সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (বাংলাদেশের গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার)
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জন্ম হয় ১৯২২ সালের ১৫ই আগস্ট নোয়াখালিতে।
তাঁদের পরিবারের আদি নিবাস ছিল চট্টগ্রামে।
চট্টগ্রাম শহরের ষোলশহর এলাকায়, তাঁর পিতা সৈয়দ আহমাদুল্লাহ ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। মা নাসিম আরা খাতুনও সমতুল্য উচ্চশিক্ষিত ও রুচিশীল পরিবার থেকে এসেছিলেন, সম্ভবত অধিকতর বনেদি বংশের নারী ছিলেন তিনি। ওয়ালীউল্লাহর আট বছর বয়সে মাতৃবিয়োগ ঘটে। দুই বছর পর তাঁর বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। বিমাতা এবং বৈমাত্রেয় দুই ভাই ও তিন বোনের সঙ্গে ওয়ালীউল্লাহর সম্পর্ক কখনোই অবনতি হয় নি।
চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে ওয়ালীউল্লাহ্ ছিলেন পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান।
তার তেইশ বছর বয়সকালে তার বাবা আহমদুল্লাহ ১৯৪৫ সালে ময়মনসিংহে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পদে কর্মরত অবস্থায় ছিলেন। সে সময় অসুস্থ হয়ে তিনি কলকাতায় চিকিৎসা করতে গিয়ে মারা যান।
সেই বছরই অর্থাৎ ১৯৪৫ সালে ওয়ালীউল্লাহ্ কলকাতার বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক ‘দি স্টেম্যান’-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেই সময় ওই পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন প্রখ্যাত কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। “দি স্টেম্যান’-এ কর্মরত অবস্থাতেই ওয়ালীউল্লাহ্ ‘কমরেড পাবলিশাস’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা স্থাপন করেন। এই প্রকাশনা থেকেই ওয়ীউল্লাহের প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। কমরেড পাবলিশার্স থেকে প্রখ্যাত কবি আহসান হাবীবের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রিশেষ’ প্রকাশিত হয়েছিল। ওয়ালীউল্লাহ্ এখান থেকেই হান্টারের বিখ্যাত গ্রস্ত ‘The Indian Mussalamans’ গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণের ব্যবস্থা করেছিলেন। এই সময়ই তিনি Contemporary নামে একটি ইংরেজ গ্রন্থও প্রকাশ করেন।
তাঁর পিতৃমাতৃবংশ অনেক শিক্ষিত ছিল। বাবা এম.এ পাশ করে সরাসরি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরিতে ঢুকে যান। মাতামহ ছিলেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স থেকে পাশ করা আইনের স্নাতক। বড় মামা এম.এ.বি.এল পাশ করে কর্মজীবনে কৃতী হয়ে খানবাহাদুর উপাধি পেয়েছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী (ওয়ালীউল্লাহর বড় মামী) ছিলেন নওয়াব আবদুল লতিফ পরিবারের মেয়ে, উর্দু ভাষার লেখিকা ও রবীন্দ্রনাথের গল্প নাটকের উর্দু অনুবাদক।
পারিবারিক পরিমণ্ডলের সাংস্কৃতিক আবহাওয়া সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মনন ও রুচিতে প্রভাব ফেলেছিল। পিতার বদলির চাকরির সুবাদে ওয়ালীউল্লাহ পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অংশ দেখার সুযোগ লাভ করেন।ওয়ালীউল্লাহর শিক্ষাজীবন কেটেছে দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। ১৯৩৯ সালে তিনি কুড়িগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় হতে ম্যাট্রিক, এবং ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৪৩ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন। তাঁর আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল ডিস্টিঙ্কশনসহ বি.এ এবং অর্থনীতি নিয়ে এম.এ ক্লাশে ভর্তি হয়েও শেষে পরিত্যাগ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি একাধিক মাসিকপত্রে লেখালেখির সাথে জড়িত ছিলেন। পাকিস্তান সরকারের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাথে জড়িত থাকার সূত্রে কর্মজীবনের বড় একটা সময় তিনি বিদেশে কাটান। ১৯৫৫ সালে তিনি ফরাসি আন মারী-র সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন।
১৯৬২ সালে প্যারিসে ছাত্র অবস্থাতেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। বাধ্য হয়ে নয়, স্বেচ্ছায়। তার জ্যেষ্ঠভ্রাতা সৈয়দ নসরুল্লাহ এম.এ এবং বি.এ পাশ করেছিলেন। তাঁর পক্ষেও খুব স্বাভাবিক ছিল এম.এ পড়াটা। কিন্তু হয় নি। ১৯৪৫ সালে তিনি কলকাতার ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় চাকরি নেন। এ বছর ২৬শে জুন তাঁর পিতা মারা যান। তার তিন মাস আগে, মার্চ মাসে, তার প্রথম গ্রন্থ গল্প সংকলন ‘নয়নচারা’ প্রকাশিত হয়।
বাংলা, ইংরেজি, ফরাসি ভাষা জানতেন তিনি। ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে পড়ার সময় লেখকের প্রথম গল্প ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’ (১৯৪১ সাল) কলেজে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
নিয়মিত লেখালেখি শুরু করেছিলেন ১৯৪১-৪২ সাল থেকে। এমন মনে করার সঙ্গত কারণ আছে যে, তিনি ভবিষ্যতে লেখকবৃত্তি বেছে নিতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পরই তিনি ‘দ্য স্টেটসম্যান’-য়ের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকা চলে আসেন এবং সেপ্টেম্বরে রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের সহকারী বার্তা-সম্পাদকের চাকরি নেন। এ চাকরিতে কাজের ভার কম ছিল। ‘লালসালু’ উপন্যাস লেখায় হাত দিলেন ঢাকার নিমতলীর বাসায়। পরের বছরই এ উপন্যাস গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে ‘কমরেড পাবলিশার্স’।
তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন কথাশিল্পী। কল্লোল যুগের ধারাবাহিকতায় তাঁর আবির্ভাব হলেও তিনি ইউরোপীয় আধুনিকতায় পরিশ্রুত নতুন কথাসাহিত্য বলয়ের শিলান্যাস করেন। জগদীশ গুপ্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের উত্তরসূরি এই কথাসাহিত্যিক অগ্রজদের কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ করলেও বিষয়, কাঠামো ও ভাষা-ভঙ্গিতে নতুন এক ঘরানার জন্ম দিয়েছেন। তাঁর লেখায়
অস্তিত্ববাদের প্রকাশ ঘটেছে।
বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গের লেখক-বুদ্ধিজীবীরা রাজনৈতিক আলোড়নে যখন নানাভাবে আলোড়িত, তখন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলার গ্রাম ও সমাজ-জীবনের এক ধ্রুপদী জীবনধারাকে লালসালু উপন্যাসে রূপদান করেন। তিনি এতে বাংলার লোকায়ত সংস্কার ও ধর্মাচরণের নেপথ্যে তথাকথিত ধর্মধ্বজাধারী ও ভন্ড ধর্মব্যবসায়ীদের স্বরূপ গভীর জীবনবোধ ও মমত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেন। তাঁর অন্য দুটি উপন্যাস চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪ সাল) ও কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮ সাল) বাংলা সাহিত্যে দুটি ব্যতিক্রমধর্মী সৃষ্টি। তিনি এ দুটি উপন্যাসে ‘চেতনাপ্রবাহ রীতি’ ও ‘অস্তিত্ববাদ’-এর ধারণাকে অসাধারণ রূপক ও শিল্পকুশলতায় মূর্ত করে তুলেছেন।
তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের করাচি কেন্দ্রের বার্তা সম্পাদক হয়ে ঢাকা ছাড়েন ১৯৫০ সালে। সেখান থেকে নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান দূতাবাসে থার্ড সেক্রেটারির পদমর্যাদায় প্রেস-আতাশে হয়ে যান ১৯৫১ সালে। অতঃপর একই পদে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বদলি হন ১৯৫২ সালের শেষের দিকে। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় ফিরে এলেন তথ্য অফিসার হিসেবে ঢাকাস্থ আঞ্চলিক তথ্য-অফিসে। ১৯৫৫ সালে পুনরায় বদলি করাচির তথ্য মন্ত্রণালয়। এরপর ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার তথ্য পরিচালকের পদাভিষিক্ত হয়ে, ১৯৫৬ সালের জানুয়ারিতে, দেড় বছর পর পদটি বিলুপ্ত হয়ে গেলে জাকার্তার পাকিস্তানি দূতাবাসে দ্বিতীয় সেক্রেটারির পদমর্যাদায় প্রেস-আতাশে হয়ে রয়ে গেলেন ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বর অবধি। এরপর ক্রমান্বয়ে করাচি-লন্ডন-বন, বিভিন্ন পদে ও বিভিন্ন মেয়াদে। ১৯৬১ সালের এপ্রিলে ফার্স্ট সেক্রেটারির পদমর্যাদায় প্রেস-আতাশে হিসেবে যোগ দিলেন প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসে। একনাগাড়ে ছয় বছর ছিলেন তিনি এ শহরে। এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছিল “লালসালু’ উপন্যাসটির ফরাসি অনুবাদ “লারব্র্ সা রাসিন” (L’arbre sans racines, অর্থাৎ শিকড়বিহীন গাছ)।
অতঃপর দূতাবাসের চাকুরি ছেড়ে ১৯৬৭ সালের ৮ই আগস্ট ইউনেস্কোতে চুক্তিভিত্তিক প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট পদে যোগ দেন। চাকুরিস্থল ছিল প্যারিস শহরে ইউনেস্কো’র সদরদপ্তরে। ১৯৭০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর ইউনেস্কোতে তার চাকুরির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। অবসরগ্রহণের নিয়ম হিসাবে পাকিস্তান সরকার ইসলামাবাদে তাঁকে বদলি করে। তবে তিনি ইসলামাবাদে না গিয়ে প্যারিসেই থেকে গিয়েছিলেন।
তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লালু সালু’-তে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পটভূমি, অতি পরিচিত মানুষ ও সামাজিক পটভূমি চিত্রিত হয়েছে। ‘বদ্ধ সমাজের শোষণ ও অত্যাচারের পটভূমিতে ব্যক্তি জীবনজিজ্ঞাসার রূপায়ণ ‘লাল সালু’।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-র দ্বিতীয় উপন্যাস ‘চাঁদের অমাবস্যা’। এই উপন্যাসের নায়ক গ্রামের স্কুল শিক্ষক আরেফ। উপন্যাসের ঘটনা বলতে তেমন কিছু নেই। বরং চেতনাপ্রবাহরীতি অনুযায়ী ব্যক্তিমনের অন্তঃবাস্তবতাকে মেলে ধরেছেন লেখক।
তাঁর তৃতীয় উপন্যাস ‘কাঁদো নদী কাঁদো’। এখানেও মনের অন্তরলোকের চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। ব্যক্তির সংকট ও সংকট মুক্তির প্রয়াস এবং অসাফল্যের নিপুণ বিশ্লেষণ ‘কাঁদো নদী কাদো’।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-র ছোটোগল্পগুলি বিষয়ের অভিনবত্বে, মুসলমান সমাজের সংস্কার বিশ্বাস, রাগ-বিরাগ, আশা-নিরাশার চিত্রণে, চেতনাপ্রবাহ রীতির প্রয়োগে এবং পরিমিত বোধে উল্লেখযোগ্য। ‘নয়নচারা’ গল্প সংকলনের গল্পগুলি ব্যক্তিমানসের স্বরূপ উদ্ঘাটনে অভিনব। গল্পের চরিত্রগুলি প্রত্যক্ষ বাস্তবের অন্তরালে ক্রিয়াশীল জীবনসত্যের প্রকাশে পাঠকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
১৯৪৮ সালে ‘নয়া সড়ক’ পত্রিকায় একটি তুলসী গাছের কাহিনী’ প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে গল্পটি পরিমার্জিত হয়ে ১৯৬৫-তে ‘দুই তীর ও অন্যান্য’ নামক গল্প সংকলনে প্রকাশিত হয়। তুলসী গাছ হিন্দুদের কাছে একমি ‘মিথ’ (Myth) এই মিথকে গল্পকার সমকালীন জীবনের ঘটনার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন মানুষের মনস্তত্ত্বের উদ্ঘাটনে উপস্থাপিত করেছেন গল্পে।
‘মৃত্যুযাত্রা’ গল্পটিও মন্বস্তরের পটভূমিকায় রচিত। যে মন্বন্তর ব্যক্তিত্ব স্বপ্ন, স্মৃতি সবকিছুকে মুছে দেয় সেই বাস্তব ছবি এই গল্পে অঙ্কিত হয়েছে।
গল্পকার তাঁর ‘খুনি’ গল্পটিতে একটি অপরাধের অন্তরালে মানুষের অন্তরস্বভাবের স্বরূপ অঙ্কন করেছেন।
‘জাহাজী’ ও ‘পরাজয়’ গল্প দুটিতেও এই শূন্যতার ছবি। এই গল্প দুটিতে সাধারণ অবহেলিত মানুষের নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা চিত্রিত হয়েছে। ‘জাহাজী’ গল্পে বৃদ্ধ সারেঙ্গ করিম ও ছাত্তার-এর চরিত্র দুটি ব্রাত্য জীবনের ছবিকে ফুটিয়ে তোলে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এমন একজন কথাসাহিত্যিক যিনি ছিলেন দেশ-কাল-সচেতন। এই সচেতনতা সমাজে ও সাহিত্যে অবহেলিত মুসলমান সমাজের চরিত্রাঙ্কনে সাহায্য করেছে।
সেলিনা হোসেন তাই বলেছেন, ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সম্পূর্ণ আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক চাহিদায় চমৎকার মিশেল ঘটিয়ে আমাদের উপন্যাসের দুটো শক্ত খুঁটি স্থাপন করেছেন” সেজন্য শুধু বাংলােদশের সাহিত্যে নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যে তিনি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির জন্য নিজের স্থান করে নিয়েছেন।
(মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান)
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারকার্য চালান এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে ফরাসি একাডেমির সদস্য পিয়ের এমানুয়েল, অাঁদ্রে মারলো প্রমুখ বুদ্ধিজীবীর সহযোগিতায় বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ফরাসি নাগরিক এ্যান মেরির সঙ্গে ওয়ালীউল্লাহ পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন (১৯৫৫)। মিসেস মেরি ওয়ালীউল্লাহর প্রথম উপন্যাস লালসালু (১৯৪৮) ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেন। পরে এটি Tree Without Roots (১৯৬৭) নামে ইংরেজিতেও অনূদিত হয়।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রাজনীতিসম্পৃক্ত মানুষ ছিলেন না, কিন্তু সমাজ ও রাজনীতিসচেতন ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি চাকরিহীন, বেকার। তা সত্ত্বেও বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করেছেন, সঙ্গতিতে যতটুকু কুলোয় তদানুযায়ী টাকা পাঠিয়েছেন কোলকাতায় মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে। তার সন্তানদের ধারণা, তাদের পিতার অকাল মৃত্যুর একটি কারণ দেশ নিয়ে দুশ্চিন্তা, আশঙ্কা ও হতাশা। তিনি যে স্বাধীন মাতৃভূমি দেখে যেতে পারেন নি সে বেদনা তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের সকলের কাছেই প্রকাশ করেছেন। তাঁর ছাত্রজীবনের বন্ধু পরবর্তীতে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, আবু সাঈদ চৌধুরী ওয়ালীউল্লাহর মৃত্যুর সাত মাস পরে তার স্ত্রীকে এক আধা সরকারি সান্ত্বনাবার্তা পাঠিয়েছেন। তাতে লেখা ছিল,
“ আমাদের দুর্ভাগ্য যে, মি. ওয়ালীউল্লাহর মাপের প্রতিভার সেবা গ্রহণ থেকে এক মুক্ত বাংলাদেশ বঞ্চিত হলো। আমাকে এ’টুকু বলার সুযোগ দিন যে আপনার ব্যক্তিগত ক্ষতি বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষতি। ”
১৯৫৬ সালে আন্-মারির সাথে করাচিতে
তার ফরাসিনী স্ত্রীর নাম আন্-মারি লুই রোজিতা মার্সেল তিবো। তাদের পরিচয় হয় সিডনিতে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তখন পাকিস্তানি দূতাবাসে কর্মরত, অন্যদিকে আন্-মারি কর্মরত ছিলেন ফরাসি দূতাবাসে। দেড়-দু বছরের সখ্যতা ও ঘনিষ্টতা শেষাবধি বৈবাহিক বন্ধনের পরিণতি লাভ করে। ওয়ালীউল্লাহ তখন করাচিতে। সেখানেই ১৯৫৫ সালের ৩রা অক্টোবর তাদের বিয়ে হয়। ধর্মান্তরিত বিদেশিনীর নাম হয় আজিজা মোসাম্মত নাসরিন। নবলব্ধ নামকে বিয়ের কাবিননামাতেই বিসর্জন দিয়েছিলেন দু-জনে। তাদের দু সন্তান। প্রথমে কন্যা সিমিন ওয়ালীউল্লাহ, তার পরে পুত্র ইরাজ ওয়ালীউল্লাহ।
১৯২২ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সাহিত্যে সক্রিয় ছিলেন তিনি। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে, ১৯৭১ সালের ১০ই অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে ওয়ালীউল্লাহ পরলোকগমন করেন। গভীর রাতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের ফলে তার মৃত্যু হয়। প্যারিসের উপকণ্ঠে তারা একটি ফ্ল্যাট কিনেছিলেন, সেখানেই ঘটনাটি ঘটে। ১৯৭১ সালের ১০ই অক্টোবর প্যারিসে তাঁর মৃত্যু হয় এবং প্যারিসের উপকণ্ঠে মদোঁ-স্যুর বেল্ভু-তে তাকে সমাহিত করা হয়।
[ তাঁর গ্রন্থতালিকা ]
(উপন্যাস)
১). লালসালু (১৯৪৮ সাল)
২). চাঁদের অমাবস্যা (১৯৬৪ সাল)
৩). কাঁদো নদী কাঁদো (১৯৬৮ সাল)
৪). কদর্য এশীয়, ফাল্গুন (২০০৬ সাল, মরনোত্তর)
৫). হাউ টু কুক বিনস (২০১২ সাল, মরনোত্তর)
(ছোটগল্প সংগ্রহ)
১). নয়নচারা (১৯৪৫ সাল) গল্প আছে –
নয়নচারা
জাহাজী
পরাজয়
মৃত্যুযাত্রা
খুনী
রক্ত
খণ্ড চাঁদের বক্রতায়
সেই পৃথিবী
২). দুই তীর ও অন্যান্য গল্প (১৯৬৫ সাল) গল্প আছে –
দুই তীর
“একটি তুলসী গাছের কাহিনী”
পাগড়ী
কেরায়া
নিষ্ফল জীবন নিষ্ফল যাত্রা
গ্রীষ্মের ছুটি
মালেকা
স্তন
মতিনুদ্দির প্রেম
(অগ্রন্থিত গল্পাবলি)
সীমাহীন এক নিমেষে
চিরন্তন পৃথিবী
চৈত্র দিনের এক দ্বিপ্রহরে
ঝড়ো সন্ধ্যা
প্রাস্থনিক
পথ বেধে দিল
মানুষ
অনুবৃত্তি
সাত বোন পারুল
সাত বোন পারুল (দ্বিতীয় দফা)
ছায়া
দ্বীপ
প্রবল হাওয়া ও ঝাওগাছ
হোমেরা
স্থাবর
সপ্ন নেবে এসেছিল
ও আর তারা
সবুজ মাঠ
স্বগত
মানসিকতা
কালচার
সূর্যালোক
মাঝি
অবসর কাব্য
নকল
রক্ত ও আকাশ
মৃত্যু
সপ্নের অধ্যায়
সতীন
বংশের জের
নানির বাড়ির কেল্লা
না কান্দে বাবু
(নাটক)
১). বহিপীর (১৯৬০ সাল)
২). উজানে মৃত্যু (১৯৬৩ সাল)
৩). সুড়ঙ্গ (১৯৬৪ সাল)
৪). তরঙ্গভঙ্গ (১৯৭১ সাল)
(রচনাবলি)
গল্পসমগ্র (১৯৭২ সাল)
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্-রচনাবলি: ১ (সম্পা. সৈয়দ আকরাম হোসেন), ১৯৮৬ সাল; ঢাকা
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্-রচনাবলি: ২ (সম্পা. সৈয়দ আকরাম হোসেন), ১৯৮৭ সাল; ঢাকা।
(তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারের তালিকা)
১). পেন পুরস্কার (দ্বিতীয় স্থান) ১৯৫৫ নাটক বহিপীর ঢাকা পেন ক্লাবের উদ্যোগে এক আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলন।
২). বাংলা একাডেমি পুরস্কার ১৯৬১সালে ‘লালসালু’ উপন্যাসের জন্য।
৩). একুশে পদক ১৯৮৩সালে (মরণোত্তর) সাহিত্য পুরস্কার।
৪). আদমজী পুরস্কার ১৯৬৫ সালে ‘দুই তীর ও অন্যান্য গল্প’ – এর জন্য।
৫). জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০০১ সালে শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার ‘লালসালু ‘-র জন্য।
—————————————————————
[ সংগৃহীত ও সম্পাদিত। তথ্যসূত্র – উইকিপিডিয়া। তথ্য নির্দেশনা –
শফিউল আলম, বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা।
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, প্রথম আলো: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা।
Choudhury, Serajul Islam (২০০৫ সাল)। “Introduction” Tree Without Roots। Dhaka, Bangladesh: writers.ink। পৃষ্ঠা ix. আইএসবিএন 984-32-2546-5.