলে থাকা দুই আগুনের গল্প—দেশপ্রেমের আগুন এবং প্রেমের আগুন

প্রথম আগুন তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল মুরারিপুকুর থেকে আলিপুরে, আলিপুর থেকে কালাপানিতে।

দ্বিতীয় আগুন তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল দীর্ঘ বিচ্ছেদ পেরিয়ে লীলার কাছে।

একটি আগুন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ছিল।

অন্যটি ছিল সময়ের বিরুদ্ধে।

দুটির কাছেই তিনি শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেননি।

আর হয়তো এ কারণেই তাঁর জীবনকে একটি বাক্যে সংজ্ঞায়িত করা যায়—

সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ সে নয়, যে পৃথিবীর সামনে নিজের শক্তি প্রদর্শন করে; সবচেয়ে শক্তিশালী সে-ই, যে এমন সব যুদ্ধ নীরবে লড়ে যায়, যার কথা পৃথিবী জানেই না

উল্লাসকর দত্ত সেই নীরব যুদ্ধের এক অমর সৈনিক।

তাঁর হাতে ছিল বারুদের আগুন।

তাঁর চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন।

আর তাঁর হৃদয়ে—শেষ দিন পর্যন্ত—একটি মানুষের জন্য অমর অপেক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *