Skip to content

Banglasahitya.net

Horizontal Ticker
বাঙালির গ্রন্থাগারে আপনাদের সকলকে জানাই স্বাগত
"আসুন শুরু করি সবাই মিলে একসাথে লেখা, যাতে সবার মনের মাঝে একটা নতুন দাগ কেটে যায় আজকের বাংলা"
কোনো লেখক বা লেখিকা যদি তাদের লেখা কোন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ বা উপন্যাস আমাদের এই ওয়েবসাইট-এ আপলোড করতে চান তাহলে আপনার লেখা আপলোড করার জন্য ওয়েবসাইটের "যোগাযোগ" পেজ টি ওপেন করুন।
Home » অসমাপ্ত ভালোবাসা || Milan Purkait

অসমাপ্ত ভালোবাসা || Milan Purkait

অরুণ’দা যখন দ্বিতীয় বিয়ে করে নিয়ে এলো মেঘলা তখন বেশ ছোটো, ক্লাস ফাইভে পড়ে। মেঘলা অরুণদার একমাত্র মেয়ে। আমি সেদিন অরুণদার বাড়িতেই উপস্থিত। ওপরের ঘরে মেঘলাকে পড়াচ্ছি তখন। পড়াতে পড়াতেই কথাটা কানে এসেছিলো,

“ওরে উলু দে। নতুন বৌ এসেছে। আরে ও বড়ো বৌমা! কোথায় গেলে সব। নতুন বৌকে বরণ করতে হবে যে।”

কথাটা শুনে মেঘলা বলেছিল,

“-ওই এসে গেছে। একবার গিয়ে দেখে আসি। জানো মাস্টারমশাই, আজ আমার বাবা বিয়ে করতে গিয়েছিল। তুমি বসো, আমি একবারটি দেখেই চলে আসব।” বলেই মেঘলা দৌড় দিয়েছিল।

আমি ছিলাম মেঘলার গৃহ শিক্ষক। মেঘলাকে পড়া লেখা শেখানোর দায়িত্বটা অরুণদার অর্থাৎ অরুণদা দিয়েছিল আমার ওপরেই। সেই ছোটো বেলায় মেঘলাকে হাতে ধরে অ আ ক খ শেখানোটা আমাকেই করতে হয়েছিল। মেঘলার মা কখনো পড়া শোনার দায়িত্ব নেননি। আর অরুণদার টাইম কোথায়? সকালে অফিস বেরিয়ে গিয়ে রাতে বাড়ি ফেরা। মেঘলাকে পড়ানোর সূত্রেই অরুণদার বাড়ির অনেক ঘটনা আমার জানা। হবে নাই বা কেন, দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই অরুণদার বাড়িতে আমার আসা যাওয়া।

সেদিন পড়াতে গিয়ে মেঘলার ঠাকুমার কথাটা কানে যেতেই আমিও উঁকি মেরে জানালা দিয়ে দেখেছিলাম, সত্যিই তো। বরের বেশে টোপর মাথায় দিয়ে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে অরুণদা, পাশে রয়েছে লাল টকটকে বেনারসীতে অরুণদার নতুন বৌ। অরুণদার মা নতুন বৌমাকে বরণ করতে বলতে শুনেছি,

“-সুখী হও মা। যুগ যুগ ধরে স্বামীর ঘর করো।”

যেহেতু এটি দ্বিতীয় বিয়ে তাই বিশেষ অনুষ্ঠান হয়নি, মন্দিরে গিয়ে বিয়ের কাজটা সমাধা করেছিল অরুণদা। তবে খবরটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল। গ্রামের দিকে বেশির ভাগ মানুষ সবাই সবাইকে চেনে। সবার মুখে মুখে তখন একটাই কথা, “অরুণ মুখার্জী আবার বিয়ে করেছে।”

গ্রামে অরুণদাকে চেনে না এমন কেউ নেই। সরকারি চাকরি করা মানুষ বলতে তখন হাতে গোণা দু-তিনজন। অরুণদা ভালো চাকরি করে – স্টেশন মাস্টার। একই গ্রামে থাকলেও অরুণদাদের পাড়াটা আলাদা, নাম ছিল মুখার্জী পাড়া। প্রথম বিয়ের সময় আমি কলেজে পড়তাম। বিয়ে হয়েছিল মহা ধূমধাম করে। একদিন আগে থেকে নহবত বসেছিল, গ্রামের বেশির ভাগ লোক নিমন্ত্রিত ছিল।

অরুণদার প্রথম বিয়ে সুখের হয়নি। বিয়ে হয়েছিল জয়ন্তীপুরের দিকে। শ্বশুর বাড়ি ছিল বনেদি – মুখার্জী বাড়ি। আশেপাশের মানুষ সবাই চেনে। শুনেছি অরুণদার ছোটো মামা ঘটকালি করেছিল। ছোটো মামার সাথে অরুণদার শ্বশুর দুজনে চাকরি করতেন। শ্বশুর বলেছিলেন,

“-একটা ভালো ছেলে দেখে দিও তো আমার মেয়ের জন্য।”

মামা বললেন,

“-আমার নিজেরই ভাগ্না আছে, বড়দির ছোট ছেলে, রেলে চাকরি করে। দেখতো পারো।”

মাত্র এক মাসের মধ্যে বিয়ের কথা হয়ে যায়। মেয়েটির নাম ছিল জয়ন্তীপুরের মেয়ে মৌমি। বয়স তখন আঠারো – উনিশ। অরুণদার বয়স তিরিশের বেশি। বয়স ব্যবধান থাকলেও মৌমি সুন্দরী। সবাই বলত, “মুখার্জী পাড়ার মধ্যে সব থেকে সুন্দরী অরুণদার বৌ।”

সুন্দরী হলেও বিয়ের দু’দিন পর বৌ পালিয়ে যায়। অরুণদা বুঝতে পারে না কেন এমন হয়েছে। হঠাৎ চলে যাওয়ায় সবার মনে খটকা লেগেছিল। পরে বুঝিয়ে শ্বশুর বাড়িতে ফিরিয়ে আনে মৌমিকে। ফিরিয়ে আনার পরও আচরণ বদলায়নি। একদিন রাতে অরুণদা জোর করে বিয়ের সম্পর্ক মানাতে গেলে মৌমি বলে,

“-আমি তোমাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করিনি আর কোনো দিন পারব না।”

অরুণদা বিস্মিত,

“-কী বলছো? বিয়ে করলে কেন?”

মৌমি জানায়, বাবার জোরে বিয়ে করতে হয়েছে। তার ভালোবাসার মানুষ – অর্ক – কে বিয়েতে বাধ্য করা হয়নি। চার বছরের সম্পর্ক ছিল।

অরুণদা মেনে নেয়, বাইরে থেকে সবাই জানুক। মৌমি বাচ্চা প্রসঙ্গে শর্ত রাখে—মা হবে, কিন্তু দায়িত্ব পুরোটা নিজের নয়। মেয়েকে দু বছর বয়স পর্যন্ত দেখাশোনা করেছিল। এরপর আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে যায়। ঘর কাজ এলোমেলো, মেয়ে খাওয়ানো, স্নান, ঘুম – সব অরুণদার মা দেখাশোনা করতেন।

মৌমি বিয়ের বারো বছর পরেও অর্ককে ভুলতে পারেনি। নির্মাল্যর ভালোবাসা তার কাছে অমোঘ। নিজের ভালোবাসার জন্য চিরতরে নিজেকে দোষী মনে করে। একদিন ভোরে আগুন দিয়ে নিজের জীবন শেষ করে। চিরকুটে লিখে যায়,

“একজন যদি ভালোবাসার জন্য এত ত্যাগ করতে পারে, আমি কেন পারব না?”

মৌমি মারা যাওয়ার খবর পেয়ে অর্ক আসে। হাতে গোলাপ, পোড়া ক্ষত শরীরের ওপর বিছিয়ে বলে,

“আমাকে এভাবে হারাবে ভাবিনি। দেখা হবে নিশ্চয়ই।”

প্রথম প্রেম কখনো সহজে মুছে যায় না। ভালোবাসার শক্তি অমর।

এরপর বহু বছর কেটে যায়। অরুণদার পরবর্তী জীবন ভালো কেটেছিল। মেঘলাকেও নিজের মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেছে। মেঘলা বলত,

“-জানো মাস্টারমশাই, আমার নতুন মা আমাকে খুব ভালোবাসে। আমাকে সুন্দর করে সাজায়।”

অরুণদা রিটায়ার করেছে। মেঘলার বিয়ে হয়ে গেছে। এখনও কখনো কখনো নির্মাল্য ও মৌমিকে মনে করে। বাবার জেদের কারণে হারিয়ে গেছে দুই জীবন। অর্কের চোখ আজও খুঁজে বেড়ায় মৌমিকে।

1 thought on “অসমাপ্ত ভালোবাসা || Milan Purkait”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *