স্মরণে হৃত্বিক
2025 – এমন একটি বছর যেখানে আমাদের সুযোগ হয়েছে 5 জন মহারথীর জন্মশতবর্ষ একসাথে পালন বা স্মরণ করার। সলিল চৌধুরী, সন্তোষ দত্ত, নারায়ণ দেবনাথ, সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং হৃত্বিক ঘটক। তাঁদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথা, অবদানের কথা কম – বেশী আমরা সবাই জানি। আমাদের এই স্বল্প পরিসরে সবাইকে একসাথে স্মরণ করার সুযোগও কম (আমি অন্য অনুষ্ঠানে অবশ্য তাদের নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি)। আজ একটু মনে করার চেষ্টা করব, এমন একজনকে যিনি ছোট ছোট কথায়, অল্প সংখ্যক কিছু কাজের মধ্যে তাঁর সৃষ্টিকে এমন গভীর ভাবে বপন করেছিলেন, যা তাঁর শিল্পী স্বত্বাকে ১০০ নয় কয়েকশো বছর হয়তো বাঁচিয়ে রাখবে। যিনি মনে করতেন সিনেমা কেবল ঘরে বসে উপভোগ করার জন্য নয়, জীবন দিয়ে ঘরের বাইরে দেখতে পাওয়া দরকার। সিনেমার মধ্যে নান্দনিকতার পাশাপাশি থাকা উচিত দর্শন, জীবনবোধ, বিচারবোধ এবং সর্বোপরি মানবিকতার পাঠ। নিজের কাজের প্রতি ছিল অসম্ভব আত্মপ্রত্যয়। অকপটে স্ত্রী সুরমা দেবীকে বলেছিলেন, ” টাকাটা তো থাকবে না, কাজটা থাকবে, তুমি দেখে নিও, আমি মারা যাবার পর সবাই আমাকে বুঝবে।” ভারতীয় সিনেমার অন্যতম নক্ষত্র – হৃত্বিক ঘটক।
সত্যজিৎ রায় তাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন তিনি নাকি অনেক বেশী বাঙালি। কিন্তু আদ্যন্ত বাঙালী হয়ে, বাঙালীর কথা বলতে গিয়ে, নিজের অজান্তেই হয়ে পরেছিলেন বিশ্বজনীন। আর সেই কারণেই তিনি সারা বিশ্বের কুশীলবদের কাছে একজন অন্যতম শিক্ষা গুরু।
জীবদ্দশায় বিশেষ খ্যাতি কারোর থেকে পাননি, অথচ সমালোচিত হয়েছেন ভীষণভাবে। কিন্তু তাতে কি এসে যায় তাঁকে তো যজ্ঞের আহুতি দিতেই হতো।
হৃত্বিক কিশোর বয়স থেকে ছোট গল্প লিখতে শুরু করেছিলেন। তার কিশোর মন সেইসময় তার গল্পের ক্যানভাসে ছবি আঁকতো আকাশ নিয়ে, নদীর স্রোত নিয়ে। তার বাড়িতে তিনি রবীন্দ্রনাথকে আসতে দেখেছেন। তাঁর বাবার সাথে আলাউদ্দিন খাঁর বিশেষ সম্পর্ক তিনি চাক্ষুষ করেছেন। তিনি যখন রাজশাহী কলেজের ইংরাজী অনার্সের ছাত্র, সেইসময় তার সাথে বন্ধুত্ব হয় কুমার রায়ের, যিনি কল্লোল যুগের এক অন্যতম নক্ষত্র। যেকোন কারণেই হোক, সেই সময় রাজশাহীতে কিছু সাম্প্রদায়িক ঘটনার সূত্রপাত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। তখন সদ্য যৌবনে পা দেওয়া হৃত্বিক এবং তার বন্ধু কুমার বিশেষভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন। এক অধ্যাপকের পরামর্শে তিনি পড়লেন রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কাব্যনাট্য ‘ বিসর্জন ‘, যা তাঁর আকাশ বা প্রকৃতিকে দেখার যে চোখ তার থেকে তাকে সরিয়ে নিয়ে আসে বাস্তবের কঠিন মাটিতে। ধর্মীয় কুসংস্কার কিভাবে মানুষের জীবনপ্রেম কে নষ্ট করতে পারে, সেটা তিনি কেবল পড়লেন না, সামাজিক কিছু ঘটনার ঘনঘটায় সেই বিষয় গুলোকে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন। তাঁর জীবনের মোড় গেল পাল্টে।
জীবদ্দশায়, তাঁর সিনেমা নিয়ে বেশীরভাগ মানুষের অভিমত ছিল যে তিনি নাকি অবক্ষয়ের কথা বলেন, হারিয়ে যাওয়ার কথা বলেন, যন্ত্রণার কথা বলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে তাঁর মৃত্যুর পর বা নাগরিক সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পর; তার সম্বন্ধে মানুষের চিন্তা ভাবনার ভিত যেন টলে যায়। নীতার সেই চিরস্মরনীয় dialouge ” দাদা, আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম।” বা তিতাস একটি নদীর নাম সিনেমাতে যখন আবার সেই নদীর চর জেগে উঠল এবং একটি বাচ্চা বাঁশি বাজিয়ে দৌড়ে আসতে লাগল বা অযান্ত্রিক সিনেমাতে যখন গাড়ি বিক্রি হাওয়ার পর তার হেড লাইটটা নিয়ে ছোট্ট বাচ্চাটা খেলতে শুরু করছে — অর্থাৎ অবক্ষয় নয়, নতুন জীবনের গান তিনি বাজাতে চেষ্টা করলেন। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে, আমরা সেই জীবনের গান আজও প্রত্যক্ষ করি। মানুষের জীবনে উপর নীচ থাকেই। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিতে সে কেবল খোলা আকাশ দেখতে ভালোবাসে, সে কেবল উপরের দিকেই উঠতে চায়। সেটা ভালো কিন্তু নীচ যদি না থাকে তাহলে উপর কাকে বলবে? কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো মানুষ সেই নীচটা দেখে তার থেকে উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ না করে বরং আরো খারাপ কিছুতে জড়িয়ে পড়ে, আরো নীচে নামতে থাকে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় সংগ্রাম । আর সেই সংগ্রাম কেবল মানুষের ব্যক্তিগত স্তরে আটকে না থেকে ছড়িয়ে পড়ে সমাজের প্রতিটা স্তরে। কিন্তু সেই সংগ্রাম একদিন শেষ হবে এবং একটা সুন্দর সকাল দেখা দেবেই — হৃতিকের গল্পের শেষ সেকথাই বলে।
তাঁর সিনেমা এবং নাটকের মধ্যে দেশভাগ একটা অন্যতম বিষয়। ৪৭ এর দেশভাগের কাঁটা আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন হৃত্বিক। মর্যাদহে কেবলই বলে, ” বাংলারে কাটিবারে পারিছ, কিন্তু দিলটারে কাটিবারে পার নাই।” দেশভাগ কেবল একজন মানুষকে তার শিকড় থেকে উপরে ফেলে না, সাথে সাথে তার স্বকীয়তা, চিন্তা – ভাবনা, ভালোবাসা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে পরিচালিত করে।
নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য, মানসিক অবসাদ এবং শিকড় ছেঁড়া মানুষের হাহাকার তাঁকে আজীবন তাড়িত করেছে।ঋত্বিক ঘটক দেশভাগ কে কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে দেখেননি; তিনি এর সামাজিক ও মানবিক পরিণতিকে মুখ্য করে তুলেছেন। তাঁর ছবিতে রাষ্ট্র প্রায়শই অনুপস্থিত, অথচ তার সিদ্ধান্তের ভার বহন করে সাধারণ মানুষ। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে রাজনৈতিক মানচিত্র বদলালেও মানুষের বেদনা, স্মৃতি ও শেকড় অদৃশ্য সীমান্তে আটকে থাকে। দেশভাগ কোনো একদিনের ঘটনা নয়, বরং একটি চলমান মানসিক ক্ষত।
তার সিনেমার মধ্যে মার্ক্সবাদের প্রভাব ভীষণভাবে লক্ষ্য করা যায়। মার্কস বিচ্ছিন্নতাবাদের যে মতামত ১৮৪৫ সালে লিপিবদ্ধ করেছেন , তার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়, নাগরিক, সুবর্ণরেখা, মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার এইসব সিনেমাতে। নাগরিক এ, তিনি দেখালেন যেদিন দুর্গা পুজোর মূর্তি আসছে সেদিন একটি পরিবারকে তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হচ্ছে অর্থাৎ তার শিকড় থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। আদ্যন্ত বামপন্থী, মার্ক্সীয় তত্বে বিশ্বাসী হওয়ার পাশাপাশি তিনি কিন্তু ভারতীয় পৌরাণিক দর্শনের প্রতি ভীষণভাবে সহনশীল ছিলেন। পৌরাণিক বিভিন্ন চরিত্র বা ঘটনাকে তিনি গল্পের মধ্যে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যা তাঁর শৈল্পিক কুশলতাকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পৌরাণিক বিষয়গুলোকে সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে তিনি মিশিয়ে দিয়েছেন । ছবির শেষে নীতা যখন টিবি রোগে আক্রান্ত হয় তখন বাড়িতে নতুন সদস্যের আগমনের প্রস্তুতি চলছে। সেই সময় অন্যদের কথা ভেবে ঝড় বৃষ্টির রাতে তার শিক্ষক বাবা তাকে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে বলে। নীতা বেরিয়ে পড়ে ঐ জল কাদার মধ্যেই। এ যেন, উমার পিতৃগৃহে একপক্ষ কাল থাকার পর জলে বিসর্জনের ছবি। আর সেইসময় আবহসঙ্গীতে ভেসে ওঠে ” আয় গো উমা কোলে লই “।
বর্তমান সময়ে খবরের কাগজ খুললে যে নারী নির্যাতনের ঘটনা আমরা দেখি, যে অধঃপতনের ছবি আমরা দেখি, কখনও সেটা ব্যক্তিগত, কখনও সামাজিক আবার কখনও বা রাষ্ট্র ব্যাবস্থা দ্বারা পরিচালিত। ইতিহাসের পাতা থেকে শুরু করে আধুনিক সময় পর্যন্ত, তা সে দ্রৌপদীই হোক বা বর্তমানের অভয়া, সমাজে নারী যে কিভাবে অবহেলিত, শোষিত এবং নিপীড়িত হয়ে আসছে, আমরা প্রত্যেকেই কম বেশী সেটা দেখছি । শিক্ষিত সমাজ অনেক সময় এইসব নিয়ে আলোচনা করে, সমবেদনা প্রকাশ করে কিন্তু তা দিয়ে পরিবর্তন কোথায়? এই নারীকেই আমরা পুজো করি মহাশক্তি বা মহাকালী বলে। তার মধ্যে এমন এক শক্তির স্ফূরণ দেখার চেষ্টা করি, যার কোন আদি বা অন্ত নেই । কিন্তু সমাজে তার প্রতিফলন কোথায়? (অনেক সময় আবার তো দেখা যায় যে প্রদীপের নীচে অন্ধকারটা সবচেয়ে বেশি জমা হয়েছে।) হৃত্বিক কিন্তু মুক্তির পথ দেখিয়েছেন তার গল্পের মধ্যে। সেই প্রতিবাদের জন্য বাসন্তী, রীনা দের অনেক দাম দিতে হয়েছে, অনেক বদনামের ভাগী হতে হয়েছে, এমনকি মৃত্যুও হয়েছে কিন্তু তারা পরিবার ও সমাজের মুখের উপর দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে কিন্তু পিছু হয়নি। তাঁরা তাদের সম্মান নিয়ে বেঁচেছে।
হৃত্বিক কে চলচ্চিত্র পরিচালক এবং নাট্যকার হিসাবে জানলেও, তার আর একটা পরিচয় ছিল একজন ছোট গল্পকার হিসাবে। তার ছোট গল্পে, প্রকৃতি যেভাবে ধরা দিয়েছে, এককথায় তা অনবদ্য। তার লেখা একটি ছোট গল্প ‘ এজাহার ‘। ভবেশ তার প্রেমিকা জয়া কে হত্যা করেছে, তাকে মুক্তি দিয়েছে। সারা ভারতের লক্ষ লক্ষ নারী, তার স্বত্ত্বা কে বিসর্জন দিয়ে কেবলমাত্র সামাজিক ও পারিবারিক কারণে ঢুকরে ধুকরে প্রতিনিয়ত মরেও মরতে পারে না, তাদের সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি । এও এক ধরনের প্রতিবাদ আমাদের সামাজিক এবং মানবিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞান অভিশাপ না আশীর্বাদ – এই প্রশ্ন নানা ভাবে আবর্তিত হয়। ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লব হোক বা স্বাধীন ভারতে শিল্পের প্রসার সবক্ষেত্রেই যন্ত্রকে নিছক একটি ব্যবহারিক বস্তু হিসেবে ভাবা হয়, জীবনের গতিকে আরো দ্রুত করে তুলতে। কিন্তু জগদ্দল কেবল প্রযুক্তির প্রতীক নয়, বরং মানুষের একাকীত্ব, বঞ্চনা ও আবেগের বাহন। আধুনিকতার নামে পুরোনো মূল্যবোধের অবক্ষয়। গাড়িটি এখানে আসলে বিমলের মতোই এক প্রান্তিক সত্তা—ব্যবস্থার চাপে যে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক বাংলার সীমাহীন অন্যায় – অবিচারের প্রতিবাদে, প্যালেস্টাইন – ইজরায়েল মানুষের মৃত্যু মিছিলের প্রতিবাদে, নারীশক্তির উত্তরণ ঘটাতে, মানব ধর্মকে পদদলিত করতে চাওয়া রাজনৈতিক ধর্মের পতাকাকে পিছু টেনে ধরার মতো — এই দ্রোহ কাল পর্বে আজ ঋত্বিককে ভীষণ ভাবেই দরকার। প্রতিবাদের ভাষা হারালে হবে না, বাঁচার পন্থা খুঁজে বের করতে হবে। সভ্যতার শেষ নেই, তার ইতিবাচক বাক খুঁজে বের করে এগিয়ে যেতে হবে। শিরদাঁড়া সোজা রেখে, কালের কণ্ঠস্বরকে সংলাপে ছুঁড়ে দিচ্ছেন আমাদের দিকে; বলছেন ‘‘ভাবো ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো, তোমরা ভাবলে কাজ হবে’’।
