প্রার্থনা
“বলি কি গো আজ কিছু ব্যবস্থা হল দেশে ফেরার”? প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে শুয়ে ছটফট করে ভোর হলেই বেরিয়ে পড়ছে রসূল, হঠাৎ থমকে যাওয়া জীবন থেকে মুক্তির স্বাদের সন্ধানে। আজ টানা একমাস লকডাউন চলছে, কাজ তো কবেই গেছে ফ্যাক্টরি বন্ধ হতে। রুটিরুজি সবশেষ কিন্তু এই রাঁচি থেকে কিভাবে দেশের বাড়ি আগরতলায় ফিরবে চিন্তায় অস্থির হচ্ছে। পেপার টিভি খুললেই পরিযায়ী শ্রমিকদের দেশে ফেরানো নিয়ে রাজনৈতিক তরজা! কিছু একটা সমাধান খুব দরকার। এর মাঝেই মৃত্যু মিছিলে ভারাক্রান্ত দেশ। সবার প্রার্থনা আর যেন না হয় প্রিয়, আত্মীয় পরিজন দের মৃত্যু।
আজ দিনটা যেন অন্যরকম শুরু হল। জলদি ফিরেই রসূল ছেলেকে উঠাচ্ছে, ” ওঠো বাবু ওঠো, আমরা বেরুবো”। ” কই গো জলদি গুছিয়ে নাও একটা ফাঁকা মালগাড়ি শুনলাম মালদহ পর্যন্ত নাকি যাবে, তাড়াতাড়ি রেডি হও”।
“না বাবু, ওসব খেলনা, সাইকেল কিছু নিতে পারবো না! শুধু নিজেদের প্রাণ তিনটে নিয়ে বাড়ি ফেরা”। কি নেবে আর কিনা নেবে না বুঝে উঠতে পারছে না সালমা!রসূল হাত লাগিয়ে দুটো চাদরের পোঁটলা করে ন্যূনতম জামা কাপড়, গামছা আর অনেকটা মুড়ি, ছোলা গুড়, দুটো বাঁশের লাঠি নিলো। আট বছরের ছেলেকে কাঁধে চড়িয়ে স্বামী স্ত্রী দুহাতে পোঁটলা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো । ” জলদি পা চালাও, ভিড় হলে সব পন্ড, উঠতেই পারবো না” বলে হনহন এগুচ্ছে রসূল। “ওগো এতসব আসবাব, বাসন, বাবুর বই! তিলে তিলে সব কিনেছি, ফেলে যাবো..! চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে রসূলের। সালমার হাত ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে সগোক্তিতে বলে ” আল্লাহ বাঁচালে আবার হবে দেখো “।
বাবা, বিহার থেকে কি আবার অন্য ট্রেন!ছেলের কপালে স্নেহ চুম্বন দিয়ে রসূল জানায়, ” না বেটা, সবাই যেমন হাঁটছে আমরাও ওভাবেই হাঁটবো। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস বেরিয়ে এলো রসূলের, যে শহর পেটে ভাত , পরনে কাপড় দিয়েছে বাঁচার তাগিদে সেই খনি অঞ্চলকে পিছনে ফেলে ট্রেনের চাকা গড়ালো। কয়লা মাখা নোংরা কামরায় কচিকাঁচা বুড়ো জওয়ান, যুবতী নানা ধর্মের সকলের প্রার্থনা , “হে আল্লাহ, হে ভগবান কিচ্ছু চাইনা সুস্থ হয়ে যেন বাড়ি ফিরতে পারি!”