১
এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
এ নহে নাদির সা, এ নহে জঙ্গীস্ খাঁ,
এ নহে তৈমুরলঙ্গ চীন তাতাবীর,
আসেনি হিমাদ্রি লঙ্ঘি, নাহি সৈন্য সাথী সঙ্গী,
নাহি হাতে তরবার নাহি ধনু তীর |
পথে পথে হাহাকারে, আসেনি কাঁদায়ে কারে,
আসে নাই দেশে দেশে বহায়ে রুধির,
আসিয়াছে পুষ্প রথে, সুমেরুর স্বর্ণপথে,
উড়ায়ে কনকরেণু কিরণে মিহির !
একাকী এসেছে “ভোলা”, মমতার হাত খোলা,
করুণা গলিয়ে পড়ে আঁখি নিলে নীর !
২
এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
কোথা হ’তে এসেছে সে, ঘর বাড়ী কেন দেশে,
নাহি জানি পরিচয় শিশু বিদেশীর,
নাহি বোঝে কপটতা, বোঝে না মোদের কথা,
বোঝে না সে কোনো ভাষা এই পৃথিবীর !
এসেছে উলঙ্গ বেশে, বস্ত্র নাই তার দেশে,
কেমনে সরম তবে বহে রমণীর ?
উলঙ্গ ভগিনী ভাই, কিসে থাকে এক ঠাঁই ?
থাকুক জ্যাকেট বডির নাহি মিলে চীর ?
কুরুচি-কবির ছেলে, এসেছে বসন ফেলে,
লজ্জায় ভাঙিয়া পড়ে রুচির মন্দির !
৪
এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
এসেছে মোদের বাড়ী, নয় মাস—দিন চারি,
টলমল করিতেছে কাঙ্গাল-কুটির !
ত্রিদিব করিয়া জয়, আসিয়াছে মনে লয়,
এনেছে মন্দার-মধু অধরে মদির,
এনেছে পাপদ কল্প, প্রকৃতই—নহে গল্প,
ও ক্ষুদ্র হৃদয়ে ভরা স্নেহ সুগভীর !
লুণ্ঠিয়া অলকা শত, আনিয়াছে রত্ন কত,
কে পারে করিতে তাহা গণনায় স্থির ?
আঙ্গিনার মাটি ধূলা, তাও মণিরত্ন গুলা,
অযত্নে পড়িয়া আছে ঘরের বাহির !
৫
এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
তার হামাগুড়ি দিতে, কুলায় না পৃথিবীতে,
অতি ক্ষুদ্র আঙ্গিনা সে ক্ষুদ্র পরিধির,
তার সে চরণ দাপে, বিশাল ব্রহ্মাণ্ড কাঁপে,
অতি ক্ষুদ্র ধরণী সে আকুল অস্থির !
বাছে না আগুন জল, বুকে তার এত বল,
তার কাছে সমতুল্য সমুদ্র শিশির,
বোঝেনা সে সাপ বাঘ, সে যাহার পায় লাগ,
অবহেলে সাপটিয়া ধরে গ্রীবা শির |
সে ত’ গো জানেনা ভয়, মরণ কাহারে কয়,
সে বুঝি অধীন নয় নব-নিয়তির !
. ৬ উপরে
এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
সে মানেনা জাতিভেদ, মানেনা কোরাণ বেদ,
মানেনা আচার ধর্ম মুনি মৌলবীর,
সে মানে না খাদ্যাখাদ্য, সে নহে কিছুর বাধ্য,
খায় সুখে বিষ্ঠা মুত্র মাখন পনির !
সে মানেনা পূণ্য পাপ, অশ্রুজল অনুতাপ,
সে মানেনা আমাদের আলোক তিমির,
সে এক সম্রাট্—প্রভু, সে নহে অধীন কভু,
সে করে চরণে চূর্ণ রীতি পৃথিবীর !
তাহার উলঙ্গ অঙ্গে, সুরুচি কুরুচি সঙ্গে,
গরু বাঘে পান করে এক ঘাটে নীর,
৭
এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
প্রতাপ প্রভুত্ব তার, নাহি বিশ্বে তুলনার,
কি ছার লঙ্কার সেই রাজা দশশির |
জুড়াইতে তাহার হিয়া, শীতল পরশ দিয়া,
আসিয়া রয়েছে আগে মলয় সমীর !
তাহারি পানের তরে, নদী হৃদ সরোবরে,
নীরদ রেখেছে ভরি সুশীতল নীর !
তারি আসিবার তরে, রজত সুবর্ণ করে,
উজলিয়া আছে ধরা শশাঙ্ক মিহির !
তারি আগমন জন্য, ধরণী হয়েছে ধন্য,
আর কোনো প্রয়োজন নাহি পৃথিবীর |
তুষিতে তাহারি মন, বসন্তের ফুলবন,
ফুটায়ে রেখেছে ফুল সুধা সুরভির |
ফল শস্যে হয় নত, তরু তৃণ আছে যত,
পোষিতে অমৃত খাদ্যে তাহারি শরীর |
তারি তরে আমি তুমি, অনন্ত আকাশ ভূমি,
সৃষ্টির গম্ভীর অর্থ হয়েছে গম্ভীর |
৮
এ দেশে এসেছে এক দিগ্বিজয়ী বীর !
প্রমদা পাইয়া তারে, কি আনন্দ অহঙ্কারে,
চুমিতেছে বার বার রোমাঞ্চ শরীর !
এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড গুলা, আজি তার পদধূলা,
সে জেন রাণীর রাণী শত ইন্দ্রাণীর !
আজি তার ছিন্নবাসে, কি লাবণ্য অট্টহাসে,
কে জানে কি ভাগ্যোদয় আজি অভাগীর,
দশ হস্তে দশভুজা, আদি তারে করে পূজা,
বাণী সে বন্দনা গায় গীত গায়ত্রীর !
লক্ষ্মী তার পদ সেবে, প্রণমে অনন্ত দেবে,
ছেলে কোলে মহিমা কি এত জননীর |
কবিতা কৃতার্থ হয়, লেখনীর জয় জয়,
তাহারি বিজয়-গাথা গাহিয়া কবির !