সামান্য উপকার (Samanyo Upokar)
জীবনভর মানুষকে আরোগ্য দিয়ে আসা চিকিৎসা কর্মকর্তা দেওয়ান সামায়েত উদ্দিন হিরু যখন নিজের অবসরোত্তর জীবন নিয়ে ভাবলেন, তখন ভেবেছিলেন বাকিটা জীবনটা শান্তিতেই কাটবে। কিন্তু জীবনের শেষ বাঁকে এসে যে তাকে এত বড় বিষাদ সিন্ধুর মুখোমুখি হতে হবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি।
রাজধানীর একটি মেডিকেল সাব সেন্টারে কয়েক দশক ধরে জনগণকে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন তিনি। স্ট্রেথোস্কোপ বুকে চেপে ধরে হাজারো রোগীর হাঁসফাঁস করা নিঃশ্বাস যে হাত শান্ত করেছে, আজ সেই হাত নিজের বুকেই থরথর করে কাঁপে। সংসার বলতে তো তার সবই আছে। সরকারি চাকরীজীবী স্ত্রী শাহীনা সামায়েত, বড় মেয়ে শ্যামা আর ছোট মেয়ে রিমা। কিন্তু সম্পর্কের সমীকরণগুলো যেন কোন অন্ধকার চোরাবালিতে হারিয়ে গেল, তা ভাবতে গেলে হিরু সাহেবের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে।
শাহীনা চিরকালই কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক আর চরম হিসাবমুখী। নিজের সরকারি চাকরির বেতনের হিসাব যেমন কখনো স্বামীকে স্পর্শ করতে দেননি, তেমনি তিনি বরিশালে হিরু সাহেবের নিজের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া অভিজাত পাঁচতলা বাড়িটির ওপরও একচ্ছত্র দখল নিয়ে রেখেছিলেন। বাড়ির সবকটি ফ্ল্যাটের মোটা অঙ্কের ভাড়া প্রতি মাসে সোজা শাহীনার ব্যাংকে গিয়ে জমে। অথচ বাড়িটি হিরু সাহেবের রক্ত পানি করা টাকায় বাবার পৈতৃক সম্পত্তির উপর নির্মিত! জীবনে কোনো দিন হিরু সাহেব সেই টাকার হিসাব চাননি, এমনকি এক টাকার ছোঁয়াও পাওয়ার আশা করেননি। উল্টো ভালোবেসে আর দায়িত্ববোধ থেকে নিজের বেতনের শেষ পয়সাটি দিয়ে সংসারের ঘানি টেনেছেন। বাজার-সদাই, মেয়েদের প্রাইভেট টিউটরের ফি, পোশাক-আশাক, সব সামলেছেন একা।
মেয়েদের মানুষ করেছেন রাজকন্যার মতো। উচ্চ শিক্ষিত করে বড় মেয়ে শ্যামার ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছেন, আর ছোট মেয়ে রিমা সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নিল প্রাঙ্গণে পা রেখেছে।
গল্পের মূল ট্র্যাজেডি শুরু হলো সেদিন, যখন অবসর জীবনের শেষ সঞ্চয় জিপি ফান্ডের টাকা, ব্যবহৃত গাড়িটা বিক্রি করে দেওয়া অর্থ আর সারা জীবনের হাঁড়ির তলার জমানো পুঁজি মিলিয়ে হিরু সাহেবের হাতে নগদ এক কোটি টাকা এলো।
এক রাতে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসে হিরু সাহেব খুব আবেগাপ্লুত হয়ে স্ত্রী আর ছোট মেয়েকে বললেন,
-আমার রাজকন্যারা ঢাকায় ভাড়াটিয়া। এই ভাড়াটিয়া গঞ্জনাটা আমি মুছে ফেলতে চাই। এতদিন চাকরি জীবনে আমিও তো মিরপুরে একাকী ভাড়া বাসাতেই কাটিয়ে দিলাম, আজও নিজের একটা ছাদ হলো না। এই এক কোটি টাকা দিয়ে এবার একটা নিজস্ব ফ্ল্যাট কিনবো ভাবছি। আমাদের একটা মাথা গোঁজার নিজস্ব ঠিকানা হবে, মেয়েরা অন্তত বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে এটা আমাদের নিজের বাড়ি। সবাই একসাথে সুখে থাকবো।
কথাটি শেষ হতে না হতেই যেন এক আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটল। সংসারের বাতাস মুহূর্তে থমথমে হয়ে গেল।
বড় মেয়ে শ্যামা শ্বশুরবাড়ি থেকে এসেই সোচ্চার হলো,
-বাবা, তোমার তো বয়স হয়েছে! এখন ফ্ল্যাট কিনলে সেটা আমাদের দুই বোনের নামে রেজিস্ট্রি করে দিও। তুমি তো কাল নাও থাকতে পারো, তখন আইনি ঝামেলায় কে পড়বে?
ছোট মেয়ে রিমাও বোনের সুরে সুর মেলালো। আর স্ত্রী শাহীনা পেছনে থেকে আগুনের লেলিহান শিখায় ঘি ঢালতে লাগলেন। তার সাফ কথা,
-মেয়েদের বঞ্চিত করে তুমি নিজের নামে সম্পত্তি করবে? তোমার নিয়ত ভালো না হিরু!
তোমার কি অন্যত্র সংসার আছে না-কী?
হিরু সাহেবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। যে জীবনের সমস্ত উপার্জনের টাকা দিয়ে পরিবারকে ভালোবেসেছেন, আজ সেই টাকাই তার জীবনে দোজখ নেমে আসার কারণ হয়ে দাঁড়াল? জীবনের সবচেয়ে বড় এই আর্থিক ও মানসিক দ্বন্দ্বে পড়ে তিনি শুভাকাঙ্ক্ষী, সাবেক সহকর্মী আর প্রবীণ আইনজীবীদের সাথে গোপনে পরামর্শ করলেন। সবাই এক বাক্যে একই কথা বললেন, -হিরু সাহেব, ভুল করেও এই ভুল করবেন না। বরিশালের পৈতৃক বাড়িটাও তো আপনার স্ত্রী নিজের দখলে রেখে ভাড়ার সব টাকা নিচ্ছেন, সেখানেও আপনার কোনো অধিকার রাখেনি। জীবনের এই শেষ বয়সে এসে নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় মেয়েদের নামে লিখে দিয়ে আপনি রাস্তার ফকির হবেন না। তাই বলছি নিজের নামেই ফ্ল্যাট কেনাটাই যৌক্তিক হবে।
কিন্তু এই যৌক্তিক সিদ্ধান্তটিই যেন হিরু সাহেবের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াল। একসাথে সুখে থাকার আশায় যে সংসারকে তিনি স্বর্গ বানাতে চেয়েছিলেন, তা রাতারাতি এক নরককুণ্ডে পরিণত হলো। স্ত্রী-কন্যাদের সাথে কথা বন্ধ হয়ে গেল। মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া হলো।
তারপর হিরু সাহেব নিজের নামেই ফ্ল্যাট কিনলেন। বাকী তিনজন সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিলেন তারা কেহই সেই ফ্লাটে যাবে না। তার প্রতি অপমান, মানসিক নির্যাতন আর তাচ্ছিল্যের তীর প্রতিদিন বুক বিদ্ধ হতে লাগলো। অদৃশ্য রক্তক্ষরণ বইতে লাগলো বুকে ও চোখে।
মানসিক অশান্তি সহ্য করতে না পেরে একটু শান্তির খোঁজে হিরু সাহেব বরিশালে নিজের পৈতৃক পাঁচতলা বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন ওঠার চেষ্টা করলেন। ভাবলেন, নিজের বাবার ভিটায়, শান্ত হাওয়ায় অন্তত মনটা একটু হালকা হবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলেন অশান্তির বিষবাষ্প আগেই পৌঁছে গেছে। স্ত্রী আর মেয়েরা তাকে নিজের পৈতৃক বাড়িতেই একপ্রকার পর করে দিলো। এই বৃদ্ধ বয়সে, নিজের বাড়িতে থেকেও তাকে নিজের রান্না নিজেকেই করে খেতে হতো। হাঁড়িতে চাল টগবগ করে ফোটার শব্দে তিনি নিজের ভাগ্যের নিষ্ঠুরতাই যেন শুনতে পেতেন। দুশ্চিন্তায়, মানসিক যন্ত্রণায় আর একাকীত্বে হিরু সাহেবের ছিপছিপে শরীরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।
একদিন নিঝুম রাতে বরিশালের নিজের পৈতৃক বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে হিরু সাহেবের বুক ফেটে এক গগনবিদারী আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো-
“হে উপরওয়ালা! এ তুমি কেমন বিচার করলে? আমি তো কখনো কারো রক্ত চুষি নাই! রোগীর গায়ে হাত দিয়ে নিঃস্বার্থ সেবা দিয়েছি, নিজের রক্ত পানি করা টাকায় সংসার চালিয়েছি! আজ কেন আমার রক্ত মাংসের সন্তান আর স্ত্রী আমাকে জ্যান্ত কবর দিচ্ছে? শুধু টাকার জন্য? একটা ফ্ল্যাটের জন্য? এ কেমন পাষাণ পৃথিবীতে আমাকে ফেলে রাখলে তুমি!”
সেই গগনভেদী আকুতি যেন রাতের বাতাসকে কাঁপিয়ে দিল, কিন্তু তার নিজের স্বজনদের মন একটুও গলাতে পারল না। ঢাকায় ফিরে হিরু সাহেব আর নীরব থাকতে পারলেন না। মনের ভেতরের এই অবর্ণনীয় যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছিল না। তিনি দেখা করলেন তার বহু পুরনো বন্ধু, কবি ও সাংবাদিক আকাশ সরকার সাহেবের সাথে।
উত্তরখানের কবিকুঞ্জ শাওনাজ ভিলার নাজ সার্কেলে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে হিরু সাহেব তার বন্ধুর কাছে নিজের জীবনের সমস্ত সত্য উগড়ে দিলেন। তিনি বললেন,
-দোস্ত, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না রে। আমার শরীর আর বইছে না। কিন্তু আমি চাই বিশ্ববাসী জানুক বাহিরের আলো ঝলমলে চেহারার নিচে কতটা কুৎসিত অন্ধকার লুকিয়ে থাকে। যে বাবারা নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়, শেষ বয়সে তারা কীভাবে নিজের রক্তের অত্যাচারের শিকার হয়! আমার এই ঘটনা থেকে মানুষ শিক্ষা নিক।
আকাশ হিরু সাহেবের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে চোখ মুছলেন। তিনি বললেন
-হিরু, তুই ভেঙে পড়িস না। তোর এই কান্না আমি শুধু পত্রিকার পাতায় নয়, গল্প-কবিতা লিখে সারা বিশ্বের কোটি মানুষের বিবেকের দরজায় পৌঁছে দেব।
তিন দিন পর সকালে খবরের কাগজের পাতায় আর সোশাল মিডিয়ার পাতায় পাতায় ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ল এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন:
“এক নিঃস্ব চিকিৎসকের কান্না: সারা জীবনের সঞ্চয় কাড়তে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে সন্তানদের চরম মানসিক নির্যাতন!”
প্রতিবেদনটি পড়ার পর শহরে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শাহীনা সামায়েত এবং তার দুই মেয়ের চরম স্বার্থপরতা আর অমানবিকতার বিরুদ্ধে ধিক্কারের ঝড় উঠল। মানুষ তাদের সামাজিক ও মানসিকভাবে বয়কট করতে শুরু করল।
এমন অবস্থায়ও হিরু সাহেব নিজের সাধ্যমতো মানুষের সেবা বন্ধ করেননি। সকালে পুরনো পোশাকটা গায়ে চাপিয়ে তিনি চলে যেতেন তার সাবেক মেডিকেল সেন্টারটির পাশে থাকা ‘মদিনা ফার্মেসী’তে। সেখানে বসেই রোগীদের প্রেসক্রিপশন লিখতেন।
একদিন হিরু সাহেবের শরীরটা একদমই ভালো যাচ্ছিল না। তীব্র মাথা ঘোরার সাথে বুকের ভেতরটা কেমন যেন খামচে ধরছিল। এমন অসুস্থ শরীর নিয়ে আর রোগী দেখা সম্ভব নয় বুঝে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। মদীনা ফার্মেসীর মালিক হোসেন আলী ব্যস্ত হয়ে ডাক্তার সাহেবের হাত ধরে ফেলেন। যত্ন করে হিরু সাহেবকে ধরে এনে একটি রিকশায় তুলে দিয়ে বললেন,
-আপনি আর দেরি করবেন না স্যার, সোজা মিরপুরের বাসায় চলে যান। আপনার হোন্ডাটা আমার ফার্মেসীর ভেতরেই সাবধানে তুলে রাখছি, কাল এসে নিয়ে যাবেন।
রিকশাওয়ালা প্যাডেলে চাপ দেবে, ঠিক তখনই এক সুঠাম স্বাস্থ্যের সুবেশ তরুণ গাড়ী থেকে নেমে দৌড়ে এসে রিকশার গতি রোধ করল। হিরু সাহেব কিছু বুঝে ওঠার আগেই তরুণটি হিরু সাহেবের ধূলিধূসরিত পা ছুঁইয়ে কদমবুসি করল। হিরু সাহেব ঝাপসা চোখে ছেলেটির মুখের দিকে তাকালেন। চেনা চেনা লাগে, কিন্তু নামটা স্মৃতির কোঠায় খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
ছেলেটি ভিজে ওঠা চোখে বলল,
-স্যার, আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি সাফায়েত সিকদার জগলু!
নামটা শুনতেই যেন ২০ বছর আগের এক বিষণ্ণ বিকেলের কথা হিরু সাহেবের মনে পড়ে গেল। সেদিন এই ছেলেটির খুব অসুখ ছিলো। তিনি চিকিৎসা করতে গিয়ে তার দৈন্যতার কথা শুনলেন। তাই ভজিট তো নেননি উল্টো ঔষধ কেনার জন্য কিছু টাকাও দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ছেলেটির পড়ালেখার অদম্য ইচ্ছার কথা শুনে তিনি তাকে আরও সাহায্য করলেন। টাকার অভাবে যখন এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে পারছিল না তখন হিরু সাহেব নিজের পকেট থেকে সেই পরীক্ষার ফি দিয়েছিলেন, কিনে দিয়েছিলেন বই, খাতা আর কলম। শুধু তা-ই নয়, পরবর্তীতে তিনি নিজের চেষ্টায় তাকে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তিও করিয়ে দিয়েছিলেন। প্রাইভেট পড়িয়ে এবং হিরু সাহেবের সাহায্য ও সহযোগিতায় চলছিল ছেলেটির শিক্ষা জীবন।
সেই অনাথ, অসহায় জগলু বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাল! আজ সে সৌদি আরবের একটি পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড অয়েল এক্সট্র্যাকশন কোম্পানির চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। মাসে মোটা অঙ্কের বেতন, উত্তরখানে নিজের ফ্ল্যাট, নিজের গাড়ি, আর তার স্ত্রী লুৎফে কানিজও পেশায় একজন চিকিৎসক।
জগলু জোর করে হিরু সাহেবকে তার গাড়িতে তুলে নিজের বাসায় নিয়ে গেলেন। হিরু সাহেবের মুখ থেকে তার জীবনের এই করুণ ও হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির কথা শুনে জগলুর চোখ আর্দ হয়ে উঠলো।
রুদ্ধ কন্ঠে জগলু বলল,
-বাবা-মাকে খুব ছোটবেলায় হারিয়েছিলাম। স্বজন বলতে যাদের জানতাম, সেই চাচারা প্রতারণা করে আমায় পথে বসিয়েছিল। সেদিন যদি আপনি দেবদূতের মতো আমায় সাহায্য না করতেন, তবে আজকের এই জগলু হয়তো কোন অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যেত! তাই আপনিই আমার পিতা, আপনিই আমার মাতা। আজ থেকে আমি আপনাকে কোথাও যেতে দেব না!
জগলু তার স্ত্রী লুৎফে কানিজকে ডেকে এনে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলল,
-লুৎফে, তোমাকে বলেছিলাম না যে মহান মানুষটির করুণায় আজ আমি এই জায়গায় পৌঁছেছি? ইনিই সেই মহান মানুষ, ইনিই আমার বাবা! তুমি সবার আগে বাবার শরীরটা পরীক্ষা করো।
লুৎফে কানিজ শ্রদ্ধায় হিরু সাহেবের পায়ে হাত দিয়ে কদমবুসি করল এবং প্রাথমিক পরীক্ষা চালিয়েই বুঝতে পারল, দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন আর অবহেলায় হিরু সাহেব চরম ‘সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার’ এ ভুগছেন। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন।
জগলু হিরু সাহেবের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
-ওরা আপনাকে টাকার লোভে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে বাবা! ওদের কাছে আপনাকে আর কোনদিন ফিরতে দেব না। যত দিন না ওরা নিজেরা এসে নিজেদের ভুল বুঝতে না পারছে, ততদিন আপনি আমাদের কাছেই থাকবেন যত্নে ও ভালবাসায়। আপনাকে আমরা সৌদিও নিয়ে যাবো।
হিরু সাহেব প্রথম দিনেই জগলু ও লুৎফের একমাত্র সন্তান ছোট্ট বিরু’র বন্ধু হয়ে গেলেন।
পরবর্তী তিন মাস জগলু আর লুৎফে পরম মমতায় হিরু সাহেবের সেবা করল। সৌদি আরব ফেরার সময় হলে ওরা হিরু সাহেবকেও সাথে নিয়ে গেলেন। সেখানে সৌদি আরবের বিশ্বমানের হাসপাতালে হিরু সাহেবের উন্নত চিকিৎসা করানো হলো, ধীরে ধীরে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ও মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। সুস্থ হওয়ার পর জগলু আন্তরিকতার সাথে হিরু সাহেবকে পবিত্র ওমরাহ হজও পালন করালেন। কাবার সামনে দাঁড়িয়ে হিরু সাহেবের চোখ দিয়ে নামল আনন্দাশ্রু।
১০ বছর পর…
স্মৃতিতে কীর্তনখোলার জল অনেকদূর গড়িয়েছে। একদিন হিরু সাহেবের কথায় জগলু তাকে নিয়ে দেশে এসে বরিশালের পৈতৃক বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। স্বপ্নের পদ্মাসেতু পার হয়ে তাদের গাড়ি ছুটল বরিশালের বাড়ির দিকে। বাড়ীর দোতলায় ভাড়াটিয়া দেখে স্তম্ভিত হলেন তিনি। তথ্য জোগাড় করতে গিয়ে জানলেন তার স্ত্রী বাপের বাড়ীতে ভান্ডারিয়ায় থাকেন।
যে মেয়েদের জন্য স্ত্রী শাহীনা স্বামী হিরু সাহেবকে তিল তিল করে শেষ করে দিয়েছিলেন, সেই মেয়েরাই পরবর্তীতে মায়ের কাছ থেকে ছলচাতুরী আর মানসিক চাপ দিয়ে বরিশালের সেই পাঁচতলা বাড়ির সবকটি ফ্ল্যাট নিজেদের নামে লিখিয়ে নিয়েছে! সব ভাড়া দিয়েছে। আজ যে সন্তান বাবার সাথে বেয়াদবি ও প্রতারণা করতে পারে, কাল যে সে মাকেও ছাড়বে না এই চরম সত্যটি শাহীনা বুঝতে পেরেছেন অনেক দেরিতে।
মেয়েরা মায়ের জমানো টাকা আর সরকারি পেনশনের সব অর্থ লুণ্ঠন করে কেটে পড়েছে। অবশেষে শাহীনার ঠাঁই হলো ভান্ডারিয়ায়। ভান্ডারিয়ায় শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে হিরু সাহেব যে দৃশ্য দেখলেন, তা যেন প্রকৃতির এক চরম ও নিষ্ঠুর বিচার!
বাড়ির এক কোণে, অন্ধকার ও দুর্গন্ধময় একটি স্যাঁতসেঁতে কক্ষে একাকী পড়ে আছেন হিরু সাহেবের সেই অহংকারী স্ত্রী শাহীনা সামায়েত। বার্ধক্য আর রোগে পঙ্গু হয়ে মলমূত্রের দুর্গন্ধের মাঝে ধুঁকে ধুঁকে মরছেন তিনি দিনের পর দিন, দেখার কেউ নেই।
জগলু আর হিরু সাহেব বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে দ্রুত সেই অসুস্থ, নিঃস্ব শাহীনাকে গাড়িতে তুলে সোজা ঢাকায় নিয়ে এলেন। উত্তরখানের ফ্ল্যাটে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন এবং পরিচর্যার জন্য সার্বক্ষণিক অভিজ্ঞ নার্স রেখে দিল।
একদিন রাতে, নিজের ভুল আর অপরাধবোধে দু’চোখের জলে বুক ভাসিয়ে শাহীনা হিরু সাহেবের পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন,
-ওগো, আমায় ক্ষমা করে দাও! তুমি ক্ষমা না করলে আমার যে নরকেও ঠাঁই হবে না।
আমি তোমায় ভুল বুঝেছিলাম …
হিরু সাহেব স্ত্রীর মাথায় পরম মমতায় হাত রেখে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বললেন,
-কারো প্রতি আজ আর আমার কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই শাহীনা। শুধু মাঝে মাঝে এই ভেবে অবাক হই যাদের রক্ত বলে ভাবলাম, যাদের পেছনে জীবনের কোটি কোটি টাকা ঢেলে দিলাম, বুকের কলিজাটা কেটে তুলে দিলাম তারা আমাকে কী দিলো? আর মাত্র কয়েকটি টাকা দিয়ে একদিন যাকে সাহায্য করেছিলাম, রক্তের কোনো সম্পর্ক না হওয়া সত্ত্বেও সে আজ আমাকে কী দিলো!
শাহীনা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না, শুধু ঘরের নীরবতায় ভেসে রইল প্রবঞ্চিত এক দম্পতির দীর্ঘশ্বাস আর এক অচেনা সন্তানের পরম শ্রদ্ধার সুরভিত পরশ।
