বাসুদেব :
‘হে ধনঞ্জয় ! যারা রাজারাজড়া আর দৈত্যদানবদের হারিয়েছে, তাদের না দেখেও
আমি বেঁচে আছি | যে সাত্যকি আর প্রদ্যুম্ন ছিল তোমার প্রিয় শিষ্য, বৃষ্ণিবংশের
জাঁহাবাজ বীর, এমন কি খোদ বাসুদেবেরও প্রিয়পাত্র – তাদেরই দুর্নীতিতে
যদুকুলের এই ক্ষয় |’
সময়টা সুবিধের নয়
কিছু না ক’রে
যে পারে সেই হাতিয়ে নিচ্ছে
খোলা মঞ্চে
চোখের পর্দাটুকুও না ফেলে
বহুরূপীরা
ঘড়ি ঘড়ি নিজেদের রং বদলাচ্ছে
কার হাত, কিসের হাততালি
কিসেরই বা জয়জোকার
মুখ দেখে কিছুই ঠাহর হচ্ছে না
শুনি নাকি রাত্রে
দরজায় দরজায় কড়া নেড়ে যায়
এক ন্যাড়ামুন্ডি
কালো-কটাসে কালপুরুষ
আমি শুধু এইমাত্র দেখেছি
মর্গে
ময়না-তদন্তের জন্যে অপেক্ষা করছে
লাইনবন্দী লাশ
রাতদুপুরে গেরস্থের ঘরে ঢুকে
ধেড়ে ইঁদুরের দল
ঘুমন্ত মানুষের চুল ও নখ
কেটে নিয়ে যাচ্ছে
হাম্বাগুলো শোনাচ্ছে ঠিক হালুমের মতো
ছাগলেরা রপ্ত করেছে
হায়েনার হাসি
ঘোড়ার পেট থেকে বেরোচ্ছে গাধা
ভিক্ষের ঝুলি থেকে যক্ষের ধন
নামাবলীর ভেতর থেকে নেপালা
নগর-সঙ্কীর্তনে
এখন হরিবোলের জায়গায়
বলোহরির রমরমা
মা-লক্ষ্মীদের জন্যে কাটা হচ্ছে
লক্ষ্মণের গণ্ডি
তার বাইরে পা দিলেই রাক্ষসে ধরবে
‘ভো ভো, পুরবাসিনীরা |
দ্বারকায় এখুনি এসে পড়বেন তৃতীয়পাণ্ডব
মা ভৈঃ ! মা ভৈঃ !’
কে আসবে ? তৃতীয়পাণ্ডব !
ধ্যুস,
উনি যে গাণ্ডীব তুলবেন, সে ক্ষ্যামতাও তো ওঁর আর নেই |
২
ব্যাসদেব :
‘হে পার্থ ! সময় সহায় হলে সুবুদ্ধি, তেজ, অনাগত দর্শন—যা হওয়ার সবই হয় |
আবার অসময়ে সবই খোয়া যায় | কালই জগতের বীজস্বরূপ | কাল বলবান হয়েও
ক্ষমতা হারায়, প্রভু হয়েও হয় পরের আজ্ঞাবহ | তোমার অস্ত্র তার স্বস্থানে ফিরে
গেছে | এবার তুমি মহাপ্রস্থানে যাত্রা করো |’
সব একসা হয়ে আছে—
জঙ্গলের মধ্যে ঘর
আর ঘরের মধ্যে জঙ্গল
এক গোলগাল গৃহস্থের মাথার চালে
ঘাড় কাত করে আছে
ধর্মের কল
মনে রেখো, বাপসকল
লাঠিকে তোল্লা দিলে নিশান হয়
নিশানকে ওল্টালে লাঠি
কেতুর জোরে কাজ না হলে
রাহু আছে
গিলতে
ফুটপাথ খড়ি পাতা
যারা হাত বার করতে ভয় পায়
টুক করে খাঁচা থেকে বেরিয়ে
একটা চড়াই
তাদের ভাগ্য গণনা করে দিচ্ছে
যারা কথা বলতে জানে না
তারা ভাষণ দেয়
যারা কোনো কথা কানে তোলে না
তারা শোনে
যারা দেখতেই পায় না, তারা দেয়াল লেখে
যারা কুটো ভেঙে দুখানা করে না
তারাই কল টেপে
হাততোলা হলে নুলোরাও
হাজিরার খাতায় টিক মারে
বনবাসে এলোচুলে
দুঃখিনী মা আমার ! আমি আসছি
হাওয়ার উজানে বুক টান ক’রে
মাটিতে পা টিপে টিপে |
বড় বেশি গায়ে-পড়া হয়ে আছে
কাঁটাগাছের ডালগুলো
তার মানে,
অনেকদিন কেউ এ-পথ মাড়ায় নি
যে বাউলের মধু আনতে গিয়েছিল
তারা ফেরে নি
বনবিবিকে পুজো-দেওয়া তাদের ঘটপট
এখনও ছড়িয়ে রয়েছে
আমি ওসব পুজোপাঠের মধ্যে নেই
হাওয়ার উল্টোমুখ
শক্ত করে মাটিতে পা টিপে টিপে চলেছি
ধূর্ত বাঘ যেন
পেছন থেকে কিছুতেই
আমার গন্ধ টের না পায় ||