Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।

” হ্যালো”
“দাদা, সুপ্রভাত। আমি তরুণ বলছিলাম, বিশ্বাস পাবলিকেশন থেকে।”
” হ্যাঁ বলুন, এত সকালে! “
” বলছি দাদা, আপনি কি পুজোর সংখ্যার লেখাটা শুরু করে দিয়েছেন? “
” হ্যাঁ, না করে উপায় কি বলুন, আপনি যা তাড়া দিচ্ছেন ।” – একটু হেসে উত্তর দিলেন নির্মল বাবু।
” দাদা, কিছু মনে করবেন না, একটা রিকোয়েস্ট ছিল, আর সেটা কিন্তু আপনাকে রাখতেই হবে।”
” কি ব্যাপার বলুন তো!”
” দাদা, আপনি এই লেখাটা স্টপ করে দিয়ে, ওই কারখানার ব্যাপারটাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখুন । লোকে খুব খাবে দাদা, ওটাই এখন হট টপিক। আপনি যা লিখবেন সেটাই পাবলিক নেবে। তাহলে ঐ কথাই রইলো।” বলেই ফোনটা কেটে দিলেন বিশ্বাস পাবলিকেশন এর মালিক তরুণ বাবু।

একটু মুশকিলেই পড়লেন নির্মলবাবু। উপন্যাস লেখার কাজটা খুব বেশী দূর গড়াই নি ঠিকই কিন্তু হঠ করে ছেড়ে দিয়ে অন্য লেখা আচমকা শুরু করাটা একটু মুশকিল। যেকোন কিছু লিখতে বা নতুন কিছু গড়তে একটা মানসিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, তা বিষয় যতই আধুনিক বা সমকালীন হোক না কেনো; আর কারখানার যেই বিষয়টা নিয়ে লিখতে বললেন প্রকাশক সেটা একটু বেশীই মুশকিল। বেকার যুবকদের চাকির পাওয়া যেমন খুব দরকার, তেমনই জমি সংক্রান্ত ব্যাপারে একটা পারস্পরিক সহাবস্থানে পৌঁছানো টাও ভীষণ প্রয়োজন।

নির্মল বাবু এই শহরের একজন নাম করা লেখক। বয়স প্রায় ৫০ এর কাছাকাছি। কর্মজীবনের শুরুতে একটি প্রাইভেট অফিসে জীবন শুরু করেছিলেন, একজন মার্কেটিং ম্যানেজার হিসাবে। বছর দশেক কাজ করে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন, এবং নিজেকে লেখা – লিখিতে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেন। নির্মল বাবুর স্ত্রী একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। তাঁদের একটি মেয়ে আছে সে এবার উচ্চ- মাধ্যমিক এর পরীক্ষার্থী। তাঁর লেখা বাঙালি পাঠক বিশেষ করে যুবক এবং তরুণ প্রজন্মের কাছে, ভীষণভাবে আকর্ষণীয়।

প্রকাশকের এ হেন আবদার নির্মল বাবুর ভীষণ অপছন্দের হলেও অনেক সময় বড় প্রকাশকদের কথা মানতে বাধ্য হতে হয় লেখকদের। বিশেষত যখন লেখা – লিখি টা রুটি রুজির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক চিন্তা করে লেখাটা লিখবেন বলে মনস্থির করলেন এবং নিজের মতো করে ঘটনার বিশ্লেষণ করে উপন্যাসের প্লটটা সাজানোর চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু এই লেখাটা নিজের মতো করে লিখতে গেলেও, স্থানীয় লোকজন ও রাজনীতির কিছু মানুষের সাথে কথা বলা প্রয়োজন। এই ভেবে নির্মল বাবু স্থির করলেন, আজই ওই অঞ্চলে যাবেন। এই লেখার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটা হলো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।

স্বাভাবিকভাবেই, বিশ্বাস পাবলিকেশন থেকে মহালয়ার এক সপ্তাহ আগে পুজোর সংখ্যা প্রকাশিত হলো এবং আগের মতো এই লেখাটিও জন – মানুষের মধ্যে ভীষণভাবে গ্রহণযোগ্য হলো।

মহালয়ার দিন, সকাল বেলায় পিতৃ তর্পণ থেকে ফিরে এসে সবে চা টা মুখে তুলতে যাবেন, এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠলো ।
” দাদা, শুভ মহালয়া। বলেছিলাম না, আপনি যাই লিখবেন পাবলিক খাবে। ফাটাফাটি দাদা।” এক নিঃশ্বাসে, বেশ চেঁচিয়ে বলল তরুণ বাবু।
” সে ঠিক আছে, কিন্তু, ওই মহালয়া কথাটার আগে ‘ শুভ ‘ শব্দটা না ব্যবহার করাই ভালো। “
” ও সব আপনাদের ব্যাপার দাদা, পুজো এসে গেছে, বই বাজারে জমে গেছে, আমাদের কাছে সব শুভ।”
“আচ্ছা, আমার টাকাটা…।”
” পাঠিয়ে দেবো, চিন্তা করবেন না, সপ্তমীর দিন পেয়ে যাবেন।” বলেই ফোনটা কেটে দিলেন তরুণ বাবু।

চা এ চুমুক টা দিতে যাবেন, এমন সময় কলিং বেলটা বেজে উঠলো। নির্মল বাবুর মেয়ে দরজাটা খুলতেই ” আরে কি কান্ড, কেমন আছো সোনা?” কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই ঘরে ঢুকে এলেন চাঁদু বাবু। চাঁদু বাবু এই অঞ্চলের বিরোধী দলের নেতা। পরনে সুতির সাদা জামা ও প্যান্ট। দশ আঙুলের প্রায় সব কাটাতেই সব গ্রহের অবস্থান। সাথে এনেছেন তার দুই সাকরেদ কে। মুখের অর্ধেক টা ঢেকে হাত তুলে বললেন ” নমস্কার দাদা, আমাকে তো আপনি চেনেনই, আমি আর কি বলবো। গতকাল রাতে হাইকমান্ড থেকে ফোন এসেছিল আপনার সাথে দেখা করার, তাই সক্কাল সক্কাল চলে এলাম। আপনি কারখানার বিষয়টা নিয়ে যা লিখেছেন, সত্যি বলতে কী সরকারের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে লড়ার জন্য একটা সঠিক অস্ত্র পেলাম আমরা “।
” না, না, সেরকম কিছু নয়, আমার যেটা ঠিক মনে হয়েছে সেটাই, লেখার মধ্যে ধরার চেষ্টা করেছি। ” বললেন নির্মল বাবু।

“আর ছ’মাস পর ভোট, তার আগে আপনার মতো একজন মানুষ যে ভাবে সরকারের প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠলেন, তারজন্য আমাদের হাইকমান্ড আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আবার দেখা হবে।” – বলে ঘর থেকে দল – বল নিয়ে বেড়িয়ে গেলেন চাঁদু বাবু।

স্বাভাবিক নিয়ম মতো ভোট হলো এবং দেখা গেলো চাঁদুবাবুর দল প্রত্যাশা মতো সরকার গঠন করেছে। এবারের ভোটে অন্যান্য আরো কিছু বিষয়ের সাথে কারখানার বিষয়টা একটা বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল সেটা বলাই যায়।

নতুন সরকার গঠনের ১০ দিন পর একদিন সকালে চাঁদুবাবু আবার এসে উপস্থিত হলেন নির্মল বাবুর বাড়ি। ইতিমধ্যে যাঁদের হাত ধরে এই পরিবর্তন সেই জমির মালিকদের জন্য সরকারের কিছু প্রতিশ্রুতি ঘোষিত হয়েছে কিন্তু চাঁদু বাবুর ক্ষেত্রে অবশ্য প্রতিশ্রুতি পালন ও হয়ে গেছে। চাঁদু বাবু আগেরবার ২ জন সাকরেদ নিয়ে এসেছিলেন এবার সেটা হয়েছে চার, একটা প্রতিমন্ত্রীর পোস্টও তিনি পেয়েছেন । চাঁদু বাবু বললেন, ” দাদা, আমরা আপনাকে গল্প একাডেমির সভাপতি করতে চাই। আপনার প্রতিবাদী ভাষা আমাদের পথ দেখিয়েছে। এই চিঠিটা ধরুন”।

” এটা কি?”

” আপনিই খুলুন। হ্যাঁ, আপনি কিন্তু না বলতে পারবেন না। আমাদের দলের থাকে আপনার ঐ মহান প্রতিভার একটা স্বীকৃতি “।

প্রথমে কিছুটা হতভম্ব হলেও, শান্ত অথচ ধীর কণ্ঠে খামটা খুলতে খুলতে নির্মালবাবু বললেন “এসব কেনো? আমি তো আমার মতো লিখেছি। এতে আর বড় ব্যাপার কি আছে।”

“ওরে বাবা! মাসে এক লাখ টাকা বেতন একটা গাড়ি আবার একজন অ্যাসিস্ট্যান্টও।” পুরো চিঠিটা পড়লেন নির্মলবাবু বললেন ” কিন্তু এত সব দিচ্ছেন অথচ আমার কাজটা কি হবে সেটা তো সেইভাবে কিছু লেখা নেই।”

আধ ঢাকা মুখে একটা মুচকি হাসি হেসে “আপনার কাজ আপনি কিভাবে করবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। খালি এটুকু মনে রাখবেন যে এখন থেকে আপনার বা আপনাদের লেখার বিষয়গুলো প্রকৃতি, প্রেম এইসব নিয়েই থাকবে।” বলেই বেরিয়ে গেলেন চন্দুবাবু। নির্মল বাবু হাতে চিঠিটা নিয়ে চেয়ে রইলেন রাস্তার দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *